১৮ই জুন, ২০২৪ খ্রিস্টাব্দ, মঙ্গলবার

এবার ছোট অ্যাম্বুলেন্স আবিষ্কার করলেন মিজান

বরিশাল টাইমস রিপোর্ট

প্রকাশিত: ০৭:৪৪ অপরাহ্ণ, ২৯ অক্টোবর ২০১৯

বার্তা পরিবেশক, অনলাইন:: ছিলেন মোটর মেকানিক। কিন্তু নিজের উদ্ভাবন শক্তি দিয়ে একের পর এক নতুন নতুন যন্ত্র আবিষ্কার করে হয়ে গেলেন দেশসেরা উদ্ভাবক। একের পর এক উদ্ভাবনে চমকে দিয়েছেন মোটরসাইকেল মেকানিক মিজানুর রহমান মিজান।

মিজানের জন্ম ১৯৭১ সালের ৫ মে যশোরের শার্শা উপজেলার আমতলা গাতিপাড়ার অজপাড়াগাঁয়ে। বাবা আক্কাস আলী ও মা খোদেজা খাতুন অনেক আগেই মারা গেছেন। তাদের ছয় সন্তানের মধ্যে মিজান পঞ্চম। বর্তমানে শার্শার শ্যামলাগাছি গ্রামে বসবাস করেন মিজান।

মোটরসাইকেল মেকানিক মিজানের একাডেমিক কোনো শিক্ষা না থাকলেও নিজের আলোয় আলোকিত হয়েছেন। নতুন চিন্তা আর চেষ্টায় এখন পর্যন্ত তার আবিষ্কারের সংখ্যা ১০টি।

সংসারে অভাবের কারণে ৮-৯ বছর বয়সে বাবার সহযোগী হিসেবে কাজে নেমে পড়েন মিজান। বাবাও ছিলেন মেকানিক। শ্যালো মেশিন মেরামতের কাজ করতেন মিজানের বাবা। পরে নাভারণ বাজারে একটি মোটরসাইকেলের গ্যারেজে কাজ পান তিনি। সেখান থেকে মোটর মেকানিক হিসেবে কর্মজীবন শুরু মিজানের। এখন শার্শা বাজারে ‘ভাই ভাই ইঞ্জিনিয়ারিং ওয়ার্কশপ’ নামে একটি মোটরসাইকেলের গ্যারেজ রয়েছে তার।

জানতে চাইলে মিজান বলেন, ছোটবেলা থেকে আমার শখ ছিল নতুন কিছু করা, নতুন কিছু জানা। আমার আগ্রহের কারণেই একে একে ১০টি জিনিস উদ্ভাবন করা সম্ভব হয়েছে।

সবশেষ উদ্ভাবনের বিষয়ে জানতে চাইলে মিজান বলেন, প্রতিনিয়ত শিশুরা পানিতে ডুবে মারা যাচ্ছে, বিষয়টি আমাকে দারুণভাবে পীড়া দেয়। তিন বছর ধরে কাজ করে এর একটা সমাধান পেয়েছি। ছোট একটা ‘ডিভাইস’ যদি কোনো শিশুর কাছে থাকে তবে শিশুটি পানিতে পড়ে গেলে তার বাড়িতে থাকা অ্যালার্মটি বাজতে থাকবে। এতে ওই শিশুর পরিবারের লোকজন জানতে পারবে পানিতে পড়েছে শিশুটি।

মিজান বলেন, এই যন্ত্রের পেছনে মাত্র ৫০০ টাকা খরচ হয়েছে। এটি তৈরিতে একটি মোবাইল ফোনের ব্যাটারি, একটি অ্যালার্ম ও একটি ডিভাইস ব্যবহার করতে হয়েছে। তবে বাণিজ্যিকভাবে এটি তৈরি করলে খরচ কমে আসবে।

জানা যায়, মিজান প্রথমে উদ্ভাবন করেন এমন একটি আলগা ইঞ্জিন। যেটিতে একবার জ্বালানি তেল দিয়ে চালু করলে পরে আর জ্বালানি তেল লাগে না। ইঞ্জিনের সৃষ্ট ধোঁয়া থেকে জ্বালানি তৈরি করে নিজে নিজেই ইঞ্জিনটি চলতে সক্ষম।

দ্বিতীয় উদ্ভাবনটি ছিল স্বয়ংক্রিয় অগ্নিনির্বাপণ যন্ত্র, যা বাসা-বাড়ি, কল-কারখানা, অফিস-আদালতে আগুন লাগলে জানমালের ক্ষয়ক্ষতি রক্ষার্থে ৫ থেকে ১০ সেকেন্ডের মধ্যে স্বয়ংক্রিয়ভাবে চালু হয়ে আগুন নেভাতে শুরু করে। কোনো জায়গায় আগুন লাগলে যন্ত্রটি তার তাপমাত্রা নির্ণায়ক যন্ত্রের মাধ্যমে আগুনের অবস্থান নিশ্চিত করে স্বয়ংক্রিয়ভাবে অ্যালার্ম ও লাইট অন করে দেয়। এরপর পানির পাম্পের সঙ্গে সংযুক্ত পাইপের মাধ্যমে আগুনের অবস্থানে পানি পৌঁছে দেয়। ফলে আগুন নিভে যায়।

মিজান বলেন, স্বয়ংক্রিয় অগ্নিনির্বাপণ যন্ত্রটি ২০১৫ সালে যশোরের বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি মেলায় প্রদর্শন করা হলে প্রথম স্থান অধিকার করে। পরে বিভাগীয় এবং জাতীয় পর্যায়ে বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি মেলায় প্রথম ও দ্বিতীয় স্থান অধিকার করে।

মিজানের তৃতীয় উদ্ভাবন ‘অগ্নিনিরোধ জ্যাকেট’। এই জ্যাকেট পরে আগুনের ভেতরে যে কেউ নিরাপদে কাজ করতে পারবে। তার চতুর্থ উদ্ভাবন ‘অগ্নিনিরোধক হেলমেট’। এটি ব্যবহার করলে দুর্ঘটনার আগুনে শ্বাসনালী পুড়বে না। তার পঞ্চম উদ্ভাবন প্রতিবন্ধীদের জীবনমান উন্নয়নে ‘মোটরকার’। এটা বিদ্যুৎ বা পেট্রলচালিত।

কৃষকদের জন্য ‘স্বয়ংক্রিয় সেচযন্ত্র’ তার ষষ্ঠ উদ্ভাবন। বাড়ি বসেই মোবাইল ফোনের মাধ্যমে সেচযন্ত্রটি বন্ধ বা চালু করা যায়। দেশীয় প্রযুক্তিতে মিজান তার সপ্তম উদ্ভাবন করেছেন ‘ফ্যামিলি মোটরকার’। এটি এলাকার মানুষের মাঝে ব্যাপক সাড়া ফেলেছে।

মিজানের অষ্টম উদ্ভাবন ‘পরিবেশ সেফটি যন্ত্র’। এটি পরিবেশ রক্ষার্থে বহুমুখী কাজ করে। যন্ত্রটি ময়লা পরিষ্কারের কাজে ব্যবহার হয়। হাতের স্পর্শ ছাড়াই যন্ত্রটি পরিষ্কার করার কাজে ব্যবহার হয়। এটি উদ্ভাবনের পর ২০১৬ সালের ৫ জুন জাতীয় পর্যায়ে পরিবেশ পদক লাভ করেন মিজান।

মিজান বলেন, উপজেলা, জেলা, বিভাগীয় ও জাতীয় পর্যায়ে এ পর্যন্ত মোট ১৭টি সাফল্য সনদ ছাড়াও অসংখ্য ক্রেস্ট ও পুরস্কার পেয়েছি। আমার আবিষ্কৃত দেশীয় প্রযুক্তির ‘মোটরকার’ প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের এটুআই প্রকল্পের আওতাভুক্ত হয়েছে। গ্রামীণ স্বাস্থ্যসেবা উন্নয়নে এবার ছোট ছোট অ্যাম্বুলেন্স আবিষ্কারের পদক্ষেপ নিয়েছি আমি। এটি প্রক্রিয়াধীন।

তিনি বলেন, আমার স্বপ্ন দেশ ও জাতির কল্যাণে কাজ করা। বর্তমানে দূষিত বায়ু শোধন যন্ত্র উদ্ভাবনের জন্য কাজ করছি। আর্থিক সচ্ছলতা না থাকায় উদ্ভাবনকৃত যন্ত্রগুলো বাজারজাত করতে পারছি না। কেউ সহযোগিতায় এগিয়ে এলে কাজটি করতে সহজ হবে।

5 বার নিউজটি শেয়ার হয়েছে
  • ফেইসবুক শেয়ার করুন