২৯শে মে, ২০২৪ খ্রিস্টাব্দ, বুধবার

নির্ধারিত সময়ে পদ্মাসেতু নির্মাণ সম্পন্ন নিয়ে সংশয়!

বরিশাল টাইমস রিপোর্ট

প্রকাশিত: ০১:০৫ পূর্বাহ্ণ, ২১ জুলাই ২০১৭

২০১৮ সালের মধ্যে স্বপ্নের পদ্মাসেতু উদ্বোধনের কথা রয়েছে। বর্তমান সরকারের আমলে সেতুটি যান চলাচলের জন্য খুলে দিতে দিন-রাত পরিশ্রম করে যাচ্ছেন সংশ্লিষ্টরা। মন্ত্রী, সচিবসহ প্রকল্প কর্মকর্তারা অগ্রাধিকার প্রকল্প হিসেবে নিয়মিত এর তদারক করছেন। তবে দুঃখজনক হলেও সত্য, প্রকৃতিগত কারণেই খরস্রোতা এ নদীতে পাইলিং বিলম্ব হচ্ছে। নতুন বিপত্তি নদীর গভীরে পাইলের শেষ প্রান্তে গিয়ে ধরা পড়ছে কাদামাটির স্তর। পাইলের প্রক্রিয়া সম্পন্নের পরই কেবল পিলার স্থাপনের পালা। তাই যথাসময়ে সেতুর নির্মাণ সম্পন্ন নিয়ে সংশয় দেখা দিয়েছে।

এ এমতাবস্থায় আরও সময় বাড়ানো লাগতে পারে। সেক্ষেত্রে খরচ বৃদ্ধিরও সম্ভাবনা রয়েছে। এজন্য ৬ মাস সময় বৃদ্ধির একটি প্রস্তাবনা তৈরি করছেন প্রকল্প-সংশ্লিষ্টরা। তবে সরকারের উচ্চ পর্যায়ের অনুমতি সাপেক্ষে পরবর্তী ব্যবস্থা নেওয়ার কথা রয়েছে।

প্রকল্প সূত্র জানায়, পদ্মা নদীর তলদেশ থেকে প্রতিবছর কিছুটা করে মাটি সরে যায়। খরস্রোতের কারণে এমনটি হয়। তাই সেতুর পাইল অনেক গভীর হতে হবে। বিশ্বে কোনো সেতুতে এত গভীর পাইল করতে হয়নি। তবে এখন পাইলের শেষ প্রান্তে কাদা মাটির স্তর ধরা পড়ায় দেখা দিয়েছে নতুন জটিলতা। এজন্য নতুন করে ভাবতে হচ্ছে। পরিবর্তন করতে হতে পারে পাইলের আকার ও সংখ্যা। এ কারণে পদ্মা সেতুর ১৪টি পিলারের ৮৪ পাইলের ডিজাইন এখনো চূড়ান্ত করা যায়নি।

এগুলোর পাইলিংয়ের ব্যাপারে সিদ্ধান্ত নেওয়া যাচ্ছে না। প্রকল্প পরিচালক শফিকুল ইসলাম বর্তমানে দেশের বাইরে। তিনি এলে প্রকল্পের সময় বাড়ানোর ব্যাপারে করণীয় নির্ধারণ হবে।

এ বিষয়ে সেতু বিভাগের সিনিয়র সচিব খন্দকার আনোয়ারুল ইসলাম বলেন, পদ্মাসেতুর নির্মাণকাজ নিয়ে গতকালও (বুধবার) কথা বলেছি, মিটিং করেছি। সেদিনও সাইটে গিয়েছি। সময় বৃদ্ধির তথ্যটি সঠিক নয়। এ ধরনের কোনো সিদ্ধান্ত হয়নি। আমি মনে করি যথাসময়ে নির্মাণকাজ শেষ হবে। আরও ৪টি হ্যামার আসছে। দ্রুত কাজ এগিয়ে চলছে।

পিলার স্থাপনে জটিলতা প্রসঙ্গে তিনি সাংবাদিকদের বলেন, নদীতে এমনটি হতেই পারে। এজন্য পাইলের নকশা নয়, আকার ও সংখ্যায় পরিবর্তন হতে পারে। তবে রিভারওয়ার্কসের (নদী শাসন) ক্ষেত্রে কিছু সময় লাগতে পারে। আমি বলেছি আরও দেড় বছর সময় আছে। কাজ চলতে থাকুক। পরে বোঝা যাবে কী করণীয়। আবারও বলছি, সেতুর নির্মাণকাজের সময় বৃদ্ধির সিদ্ধান্ত হয়নি। এখনো আশা করি, নির্ধারিত সময়ে কাজ শেষ হবে।

এদিকে পদ্মাসেতুর প্যানেল অব এক্সপার্ট টিমের সভাপতি অধ্যাপক জামিলুর রেজা চৌধুরী সাংবাদিকদের বলেন, পদ্মাসেতুর ১৪টি পিলারের পাইলের সমস্যার কারণে পর্যালোচনা করা হচ্ছে। এতে পাইলের ডিজাইনে কিছুটা পরিবর্তন আসতে পারে। এক্ষেত্রে পাইলের দৈর্ঘ্য কমিয়ে সংখ্যা বাড়িয়ে দেওয়া হবে। লোড টেস্টে পাস হলে সেটি কার্যকর হবে। অন্যথায় বিকল্প অন্য পদ্ধতি অনুসরণ করতে হবে। এতে সেতুটি নির্মাণকাল ছয় মাস পিছিয়ে যেতে পারে।

সূত্রমতে, পদ্মাসেতুতে ৪২টি পিলার থাকবে। এর মধ্যে ৪০টিই নদীতে অবস্থিত। বিদ্যমান ডিজাইনে নদীর প্রতিটি পিলারের জন্য ৬টি করে পাইল নির্মাণ করতে হবে। নদীর গভীরতা ভেদে এগুলোর গভীরতা হবে ৩০০ থেকে ৪০০ ফুট। আর মাওয়া ও জাজিরায় অবস্থিত দুই পিলারে নদীর পারে পাইল হবে দুটি করে। পদ্মায় মোট ২৪০টি পাইল হবে। ১৪টি পিলারের নকশায় জটিলতা চলছে। পিলারগুলোর পাইলিংয়ের ৩৮০ থেকে ৪০০ ফুট গভীরতায় ধরা পড়েছে কাদার স্তর। লোড টেস্টে পাইল কাদার ভেতরে দেবে যেতে পারে। ফলে ওই স্থানে পাইলিং শেষ হলে তা সেতুর ভারবহন করতে পারবে না। তবে চূড়ান্ত হয়েছে অবশিষ্ট ২৮টি পিলারের সাইজ। এর মধ্যে ১৬টির কাজ চলছে। যদিও ভরা বর্ষার কারণে এখন মাঝ নদীতে কাজ করা সম্ভব নয়। এক্ষেত্রে সেপ্টেম্বরের মধ্যে পাইলগুলোর ডিজাইন চূড়ান্ত করা গেলে কাজ এগিয়ে নেওয়া যাবে।

সবচেয়ে বড় কথাÑ শুষ্ক মৌসুমের মধ্যে ওই ১৪ পিলারের পাইলগুলোর নকশা চূড়ান্ত না হলে সেতুর নির্মাণকাজ অনেক পিছিয়ে যাবে। এ বিষয়ে পদ্মা সেতুর প্যানেল অব এক্সপার্টের মতামত চাওয়া হয়। এজন্য কয়েক দফা বৈঠক করেও সিদ্ধান্ত নেওয়া যায়নি। ফলে পাইলিংয়ের ডিজাইন রিভিউ করতে পরামর্শক রেন্ডাল অ্যান্ড অ্যাসোসিয়েটসকে দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে। এর সমাধানে তিনটি বিকল্প নিয়ে পর্যালোচনা করা হচ্ছে। প্রথমত, ৪০০ ফুট পর্যন্ত গভীরে না গিয়ে ৩৫০ বা ৩৬০ ফুটে পাইল শেষ করা। এক্ষেত্রে প্রতিটি পিলারের জন্য ৬টির পরিবর্তে ৮টি পাইল নির্মাণ করা হতে পারে। তবে এ পদ্ধতিতে পাইল লোড টেস্টে ব্যর্থ হলে কাদার স্তর পেরিয়ে পাইলিংকে আরও গভীরে নিয়ে যাওয়া হবে। এতে পাইলের দৈর্ঘ্য অন্তত ৫৫০ ফুট পর্যন্ত গভীর করতে হবে। এতেও পাইলের নকশায় পরিবর্তন আনতে হবে। শেষ বিকল্প হিসেবে রাখা হয়েছে ৪০০ ফুট গভীরের কাদা টেনে তুলে ফেলে স্যান্ড পাইলিং (বালু দিয়ে ভরা) করা। এতে পাইলের দৈর্ঘ্য ৪০০ ফুট পর্যন্ত রাখলেই চলবে।

 

খোঁজ খবর নিয়ে জানা গেছে, পদ্মাসেতুর মূল অবকাঠামো নির্মাণে চুক্তি সই হয় ২০১৪ সালের জুনে। ওই বছর নভেম্বরে চুক্তিটি কার্যকর হয়। দুই বছর পেরিয়ে গেলেও আশানুরূপ অগ্রগতি হয়নি মূল সেতু নির্মাণে। একই অবস্থা নদী শাসন প্যাকেজেরও। ২০১৪ সালের নভেম্বরে চুক্তি সইয়ের পর ডিসেম্বরে তা কার্যকর হয়। এ প্যাকেজও লক্ষ্যমাত্রার চেয়ে অনেক পিছিয়ে। গত মে মাসে সেতু বিভাগে অনুষ্ঠিত পদ্মা সেতুর নির্মাণকাজের অগ্রগতি পর্যালোচনা বৈঠকে এ তথ্য উঠে আসে। সর্বশেষ খবর অনুযায়ী প্রকল্পের সার্বিক অগ্রগতি ৪৪ শতাংশ। গত জুন পর্যন্ত মূল সেতু নির্মাণের ভৌত-অগ্রগতি ৪০ শতাংশ, আর্থিক অগ্রগতি ৪৭.৪২ শতাংশ। আর নদী শাসনকাজের ভৌত অগ্রগতি ৩২.৫০ শতাংশ এবং আর্থিক অগ্রগতি ৩৩.৩৬ শতাংশ।

এদিকে পদ্মা সেতু প্রকল্পের ব্যবস্থাপনা পরামর্শক প্রতিবেদনে বলা হয়, কাজের অগ্রগতির সঠিক তথ্য দিচ্ছে না চীনের দুই ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান। এতে প্রকল্পটির তদারক কার্যক্রম বিঘিœত হচ্ছে। এ-সংক্রান্ত প্রতিবেদন জমা দেয় যুক্তরাজ্যের রেন্ডাল লিমিটেড অ্যান্ড অ্যাসোসিয়েটস। পদ্মা সেতু প্রকল্পটির প্রোগ্রাম ও অগ্রগতি পর্যবেক্ষণ করে এতে বলা হয়, উদ্বেগের বিষয় হলো মূল সেতু ও নদী শাসন উভয় অংশের ঠিকাদার অগ্রগতির তথ্য গ্রহণযোগ্য পদ্ধতিতে উত্থাপন করছে না। তারা কাজের অগ্রগতি অর্থের ভিত্তিতে দেখাচ্ছে, যার ভিত্তিতে চুক্তি মূল্য পরিশোধ করা হয়। যদিও কাজের অগ্রগতি বাস্তবিক অবস্থার পরিপ্রেক্ষিতে পরিমাপ করা হয়। এতে ঠিকাদারদের প্রতিবেদন কাজের অগ্রগতির সঠিক চিত্র প্রদর্শন করছে না। ফলে কাজের অগ্রগতির সঠিক অবস্থা জানা যাচ্ছে না।

প্রসঙ্গত, সেতুর মূল অবকাঠামোর কাজ করছে চায়না মেজর ব্রিজ ইঞ্জিনিয়ারিং কোম্পানি। আর নদী শাসনের কাজ করছে চীনের সিনোহাইড্রো করপোরেশন।

প্রকল্প সূত্র জানিয়েছে, জটিলতায় পড়া পিলারের মধ্যে ৭টি মাওয়ার কাছে এবং ৭টি জাজিরা প্রান্তের কাছে। এগুলো হলোÑ মাওয়ার কাছে ৬, ৭, ৮, ৯, ১০, ১১ ও ১২ এবং জাজিরার কাছে ২৬, ২৭, ২৯, ৩০, ৩১, ৩২ ও ৩৫ নং পিলার। পিলারগুলোর জন্য পানির জিরো ডিগ্রি থেকে ১১০ থেকে ১২০ মিটার গভীর পাইল করতে হবে। তবে পাইলিং করতে গিয়ে মাটির ৪০০ ফুট গভীরে কাদার স্তর ধরা পড়ে। ফলে ওই স্থানে পাইলিং শেষ হলে তা সেতুর ভার বহন করতে পারবে না। লোড টেস্টে পাইল কাদার ভেতরে দেবে যেতে পারে। বর্তমানে ৩৮নং পিলারের কাজ চলছে। আগামী দুই মাসের মধ্যে ৪২ পর্যন্ত ৬টি পিলার ঢালাই সম্পন্ন হতে পারে। এরপর পিলারগুলোর ওপর স্প্যান বসানো হয়। তবে পুরো সেতুর জন্য সব পিলারের নকশা চূড়ান্ত করতে না পারায় পিছিয়ে গেছে পদ্মা সেতুর নির্মাণকাজ। এভাবে চলতে থাকলে বর্তমান সরকারের আমলে পদ্মাসেতু উদ্বোধন করা কঠিন হয়ে যেতে পারে।”

7 বার নিউজটি শেয়ার হয়েছে
  • ফেইসবুক শেয়ার করুন