২২শে এপ্রিল, ২০২৪ খ্রিস্টাব্দ, সোমবার

বরিশাল পুলিশের সাথে প্রতারক চক্রের এত সখ্যতা?

বরিশাল টাইমস রিপোর্ট

প্রকাশিত: ০৫:১৩ অপরাহ্ণ, ৩০ জুলাই ২০২০

নিজস্ব প্রতিবেদক, বরিশাল:: পাবনা থেকে আমদানি প্রায় তিন লক্ষ টাকার মুরগি আত্মসাতের লক্ষে প্রতারণার আশ্রয় নিয়ে একটি চক্র ধরা খাওয়ার পর বরিশাল পুলিশ তাদের রক্ষায় এক নাটকীয় ঘটনার জন্ম দিয়েছে। মুরগির মূল মালিক পুলিশের অসহযোগিতার একপর্যায়ে নিজেই সমুদ্বয় চালান উদ্ধার করেন। কিন্তু এ ঘটনায় মামলা করা হলেও দুই প্রতারককে পুলিশ গ্রেপ্তার না করে উল্টো পাবনার ব্যবসায়ীর সাথে সমঝোতার ক্ষেত্রফল তৈরি করে। এবং মুরগি মালিক পাবনার রেজাউল ইসলামকে প্রাপ্ত টাকা বুঝিয়ে দিয়ে মামলাটি প্রত্যাহার করে নেওয়ার চাপ দিয়ে স্বাক্ষর নেয়। রেজাউল কৌশলে বরিশাল ছেড়ে নিজ এলাকা পাবনায় এখন এ বিষয়ে আইনের আশ্রয় নেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন বলে তিনি জানিয়েছেন।

অনুসন্ধানে জানা গেছে, মুরগি আমদানির নামে আত্মসাত চেষ্টার সাথে জড়িত জালাল ও বাদল প্রকৃত অর্থেই প্রতারক চক্র গড়ে তুলেছেন। বিভিন্ন ব্যক্তির নামে মুরগির অর্ডার দিয়ে বরিশালে নিয়ে এসে টাকা না দিয়ে আত্মসাত করে। তাদের এই প্রক্রিয়া বড়ই নাটকীয়তাপূর্ণ। সংশ্লিষ্ট বিমানবন্দর থানা পুলিশ বিষয়টি নিশ্চিত হলেও এখন তাদের পক্ষে অবস্থান নিয়েছে অর্থনৈতিক সমঝোতার বুনিয়াদে। অভিযোগ পাওয়া গেছে- পাবনার ওই ব্যবসায়ীর করা মামলাটি প্রত্যাহারে প্রতারক চক্রের কাছ থেকে ৫০ হাজার টাকা পুলিশ প্রাথমিকভাবে গ্রহণ করে। এই প্রতারণা মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তা উপ-পরিদর্শক (এসআই) ইলিয়াস গোটা ঘটনার ধামাচাপা দেওয়ার মূল নায়ক ভুমিকা রেখে থানার ওসিকে ম্যানেজ করে প্রতারকদের রক্ষায় কৌশল নেন। বিষয়টি ফাঁস হয়ে গেলে এই প্রতিবেদক এসআই ইলিয়াসের সাথে প্রাসঙ্গিক এ অভিযোগ সংক্রান্তে জানতে চাইলে তিনি ক্ষুব্ধ হয়ে ওঠেন এবং মামলার আসামীদের অনপুস্থিতিতে কিভাবে বাদীর সাথে আপসরফার নথি তৈরি করলেন তার ব্যাখ্যা দিতে গিয়ে একটি আইনী যুক্তি দাঁড় করান। বিপরিতে বরিশাল মেট্রোপলিটন পুলিশের উপ-পুলিশ কমিশনার (ডিসি/উত্তর) খাইরুল আলম তার সহকর্মী ইলিয়াসের এই ব্যাখ্যা এবং প্রতারক চক্রের সাথে পুলিশের সখ্যতার বিষয়টি সম্পর্কে জেনে বিস্মিত হন। উচ্চপদস্থ কর্মকর্তার কান পর্যন্ত ঘটনা গড়ালে এই বিষয় নিয়ে বিমানবন্দর পুলিশ পড়েছে বিপাকে।

জানা গেছে, প্রতারক জালাল ও বাদল বরিশাল শহরের রুপাতলী এলাকার মুরগি ব্যবসায়ী হিসেবে পরিচিত। গত বৃহস্পতিবার দুই ব্যক্তি নিজেদের পরিচয় আড়াল রেখে এদের একজন নিজেকে সিরাজ নামে পরিচয় দিয়ে সেলফোনের মাধ্যমে পাবনার বৃহৎ ব্যবসায়ী রেজাউলের কাছে ৫৬০টি মুরগি অর্ডার করে। চুক্তিস্বরুপ পণ্য বরিশালে আসার পর অর্থ পরিশোধের কথা ছিল। আলোচনা সাপেক্ষে রেজাউল একটি ট্রাকে করে ২ লাখ ৭০ হাজার টাকার মুরগি বরিশালের উদ্দেশে নিয়ে আসেন। পথিমধ্যে শুক্রবার ভোর রাতে বরিশাল নগরীর প্রবেশদ্বার গড়িয়ারপাড়ে মুরগিভর্তি ট্রাকটি পৌঁছালে কোন এক ব্যক্তি নিজেকে সিরাজ পরিচয় দিয়ে রেজাউলের সাথে ফোনের মাধ্যমে যোগাযোগ করে ট্রাকটির গতিরোধ করে। এবং অন্য একটি ট্রাকে মুরগিগুলো তুলে নিয়ে যায়।

পাবনার ওই ব্যবসায়ী এ প্রতিবেদককে জানান, বরিশাল নগরীতে বহিরাগত ট্রাক প্রবেশ করলে ট্রাফিক বিভাগ প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করতে পারে এমন ধুয়া তুলে বাদল ও জামালের পরিকল্পনা অনুযায়ী তাদের ট্রাকে মুরগিগুলো তুলে নিয়ে তাকে দাঁড় করিয়ে রেখে দ্রুত নিরুদ্দেশ হয়ে যায়। মূলত সিরাজকে না চেনায় বুঝে উঠতে পারেননি তিনি প্রতারণার শিকার হতে যাচ্ছেন। প্রতারণার বিষয়টি নিশ্চিত হলে এই অঞ্চলে তার কাছ থেকে মুরগি আমদামিকারী বেশ কয়েকজনের কাছে এ ঘটনা তুলে ধরে মুরগির সন্ধান শুরু করে। পাশাপাশি ঘটনা সংশ্লিষ্ট বিমানবন্দর থানায় একটি মামলা করেন। কিন্তু বিষয়টি আমলে না নিয়ে তাকে অসহযোগিতা শুরু করে। ঘটনাচক্রে রেজাউল জানতে পারেন তার মুরগির চালান রুপাতলীর দুই ব্যবসায়ীর কাছে রয়েছে। পরক্ষণে একদিনের মাথায় শনিবার ঘটনাস্থলে গিয়ে তিনি সমুদ্বয় মুরগি শনাক্ত করেন এবং বাদল-জালাল প্রতারক সে বিষয়ে ধারনা পেয়ে যান। তাৎক্ষণিক তিনি থানা পুলিশকে তার পণ্য উদ্ধারে সহায়তা চায়।

পুলিশ ঘটনাস্থলে গেলে বাদল-জালাল বিষয়টি ঘুরিয়ে সেই কথিত সিরাজের কাছ থেকে ক্রয় করার কথা জানান। কিন্তু বেআইনী এবং চুরির অপরাধের আওতায় পড়ায় কৌশলী মুরগির অর্থ পরিশোধে সম্মতি দিয়ে পরিস্থিতি সামাল দেয়। অবশ্য ব্যবসায়ী রেজাউল বরিশালের এই দুই ব্যবসায়ী কৌশল আঁচ করতে পারলেও অর্থ উদ্ধারের আশায় বিষয়টি নিয়ে বাড়াবাড়ি করেননি। কিন্তু প্রশ্ন উঠেছিল চোরাই পণ্য রাখার দায়ে কেন বাদল-জালালকে আটক করা হলো না। এই রহস্য ভেদের মাঝেই পুলিশের মধ্যস্ততায় দুই লাখ ৩০ হাজার টাকা রেজাউলকে দেওয়ার পর মামলাটি প্রত্যাহারে তাকে চাপ দিলে প্রকাশ এই প্রতারক চক্রের সাথে পুলিশের আগেভাগেই সমঝোতা হয়েছে। অর্থাৎ পুলিশ মামলা তদন্ত গিয়ে প্রতারক চক্রের সন্ধান পেয়েও নিরব ছিল।

বিস্ময়কর বিষয় হলো বিমানবন্দর থানায় বসে রেজাউলকে মুরগির সমুদ্বয় অর্থ পরিশোধ করা হলেও মামলায় অভিযুক্ত কথিত সেই সিরাজকে সামনে আনা হয়নি। তাকে অন্তরালেই রাখা হয়েছে। পরে এসআই ইলিয়াস মামলাটি প্রত্যাহার করে দেওয়ার চাপ দিয়ে ব্যবসায়ী রেজাউলের কাছ থেকে একটি স্বাক্ষর নেন। এবং সেই দৃশ্য ভিডিও ধারণ করে রাখেন। থানায় বসে এই আনুষ্ঠানিকতা ওসি জাহিদ বিন আলম প্রত্যক্ষ করলেও তিনি সমঝোতার নির্দেশ দিয়ে দুরত্ব বজায় রাখেন।

পুলিশের একটি সূত্র জানায়, কথিত প্রতারক সিরাজের কোন অস্থিত্ব নেই। মূলত বাদল ও জালালই সিরাজ নামটি ব্যবহার করেছে প্রতারণার কৌশলস্বরুপ। থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা ও মামলা তদন্তকারী অফিসার ইলিয়াস বিষয়টি নিশ্চিত হওয়ায়ার পরেও বাদল-জালালের সাথে সমঝোতাস্বরুপ মামলাটি প্রত্যাহারের সন্ধিচুক্তি করেন। সেক্ষেত্রে ৫০ হাজার টাকা লেনদেনের আলামত পাওয়া গেছে। মামলার আসামি পাওয়া সত্ত্বেও তাদের গ্রেপ্তার না করে সমঝোতার নাটক তৈরি করায় প্রমাণিত হয় বরিশাল পুলিশের সাথে এ ধরনের প্রতারক চক্রের সখ্যতা রয়েছে, নচেৎ এত বড় ধরনের ঘটনা চেপে যাওয়ার মানে কী?

এমন প্রশ্ন এসআই ইলিয়াসের কাছে তোলা হলে তিনি বিষয়টি এড়িয়ে যেতে নানা যুক্তি খাড়া করার চেষ্টা করেন। সেক্ষেত্রে ওসিও তাকে সমর্থন দেন। কিন্তু মেট্রোপলিটন পুলিশের উপ-পুলিশ কমিশনার খাইরুল আলম বলেন- এ ধরনের আপসের কোন সুযোগ নেই। তিনি বিষয়টি তদন্তপূর্বক ব্যবস্থা গ্রহণের আশ্বাস দেন।

সর্বশেষ বিভিন্ন মাধ্যমে জানা গেছে- এই ঘটনা পুলিশের উর্ধ্বতন কর্মকর্তাসহ মিডিয়াকর্মীরা অবগত হওয়ায় বিমানবন্দর থানা ওসি-এসআই ইলিয়াসের ঘুম হারাম হয়ে গেছে। এখন বিষয়টি ভিন্ন দিকে নিয়ে যেতে সেই রেজাউলকে সহায়তা দেওয়ার নতুন প্রতিশ্রুতি দিয়ে পাবনায় যোগাযোগ শুরু করেছে। কিন্তু ব্যবসায়ী রেজাউল বরিশালে নাজেহাল ও পুলিশের অসহযোগিতাপূর্ণ আচারণের কারণে তার নিজ এলাকার আদালতে আশ্রয় নিতে যাচ্ছেন বলে জানিয়েছেন। সেক্ষেত্রে বিমানবন্দর থানা পুলিশও মামলা মোকাদ্দমায় জড়িয়ে যেতে পারে, এমনটি আভাস পাওয়া গেছে।’

4 বার নিউজটি শেয়ার হয়েছে
  • ফেইসবুক শেয়ার করুন