২৫শে এপ্রিল, ২০২৪ খ্রিস্টাব্দ, বৃহস্পতিবার

বরিশালে সাবেক সন্ত্রাসীরা ফের মাঠে, সাথে নবাগতরা চাচ্ছে চাঁদা

বরিশাল টাইমস রিপোর্ট

প্রকাশিত: ১০:৫১ অপরাহ্ণ, ২৮ জুলাই ২০২০

শাকিব বিপ্লব, বরিশাল:: বরিশালের সাবেক আলোচিত সন্ত্রাসীরা সামাজিক স্ট্যাটাস পরিবর্তন করলেও চারিত্রিক বৈশিষ্ট্য এখনও অভিন্ন রয়েছে। র‌্যাবের ক্রোসফায়ার আতঙ্কে স্বাভাবিক জীবনে ফের আসার কৌশলগত পদক্ষেপে জনপ্রতিনিধির তকমা লাগিয়ে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর চোঁখ অন্যদিকে ঘুরিয়ে শুরু করেছে বহুমখী অপকর্ম। এদের সাথে যুক্ত হয়েছে ছাত্রলীগ নামধারী নবাগত বেশ কয়েকজন সন্ত্রাসী। এলাকাভিত্তিক মাদক ব্যবসা নিয়ন্ত্রণের পাশাপাশি বরিশালের উন্নয়ন কাজে চাঁদা দাবি করায় প্রকল্প বাস্তবায়নের অন্তরায় হয়ে দাঁড়িয়েছে।
চাঁদা না দেয়ার কারণে বরিশাল শিল্প এলাকা বিসিকে চার ঠিকাদারকে নাস্তনাবুদ করার পর প্রায় ২৫ লক্ষ টাকার পাইপ লুট করে নিয়ে যায় বলে অভিযোগ পাওয়া গেছে। অন্যদিকে সরকারি বরিশাল কলেজের নাম পরিবর্তন নিয়ে চলমান আন্দোলনের পাল্টা পদক্ষেপে সেই সাবেক সন্ত্রাসীদের মধ্যেকার দুই জনকে অগ্রভাগে মূল ভুমিকায় থাকতে দেখা যাচ্ছে।
এদিকে কলেজের নাম পরিবর্তনের স্বপক্ষে আন্দোলনের নেতৃত্বদানকারী বাসদ নেত্রী মনিষা চক্রবর্তীর বিরুদ্ধে শুরু হয়েছে চক্রান্ত। পাল্টা আন্দোলন গড়ে তুলতে ব্যর্থ হওয়ার পর মনিষা চক্রবর্তীকে বাড়ি থেকে উচ্ছেদসহ তার দল বাসদের উদ্যোগে করোনা দুর্যোগে বিভিন্ন সামাজিক সহায়তা দিতে তাদের কার্যালয়ে দখল করে নিয়েছে। গত রোববার মনিষা চক্রবর্তী আহুত এক সংবাদ সম্মেলনে আনুষ্ঠানিকভাবে এই অভিযোগ তুলেছেন। বাস্তবতাও সে কথাই বলছে। সাবেক ও নবাগত সন্ত্রাসীদের ভুমিকার মধ্যে পার্থক্য হলো এখানেই যে, বিসিক উন্নয়ন কাজে চাঁদা আদায়ে ব্যবহৃত হচ্ছে নবাগতরা। অন্যদিকে সাবেক সন্ত্রাসীর রয়েছে কলেজের নাম পরিবর্তন নিয়ে বরিশাল উত্তপ্ত করার ক্রিয়াশীল কর্মকান্ডে।
একাধিক সূত্র অভিন্ন ভাষায় বলছে, বরিশালে ক্ষমতাসীন দলের শীর্ষ স্থানীয় একজন নেতার আশ্রয়ে তার ইচ্ছা-আঙ্খাকা পুরণে নির্দেশনায় এই দুটি কর্মকান্ডের সাথে দুই শ্রেণির সন্ত্রাসীরা যুক্ত হতে বাধ্য হয়েছে।
স্থানীয় প্রশাসন এবং আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীসহ বিভিন্ন গোয়েন্দা সংস্থা এই বিষয় অবাগত হলেও পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করছে বলে জানা গেছে। তবে বিসিক উন্নয়ন কাজে ঠিকাদারদের হুমকি ধামকি ও কাজে বাঁধা দেয়ার প্রেক্ষাপটে র‌্যাব-পুলিশ কিছুটা পদক্ষেপ নিলেও সন্ত্রাসীদের বিরুদ্ধে আইনী ব্যবস্থা নিচ্ছেন না বা নিতে পারছেন না। অবশ্য বরিশাল মেট্রোপলিটন পুলিশের শীর্ষ পর্যায়ের কর্মকর্তারা মিডিয়ার কাছে বলছেন, আনুষ্ঠানিক অভিযোগ বা মামলা না দেওয়ায় কাউকে আটক করা যাচ্ছে না। তবে বরিশালে চাঁদাবাজি চলবে না, এ ধরনের হুংকার দিলেও তা কাগুজেবাঘের ন্যায় পরিণত হয়েছে, তা সহজেই অনুমেয়।

উদাহরণস্বরুপ একটি ঘটনাই যথেষ্ট। বিসিকের ২০ কোটি টাকা ব্যয় সাপেক্ষে ৪ গ্রুপের কাজের মধ্যে রাস্তা নির্মাণে ভূমি উন্নয়নের জন্য কীর্তনখোলা নদী থেকে বালু উত্তোলনে ব্যবহারে আনা প্রায় ২৫ লক্ষ টাকার পাইপ তুলে নিয়ে যাওয়ার ঘটনায় পুলিশের বক্তব্য সন্তসজনক নয়। বিসিক ব্যবসায়ী সমিতির অভিযোগ কথিত ছাত্রলীগ নেতা রইজ আহম্মেদ মান্না ও অনিক এই পাইপ লুটপাট করে নিয়ে যায়। এ প্রসঙ্গে রইস আহম্মেদ মান্নার বক্তব্য হচ্ছে, সিটি মেয়রের নির্দেশেই এই পাইপ জব্দ করা হয়েছে। যা সিটি কর্পোরেশনে রাখা হয়েছে এবং পুলিশকে বিষয়টি অবহিত করেই এই পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছিল। তবে তিনি এই ঘটনার সাথে জড়িত নন বলে দাবি করেন। বিসিক সংশ্লিষ্ট কাউনিয়া থানা পুলিশের ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা আজিমুল করিম এই প্রতিবেদককে জানান, এ ধরণের বক্তব্য সঠিক নয়। পাইপ নিয়ে যাওয়া বা জব্দ করার হেতু কখনই পুলিশকে অবহিত করা হয়েনি। অবশেষে বিসিক শিল্প কমিটির নেতৃবৃন্দ ওই ঠিকদারের পক্ষ নিয়ে একটি গোয়েন্দা সংস্থার মাধ্যমে পাইপ ফিরে পেতে মধ্যস্তার আশ্রয় নেয়। শক্তিশালী ওই গোয়েন্দা সংস্থার বরিশালের শীর্ষ পদস্থ কর্মকর্তাকে নগর আ’লীগের জনৈক এক নেতা আশ^স্ত করেছিলেন যে, পাইপ শিগগিরই ফিরিয়ে দেওয়া হবে। কিন্তু প্রতিশ্রুতি দিয়ে কৌশলে সময় ক্ষেপন করার আশ্রয় নেওয়া হয়েছে বলে ধারনা পাওয়া গেছে।
একটি নির্ভরযোগ্য সূত্র জানায় ক্ষমতাসীন দলের শীর্ষ স্থানীয় ওই নেতা বিসিকের এই উন্নয়ন কাজের ঠিকাদারী কাজ নিজের অনুকূলে নিতে চেয়েছিলেন। কিন্তু ২০ কোটি টাকার চার গ্রুপের কাজ বাস্তবায়নকারী ঢাকার ৩ জন ও চট্টগ্রামের ১ একজন ঠিকাদার সেই প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করার পরই শুরু হয় বিসিকে তার ক্যাডার বাহিনীর উৎপাত। বিষয়টি নিয়ে বরিশাল প্রশাসনের সর্বস্তরের কর্মকর্তাদের কাছে নালিশ জানিয়েও কোন সুরাহা না পাওয়ায় ঠিকাদাররা এই প্রকল্প বাস্তবায়নে অস্বীকৃতি জানান। একপর্যায় বরাদ্দ অর্থ মন্ত্রণালয় ফিরে যাওয়া এবং রংপুরের একটি প্রকল্পের বরাদ্দ দেওয়ার আশঙ্কা দেখা দিলে বিসিক শিল্প এলাকার ব্যবসায়ী সমিতি নেতৃবৃন্দ নিজেদের স্বার্থেই এই প্রকল্পের কাজ বাস্তবায়নে অগ্রসর হয়। এবং চুক্তিভিত্তিক ও ঠিকাদারদের কাছ থেকে এ বিষয় আনুষ্ঠানিক সমঝোতার ভিত্তিতে কাজ বাস্তবায়নের উদ্যোগী হয়। এরপর শুরু হয় নতুন লড়াই।

অনুসন্ধানে পাওয়া যায়, ২০১৯ সালে তৎকালীন শিল্পমন্ত্রী আমির হোসেন আমু ভঙ্গুর বরিশাল শিল্প এলাকা বিসিক’র উন্নয়নে ৫২ কোটি টাকার একটি বরাদ্দ দেন। প্রকল্পের আওতায় ১০ হাজার ৫শ’ ফুট কার্পেটিং সড়ক, ১৭ হাজার ফুট ড্রেন, সীমানা প্রাচীরসহ পুকুর সংস্কার কাজ দ্রুত বাস্তবায়নের তাগিদ দেয় এবং টেন্ডার আহ্বান করে। প্রাথমিকভাবে এই চার গ্রুপের কাজের জন্য ২০ কোটি টাকা বরাদ্দ দেওয়া হয়। টেন্ডারে বাউন্ডারি ওয়াল নির্মাণে ঢাকার ডিওএইচএস মহাখালীর মজিদ সন্স কন্সেট্রাকশন লিমিটেড, ড্রেন নির্মাণে ঢাকার নিকেতন গুলশানের এসএম বিল্ডার্স এন্ড ইঞ্জিনিয়ারিং লিমিটেড, রাস্তা নির্মাণে ঢাকার সিদ্বেশরী সার্কুলার রোডের মেসার্স ইসলাম ব্রাদার্স ও ভূমি উন্নয়ন বাস্তবায়নে চট্টগ্রাম শহরের ইউনুস এন্ড ব্রাদার্স প্রাইভেট লি: এই চারটি ঠিকাদারী কোম্পানী প্রকল্প বাস্তবায়নে গত বছর অনুমোদন পায়।

ওই বছরের শুরুতে সিডিউল অনুযায়ী ঠিকাদারী প্রতিষ্ঠানসমূহের মধ্যে বালু ভরাটের জন্য ইউনুস এন্ড ব্রাদার্স কাজ শুরু করলে স্থানীয় ক্ষমতাসীন দলের শীর্ষ এক নেতা এ বিষয় পরোক্ষভাবে বিরোধীতা শুরু করেন। একটি কালভার্ট ভেঙে কাজ শুরুর খবর পেয়ে তার অনুসারী কথিত ছাত্রলীগ নেতা রইজ আহম্মেদ মান্না ও অনিক সেরনিয়াবাতসহ প্রায় ২০-২৫ জন ক্যাডার বাহিনী মোটরসাইকেলযোগে এসে কাজ বন্ধ করে তাদের নেতার সাথে যোগাযোগ করার নির্দেশ দেন।

প্রদক্ষদর্শীরা জানান, এরপর প্রতিদিনই মান্নার নেতৃত্বে মোটরসাইকেল মহড়া দিয়ে বিসিকের ভিতরে আতঙ্ক সৃষ্টি করায় ওই ঠিকাদারী প্রতিষ্ঠান কাজ বন্ধ করে দিতে বাধ্য হয়। পরবর্তীতে চলতি বছরের এপ্রিল মাসে তাদের পক্ষে মাদারীপুরের একজন ঠিকাদার কীর্তনখোলা থেকে বালু উত্তোলন করে বিসিক পর্যন্ত নিয়ে আসতে ব্যবহারের জন্য প্রায় ২৫ লক্ষ টাকার পাইপ আমদানী করে। বিসিক বেঙ্গল বিস্কুট ফ্যাক্টুরীর সামনে রাখা ওই পাইপ কোন এক রাতে মান্না ও অনিকের উপস্থিতে দুটি ট্রাকে তুলে নিয়ে যায়। সেই পাইপ মান্না নিজের একটি ঠিকাদারী কাজে ব্যবহার করছে বলে বিসিকের বেশ কয়েকজন ব্যবসায়ী এই তথ্য দেন। এই অভিযোগ সম্পর্কে মান্নার সাথে যোগাযোগ করা হলে তিনি এই প্রতিবেদককে জানান, অনিকের সাথে তার জোটবদ্ধ হয়ে পাইপ তুলে নিয়ে যাওয়ার অভিযোগ সঠিক নয়। তবে সিটি কর্পোরেশনের আড়াই পদে দায়িত্বশীল অনিক মেয়র সেরনিয়াবাত সাদিক আবদুল্লাহর নির্দেশে পাইপগুলো জব্দ করে কর্পোরেশন রেখেছে বলে তিনি জানান। কিন্তু সিটি কর্পোরেশনের নির্বাহী কর্মকর্তা (সিও) ইসরাইল হোসেন বিসিক উন্নয়ন কাজের ড্রেজার পাইপ জব্দ করার এখতিয়ার এ দপ্তরের রয়েছে কী না সে বিষয়ে তিনি মন্তব্য করতে নারাজ। আবার জব্দ পাইপ সিটি কর্পোরেশনে রাখা হয়েছে কী না সেই সম্পর্কেও তিনি অবগত নন মতপ্রকাশ করেন।

তবে মজার বিষয় হচ্ছে, এখানেও কৌশল রয়েছে। ছাত্রলীগ নেতা অনিকের নাম ঘুরিয়ে চাপিয়ে দেওয়া হয়েছে আরেক অনিকের ওপর। কারণ ছাত্রলীগের নেতৃত্ব নিয়ে মান্না ও অনিকের মধ্যে দীর্ঘদিন ধরে লড়াই চলছে। কিন্তু ওই নেতার নির্দেশে পাইপ নিয়ে যাওয়ার আর্দেশ বাস্তবায়নে তারা একত্রিত হয়েছিল তা প্রকাশ করতে না চাওয়ায় সিটি কর্পোরেশনের আড়াই অনিকের নামটি সামনে আনা হয়েছে। কি কারণে পাইপ জব্দ করা হলো এমন প্রশ্নে মান্নার উত্তর হচ্ছে, শহরের ওপর থেকে ড্রেজারের পাইপ টানার ক্ষেত্রে সিটি কর্পোরেশনের অনুমোদন জরুরি, কিন্তু সেটা নেওয়া হয়নি।

মন্ত্রণালয়ের একটি সূত্র বলছে, বিসিকের সাথে সিটি কর্পোরেশনের কোন সম্পৃক্ততা নেই। এটি আলাদা সেক্টর, যেটির নিয়ন্ত্রণ করে মন্ত্রণালয়। অথচ শিল্প এলাকার এই উন্নয়ন প্রকল্প সরকারের উচ্চমহলের তত্ত্বাবাধনে হওয়ার বিষয়টি ক্ষমতার জোরে এক্ষেত্রে আমলে আনা হয়নি।

ঠিকাদারদের একটি সূত্র জানায়, পরিস্থিতিগত কারণে বরিশালের বাইরের ঠিকাদারা এই প্রকল্প বাস্তবায়নে অস্বীকৃতি জানালে সময় ক্ষেপনের কারণে বরাদ্দ অর্থ ফিরে যাওয়ার আশঙ্কায় বিসিক ব্যবসায়ী সমিতির নেতৃবৃন্দ এক বৈঠকে উন্নয়ন প্রকল্প বাস্তবায়নে ঠিকাদারী কাজ নিজেদের তত্ত্বাবধানে করার সিদ্ধান্ত নেয়। যদিও এ নিয়ে ব্যবসায়ী সমিতির মধ্যে বিভাজন রয়েছে বলে আলামত পাওয়া গেছে। তদুপরি কমিটির শীর্ষ সারির নেতারা কাজ শুরুর উদ্যোগ নিলে আবারও আসে বাঁধা এবং হুমকি।

নির্ভরযোগ্য একটি সূত্র জানায়, ব্যবসায়ী সমিতির নেতৃবৃন্দ জেলা আ’লীগের এক নেতার মাধ্যমে ক্ষমতার কেন্দ্রবিন্দুতে থাকা ওই নেতার সাথে একটি সমঝোতায় যায় এবং করোনা দুর্যোগে তার দেয়া ত্রাণ বিতরণ কাজে সহায়তাস্বরূপ ৫০ লক্ষ টাকা অনুদান দেয়। একজন ব্যবসায়ীর সহদর ওই টাকা কোন একটি দপ্তরে দিয়ে আসেন, এ ধরনের প্রমাণ এই প্রতিবেদকের কাছে রয়েছে। কিন্তু তাতেও তার মন গলেনি। দাবি তুলেছে আরও মোটা অংকের অর্থ দিতে হবে। কিন্তু ব্যবসায়ী নেতৃবৃন্দ এই প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করে র‌্যাব-পুলিশের সহায়তা চায়।

সরেজমিন ঘুরে প্রকল্পের কাজের অংশবিশেষ ড্রেন নির্মাণ কাজ চলছে দেখা যায়। সেখানে পাহাড়া দিচ্ছে র‌্যাব-পুলিশ। কিন্তু যখন আইনশৃঙ্খলা বাহিনী সেখানে অনুপস্থিতি থাকছে তখনই সেই ক্যাডার বাহিনী মোটরসইকেল মহড়া দিয়ে কাঁপিয়ে তুলছে শিল্প এলাকা। ব্যবসায়ী সমিতি তাদের স্বার্থগত বিষয় হওয়ায় অন্যান্য ব্যবসায়ীদের একত্রিত করতে সক্ষম হওয়ায় এখন কাজ বন্ধ করতে না পারায় বিভিন্ন মিডিয়ার মাধ্যমে সেখানে উন্নয়ন কাজে অনিয়ম হচ্ছে, এমন শিরোনাম দিয়ে ফলাও করে সংবাদ প্রকাশের কৌশল নেওয়া হয়েছে। যাতে প্রকল্প নিয়ে বিতর্কে কাজ স্থগিতে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়কে নাড়িয়ে তোলা যায়। অবশ্য এ কথা সত্য যে পরিত্ত্যক্ত ইট ড্রেন ও সড়ক নির্মাণকাজে ব্যবহার করায় কিছুটা বিতর্কের সৃষ্টি হয়েছে। এ কথা স্বীকার করে বিসিক ব্যবসায়ী মালিক সমিতির সভাপতি ও ফরচুন সু-কোম্পানির ব্যবস্থাপনা পরিচালক মিজানুর রহমান জানান, তার অনপুস্থিতিতে শুরুতে এ ধরনের কাজ ঘটেছে বটে। কিন্তু বিষয়টি তিনি দেখবেন বলে সংবাদমাধ্যমকে আশ্বস্ত করেন।

জানা গেছে, আক্রোশের সূত্র ধরে ইতিপূর্বে বিসিকের ট্যাক্স বৃদ্ধি করেছিল সিটি কর্পোরেশন। হাইকোর্টে তা ধোপে টেকেনি। কারণ শিল্প এলাকা সিটি কর্পোরেশনের অন্তর্ভুক্ত নয়। এরমধ্যে বিসিক প্রকল্প কর্মকর্তা খাইরুল বাশারকে বরিশাল থেকে প্রত্যাহার করার চিঠি এসে বলে যানা গেছে। ব্যবসায়ীদের অভিমত, এই প্রকল্প কর্মকর্তাও ওই নেতার আর্দেশ মানতে নারাজ হওয়ায় তাকে সরিয়ে দিতে ঢাকায় জোর তদবির করে সফল হয়েছে। অপর একজন বিশিষ্ট ব্যবসায়ী জানান, শিল্প এলাকার উন্নয়ন প্রকল্প বাস্তবায়নে অগ্রণী ভুমিকায় থাকায় তিনি এখন চাপের মুখে রয়েছেন। নিরাপত্তা প্রোটেকশন নিয়ে তাকে চলতে হচ্ছে। কেন আইনের আশ্রয় অর্থাৎ মামলা করা হচ্ছে না এমন প্রশ্নের প্রতিত্তোর হচ্ছে কৌশলগত কারণে বা আক্রোশের হাত থেকে রক্ষা পেতেই তারা এই পদক্ষেপ নিতে আপাতত নারাজ।

তবে অপর একটি সূত্র বলছে, আইনশৃঙ্খলা বাহিনী ও গোয়েন্দা সংস্থা ও নেতার কর্মকান্ড এবং উন্নয়ন প্রকল্পে নানাভাবে অন্তরায় সৃষ্টি করার বিষয়টি সরকারের উচ্চমহলকে অবহিত করেছে। পাশাপাশি কৌশলে নিরপত্তা দিয়ে প্রকল্পের কাজ চালিয়ে যাওয়ার সুযোগ করে দিতে চায়। এদিকে একটি সরকারি কলেজের নাম পরিবর্তন নিয়েও ওই নেতার গাত্রদাহ’র কারণে বরিশাল নগরী উত্তপ্ত হয়েছে উঠেছে, গুঞ্জন চলছে। সাংস্কৃতিক ও সামাজিক একটি মহল সরকারি বরিশাল কলেজের নাম পরিবর্তন করে শিক্ষানুরাগী অশি^নী কুমার দত্তের নামকরণে সক্রিয় হলে জেলা প্রশাসক তা প্রস্তাব আঁকারে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয় বিষয়টি অনুমোদনের জন্য উপস্থাপন করেন।

সূত্র জানায়, জেলা প্রশাসক এসএম অজিয়র রহমানের সাথে ওই নেতার দীর্ঘদিন ধরে শীতল লড়াই চলছিল। কলেজের নাম পরিবর্তনে তিনি প্রস্তাব রাখায় বিরোধীতার আলোকে শীর্ষ ওই নেতা পর্দার অন্তরালে থেকে নাম পরিবর্তনের প্রতিবাদস্বরূপ আন্দোলন গড়ে তুলতে সার্বিক সহায়তা দিচ্ছেন। ওই নেতার আস্তাভাজন সাবেক দুর্ধর্ষ সন্ত্রাসী ও বর্তমানে নগরীর পশ্চিমাঞ্চলের কাউন্সিলর হিসেবে সমীহের পাত্র যুব বয়সি নেতার নেতৃত্বে নাম পরিবর্তনের বিরোধীতায় জেলা প্রশাসকের কাছে স্মারকলিপি দেওয়ার পরই তাদের গোপন পরিকল্পনা প্রকাশ পায়। পরবর্তীতে আরেক সাবেক সন্ত্রাসী যিনি কাউনিয়া এলাকার কাউন্সিলর এবং সিটি কর্পোরেশনে দাপটের সাথে রয়েছেন তাকেও নাম অপরিবর্তিত রাখার আন্দোলনের নেতৃত্বের অগ্রভাগে দেখা যাচ্ছে। পক্ষান্তরে কলেজের নাম পরিবর্তনের স্বপক্ষে আন্দোলন গড়ে তুলতে অগ্রণী ভূমিকায় থাকা বাসদ নেত্রী মনিষা চক্রবর্তী মাঠে নামলে ওই নেতা আরও ক্ষুব্ধ হয়ে উঠেন বলে আভাস পাওয়া যায়। চাউর রয়েছে, স্থানীয় রাজনীতিতে বেশকিছু কারণে মনিষাকে ওই নেতা কোনভাবেই মানতে পারছেন না। আবার সেই নেত্রী কলেজের নাম পরিবর্তনের আন্দোলন বেগবান করে তোলার বিষয়টি তিনি ভালো চোখে নেননি। অবশ্য ওই কলেজের নাম পরিবর্তন নিয়ে রয়েছে তুমুল বিতর্ক। সর্বশেষ জানা গেছে, করোনা দুর্যোগের শুরু থেকে বাসদের পক্ষে মনিষা চক্রবর্তী উদ্যোগী হয়ে বিভিন্ন সহায়তামূলক কর্মকান্ড পরিচালনা করতে তাদের যে দলীয় কার্যালয় ব্যবহার করতেন তা গত রোববার কৌশলী পদক্ষেপ রেখে বন্ধ করতে শুরু করেন নতুন এক ষড়যন্ত্র। একপর্যায়ে সেখানে প্রবেশদ্বার বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে।

সূত্র জানায়, বাসদের ওই কার্যালয়টি প্রয়াত মুক্তিযোদ্ধা হাসান ইমামের পরিবারের কাছ থেকে বরিশাল সিটি কলেজের অক্ষ্যক্ষ সুজিত কুমার চুক্তিতে ভাড়া নেন। বিগত সময়ে তিনি রাজনৈতিক দল বাসদের কার্যক্রম পরিচালনার জন্য একাংশ ভাড়া দেন। সেই সুজিত কুমারকে ওই আ’লীগ নেতা ব্যবহার করায় তিনি এখন বাসদের বিপক্ষে অবস্থান নিয়ে এখন বলছেন সেখানে রাজনৈতিক কর্মকান্ড পরিচালনা করা যাবে না। অথচ কদিন আগেও এই সুজিত কুমার করোনা নিয়ে সামাজিক আন্দোলন ও সহায়তায় সমর্থন দিতে দেখা গেছে।

অনুসন্ধানে নিশ্চিত হওয়া গেছে, নগরীর ফকিরবাড়ি সড়কের ওই ভবনটির মালিকপক্ষের ভাষ্য, সেখানে বাসদ কার্যালয় নিয়ে তাদের কোন আপত্তি নেই। তাছাড়া অধ্যক্ষ সুজিত কুমারের ভাড়া চুক্তি মেয়াদোত্তীর্ণ হয়ে গেছে। সুতরাং তার বাঁধা দেয়ার এখতিয়ার নেই। প্রসঙ্গত কারণে এই বিষয়ে সিটি কলেজ অধ্যক্ষের এ প্রতিবেদকের আলাপকালে তিনি দাবি করেন, চুক্তির মেয়াদোত্তীর্ণের তথ্যটি অমুলক। বরং বিভ্রান্তি ছড়ানো হচ্ছে। তার ভাষায় বাসদকে সামাজিক উন্নয়নকাজে ওই স্থানটি ব্যবহারে মৌখিক অনুমোদন দেওয়া হয়েছিল। কিন্তু সেখানকার নানান উপকরণ বিনষ্ট করায় তিনি বাসদ নেতৃবৃন্দকে প্রথমে অনুরোধ রাখেন। পরে পরিস্থিতি ঘোলাটে হয়ে ওঠায় থানায় একটি সাধারণ ডায়েরি করেন। এক্ষেত্রে কোন রাজনৈতিকের দ্বারা প্রভাবিত হওয়ার কোন অবকাশ নেই। কিন্তু এই ব্যক্তব্যের বিপরিতে মনিষা ভাষ্য, সুজিত কুমার এখন নাটকের একটি পর্বে নায়কের ভুমিকায় অবতীর্ণ হয়েছে।

এই দুইটি ঘটনায় প্রমাণ করে বরিশালে উন্নয়ন কর্মকান্ডের অন্তরায় হয়ে দাঁড়িয়েছে খোদ ক্ষমতাসীন দলের একটি অংশ। সেক্ষেত্রে এক নেতার একক ইচ্ছায় প্রাধান্য দিতে বাধ্য হচ্ছে, তার অনুকূলের অপরাপর দলীয় নেতারা। তারাও অখুশী এই নেতার ক্যাডারভিত্তিক রাজনীতি ও চাঁদাবাজির ঘটনা প্রবাহে। কিন্তু কেউ কোন মন্তব্য করতে নারাজ।’

7 বার নিউজটি শেয়ার হয়েছে
  • ফেইসবুক শেয়ার করুন