৩৬ মিনিট আগের আপডেট সন্ধ্যা ৭:৩০ ; বৃহস্পতিবার ; মার্চ ২৩, ২০২৩
EN Download App
Youtube google+ twitter facebook
×

গরিবের হোটেলে ভাড়া মাত্র ১৫ টাকা

Mahadi Hasan
১২:২২ অপরাহ্ণ, সেপ্টেম্বর ৮, ২০২২

গরিবের হোটেলে ভাড়া মাত্র ১৫ টাকা

নিজস্ব প্রতিবেদক, বরিশাল :: ২২ ফুট দৈর্ঘ্য ও ১৪ ফুট প্রস্থের একটি টিনশেড ঘর। এ ঘরের মেঝেতে শুয়ে আছেন প্রায় ৫০ জন। পেশায় এরা সবাই দিনমজুর। সারাদিন ক্ষেত-খামারে কাজ করে রাতে এ ঘরে ঘুমান। ভাড়া প্রতি রাতের জন্য ১৫ টাকা। দিনমজুরদের থাকার এ ঘরগুলো স্থানীয়দের কাছে ‘লেবার বোর্ডিং’ নামে পরিচিত। আবার অনেকেই নাম দিয়েছেন ‘গরিবের হোটেল’।

পাবনার ঈশ্বরদী উপজেলার ভাড়ইমারী গ্রামের আনন্দবাজারের আশেপাশেই গড়ে উঠেছে পাঁচটি লেবার বোর্ডিং। এসব বোর্ডিংয়ে শুয়ে ঘুমানোর জন্য কোনো চৌকি বা খাট নেই। মেঝেতে খেজুরের পাটি বা প্লাস্টিকের চট বিছিয়ে নিজস্ব কাঁথা-বালিশে দিনমজুররা ঘুমান। যারা দীর্ঘদিন ধরে আছেন তাদের অনেকের নিজস্ব ট্রাঙ্ক রয়েছে।

মঙ্গলবার (৬ সেপ্টেম্বর) রাত ৯টায় সরেজমিনে গিয়ে দেখা গেল, কাজ থেকে ফিরে বেশ কয়েকজন রান্নার আয়োজনে ব্যস্ত। ৫-৭ জন একত্র হয়ে রান্না করছেন। বোর্ডিংয়ে ঘর রয়েছে মোট ১০টি। এখানে ২৫০ থেকে ৩০০ জন শ্রমিক থাকতে পারেন।

স্থানীয়রা জানান, উপজেলার সলিমপুর ইউনিয়নের ভাড়ইমারী, বক্তারপুর ও নওদাপাড়া গ্রামে বছর জুড়ে ব্যাপক সবজির আবাদ হয়। পাশাপাশি ধান, পাট, সরিষা, মাশকালাই, মশুর, পেঁপে, পেয়ারাসহ বিভিন্ন ফল-ফসলের আবাদ হয়। ফসলের কাজের জন্য ব্যাপক দিনমজুরের চাহিদা থাকায় স্থানীয় দিনমজুরদের পাশাপাশি অন্যান্য জেলা-উপজেলার দিনমজুররা এখানে এসে বছর জুড়েই কাজের সুযোগ পান।

ফলে রাজশাহী, নাটোর, রংপুর, কুষ্টিয়া, সিরাজগঞ্জ ও পাবনা জেলার দিনমজুররা কাজে এসে একসময় স্কুলের বারান্দা ও দোকানপাটের সামনে রাত্রিযাপন করতেন। আবার অনেকেই পলিথিনের ছাউনি তুলে ক্ষেত-খামারেই থাকতেন। এতে তাদের নিদারুন কষ্ট হতো। অনেকেই অসুস্থ হয়ে পড়তেন।

তাদের এ দূরাবস্থা দেখে স্থানীয় বাসিন্দা আতিয়ার রহমান ভাড়ইমারি আনন্দ বাজারে দিনমজুরদের জন্য একটি ঘর নির্মাণ করে দেন। দিনমজুররা সারাদিন কঠোর পরিশ্রম শেষে অন্তত নিশ্চিন্তে এই ঘরে রাত্রিযাপনের সুযোগ পান।

প্রথম দিকে রাত্রী যাপনের জন্য দিনমজুরদের কাছ থেকে ১০ টাকা করে নেওয়া হতো। এভাবেই প্রায় ১২ বছর আগে দিনমজুরদের থাকার জন্য আনন্দবাজারে গড়ে ওঠে লেবার বোর্ডিং। পরবর্তীতে দিনমজুরদের চাহিদা অনুযায়ী আনন্দ বাজারে একে একে গড়ে ওঠে আরো ছয়টি বোর্ডিং।

ঈশ্বরদীর পার্শ্ববর্তী নাটোরের লালপুর উপজেলার অমৃতপাড়ার আরজ আলী জানান, আমাদের বাড়ি থেকে ঈশ্বরদীর ভাড়ইমারির দূরত্ব প্রায় ৩০ কিলোমিটার। সকাল ৬টায় কাজে যোগ দিতে হলে রাত ৪টায় বাড়ি থেকে সাইকেল নিয়ে বের হতে হয়। ৩০ কিলোমিটার পথ পাড়ি দিয়ে কাজে আসা আবার কাজ শেষে ৩০ কিলোমিটার সাইকেল চালিয়ে বাড়ি গিয়ে শরীর ক্লান্ত হয়ে পড়ে। পরের দিন আবার রাত ৪টায় উঠে আবার কাজে যোগ দেওয়া কষ্টকর।

তিনি বলেন, কিছুদিন যাতায়াতের পর লেবার বোর্ডিংয়ে থাকা শুরু করলাম। সকালে বাসিপান্তা খেয়ে কাজে চলে যাই। দুপুরে গেরস্ত (ক্ষেতের মালিক) খাবার দেন। রাতে এসে ৪-৫ জন ঐক্যবদ্ধ হয়ে রান্না করে খাই। সবজির ক্ষেতে আগাছা বাছাইয়ের কাজ করে হাজিরা পেয়েছি ৫০০ টাকা। এখানে দু’বেলা খাওয়া, বোর্ডিং ভাড়া ও পকেট খরচসহ প্রতিদিন ৯০ থেকে ১০০ টাকা খরচ হয়। খুব কম খরচে স্বাচ্ছন্দ্যে এখানে থাকতে পারি।

লালপুরের মহরকয়া গ্রামের মাহাবুল ইসলাম বলেন, ভাড়ইমারীতে দিনমজুরের ব্যাপক চাহিদা রয়েছে। পাট থেকে আঁশ ছাড়ানোর কাজ করে ৭৫০ টাকা হাজিরা পেয়েছি। এ বোর্ডিংয়ে থাকা ও খাওয়া দিয়ে ১০০ টাকা খরচ হয়েছে।

বাড়ির দূরত্ব ২০ কিলোমিটার হবে। আগে সাইকেল চালিয়ে এসে কাজ করেছি কিন্তু এখন আর সম্ভব না। ভাই-ব্রাদার একসঙ্গে ভালোই আছি। কোনো অসুবিধা নেই। মাত্র ১৫ টাকা ভাড়া দেশের আর কোথাও আছে বলে মনে হয় না। আমরা এটাকে গরিবের হোটেল বলে থাকি।

রাজশাহীর বাঘা উপজেলার নন্দীগ্রামের নুরুল ইসলাম বলেন, দেশের বিভিন্ন এলাকায় গিয়ে কাজ করেছি। এতে কম খরচে কোথাও থাকার ব্যবস্থা নেই। দিনমজুরদের থাকা ও খাওয়ার এমন সুব্যবস্থা না থাকলে এখানে এসে কাজ করা সম্ভব হতো না। শুধু থাকাই নয়, বিনোদনের জন্য প্রায় ঘরেই রয়েছে টেলিভিশন। অবসর সময়ে টিভি দেখে সময় কাটানো যায়।

আতিয়ার লেবার বোর্ডিংয়ের মালিক আতিয়ার রহমান জানান, দিনমজুরদের থাকার কষ্ট দেখে প্রথমে একটি ঘরের ব্যবস্থা করেছিলাম। এরপর অনেকেই বোর্ডি খুলেছে। এতে গরিব দিনমজুরদের উপকার হয়েছে।

এখানে আমাদের ব্যবসার কোনো উদ্দেশ্য নেই। আমাদের জমিজমা চাষাবাদের জন্য দিনমজুরের প্রয়োজন হয়। তারা যেন নিশ্চিন্ত নিরাপত্তার মধ্যে থেকে কাজ করতে পারে সেজন্য এ ব্যবস্থা করেছি।

জাহিদ বোর্ডিংয়ের মালিক জাহিদুর ইসলাম জাহিদ বলেন, আমার বোডিংয়ে তিনটি ঘরে ১০০ জন থাকার ব্যবস্থা রয়েছে। ফসল লাগানো ও উঠানো মৌসুমে বোর্ডিংয়ে লোকজন ভরপুর থাকে। তখন প্রতিদিন ১৫০০ টাকা আয় হয়। রোববার আয় হয়েছে ১৩০০ টাকা। এটি আমরা সেবামূলক কাজ হিসেবে দেখি। পাশাপাশি এখান থেকে যথেষ্ট আয়ও হয়।

সলিমপুর ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান আব্দুল মজিদ বাবলু মালিথা জানান, সলিমপুর ইউনিয়নের প্রতিটি গ্রামেই বছরজুড়ে সবজির আবাদ হয়। প্রতিদিন এই ইউনিয়নের তিন থেকে চার হাজার দিনমজুর আশপাশের উপজেলা ও জেলা থেকে এসে কাজ করে। দূর-দূরান্ত থেকে আসা এসব দিনমজুরদের অনেকেই কাজ শেষে বাড়ি ফিরে যেতে পারেন না।

এসব গরিব দিনমজুরদের থাকার জন্য মানবিক দৃষ্টিকোণ থেকে স্থানীয়রা লেবার বোর্ডিং করে দিয়েছেন। এখানে দিনমজুররা খুব কম ব্যয়ে স্বাচ্ছন্ধ্যে থেকে কাজকর্ম করতে পারে। দিনমজুরদের আবাসন সুবিধা হওয়ায় স্থানীয় কৃষক ও দিনমজুর দু’পক্ষেরই উপকার হয়েছে।

ঈশ্বরদী উপজেলা সমাজসেবা কর্মকর্তা মো. মাসুদ রানা জানান, দিনমজুরদের থাকার জন্য লেবার বোর্ডিং বা আবাসিক কোনো ব্যবস্থা রয়েছে এটি আমার জানা নেই। খোঁজ নিয়ে এ বিষয়টি দেখবো।

উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা মিতা সরকার জানান, ঈশ্বরদীতে কৃষি কাজ করতে প্রতিদিন হাজার হাজার দিনমজুর পার্শ্ববর্তী উপজেলা-জেলা থেকে আসে। এদের থাকার আবাসিক কোনো ব্যবস্থা রয়েছে এটি আমার জানা নেই। আমি মাঝে মধ্যেই ভাড়ইমারী আনন্দবাজারে যাই। এবার গেলে দিনমজুরদের বোর্ডিংগুলোর খোঁজখবর নেবো।

দেশের খবর

আপনার মমত লিখুন :

 
ভারপ্রাপ্ত-সম্পাদকঃ শাকিব বিপ্লব
© কপিরাইট বরিশালটাইমস ২০১২-২০১৮ | বরিশালটাইমস.কম
বরিশালটাইমস মিডিয়া লিমিটেডের একটি প্রতিষ্ঠান।
ইসরাফিল ভিলা (তৃতীয় তলা), ফলপট্টি রোড, বরিশাল ৮২০০।
ফোন: +৮৮০২৪৭৮৮৩০৫৪৫, মোবাইল: ০১৮৭৬৮৩৪৭৫৪
ই-মেইল: [email protected], [email protected]
© কপিরাইট বরিশালটাইমস ২০১২-২০১৮
টপ
  আগামীতে অনেক যড়যন্ত্র মোকাবিলা করে নির্বাচন করতে হবে: ড. শাম্মী আহমেদ  ১০ উইকেটের বিশাল জয়ে সিরিজ নিশ্চিত টাইগারদের  ৭০ বছর বয়সে এসে বিয়ে করলেন অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষক  নুরজাহানের ঘর নির্মাণে এমপি রত্না আমিন এবং ইউএনও সজল চন্দ্র শীলের অর্থসহায়তা  প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে ভাত খেতে চাইলেন বানারীপাড়ার মনোয়ারা বেগম  বাউফলে কৃষকলীগ নেতার বসতঘরে হামলা: ছাত্রলীগ নেতা গ্রেপ্তার  যাতায়াতের একমাত্র ব্রিজটি ৭ বছর ধরে চলাচলের অনুপযোগী  বিয়ের প্রলোভনে সহবাস: নারী বললেন- ‘ওসিকে আমি বিয়ে করতে চাই’  কাউখালীতে কৃষকদের মাঝে বীজ ও সার বিতরণ  ঈদের পরই রাজপথে নামবে বিএনপি!