১৩ই জুন, ২০২৪ খ্রিস্টাব্দ, বৃহস্পতিবার

মহামারিতেও বদলায় নি তারা!

বরিশাল টাইমস রিপোর্ট

প্রকাশিত: ০৮:০১ অপরাহ্ণ, ২৭ মে ২০২০

বার্তা পরিবেশক, অনলাইন :: ঢাকায় মেয়ের বাড়িতে থাকার সময়েই করোনা আক্রান্ত হয়েছিলেন বৃদ্ধা পুষ্প রাণী সাহা। সহজেই অনুমান করা যায় কতটা প্রতিকূল পরিবেশ থাকলে ওই অসুস্থ শরীরেই রওনা হয়েছিলেন মেহেরপুরে ছেলের বাসায়।
এ কষ্টের গল্পের মাঝেও শুরুর দোষটা দেব মেয়ের পরিবারকে, যারা হাসপাতালে পাঠানোর পরিবর্তে রোগ ছড়ানোর ভয়ংকর আশঙ্কার মধ্যে মাকে রওনা করিয়েছিলেন দূরের পথে।
তবে মা মেহেরপুরে পৌঁছানোর পর ছেলে যা করলো, তাতে মেয়ের দোষ কর্পুরের মতো হাওয়ায় উড়ে যেতে বাধ্য। বাড়িতে তালা মেরে মাকে ঢুকতেই দেন নি ছেলে!

আমি নিশ্চিত, এত বড় আঘাতের পরেও নিশ্চয়ই ছেলেকে দোষারোপ করেন নি সেই বৃদ্ধা মা।
মায়েরা পারে না। তবে বর্তমান যুগের এসব কুসন্তান পারছে। রোগের ভয়ে জন্মদাত্রী মায়ের পরিবর্তে বেছে নিচ্ছে নিরাপদ থাকার সুযোগকে। এমন ঘটনা আমরা সাভারে দেখেছি। দেখেছি দেশের বিভিন্ন প্রান্তে। এই দিন দেখার জন্যই কী সন্তান জন্ম দিয়েছিলেন মায়েরা? প্রসব যন্ত্রণার চেয়ে হাজার গুণ বেশি যন্ত্রণা যে এই প্রত্যাখ্যানের।

বেঁচে থাকতেই যখন এত হৃদয় ভাঙা ঘটনার সাক্ষী হতে হয়, করোনায় মৃত্যু হলে এর চেয়ে আরও কঠিন পরিস্থিতির মুখোমুখি হতে হবে, তা তো সহজেই অনুমেয়।

অভয়নগরে এসিল্যান্ডকে চিতার আগুন জ্বালাতে হয়। ঝিনাইদহ সদর ইউএনওকে পড়াতে হয় জানাজা। দিনাজপুরে নদীতে ভাসিয়ে দেয়া পোশাক শ্রমিকের লাশ উদ্ধার করে দাফন করতে হয় পুলিশকে। কারণ একটাই, পরিবারের মানুষগুলো মুখ ফিরিয়ে নিয়েছে রোগের আতঙ্কে।
এ তো গেল করোনা আতঙ্কের কথা। ভয়াবহ এ দুঃসময়ে থেমে নেই অন্য বর্বরতাও। স্বামীর কুপ্রস্তাবে রাজী না হওয়ায় স্ত্রীর চুল কেটে ফেলা হয়েছে, বরগুনায় প্রকাশ্যে হত্যা করা হয়েছে কিশোরকে, মুন্সিগঞ্জে বীর মুক্তিযোদ্ধাকে পারিবারিক বিরোধে জখম করেছে তার আপন ভাই।

শেষ করার আগে দেশের বাইরের কথা বলি। আজ বুধবার (২৭ মে) সকালে বলিভিয়ার একটা খবর দেখলাম।স্পাইডারম্যান হওয়ার প্রবল ইচ্ছায় তিন ভাই স্বেচ্ছায় বিষাক্ত মাকড়সার কামড় খেয়ে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছে। দূরদেশের এই তিন ভাই যখন অতিমানব হওয়ার উদ্ভট স্বপ্ন দেখছে, আমাদের কেউ কেউ অতিমানব তো দূরে থাক, মানুষও হতে পারে নি ঠিকঠাকভাবে।

ভেবেছিলাম বিশ্বের চেহারা পাল্টে দেয়া মহামারিতে বদলে যাবে এই মানুষগুলোও। মানবতা জেগে উঠবে নতুন নতুন লাখ-কোটি হৃদয়ে। বদল হয় নি কিছুই। মানুষের জন্য লড়ে যাওয়া সত্যিকারের মানুষগুলো প্রতিদিন যুক্ত হচ্ছেন মানবতার নতুন লড়াইয়ে।

আর মানুষের মুখোশের আড়ালে থাকা এইসব ‘না মানুষ’ এই মহামারিতেও তাদের কুৎসিত মনের প্রকাশ করছেন অভূতপূর্ব সব ঘটনায়।

সত্যিই আমি ভুল ভেবেছিলাম। মায়ের চোখের জলে যাদের হৃদয় কাঁপে নি, দূর থেকে দাঁড়িয়ে প্রিয়জনের শেষকৃত্য দেখা যাদের সাহসে কুলোয় নি, তাদেরকে কোনো মহামারিই বদলাতে পারবে না। নিজের অপরাধের কথা বেমালুম ভুলে এই মানুষগুলো তাদের বার্ধক্যে অপেক্ষা করবে, শেষকৃত্যের সময় তাদের সন্তানদের চোখের জলের।

লেখক: মনদীপ ঘরাই, সিনিয়র সহকারী সচিব

11 বার নিউজটি শেয়ার হয়েছে
  • ফেইসবুক শেয়ার করুন