২৪ মিনিট আগের আপডেট রাত ১:৫৯ ; মঙ্গলবার ; আগস্ট ৯, ২০২২
EN Download App
Youtube google+ twitter facebook
×

কেন হইলে নীরব, মেল দুটি আঁখি রে পাখি…

বরিশাল টাইমস রিপোর্ট
৩:০৯ অপরাহ্ণ, নভেম্বর ২৪, ২০১৭

বারী সিদ্দিকীকে চিকিৎসক পূর্ণ বিশ্রাম নেওয়ার পরামর্শ দেন। চিকিৎসককে তিনি বললেন, ‘আমি গান গাইতে গাইতে মরতে চাই। আমার মৃত্যু যদি মঞ্চে হয়, তাহলে সেটাই হবে আমার জন্য সবচেয়ে আনন্দের।’

‘শুয়া চান পাখি আমার

আমি ডাকিতাছি তুমি ঘুমাইছ নাকি

তুমি আমি জনম ভরা ছিলাম মাখামাখি

আইজ কেন হইলে নীরব, মেল দুটি আঁখি রে পাখি

আমি ডাকিতাছি তুমি ঘুমাইছ নাকি…’

প্রখ্যাত সংগীতশিল্পী ও বংশীবাদক বারী সিদ্দিকী আর নেই। বৃহস্পতিবার দিবাগত রাত ২টা নাগাদ রাজধানীর স্কয়ার হাসপাতালে তিনি মারা যান। মৃত্যুকালে তাঁর বয়স হয়েছিল ৬৩ বছর। তিনি স্ত্রী, দুই ছেলে ও এক মেয়ে আর অসংখ্য গুণগ্রাহী রেখে গেছেন। তিনি বাংলাদেশ টেলিভিশনে সংগীত পরিচালক ও মুখ্য বাদ্যযন্ত্রশিল্পী হিসেবে কর্মরত ছিলেন।

উল্লেখ্য, ২০১৬ সাল থেকে সপ্তাহে তিন দিন বারী সিদ্দিকীর কিডনির ডায়ালাইসিস করা হচ্ছে। কিন্তু কোথাও গানের ডাক পেলে অসুস্থতার কথা ভুলে যেতেন। সাব্বির বললেন, ‘ডায়ালাইসিস শেষে হাসপাতাল থেকে বেরিয়ে ৭ ঘণ্টা জার্নি করে তিনি যশোর গেছেন। গাড়িতেই ঘুমিয়েছেন। মঞ্চে ওঠার ঠিক পাঁচ মিনিট আগে দেখি তিনি সুস্থ। মঞ্চে গিয়ে বসলেন। এরপর কোথা

বারী সিদ্দিকী দুই বছর ধরে কিডনি সমস্যায় ভুগছিলেন। তাঁর দুটি কিডনি অকার্যকর ছিল। তিনি বহুমূত্র রোগেও ভুগছিলেন। গত ১৭ নভেম্বর রাতে তিনি হৃদ্রোগে/ আক্রান্ত হন। এরপর তাঁকে হাসপাতালে নিয়ে আসা হয়, তখন তিনি অচেতন ছিলেন। তাঁকে দ্রুত নিবিড় পরিচর্যাকেন্দ্রে (আইসিইউ) ভর্তি করা হয়।

মৃত্যুর পর বৃহস্পতিবার গভীর রাতে হাসপাতাল থেকে বেরিয়ে আসে অ্যাম্বুলেন্স। বড় ছেলে সাব্বির সিদ্দিকী জানালেন, কাফনের জন্য মোহাম্মদপুরে আঞ্জুমানে মফিদুল ইসলামে নিয়ে যাওয়া হচ্ছে। সেখান থেকে মরদেহ সকাল ৭টায় ধানমন্ডি ১৪/এ সড়কে তাঁর বাসায় নিয়ে যাওয়া হবে। সকাল সাড়ে ৯টায় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় জামে মসজিদে বারী সিদ্দিকীর প্রথম জানাজা হবে। সকাল সাড়ে ১০টায় দ্বিতীয় জানাজা হবে বাংলাদেশ টেলিভিশন ভবনে। বাদ আসর তৃতীয় ও শেষ জানাজা হবে নেত্রকোনা সরকারি কলেজে। এরপর বারী সিদ্দিকীকে নেত্রকোনার কারলি গ্রামে ‘বাউল বাড়ি’তে দাফন করা হবে।

নেত্রকোনা শহরে তাঁর দুটি বাড়ি, পড়ে আছে অবহেলা আর অযত্নে। তাঁর পৈতৃক বাড়ি সদর উপজেলার কাইলাটি ইউনিয়নের ফচিকা গ্রামে। এখানেই ১৯৫৪ সালের ১৫ নভেম্বর জন্মগ্রহণ করেন বারী সিদ্দিকী। মাত্র কদিন আগেই ছিল তাঁর জন্মদিন। কিন্তু নিজের জন্মদিন তিনি কখনোই উদ্যপন করেননি। বলতেন, ‘এগুলো ছোটদের ব্যাপার। ছোটরা করবে।’

নেত্রকোনা শহর থেকে ৫ কিলোমিটার দূরে কারলি গ্রাম। এখানে ২৫০ শতক জমির ওপর তিনি গড়ে তোলেন আশ্রম, নাম ‘বাউল বাড়ি’। তাঁর ভাষায়, ‘আপনি বৃষ্টি দেখতে চান? এখানে এক তলার ছাদে বসলে চারদিকে ২ কিলোমিটার শুধু বৃষ্টি দেখতে পাবেন। রোদ দেখতে চান? ২ কিলোমিটার শুধু রোদ। কুয়াশা? তাও।’ এমনি নিরিবিলি পরিবেশে এই আশ্রম গড়েছিলেন চোখ ভরা স্বপ্ন নিয়ে। এই বাউল বাড়িতে ছোট্ট ছেলেমেয়েরা থাকবে, সংগীত চর্চা করবে, খেলাধুলা করবে, শিশু-কিশোর বান্ধব পরিবেশে তারা বড় হবে। শেষ পর্যন্ত তা আর সম্ভব হয়নি, স্বপ্ন স্বপ্নই থেকে যায়।

তবে সাব্বির সিদ্দিকীকে বলে গেছেন তাঁর শেষ ইচ্ছার কথা। মৃত্যুর পর এই ‘বাউল বাড়িতেই’ যেন তাঁকে সমাহিত করা হয়।

সংগৃহীতবারী সিদ্দিকী পড়াশোনা করেছেন নেত্রকোনায় আঞ্জুমান সরকারি উচ্চবিদ্যালয় ও নেত্রকোনা সরকারি কলেজে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ইসলামের ইতিহাস বিষয়ে স্নাতক করেন। এরপর পুরোপুরি জড়িয়ে পড়েন সংগীতের সঙ্গে। বংশীবাদক হিসেবে তখন তাঁর জনপ্রিয়তা তুঙ্গে। বাসা থেকে বের হতেন সকাল ৯টায়, ফিরতেন রাত ১২টায়। স্টুডিও, বাংলাদেশ টেলিভিশন, বেতার কিংবা মঞ্চের অনুষ্ঠান নিয়েই ব্যস্ত থাকতেন। গান গাইতেন বাসায় কিংবা পরিচিতজনদের মাঝে।

জনপ্রিয় কথাসাহিত্যিক ও নির্মাতা হুমায়ূন আহমেদ হাসন রাজার গান নিয়ে কাজ করছেন। রাজধানীর সাসটেইন স্টুডিওতে রেকর্ডিং হচ্ছে। এখানে বাঁশি বাজাচ্ছেন বারী সিদ্দিকী। হঠাৎ বিদ্যুত বিভ্রাট। সব কাজ বন্ধ। সহশিল্পীরা বারী সিদ্দিকীকে গান গাওয়ার জন্য অনুরোধ করেন। পরপর কয়েকটি বিচ্ছেদ গান গেয়েছিলেন তিনি। সেদিন বারী সিদ্দিকীর গান শুনে মুগ্ধ হন হুমায়ূন আহমেদ।

হুমায়ূন আহমেদের জন্মদিনে আমন্ত্রণ জানানো হয় তাঁকে। বারী সিদ্দিকীকে দু-একটা বিচ্ছেদ গান গাওয়ার জন্য অনুরোধ করা হয়। সেই রাতে ধানমন্ডিতে হুমায়ূন আহমেদের বাসায় বসার ঘরে ৩৫টা গান গেয়েছিলেন তিনি। সবাই মুগ্ধ হয়ে শুনেছিলেন নতুন এক মেধাবী শিল্পীর গান। অন্য রকম কণ্ঠ। কণ্ঠ দিয়ে তিনি সবাইকে পুরোটা সময় আবিষ্ট করে রেখেছিলেন। ১৯৯৮ সালে হুমায়ূন আহমেদ ‘শ্রাবণ মেঘের দিন’ ছবির কাজ করেন। তখন এই ছবিতে গান গাওয়ার জন্য আমন্ত্রণ পান বারী সিদ্দিকী। এই ছবির ‘শুয়া চান পাখি আমি ডাকিতাছি তুমি ঘুমাইছ নাকি’, ‘পুবালি বাতাসে’, ‘আমার গায়ে যত দুঃখ সয়’, ‘ওলো ভাবিজান নাউ বাওয়া’, ‘মানুষ ধরো মানুষ ভজো’ গানগুলো বারী সিদ্দিকীকে পৌঁছে দেয় সারা দেশের মানুষের কাছে।

বারী সিদ্দিকী ১৬০টি গান গেয়েছেন। মৃত্যুর আগে তিনি একটি অ্যালবামের কাজ করেছেন। ১০টি গানের কথা লিখেছেন দেলোয়ার আরজুদা শরফ, সুর ও সংগীত পরিচালনা করেছেন এবং গানগুলোতে কণ্ঠ দিয়েছেন বারী সিদ্দিকী। সাব্বির বলেন, ‘কিছুদিন আগে গানগুলো ডিজিটাল প্রযুক্তিতে প্রকাশ করা হয়েছে। বাবার অসুস্থতার কারণে কাউকে জানানো সম্ভব হয়নি।’

হুমায়ূন আহমেদ নিজের লেখা গান তাঁকে দিয়ে সুর করাতে চেয়েছিলেন। মৃত্যুর আগে যখন তিনি দেশে এসেছিলেন, তখন বারী সিদ্দিকীকে একটি গান দিয়েছিলেন। গানটির স্থায়ী অংশটুকু হলো ‘কেউ গরিব অর্থের লোভে/কেউ গরিব রূপে/এই দুনিয়ায় সবাই গরিব/কান্দে চুপে চুপে…’। সম্প্রতি হুমায়ূন আহমেদের জন্মদিন উপলক্ষে বেসরকারি একটি টিভি চ্যানেলে গানটি গেয়ে শোনান তিনি। তাঁর উল্লেখযোগ্য অ্যালবামগুলো হলো ‘অন্তর জ্বালা’, ‘দুঃখ রইল মনে’, ‘ভালোবাসার বসতবাড়ি’। গান গেয়েছেন কয়েকটি চলচ্চিত্রেও।

দিয়ে দেড় ঘণ্টা চলে গেল, টেরই পাইনি। কেউ বুঝতেও পারেনি, তিনি কতটা অসুস্থ। গত ১০ নভেম্বর পর্যন্ত তিনি এভাবেই গান করেছেন।’

জাতীয় খবর

 

আপনার মতামত লিখুন :

 
ভারপ্রাপ্ত-সম্পাদকঃ শাকিব বিপ্লব
© কপিরাইট বরিশালটাইমস ২০১২-২০১৮ | বরিশালটাইমস.কম
বরিশালটাইমস মিডিয়া লিমিটেডের একটি প্রতিষ্ঠান।
ইসরাফিল ভিলা (তৃতীয় তলা), ফলপট্টি রোড, বরিশাল ৮২০০।
ফোন: +৮৮০২৪৭৮৮৩০৫৪৫, মোবাইল: ০১৮৭৬৮৩৪৭৫৪
ই-মেইল: [email protected], [email protected]
© কপিরাইট বরিশালটাইমস ২০১২-২০১৮
টপ
  সাগরে নিম্নচাপ: উপকূলে ঝড়-জলোচ্ছ্বাসের আশঙ্কা  রাতে ঘুমাতে যাওয়ার আগে এই দোয়া পড়বেন  বিএনপির ওপর কোনো অত্যাচার করা হয় নাই: তোফায়েল আহমেদ  রাস্তায় কুড়িয়ে পাওয়া ২ লাখ টাকা ব্যবসায়ীকে বুঝিয়ে দিলেন দিনমজুর  সাংবাদিকের ওপর হামলা: পুলিশ কর্মকর্তা বরখাস্ত: গ্রেপ্তার ৩  কখনও ডিবি পুলিশ আবার কখনও সাংবাদিক পরিচয়ে চাঁদাবাজি  পটুয়াখালী/ গভীর সাগরে ট্রলারডুবি: ২ জেলেসহ নিখোঁজ ৮ ট্রলার  সন্ধ্যানদীতে নিখোঁজ শ্রমিকের লাশ উদ্ধার  ঝালকাঠিতে স্ত্রীকে পিটিয়ে হত্যা: স্বামী আটক  ঝালকাঠির সুগন্ধা নদী থেকে গলিত লাশ উদ্ধার