উন্নয়নের জন্য মাস্টারপ্ল্যান করা হলেও তা বাস্তবায়নের দীর্ঘসূত্রিতার কারণেই থমকে গেছে কুয়াকাটার ব্যবসা-বাণিজ্য ও উন্নয়ন। স্থানীয় প্রশাসন বলছে, মাস্টারপ্ল্যান শুধু বই আর কাগজেই সীমাবদ্ধ রয়েছে বলেই ভোগান্তি বাড়ছে। পাশাপাশি মাস্টারপ্ল্যানের কারণে জমিজমা ক্রয়-বিক্রয়ে প্রশাসনের অনুমতি নিতে হচ্ছে বলে মুখ ফিরিয়ে নিচ্ছেন বিনিয়োগকারীরা। ফলে জমিজমার উপর নির্ভরশীল মানুষকে দুর্ভোগ পোহাতে হচ্ছে, বলে জানিয়েছেন স্থানীয়রা।

খোঁজখবর নিয়ে জানা যায়, ১৯৯৮ সালের মে মাসে কুয়াকাটাকে পর্যটন কেন্দ্র ঘোষণা করা হয়। পরে ২০১০ সালে কুয়াকাটাকে পৌরসভায় উন্নীত করা হয়। এরপর ২০ বছর মেয়াদী ‘কুয়াকাটার টেকসই ও কার্যকর উন্নয়ন মহাপরিকল্পনা’ গ্রহণ করে সরকার। এ লক্ষ্যে ২০১১ সালে ভূমি মন্ত্রণালয় এক প্রজ্ঞাপনের মাধ্যমে কুয়াকাটা পর্যটন এলাকার জন্য মহাপরিকল্পনা বাস্তবায়ন না হওয়া পর্যন্ত জমি ক্রয় ও বিক্রয়ের ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করা হয়।

এর ফলে বিপাকে পড়েছেন জমির ওপর আয় নির্ভর সেখানকার স্থানীয় মানুষ, ব্যবসায়ী ও ডেভেলপার কোম্পানিসহ বহু প্রতিষ্ঠান। বিনিয়োগকারীরা মুখ ফিরিয়ে নেওয়ায় কুয়াকাটায় নতুন করে আর কোনও স্থাপনা গড়ে উঠছে না।

কুয়াকাটার রিয়েলস্টেট কোম্পানি ‘সেঞ্চুরি’র সার্ভেয়ার ও স্থানীয় ব্যবসায়ী আব্দুল কুদ্দুস সাংবাদিকদের জানান, একটা জমি বিক্রি করতে অনুমতির জন্য প্রথমে ভূমি অফিসে যেতে হয়। তারপর কলাপাড়া। এরপর পটুয়াখালী হয়ে বিভাগীয় কমিশনারের কার্যালয়ে। আবার ওই আবেদন পটুয়াখালী হয়ে কলাপাড়া আসতে দীর্ঘ সময় লেগে যায়। এভাবে মাসের পর মাস মানুষ জমি বিক্রিতে হয়রানির স্বীকার হচ্ছে। বাংলাদেশের বিভিন্ন স্থান থেকে ব্যবসায়ীরা জমি কিনতে কুয়াকাটা আসে। কিন্তু জমি ক্রয়ে এই দীর্ঘসূত্রিতার কারণে আবার ফিরে যায়।

তিনি বলেন, ‘মাস্টারপ্ল্যান যেহেতু হয়ে গেছে, তাই মাস্টারপ্ল্যানের আওতায় যে জমি আছে সেগুলো চিহ্নিত করে সীমানা প্রাচীর দেওয়া উচিত। আর বাকি জমিগুলো অবাধে বিক্রির জন্য উন্মুক্ত করে দেওয়া উচিত।’

কুয়াকাটা হোটেল-মোটেল ওনার্স অ্যাসোসিয়েশনের সাধারণ সম্পাদক মো. মোতালেব শরীফ সাংবাদিকদের বলেন, ‘শুনেছি মাস্টারপ্ল্যানের কপি সরকারি বিভিন্ন অফিস-আদালতে চলে এসেছে। কুয়াকাটায় কী কী উন্নয়ন হবে তা মাস্টারপ্লানেই রয়েছে। তারপরও এখন পর্যন্ত কোনও কার্যক্রম শুরু হয়নি।’

তিনি আরও বলেন, ‘কক্সবাজারে অন্তত ৩৫০টি হোটেল রয়েছে। কিন্তু আমাদের এখানে ছোট-বড় মিলিয়ে হোটেল রয়েছে মাত্র ৫০টি। আর কক্সবাজারের মতো প্রথম শ্রেণির হোটেল রয়েছে আট থেকে ১০টি। জমি বিক্রয়ের ওপর নিষেধাজ্ঞা না থাকলে কুয়াকাটায় হোটেলের পরিমাণ বৃদ্ধি পেত।’

পটুয়াখালী চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির সভাপতি মহিউদ্দিন আহমেদ বলেন, ‘মাস্টারপ্ল্যান বাস্তবায়ন করা হলে কুয়াকাটায় ব্যবসা-বাণিজ্য আরও অনেক এগিয়ে যাবে।’

কুয়াকাটা পৌরসভা মেয়র ও পৌর আওয়ামী লীগের সভাপতি আব্দুল বারেক মোল্লা সাংবাদিকদের জানান, কুয়াকাটার মহাপরিকল্পনা শুধু বই আর কাগজেই সীমাবদ্ধ রয়েছে। মাস্টারপ্ল্যান অনুযায়ী কর্মকাণ্ড শুরু না হওয়ায় কুয়াকাটার উন্নয়ন ও ব্যবসা বাণিজ্য স্থবির হয়ে পড়েছে।’

কুয়াকাটা বিচ ম্যানেজমেন্ট কমিটির সদস্য ও কলাপাড়া উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা এবিএম সাদিকুর রহমান সাংবাদিকদের বলেন, ‘মাস্টারপ্ল্যান কুয়াকাটার উন্নয়নে একটি গাইডলাইন হিসেবে কাজ করবে। মাস্টারপ্ল্যান বাস্তবায়নে জমি অধিগ্রহণের জন্য প্রাথমিক কাগজপত্র তৈরি করার পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে।

বিশেষ বিশেষ ক্ষেত্রে সেখানকার জমি ক্রয়-বিক্রয়ে অনুমতি দেওয়া অব্যাহত আছে।’ মাস্টারপ্ল্যানের কাজ ২০১০-২০৩০ সালের মধ্যে বাস্তবায়ন করা হবে। চারটি ধাপে এই উন্নয়ন কর্মকাণ্ড পরিচালিত হবে, বলেও জানান তিনি।

জেলা প্রশাসক ড. মাছুমুর রহমান সাংবাদিকদের বলেন, ‘মাস্টারপ্ল্যান বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে সরকারের পরিকল্পনা রয়েছে। সরকার কুয়াকাটার উন্নয়নে মহাপরিকল্পনা হাতে নিয়েছে। তাই অবাধে জমিজমা ক্রয়-বিক্রয়ের ওপর যে নিষেধাজ্ঞা দেওয়া হয়েছে তারও বিশেষ কারণ রয়েছে।’