২৩শে এপ্রিল, ২০২৪ খ্রিস্টাব্দ, মঙ্গলবার

মুলাদী উপজেলা চেয়ারম্যানের স্বজনদের অবৈধ ড্রেজার বাণিজ্য, পুলিশ ম্যানেজ

বরিশাল টাইমস রিপোর্ট

প্রকাশিত: ১১:০৮ অপরাহ্ণ, ০৩ জুলাই ২০২০

নিজস্ব বার্তা পরিবেশক:: বর্তমান প্রেক্ষাপটে নদ-নদী থেকে ড্রেজারের মাধ্যমে বালু উত্তোলনের ক্ষেত্রে সরকারের কঠোর নিষেধাজ্ঞা থাকলেও বরিশালের মুলাদী উপজেলায় জনৈক এক জনপ্রতিনিধির প্রভাবের কাছে তা যেন উপেক্ষিতই রয়ে গেলো। খোদ উপজেলা চেয়ারম্যান তারিকুল আলম মিঠুর স্বজনরা সেই নির্দেশনাকে বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখিয়েছেন।

গোটা উপজেলা শহরের অভ্যন্তর ও আশপাশ ইউনিয়নসমূহে বসিয়েছে অন্তত ৩০টির বেশি অবৈধ ড্রেজার। প্রতিনিয়ত আশেপাশের আড়িয়াল খাঁ, জয়ন্তী ও নয়াভাঙনী নদী থেকে লাখ লাখ টাকার বালু উত্তোলন করে এবং পার্শ্ববর্তী হিজলা-মেহেন্দিগঞ্জসহ বিভিন্ন এলাকায় সরবরাহ করে। অব্যাহত বালু উত্তোলনের ফলে নদীর তীরবর্তী গ্রামগুলো ভাঙন হুমকিতে থাকলেও উপজেলা চেয়ারম্যানের স্বজনদের ক্ষমতার ভয়ে কেউ মুখ খুলছে না।

জানা গেছে, উপজেলা চেয়ারম্যানের আপন ছোট ভাই টিপু এই অবৈধ ড্রেজার বাণিজ্যের নিয়ন্ত্রক। অভিযোগ রয়েছে ভাইয়ের ক্ষমতাকে ব্যবহার করে এই টিপুই পুলিশ প্রশাসন ম্যানেজে সক্ষম হয় এবং ব্যবসা চাঙ্গা রেখেছে। অবশ্য এর প্রমাণও পাওয়া গেছে সরেজমিনে। মাঝে মধ্যে উপজেলা প্রশাসন অবৈধ ড্রেজার বিরোধী অভিযানে নামার আগ্রহ দেখালেও পুলিশ নানা অজুহাতে সহায়তা দিচ্ছেনা বা দেয়না। ফলে ড্রেজার ব্যববায়ী ও পুলিশের গভরি সখ্যতা নিয়ে উপজেলায় রাজনৈতিক অঙ্গনে নানান কথা শোনা যায়। এনিয়ে উপজেলা প্রশাসন থানা পুলিশের ওপর সংক্ষুব্ধ।

অনুসন্ধানে জানা যায়, উপজেলা চেয়ারম্যানের ভাগিনা সুজন পৌর শহরের ৪নং ওয়ার্ডে নদীর তীরবর্তী একটি ড্রেজার দীর্ঘদিন যাবত বালু উত্তোলনের কাজে ব্যবহার করে আসছে। থানা থেকে কিছুটা দুরত্বে সুজনের এই বালু উত্তোলন ও সরবরাহ থাকলেও পুলিশ-প্রশাসনের নিলুপ্ততার কারণে তা রোধ করা যাচ্ছে না। সুজন উপজেলা চেয়ারম্যানের স্বজন হলেও স্থানীয় ছাত্রলীগের রাজনীতিতে সম্পৃক্ত বলে জানা যায়। মামার দাপট ও নিজের দলীয় ক্ষমতার প্রভাব খাটিয়ে সুজন তার বাণিজ্য চালিয়ে রাখতে সক্ষম হচ্ছে। উপজেলা চেয়ারম্যান ড্রেজার বাণিজ্য সম্পর্কে অবগত থাকলেও পুরো এই সিন্ডিকেটকে নিয়ন্ত্রন করেন তার আপন ছোট ভাই টিপু।

স্থানীয় একটি সূত্র জানায়, উপজেলার জয়ন্তী নদীর চরমালিয়া, কৃষ্ণপুর, মৃধারহাট, চরবাটমারা এবং আড়িয়াল খাঁ নদীর মিয়ারচর, সাহেবেরচর, বানীমর্দন, মনষাগঞ্জ, নন্দীবাজারসহ অন্তত ৩০টি স্পট থেকে ড্রেজার ব্যবহার করে বালু তোলে চেয়ারম্যানের স্বজন ও ঘনিষ্ঠরা। অবশ্য এই অভিযোগ সম্পর্কে জানতে উপজেলা চেয়ারম্যান তারিকুল আলম মিঠুর সাথে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করেও তাকে পাওয়া যায়নি। তার ব্যবহৃত মুঠোফোনে অসংখ্যবার কল দিলেও তিনি রিসিভ করেননি। সর্বশেষ মোবাইলে ক্ষুদে বার্তা (এসএমএস) পাঠিয়ে অভিযোগ সম্পর্কে জানতে চাওয়া হলে তারও উত্তর মেলেনি। তবে একবার মোবাইল ফোন রিসিভ করে তিনি স্থানীয় এক সংবাদকর্মীকে ধরিয়ে দেন। জনপ্রতিনিধির এই অস্বাভাবিক আচরণে অবৈধ ড্রেজার বাণিজ্য তিনিও জড়িত কিনা তা নিয়ে সন্দেহ তৈরি হয়েছে।

অবশ্য এমন সন্দেহ অমূলক নয় দাবী করে স্থানীয় একাধিক সূত্র বলছে, উপজেলা শহরের অভ্যন্তর ও আশপাশ ইউনিয়নসমূহে চলমান অবৈধ ড্রেজিং বাণিজ্যের বিষয়টি চেয়ারম্যানের অজানা নয়। বালু উত্তোলনকে কেন্দ্র করে ঘটনাচক্রে ব্যবসায়িদের মাঝে বিরোধ দেখা দিলে তা নিয়ে তুমুল আলোচনা-সমালোচনার অবতারণা হয়। ফলে উপজেলা চেয়ারম্যান বিষয়টি অজ্ঞাত এমন প্রশ্নে অনেকেই বিষ্ময় প্রকাশ করেছেন। তবে এ প্রতিবেদকের অনুসন্ধানের খবর কোনো মাধ্যমে উপজেলা চেয়ারম্যানের ভাই টিপু আঁচ করতে পেরে নানাভাবে যোগাযোগ স্থাপন করেন এবং আপসরফার প্রস্তাব দিয়ে ভাগিনা সুজনকে যোগাযোগ করান। কিন্তু অবৈধ বাণিজ্য ও ব্যবসায়ীদের সাথে সমঝোতার সুযোগ কোথায় এমন প্রশ্ন রাখলে সুজন মোবাইল সংযোগ বিচ্ছিন্ন করেন। পরে অবশ্য বিভিন্ন মাধ্যম থেকে এ প্রতিবেদকের সাথে যোগাযোগের চেষ্টা করেন। কিন্তু সেখানেও ব্যর্থ হয়েছে।

অবৈধ ড্রেজার বাণিজ্য সচল রাখতে সুজন ও মামা টিপুর দৌড়ঝাঁপ আর বলার অপেক্ষা রাখেনা যে তারা এখান থেকে আর্থিকভাবে কতটা লাভবান।

সূত্রগুলো জানায়, চলমান ৩০টির বেশি ড্রেজার থেকে টিপুই মাসান্তর একটি মোটা অংকের অর্থ নিয়ে থাকেন এবং তার একটি অংশ দিয়ে থানা পুলিশকে ম্যানেজ করেন। মুলাদী থানার ওসি ফয়েজ উদ্দিন মৃধা এই অভিযোগসমূহ অস্বীকার করলেও উপজেলা ভূমি প্রশাসন তাকে বাঁকা চোখেই দেখছেন।

নাম প্রকাশ না করার শর্তে উপজেলা প্রশাসনের দায়িত্বশীল এক কর্মকর্তা বলেন, সরকারি নির্দেশ অমান্য করে অবৈধ ড্রেজারে বালু তোলার বিষয়টি সম্পর্কে তারাও ওয়াকিবহাল। কিন্তু উপায় নেই, ভ্রাম্যমাণ আদালত অভিযানের কথা শুনলেই দেখা দেয় পুলিশের অসহযোগিতা। সদস্য সংকট ও ব্যস্ততাসহ নানান অজুহতে এড়িয়ে যান থানার ওসি। ফলে ড্রেজার বিরোধী অভিযানে উপজেলা ভূমি প্রশাসন তেমন একটা অগ্রসর হতে পারছে না।

থানা পুলিশ যে অসহযোগিতা করছে সেই বিষয়টি খোদ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তাও (ইউএনও) স্বীকার করলেন অকপটে। কিন্তু ড্রেজার বিরোধী অভিযান চলছে এবং চলবে জানালেন, তাতে ক্ষমতাধর যে কেউ জড়িত থাক না কেন আইনের আওতায় আনার হুঁশিয়ারি দিলেন ইউএনও শুভ্রা দাস।

6 বার নিউজটি শেয়ার হয়েছে
  • ফেইসবুক শেয়ার করুন