৪ ঘণ্টা আগের আপডেট রাত ৪:২৮ ; মঙ্গলবার ; সেপ্টেম্বর ১৭, ২০১৯
EN Download App
Youtube google+ twitter facebook
×


 

স্বেচ্ছাসেবক লীগ নেতার হাত কেটে নিল যুবলীগ নেতা!

বরিশাল টাইমস রিপোর্ট
৮:১৮ পূর্বাহ্ণ, সেপ্টেম্বর ১১, ২০১৯

‘বাবা, ওরা তোমার হাত কেটে নিল কেন? এখন আমাকে কিভাবে খাইয়ে দিবা? কাটা হাতটুকু নিয়ে আসো, আমি সেলাই করে দেই।’ পাঁচ বছরের কন্যা ইশরাত জাহান নওরিনের মুখে এমন কথা শুনে গড়িয়ে পড়ে দুই চোখের পানি। কোনো জবাব দিতে পারেন না ইলিয়াস নোমান। আইসিইউয়ের বেডে সদ্য জ্ঞান ফেরা স্বামীর পাশে দাঁড়িয়ে কাঁদছেন স্ত্রী মাহমুদা খাতুন। মেয়ের কথা শুনে তার মুখ চেপে ধরে ফুঁপিয়ে কাঁদতে থাকেন আর সান্ত্বনা দেন, ‘আরেকটি হাত আছে মা, সেই হাতে তোমাকে খাওয়াবে।’ এরপর কন্যাকে নিয়ে বেরিয়ে যান আইসিইউ থেকে। গত রবিবার সকালে শেরেবাংলানগরে জাতীয় অর্থোপেডিক ইনস্টিটিউটের চারতলায় আইসিইউয়ের বেডে গিয়ে এই মর্মান্তিক দৃশ্য দেখা যায়।

একমাত্র কন্যা নওরিনকে প্রতিদিন সকাল-বিকেল মোটরসাইকেলে ঘুরে বেড়ানো ছিল বাবার রুটিন কাজ। মুখে তুলে তাকে খাবার খাইয়ে দিতেন নোমান। এখন আর তাকে মোটরসাইকেলে নিয়ে ঘুরতেও যেতে পারবেন না। কারণ তাঁর ডান হাতটি দেহ থেকে বিচ্ছিন্ন করে ফেলেছে স্থানীয় সন্ত্রাসীরা। নওরিনের বাবার অপরাধ, অন্যায়ের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করতেন, মাদক আর সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে কথা বলতেন, বাল্যবিবাহ বন্ধসহ অনেক সামাজিক কাজে সোচ্চার ছিলেন। তাঁর হাত কুপিয়ে বিচ্ছিন্ন করায় অতিরিক্ত রক্তক্ষরণের কারণে তিনি মৃত্যুর সঙ্গে লড়াই করছেন। কাটা হাতে ইনফেকশন হয়েছে, বেঁচে থাকা নিয়েই সংশয় দেখা দিয়েছে।

নোমানের স্ত্রী মাহমুদা আক্তার কাঁদতে কাঁদতে বলেন, ‘মানুষের বিপদের কথা শুনে ঘরে থাকতে পারত না, রাত নাই, দিন নাই ছুটে যেত। মাদকের বিরুদ্ধে কথা বলত। আমি কত বলেছি ওরা সন্ত্রাসী, মানুষের জন্য ছুটতে গিয়ে নিজের জীবনটা শেষ কইরো না।’

আইসিইউ ইউনিটের বাইরে থেকে জানালা দিয়ে ছেলের দিকে তাকিয়ে চোখের পানি ফেলছেন বৃদ্ধা মা সাহেরা খাতুন আর দুই হাত ওপরে তুলে ছেলের জন্য দোয়া করছেন। ছেলের কথা জানতে চাইলে অঝোরে কাঁদেন সাহেরা খাতুন। চোখ মুছতে মুছতে বলেন, ‘যারা সন্ত্রাস আর মাদক ব্যবসা করে, এদের কিছু হয় না, আর আমার ছেলে এইসবের বিরুদ্ধে কথা বলছে বলে জীবনটাই যায় যায়। আমি ওদের বিচার চাই, কঠিন বিচার চাই।’ মায়ের কান্না দেখে পাশে থাকা স্বজনদের অনেকের চোখ ছলছল করে।

পরিবারের সদস্য ও দলীয় নেতাকর্মীরা জানায়, ময়মনসিংহ জেলা স্বেচ্ছাসেবক লীগের সদস্য ইলিয়াস নোমান। গফরগাঁও উপজেলার যশোরা গ্রামের মো. সিরাজুল হকের ছেলে। ছোটবেলা থেকেই অন্যায় দেখলেই প্রতিবাদ করতেন, মানুষের কোনো সমস্যা হলেই বন্ধুদের নিয়ে পাশে দাঁড়াতেন, আশপাশের গ্রামেও ছুটতেন মানুষের উপকারের জন্য। প্রধানমন্ত্রীর বিশেষ সহকারী প্রয়াত মাহবুবুল হক শাকিলের ভাগ্নে এই নোমান।

ইউনিয়ন আওয়ামী লীগের সভাপতি মো. মতিউর রহমান কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘প্রতিবাদী যুবক হিসেবেই নোমান এলাকায় পরিচিত। মাদক এবং সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে সোচ্চার ছিল, বাল্যবিবাহ হচ্ছে শুনলেই প্রশাসনে খবর দিয়ে নিজে উপস্থিত থেকে তা বন্ধ করত। কোনো অন্যায়কেই ছেলেটি সহ্য করত না। ওই সব কারণই কাল হয়েছে ছেলেটির জন্য।’

এলাকাবাসী, দলীয় নেতাকর্মী ও নোমানের পরিবারের অভিযোগ, স্থানীয় ইউনিয়ন যুবলীগের আহ্বায়ক রেজাউল করিম সুমন ও তাঁর ক্যাডার সারোয়ার জাহান, ধনু, রাকিব, ফয়সাল, আকিব, ওয়াহিদ, মুস্তাকিন ও মাহফুজ এলাকায় ইয়াবা, ফেনসিডিলসহ বিভিন্ন প্রকারের মাদক কারবার এবং সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড চালিয়ে আসছে। বেশ কয়েকবার এসবের প্রতিবাদ করে সন্ত্রাসীদের পুলিশে ধরিয়ে দিয়েছিলেন নোমান। সন্ত্রাসীরা বাল্যবিবাহের পক্ষে অবস্থান নিয়ে নানাভাবে হুমকিও দিত নোমানকে।

সম্প্রতি যশোরা গ্রামের ১৮টি পরিবারকে বিদ্যুতের ব্যবস্থা করে দেবে বলে প্রতিটি পরিবার থেকে ১০ থেকে ১৫ হাজার টাকা হাতিয়ে নেয় যুবলীগ নেতা সুমনের ভাগ্নে বকুল মিয়া ও তাঁর সহযোগীরা। এক বছর পেরিয়ে গেলেও বিদ্যুতের ব্যবস্থা করেনি, টাকাও ফেরত দেয়নি। বিষয়টির সমাধান পেতে নোমানকে জানায় পরিবারগুলো। নোমান পরে বকুলসহ অন্যদের টাকা ফেরত দিতে বলেন, নইলে স্থানীয় প্রশাসনের কাছে লিখিতভাবে অভিযোগ দেবেন বলে জানান। এতে ক্ষুব্ধ হয়ে ওঠে বকুলের মামা সুমনসহ ক্যাডাররা। গত ২ আগস্ট মোটরসাইকেলে ফেরার পথে বাড়ি থেকে এক কিলোমিটার দূরে তাঁর ওপর চাপাতি, চায়নিজ কুড়াল দিয়ে সুমনের নেতৃত্বে সন্ত্রাসীরা হামলা করে। সন্ত্রাসীদের কোপে তাঁর ডান হাত দেহ থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়; মুখে, পিঠে, শরীরের বিভিন্ন স্থানেও আঘাত লাগে। ওই ঘটনায় নোমানের স্ত্রী মাহমুদা আক্তার বাদী হয়ে যুবলীগ নেতা সুমনসহ সন্ত্রাসীদের বিরুদ্ধে গফরগাঁও থানায় একটি মামলা করেন। ওই মামলায় আসামি ধনু মিয়া গ্রেপ্তার হয়েছেন।

সন্ত্রাসীদের কাছে বিদ্যুতের জন্য দেওয়া টাকা ফেরত চাইতে গিয়ে মারধরের শিকার হয়েছিলেন যশোরা ইউনিয়নের খোদাবক্স গ্রামের আব্দুর রাজ্জাকের ছেলে মো. কামরুজ্জামান। মসজিদের মিটারের জন্যও টাকা নিয়েছিলেন সুমনের ভাগ্নে বকুল। এ প্রসঙ্গে ময়মনসিংহ পল্লী বিদ্যুৎ সমিতি-২ এলাকার পরিচালক ফরহাদ ঢালী বলেন, ‘বিদ্যুৎ দেওয়ার কথা বলে মিটারপ্রতি টাকা নেওয়ার অভিযোগ আসলে আমি বিষয়টি পল্লী বিদ্যুৎ অফিসে জানাই। গ্রাহকের সঙ্গে প্রতারণা করে টাকা হাতিয়ে নেয় তারা। পরে সমিতি থেকে এলাকায় বিদ্যুৎ সংযোগ দিতে গেলে পুলিশের উপস্থিতিতেই বাধা দেয় বকুলসহ ক্যাডাররা।’

এলাকাবাসীর অভিযোগ, যশোরা ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যানের প্রত্যক্ষ মদদেই সুমন ও তাঁর ক্যাডাররা মাদক কারবার ও সন্ত্রাসে বেপরোয়া। এই ক্যাডারদের হামলার শিকার হয়েছে অনেকেই। তাদের হামলায় গুরুতর আহত হয়ে হাসপাতালে চিকিৎসাধীন ছিল শিবগঞ্জ বিদান্স উচ্চ বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক বদরুল হকসহ অনেকেই।

উপজেলা ভাইস চেয়ারম্যান অধ্যক্ষ আতাউর রহমান বলেন, ‘অন্যায়ের প্রতিবাদ করতে গিয়ে এমনটা হবে কল্পনাও করতে পারি না। এ ঘটনার সঙ্গে জড়িতদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি না হলে আর কোনো যুবক মাদক কারবার ও সন্ত্রাসের প্রতিবাদ করবে না। আসামিরা যত বড় ক্ষমতাধরই হোক, তাদের আইনের আওতায় আনা উচিত।’

দেশের খবর

আপনার মতামত লিখুন :

প্রধান সম্পাদক: শাহীন হাসান
সম্পাদক : শাকিব বিপ্লব
নির্বাহী সম্পাদক : মো. শামীম
বার্তা সম্পাদক : হাসিবুল ইসলাম
প্রকাশক : তারিকুল ইসলাম
ভুইয়া ভবন (তৃতীয় তলা), ফকির বাড়ি রোড, বরিশাল ৮২০০।
ফোন: ০৪৩১-৬৪৮০৭, মোবাইল: ০১৭১৬-২৭৭৪৯৫
ই-মেইল: [email protected], [email protected]
© কপিরাইট বরিশালটাইমস ২০১২-২০১৮
টপ
  খিচুড়িসহ পাতিল ছিনতাই করলো ছাত্রলীগ!  রক্তাক্ত রিফাতকে একাই হাসপাতালে নিয়েছিল মিন্নি  মায়ের নাম রোকিয়া বেগম আর বাবার নাম আওয়ামী লীগ!  এডিট করে স্ক্রিনশট বানিয়ে সাংবাদিক মাইনউদ্দিনের বিরুদ্ধে অপপ্রচার, থানায় জিডি    বৃদ্ধাকে পেটানো উজিরপুরের সেই কনস্টেবল ক্লোজড, এখনও বহাল ওসি  আপত্তিকর অবস্থায় আটক অধ্যক্ষ-অধ্যাপিকা  আসামি ছেড়ে ইয়াবা ভাগবাটোয়ারা, ৫ পুলিশ গ্রেপ্তার  এক চার্জে ১৫৬ কিলোমিটার চলবে এই মোটরসাইকেল  বরিশালে শুরু হচ্ছে মশা জরিপ