২৯শে মে, ২০২৪ খ্রিস্টাব্দ, বুধবার

২ চেয়ারম্যান প্রার্থী নিয়ে আ’লীগে বিভেদ, সংঘাত-সহিংসতার শঙ্কা

Zahir Khan

প্রকাশিত: ০৫:৩৮ অপরাহ্ণ, ১০ এপ্রিল ২০২৪

জহির খান, বিশেষ প্রতিবেদক:: দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের রেশ কাটতে না কাটতেই উপজেলা নির্বাচন নিয়ে আলোচনা জমে উঠেছে। চায়ের দোকান থেকে শুরু করে পাড়া-মহল্লায় আসন্ন এই নির্বাচন নিয়ে আলোচনার ঝড় বইছে। বরিশাল জেলার অন্যান্য উপজেলার ন্যায় উজিরপুরেও উপজেলা পরিষদ নির্বাচনকে ঘিরে দলীয় নেতকমী থেকে শুরু করে সাধারণ ভোটারদের মাঝেও চলছে নানা জল্পনা-কল্পনা। সেই সাথে আসন্ন এই নির্বাচনকে সামনে রেখে চাঙা হয়ে উঠেছেন আওয়ামী লীগের অনেক নেতা। জেলার এই উপজেলায় নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে কথা তৃতীয় ধাপে। নয়টি ইউনিয়ন ও একটি পৌরসভা নিয়ে গঠিত এই উপজেলার মোট ভোটার ২ লাখ ১৮ হাজার ২৫২ জন। এর মধ্যে পুরুষ ভোটার ১ লাখ ১১ হাজার ৩৫ জন এবং নারী ভোটার ১ লাখ ৭ হাজার ২১৬ জন।

সূত্র মতে, এবার উপজেলা নির্বাচনে দলীয় প্রতীক নৌকা না থাকায় আওয়ামী লীগে প্রার্থীদের ছড়াছড়ি হতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে। এই নির্বাচনকে সামনে রেখে সরকার দলীয় সম্ভাব্য প্রার্থীরা বিভিন্ন কৌশলে দলের সমর্থন আদায়ের চেষ্টা করছেন। পাশাপাশি তারা এলাকার বিভিন্ন সামাজিক অনুষ্ঠানে যোগ দিয়ে নির্বাচনে নিজেদের প্রার্থী হওয়ার কথা জানিয়ে দিচ্ছেন। তবে বিএনপি ও অন্য দলের নেতাকর্মীরা জানান, যেখানে আওয়ামী লীগের লোকজনই নিরপেক্ষ ভোট নিয়ে শঙ্কিত, সেখানে অন্য দলের নেতাদের নির্বাচনে অংশ নেওয়া নিয়ে সন্দেহ রয়েছে।

সূত্রে জানা গেছে, উজিরপুর উপজেলা পরিষদ নির্বাচনে চেয়ারম্যান পদে বেশ কয়েকজন আওয়ামী লীগ নেতাসহ অনেক প্রার্থী প্রতিদ্বন্দ্বিতা করতে পারেন বলে আভাস পাওয়া যাচ্ছে। তাদের মধ্যে বর্তমান উপজেলা পরিষদ চেয়ারম্যান আব্দুল মজিদ সিকদার বাচ্চু এবং সাবেক উপজেলা পরিষদ চেয়ারম্যান হাফিজুর রহমান ইকবালকে নিয়েই সর্বত্র আলোচনা চলছে।

বর্তমান উপজেলা চেয়ারম্যান আ. মজিদ সিকদার বাচ্চু উপজেলা আওয়ামী লীগের সিনিয়র সহ-সভাপতি এবং সাবেক চেয়ারম্যান হাফিজুর রহমান ইকবাল সহ- সভাপতি হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন। তারা দু’জনেই নিজেদের নিজস্ব ভোট ব্যাংকের ওপর ভরসা করে নির্বাচনী প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নেমেছেন। এর মধ্যে এগিয়ে রয়েছেন বর্তমান উপজেলা চেয়ারম্যান ও আওয়ামী লীগের সিনিয়র সহ-সভাপতি আব্দুল মজিদ সিকদার বাচ্চু। তিনি নিজ দলীয় নেতা-কর্মীদের একটি বড় অংশ নিয়ে নির্বাচনী মাঠ চষে বেড়াচ্ছেন। চালাচ্ছেন নির্বাচনের প্রচার-প্রচারণা। সেই সাথে প্রত্যন্ত অঞ্চলের ভোটারদেরকে সুষ্ঠু নির্বাচনের ভরসা দিয়ে ভোটের মাঠে দাঙ্গা সৃষ্টিকারীদের প্রতিহত করার ঘোষণা দিচ্ছেন।

এসব বিষয় নিয়ে বর্তমান উপজেলা চেয়ারম্যান ও আওয়ামী লীগের সিনিয়র সহ-সভাপতি আব্দুল মজিদ সিকদার বাচ্চুর সাথে যোগাযোগ করা হয়ে তিনি বলেন, আমার নিজস্ব যে ভোট ব্যাংক রয়েছে এবং গত পাঁচ বছর ধরে উপজেলাবাসীর জন্য যে সকল উন্নয়ণমূলক কাজ করেছি তাতে সুষ্ঠু নির্বাচন অনুষ্ঠিত হলে আমি বিপুল ভোটে জয় লাভ করবো।

এবারের নির্বাচনে দলীয় প্রতীক না থাকায় নিজ দলীয় প্রতিপক্ষ প্রার্থীর কারণে নেতা-কর্মীদের মধ্যে বিভাজন হতে পারে কিনা এমন প্রশ্নের জবাবে এই আওয়ামী লীগ নেতা বলেন, যেহেতু এবার নির্বাচনে দলীয় প্রতীক থাকছে না, তাই দলীয় প্রার্থীর সংখ্যাও বাড়বে। যার কারণে দলীয় নেতাকর্মীদের মধ্যেও কিছুটা বিভাজন তৈরি হবে।

আওয়ামী লীগের নিজ দলীয় নেতাকর্মীদের মধ্যে সংঘর্ষ হতে পারে কিনা সে বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি বলেন, আমার প্রতিদ্বন্দ্বি সাবেক চেয়ারম্যানের সমর্থকদের বেশিরভাগই অস্ত্রধারী সন্ত্রাসী। তারা গত নির্বাচনে নৌকার বিরোধীতা করে বিভিন্ন এলাকায় আমার নিরীহ ভোটার ও কর্মী-সমর্থকদের ওপর হামলা চালিয়েছিলো। তবে এবার সেই সুযোগ দেওয়া হবে না, ভোটের মাঠে দাঙ্গা সৃষ্টি করতে চাইলেই প্রশাসন নিয়ে তাদেরকে প্রতিহত করা হবে। যাতে সাধারণ ভোটারদের মধ্যে আতঙ্ক সৃষ্টি না হয়।

অপরদিকে আসন্ন নির্বাচনে ভোটের মাঠে লড়তে বসে নেই বর্তমান উপজেলা আওয়ামী লীগের সহ-সভাপতি ও সাবেক চেয়ারম্যান হাফিজুর রহমান ইকবাল। তিনিও তার নিজস্ব কর্মী-সমর্থকসহ নিজ দলীয় নেতাকর্মীদের একাংশ নিয়ে নির্বাচনী মাঠে প্রচার-প্রচারণায় নেমে পড়েছেন। ২০১৯ সালের নির্বাচনে নৌকার বিপক্ষে স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে অংশগ্রহণ করে পরাজিত আওয়ামী লীগের এই নেতা এবারে জয়ের হিসেবটা মেলাতে চালাচ্ছেন নানামুখী তৎপরতা।

এসব বিষয়ে সাবেক চেয়ারম্যান ও আওয়ামী লীগের সহ-সভাপতি হাফিজুর রহমান ইকবালের সাথে মুঠোফোনে যোগাযোগ করা হলে তিনি বলেন, যদিও এবারের নির্বাচনে দলের হাইকমান্ড থেকে সিদ্ধান্ত দেওয়া হয়েছে প্রতীক থাকবে না। তবে আমাদের উজিরপুর উপজেলার প্রেক্ষাপটটা একটু ভিন্ন হবে। কারণ আমরা উজিরপুর আওয়ামী লীগ আমাদের অভিভাবক বরিশাল জেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি আলহাজ্ব আবুল হাসনাত আব্দুল্লাহ্ এমপির ওপর নির্ভরশীল। তিনি যদি কাউকে নির্ধারিত করে দেন, কিংবা আমাদের উজিরপুর আওয়ামী লীগকে সিদ্ধান্ত নিতে বলেন তাহলে প্রেক্ষাপট পরিবর্তন হয়ে যাবে।

দলীয় একাধিক প্রার্থী থাকায় তৃণমূল নেতাকর্মীদের মধ্যে বিভেদ-সংঘাতের শঙ্কা রয়েছে কিনা এমন প্রশ্নের জবাবে এই আওয়ামী লীগ নেতা বলেন, ব্যক্তিগতভাবে নেতাকর্মীদের পছন্দের প্রার্থী থাকতে পারে। আবার একজনের প্রতি আরেকজনের ব্যক্তিগত আক্রোশও থাকতে পারে। তবে এজন্য নির্বাচনী মাঠে নিজেদের মধ্যে সংঘাত-সংঘর্ষ হওয়ার কোনো শঙ্কা নেই।

এদিকে উজিরপুর উপজেলা আওয়ামী লীগের একাধিক নেতা-কর্মী জানিয়েছেন, দলের গুরুত্বপূর্ণ নেতারা একে অন্যের বিরুদ্ধে নির্বাচনে নেমে যাওয়ায় বিব্রতকর অবস্থায় পড়েছেন তৃণমূল নেতাকর্মীরা। ভবিষ্যতের কথা চিন্তা করে দলের পদধারী নেতাদের অনেকেই প্রকাশ্যে কোনো প্রার্থীর পক্ষে নির্বাচনী মাঠে নামছেন না। তবে গোপনে যে যার পছন্দের প্রার্থীর হয়ে কাজ করছেন। অন্যদিকে, নির্বাচনের মাঠে একই দলের একাধিক প্রার্থীর উপস্থিতি বিশৃঙ্খলা এবং দলীয় কোন্দল বাড়াচ্ছে। সেই সাথে যত দিন ঘনিয়ে আসছে ততই নিজ দলীয় নেতাকর্মীদের মধ্যে সংঘাত-সহিংসতার আশঙ্কা বাড়ছে। যা নিয়ে দলীয় নেতাকর্মী থেকে শুরু করে সাধারণ ভোটারদের মাঝেও আতঙ্ক বিরাজ করছে।

উপজেলা আওয়ামী লীগের শীর্ষ নেতারা মনে করছেন, অংশগ্রহণমূলক নির্বাচন করার কৌশল হিসেবে দলীয় হাইকমান্ড সিদ্ধান্ত নিয়েছে, এবার উপজেলা নির্বাচনে দলীয় প্রতীকে অংশ নেবে না। তারা কোনো প্রার্থীকেও মনোনয়ন দেবে না। এটা তারা আগেই নির্বাচন কমিশনে জানিয়ে দিয়েছে। ফলে উপজেলা নির্বাচনে এবার প্রার্থী অনেক বেশি হবে। কিন্তু আওয়ামী লীগের সিদ্ধান্তে এই নির্বাচনে তৃণমূলস্তরে দ্বন্দ্ব আরো প্রকট হওয়ার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে। আসন্ন উপজেলা পরিষদ নির্বাচন ঘিরে আওয়ামী লীগে বিভেদ নতুনভাবে মাথাচাড়া দিয়ে উঠছে। দলীয়ভাবে মনোনয়ন না দেওয়ার সিদ্ধান্তে ক্ষমতাসীন দলে পুরোনো দ্বন্দ্ব কোন্দল নতুন করে ফিরে আসছে। যা নিয়ে দুশ্চিন্তায় পড়েছেন খোদ দলের স্থানীয় শীর্ষ নেতারা। আবার এমন পটভূমিতে স্থানীয় প্রশাসনও কতটা নিরপেক্ষ ভূমিকা পালন করতে পারবে কিংবা পালনের চেষ্টা করবে সেই প্রশ্নও ঘুরপাক খাচ্ছে তাদের মধ্যে।

আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় বেশ কয়েকজন নেতা জানিয়েছেন, এবারের উপজেলা নির্বাচনকে ঘিরে কোনো সংঘাত যাতে না হয়, সে জন্য ঈদের পরপরই আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় কার্যনির্বাহী সংসদের বৈঠক করা হবে। সেই বৈঠক থেকে দলের সব প্রার্থীর জন্য কিছু নির্দেশনা দেওয়া হতে পারে।

784 বার নিউজটি শেয়ার হয়েছে
  • ফেইসবুক শেয়ার করুন