২২শে জুন, ২০২৪ খ্রিস্টাব্দ, শনিবার

করোনা রোগীদের যেসব উপসর্গ অবাক করছে চিকিৎসকদের

বরিশাল টাইমস রিপোর্ট

প্রকাশিত: ০৭:৩৯ অপরাহ্ণ, ২৬ মে ২০২০

করোনাভাইরাস সংক্রমিত কোভিড-১৯ রোগীদের উপসর্গ নিয়ে চিকিৎসকরা বলছেন, এমন রোগী তারা আগে কখনো দেখেননি।ব্রিটেনের এই ডাক্তারদের অনেকেই হাসপাতালগুলোর ইনটেনসিভ কেয়ার ইউনিটে কাজ করেছেন। তারা কিন্তু চীন থেকে ছড়িয়ে পড়া এই নতুন ভাইরাসের কথা জানতেন। তাদের অনেকে চীন এবং ইতালিতে থাকা তাদের সহকর্মীদের অভিজ্ঞতা শুনেছেন, পড়েছেন।

তারা জানতেন যে, এই রোগ ব্রিটেনে পৌঁছানো সময়ের ব্যাপার মাত্র। কিন্তু সত্যি যখন করোনাভাইরাস যুক্তরাজ্যে এলো, তখন কিন্তু আইসিইউর সবচেয়ে অভিজ্ঞ ডাক্তাররাও এই ভাইরাসের সম্মুখীন হয়ে আশ্চর্য হয়ে গিয়েছিলেন।

করোনাভাইরাসে আক্রান্ত বেশির ভাগ রোগীরই উপসর্গ ছিল মৃদু। কারও কারও হয়তো কোনো উপসর্গই ছিল না। কিন্তু যে হাজার হাজার রোগীর অবস্থা সংকটজনক পর্যায়ে চলে গিয়েছিল, তাদের চিকিৎসা করতে গিয়ে ডাক্তাররা দেখলেন, কোভিড-১৯ আসলে বিস্ময়কর রকমের জটিল একটি ভাইরাস।

কোভিড-১৯ মানবদেহে কীভাবে আক্রমণ করে–এ বিষয়ে ডাক্তাররা যা জানতে পেরেছেন এবং যা এখনো জানতে পারেননি–তারই বর্ণনা এখানে।

প্যাডিংটনের সেন্ট মেরি‌’জ হাসপাতালের কনসালট্যান্ট অধ্যাপক অ্যান্টনি গর্ডন, বলছিলেন, ডাক্তারদের অনেকেই মনে করেছিলেন, এটা হবে শ্বাসতন্ত্র আক্রমণকারী ভাইরাস, যা নিউমোনিয়া সৃষ্টি করে। মৌসুমি ফ্লুর মতোই কিন্তু যা আরও ব্যাপক আকারে ছড়াচ্ছে। খুব দ্রুতই এটা স্পষ্ট হয়ে গেল যে, এ ভাইরাস শুধু রোগীদের শ্বাসতন্ত্র নয়, আরও অনেক কিছু আক্রান্ত করছে।

বার্মিংহ্যামের চিকিৎসক রন ডানিয়েলস বলেন, ‘প্রথমত কোভিড-১৯ এ অনেক বেশি লোক সংক্রমিত হচ্ছে। তা ছাড়াও এটা যে অসুস্থতা তৈরি করছে, তা একেবারেই অন্যরকম। আমরা আগে কোনো রোগীর মধ্যে এমন দেখিনি।’

তাছাড়া এই রোগে যারা সংকটাপন্ন অবস্থায় চলে যান, তাদের ফুসফুসে এত তীব্র প্রদাহ এবং রক্ত জমাট বাঁধা শুরু হয়ে যায় যে, তাতে অন্য প্রত্যঙ্গগুলোও আক্রান্ত হয়। এ ছাড়া রোগীর সারা দেহে জীবন বিপন্ন করার মতো সমস্যা দেখা দেয়।

লন্ডনের একটি হাসপাতালের থ্রম্বোসিস বিশেষজ্ঞ বেভারলি হান্ট বলেন, ‘‍একজন ডাক্তারের চোখে এটা এক ভয়াবহ পরিস্থিতি। কারণ আমাদের সামনে এত বেশি রোগীর মধ্যে এ অবস্থা ঘটতে দেখা যাচ্ছে। আমরা এখনো এই ভাইরাসটির আচরণ বুঝতে হিমশিম খাচ্ছি।’

মার্চ মাস জুড়েই যুক্তরাজ্যের হাসপাতালগুলোতে এমন অনেক রোগী আসছিলেন, যাদের শ্বাসকষ্ট ছিল, দেহে অক্সিজেনের পরিমাণ কমে গিয়েছিল। কিন্তু সবচেয়ে গুরুতর অসুস্থদের শুধু ফুসফুস নয়, অন্য প্রত্যঙ্গেরও সমস্যা দেখা দিচ্ছিল। তাদের দেহের রক্তে এমন কিছু ঘটছিল, যার কোনো ব্যাখ্যা মিলছে না।

উত্তর লন্ডনের হুইটিংটন হাসপাতালের অধ্যাপক হিউ মন্টগোমারি বলেন, ‘আমরা এখনো জানি না, কেন কিছু রোগীর রক্তে অবিশ্বাস্য রকমের কম মাত্রায় অক্সিজেন থাকলেও তারা অসুস্থ বোধ করে না।’

মানুষের রক্তের হিমোগ্লোবিন নামে যে কণিকা আছে, সেটাই অক্সিজেন বহন করে। কোনো কোনো কোভিড-১৯ রোগীর রক্তে হিমোগ্লোবিনের পরিমাণ ৮০ শতাংশ বা তারও নিচে নেমে যায়।

ডাক্তার অ্যান্টনি গর্ডন বলেন, ‘সম্ভবত এর সাথে প্রদাহের একটা সম্পর্ক আছে, যার কারণে রক্তনালীর ওপর প্রভাব পড়ছে। এতে অক্সিজেন রক্তে মিশতে পারছে না। কিন্তু ফুসফুসে হয়তো তেমন প্রভাব পড়ছে না, অন্তত প্রাথমিক স্তরে।’

এটি হচ্ছে কোভিড-১৯ এর অনেক রহস্যের একটা। এ নিয়ে জরুরিভাবে আরও গবেষণা দরকার।

এ কারণে অনেক ডাক্তার প্রশ্ন করছেন, করেনাভাইরাস রোগীদের ক্ষেত্রে ভেন্টিলেশন সবসময় সঠিক পন্থা কি না। ভেন্টিলেটর দিতে হলে রোগীকে অজ্ঞান করতে হয় এবং তার শ্বাসনালীতে একটা নল ঢোকাতে হয়। এতে অনেক গুরুতর অসুস্থ কোভিড রোগীকে বাঁচানো সম্ভব হয়েছে। কিন্তু কারও কারও ক্ষেত্রে ভেন্টিলেটর ভুল সময়ে ভুল চিকিৎসা হয়ে দাঁড়াতে পারে।

বারবারা মাইলস বলছেন, ‘এই রোগ বিভিন্ন পর্যায়ের মধ্যে দিযে যায়, তাই কোনো পর্যায়ে কীভাবে ভেন্টিলেটর ব্যবহার করতে হবে তা বুঝতে আমাদের আরও সময় লাগবে।’

বেলফাস্টের রয়াল ভিক্টোরিয়া হাসপাতালের অধ্যাপক ড্যানি ম্যাকলে বলেন, ‘সাধারণত গুরুতর নিউমোনিয়ায় আক্রান্ত রোগীকে এক সপ্তাহ ভেন্টিলেটর দিতে হয়। কিন্তু কোভিড রোগীদের অনেককে আরও অনেক বেশি সময় ধরে ভেন্টিলেটর দিতে হচ্ছে, যার কারণ আমরা ঠিক জানি না।’

প্রদাহ এবং রক্ত জমাট বেঁধে যাওয়া

সবাই বলছেন, ফুসফুস বা রক্তনালীর নজিরবিহীন প্রদাহ এটাকে একেবারেই ভিন্ন রকম এক রোগে পরিণত করেছে। এ কারণে রক্ত জমাট বেঁধে যাওয়ার সম্ভাবনা বেড়ে যায়। আর গুরুতর রোগীদের ২৫ শতাংশের দেহেই কোভিড-১৯ অবিশ্বাস্য রকমের ঘন এবং আঠালো রক্ত তৈরি করে, যা এক বিরাট সমস্যা,  বলছেন হিউ মন্টগোমারি।

বেভারলি হান্ট বলেন, ‘এর ফলে বিশেষত রোগীর পায়ে রক্ত জমাট বেঁধে যেতে পারে, যাকে বলে ডিপ ভেইন থ্রমবোসিস। এটা সারা শরীরে ঘুরে ফুসফুসে রক্ত সরবরাহ বন্ধ করে দিতে পারে, যার ফরে নিউমোনিয়া আরও গুরুতর চেহারা নেয়।’

তা ছাড়া জমাট বাঁধা রক্ত মস্তিষ্ক বা হৃদপিন্ডে রক্ত সরবরাহ বন্ধ করে দিতে পারে, যার ফলে রোগীর হার্ট অ্যাটাক বা স্ট্রোক হতে পারে।

বেভারলি হান্ট বলেন, ‘রক্তে যে প্রোটিনটি জমাট বাঁধার সমস্যা সৃষ্টি করে, তার নাম ফাইব্রিনোজেন। সাধারণত এক লিটার রক্তে এর পরিমাণ থাকে ২ থেকে ৪ গ্রাম। কিন্তু কোভিড রোগীর রক্তে লিটার প্রতি ১০ থেকে ১৪ গ্রাম পর্যন্ত ফাইব্রিনোজেন পাওয়া গেছে, যা আমি ডাক্তার হিসেবে আমার জীবনে কখনো দেখিনি।’

হিউ মন্টগোমারি বলেন, ‘রক্ত জমাট বাঁধার ঝুঁকি মাপার আরেকটি একক হলো ডি-ডাইমার নামে একটি প্রোটিন। স্বাস্থ্যবান রোগীর রক্তে এটা দশক থেকে শ’য়ের হিসেবে মাপা হয়। কিন্তু কোভিড রোগীর দেহে এই স্তর ৬০, ৭০ বা ৮০,০০০ পর্যন্ত উঠতে দেখা গেছে, যা আমরা কখনা শুনিনি।’

রোগপ্রতিরোধ ব্যবস্থা এবং অন্যান্য প্রত্যঙ্গ

অ্যান্টনি গর্ডন জানান, কারও কারও ক্ষেত্রে কোভিড-১৯ সংক্রমণ এত তীব্র হতে পারে যে, দেহের রোগ-প্রতিরোধ ব্যবস্থা বা ইমিউন সিস্টেমে অতিরিক্ত প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করে, যা খুবই বিপজ্জনক। কোনো কোনো রোগীর দেহে কোভিড সংক্রমণ সৃষ্টি করে একরকম ‘সাইটোকিন ঝড়।’

সংক্রমণ ঠেকানোর অংশ হিসেবে মানবদেহ সাইটোকিন নামে এক ধরনের অণু তৈরি করে যাকে বলা যায়, এক ধরনের রাসায়নিক সতর্ক সংকেত। এর ফলে শরীরে প্রদাহ সৃষ্টি হয়, যা একটা পর্যায় পর্যন্ত ক্ষতিকর নয়। কিন্তু কোনো কোনো রোগীর দেহে কোভিড সংক্রমণ সৃষ্টি করে একরকম ‘সাইটোকিন ঝড়’। বিপুল পরিমাণে সাইটোকিন শরীরে ছড়িয়ে পড়ে। আর তাতে আরও বেশি প্রদাহ সৃষ্টি হয়। ফলে ইমিউন সিস্টেমের গুরুত্বপূর্ণ অংশ রক্তে টি সেলের পরিমাণ কমে যায়, দেখা দেয় শ্বাসকষ্ট এবং শরীরের অন্য প্রত্যঙ্গ ক্ষতিগ্রস্ত হয়।

এ কারণে কোভিড-১৯ শরীরে ঢুকে কী করবে তা আগে থেকে বলা খুবই কঠিন। বিশেষজ্ঞরা একে বলছেন, মাল্টি-সিস্টেম রোগ, যাতে রোগীর ফুসফুস, কিডনি, হৃদপিন্ড, লিভার এমনকি মস্তিষ্ক, যেকোনো কিছু আক্রান্ত হতে পারে।

আইসিইউতে আসা দুই হাজারেরও বেশি কোভিড রোগীর ক্ষেত্রে কিডনি অকেজো হয়ে যাওয়ার সমস্যা দেখা দিয়েছে।

অনেকের মস্তিষ্ক প্রদাহ দেখা দিয়েছে, তাদের মধ্যে বিভ্রান্তি বা উল্টোপাল্টা আচরণ করার সমস্যা দেখা গেছে। অনেকের ভেন্টিলেটর খুলে নেওয়ার পর ঠিক মতো জ্ঞান ফিরছে না, বলছিলেন হিউ মন্টগোমারি।

বলা হয়, যেসব রোগীর আগে থেকে স্বাস্থ্য সমস্যা থাকে তাদের ক্ষেত্রে কোভিড-১৯ সংক্রমণ বিপজ্জনক রূপ নিতে পারে। এর মধ্যে শুধু এ্যাজমা বা হাঁপানি নয়, উচ্চ রক্তচাপ, ডায়াবেটিস, হৃদরোগ, স্থুলতা, বৃদ্ধ বয়স, এমনকি রোগী পুরুষ না নারী, সবই রয়েছে।

এক হিসেবে দেখা গেছে, ইংল্যান্ড, ওয়েলস আর নর্দার্ন আয়ারল্যান্ডে সংকটাপন্ন রোগীদের ৭০ ভাগই ছিলেন পুরুষ, ৭০ ভাগই ছিলেন মোটা বা ওজন বেশি, দু-তৃতীয়াংশের বয়স ছিল ৬০এর বেশি।

কেউ কেউ, সবাই নয়

কিন্তু তার পরও এটা ব্যাখ্যা করা যাচ্ছে না যে, কেন বেশির ভাগ কোভিড সংক্রমিত লোকের দেহেই মৃদু উপসর্গ দেখা দেয়। আরও কেন কেউ কেউ দ্রুত গুরুতর অসুস্থ হয়ে পড়েন। রন ড্যানিয়েলস বলেন, ‘আমরা এখনো এর কারণ বুঝতে পারছি না।’

অনেকে বলছেন, যাদের দেহকোষে এসিই-টু নামের একটি প্রোটিন বেশি থাকে তাদের কোভিড সংক্রমণের ফলে গুরুতর অসুস্থ হবার ঝুঁকি বেশি থাকে। এ কারণে করোনাভাইরাস নিয়ে নানারকম তত্ত্ব ছড়াচ্ছে, আবার গবেষণাও চলছে।

ড্যানিয়েলসের মতে, হয়তো কোনো ব্যক্তির জিনগত গঠন বা এশিয়ান ও কৃষ্ণাঙ্গদের জেনেটিক বৈশিষ্ট্য এতে একটা ভুমিকা রাখছে। কিন্তু এটা নিশ্চিতভাবে বলা সম্ভব নয়।

অনেকে বলছেন, যাদের দেহকোষে এসিই-টু নামের একটি প্রোটিন, যা রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণ করতে সহায়ক। বেশি থাকে তাদের কোভিড সংক্রমণের ফলে গুরুতর অসুস্থ হওয়ার ঝুঁকি বেশি থাকে। দেখা গেছে, তাদের ক্ষেত্রে অন্ত্রের সমস্যা বা কিডনি অকেজো হয়ে যাবার ঘটনা বেশি ঘটেছে। কিন্তু যত উত্তর পাওয়া যাচ্ছে তার চেয়ে প্রশ্ন অনেক বেশি।

পরীক্ষামূলক চিকিৎসা

আইসিইউর ডাক্তাররা এখনো যেসব প্রশ্ন নিয়ে হিমশিম খাচ্ছেন তা হলো:

১. কোভিড-১৯ রোগীদের ভেন্টিলেশন দেবার সঠিক সময় কখন?

২. অ্যান্টি-ভাইরাল ওষুধগুলোর মধ্যে কোনটা সর্বোত্তম, অথবা প্রদাহ-রোধী এবং রোগপ্রতিরোধ ব্যবস্থাকে নিয়ন্ত্রণের আনার ওষুধগুলোর সঠিক মাত্রা কতটা?

৩.প্লাজমা বা সেরে-ওঠা রোগীদের রক্তের এন্টিবডি ব্যবহার কি এ সমস্যার সমাধান করতে পারে?

ডাক্তারদের মতে, আগামী কয়েক মাসে ব্যাপক পরিমাণ পরীক্ষা-নিরীক্ষার মাধ্যমেই শুধু এর উত্তর পাওয়া সম্ভব।

এ কারণে আইসিইউর ডাক্তাররা অনেক ক্ষেত্রেই তাদের আগেকার জ্ঞানের ভিত্তিতে কোভিড-১৯ রোগীদের ওষুধ দিতে পারছেন না, তাদেরকে বরং একেকজন রোগীর অবস্থা দেখে ঠিক করতে হচ্ছে, কি করবেন।

বেভারলি হান্ট বলছেন, তার ব্যাপারটাকে প্রায় ‘মধ্যযুগীয়’ অবস্থা বলে মনে হয়েছে।

অ্যান্টনি গর্ডন জানা, তিনি ২০ বছর ধরে আইসিইউতে কাজ করছেন। কিন্তু কোভিড-১৯ রোগীদের চিকিৎসা করতে গিয়ে তার মনে হয়েছে, আজ তিনি হাসপাতালে যা করেছেন তা সঠিক ছিল কি না, তা তিনি জানেন না। সূত্র : বিবিসি বাংলা

9 বার নিউজটি শেয়ার হয়েছে
  • ফেইসবুক শেয়ার করুন