২২শে এপ্রিল, ২০২৪ খ্রিস্টাব্দ, সোমবার

যৌতুকের দাবিতে স্ত্রীর শরীর ঝলসে দিয়ে ঘরে আটকে রাখেন শিক্ষক স্বামী

বরিশালটাইমস, ডেস্ক

প্রকাশিত: ০১:৩৩ অপরাহ্ণ, ২৯ ফেব্রুয়ারি ২০২৪

যৌতুকের দাবিতে স্ত্রীর শরীর ঝলসে দিয়ে ঘরে আটকে রাখেন শিক্ষক স্বামী

নিজস্ব প্রতিবেদক, বরিশাল: যৌতুকের দাবিতে স্ত্রীর হাত বেঁধে নির্যাতনের একপর্যায়ে শরীরে ফুটন্ত গরম পানি ঢেলে দেওয়া হয়। এতেই ক্ষান্ত হননি শিক্ষক স্বামী। গরম পানিতে শরীর ঝলসে গেলেও বিনা চিকিৎসায় সাতদিন ঘরে আটকে রাখেন পাষণ্ড ওই স্বামী। জামালপুর শহরের গেটপাড় এলাকায় সোমবার (১৯ ফেব্রুয়ারি) রাত সাড়ে ১০টার দিকে এ ঘটনা ঘটে।

পরে গুরুতর অসুস্থ অবস্থায় সোমবার (২৬ ফেব্রুয়ারি) ওই গৃহবধূকে তার পরিবারের লোকজন তাকে উদ্ধার করে জামালপুর জেনারেল হাসপাতালে ভর্তি করেন। অভিযুক্ত শিক্ষক আল আমিনের বাড়ি জামালপুর সদর উপজেলার মেষ্টা ইউনিয়নের চর মল্লিকপুর গ্রামে।

তিনি শাহবাজপুর ইউনিয়নের জাফর শাহী সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষক পদে কর্মরত। ভুক্তভোগী গৃহবধূ নিশি আক্তারের (২০) দাবি, শুধু শরীর পুড়িয়েই ক্ষান্ত হননি স্বামী। বিনা চিকিৎসায় তাকে সাত দিন ঘরে আটকে রেখে বাইরে থেকে ঘরে তালা দিয়ে রেখেছেন।

এই ঘটনায় জামালপুর সদর থানায় ওই গৃহবধূর বড় বোন মৌসুমী আক্তার বাদী হয়ে পাঁচ জনকে আসামি করে একটি মামলা দায়ের করেন। এ ঘটনায় ভুক্তভোগীর শ্বশুর আশেক আলীকে আটক করেছে পুলিশ। তবে স্বামী শিক্ষক আল আমিন এখনও পলাতক।

স্থানীয়রা জানান, মেলান্দহ উপজেলার ঘোষেরপাড়া ইউনিয়নের নাগেরপাড়া এলাকার সৌদি প্রবাসী আব্দুল মান্নানের মেয়ে নিশির সঙ্গে পারিবারিকভাবে প্রায় ১০ মাস আগে বিয়ে হয় আল আমিনের। বিয়ের সময় নিশির বাবা স্বামীকে মোটরসাইকেল, ঘরের আসবাবপত্র মেয়ের জন্য গহনা সব কিছুই দেন।

তবুও বিয়ের কিছু দিন পর থেকেই আরও পাঁচ লাখ টাকা যৌতুকের জন্য চাপ দিতে শুরু করেন। এ নিয়ে তাদের মধ্যে শুরু হয় ঝগড়া। তিন মাস আগে ওই দম্পতি জামালপুর শহরের গেটপাড় এলাকায় একটি ভাড়া বাসায় ওঠেন। ওই বাসায় স্ত্রীকে নিয়ে বসবাস শুরু করেন আল আমিন।

ভুক্তভোগী মায়া আক্তার নিশি বলেন, ‘গত সোমবার রাত সাড়ে দশ টার দিকে চা বানানোর জন্য চুলায় পানি গরম করছিলাম। এমন সময় আমার স্বামী বাবার বাড়ি থেকে পাঁচ লাখ টাকা নিয়ে এসে দিতে বলেন। বিয়ের পরে তাকে একটি মোটরসাইকেল, মোবাইল ও ঘরের আসবাবপত্র দেওয়া হয়েছে। তাই আমি টাকা দিতে অস্বীকৃতি জানাই। এতে সে ক্ষিপ্ত হয়ে গলা চেপে ধরে মারধর শুরু করে।

এক পর্যায়ে মেঝেতে পরে গেলে হাত-পা বেঁধে চুলায় থাকা গরম পানি শরীরে ঢেলে দেয়। আমি মৃত্যু যন্ত্রণায় ছটফট করতে থাকি। তখন আমাকে ছেড়ে দেয়। আমাকে ছেড়ে দিলে আমি শরীরের জামা-কাপড় ছিঁড়ে গোসলখানায় গিয়ে পানি দিয়ে বের হই। এ সময় আমি কান্না করলে, ‘আমাকে দেখে সে হাসতে থাকে’।

কোন হাসপাতাল বা চিকিৎসকের কাছে না নিয়ে দোকান থেকে কয়েকটা ওষুধ কিনে দেন এবং ঘটনাটি কাউকে না জানানোর জন্য আমাকে ভয় দেখায়। তিনি আরও বলেন, সে প্রতিদিন সকালে স্কুলে যাওয়ার সময় ঘরে তালা দিয়ে যেতো। এভাবে সাত দিন আমাকে তালা মেরে রাখে।

আমার অবস্থা খারাপ হলে একটি বেসরকারি হাসপাতালে নিয়ে যায়। আমাকে কোন সময় ফোন ব্যবহার করতে দিতো না। কৌশলে ওই হাসপাতাল থেকে অন্যের মোবাইল দিয়ে আমার বড় বোনকে ফোন দেয়। পরে আমার বোন হাসপাতালে আসলে সেখান থেকে সে পালিয়ে যায়।

সেখান থেকে হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে। এমন একটি বিচার চাই, সেই বিচার দেখে যেন কোন মানুষ কোন মানুষকে নির্যাতন করতে সাহস না পায়। ভুক্তভোগীর মা নার্গিস বেগম বলেন, মেয়ের পিঠে বুকে ও পেটে আর কোনও অবস্থা নেই। গরম পানি ঢেলে একেবারে ঝলসে দিয়েছে।

এতটা পুড়ে দিয়েছে যে কেউ দেখলে ভয় পাবে। আমার মেয়ে তো কোনও অপরাধ করেনি। এভাবে নির্যাতন করার কী দরকার ছিল। তিনি এ ঘটনার কঠোর বিচার দাবি করেন। মানবাধিকার কর্মী জাহাঙ্গীর সেলিম বলেন, মানুষ কতটা নির্মম হলে এতটা নির্যাতন করতে পারে। গরম পানি ঢেলে দিয়ে পাশে স্বামীর হাসতে থাকে।

এ সময় তাকে চিকিৎসা না করে উল্টো ঘরের মধ্যে তালাবদ্ধ করে রাখে। শিক্ষক স্বামী হয়ে তিনি এই কাজ কীভাবে করতে পারেন। জামালপুর জেনারেল হাসপাতালে সহকারী পরিচালক মাহফুজুর রহমান সোহান বলেন, নিশির শরীরের সামনে ও পেছনে শরীরের প্রায় ২০ ভাগ পুড়ে গেছে।

তবে রোগী শঙ্কামুক্ত। নিশির চিকিৎসা চলছে আশা করি খুব দ্রুত সময়ের মধ্যেই নিশি স্বাভাবিক জীবনে ফিরে আসবে। জামালপুর সদর থানার ওসি মহব্বত কবীর বলেন, এই ঘটনায় থানায় একটি মামলা হয়েছে। মামলার প্রধান আসামি আল আমিন পলাতক রয়েছেন। ইতিমধ্যে একজনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। বাকিদের গ্রেপ্তারের চেষ্টা চলছে।

15 বার নিউজটি শেয়ার হয়েছে
  • ফেইসবুক শেয়ার করুন