২৩শে এপ্রিল, ২০২৪ খ্রিস্টাব্দ, মঙ্গলবার

বেআইনি কর্মকান্ডের খলনায়ক মহিপুর থানার ওসি মনিরুজ্জামান

বরিশাল টাইমস রিপোর্ট

প্রকাশিত: ০২:২৬ অপরাহ্ণ, ২১ জুলাই ২০২০

নিজস্ব প্রতিবেদক, বরিশাল:: পটুয়াখালীর মহিপুর থানার ওসি মনিরুজ্জামানের বেপরোয়া চাঁদাবাজি আর বেআইনী কর্মকান্ডের বিরুদ্ধে অনুসন্ধানে একের পর এক বেরিয়ে আসছে চাঞ্চল্যকর তথ্য। চলতি বছরের ২ মার্চ মহিপুর থানায় যোগদানের পরপরই ওসি মনিরুজ্জামান (বিপি-৭৮০৪১২১৯০৩) স্থানীয় মানুষের কাছে হয়ে ওঠেন এক মূর্তিমান আতঙ্ক। তার অপকর্ম আর ধরপাকোর বাণিজ্যে ফুঁসে উঠতে শুরু করেছে স্থানীয় বাসিন্দারা।

অনুসন্ধানে জানা গেছে, মহিপুর থানার অন্তর্গত মহিপুর, ডালবুগঞ্জ, লতাচাপলি, ধূলাসার ইউনিয়নের বিভিন্ন এলাকাসহ কুয়াকাটা পৌর এলাকায় সহস্রাধিক ভাড়াটে মোটরসাইকেল থেকে মাসোয়ারা আদায় করছেন ওসি মনিরুজ্জামান। নিজ এলাকা লালমোহনের ছেলে পুলিশ কনেষ্টবল (পিকআপ চালক) আরিফ হোসেন ওসির ক্যাশিয়ারের দায়িত্ব পালন করছেন। কেউ চাহিদামত মাসোয়ারা না দিলেই গাড়ীর কাগজ, ড্রাইভিং লাইসেন্স, হেলমেটসহ নানা অজুহাতে এক একবার ১০ থেকে ১৫টি মোটরসাইকেল আটক করেন তিনি। পরে গাড়ী প্রতি ৫ থেকে ৭ হাজার টাকা আদায় করে কয়েকদিন পর ছেড়ে দেন। অনেকের স্ত্রীর স্বর্ণালংকার বন্ধক রেখেও থানায় টাকা দিয়ে গাড়ি মুক্ত করতে হয়েছে।

অভিযোগ রয়েছে, করোনা সংক্রমন এড়াতে মহিপুরের প্রায় ২০টি স্ব-মিল বন্ধ করে দেন তিনি। পরে তাঁকে ৮০ হাজার টাকা ঘুষ দিয়ে সেসব স্বমিল চালাতে হয়। এছাড়া সমুদ্রে মাছ ধরায় ৬৫দিনের সরকারী অবরোধ চলাকালীন সময় মাছ ধরা ও প্রক্রিয়াজাত করতে মহিপুর-আলীপুর মৎস্যবন্দরের আড়ত মালিক সমিতি থেকে ওসি ৩ লাখ টাকা ঘুষ নেন বলে জানায় মৎস্যবন্দরের একটি সূত্র। বন্দরের বরফকল গুলোতে বরফ উৎপাদনের জন্য বরফকল প্রতি ওসিকে আলাদা টাকা দিতে হয়েছে। ট্রলার মালিকদের কাছ থেকেও সমুদ্রে যেতে ট্রিপ প্রতি টাকা দিতে হয়েছে ওসিকে।

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, মহিপুর ওসি মনিরুজ্জামানের এসব বেআইনে কর্মকান্ডে মুখ্য ভূমিকা পালন করেন থানার উপ-পরিদর্শক (এসআই) সাইদুল ইসলাম, তারেক, মনির হোসেন, আসাদুজ্জামান, সহকারি উপ-পরিদর্শক (এএসআই) সাদেক, মাইনুদ্দিন, ইমরান ও পুলিশ কনেষ্টবল (পিক আপ চালক) আরিফ হোসেন।

স্থানীয় একটি সূত্র জানিয়েছে, গত ১৩ জুলাই সোমবার রাত ২ টার দিকে মৎস্যবন্দরের মজনু গাজীর ঘাট থেকে ট্রলারে বরফ নিচ্ছিল কয়েকটি মাছ ধরা ট্রলার। এ সময় ওসি’র নির্দেশে এসআই মনির হোসেন ও এসআই আসাদুজ্জামান ৮টি ট্রলার আটক করেন। পরে ৭টি ট্রলারের কাছ থেকে মোটা অংকের উৎকোচ নিয়ে তাদের সমুদ্রে যেতে দেওয়া হয়। টাকা দিতে রাজি না হওয়ায় মনু খাঁ’র মালিকানাধীন এফবি ফাহিম নামের ট্রলারটি আটক করে ২০ হাজার টাকা জরিমানা করা হয়। এনিয়ে এসআই মনির হোসেন’র কাছে জানতে চাইলে তিনি বলেন, টিমের নেতৃত্বে ছিলেন এসআই তারেক। আর এসআই তারেক বলেন, তিনি কুয়াকাটা থেকে ওসি’র নির্দেশের পরে এসেছেন।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছিুক স্থানীয় একাধিক সূত্র জানায়, করোনার সরকারি নিষেধাজ্ঞার মধ্যে মৎস্য বন্দর আলীপুর-মহিপুরের দোকান মালিক ও ভাড়াটিয়ারা তাদের দোকানে সংস্কার কাজ শুরু করার পর লোকজন জড়ো করে কাজ করানো যাবে না বলে কাজ বন্ধ করে দেন ওসি মনিরুজ্জামান। পরে ওসি কাজের ধরন অনুযায়ী ২০, ৩০ ও ৫০ হাজার টাকা পর্যন্ত হাতিয়ে নিয়ে কাজ করার অনুমতি দেন। এমনকি নিজের রেকর্ডীয় জমিতে বাড়ীর ছাদ ঢালাই দিতে ছাদ প্রতি বেশ কয়েকজন বাড়ীর মালিককে ওসি মনিরুজ্জমানকে টাকা দিতে হয়েছে। তবে ঢাকায় টেলিভিশনে কর্মরত স্থানীয় এক জ্যেষ্ঠ সাংবাদিকের হস্তক্ষেপে শাহজাহান খলিফার ৩০ হাজার টাকা ফেরৎ দেন ওসি।

এদিকে স্থানীয় ট্রলার মালিকদের একটি সূত্র জানায়, অবরোধ শেষ হওয়ার আর মাত্র ৫/৭ দিন আছে। এরমধ্যেও বরফ নিয়ে সমুদ্রে যেতে ওসিকে টাকা দেওয়া লাগে। বড় সাইজের ট্রলার প্রতি ২০ হাজার ও ছোট সাইজের ট্রলার প্রতি ১০ হাজার টাকা করে দিতে হয়েছে ওসি মনিরুজ্জামানকে। এ সপ্তাহেও মহিপুর ইউনিয়নের নজিবপুর গ্রামের ট্রলার মালিক জাকির, তোতা মিয়া, নাসির, রকিব খাঁ, জয়নাল গাজী, শাহ জাহান মাঝি, শাহ আলম মাঝি, ফুল মিয়া সহ মহিপুর থানার বিভিন্ন এলাকার একাধিক ট্রলার মালিকের কাছ থেকে টাকা নেন ওসি।

লতাচাপলি ইউনিয়নের আলীপুর গ্রামের মিজানুর রহমান (৩৮) বলেন, ‘আলীপুর গ্রামের সোহেলের ভালবাসার অপরাধে মেয়ে পক্ষের মৌখিক অভিযোগে তার পিতা সেলিম মিয়াকে (৪৫) আটক করে থানা হাজতে আটকে রাখে ওসি। পরবর্তীতে উভয় পরিবারের সম্মতিতে পরিষদে তাদের বিয়ে হয়। কিন্তু ওসি ৭ হাজার টাকা নিয়েই তাকে থানা থেকে মুক্তি দেয়। এছাড়া একই গ্রামের বিবাহিত এক মেয়ের সাথে প্রেমের অপরাধে প্রেমিক বেল্লালকে (২১) থানা হাজতে আটকে রাখে ওসি। পরে মেয়ের মা থানায় গিয়ে তার জিডি প্রত্যাহার করে নিলেও ওসিকে সাড়ে ৫ হাজার টাকা দিয়ে বেল্লালকে মুক্ত করতে হয়।’

ইব্রাহিম (৪২) নামের এক ভাড়াটে মোটরসাইকেল চালক বরিশালটাইমসকে জানান, ‘গত ১৫ থেকে ২০ দিন আগে কলাপাড়া পৌর শহরের সদর রোডে মহিপুর ওসি’র পুলিশ পিকআপের পেছনে মোটরসাইকেল ছিল আমার। পুলিশ পিকআপটি আকস্মিকভাবে ব্রেক করার ফলে মোটরসাইকেলটি পিকআপের ব্যাক লাইটের সাথে লাগে। এতে ব্যাক লাইটটি ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ায় ওসি আমার মোটরসাইকেলটি আটকে থানায় নিয়ে যায়। পরে ৫ থেকে ৭দিন ঘুরিয়ে ব্যাক লাইটের খরচ বাবদ ১০ হাজার টাকা নিয়ে মোটর সাইকেলটি ছাড়ে।’

মহিপুর থানার ডালবুগঞ্জ ইউনিয়নের পেয়ারপুর গ্রামের মাছুমা বেগম (৩৪) বলেন, ‘গত ২৫ এপ্রিল শনিবার সকালে জমিজমা নিয়ে বিরোধের জেরে প্রতিপক্ষরা তার ডান হাতের কব্জি কুপিয়ে ও বাম হাতের হাড় ভেঙ্গে নির্যাতন করে। এনিয়ে সে মহিপুর থানায় অভিযোগ দিতে যান বেশ কয়েকদিন। কিন্তু ওসিকে তাঁর দাবীকৃত টাকা দিয়ে সন্তুষ্ট করতে না পারায় ওসি মামলা নেয়নি বলে মাছুমার অভিযোগ।’

কিন্তু বিস্ময়কর বিষয় হলো মহিপুর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো: মনিরুজ্জামান সকল অভিযোগ অস্বীকার করে বরিশালটাইমসকে জানান, ‘তিনি দুর্নীতি, অনিয়ম ও চাঁদাবাজির কোন বিষয়ের সাথে সম্পৃক্ত নন। এগুলো কিভাবে করে তাও তার জানা নেই। প্রয়োজনে তদন্ত করে দেখতে পারেন।’

তবে পটুয়াখালী জেলা পুলিশ সুপার (এসপি) মো: মইনুল হাসান সাংবাদিকদের বলেন, দুর্নীতি অনিয়মের বিষয়ে আমরা জিরো টলারেন্স নীতি অনুসরণ করি। পুলিশ বিভাগের কারও বিরুদ্ধে সুনির্দিষ্ট অভিযোগ পেলে তাকে ছাড় দেয়ার কোন সুযোগ নেই।’

6 বার নিউজটি শেয়ার হয়েছে
  • ফেইসবুক শেয়ার করুন