বরিশালের আদালতে বরগুনা সদর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা গাজী তারেক সালামের বিরুদ্ধে মামলা এবং গ্রেপ্তারের ঘটনায় তোলপাড় হয়েছে সচেতন মহলে। নিন্দা করা হচ্ছে সব মহল থেকে। নিন্দনীয় এ ঘটনায় আমার তিনটি বিষয় মনে পড়েছে। একটি ফরাসি গল্প, নিজের অভিজ্ঞতা এবং হুমায়ূন আহমেদের সমুদ্র বিলাস নাটক।

ফরাসি গল্পটি এরকম, একজন বিচারক সব মামলায় প্রথমেই ঘটনার নেপথ্যের নারীটিকে খুঁজে বের করার নির্দেশ দেন। প্রতিটি মামলায় বিচারক এ কাজ করেন এবং সবাইকে অবাক করে দিয়ে তদন্তে ঠিকই একজন নারীকে পাওয়া যায় ঘটনার নেপথ্যে। একবার উল্লিখিত বিচারকের আদালতে গভীর রাতে সড়ক দুর্ঘটনার মামলা এলো।  এতে চালক ও মালিক দুজনই নিহত হয়েছেন এবং গাড়িটি দুমড়েমুচড়ে মোয়া হয়ে গেছে। কিন্তু এবারো উল্লিখিত বিচারক ঘটনার নেপথ্যের নারীটিকে খুঁজে বের করার নির্দেশ দিলেন যথারীতি। বিচারকের এবারের নির্দেশে বেশ হাস্যরসের উদ্রেক হলো তদন্তকারীদের মধ্যে। সবাই ধরে নিলেন, এর পেছনে কোনো নারী থাকার সুযোগই নেই। কিন্তু অনেক তদন্তের পর দেখা গেল, আসলেই নারী আছে। তবে রক্তমাংসের নয়, বিলবোর্ডের। অর্ধনগ্ন উন্নত বক্ষের নারী ছবি দেখতে দেখইে কিঞ্চিত মাতাল ড্রাইভার গাড়ি লাগিয়ে দিয়েছিল রোড ডিভাইডারে।

অনেক গোজামিলের এ গল্পের সঙ্গে সহজেই মিলানো যায় বরগুনার নির্বাহী কর্মকর্তার বিরুদ্ধে আইনজীবীর মামলার ঘটনা। ফরাসির গল্পের সব অপরাধের পেছনেই যেমন নারীর উপস্থিতি, তেমনই আমাদের দেশে এখন সবকিছুর পেছনেই রয়েছে নিজের ধান্দা!

গত ১৭ মার্চ বঙ্গবন্ধুর জন্মদিন ও জাতীয় শিশু দিবসে বরিশালের আগৈলঝাড়া উপজেলা প্রশাসনের আয়োজনে ‘বঙ্গবন্ধু ও বাংলাদেশ’ শিরোনামে এক চিত্রাঙ্কন প্রতিযোগিতার আয়োজন করা হয়। এ উপজেলার তৎকালীন নির্বাহী কর্মকর্তা গাজী তারিক সালমানের উদ্যোগে এ চিত্রাঙ্কন প্রতিযোগিতায় প্রথম ও দ্বিতীয় স্থান অর্জনকারী ছবির জন্য দুই শিশু পুরস্কৃত হয়। আর ২৬ মার্চ স্বাধীনতা ও জাতীয় দিবস উদযাপনে উপজেলা প্রশাসনের আমন্ত্রণপত্রে ছবি দুটি ব্যবহার করা হয়। এর মধ্যে প্রথম স্থান পাওয়া ছবিটি আমন্ত্রণপত্রের কভারে এবং দ্বিতীয় ছবিটি ব্যবহার করা হয় আমন্ত্রণপত্রের পেছনের পাতায়। এটি ছিল উপজেলা প্রশাসনের সুদূরপ্রসারী,  প্রশংসনীয় ও মৌলিক উদ্যোগ। এর ফলে শিশুরা বঙ্গবন্ধুর প্রতি অধিকর আকৃষ্ট হবে। যে লক্ষেই বঙ্গবন্ধুর জম্মদিনকে শিশু দিবস হিসেবে ঘোষণা করা হয়েছে। উদ্দেশ্য হচ্ছে, শুরু থেকে এক একটি প্রজম্মকে জাতির পিতার প্রতি অনুরক্ত করে তোলা। কিন্তু বরিশালে ঘটলো উল্টো ঘটনা। যার প্রতিক্রিয়ায় তৃণমূল থেকে শীর্ষ পর্যন্ত বিরূপ অবস্থা সৃষ্টি হয়েছে।

এ প্রসঙ্গে বিবিসির সঙ্গে ২০ জুলাই সাক্ষাৎকারে এইচ টি ইমাম প্রধানমন্ত্রীর প্রতিক্রিয়ার কথা জানিয়েছেন। প্রধানমন্ত্রী বলেছেন, ক্লাস ফাইভের ছেলে-মেয়েদের মধ্যে প্রতিযোগিতার আয়োজন করে এ অফিসার সুন্দর একটি কাজ করেছেন। এবং ছবিটিতে বিকৃত করার মতো কিছু করা হয়নি। এ অফিসারটি রীতিমত পুরস্কার পাওয়ার যোগ্য। আর সেখানে উল্টো আমরা তার সঙ্গে এই করেছি! এটি রীতিমত নিন্দনীয়। মামলা দায়েরকারীর ব্যাপারে এইচ টি ইমাম বিবিসির সঙ্গে সাক্ষাৎকারে বলেছেন, ‘এ লোক পাঁচ বছর আগেও আওয়ামী লীগে ছিল না। দলের ভেতরে ঢুকে পড়া এই ‘অতি উৎসাহীরাই’ এ কাণ্ড ঘটিয়েছে; এ চাটুকাররাই আমাদের ক্ষতি করছে।’ মামলা দায়েরকারী অ্যাডভোকেট ওবায়েদ উল্লাহ সাজুকে ২১ জুলাই আওয়ামী লীগ থেকে সাময়িক বহিষ্কার করা হয়েছে। কিন্তু বরিশালবাসীসহ দেশবাসীর প্রত্যাশা আরও বেশি।

নির্বাহী কর্মর্কতা গাজী তারিক সালমানের বিরুদ্ধে জেলার আইনজীবী সমিতির সভাপতি ওবায়েদ উল্লাহ সাজু আদালতে মামলা দায়ের করেন ৭ জুন। তার অভিযোগ, বঙ্গবন্ধুর ছবি বিকৃত করা হয়েছে। মামলা দায়েরকারী এ উকিল বরিশালে আওয়ামী লীগের নেতাও; দলের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুর কাদেরের ভাষায় হাইব্রিড। এরপরও তিনি ধর্মবিষয়ক সম্পাদক হয়েছেন। এ পদ পাওয়া নিয়ে সে আর এক বাণিজ্যের নষ্ট কাহিনির রটনা আছে; যে বাণিজ্য বরিশালে সব সীমা ছাড়িয়েছে বিগত ইউপি নির্বাচনের সময়।

কেউ অতিরিক্ত সহানুভূতিশীল হয়ে ভাবতে পারেন, বঙ্গবন্ধুর প্রতি অতি আবেগে আশেকে দেওয়ানা হয়ে ওবায়েদ উল্লাহ সাজু খেয়াল করেননি যে, ছবিটি শিশুর আঁকা। এবং আবেগের আতিশয্যে তিনি প্রায় ‘বোধনাশা’ হয়ে গিয়েছিলেন। এমনটি ভাবা হয়তো স্বাভাবিক অ্যাডভোকেট সাজুর কুষ্টিনামা জানা না থাকলে। কিন্তু বরিশালের অনেকেই জানেন, ক্ষমতাসীন দলে তার যোগদানের উদ্দেশ্য ছিল বাণিজ্যে। যা তিনি ভাগ দেয়ার তরিকা মেনে অনেকটাই হাসিল করতে পেরেছেন। কিন্তু তিনি প্রথম হোচট খেয়েছেন উজিরপুরের জয়শ্রী বাসস্ট্যান্ড সংলগ্ন জমি দখল করতে গিয়ে। এ জমিতে তিনি ১৩টি দোকান নির্মাণও শুরু করেছিলেন। এ ছবি ও খবর সংগ্রহ করতে গেলে তিনি সাংবাদিকদের ওপর দলবল নিয়ে চড়াও হন; এ সময় ক্যামেরাও ভাঙচুরের ঘটনা ঘটে। এ লংকাকাণ্ড চলাকালে থানা পুলিশ আকাশের তারা গুণছিল। পরে জেলার ঊর্ধ্বতন পুলিশের নির্দেশে ভূমিদস্যুদের নিবৃত্ত করতে এগিয়ে আসে স্থানীয় পুলিশ। ভূমি নিয়ে অনেক ঘটনা আছে অ্যাডভোকেট সাজুর। যার সূচনা হয়েছিল বরিশাল শহরে সদরগার্লস স্কুলের কাছে তার ভগ্নিপতির জমি দিয়ে। অনেক অঘটনের খলনায়ক নব্য আওয়ামী লীগার ওবায়েদ উল্লাহ সাজু। এ ছাড়া বরিশাল শহরে তিনি মাদক মামলার ‘নির্ভরযোগ্য’ উকিল; তার কাছে গেলেই জামিন! বলা হয়, এ ক্ষেত্রে তার হাত সম্প্রসারিত বরিশালের বাইরেও। কাজেই তাকে নিজস্ব প্রয়োজনের বাইরেও অনেক আদেশ নির্দেশ পালন করতে হয় টিকে থাকার জন্য।

এটি দিবালোকের মতো পরিষ্কার, বঙ্গন্ধুর প্রতি ভালোবাসার অধিক্যে নয়; আদেশ পালন করতে গিয়েই মামলার বাদী হয়েছেন অ্যাডভোকেট ওবায়েদ উল্লাহ সাজু। উল্লেখ্য, বরগুনা সদরের আগে গাজী তারেক সালাম আগৈলঝারা উপজেলার নির্বাহী কর্মর্কতা ছিলেন। কিন্তু সেখান থেকে তাকে সাত মাসের মধ্যেই বদলি হতে হয়েছে। এ বদলির বিষয়টি খতিয়ে দেখলেই পরিষ্কার হয়ে যাবে তার বিরুদ্দে জেলা আইনজীবী সমিতির মামলা দায়ের নেপথ্য কারণ, ফরাসি গল্পের প্রতিটি ঘটনার পেছনে নারী থাকার মতোই।

আমার নিজের অভিজ্ঞতা মিলে যায় বিবাদী নির্বাহী কর্মকর্তা গাজী তারিক সালমানের পক্ষে কোনো আইনজীবী না দাঁড়ানোর ঘটনায় সাথে। চট্টগ্রামে আখতারুজ্জামান বাবুর দায়ের করা সাপ্তাহিক সুগন্ধার বিরুদ্ধে মামলায় আদালতে আমাদের পক্ষে কোনো আইনজীবী দাঁড়াতে চাননি। আইন পেশা প্রায় ছেড়ে দেয়া শামসুল হুদাকে খুঁজে না পেলে আমাদেরকে উকিল ছাড়াই আমালতে দাঁড়াতে হতো গাজী তারিকের মতো। আইনজীবীরা কোন বিবেচনা দল বেঁধে বাদী বা বিবাদীর পক্ষে দাঁড়াতে অস্বীকৃতি জানান- আমি অধম বুঝি না! যেমন বুঝি না, ডাক্তারদের ধর্মঘট করার নৈতিক বিষয়টি।

প্রতিক্রিয়ার তৃতীয় বিষয় হুমায়ূন আহমেদের নাটক সমুদ্র বিলাস; নাটকটি বিটিভিতে প্রচারিত হয়েছিল। নানা আয়োজন ও নিশ্চিদ্র নিরাপত্তার মধ্যে কক্সবাজারে পিকনিকে যাবার সময় বাসে সাজানো ডাকাতের হামলা হলে প্রথম সারেন্ডার করেন প্রধান নিরাপত্তা কর্মকর্তা। একে একে সব আয়োজন ভেঙে পড়ে। মজা করার বিষয়টি প্রকাশ করে নাটকের শেষ সংলাপ ছিল, এতো অকর্মা জোগার হলো কিভাবে!

কেবল প্রশাসন নয়, নানা ঘটনায়ই আমার মনে পড়ে সমুদ্র বিলাস নাটকের এ সংলাপ। বিশেষ করে প্রশাসন যখন হতাশ করে। জেলা প্রশাসন যেকোনো পর্যায়ে নেমেছে তা হাওর প্লাবিত হওয়ার পর দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণমন্ত্রী মোফাজ্জল হোসেন চৌধুরী মায়া নিজে দেখে এসেছেন। আর এবার বরিশালে জেলা প্রশাসনের শূন্য কলশি দেখলো দেশবাসী। বিভাগীয় কমিশনার-ডিসি-এসপি থেকে শুরু করে বিচারব্যবস্থার নানা দিক প্রশ্নবিদ্ধ হয়েছে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা গাজী তারিক সালমান নাজেহাল হওয়ার ঘটনার মধ্য দিয়ে। বিশেষ করে জেলা প্রশাসন যেকোনো পর্যায়ে নেমেছে সেটি ফুটে উঠেছে এবার। তবে কেবল জেলা প্রশাসন নয়, কেন্দ্রীয় প্রশাসনের কর্মকর্তাদের মেধার বিষয়টিও নগ্নভাবে ফুটিয়ে তুলেছেন ত্রাণ সচিব শাহ কামাল তার ‘ছাগল তত্ত্বের’ মাধ্যমে।

অথচ প্রশাসন ও প্রশাসনিক কর্মকর্তা যে কত গুরুত্বপূর্ণ বিষয় তা বলার অপেক্ষা রাখে না। প্রতিটি সরকারই বিষয়টি অনুধাবন করে। বর্তমান সরকার সম্ভবত একটু বেশিই অনুধাবন করেছে। যে কারণ বেতন-ভাতা বৃদ্ধিসহ বারবারই প্রশাসনের কর্তাদের যথাযথভাবে দায়িত্ব পালনের আহবান জানাচ্ছেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। প্রশাসনের সাবেক কর্মকর্তাদের তিনি উপদেশ নিচ্ছেন, উপদেষ্টার বানিয়েছেন; ধানমন্ডির রাজনেতিক অফিসেও গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্বে বসিয়েছেন সাবেক আমলা। রাজনীতির পাশাপাশি প্রশাসনের ওপর এই যে আস্থা তা কিন্তু বঙ্গবন্ধুর প্রজ্ঞারই ধারাবাহিকতা। স্মরণ করা যেতে পারে, ছয় দফার কাঠামো শুরু হয়েছে দুই আমলার হাত দিয়ে। উল্লেখ্য, ১৯৬৬ সালের ৫ ফেব্রুয়ারি লাহোরের সম্মেলনে টকিং পয়েন্ট মুসাবিদা করার জন্য বঙ্গবন্ধু দুই বাঙালি সিএসপি অফিসারকে দায়িত্ব দিয়েছিলেন। তারা সাত দফা কর্মসূচির একটা খসড়া তৈরি করে দেন। যা বঙ্গবন্ধুর হাতে পরিমার্জিত হয়ে দাঁড়ায় ছয় দফায়। এ ছয় দফা ১৯৬৬ সালের ২১ ফেব্রুয়ারি আওয়ামী লীগের কর্মসূচি হিসেবে গৃহীত হয়। এই হচ্ছে আমলাদের গৌরবের ইতিহাস। কিন্তু আমলাদের মেধা-মননের এ গৌরবের ধারা নামতে নামতে ‘ছাগল তত্ত্বে’ গিয়ে ঠেকেছে। আর জেলা পর্যায়ে এদের জুনিয়ররা কোন পর্যায়ে নেমেগেছে তার প্রমাণ হাওরের দুর্যোগ পরিস্থিতি মোকাবিলার বেহাল চিত্র এবং বরিশালের সাম্প্রতিক ঘটনা।

প্রশ্ন হচ্ছে, লাগাতরভাবে আমরা কেন কেবল অধগতিতে ধাবিত হচ্ছি। এ প্রশ্নে উত্তর নিশ্চয়ই কঠিন। তবে আমার ধারণা এর একটি গ্রহণযোগ্য উত্তর দিয়েছেন একুশে টেলিভিশনের নিউজ অ্যান্ড কারেন্ট অ্যাফেয়ার্স বিভাগের প্রযোজক ফারুক তরফদার। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে আমার এক পোস্টের পরিপ্রেক্ষিতে ফারুক তরফদার কমেন্ট করেছেন, ‘আমরা নষ্ট হয়ে গেছি। শিক্ষক, ডাক্তার, সাংবাদিক, আইনশৃংখলা বাহিনী, লেখক, বুদ্ধিজীবী, আইনজীবী, সুশীলগণ সবাই আমরা বিভক্ত, দ্বিধা-বিভক্ত। রাজনীতিতে বিভক্তি, মননে বিভক্তি। উপরের মানুষগুলো যদি রাজনীতিগত অথবা মননে বিভক্ত হয় তবে পদে পদে বিপদ। রজনীতি আর স্ব-স্ব কর্মকে গুলিয়ে ফেলেছি বলেই আজকে এ অবস্থা। বিভক্ত হচ্ছি আমরা প্রতিদিন। নষ্ট হচ্ছি একটু একটু করে।’ এ থেকে উত্তরণেরও বিষয়েও অভিমত দিয়েছেন  ফারুক তরফদার। তিনি লিখেছেন, ‘প্রত্যেকেরই নিজস্ব রাজনীতিক চেতনা থাকতেই পারে। কিন্তু উপরের মানুষ গুলোকে কাজ করতে হবে মানুষের জন্য, সমাজের জন্য, দেশের জন্য। শিক্ষকগণ কর্মক্ষেত্রে রাজনীতি করলে শিক্ষার জন্য যেমন বিপদ তেমনি বিভাজন সৃষ্টি হবেই। ডাক্তার, সুশীল, পুলিশ, আমলা, সাংবাদিকের ক্ষেত্রেও একই। নিরপেক্ষ হওয়াটা নিজের জন্য না হলেও পরবর্তী প্রজন্মের জন্য জরুরী।’ আমি ফারুক তরফদার সঙ্গে বিনীতভাবে একমত।

লেখক: জেষ্ঠ্য সাংবাদিক

e-mail: [email protected]