১৬ই জুন, ২০২৪ খ্রিস্টাব্দ, রবিবার

ঘুস আদায়ে ব্যর্থ হয়ে দিনমজুরকে মামলায় ফাঁসালেন এসআই শহিদুল!

বরিশাল টাইমস রিপোর্ট

প্রকাশিত: ১২:৫৮ পূর্বাহ্ণ, ১৮ নভেম্বর ২০১৯

নিজস্ব বার্তা পরিবেশক:: বরিশালের মেহেন্দিগঞ্জ থানা পুলিশের ২ কর্মকর্তা ও থানার মাঝির বিরুদ্ধে মোস্তফা বেপারী (৪০) নামের এক নিরীহ দিনমজুরকে মিথ্যা মামলায় ফাঁসানোর ভয় দেখিয়ে অর্ধলাখ টাকা হাতিয়ে নেয়ার অভিযোগ পাওয়া গেছে। মোস্তফা উপজেলার রাজাপুর গ্রামের মৃত ফজলে করিম বেপারীর ছেলে।

এ ঘটনায় ভুক্তভোগী মোস্তফা বরিশাল রেঞ্জ ডিআইজির নিকট অভিযোগ দায়ের করলে অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে অভিযোগের তদন্ত দেওয়া হয়। এরপর ভুক্তভোগী দিনমজুর মোস্তফাকে ত্রিশ হাজার টাকা ফেরত দিয়ে বাকী টাকা কিছুদিন পরে ফেরত দেওয়ার শর্তে তদন্তকারী কর্মকর্তাদের মধ্যস্ততায় সময় নেয় অভিযুক্তরা।

অভিযোগ ও ভুক্তভোগী সূত্রে জানা গেছে, চলতি বছরের ৮ জুলাই গভীর রাতে মেহেন্দিগঞ্জ থানার উপ-পরিদর্শক (এসআই) শহিদুল ইসলাম, সহকারি উপ-পরিদর্শক (এএসআই) আল-আমিন ও মাঝি আব্দুল কাদেরসহ একদল পুলিশ সদস্য নিরীহ দিনমজুর মোস্তফার বাড়িতে গিয়ে তার বিরুদ্ধে মাদক বেচা-কেনার অভিযোগ তোলে। তখন দিনমজুর মোস্তাফা অভিযোগ অস্বীকার করলে ওই পুলিশ কর্মকর্তারা মাদক উদ্ধারের নামে মোস্তফার ঘরে ঢুকে তল্লাশি চালিয়ে সবকিছু এলোমেলো করে ফেলে। কোনো কিছু না পেয়ে তল্লাশির একপর্যায়ে মোস্তফাকে মাদকের অন্য মামলায় চালান দেয়ার ভয় দেখিয়ে ১০ হাজার টাকা দাবী করেন এসআই শহিদুল।

এ সময় মোস্তফা ও তার স্ত্রী টাকা দিতে অপরাগতা জানালে তাদেরকে অশ্লীল ভাষায় গালিগালাজ করে এবং ঘরে থাকা ভাত-তরকারী লাথি মেরে ফেলে দেয়। শেষাবধি নিরীহ মোস্তফার হাতে হাতঁকড়া লাগিয়ে থানায় নিতে চাইলে তার স্ত্রী এসআই শহিদুলের হাত-পা জড়িয়ে ধরে এক হাজার টাকা দিয়ে মোস্তফাকে ছাড়িয়ে রাখে।

পরেরদিন সকালে মোস্তফা বিষয়টি এলাকার গণ্যমান্য ব্যক্তিদের জানালে ঘটনা থানা পর্যন্ত গড়ালে ক্ষুব্ধ হয়ে ওঠে এসআই শহিদুল। এরই জের ধরে দুই দিন পর ১০ জুলাই গভীর রাতে কোনো প্রকার অভিযোগ ছাড়াই ফের মোস্তফার ঘরে যায়। ঘুম থেকে উঠিয়ে মোস্তফাকে আটক করে থানায় নিয়ে আসে এসআই শহিদুল, এএসআই আল-আমিন ও থানার মাঝি আব্দুল কাদেরসহ বেশ কয়েকজন।

এরপরই শুরু হয় এসআই শহিদুলের ক্ষমতার নোংরামি। নিরীহ মোস্তফাকে হত্যা, চুরি-ডাকাতি ও মাদকসহ ৭/৮ টি মামলায় ফাঁসানোর ভয় দেখিয়ে ৫০ হাজার টাকা চাঁদা দাবী করে এসআই শহিদুল। রাতভর দর কষাকষি শেষে সকালে মোস্তফা ও তার স্ত্রীর সাথে ৪০ হাজার টাকা নিয়ে মাতাল দেখিয়ে পুলিশ আইনের ৩৪ (৬) ধারায় আদালতে প্রেরণ করে।

ভুক্তভোগী মোস্তফা আক্ষেপ করে বলেন, এসআই শাহদুল কোনো কারন ছাড়াই আমাকে ঘুম থেকে তুলে নিয়ে আটকে রাখে এবং চুরি,ডাকাতি,হত্যা ও মাদক মামলায় আমাকে ফাঁসানোর ভয় দেখিয়ে চল্লিশ হাজার টাকা নেয়। তারপরেও এসআই শহিদুল থানা থেকে না ছেড়ে আমাকে আদালতে নিয়ে যায় এবং আমার কাছ থেকে আরও পাঁচ হাজার টাকা নিয়ে নিজেই উকিল ঠিক করে জামিন করিয়ে দেয়।

তিনি আরও বলেন, এসআই শহিদুল ও তার সহযোগীদের এমন কর্মকান্ডের বিষয়ে আমার এক নিকটাত্মীয়কে জানালে তার পরামর্শে ঘটনা সম্পর্কে বরিশাল রেঞ্জ ডিআইজির কাছে লিখিত অভিযোগটি দায়ের করেছিলাম।

এদিকে ডিআইজির কার্যালয়ে ভুক্তভোগী মোস্তফার দায়েরকৃত অভিযোগ পর্যালোচনা করে জানা গেছে এসআই শহিদুলের অজানা অনেক অধ্যায়। ওই অভিযোগে উল্লেখ রয়েছে, অভিযুক্ত এসআই শহিদুল ২০০০ সালে বাংলাদেশ পুলিশ বাহিনীতে একজন সদস্য হিসেবে ১৫তম ব্যাচে ভর্তি হয়ে ট্রেনিং শেষে বরিশাল জেলায় যোগদান করেন। এরপর থেকে দীর্ঘদিন যাবৎ বরিশাল রেঞ্জ ডিআইজি অফিসে ডিসপাশ শাখায় কর্মরত ছিলেন। সেখানে থাকাকালীন বিভিন্ন জেলার পুলিশ কর্মকর্তাদের নামে-বেনামে নিজেই ভিত্তিহীন অভিযোগ দিয়ে হয়রানি করে লাখ লাখ টাকা হাতিয়ে নেয়।

পরবর্তীতে ২০১২ সালে বরিশাল রেঞ্জ ডিআইজি অফিস হইতে এএসআই পদে পদোন্নতি পেয়ে ঝালকাঠী জেলা পুলিশে যোগদান করেন। কিছুদিন পরে ঝালকাঠী সদর কোর্টে তার বদলি হলে সেখানে একজন বিচারকের স্বাক্ষর জাল করার অপরাধে কোর্ট হইতে প্রত্যাহার করে পুলিশ লাইন্সে যুক্ত করা হয়। দীর্ঘদিন পরে এ অপরাধ হইতে অব্যাহতি পেয়ে ২০১৩ সালের ২২ মে ভোলা জেলার লালমোহন থানায় যোগদান করে শহিদুল। সেখানে গিয়ে মাদক বিক্রেতাদের সাথে গভীর সখ্যতা বিপুল পরিমান অর্থ সঞ্চয় করেন।

পরে ২০১৫ সালে ভোলা থেকে বদলী হয়ে বরিশাল জেলার মুলাদী থানায় যোগদান করেন। সেখানে আইন পরীপন্থী কাজ করে নিরীহ মানুষদের হয়রানি করায় জনতার হাতে গনধোলাই খেয়ে বদলী হয় জেলা বিশেষ শাখায়। এরপর তাকে দেয়া হয় জেলার গৌরনদী থানায়। সেখানে মাদকের সাথে সংশ্লিষ্ট পাওয়ার অপরাধে শহিদুলকে প্রত্যাহার করে পুলিশ লাইন্সে যুক্ত করা হয়।

এরপর ২০১৫ সালে এই অসাধু কর্মকর্তা বদলি হয়ে মেহেন্দিগঞ্জ থানায় যোগদান করেন। তৎকালীন সময়ে সেখান থেকেও মাদক সংশ্লিষ্টতাসহ বিভিন্ন অপরাধ মূলক কর্মকান্ডে করে এবং নিরপরাধ মানুষদের মামলায় ফাঁসানোর ভয় দেখিয়ে বিপুল পরিমান টাকা হাতিয়ে নেন। পরে ২০১৭ সালে এএসআই হইতে এসআই পদে পদন্নোতি হয়ে বানারীপারা থানায় বদলী হয়। সেখানেও একইভাবে কর্মকান্ড করে টিকতে না পেরে পুনরায় বদলী হয়ে মেহেন্দিগঞ্জ থানায় পারি জমায় এসআই শহিদুল।

অভিযোগে আরও উল্লেখ রয়েছে মেহেন্দিগঞ্জে এসআই হিসেবে যোগদানের পর থেকে শহিদুল শুরু করে একের পর এক বিতর্কিত কর্মকান্ড। ওই এলাকার অটো রিক্সা, নসিমন-করিমন মালিক ও চিহ্নিত মাদক ব্যবসায়ীদের নিকট থেকে প্রতি মাসে মোটা অঙ্কের টাকা মাসোয়ার নেয়। এছাড়া অসাধু এই পুলিশ কর্মকর্তা স্থানীয় জেলেদেরও বিভিন্ন ধরনের মামলায় হয়রানি ভয় দেখিয়ে মাসিক চাঁদা নেয়। এমনকি সে তার কর্মস্থলে নিয়মিত না থেকে মাাসের ১৫ দিনই অবস্থান করেন কোটি টাকা ব্যয়ে নির্মিত বরিশালের কাশিপুরস্থ নিজের পাঁচ তলা আলিশান বাসায়।

নাম প্রকাশ না করার শর্তে এসআই শহিদুলের হয়রানির শিকার একাধিক ভুক্তভোগী অভিযোগ করে জানান, রাতে সিভিল টিমের দায়িত্ব পালনকারী পুলিশ কর্মকর্তারা এলাকার নিরীহ মানুষদের আটক করে মাদক ও নাশকতা মামলায় গ্রেপ্তারের ভয় দেখিয়ে প্রায় প্রতিদিনই হাতিয়ে নিচ্ছে হাজার হাজার টাকা। আবার অনেক ক্ষেত্রে বড় ধরনের অপরাধীদের টাকার বিনিময়ে অভিযোগপত্র থেকে বাদ দেয়ার ঘটনাও ঘটেছে।

এ সকল বিষয়ে অভিযুক্ত এসআই শহিদুলসহ অন্যান্যদের সাথে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করেও পাওয়া যায়নি।

5 বার নিউজটি শেয়ার হয়েছে
  • ফেইসবুক শেয়ার করুন