২৫শে এপ্রিল, ২০২৪ খ্রিস্টাব্দ, বৃহস্পতিবার

করোনা: শিক্ষকদের সংসার চালাতে হিমশিম, বিক্রি হচ্ছে স্কুল!

বরিশাল টাইমস রিপোর্ট

প্রকাশিত: ০২:০২ অপরাহ্ণ, ২৯ জুন ২০২০

বার্তা পরিবেশক, অনলাইন :: রাজধানীর মোহাম্মদপুর নবীনগর হাউজিং এলাকায় ২০০৪ সালে প্রতিষ্ঠা করেন তদবির আহমদ একজন স্বপ্নবাজ যুবক। ফুলকুঁড়ি কিন্ডার গার্টেন অ্যান্ড হাইস্কুল। প্লে গ্রুপ থেকে ৮ম শ্রেণি পর্যন্ত পাঠদান হওয়া এ প্রতিষ্ঠানে বর্তমানে প্রায় ২শ’ শিক্ষার্থী পড়ালেখা করবেন। দীর্ঘদিন থেকেই সুনামের সঙ্গে চলছিল প্রতিষ্ঠানটি।

কিন্তু বৈশ্বিক মহামারী করোনা ভাইরাস ওলট-পালট করে দিয়েছে সবকিছু। ব্যয়ভার মেটাতে না পারায় স্কুলটি বিক্রি করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে তদবির আহমদ। দীর্ঘ একমাস থেকে মোহাম্মদপুর এলাকার দেয়ালে দেয়ালে সাঁটাচ্ছে আসবাপত্রসহ স্কুল বিক্রির পোস্টার। কিন্তু পাচ্ছেন না কোনো ক্রেতা। তদবির আহমদের স্কুল ছাড়াও রাজধানীর অলি-গলিতে দেখা যাচ্ছে এমন অনেক স্কুল বিক্রির পোস্টার!

তদবির আহমদ সাংবাদিকদের বলেন, করোনার কারণে সরকারি নির্দেশ মোতাবেক প্রায় ৪ মাস থেকে স্কুলটি বন্ধ রয়েছে। অভিভাবকরা বেতনাদি দিচ্ছেন না। ফলে স্কুলের ভাড়া ও শিক্ষকদের বেতন দিতে পারছি না। আমি অর্থনৈতিকভাবে সচ্ছল না থাকায় স্কুলের ব্যয়ভার বহন করতে অক্ষম হয়ে পড়েছি। আর করোনা ভাইরাসের প্রাদুর্ভাব দেশে কতদিন থাকবে তাও নিশ্চিত হয়। সবকিছু চিন্তা করে স্কুলটি বিক্রির সিদ্ধান্ত নিয়েছি। যদি কোনো হৃদয়বান ব্যক্তি স্কুল চালাতে আগ্রহী হন তাহলে স্কুলটি তার হাতে তুলে দেব। রাজধানীজুড়ে এমন স্কুল কিংবা কিন্ডার গার্টেনের সংখ্যা হাজারেরও ওপর।

দেশে করোনার প্রাদুর্ভাব দেখা দেয়ার পর থেকে এসব স্কুলের মালিক পড়েছেন চরম বিপাকে। শিক্ষার্থীদের কাছ থেকে যে বেতন পেতেন সেটা দিয়েই শিক্ষকদের সম্মানীসহ সব খরচ মিটিয়ে নিজের কাছে কিছু থাকত। কিন্তু গত প্রায় ৪ মাস থেকে সরকারি সিদ্ধান্ত মোতাবেক দেশের সব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বন্ধ রয়েছে। খুলবে তাও নিশ্চিত করে বলতে পারছেন না সংশ্লিষ্ট কেউই।
স্কুল খোলা থাকলেও ব্যয়ভার মোটেও কমে নাই। স্কুলের ভাড়া ও শিক্ষকদের সম্মানী স্কুল মালিকরা দিচ্ছেন নিজের পকেট থেকে। ফলে ব্যয়ভার মেটাতে না পারায় অনেক স্কুল মালিকার স্কুল বন্ধ কিংবা বিক্রি করার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন। এতে হুমকির মুখে পড়েছে কয়েক লাখ শিক্ষার্থীর ভবিষ্যৎ।

একই চিত্র ঢাকার বাইরের কিন্ডার গার্টের স্কুলগুলোতেও। বাংলাদেশ কিন্ডার গার্টেন অ্যাসোসিয়েশনের মৌলভীবাজার জেলা সভাপতি ও শ্রীমঙ্গল আইডিয়াল স্কুলের প্রিন্সিপাল এহসান বিন মুজাহির সাংবাদিকদের জানান, করোনাকালে খুবই কষ্টে আছেন কিন্ডা রগার্টেন স্কুলের শিক্ষকরা। পৃথিবীর সবচেয়ে সম্মানিত পেশায় নিয়োজিত কিন্ডার গার্টেন স্কুলের শিক্ষকরা আজ অবহেলিত রাষ্ট্রের কাছেও।
করোনা দুর্যোগে দুর্ভোগে পড়া এসব প্রতিষ্ঠানের উদ্যোক্তা ও শিক্ষকদের পাশে কেউ নেই। দুঃখ, দুর্দশা লাঘবে সরকার এগিয়ে আসছে না। এসব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের উদ্যোক্তাদের আর্থিক সংকট নিরসনে কোনো ব্যাংকও লোন দিচ্ছে না। সরকারি কিংবা কোনো বেসরকারি প্রতিষ্ঠান/সংগঠন/ব্যক্তিরাও অনুদানে এগিয়ে আসছেন না।

দীর্ঘদিন কর্মহীন থাকায় কিন্ডার গার্টেন স্কুল শিক্ষকদের সংসার চালাতে বেশ হিমশিম খেতে হচ্ছে। সত্যিই যদি সেপ্টেম্বর কিংবা আরো বেশি সময় পর্যন্ত শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বন্ধ থাকে, তবে স্কুল ভাড়া, সংসারের খরচ চালানো এবং পানি, বিদ্যুৎ, গ্যাস বিল এবং শিক্ষকদের বেতন দিয়ে স্কুলগুলোকে টিকিয়ে রাখা খুব কঠিন হয়ে পড়বে। স্কুলগুলো টিকিয়ে রাখতে প্রধানমন্ত্রীর আর্থিক সহায়তা জরুরি।

তিনি আরো বলছেন, সংক্রমণ বাড়তে থাকায় বন্ধ হয়ে আছে শিক্ষকদের উপার্জনের অন্যতম মাধ্যম কোচিং এবং প্রাইভেটও। স্কুল থেকে বেতন পাচ্ছেন না শিক্ষকরা। এদিকে থেমে নেই জীবনযাত্রার ব্যয়, এভাবে চলতে থাকলে শিক্ষকদের খেয়ে-পড়ে বেঁচে থাকা দিন দিন কঠিন হয়ে যাচ্ছে।

শিক্ষাবিদরা বলছেন, রাজধানীর অধিকাংশ পরিবারের পক্ষেই তাদের সন্তানদের নামিদামি স্কুলে পড়ানোর আর্থিক সঙ্গতি থাকে না। তাই তাদের একমাত্র আশ্রয় গলির ভেতরে থাকা সাধারণ মানের ছোট ছোট স্কুলগুলো। সবমিলিয়ে কয়েক লাখ শিশু এসব স্কুলে লেখাপড়া করে থাকে। করোনার কারণে স্কুলগুলো যদি বন্ধ হয়ে যায় তাহলে হুমকির মুখে পড়বে এসব শিক্ষার্থীর লেখাপড়া। বিষয়টি নিয়ে সরকারকে তাই আলাদা করে ভাবতে হবে।

এ প্রসঙ্গে বাংলাদেশ কিন্ডার গার্টেন অ্যাসোসিয়েশনের মহাসচিব মো. মিজানুর রহমান সরকার সাংবাদিকদের বলেন, করোনার কারণে স্কুল বন্ধ রয়েছে, অভিভাবকরা বেতন দিচ্ছেন না ফলে স্কুল মালিকার বাধ্য হয়ে স্কুল বন্ধ কিংবা বিক্রি করার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন। করোনা যদি আরো দীর্ঘায়িত হয় তাহলে আমার ধারণা রাজধানীর ৫০-৭০শতাংশ কিন্ডার গার্টেন বন্ধ হয়ে যাবে।

এখন পর্যন্ত স্কুলটি কর্তৃপক্ষ কতটি স্কুল বন্ধ কিংবা বিক্রির সিদ্ধান্ত নিয়েছেন এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, সঠিক তথ্য এখনো আমরা পাইনি। আমার জানামতে, ১৫-১৬টি স্কুল বন্ধের নিয়েছেন স্কুল কর্তৃপক্ষ। এ ছাড়া ৫-৭ স্কুল বিক্রির সিদ্ধান্ত নেয়া হয়েছে বলে আমরা খবর পেয়েছি। করোনার কারণে আসলে ক্রেতা পাওয়া যাচ্ছে না, পেলে হয়তো আরো অনেকেই বিক্রি করবেন।

7 বার নিউজটি শেয়ার হয়েছে
  • ফেইসবুক শেয়ার করুন