২ মিনিট আগের আপডেট সকাল ১১:২৪ ; বৃহস্পতিবার ; ফেব্রুয়ারি ২৭, ২০২০
EN Download App
Youtube google+ twitter facebook
×

পিরোজপুরের সন্তান মজিবুর রহমান ‘ড্রিল সাম্রাজ্যের মুকুটহীন সম্রাট’

অব: কর্নেল মোহাম্মদ আবদুল হক, পিএসসি
৭:৫৫ অপরাহ্ণ, জুন ২৬, ২০১৯

The deserving flowers of a great man ought to be given him when his eyes can see, ears can hear and heart can feel. This gives him the feeling of worth and appreciation for his contributions.

অব: কর্নেল মোহাম্মদ আবদুল হক, পিএসসি :: বাংলাদেশ সামরিক বাহিনীর এমন একজন বীর সেনানী, মুক্তিযোদ্ধা ব্যক্তিত্বকে তুলে ধরার চেষ্টা করব, যার অসাধারণ ও অনন্য অবদানের কথা দেশবাসী না জানলে হয়তো বাংলাদেশ মিলিটারি একাডেমি তথা সশস্ত্র বাহিনীর ড্রিল ও শৃঙ্খলা প্রশিক্ষণের ইতিহাস পূর্ণতা লাভ করবে না।

একজন সাধারণ মানুষকে সামরিক অফিসার হিসেবে রূপান্তর করতে হলে চাই তীক্ষè বুদ্ধিমত্তাসম্পন্ন, তেজস্বী, সাহসী, অভিজ্ঞ, নেতৃত্বের গুণাবলিসম্পন্ন মানুষ গড়ার কারিগর। মিলিটারি একাডেমিতে বাছাই করা উঠতি বয়সের ডানপিটে, মেধাবী, চৌকস; কিন্তু অতি সাধারণ তরুণ ছেলেমেয়েদের নির্বাচিত করা হয় সামরিক অফিসার হিসেবে গড়ে তোলার জন্য। সামরিক শিক্ষার প্রথম ধাপ ও অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা হলো- ‘শৃঙ্খলা’ ও ‘আনুগত্যপরায়ণতা’কে একজনের জীবনের প্রধান অবলম্বন হিসেবে গ্রহণ করা।

একটি বাহিনী কতটুকু সুশৃঙ্খল তা প্রমাণিত হয় ড্রিলের মাধ্যমে। সামরিক বাহিনীর প্যারেডের মূল প্রতিপাদ্য বিষয় হলো ড্রিল। এর দ্বারা একজন মানুষকে তার শারীরিক ও মানসিক কার্যক্রম সুসমন্বিতভাবে পরিচালনার প্রশিক্ষণ দিয়ে তাকে সুশৃঙ্খল করে গড়ে তোলা হয়। শারীরিক ও মানসিকভাবে প্রস্তুত করার সাথে সাথে আনুগত্যপরায়ণতাও জেগে ওঠে ক্যাডেটদের ধ্যানধারণায়। এতে সহজ হয় বৃহত্তর আঙ্গিকে প্রশিক্ষণ প্রদান করা। যারা এ প্রশিক্ষণ দেবেন তাদের হতে হবে কঠোর পরিশ্রমী, সুশৃঙ্খল, মেধাবী ও রুচিবোধসম্পন্ন। সামরিক বাহিনীর সদস্যদের অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ড্রিল প্রশিক্ষণ সব প্রতিষ্ঠান ও ইউনিটের জন্য বাধ্যতামূলক। বাংলাদেশ মিলিটারি একাডেমিতে (বিএমএ) জেন্টলম্যান ক্যাডেটদের জন্য ড্রিল সর্বাধিক গুরুত্বপূর্ণ প্রশিক্ষণ। ড্রিল প্রশিক্ষণে উত্তীর্ণ না হওয়া পর্যন্ত কোনো ক্যাডেটকে একাডেমি থেকে বের হওয়ার অনুমতি দেয়া হয় না। এ প্রশিক্ষণের ফলই বলে দেবে, কে কত সুশৃঙ্খল অফিসারে পরিণত হবে।

বাংলাদেশ মিলিটারি একাডেমি স্থাপিত হওয়ার সাথে সাথেই সর্বপ্রথম প্রয়োজন হয় সুদক্ষ ড্রিল প্রশিক্ষকের, যারা ক্যাডেটদের ড্রিলের মাধ্যমে প্রশিক্ষিত করে কমিশনড অফিসার হিসেবে গড়ে উঠতে সাহায্য করবেন। মহান আল্লাহ তায়ালা আমাদেরকে সব কিছু দিয়েই সাহায্য করেছেন। এ দেশকে স্বাধীনতার লাল সূর্য উপহার দিয়েছেন পাকিস্তান মিলিটারি একাডেমি থেকে প্রশিক্ষিত, অসাধারণ মেধাবী তরতাজা একদল সামরিক অফিসার, জেসিও, এনসিও ও সৈনিকেরা। তারা বঙ্গবন্ধুর আহ্বানে জীবনের মায়া ত্যাগ করে পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীর বিরুদ্ধে বিদ্রোহ ঘোষণা করে ঝাঁপিয়ে পড়েন দেশকে মুক্ত করার জন্য। সংগঠিত করে প্রশিক্ষিত করেন জনসাধারণকে মুক্তির লড়াইয়ে শামিল হতে।

তখন বাংলাদেশের নৌ ও বিমানবাহিনীর যাত্রা কেবল শুরু হয়েছে। সেনাবাহিনীর বিভিন্ন ইউনিটের, বিশেষ করে স্বাধীনতা যুদ্ধে নেতৃত্ব প্রদানকারী ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্টের ইউনিটগুলোর পদচারণা সর্বত্র। দু-একটি সাঁজোয়া ও গোলন্দাজ ইউনিটও সংগঠিত হওয়ার পথে। সেনাপ্রধান মেজর জেনারেল শফিউল্লাহ একটি ‘সুদক্ষ ড্রিল প্রশিক্ষক দল’ গঠন করার নির্দেশ দিলে ফার্স্ট বেঙ্গল ল্যান্সারের সবচেয়ে ভালোমানের সুদক্ষ ড্রিল প্রশিক্ষক সার্জেন্ট মো: মজিবুর রহমানের নেতৃত্বে চারজন সহকারীসহ একটি ‘ড্রিল স্কোয়াড’ গঠন করা হলো। তার দ্বারা ঢাকা সেনানিবাসে দু’টি ড্রিল কোর্স পরিচালিত হয়। পরবর্তীকালে তিনি নির্বাচিত হলেন বিএমএ’র ড্রিল প্রশিক্ষক হিসেবে এবং তিনিই সূচনা করেন মিলিটারি একাডেমির ড্রিল প্রশিক্ষণ। ১৯৭৬ সালে কুমিল্লা সেনানিবাস থেকে একাডেমি চট্টগ্রামের ভাটিয়ারিতে স্থানান্তর করা হলে তিনি নতুন স্থানে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখতে থাকেন।

মিলিটারি একাডেমিতে রিসালদার অ্যাডজুটেন্ট মজিবুর রহমান ছিলেন অসাধারণ। অত্যন্ত সুঠাম দেহ ও তীক্ষ্ণ দৃষ্টিশক্তির অধিকারী এ মানুষটি যখন প্যারেড গ্রাউন্ডে প্রবেশ করতেন, তার বুটের আওয়াজ বেজে উঠত। ‘চির উন্নত মমশির’ অঙ্কিত পাহাড়ে প্রতিধ্বনি হয়ে ফিরে আসত তার কমান্ডের শব্দগুলো। তিনি এত স্মরণশক্তিসম্পন্ন ছিলেন যে, বিএমএ’র প্যারেড গ্রাউন্ডে দাঁড়ানো শত শত ক্যাডেটের যে কাউকে নাম ধরে ডাকতে পারতেন। ফাঁকিবাজদের জন্য তিনি ছিলেন ‘যম’। বিশাল গ্রাউন্ডের এক প্রান্তে দাঁড়িয়ে তিনি ফাঁকিবাজদের নাম ধরে ডেকে বলতেন, ‘ফল আউট’। অপরদিকে, সিনসিয়ার ক্যাডেটদের প্রতি ছিলেন বন্ধুভাবাপন্ন। অসাধারণ অবদানের জন্য একাডেমি জুড়ে তার ব্যাপক পরিচিতি ছিল। তিনি ছিলেন সর্বমহলে গ্রহণযোগ্য ও সম্মানিত ব্যক্তিত্ব এবং ড্রিল প্রশিক্ষকদের প্রশিক্ষক ও মুকুটহীন সম্রাট; তিনি কিংবদন্তি ড্রিল প্রশিক্ষক হিসেবে হাজার হাজার অফিসারের মানসপটে ভেসে আছেন।

১৯৪০ সালের ৬ ডিসেম্বর বরিশাল বিভাগের পিরোজপুর জেলার মঠবাড়িয়া উপজেলার আমরীবুনিয়া গ্রামে সম্ভ্রান্ত এক মুসলিম পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন বীর মুক্তিযোদ্ধা অনারারি ক্যাপ্টেন মোহাম্মদ মজিবুর রহমান। তুষখালী মাধ্যমিক বিদ্যালয়ে দশম শ্রেণীতে অধ্যয়নরত অবস্থায় ১৯৫৯ সালের ৬ ডিসেম্বর পাকিস্তান সেনাবাহিনীর সাঁজোয়া কোরের ৩৮তম ব্যাচে যোগ দিয়ে আর্মাড কোর সেন্টার, নওশেরা, পেশোয়ারে রিক্রুট হিসেবে প্রশিক্ষণ গ্রহণ করেন। এ সেন্টারেই তিনি ড্রিল প্রশিক্ষণ গ্রহণ করে অসাধারণ কৃতিত্বের পরিচয় দেন এবং প্রশিক্ষক হিসেবে নিয়োগ লাভ করেন। পরবর্তীকালে ৩২ ক্যাভেলরি, শিয়ালকোটে বদলি হয়ে ড্রিল প্রশিক্ষকের দায়িত্ব পালন করেন। ১৯৬৫ সালের পাক-ভারত যুদ্ধে অসম সাহসী ভূমিকা পালন করে বীরত্বপূর্ণ সম্মান ‘তমঘায়ে জঙ্গ’ মেডেল অর্জন করেন।

১৯৭১ সালের জানুয়ারিতে বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হন। তিনি ছিলেন এক মেয়ে ও পাঁচ ছেলের জনক। ১৯৭১ সালে বঙ্গবন্ধুর আহ্বানে সাড়া দিয়ে আর ফিরে যাননি পশ্চিম পাকিস্তানে। মাতৃভূমিকে পরাধীনতার গ্লানি ও শৃঙ্খল থেকে মুক্ত করার লক্ষ্যে ঝাঁপিয়ে পড়েন মুক্তিযুদ্ধে। সেনাবাহিনীর দীর্ঘ ১১ বছরের প্রশিক্ষণ ও ১৯৬৫ সালের যুদ্ধের অভিজ্ঞতাকে কাজে লাগালেন মুক্তিযুদ্ধের সময়ে। ৯ নম্বর সেক্টরে মেজর মেহেদীর অধীনে সক্রিয়ভাবে সম্মুখযুদ্ধে অংশগ্রহণ করে স্বাধীনতা যুদ্ধের ইতিহাসে অনন্য ভূমিকা রাখেন। মুক্তিযুদ্ধে তিনি আহত হয়ে ওপরের মাড়ির একটি দাঁত হারিয়েছেন।

বর্ণাঢ্য সামরিক জীবনের অধিকারী মজিবুর রহমান স্বাধীনতার পরপর সেনাবাহিনীর সাঁজোয়া কোর সংগঠনে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখেন। বিভিন্ন সাঁজোয়া ইউনিটে নানা পদে দায়িত্ব পালন করেছেন এবং ড্রিল প্রশিক্ষক হিসেবে সব সাঁজোয়া ইউনিটের ড্রিলের মান অনেক উঁচু অবস্থানে নিয়ে গেছেন। বাংলাদেশের সব শৃঙ্খলাবাহিনীর ড্রিল প্রশিক্ষণে অনন্যসাধারণ অবদান রাখার মাধ্যমে উল্লেখযোগ্য দৃষ্টান্ত সৃষ্টি করেন। ১৯৭৩ সাল থেকে ১৯৯২ সাল পর্যন্ত বিভিন্ন সময়ে তিনি প্রথম থেকে অষ্টম বিএমএ শর্ট কোর্স, একটি গ্র্যাজুয়েট কোর্স এবং প্রথম থেকে আঠারো বিএমএ লং কোর্সের (মোট ২৭টি কোর্সের) অফিসারদের প্রশিক্ষক হিসেবে তাদের হৃদয়ে উচ্চমর্যাদার উচ্চ আসনে অধিষ্ঠিত হয়েছেন। মজিবুর রহমানের নেতৃত্বে বিমানবাহিনীর একটি, নৌবাহিনীর একটি, পুলিশের দু’টি, ম্যাজিস্ট্রেটদের দু’টি ড্রিল কোর্সও পরিচালিত হয়েছে।

১০. ১৯৮৬ সালের ৭ নভেম্বর তিনি রিসালদার মেজর, ২৬ মার্চ ১৯৯১ সালে অনারারি লেফটেন্যান্ট ও ১৬ ডিসেম্বর ১৯৯১ অনারারি ক্যাপ্টেন হিসেবে পদোন্নতি লাভ করেন। সেভেন হর্স ইউনিট, কুমিল্লা সেনানিবাস থেকে ১৯৯২ সালের ৬ মে অবসরে গেছেন। পাকিস্তান ও বাংলাদেশ সেনাবাহিনীতে দীর্ঘ ৩৪ বছর বর্ণাঢ্য চাকরি জীবনে তিনি বহু রাষ্ট্রীয় সম্মাননা, উপাধি ও পদকে ভূষিত হন। সেনাপ্রধান জেনারেল আজিজ আহমদ তাকে অনেক সম্মানের আসনে আসীন করেছেন। সাবেক সেনাপ্রধানরাও তাকে সম্মানিত করেছিলেন। তার সম্মানার্থে বগুড়া সেনানিবাসে আর্মার সেন্টার ও স্কুলে শহীদ লে. বদিউজ্জামান ড্রিল গ্রাউন্ডের দর্শক গ্যালারিকে ‘অনারারি ক্যাপ্টেন মজিব গ্যালারি’ হিসেবে নামকরণ করা হয়েছে, যা সেনাপ্রধান জেনারেল আজিজ আহমদ উদ্বোধন করেছেন। মহান আল্লাহ তায়ালার কাছে কায়মনোবাক্যে দোয়া করছি তার সুস্থতা ও দীর্ঘায়ু কামনা করে।

 

পিরোজপুর, ফোকাস

আপনার মতামত লিখুন :

  Attention Required! | Cloudflare

One more step

Please complete the security check to access nextzenbd.com

Why do I have to complete a CAPTCHA?

Completing the CAPTCHA proves you are a human and gives you temporary access to the web property.

What can I do to prevent this in the future?

If you are on a personal connection, like at home, you can run an anti-virus scan on your device to make sure it is not infected with malware.

If you are at an office or shared network, you can ask the network administrator to run a scan across the network looking for misconfigured or infected devices.

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : শাকিব বিপ্লব
ঠিকানা: শাহ মার্কেট (তৃতীয় তলা),
৩৫ হেমায়েত উদ্দিন (গির্জা মহল্লা) সড়ক, বরিশাল ৮২০০।
ফোন: ০৪৩১-৬৪৮০৭, মোবাইল: ০১৮৭৬৮৩৪৭৫৪
ই-মেইল: [email protected], [email protected]
© কপিরাইট বরিশালটাইমস ২০১২-২০১৮
টপ
  করোনাভাইরাস : ওমরাহ হজ নিষিদ্ধ করলো সৌদি  দিল্লি সহিংসতায় ‍নিহত ৩৪, ভয়াবহ আতঙ্কে মুসলিমরা  রাজধানীর ইস্কাটনে ভয়াবহ আগুন, নিহত ৩  ক্রিকেটার মিরাজের মিরপুরের বাসা থেকে ২৭ ভরি সোনা চুরি  পাপিয়াদের খুঁজে বের করার নির্দেশ প্রধানমন্ত্রীর  রক্তাক্ত দিল্লিতে নিহত বেড়ে ২৭, দাঙ্গা ছড়িয়ে পড়ছে আনাচে কানাচে  গোটা দেশের হোটেলে সুন্দরীদের নারীদের সাপ্লাই করতেন পাপিয়া!  ক্যান্সার আক্রান্ত বরগুনার মেধাবী তানিয়া বাঁচতে চান  তালাক দেওয়ায় স্ত্রীকে অপহরণের চেষ্টা, না পেয়ে শ্বশুরকে মারধর  ১১ অতিরিক্ত সচিব রদবদল