২৯শে মে, ২০২৪ খ্রিস্টাব্দ, বুধবার

আন্দোলন-সংগ্রামে আমাদের বটবৃক্ষ সুফিয়া কামাল

বরিশাল টাইমস রিপোর্ট

প্রকাশিত: ১২:৩৩ অপরাহ্ণ, ২১ জুন ২০১৭

জন্মদিন বছরের একটি বিশেষ দিন। যাঁকে উপলক্ষ করে সেই জন্মদিন তিনি যদি দেশনন্দিত এবং সবার ভালোবাসায় স্নাত, উজ্জ্বল, একক কেউ হন তবে তাঁকে বিনম্র শ্রদ্ধায় স্মরণ করে আমরা ধন্য হই। এমন একজন আমাদের জননী সাহসিকা কবি সুফিয়া কামাল।ইতিহাসের অনিবার্যতায় তাঁর তৈরি হয়ে ওঠা। সমাজ-অর্থনীতি-সংস্কৃতি-রাজনীতি ও রাষ্ট্রনীতি সব ক্ষেত্রে তাঁর যে কোনো দায়িত্বশীল উদ্যোগী ভূমিকা সবাইকে আশ্বস্ত করেছে এবং দেশ ও জাতির কল্যাণে তিনি বিশেষ অবদান রেখেছেন। তিনি সারা জীবন আমাদের ভাষা সংস্কৃতি ও ঐতিহ্য বিধ্বংসী সবরকম ষড়যন্ত্রের বিরুদ্ধে প্রবল প্রতিবাদ করেছেন। অশ্বিনী কুমার, মুকুন্দ দাস, ফজলুল হকের বরিশাল থেকে উঠে আসা এক কিশোরী– যাঁর দীক্ষা হয়েছিল বেগম রোকেয়ার হাত ধরে– তিনি তাঁকে সড়কে তুলে দিয়েছিলেন, মন্ত্রটা কী ছিল?

সুফিয়া কামাল জানিয়েছেন, নারীমুক্তি মানেই মানবমুক্তি। তিনি নারী-পুরুষ এবং সব সম্প্রদায়ের মানুষের মানবাধিকার নিয়ে লড়াই করেছেন। সাম্প্রদায়িকতার বিরুদ্ধে তাঁর রুখে দাঁড়ানো আজ অনুকরণীয় দৃষ্টান্ত। তাঁর অনুপস্থিতি আজ আমরা ভীষণভাবে অনুভব করছি।

একজন কবি হিসেবে তাঁর পরিচয় প্রথম প্রকাশ পেয়েছিল বিশ শতকে, ব্রিটিশ শাসিত কলকাতার সাহিত্য পত্রিকায়। তখন মুসলিম নারী সমাজ রোকেয়ার ‘নারী জাগরণী’ মন্ত্রে সবেমাত্র দীক্ষা নিয়েছে। সুফিয়া কামালের কাব্যচর্চা শুরু হয়েছে। একজন তরুণীর লেখা কবিতা বিদ্রোহী কবি নজরুলকেও আকৃষ্ট করে এবং সেকালের কবি- সাহিত্যিকদেরও দৃষ্টি আকর্ষণ করেছিল। বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ তাঁকে আশীর্বাণী পাঠিয়েছিলেন।

পিতৃস্নেহ বঞ্চিত সুফিয়া কামাল প্রথম শিক্ষা অর্জন করেন মায়ের কাছে। শৈশব- কৈশোর যাঁর কেটেছে একাকী, মায়ের স্নেহছায়ায়, বরিশালের নানাবাড়ির আভিজাত্যও তাঁকে ধরে রাখতে পারেনি। বাঙালি মেয়ে হয়েই জন্মেছিলেন বলে তাঁর স্বভাবজাত মূল্যবোধ ও আদর্শ ছিল সুদৃঢ়।

ধর্মীয় শিক্ষা-দীক্ষা ও সাংসারিক কাজকর্মের প্রাথমিক শিক্ষা অর্জন করলেও, তাঁর মন পড়ে থাকত প্রকৃতির কাছে। এই বাংলার আকাশ-বাতাস-সাগর-গিরি ও নদী এবং ধূলিকণা, ঘাস, ফুল, পাখি তাঁর হৃদয় আকুল করে রাখত। প্রকৃতি তাঁকে কবি করেছিল, প্রকৃতি তাঁকে পরিপুষ্ট করেছিল, প্রকৃতি তাঁকে মানবিক ও সাহসী করেছিল বলেই আমরা এক বিরাট বটবৃক্ষ সুফিয়া কামালের ছায়ায় আশ্রয় পাই।

১৯১১ সালে তাঁর জন্ম বরিশালের শায়েস্তাগঞ্জে।। শৈশবে মায়ের সঙ্গে একবার কলকাতায় গিয়েছিলেন, তখন যে আত্মীয় বাড়িতে ছিলেন, সেখানে একদিন বেগম রোকেয়া এসেছিলেন। তিনি তাঁকে কাছে টেনে বলেছিলেন:

“আমার স্কুলে আপনার মেয়েটিকে দিয়ে দিন।”

কিন্তু সেটা সম্ভব হয়নি, মায়ের সঙ্গে সুফিয়া চলে আসেন নানাবাড়ি বরিশালে। মাত্র ১৬ বছর বয়সে বিয়ে হয় মামাতো ভাই নেহাল হোসেনের সঙ্গে, তারপর কলকাতায় গিয়ে বসবাস করেন। কাব্য প্রতিভার স্ফূরণ ঘটেছিল মূলত বরিশালে বসেই। মামার বিশাল লাইব্রেরি তাঁকে বই পড়ায় আগ্রহী করে তোলে। তিনি নিজেই বলেছেন:

“আমি বই ও পত্র-পত্রিকায় লেখা ও লেখকের নাম দেখতাম ও পড়তাম, আর ভাবতাম আমিও চেষ্টা করলে একদিন নিশ্চয় লিখতে পারব। শৈশবে পাড়ার মেয়েরাই আমাদের বাড়ি আসত। তাদের বকুল ফুলের মালা গেঁথে, দোলনায় দুলে, পাখির কণ্ঠ শুনে, লতায়-পাতায় জড়াজড়ি করে, নদীর বাতাসে শ্বাস নিয়ে আমার দিন কেটেছে। মায়ের কাছে বাংলা পড়া শিখেছি, কোরান শরীফ ও নামাজ শিখেছি, রান্না-বান্না শিখেছি। আমাদের বাড়ি ছিল অনেক বড়, ঐ বাড়ির প্রাকৃতিক পরিবেশই আমাকে কবিতা লিখতে অনুপ্রাণিত করেছে। তখন স্বদেশী আন্দোলন চলছিল, পাড়ার মেয়েদের সঙ্গে আমিও একবার বাড়িতে না বলে বক্তৃতা শুনতে গিয়েছিলাম। আমার কৌতূহল ও উৎসাহই জানতে সাহায্য করেছে মানুষের কথা, সমাজ ও দেশের কথা।”

sufia kamal2 মাত্র ১৬ বছর বয়সে তিনি স্বামী নেহাল হোসেনের সঙ্গে যখন কলকাতায় বসবাস করতেন তখন তার কাব্য প্রতিভার মাত্র প্রকাশ ঘটেছে। মাসিক ‘সওগাত’  ছাড়াও অন্যান্য পত্র-পত্রিকায় কবিতা ছাপা হত। তাঁর কবিতার প্রধান আকর্ষণ ছিল বিষয়, ছন্দ ও প্রকৃতিগত সারল্য। কবি হিসেবে তাঁর প্রতিষ্ঠা পেতে খুব দেরি হয়নি। এখানেই হচ্ছে সুফিয়া কামালের প্রধান সাফল্য। তিনি বলেছেন,

“আমি চেষ্টা করেছি সবসময় বিবেকের কথা প্রকাশ করতে, কাজে লাগাতে। তবে কবিতা লেখা, সামাজিক কাজ করা আর সংসার করা সবটাতেই আমাকে সংগ্রাম করে পথ করে নিতে হয়েছে। স্বামী-সন্তানের প্রতি দায়িত্ব কর্তব্য অবহেলা করিনি কোনোদিন, মানুষের সুখে-দুঃখে পাশে থেকেছি।”

কলকাতা থাকতেই অল্প বয়সে তিনি বিধবা হলেন একটি কন্যা সন্তান নিয়ে। কলকাতা কর্পোরেশনের একটি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে শিক্ষকতার চাকরি নেন মাত্র ১৭ টাকা বেতনে। প্রথম জীবন সংগ্রাম তাঁর ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা থেকেই একটু একটু করে তৈরি করেছে আমাদের সুফিয়া কামালকে। ১৯২৯ সালে তিনি আঞ্জুমানে খাওয়াতীনে এবং ইন্ডিয়ান ওমেন্স ফেডারেশনের সদস্য হন।

একজন নিরুপায় তরুণী হলেও আত্মমর্যাদায় সুফিয়া কামাল ছিলেন অনন্য ব্যক্তিত্বময়ী। সরকারি চাকরিজীবী হলেও তাঁর দ্বিতীয় স্বামী কামালউদ্দীন সাহেব তখন লেখকমহলে সুপরিচিত ছিলেন। কবি সুফিয়ার সঙ্গে তাঁর বিয়ে হয় ১৯৪০ সালে, এরপর আর তাঁকে ভাবতে হয়নি। স্বামী, সন্তান, সংসার সামলে তাঁর কাব্যচর্চা এগিয়ে গেছে এবং সমাজ-সংস্কৃতি ও স্বদেশের কাজে তিনি একাত্ম হতে পেরেছিলেন। তিনি নিজেই বলেছেন:

“আমি সাধারণত রাতের কাজকর্ম শেষ হলে, সবাই ঘুমুলে লেখার টেবিলে বসতাম। লেখার সময়টা আমার তখনই ছিল। অনেক সময় ভোরবেলা উঠে লিখতে বসি। লেখার ভাবনাটা আগে থেকেই ভেতরে ভেতরে থাকে, সুতরাং লিখতে বসলে গুছিয়ে নিতে সময় লাগে না। তাছাড়া লেখার জন্য তাগাদা থাকত বেশি। প্রতিদিন লেখার টেবিলে বসাটা একটা অভ্যাস ছিলই।”

তবে পড়ার প্রতি ঝোঁকটা শৈশব-কৈশোর থেকে গড়ে উঠেছিল শেষ বয়সেও সেই অভ্যাস ছাড়তে পারেননি। ১৯৪৭ সালে সাপ্তাহিক ‘বেগম’ প্রকাশিত হলে তিনিই এর প্রথম সম্পাদক ছিলেন কয়েক মাস। সুফিয়া কামাল কেবলমাত্র কাব্যচর্চায় থাকেননি; ঘর ছেড়ে বেরিয়েছেন মানুষের ডাকে, মানুষের কল্যাণ্যের জন্য।

বর্ধমানে স্বামীর চাকরিস্থলে থাকাকালে তাঁকে প্রথম দেখা যায় খাদ্যের দাবিতে একটি মিছিলে, এর উল্লেখ মণিকা সেনের গ্রন্থে পাওয়া যায়। এরপর কলকাতায় থাকাকালে দেশবিভাগের পূর্বে ও পরে যে দাঙ্গা হয়, তখনও তাঁকে দেখা গেছে দাঙ্গায় আহত ও ক্ষতিগ্রস্থদের মাঝে কাজ করতে। ১৯৪৮ সালে সুফিয়া কামাল ঢাকায় চলে আসার পর তখনকার মহিলা সমাজকর্মী আশালতা সেনের সঙ্গে পরিচিত হন এবং ঢাকার ‘গেন্ডারিয়া মহিলা সমিতি’র সঙ্গে যুক্ত হয়ে সমাজকল্যাণমূলক কাজে সংযুক্ত হন। এরপর বেগম ক্লাবের সঙ্গে যুক্ত হয়ে তাঁকে আরও বেশি জড়িয়ে পড়তে হয় শামসুন্নাহার মাহমুদ, জোবেদা খাতুনসহ অনেকের সঙ্গে।

নারী শিক্ষার জন্য কলেজ প্রতিষ্ঠার আন্দোলন, নারী পুনর্বাসন, নারীর অধিকার আদায়ের নানা আন্দোলনে সক্রিয়ভাবে যুক্ত হন তিনি। ১৯৬১ সালে যে ‘মুসলিম পারিবারিক আইন’ পাস হয় তার পেছনেও ছিল তৎকালীন বেগম ক্লাবের পক্ষ থেকে শামসুন্নাহার মাহমুদ, সুফিয়া কামালের বিরাট ভূমিকা। এ আন্দোলনে পাকিস্তানের আরও অনেক কল্যাণী নারীও সংযুক্ত ছিলেন। এ দাবি সোচ্চার হয়েছিল, সমর্থন পেয়েছিল বলেই জেনারেল আইয়ুব তা মেনে নিতে বাধ্য হয়েছিলেন।

১৯৫২ সালের ভাষা আন্দোলনের সময় সুফিয়া কামাল রাজপথেই ছিলেন। ছাত্রদের গুলি খাওয়া ও গ্রেপ্তারের খবর পেয়ে ছুটে গিয়েছিলেন মেডিক্যাল কলেজে, প্রতিবাদ সভায়, মিছিলে। অধিকার আদায়ের জন্য সচেতন বাঙালির যে সংগ্রাম, সেখানে তিনি যুক্ত হয়ে পড়লেন। বাঙালির সাংস্কৃতিক অধিকার আদায়ের আন্দোলনে প্রধান সারিতে দাঁড়ালেন সুফিয়া কামাল। ছাত্র সমাজের অনুষ্ঠানে বক্তৃতা, রবীন্দ্র সঙ্গীত প্রচারের স্বপক্ষে আন্দোলন- সর্বত্র। কোথাও তিনি সভানেত্রিত্ব করছেন, কোথাও বা প্রধান অতিথি।

পাকিস্তানি সামরিক শাসকগোষ্ঠী তখন বাঙালির উপর শাসন ও শোষণের ‘স্ট্রিম রোলার’ চালাচ্ছে। এসব স্বাধিকার ও সাংস্কৃতিক আন্দোলন বন্ধ করতে বেয়নেট-বুলেট চালাচ্ছে, অসংখ্য রাজবন্দিতে কারাগার ভরে যাচ্ছে। বাঙালির স্বাধিকার আদায়ের নেতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে যখন দেশদ্রোহী হিসেবে আখ্যা দিয়ে ‘আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলা’ শুরু হয় তারপর জোরালো হয় গণআন্দোলন।

সে সময়ের আন্দোলনে রাজপথে নেমে এসেছিল সর্বস্তরের মানুষ। সচেতন শিক্ষিত, চাকরিজীবী, বিবেকবান সবাই তুলেছিল রাজবন্দির মুক্তি ও স্বাধিকারের পক্ষে স্লোগান। সুফিয়া কামালও নেমেছিলেন রাজপথে নারী সমাজের মিছিল নিয়ে। শহীদ আসাদের শোক মিছিলে তিনি নেতৃত্ব দিয়েছিলেন, শহীদ মতিউরের প্রতিবাদ সভায় তিনি ছিলেন সোচ্চার প্রতিবাদী বক্তা। ঊনসত্তরের গণঅভ্যুত্থান সফল এদেশের জাগ্রত জনতার একাত্মতায়। এই শক্তিকে সর্বতোভাবে সাহস যুগিয়েছেন আমাদের সমাজের বিবেকবান মানুষেরাই।

১৯৭১ সালের অসহযোগ আন্দোলনের সময় সুফিয়া কামাল হেঁটেছেন রাজপথে, মিছিলে, বাংলাদেশের স্বাধীনতার জন্য। একাত্তরের নয়টি মাস তাঁকে নজরবন্দি করে রাখে পাকিস্তানি সৈন্যরা। এ সময়ও তিনি সাহস নিয়ে সাহায্য করেছেন গোপনে মুক্তিযোদ্ধাদের, মেয়েদের। স্বাধীনতার পর সৈন্যদের হাতে ধর্ষিতা ও নির্যাতিতা মেয়েদের পুনর্বাসনের জন্য তিনিও ‘নারী পুনর্বাসন বোর্ড’-এর কাজের সঙ্গে সংযুক্ত হন। বাংলাদেশ মহিলা পরিষদের প্রতিষ্ঠাতা সভানেত্রী হিসেবে নারী মুক্তি আন্দোলনের নেত্রী হিসেবে তিনি সুপ্রতিষ্ঠিত, সর্বজন স্বীকৃত।

নারী নির্যাতনের বিরুদ্ধে তাঁর প্রতিবাদী কণ্ঠ, সাহসী আন্দোলন দুস্থ অসহায় নারী সামজের মাঝে বিপুল সম্ভাবনা এনে দিয়েছিল। নারীর মানবাধিকার আদায়ে বেগম রোকেয়া যে নারী জাগরণী শক্তি যুগিয়ে যান, সুফিয়া কামাল তা আন্দোলনে রূপান্তরিত করে প্রতিষ্ঠা করে গেলেন। এ কর্মে, সংগ্রামে তাঁকে সাহস ও সমর্থন দিয়ে তা কার্যকর করতে অনেক পথ হাঁটতে হয়েছে অনেককে। তাঁর বিরুদ্ধে অনেক অপপ্রচার হয়েছে, তাঁকে বিরোধিতার মুখে পড়তে হয়েছে, কিন্তু তাঁর আদর্শ সব বিরোধী শক্তিকে পরাজিত করে ‘নারীর অধিকার আদায়ের সংগ্রাম’কে মর্যাদায় অভিষিক্ত করেছে।

বাংলাদেশের নারীকে পশ্চাৎপদতা, ধর্মান্ধতা, সামাজিক কুসংস্কার, পারিবারিক নির্যাতন, দারিদ্র্য যুগ যুগ ধরে মানবেতর জীবনযাপনে বাধ্য করেছে। বাংলাদেশে ‘ইউনিফর্ম ফ্যামিলি কোড’-এর জন্য যে আন্দোলন এর পশ্চাতে ছিল তাঁর সক্রিয় ভূমিকা। তিনি নারী-পুরুষ এবং সব সম্প্রদায়ের মানুষের সমানাধিকার নিয়ে লড়াই করেছেন।

বেগম রোকেয়া নারীর শিক্ষা ও অর্থনৈতিক স্বাবলম্বিতার উপর প্রধানত জোর দিয়েছিলেন। সুফিয়া কামালও সেই একই সংগ্রাম চালিয়ে গেছেন। আজকের নারী সমাজের সচেতনতা বোধ গড়ে ওঠার পেছনে এই আদর্শ ও সংগ্রাম ছিল প্রধান শক্তি। বাঙালিত্বের প্রতিভূ সুফিয়া কামাল যুগপৎ বিশ্বভুবনের আঙ্গিনায় আসন করে নেন। তাঁকে ‘লেলিন পদকে’ বরণ করে নেওয়া হয়। চেকোশ্লোভাকিয়ার ‘সংগ্রামী নারী পদক’ প্রদান করে স্বীকৃতি জানানো হয়।

মনে পড়ে ঢাকায় যখন রাজীব গান্ধী এলেন যখন তখন তাঁর দেখা হয়েছিল কবির সঙ্গে। সাক্ষাৎপর্ব ছিল খুবই হৃদয়গ্রাহী। পরিচয় প্রদানকারী যখন বলতে গেছেন তাঁর পরিচয়, তিনি তখন দু’হাতে কবির হাত জড়িয়ে মৃদুকণ্ঠে বলেছিলেন:

“বলতে হবে না, আমি ওঁকে চিনি।”

কী মাধুর্য ছিল তাঁর স্বরে, কী কোমল ভক্তি, শ্রদ্ধা ছিল তাঁর কথায়।

সুফিয়া কামাল নারীর অধিকার আদায়ে, বাঙালির সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য রক্ষায়, মুক্তিযুদ্ধের চেতনা বাস্তবায়নে, সর্বোপরি রাজনৈতিক আন্দোলন ও অধিকার প্রতিষ্ঠায় জাতীয় বিবেক হিসেবে সম্মানিত, প্রতিষ্ঠিত। সুদীর্ঘ জীবনের অভিজ্ঞতায় ‘শতাব্দীর সাহসিকা’ হিসেবে সর্বস্তরের মানুষের কাছে মর্যাদায় শ্রদ্ধায় অভিষিক্ত হয়েছেন। বাংলাদেশের নারীকে তিনি অনেকখানি এগিয়ে দিয়ে গেছেন। মেরুদণ্ড শক্ত করে দাঁড় করিয়েছেন। এই দেশ ও জাতির বিরুদ্ধে যখনই কোনো অশুভ শক্তি পায়তারা বা ষড়যন্ত্রে মেতেছে দেশের নাগরিক সমাজ তাকিয়েছে তাঁর দিকে, তিনি নির্দেশনা দিয়েছেন।

সুফিয়া কামাল শুদ্ধতম এক মানবিক হৃদয়ের অধিকারী। এক বিরাট মমত্ব তাঁর হৃদয়জুড়ে ছিল, যা তিনি অর্জন করেছেন এই বাংলার প্রকৃতি, সমাজ, মানুষ ও স্বদেশ থেকে। এ অর্জন করতে বড় দুঃখ, কষ্ট, অপমান সইতে হয়েছে, কিন্তু যে কোনো মহান আত্মত্যাগ, আদর্শ ও সংগ্রামের পরই থাকে সম্মান ও অপার সাফল্য।

আমরা তাঁকে পেয়েছি সমাজের প্রতি অঙ্গীকারে, চরিত্রের দৃঢ়তায় মুক্তবুদ্ধির অনন্য মানুষ হিসেবে। সর্বোপরি জাতির বিবেকের প্রতীক হিসেবে। আমাদের মহত্তম প্রাপ্তি: সব অকল্যাণ-অশুভ প্রতিরোধে তিনি দুর্জয় শক্তির প্রতীক।

জন্মদিনে বিনম্র শ্রদ্ধায় তাঁকে স্মরণ করছি।”

10 বার নিউজটি শেয়ার হয়েছে
  • ফেইসবুক শেয়ার করুন