২৯শে মে, ২০২৪ খ্রিস্টাব্দ, বুধবার

কিস্তি দিতে না পারায় এনজিও’র মামলা: দুধের সন্তান রেখে মাকে যেতে হলো কারাগারে

বরিশাল টাইমস রিপোর্ট

প্রকাশিত: ০৮:১২ অপরাহ্ণ, ২১ মে ২০২১

কিস্তি দিতে না পারায় এনজিও’র মামলা: দুধের সন্তান রেখে মাকে যেতে হলো কারাগারে

নিজস্ব প্রতিবেদক, বরিশাল >> ঋণের কিস্তির মাত্র এক হাজার ১০ টাকা পরিশোধ না করার ঘটনায় বরিশালের গৌরনদী উপজেলায় নুরুন্নাহার বেগম নামের এক গৃহবধূকে চেক জালিয়াতি মামলা দিয়ে জেল খাটানোর অভিযোগ পাওয়া গেছে। পপুলার মাল্টিপারপাস কো-অপারেটিভ সোসাইটি লিমিটেড নামের একটি বেসরকারি সংস্থার করা মামলায় গত বুধবার (১৯ মে) সকালে নুরুন্নাহার বেগমকে গ্রেপ্তার করে গৌরনদী থানা পুলিশ। এসময় নুরুন্নাহার বেগমের কোলে তার ১২ মাস বয়সী দুধের সন্তান ছিল। সন্তানকে স্বামীর কোলে তুলে দিয়ে কান্নায় ভেঙে পড়েন নুরুন্নাহার বেগম।

ওই দিন দুপুরে নুরুন্নাহার বেগমকে আদালতের মাধ্যমে বরিশাল কেন্দ্রীয় কারাগারে পাঠানো হয়। এ ঘটনা জানাজানি হলে পুরো উপজেলায় তুমুল আলোচনা-সমালোচনার ঝড় শুরু হয়। প্রতিবাদে পপুলার মাল্টিপারপাস কো-অপারেটিভ সোসাইটি লিমিটেডর বিরুদ্ধে বিচার দাবি করেন এলাকাবাসী।

নুরুন্নাহার বেগম বরিশালের গৌরনদী উপজেলার বাটাজোর ইউনিয়নের বাসুদেবপাড়া গ্রামের বাসিন্দা সেলিম হাওলাদারের স্ত্রী। সেলিম হাওলাদার ক্ষুদ্র একজন ব্যবসায়ী। ২০১৯ সালের শেষ দিকে সেলিম হাওলাদারের ব্যবসায় লোকসান দেখা দেয়। ওই বছর পপুলার মাল্টিপারপাস কো-অপারেটিভ সোসাইটির বাটাজোর বন্দর অফিস থেকে ৩০ হাজার টাকার ঋণ নিয়ে স্বামীকে দেন স্ত্রী নুরুন্নাহার বেগম।

ভুক্তভোগী নুরুন্নাহার বেগম জানান, ‘২০১৯ সালে পপুলার মাল্টিপারপাস কো-অপারেটিভ সোসাইটির বাটাজোর বন্দরের অফিস থেকে ৩০ হাজার টাকার ঋণ নিয়েছেন। স্বামীর ব্যবসা খারাপ যাচ্ছিল। ওই টাকা স্বামীর হাতে তুলে দিয়েছিলাম। ওই টাকা ব্যবসায় খাটিয়ে স্বামী সেলিম হাওলাদার ঘুরে দাঁড়ানোর চেষ্টা করছিলেন। সোসাইটির নিয়মানুযায়ী প্রতি সপ্তাহে ৯০০ টাকা করে কিস্তির টাকা পরিশোধ করতে থাকি। ২০২০ সালের ফেব্রুয়ারি মাস পর্যন্ত মাল্টিপারপাসের অনুকূলে ২০ হাজার ১০০ টাকা পরিশোধ করি এবং সঞ্চয় বাবদ ৮ হাজার ৯০ টাকা জমা দিয়েছিলাম।’

‘করোনা মহামারির কারণে স্বামী সেলিম হাওলাদারের ব্যবসা লোকসানের মুখে পড়লে সংসারে আর্থিক অনটন দেখা দেয়। এরপরও মাল্টিপারপাসের কিস্তির টাকা পরিশোধ করার চেষ্টা করে গেছি। তবে ২০২০ সালের মার্চের দিকে মাল্টিপারপাসের বাটাজোর অফিস বন্ধ থাকায় কিস্তি পরিশোধ সম্ভব হয়নি। ফলে কিস্তি বাবদ এক হাজার ১০ টাকা মাল্টিপারপাসে জমা দেওয়া হয়নি।’

এক সন্তানের জননী বলেন, ‘২দিন পূর্বে গৌরনদী মডেল থানার সহকারী উ-পপরিদর্শক (এএসআই) রফিকুল ইসলাম বাসুদেবপাড়া কালীবাড়ি বাজারে গিয়ে আমার খোঁজ করেন। এবং তার সঙ্গে থানায় দেখা করতে বলেন। বুধবার সকালে স্বামী সেলিম হাওলাদারকে নিয়ে থানায় দেখা করি। এসময় কোলে আমার ১২ মাসের সন্তান ছিল।

এএসআই রফিকুল ইসলাম জানান, পপুলার মাল্টিপারপাস সোসাইটি কর্তৃপক্ষ আমার বিরুদ্ধে চেক জালিয়াতির অভিযোগ এনে ২০২০ সালে পিরোজপুর আদালতে একটি মামলা করেছেন। ওই মামলায় গ্রেফতারি পরোয়ানা জারি করেছেন আদালত। এরপর তারা আমাকে গ্রেপ্তার করেন। এসময় আমার কোলে থাকা ১২ মাসের দুধের সন্তানকে তার বাবার কোলে তুলে দেই। পরদিন বৃহস্পতিবার বিকেলে আদালত আমাকে জামিন দেন। সন্ধ্যার পর কারাগার থেকে বের হয়ে বাড়ি ফিরেছি’, বলেন নুরুন্নাহার বেগম।

নুরুন্নাহার বেগমের অভিযোগ, সামান্য কয়টা টাকার জন্য তার নামে মামলা দেওয়া হয়েছে। সেই মামলায় জেল খাটতে হয়েছে। কিন্তু পপুলার মাল্টিপারপাস সোসাইটি কর্তৃপক্ষ মামলার আগে একবারও তার সঙ্গে যোগাযোগ করেনি বা কোনো নোটিসও দেয়নি।

‘তাদের কারণে আমার দুধের সন্তান থেকে দূরে থাকতে হয়েছে। এটা যে সন্তানের মায়ের কাছে কতটা বেদনাদায়ক তা বলে বোঝানো সম্ভব নয়। নারী বলেন, আল্লাহর কাছে এর বিচার দিলাম।’

অভিযোগ ও মামলার বিষয় জানতে পপুলার মাল্টিপারপাস কো-অপারেটিভ সোসাইটির বাটাজোর অফিসের একাধিক কর্মকর্তার মোবাইলে যোগাযোগ করা হলে তাদের ফোন বন্ধ পাওয়া যায়। এরপর বাটাজোর এলাকার কয়েকজন বাসিন্দার সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তারা জানান, পপুলার মাল্টিপারপাস কো-অপারেটিভ সোসাইটির অফিসটি বেশকিছু দিন ধরে বন্ধ রয়েছে। পাশাপাশি বেশ কিছু দিন ধরে তাদের কোনো কর্মকর্তা বা মাঠকর্মীদের এলাকায় দেখা যায়নি।

এ বিষয়ে গৌরনদী উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) বিপিন চন্দ্র বিশ্বাস বরিশালটাইমসকে বলেন, ‘নুরুন্নাহার বেগমকে গ্রেপ্তারের পর তার বাবা আমার কার্যালয় এসে বিষয়টি জানিয়েছেন। আমি এরপর গৌরনদী মডেল থানার কর্মকর্তাদের সঙ্গে যোগাযোগ করেছি। তবে গ্রেফতারি পরোয়ানা থাকায় থানা পুলিশেরও এ বিষয় কিছু করার ছিল না।’

তিনি বলেন, ‘পপুলার মাল্টিপারপাস কো-অপারেটিভ সোসাইটির কর্তৃপক্ষ সামান্য টাকার জন্য নুরুন্নাহার বেগমের বিরুদ্ধে মামলা দেবে, এটা চরম নিষ্ঠুরতা। দুধের সন্তান রেখে নুরুন্নাহার বেগমকে জেল যেতে হয়েছে, এটাও দুঃখজনক।’

পপুলার মাল্টিপারপাস কো-অপারেটিভ সোসাইটির বিরুদ্ধে আমানতকারীদের হয়রানি করাসহ নানা অভিযোগ পাওয়া গেছে। অভিযোগগুলো গুরুত্ব সহকারে খতিয়ে দেখা হচ্ছে বলেও জানান তিনি।

14 বার নিউজটি শেয়ার হয়েছে
  • ফেইসবুক শেয়ার করুন