১৮ই জুন, ২০২৪ খ্রিস্টাব্দ, মঙ্গলবার

বরিশালের বিভিন্ন নৌ-রুটে নাব্যতা সংকট, আটকা পড়ছে নৌযান

বরিশাল টাইমস রিপোর্ট

প্রকাশিত: ০১:৩৭ অপরাহ্ণ, ৩০ অক্টোবর ২০১৯

নিজস্ব প্রতিবেদক, বরিশাল:: শীত মৌসুম আসতে না আসতেই দক্ষিণাঞ্চলের বিভিন্ন নৌ-রুটে নাব্যতা সংকট দেখা দিয়েছে। ভাটার সময় নাব্যতা সংকটের কারণে দক্ষিণাঞ্চলের বরিশাল নদীবন্দরে প্রায় প্রতিদিনই যাত্রীবাহী লঞ্চ আটকে পড়ার ঘটনা ঘটছে। এতে লঞ্চগুলোকে হাজারো যাত্রী নিয়ে ঘণ্টার পর ঘণ্টা জোয়ারের জন্য অপেক্ষা করতে হচ্ছে। এছাড়াও নদীতে নাব্যতা সংকটের কারণে এরইমধ্যে বিআইডব্লিউটিএর অনির্ধারিত ঢাকা-বরিশাল রুটের মিয়ার চ্যানেল দিয়ে লঞ্চ চলাচল বন্ধ হয়ে গেছে।

লঞ্চচালক বা মাস্টারদের মতে, এবার উত্তরাঞ্চলে সৃষ্ট বন্যা ও নদী ভাঙনের কারণে নদীর পানির সঙ্গে পলির পরিমাণ বেড়ে যায়। আর পলিযুক্ত পানির স্রোতধারা নদীর তলদেশে যেসব স্থানে বাধাগ্রস্ত হচ্ছে সেখানেই ডুবোচরের সৃষ্টি হচ্ছে। ফলে ওইসব স্থানে নাব্যতা সংকট দেখা দিচ্ছে।

তবে এবার শীতের মৌসুম আসার আগেই নাব্যতা সংকট তীব্র আকার ধারণ করায় স্বাভাবিক নৌ-যান চলাচল ব্যাহত হওয়ার আশঙ্কা করছেন চালক বা মাস্টাররা।

খোজ নিয়ে জানা যায়, দক্ষিণাঞ্চল তথা বরিশাল বিভাগের মধ্যে বরিশাল ও পটুয়াখালী জেলার বিভিন্ন নদীতে নাব্যতা সংকট এতোটাই দেখা দিয়েছে যে ভাটার সময় প্রায় দিনই বিভিন্ন স্থানে লঞ্চ বা নৌযান আটকে পড়ার ঘটনা ঘটছে।

ঢাকা-বরিশাল রুটের বিভিন্ন লঞ্চের চালকদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, বর্তমানে পটুয়াখালী ও বরিশাল নদীবন্দর সংলগ্ন এলাকায় নাব্যতা সংকট রয়েছে। এছাড়া বরিশাল-ঢাকা রুটের মেহেন্দিগঞ্জের উলানিয়া, ভাসানচর এলাকা সংলগ্ন নদীতেও বিভিন্ন জায়গায় নাব্যতা সংকট রয়েছে। সেসব জায়গা দিয়ে বড় আকারের নৌযান চালিয়ে নিতে হিমশিম খেতে হয়। আর ঢাকা-বরিশাল রুটের আলোচিত মিয়ারচর চ্যানেল বর্ষা শেষ হতে না হতেই নৌযান চলাচলের অনুপযোগী হয়ে যায়। যেখান থেকে বর্তমানে লঞ্চ চলাচল বন্ধ রয়েছে। যদিও এ চ্যানেলটি বিআইডব্লিউটিএর নির্ধারিত কোনো নৌ-রুটের মধ্যে নেই, তবে সময় ও খরচ বেঁচে যাওয়ার কারণে লঞ্চ মালিক ও চালকদের কাছে বেশ জনপ্রিয়।

ঢাকা-বরিশাল রুটের এমভি সুন্দরবন-১১ লঞ্চের মাস্টার আলমগীর হোসেন বলেন, বরিশাল-ঢাকা নৌরুটে বরিশাল নদীবন্দর থেকে চাঁদপুর পর্যন্ত অন্তত পাঁচ থেকে ছয়টি পয়েন্ট নাব্যতা সংকটের কারণে ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। নাব্যতা সংকটের কারণে প্রায় দু’মাস ধরে ওই চ্যানেল হয়ে লঞ্চ চলাচল করছে না। এ কারণে বিআইডব্লিউটিএর নির্ধারিত চ্যানেল মেঘনার উলানীয়া-কালিগঞ্জ হয়ে চলাচল করতে হচ্ছে। এতে গন্তব্যে পৌঁছাতে প্রায় দুই ঘণ্টা সময় বেশি লাগার পাশাপাশি অন্তত তিন ব্যারেল তেল বেশি লাগছে।

‘কিন্তু বর্তমান চ্যানেলেও নাব্যতা সংকট দেখা দিয়েছে। জোয়ারের সময় ন্যাবতা সংকট থাকে এখানে। আর এ চ্যানেলটিও বন্ধ হয়ে গেলে বরিশাল-ঢাকা নৌরুটের লঞ্চগুলোকে চলাচল করতে হবে ভোলার ইলিশা হয়ে। এতে গন্তব্যে পৌঁছাতে অন্তত আরও এক ঘণ্টা সময় বেশি লাগবে। বেড়ে যাবে জ্বালানি খরচও।

তিনি আরও জানান, এর বাইরে বরিশাল-ঢাকা নৌ-রুটের বাউশিয়া-নলবুনিয়া চ্যানেল, বরিশালের শায়েস্তাবাদ সংলগ্ন কীর্তনখোলা ও আড়িয়াল খাঁসহ তিন নদীর মোহনায় পলিমাটি জমে নাব্যতা সংকটের সৃষ্টি হয়েছে।

আর এমভি কীর্তনখোলা-১০ লঞ্চের মাস্টার মো. সাজ্জাদ হোসেন বলেন, বর্তমানে বরিশাল নদীবন্দরের টার্মিনাল সংলগ্ন কীর্তনখোলা নদীতেও নাব্যতা সংকট চরম আকার ধারণ করেছে। ভাটা থাকায় প্রায় প্রতিদিন রাত ৯টার পরে ছেড়ে যাওয়া লঞ্চগুলো ঘাটে আটকে যাচ্ছে। জোয়ারের অপেক্ষায় অন্তত দুই ঘণ্টা অপেক্ষা করে ঢাকার উদ্দেশ্যে যাত্রা করতে হচ্ছে।

খোঁজ নিয়ে জানা যায়, গত ২৬ অক্টোবর রাতে একসঙ্গে দু’টি লঞ্চ এমভি কীর্তনখোলা-১০ ও অ্যাডভেঞ্চার-৯ এবং পরের দিন ২৭ মার্চ এমভি মানামী লঞ্চ বরিশাল নৌবন্দরে আটকে যায়। রাত ৯টার কিছু সময় পরে এসব লঞ্চ ছাড়ার কথা থাকলেও রাত সাড়ে ১০টার পরে জোয়ার এলে লঞ্চগুলো টার্মিনাল এলাকা ত্যাগ করে। আর এরকম অবস্থা চলতে থাকলে ১০-১২ দিন পরে বরিশাল নদীবন্দরে কোনো লঞ্চই বার্দিং করা সম্ভব হবে না।

এদিকে অভ্যন্তরীণ রুটের মধ্যে ভোলার ভেদুরিয়া ও বরিশালের লাহারহাট ফেরিঘাট এবং মেহেন্দিগঞ্জের পাতারহাট লঞ্চঘাট সংলগ্ন এলাকায় নাব্যতা সংকট রয়েছে। এছাড়া ঢাকা–পটুয়াখালী রুটেও নাব্যতা সংকটের কারণে বিভিন্ন স্থানে প্রতিনিয়ত লঞ্চগুলোকে আটকে পড়তে হচ্ছে। বাকেরগঞ্জের কারখানা নদীসহ কবাই ও পটুয়াখালী লঞ্চঘাট সংলগ্ন এলাকায় এ সমস্যা প্রকট বলে জানিয়েছেন কুয়াকাটা-১ লঞ্চের স্টাফরা।

বরিশাল-ঢাকা নৌ রুটে নাব্যতা সংকট সৃষ্টির জন্য বিআইডব্লিউটিএর অপরিকল্পিত ডেজিং ব্যবস্থাকেই দায়ী করছেন লঞ্চ মালিকরা। তাদের মতে, বিআইডব্লিউটিএর উদ্যোগে নদীর অনেক জায়গায়ই ড্রেজিং করা হয়েছে, কিন্তু বছর ঘুরতে না ঘুরতেই সেসব জায়গা ও চ্যানেলে নাব্যতা সংকট দেখা দিয়েছে। মালিকদের ধারণা, ড্রেজিংয়ের বালু যে স্থান থেকে কাটা হচ্ছে তা আবার এক থেকে দেড়শ মিটার দূরে নদীতেই ফেলা হচ্ছে। ড্রেজিংয়ের বালু নদীতে না ফেলে অন্যত্র সরিয়ে ফেললে বছর বছর এ সমস্যার সৃষ্টি হতো না।

নাব্যতা সংকটে আটকে পড়া নৌযানআর ড্রেজিং বিভাগের কর্মকর্তারা বলছেন, ড্রেজিংয়ের বালু নদীতে ফেলা ছাড়া কোনো উপায় নেই। কেননা যে পরিমাণ বালু কাটা হয় তা স্থলে ফেলার মতো জায়গা নেই। এ কারণে বিগত বছরে ঘোষণা দিয়ে ড্রেজিং কার্যক্রম শুরু করা হয়ছিল, যদি কারও নিম্নজমি থাকে তা বিনামূল্যে ড্রেজিংয়ের বালু দিয়ে ভরে দেওয়া হবে। কিন্তু কেউ বালু না নিলে সে ক্ষেত্রে নদীতে ফেলা ছাড়া আর কোনো উপায় থাকে না।

তবে খুব শিগগিরই বরিশাল-ঢাকা নৌরুট নিরাপদ করে তুলতে ড্রেজিং কার্যক্রমের মাধ্যমে নাব্যতা সংকট দূর হবে বলে জানিয়েছেন বরিশাল নৌবন্দর কর্মকর্তা (যুগ্ম পরিচালক) এবং বিআইডব্লিউটিএর নৌ-নিরাপত্তা ও ট্রাফিক ব্যবস্থাপনা বিভাগের উপ-পরিচালক আজমল হুদা মিঠু সরকার।

তিনি বলেন, এ মৌসুমে নদীতে পানি কম থাকে। এ কারণে কিছু কিছু পয়েন্টে নাব্যতা সংকটের সৃষ্টি হয়। অনেক নদীতেই ড্রেজিং ব্যবস্থা চালুও রয়েছে। আশা করা যাচ্ছে খুব শিগগিরই এ সমস্যার সমাধান হবে।

4 বার নিউজটি শেয়ার হয়েছে
  • ফেইসবুক শেয়ার করুন