১৩ই জুন, ২০২৪ খ্রিস্টাব্দ, বৃহস্পতিবার

জট খোলেনি শিশু মাহদী হত্যার, রিমান্ডে বাবা

বরিশাল টাইমস রিপোর্ট

প্রকাশিত: ০১:১৭ অপরাহ্ণ, ০২ নভেম্বর ২০১৯

বার্তা পরিবেশক, অনলাইন:: সাত দিনেও উদঘাটন হয়নি ১৮ দিন বয়সী ছোট্ট শিশু আবদুল্লাহ আল মাহাদী হত্যার রহস্য। ঘটনার সময় তাকে নিয়ে একই বিছানায় ঘুমিয়ে ছিলেন মা ও নানি। আর মামা জুবায়ের আল নাফিস (১১) ও বাবা বিজয় হাসান ছিলেন পাশের কক্ষে। মা ও নানা-নানির দাবি, বিছানা থেকে তুলে টয়লেটে বালতির পানিতে চুবিয়ে মাহাদীকে হত্যা করেছে বাবা বিজয়।

এদিকে পুলিশের প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে বিজয় জানিয়েছেন, তিনি ছেলেকে হত্যা করেননি। এটা তার বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র। সঠিক তদন্ত হলেই প্রকৃত খুনিরা ধরা পড়বে।

গত ২৭ অক্টোবর ভোর ৬টার দিকে গাজীপুরের শ্রীপুর পৌর এলাকার ভাংনাহাটি গ্রামে শিশু মাহাদীকে বালতির পানিতে চুবিয়ে হত্যা করা হয়। এ ঘটনায় প্রকৃত হত্যাকারী চিহ্নিত নিয়ে সৃষ্টি হয় ধুম্র্রজালের। বাবা বিজয়কে আসামি করে থানায় মামলা করেন শিশুটির মা নুসরাত জাহান মুন্নি। এ ঘটনার এক সপ্তাহ পার হয়ে গেলেও এ হত্যাকাণ্ডের রহস্য এখনও উদঘাটন করতে পারেনি পুলিশ।

এদিকে বাবা বিজয়কে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য পুলিশ ৭ দিনের রিমান্ড আবেদন করলেও বৃহস্পতিবার গাজীপুর চিফ জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট হামিদুল হক শুনানি শেষে পাঁচ দিনের রিমান্ড মঞ্জুর করেন।

আদালত পরিদর্শক রফিকুল ইসলাম জানান, গত সোমবার বিজয় হাসানকে আদালতে হাজির করে ৭ দিনের রিমান্ডে নেয়ার আবেদন করেন তদন্তকারী কর্মকর্তা। তবে মামলার তদন্ত-সংক্রান্ত প্রয়োজনীয় কাগজপত্র (সিডি) না থাকায় আদালত বৃহস্পতিবার শুনানির জন্য দিন ধার্য করেছিলেন।

আদালতে দেয়া প্রতিবেদনে বলা হয়, বিজয়ের পরকীয়া প্রেম ছিল। তা নিয়ে স্ত্রীর সঙ্গে সম্পর্ক ভালো যাচ্ছিল না। একপর্যায়ে স্ত্রীর গর্ভে থাকা সন্তানকে হত্যার হুমকি দিয়েছিলেন। এছাড়া বিভিন্ন সময় হুমকি দেয়ার অডিও রেকর্ডসহ বেশ কিছু আলামতও পাওয়া গেছে। মামলার তদন্তের স্বার্থে তাকে জিজ্ঞাসাবাদ করা প্রয়োজন।

ঘটনার প্রথম থেকেই মা নুসরাত অভিযোগ করছেন, বিজয়ই মাহদীকে হত্যা করেছে। কারণ হিসেবে তার দাবি, বিজয়ের পরকীয়া প্রেমের বিষয়টি তাদের দুই পরিবারই জেনে গিয়েছিল। একপর্যায়ে বিজয় তার সঙ্গে খারাপ আচরণ করত। সন্তানের বাবা হওয়াকে সহজভাবে নেয়নি সে। সাত মাসের অন্তঃসত্ত্বা থাকা অবস্থায় গর্ভের সন্তাকে হত্যার হুমকি দিয়েছিল বিজয়। সেই ঘটনায় গত ১৪ আগস্ট থানায় একটি সাধারণ ডায়েরি (নম্বর ৬৩৫) করেছিলেন নুসরাত।

অপরদিকে বিজয়কে নির্দোষ দাবি করে বাবা শামসুল হক ফকির জানান, গত শুক্রবার (২৫ অক্টোবর) রাতে তার ছেলে শ্বশুরবাড়ি গিয়েছিল। পরদিনই বাড়ি ফিরে সে। কিন্তু বিকেলেই নূসরাত ফোন দিয়ে বিজয়কে রাতে যেতে বলে। কিন্তু জরুরি কাজ থাকায় যেতে পারবে না বলায় নূসরাত জানায়, তার জন্য বিশেষ খাবারের আয়োজন করা হয়েছে। এছাড়া সন্তানের জন্য দৈনন্দিন প্রয়োজনীয় কিছু জিনিসও আনতে বলে সে (নূসরাত)।

তিনি আরও জানান, পরে ভাই হৃদয়ের কাছ থেকে কিছু টাকা নিয়ে ছেলের জন্য খেলনা ও ডায়পার কিনে বিজয় শ্বশুরবাড়ি গিয়েছিল। পরদিন সকালে খবর পান নাতি খুন হয়েছে। আর ওই ঘটনায় বিজয়কে ফাঁসানোর ষড়যন্ত্র চলছে বলে দাবি করেন তিনি।

নিহতের মামা জুবায়ের আল নাফিস (১১) জানায়, ওই রাতে তার সঙ্গেই ঘুমিয়েছিলেন বিজয়। রাতে হঠাৎ ঘুম ভেঙে গেলে দেখেতে পায় দুলাভাই মোবাইল চালাচ্ছে। এরপর সে আবার ঘুমিয়ে পড়ে। সকালে তার মা ও বড় বোনের চিৎকারে ঘুম ভাঙে। কিন্তু দুলাভাই ঘুম থেকে জাগছিল না। পরে তার বাবা গিয়ে বিজয়কে ডেকে তোলে। ওই সময় বিজয় ছিল নির্বিকার। জুবায়ের দাবি, দুলাভাইই মাহদীকে হত্যা করেছে।

সুরতহাল তৈরি করা শ্রীপুর মডেল থানার উপ-পরিদর্শক (এসআই) নাজমুল শাকিব বলেন, ‘শিশুটিকে শ্বাসরোধে হত্যা করে কাঁথা মুড়িয়ে বালতির ভেতর পানিতে রেখে, নাকি পানিতে চুবিয়ে হত্যা করা হয়েছে; তা বোঝা যায়নি। তবে শিশুটির পেট কিছুটা ফাঁপা ছিল। সুরতহাল তৈরির সময় নাক দিয়ে তিন-চার ফোঁটা পানি ঝরলেও মুখের ভেতর থেকে পানি বের হয়নি।’

এদিকে মামলার তদন্ত কর্মকর্তা শ্রীপুর মডেল থানার পরিদর্শক (তদন্ত) মোহাম্মদ আকতার হোসেন জানান, শিশুটির মা-বাবা, অথবা নানা-নানির কেউ এ হত্যাকাণ্ড ঘটিয়েছে। চারজনকে ঘিরেই তদন্ত চলছে। নিহতের মা ও নানা-নানিকে নজরদারিতে রাখা হয়েছে। পর্যায়ক্রমে তাদের তিনজনকেই জিজ্ঞাসাবাদ করা হচ্ছে। তাদেরকে পুলিশকে না জানিয়ে কোথাও যেতে নিষেধ করা হয়েছে

তিনি জানান, নূসরাতের সঙ্গে বিজয়ের বিয়ের পর থেকে প্রতিটি বিষয় খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে বিশ্লেষণ করা হচ্ছে। পাশের কক্ষ থেকে এসে মশারি তুলে মা ও নানির মধ্য থেকে শিশুটিকে কাঁথায় জড়িয়ে তুলে নেয়ার সময় তাদের টের পাওয়ার কথা ছিল। তাছাড়া ভোর চারটায় বিছানায় শুয়ে তখনই ঘুমিয়ে পড়ার কথা নয়। ফলে সন্দেহটা শিশুর নানিকে ঘিরেও।

তিনি আরও জানান, বিজয়-মুন্নির ২০ লাখ টাকা দেনমোহরে বিয়ে হয়। বিয়েতে কয়েক লাখ টাকার স্বর্ণালঙ্কার দেয়া হয়েছিল। শোনা যাচ্ছে, বিজয়ের বাবার কাছ থেকে মুন্নীর বাবা পাঁচ মাস আগে নগদ ৫ লাখ টাকা ও এর তিন থেকে সাড়ে তিন মাস পর আরও সাড়ে ৫ লাখ টাকা ধার নিয়েছিলেন। টাকা আত্মসাতের জন্যই হত্যাকাণ্ড কীনা তাও খতিয়ে দেখা হচ্ছে।

যদিও মুন্নীর বাবা মোফাজ্জল হোসেন দাবি করেছেন, তিনি কখনোই বিজয়ের বাবার কাছ থেকে টাকা ধার নেননি।

শ্রীপুর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) লিয়াকত আলী বলেন, পুলিশ সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়ে মামলাটি তদন্ত করছে। ছায়া তদন্তে সম্পৃক্ত রয়েছে পুলিশের একাধিক দল। তদন্তে গুরুত্বপূর্ণ অনেক তথ্যই হাতে এসেছে। আজ (শনিবার) বিজয় হাসানকে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য আনা হবে। আশা করছি, শিগগিরই হত্যার রহস্য উদঘাটন সম্ভব হবে।

3 বার নিউজটি শেয়ার হয়েছে
  • ফেইসবুক শেয়ার করুন