ধেয়ে আসা শক্তিশালি ঘূর্ণিঝড় ‘মোরা’ সম্পর্কে কিছুই জানেন না ভোলার উপকূলীয় এলাকা মনপুরা উপজেলার বিচ্ছিন্ন চরাঞ্চলের অন্তত ১ লক্ষাধিক মানুষ। দেশের বিভিন্ন স্থান থেকে চরবাসীদের অনেকে ফোনে ঘূর্ণিঝড়ের কথা জানালেও চরবাসীদের অনেকেই তা বিশ্বাস করছেন না। তারা বলছেন, আকাশে কোনো ঘূর্ণিঝড়ের লক্ষণ দেখা যাচ্ছে না।

এছাড়া বড় ধরনের বিপদ সংকেত দেখা দিলে স্থানীয় প্রশাসনের পক্ষ থেকে অন্তত মাইকিং করে বাসিন্দাদের সতর্ক করা হতো বলেও জানান তারা।

জানতে চাইলে মনপুরা দ্বীপের বাসিন্দা আবুবক্কর ইসমাইল মোবাইল ফোনে বরিশালটাইমসকে বলেন, ‘কিসের ঘূর্ণিঝড় (!) আমার তো মোবাইল ফোন বন্ধ ছিল। এছাড়া এখন নেটওয়ার্কও থাকে না। আমরা তো জানি না। প্রশাসনের পক্ষ থেকেও কোনো সতর্ক বার্তা দেয়া হয়নি। এখন কি করব? কোথায় থাকব? আমাদের এ চরে তো কোনো ঘূর্ণিঝড় আশ্রয় কেন্দ্রও নেই।’

প্রায় ছোট-বড় ৩০টি চর নিয়ে মনপুরা উপজেলা গঠিত। এসব চরের মধ্যে অন্তত ১৫টি চরে মানুষ বসবাস করেন। এর মধ্যে ৭টি চর মোটামুটি উন্নত। বাকি ১৫টি চরে কোনো উন্নয়নের ছোঁয়া লাগেনি। যে কারণে কোনো দুর্যোগময় মুহূর্তে এসব চরের মানুষ কোনো সতর্কবার্তা পান না।

বিভিন্ন সময়ে উপকূল দিয়ে বয়ে যাওয়া ঘূর্ণিঝড়ে এ চরগুলোতে প্রাণহাণির ঘটনা বেশি ঘটে।

জানতে চাইলে দ্বীপের সাবেক ইউপি সদস্য মো. কামাল উদ্দিন বরিশালটাইমসকে বলেন, ‘পরিস্থিতি দেখে ঘূর্ণিঝড় হবে তা বোঝা যাচ্ছে না। তবে বিকেল থেকে ইউনিয়ন পরিষদের পক্ষ থেকে মাইকিং করা হচ্ছে। কিন্তু এখন পর্যন্ত কোনো বৃষ্টি নেই।’

তিনি জানান, মানুষ ঘূর্ণিঝড়ের কথা জানলেও আশপাশের বিচ্ছিন্ন চরাঞ্চলের মানুষ তা জানেন না। এসব চরে মানুষের পাশপাশি লাখ লাখ গরু-মহিষও রয়েছে।

ওই চরগুলো মোবাইল ফোন অপারেটর কোম্পানির নেটওয়ার্কের আওতায় আসেনি। নেই কোনো রাস্তাঘাট কিংবা আশ্রয়কেন্দ্র। আর অবহেলিত এ চরগুলোতে অন্তত দুই লক্ষাধিক মানুষ বসবাস করছেন।

ওই চরের বাসিন্দা আসমা বেগম মোবাইল ফোনে বরিশালটাইমসকে বলেন, ‘সিকনাল (সংকেত) আছে হুইনছি (শুনেছি)। মোবাইলে ঢাকাত্তোন (ঢাকা থেকে) কইছে। কিন্তু আঙ্গো (আমাদের) ইয়ানে (এখানে) কোনো মাইকিং-টাইকিং নাই। আগে তো বন্য অইলে (হলে) হতাকা (পতাকা) উড়তো। অন হেগিও (এখন সেগুলোও) দেখি না। আল্লার ওপর ভরসা করি আছি। যা অয় অইব।’

তবে স্থানীয় সংবাদকর্মীরা জানান, উপজেলার চরাঞ্চলে কোনো এলাকায় এখনও মাইকিং করা হয়নি। খোলা নেই আশ্রয় কেন্দ্রগুলোও। চালু করা হয়নি দুর্যোগ উপলক্ষে নিয়ন্ত্রণ কক্ষ। প্রশাসনের পক্ষ থেকে কোনো তদারকিও নেই। স্থানীয়রা নিজেদের প্রয়োজনেই নিজেরা উদ্যোগ নিচ্ছেন। এ অবস্থায় কোনো দুর্যোগ হলে অতীতের মতো ভয়াবহ মাশুল দিতে হবে মনপুরাবাসীকে।

এ বিষয়ে হাতিয়া উপজেলা প্রশাসন বলছে, ‘এখনও দুর্যোগ শুরু হয়নি। আসবে শুনছি। অপেক্ষায় আছি, আসুক।’

দুর্যোগ আসলে কী পরিমাণ প্রস্তুতি রয়েছে- জানতে চাইলে তারা বলছে, ‘আমরা মানুষকে বলে দিয়েছি। সাইক্লোন সেন্টারগুলো রেডি রেখেছি। অনেকে গেছেন, অনেকে যাননি। চরগুলোতে মানুষ থাকে না। কিছু মানুষ গেছেন। যারা শখের বসে গেছেন। তারা চলে আসতে পারলে তো পারলো। না পারলে কি করার! বাকি চরের কোনো খবর নেই।’

ঘূর্ণিঝড় ‘মোরা’র কারণে চট্টগ্রাম ও কক্সবাজার সমুদ্র বন্দরসমূহকে ০৭ (সাত) নম্বর বিপদ সংকেত নামিয়ে তার পরিবর্তে ১০ (দশ) নম্বর পুনঃ ১০ (দশ) নম্বর মহাবিপদ সংকেত দেখাতে বলা হয়েছে।

উপকূলীয় জেলা চট্টগ্রাম, কক্সবাজার, নোয়াখালী, লক্ষ্মীপুর, ফেনী, চাঁদপুর এবং তাদের অদূরবর্তী দ্বীপ ও চরসমূহ ১০ (দশ) নম্বর পুনঃ ১০ (দশ) নম্বর মহাবিপদ সংকেতের আওতায় থাকবে।

মংলা ও পায়রা সমুদ্র বন্দরসমূহকে ০৫ (পাঁচ) নম্বর বিপদ সংকেত নামিয়ে তার পরিবর্তে ৮ (আট) নম্বর পুনঃ ৮ (আট) নম্বর মহাবিপদ সংকেত দেখাতে বলা হয়েছে।

উপকূলীয় জেলা ভোলা, বরগুনা, পটুয়াখালী, বরিশাল, পিরোজপুর, ঝালকাঠি, বাগেরহাট, খুলনা, সাতক্ষীরা এবং তাদের অদূরবর্তী দ্বীপ ও চরসমূহ ৮ (আট) নম্বর পুনঃ ৮ (আট) নম্বর মহাবিপদ সংকেতের আওতায় থাকবে।

আবহাওয়া অধিদফতরের আবহাওয়াবিদ আব্দুল মান্নান সোমবার সন্ধ্যা ৬টার দিকে বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন।”