২৫শে এপ্রিল, ২০২৪ খ্রিস্টাব্দ, বৃহস্পতিবার

হাসানাত নিশ্চুপ কেন?

বরিশাল টাইমস রিপোর্ট

প্রকাশিত: ১২:৫৯ পূর্বাহ্ণ, ০২ জুন ২০১৬

বরিশাল: বরিশাল আওয়ামী লীগের মধ্যে ছাত্র সংগঠন থেকে শুরু করে প্রতিটি অংগসংগঠনের কোথাও স্বস্তি নেই। বিভাজন, দ্বন্দ্ব ও একে অপরকে ঘায়েল করার নানান ঘটনায় স্থানীয় রাজনৈতিক অঙ্গনে তুলনামূলক ক্ষমতাসীন দলের মধ্যেকার অস্থিরতায় বরিশাল এখন উত্তপ্ত। বিশেষ করে পলিটেকনিক কলেজের ছাত্রলীগের আভ্যন্তরীণ কোন্দলের ফসল রেজাউল করিম রেজা হত্যকান্ড নিয়ে নানান ঘটনাবলিতে একটি নাটকীয় পর্ব চলছে। বিভাজন আ’লীগের একাংশের নেতা বা নিয়ন্ত্রক সাদিক আব্দুল্লাহ এই প্রেক্ষাপটে আছেন মহাবিপাকে। কারণ পলিটেকনিক কলেজের তার অনুসারীদের মধ্যেকার দ্বন্দ্ব থেকেই উদীয়মান নেতা রেজাউর করিম রেজাকে কুপিয়ে হত্যা করা হয়।

 

এমতাবস্থায় একদিকে এই হত্যা মামলার আসামী করা নিয়ে সাদিক অনুকুলে যেমন মতবিরোধ রয়েছে। তদরুপ পরিস্থিতিতে বাগে পেয়ে  জেবুন্নেছা আফরোজ গ্র“প চাচ্ছে সাদিক আব্দুল্লাহকে এখন চেপে ধরতে। সার্বিক প্রেক্ষাপটে এমন এক সময় রেজা নিহত হলো যা ইস্যু করে বরিশাল আ’লীগের পক্ষ-বিপক্ষ একে অপরকে ঘায়েল করার পরিকল্পনায় অগ্রসর হয়েছে বলে দল ঘনিষ্ট একাধিক সূত্র আভাস দিয়েছে। কিন্তু জেলার দলের নিয়ন্ত্রক আবুল হাসানাত আবদুল্লাহ এরূপ প্রেক্ষাপটে নিশ্চুপ থাকায় তার রহস্য নিয়ে নানা প্রশ্ন আলোচনায় আসছে। কারো কারও দাবি, সদর আসনের সাংসদ জেবুন্নেছা আফরোজকে বরিশালে প্রতিষ্ঠিত করতে শিল্পমন্ত্রী আমির হোসেন আমু যতটুকু আন্তরিক ততটুকু পুত্র সাদিকের জন্য আবুল হাসানাত আব্দুল্লাহ সোচ্চার নয়। আবার কেউ বলছে শিল্পমন্ত্রীর প্রভাব বিস্তারের কাছে হাসানাত পেরে না ওঠায় নিজেকে দুরুত্বে রেখে ইজ্জত রক্ষার কৌশল নিয়েছেন এই প্রখর নেতা।
সূত্রের দাবি বরিশাল পলিটেকনিক কলেজের কমিটি গঠন নিয়ে সাদিক অনুকুলে দ্বন্দ্ব এতটাই প্রকট হয়ে ওঠে যে হত্যা পরিকল্পা তরান্বিত করে টার্গেট ছাত্র নেতাকে। নচেৎ ২৭ মে রাতে সাদিকের বাড়িতে কমিটি নিয়ে পরস্পরবিরোধী দুই নেতা রেজাউল করিম রেজা এবং রাজিব হোসেনের মধ্যে প্রকাশ্য চ্যালেঞ্জ ছুড়ে দেওয়ার ১ ঘন্টার মাথায় ঘটে যায় এই প্রাণবিয়োগান্ত ঘটনা। বিষ্ময়কর বিষয় হলো এই হত্যার পেছনে রাজিবের হাত থাকার বিষয়টি পরিস্কার হয়ে উঠলেও তাকে মামলার আসামি করা হয়নি। একটি নির্ভরযোগ্য সূত্র জানায়, তবুও নিজের নিরাপত্তার স্বার্থে এই ছাত্র নেতা এখন সাদিক আব্দুল্লার কালি বাড়ি সড়কের বাসভবনে অনেকটা আত্তগোপনের ন্যায় আশ্রয় নিয়ে আছে। বিষয়টি কেউ নিশ্চিত না করলেও গত দুইদিন তাকে প্রকাশ্যেই ওই বাড়িতে দেখা গেছে। অথচ জেলা ছাত্রলীগের সাংগঠনিক সম্পাদক রাজিব হোসেন অপেক্ষা পলিটেকনিক কলেজ ছাত্রলীগের সাবেক নেতা নিহত রেজা ছিলেন সাদিকের অত্যন্ত প্রিয়ভাজন। দলীয় সূত্রগুলো এই তথ্য নিশ্চিত করে বলছে তদুপরি সাদিক এই হত্যা মামলাটি এমনভাবে নিয়ন্ত্রন করছেন যাতে তার অনুকুলে আঘাত না হানে। অর্থাৎ তার কোন অনুসারি আসামি হিসেবে অর্ন্তভূক্ত হোক।

 

এবং বরিশাল ছেড়ে লাপাত্তা হয়ে যাক। বর্তমান মুহুর্তে জেবুন্নেছা আফরোজের সাথে মহানগরের কমিটি গঠন নিয়ে লড়াই এতটাই তুঙ্গে উঠেছে যে উভয় নেতা-নেত্রী চাচ্ছে দল ভাড়ী এবং প্রতিটি কমিটি এমনকি কলেজ গুলোতে তাদের শক্তি বৃদ্ধি। বাস্তবে ঘটেছেও তাই। রেজা হত্যা মামলায় প্রধান সন্দেহভাজন রাজিব হোসেনকে আসামির তালিকায় কোথাও নাম নেই। সাদিক অনুকুলে ধারনা পলিটেকনিক কলেজের সাবেক নেতা ও ছাত্রলীগের জেলার সাধারন সম্পাদক আব্দুর রাজ্জাক তার প্রধান অনুসারি হলেও বর্তমান মুহুর্তে কলেজে রাজিবের প্রভাব বেশি। বেশ কয়েকটি সূত্রের জোড় দাবি রেজা হত্যা মামলা নিয়ে এখন চলেছে কিভাবে প্রতিপক্ষকে আসামীর তালিকায় নাম অন্তর্ভুক্ত করে পরস্পর বিরোধী গ্রুপকে চেপে ধরতে। জানা গেছে, এই মামলাটি দায়ের নিয়ে ঘটে নাটকীয় ঘটনা। অন্তত ৩ দফা মামলার আসামির তালিকা তৈরি করে পুলিশ তা এজাহার হিসেবে গ্রহনে বাধ্য করে। একারনেই মামলাটি গ্রহনে সময় ক্ষেপন করা হয়।

 

তাছাড়া জেবুন্নেছা আফরোজ গ্রুপ থেকে চাপ ছিল প্রকৃত হত্যাকরীদের মামলার আসামী হিসেবে চিহ্নিত করতে। কিন্তু কোতয়ালী মডেল থানা পুলিশ প্রথম থেকে বলে আসছিল মামলাটি গ্রহন করা হয়েছে। এরই মধ্যে ২৯ মে রাতে যুবলীগ নেতা মেহেদী হাসান ঘটনাচক্রে আটক হয়ে গেলে পাল্টে যায় পরিস্থিতি। কারন আটক এই যুবলীগ নেতা সাদিক আব্দুল্লাহর ঘনিষ্ট সহচর হিসেবে রাজনৈতিক অঙ্গনে পরিচিত। আটকের ঐ রাতেই যুবলীগ নেতা টুটুল ১২ জনের একটি তালিকা নিয়ে পুলিশকে মামলা গ্রহনে এক প্রকার চাপের মুখে ফেলে দেয়। ঐ মামলার তালিকায় সাদিক অনুসারি বেশ কয়েকজন থাকলেও অধিকাংশ অপরিচিত। পরে আবার মামলার তালিকায় নাম বৃদ্ধি করে ২৬ জনকে অর্ন্তভুক্ত করা হয়। একটি সূত্রের দাবি মেহেদী আটকের পরই সাদিক চেয়েছিল মহানগর ছাত্রলীগের সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদক জসিম উদ্দিন ও অসিম দেওয়ানকে এই মামলায় আসামি করা। যাতে জেবুন্নেছা অংশের ছাত্র সংগঠনের নিয়ন্ত্রক এই দুই নেতা পলাতক থাকলে অন্তত সাদিকের জন্য মাঠ দখলে সহায়ক হয়।

 

পুলিশের একটি সূত্র তথ্য দিয়ে জানায়, জেবুন্নেছার পাশাপাশি শিল্পমন্ত্রি আমির হোসেন আমু মামলার আসামী এবং এজাহারটি গ্রহনে সতর্ক বানী জানিয়ে দেয়। । কোতয়ালী মডেল থানার সদ্য বিদায়ী ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা সাখাওয়াত হোসেন গত ৩ বছর থাকাকালীন সাদিক আব্দুল্লাহর কোন সুপারিশ ওই পুলিশ কর্মকর্তা আমলে নেয়নি। কিন্তু চলতি দায়িত্বে থাকা কোতয়ালী মডেল থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা অতটা দৃঢচেতা না হওয়ায় সাদিকের চাপের মুখে পরে যায়। নিয়ে নেয় মামলা। সেখানে মহানগর ছাত্রলীগির সভাপতি জসিমকে হত্যার পরিকল্পনা কারিদের একজন হিসেবে চিহ্নিত করে আসামী করা হয়। দল ঘনিষ্ট একটি সূত্র জানায়, এই হত্যাকান্ডের মামলা নিয়ে জেলা আ’লীগের সভাপতি ও কেন্দ্রীয় নেতা আবুল হাসানাত আব্দুল্লাহ কোনরুপ সুপারিশ রাখেনি পুলিশ অনুকুলে। এর বিরোধীতা করে অপর একটি সূত্র জানায়, হাসানাতের চাপের মুখেই জসিমকে আসামী করার সহায়ক হয়েছে সাদিকের জন্য। যদিও এই তথ্যের কোন সত্যতা নিশ্চিত করা যায়নি। তবে নানা আকার-ইঙ্গিতে অনুমান করা হচ্ছে হাসানাত কৌশলী অবস্থানে থেকে এমনভাবে ভুমিকা রাখছেন যাতে তিনি কোন বিতর্কে না জড়ান।

 

বিশেষ করে ঝালকাঠির নেতা শিল্পমন্ত্রি আমির হোসেন আমু বরিশাল প্রশাসনে প্রভাব বিস্তার করায় হাসানাত দীর্ঘদিন অনেকটা অসহায় অবস্থায় ছিল। কিন্তু সাম্প্রতিক হাসানাত বরিশার প্রশাসনে আমুর সেই প্রভাব অনেকটাই খর্ব করতে সক্ষম হয়েছেন। যার বুনিয়াদেই বরিশাল মেট্রোপলিটন এলাকার থানা গুলোতে প্রয়াত নেতা শওকত হোসেন হিরনের সাজানো গোছোনো পুলিশ কর্তাদের দীর্ঘদিন পর বদলী প্রক্রিয়া শুরু দেখা যায়। উদাহরণ কোতয়ালী মডেল থানার ওসি সাখাওয়াত। তিনি দীর্ঘদিন ৩ বছর ক্ষমতায় থেকে সদর আসনের সাংসদ ও হিরন পতœী জেবুন্নেছা আফরোজকে নানাভাবে সহায়তা দিয়ে আসছিলেন। হাসানাত পর্দার অন্তরালে থেকে কলকাঠি নাড়ার যে তথ্য পাওয়া যায় তার সাথে বাস্তবতার মিল পাওয়া অসম্ভব। কারন তিনি প্রকাশ্যে কোন ভুমিকায় নেই। এমনকি বরিশালের রাজনৈতিক মাঠেও তিনি নামছে না। ফলে বরিশালে ক্ষমতাসীন দল নিয়ন্ত্রনহীন অবস্থায় রয়েছে। কোন নেতা কেউ কারো কথা আমলে নিচ্ছেন না।

 

এক হযবরল অবস্থার মধ্যে রয়েছে বরিশার আ’লীগ। রাজনৈতিক একটি সূত্রের দাবি তিনি পুত্র সাদিক আব্দুল্লাহর বরিশাল নিয়ে রাজনীতি পছন্দ না করলেও এখন পরিস্থিতি এমন দাড়িয়েছে যে তাকে সহায়তা করা ছাড়া কোন কুল নেই। একটি নির্ভরযোগ্য সূত্রের দাবি হাসানাত চাচ্ছেন বরিশালের সাংগঠনিক পরিস্থিতিগত কারনে আবুল হাসানাতের গুরুত্ব কেন্দ্রে উপলব্ধি বোধ হোক। কারন জেবুন্নেছাকে রাজনীতিতে প্রতিষ্ঠা করতে আসা শিল্পমন্ত্রি আমির হোসেন আমু বরিশাল নিয়ন্ত্রন শুরু করায় সাংগঠনিক কাঠামো ভেঙ্গে পরার দায়ভার তার ঘারে চাপিয়ে দিয়ে হাসানাত রাজনীতিতে একটি গেইম নিতে চান। ফলে রহস্যের চাদরে ঢেকে রেখেছেন রাজনীতিকে পোড় খাওয়া নেতা হাসানাত।

5 বার নিউজটি শেয়ার হয়েছে
  • ফেইসবুক শেয়ার করুন