৮ ঘণ্টা আগের আপডেট সকাল ১১:৪৬ ; শনিবার ; ডিসেম্বর ১০, ২০২২
EN Download App
Youtube google+ twitter facebook
×

বাঁশের মাথায় ওড়ে আসাদের রক্তমাখা শার্টের লাল ঝান্ডা

বরিশাল টাইমস রিপোর্ট
৮:৪১ অপরাহ্ণ, জানুয়ারি ১৯, ২০২২

বাঁশের মাথায় ওড়ে আসাদের রক্তমাখা শার্টের লাল ঝান্ডা

আহমেদ জালাল  >> “ওসমান প্রথমে তাকায় উত্তরে। কালো কালো হাজার হাজার মাথা এগিয়ে আসছে অখ স্রোতধারার মতো। এই বিপুল স্রোতের মধ্যে ঘাইমারা রুই-কাতলার ঝাঁক নিয়ে গর্জন করতে করতে এগিয়ে আসছে কোটি ঢেউয়ের দল।… উত্তর থেকে আসে বরফ-গলা শহরের স্রোত, উপচে উঠে মানুষ গড়িয়ে পড়ছে পাশের গলিতে-উপগলিতে। …দক্ষিণে বুড়িগঙ্গা। ওসমানের বুক ধকধক করে ওঠে, এই এতদিনকার শহর কি আজ তার সব মানুষ, সব রাস্তা গলি-উপগলি, বাড়িঘর, সব অতীত-বর্তমান-ভবিষ্যৎ নিয়ে গড়িয়ে পড়বে বুড়িগঙ্গার অতল নিচে। না দক্ষিণে বুড়িগঙ্গা তার শীতের শীর্ণ তনু একেবারে নিচে ফেলে উঠে এসেছে বিপুল স্ম্ফীত হয়ে, বুড়িগঙ্গার অজস্র তরঙ্গরাশির সক্রিয় অংশগ্রহণ না হলে কি এ রকম জলদমন্দ্র ধ্বনি উঠতে পারে, ‘আসাদের রক্ত-বৃথা যেতে দেবো না!’ পায়ের আঙুলে ভর দিয়ে উঁচু হয়ে দেখতে চেষ্টা করে ওসমান, না হে, মিছিলের মাথা দ্যাখা যায় না। অনেক সামনে উঁচু ১টা বাঁশের মাথায় ওড়ে আসাদের রক্তমাখা শার্টের লাল ঝান্ডা। বাঁশের মাথায় এই শার্ট হলো দস্তিদারের হাতের লাল লণ্ঠন। নদীর জাহাজ নয়, নদীই আজ ছুটতে শুরু করেছে দস্তিদারের লাল লণ্ঠনের পেছনে। এই পাগলপারা জলস্রোতকে আজ সামলায় কে?”

প্রখ্যাত কথাসাহিত্যিক আখতারুজ্জামান ইলিয়াসের ‘চিলেকোঠার সেপাই’ উপন্যাসের সূচনা ঘটে অন্যতম চরিত্র ওসমানের পিতার মৃত্যু সংবাদের দৃশ্য দিয়ে। বিভিন্ন চরিত্রের অতলস্পর্শী ভূমিকা কাহিনীকে অনন্যতা দান করে। বহুমাত্রিক চরিত্রের সমাবেশ ঘটলেও ব্যক্তিবিশেষ এই উপন্যাসের নায়ক নয়। উপন্যাসের নায়ক ইতিহাসধৃত সময় ১৯৬৯ সাল। এক আসাদের মৃত্যুতে সমগ্র পূর্ব বাংলা বিক্ষোভে ফেটে পড়ে। সেই বিক্ষোভের জোয়ার আঘাত করে পরাক্রমশালী সামরিক শাসক আইয়ুব খানের সিংহাসনে। শোষিত আর বঞ্চিত মানুষের শ্লোগানে পাকিস্তানের মসনদ কেঁপে ওঠে। গণঅভ্যুত্থানের স্মারক এই কালপর্বকে চিহ্নিত করতে গিয়ে ঔপন্যাসিক গ্রামীণ ও শহুরে চরিত্রের বর্ণিল পসরা সাজিয়েছেন। স্বাধিকার, শ্রেণিবৈষম্য, জাতীয়তাবাদ, সমাজতন্ত্র-রাজনীতির বহুমাত্রিক অনুষঙ্গ ঘুরে ফিরে এসেছে। অব্যক্ত থাকেনি স্বাধীনতার স্পৃহা ও সাম্যের ভয়।
ইতিহাসের ধারাবাহিকতায় মহান মুক্তিযুদ্ধের মাধ্যমে সৃষ্টি হয় আজকের বাংলাদেশ।

আসাদ একাধারে যেমন তিনি ছাত্র আন্দোলন করতেন তেমনি কৃষক আন্দোলনেও সক্রিয় ছিলেন। শহীদ আসাদের সেই রক্তমাখা শার্ট হয়ে উঠেছিল গণঅভ্যুত্থানের প্রতীক। ১৭ জানুয়ারি ছাত্রনেতারা দেশব্যাপী সকল শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে ধর্মঘটের ডাক দেন। আন্দোলনের তীব্রতায় বেসামাল হয়ে স্বৈরাচারী আইয়ুব সরকার ছাত্র-জনতার ওপর শুরু করে নির্যাতন। ১৯৬৯ সালের ২০ জানুয়ারি সংগ্রামী ছাত্রবৃন্দ পুলিশি নির্যাতনের বিরুদ্ধে ধর্মঘট, মিছিল ও প্রতিবাদী সভা আহ্বান করেন। ছাত্র-জনতা সমবেত হয়ে বিশাল মিছিল বের করেন। পূর্ব পরিকল্পনা অনুসারে ২০ জানুয়ারি দুপুরে ছাত্রদেরকে নিয়ে ঢাকা মেডিক্যাল কলেজের পার্শ্বে চাঁন খাঁ’র পুল এলাকায় মিছিল নিয়ে অগ্রসর হচ্ছিলেন আসাদ। পুলিশ তাদেরকে চাঁন খাঁ’র ব্রীজে বাঁধা দেয় ও চলে যেতে বলে। কিন্তু বিক্ষোভকারী ছাত্ররা সেখানে প্রায় এক ঘণ্টা অবস্থান নেয়। এবং আসাদ ও তাঁর সহযোগীরা স্বৈরাচারী সরকারের বিরুদ্ধে স্লোগান দিতে থাকে। ঐ অবস্থায় খুব কাছ থেকে আসাদকে লক্ষ্য করে এক পুলিশ কর্তা গুলিবর্ষণ করে। স্বৈরাচারী আইয়ুবের লেলিয়ে দেওয়া পুলিশ কর্তার গুলিতে বিদীর্ণ হয় আসাদের বক্ষ। গুলিবিদ্ধ হয়ে আসাদ সঙ্গে সঙ্গে লুটিয়ে পড়ে মাটিতে। তৎক্ষণাৎ গুরুতর আহত অবস্থায় আসাদকে হাসপাতালে নেয়া হলে কর্তব্যরত চিকিৎসক তাকে মৃত বলে ঘোষণা করেন। মৃত্যুর পর গ্রামের বাড়ি নরসিংদীর শিবপুর উপজেলার ধানুয়া গ্রামে তাঁকে সমাহিত করা হয়। পাকিস্তানি বাহিনীর গুলিতে আসাদের রক্তে লাল হয়েছিল ঢাকার রাজপথ। আসাদের শার্ট। রক্তমাখা লাল। আসাদের শার্ট। মুক্তির কেতন। হাজার হাজার ছাত্রছাত্রী সেই সাহস আর প্রতিবাদের ভাষায় উজ্জীবিত হয়ে বের করে এক শোক মিছিল।

বলাবাহুল্য : মেয়েরাই প্রথম শুরু করেছিল এই মিছিল। পুরোভাগে মেয়েরা থাকলেও ক্রমে সবাই যোগ দেয় তাতে। ছাত্র, সাধারণ মানুষ, ছোট-বড় অফিস আদালতের কর্মচারী, সবাই। দুই মাইল দীর্ঘ এই মিছিল শহরের বিভিন্ন রাস্তা প্রদক্ষিণ করেছিল সেদিন এই শার্ট নিয়ে। শেষ হয়েছিল এসে শহীদ মিনারে। ‘আসাদের মন্ত্র/জনগণতন্ত্র’—নতুন এই স্লোগান তৈরি হয়েছিল ঢাকায়। বাঙালি অবাক হয়ে দেখেছিল ভীরুতার দিন শেষ। এবার গর্জে ওঠার দিন। ফুল খেলবার দিন নয়  অদ্য। রক্তের সেই দাগ মুছে গেলেও মানুষের হৃদয় থেকে মুছবে না তাঁর কীর্তি। আসাদের রক্তাক্ত শার্ট হয়ে ওঠে বাঙালির প্রাণের পতাকা। ঊনসত্তরে পূর্ব পাকিস্তানের গণঅভ্যুত্থানের মুখে পতন ঘটে আইয়ুব সরকারের।

শোকাতুর ও আবেগে আপ্লুত অগণিত ছাত্র-জনতার মিছিলে শহীদ আসাদের রক্তমাখা শার্ট দেখে আধুনিক বাংলা সাহিত্যের এক অনন্য কবি শামসুর রাহমান লেখেন-

‘আসাদের শার্ট’।

গুচ্ছ গুচ্ছ রক্তকরবীর মতো কিংবা সূর্যাস্তের
জ্বলন্ত মেঘের মতো আসাদের শার্ট
উড়ছে হাওয়ায় নীলিমায় ।
বোন তার ভায়ের অম্লান শার্টে দিয়েছে লাগিয়ে
নক্ষত্রের মতো কিছু বোতাম কখনো
হৃদয়ের সোনালী তন্তুর সূক্ষতায়
বর্ষীয়সী জননী সে-শার্ট
উঠোনের রৌদ্রে দিয়েছেন মেলে কতদিন স্নেহের বিন্যাসে ।
ডালীম গাছের মৃদু ছায়া আর রোদ্দুর- শেভিত
মায়ের উঠোন ছেড়ে এখন সে-শার্ট
শহরের প্রধান সড়কে
কারখানার চিমনি-চূড়োয়
গমগমে এভেন্যুর আনাচে কানাচে
উড়ছে, উড়ছে অবিরাম
আমাদের হৃদয়ের রৌদ্র-ঝলসিত প্রতিধ্বনিময় মাঠে,
চৈতন্যের প্রতিটি মোর্চায় ।
আমাদের দুর্বলতা, ভীরুতা কলুষ আর লজ্জা
সমস্ত দিয়েছে ঢেকে একখন্ড বস্ত্র মানবিক ;
আসাদের শার্ট আজ আমাদের প্রাণের পতাকা ।
বাংলাদেশের অন্যতম কবি হেলাল হাফিজ এ ঘটনায় ক্রোধে ফেঁটে পড়েন এবং ক্ষোভ প্রকাশ করে কালজয়ী “নিষিদ্ধ সম্পাদকীয়” কবিতাটি লিখেন।
এখন যৌবন যার মিছিলে যাবার তার শ্রেষ্ঠ সময়
এখন যৌবন যার যুদ্ধে যাবার তার শ্রেষ্ঠ সময়
মিছিলের সব হাত
কন্ঠ
পা এক নয় ।
সেখানে সংসারী থাকে, সংসার বিরাগী থাকে,
কেউ আসে রাজপথে সাজাতে সংসার ।
কেউ আসে জ্বালিয়ে বা জ্বালাতে সংসার
শাশ্বত শান্তির যারা তারাও যুদ্ধে আসে
অবশ্য আসতে হয় মাঝে মধ্যে
অস্তিত্বের প্রগাঢ় আহ্বানে,
কেউ আবার যুদ্ধবাজ হয়ে যায় মোহরের প্রিয় প্রলোভনে
কোনো কোনো প্রেম আছে প্রেমিককে খুনী হতে হয় ।
যদি কেউ ভালোবেসে খুনী হতে চান
তাই হয়ে যান
উৎকৃষ্ট সময় কিন্তু আজ বয়ে যায় ।
এখন যৌবন যার মিছিলে যাবার তার শ্রেষ্ঠ সময়
এখন যৌবন যার যুদ্ধে যাবার তার শ্রেষ্ঠ সময় ।

আমানুল্লাহ মোহাম্মদ আসাদুজ্জামান। তিনি সর্বসমক্ষে শহীদ আসাদ নামেই অধিক পরিচিত ব্যক্তিত্ব। শহীদ আসাদ ১৯৪২ সালের ১০ জুন নরসিংদী জেলার শিবপুর উপজেলার ধানুয়া গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। শিবপুর উচ্চ বিদ্যালয় থেকে ১৯৬০ সালে মাধ্যমিক শিক্ষায় উত্তীর্ণ হয়ে উচ্চ শিক্ষার্থে জগন্নাথ কলেজ (বর্তমান জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়) ও এমসি কলেজে পড়াশোনা করেন। ১৯৬৩ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে স্নাতক (সম্মান) শ্রেণীতে ভর্তি হয়ে ১৯৬৬ সালে বি.এ এবং ১৯৬৭ সালে এম.এ ডিগ্রী অর্জন করেন। একই বছরে আসাদ ন্যাশনাল আওয়ামী পার্টি (ন্যাপ) এবং কৃষক সমিতির সভাপতি মওলানা আবদুল হামিদ খান ভাষাণী’র নির্দেশনায় কৃষক সমিতিকে সংগঠিত করার লক্ষ্যে শিবপুর, মনোহরদী, রায়পুরা এবং নরসিংদী এলাকায় নিজেকে সম্পৃক্ত রাখেন। ঢাকা’র সিটি ল কলেজে তিনি ১৯৬৮ সালে আরও ভালো ফলাফলের জন্যে দ্বিতীয়বারের মতো এম.এ বা স্নাতকোত্তর ডিগ্রী অর্জনের জন্য চেষ্টা করছিলেন। ১৯৬৯ সালে মৃত্যুকালীন সময়ে তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইতিহাস বিভাগে এম.এ শেষ বর্ষের ছাত্র ছিলেন তিনি। শহীদ আসাদ পূর্ব পাকিস্তান ছাত্র ইউনিয়নের নেতা ছিলেন। রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডে নিবেদিত প্রাণ আসাদ গরিব ও অসহায় ছাত্রদের শিক্ষার অধিকার বিষয়ে সর্বদাই সজাগ ছিলেন। তিনি শিবপুর নৈশ বিদ্যালয় নামে একটি নৈশ বিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা করেন। এবং শিবপুর কলেজ প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে স্থানীয় শিক্ষানুরাগী ব্যক্তিদেরকে সাথে নিয়ে আর্থিক তহবিল গড়ে তোলেন।

জনগণতান্ত্রিক সমাজ ব্যবস্থা তথা জনগণতান্ত্রিক রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার জন্য আমৃত্যু সংগ্রাম করে গেছেন ছাত্রনেতা আসাদ। আসাদের রাজনৈতিক উপলব্ধি ‘আসাদের মন্ত্র—জনগণতন্ত্র’। বস্তুত: ‘জনগণতন্ত্র’ এই শব্দটির মধ্যেই আসাদের রাজনৈতিক উপলব্ধি পরিষ্কার ধরা পড়ে। গণতন্ত্রের জন্য শহীদ আসাদের আত্মদান পরবর্তীকালে এদেশের প্রতিটি গণতান্ত্রিক আন্দোলন-সংগ্রামে অনুপ্রাণিত করেছে। প্রশ্ন হচ্ছে-এই স্বাধীন বাংলাদেশে শাসকগোষ্ঠি গণতন্ত্রকে আজোও কি প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দিতে পেরেছে? আর শহীদ আসাদের জনগণতান্ত্রিক সমাজ ব্যবস্থা তথা জনগণতান্ত্রিক রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা তিমিরের হাবুডুবু খাচ্ছে! আসাদের মন্ত্র—জনগণতন্ত্র। জনগণতান্ত্রিক রাষ্ট্র ব্যবস্থা  প্রতিষ্ঠা’র মাধ্যমেই শহীদ আসাদের স্বপ্ন পূরণ হবে। এই প্রত্যাশায়…
—————–
লেখক : নির্বাহী সম্পাদক ও বার্তা প্রধান, রণাঙ্গণের মুখপত্র “বিপ্লবী বাংলাদেশ”।

কলাম

 

আপনার মতামত লিখুন :

 
এই বিভাগের অারও সংবাদ
ভারপ্রাপ্ত-সম্পাদকঃ শাকিব বিপ্লব
© কপিরাইট বরিশালটাইমস ২০১২-২০১৮ | বরিশালটাইমস.কম
বরিশালটাইমস মিডিয়া লিমিটেডের একটি প্রতিষ্ঠান।
ইসরাফিল ভিলা (তৃতীয় তলা), ফলপট্টি রোড, বরিশাল ৮২০০।
ফোন: +৮৮০২৪৭৮৮৩০৫৪৫, মোবাইল: ০১৮৭৬৮৩৪৭৫৪
ই-মেইল: [email protected], [email protected]
© কপিরাইট বরিশালটাইমস ২০১২-২০১৮
টপ
  হাড্ডাহাড্ডি লড়াইয়ের পর সেমিফাইনালে আর্জেন্টিনা  ব্রাজিলের হার দেখে অজ্ঞান কিশোর, নেয়া হলো হাসপাতালে  পদত্যাগ করলেন তিতে  মেসির পাসে মলিনার গোল, এগিয়ে আর্জেন্টিনা  বিএনপির সমাবেশ: ফখরুলের পরিবর্তে প্রধান অতিথি মোশাররফ  বিশ্বকাপ থেকে বিদায়ে কান্নায় ভেঙে পড়লেন নেইমার  নেদারল্যান্ডসের বিপক্ষে আর্জেন্টিনার একাদশে নেই ডি মারিয়া  বিএনপির সমাবেশ: ব্যানার-ফেস্টুনে সাজছে গোলাপবাগ মাঠ  ব্রাজিলকে কাঁদিয়ে সেমিতে ক্রোয়েশিয়া  নেইমারের গোলে ১-০ ব্যবধানে এগিয়ে ব্রাজিল