বার্তা পরিবেশক,অনলাইন:: নতুন সড়ক পরিবহন আইনের বিরোধিতা করে দেশব্যাপী পরিবহন শ্রমিকদের আন্দোলন শেষ না হতেই মুন্সীগঞ্জের শ্রীনগরে ঢাকা-মাওয়া সড়কে ঘটে গেল এক মর্মান্তিক দুর্ঘটনা। বেপরোয়া বাসের কারণে বিয়েবাড়ি পরিণত হলো শোকের বাড়িতে। প্রাণ গেছে শিশু-নারীসহ ৯ জন বরযাত্রীর। গুরুতর আহত হয়েছে আরও তিনজন।

মুন্সীগঞ্জের লৌহজং উপজেলার কনকসার গ্রামের বেপারী বাড়িতে এখন শুধুই কান্নার আওয়াজ। গতকাল শুক্রবার (২২ নভেম্বর) যেখানে চলছিল বিয়ের আনন্দ-উল্লাস, সেখানে আজ শুধু শোক আর কান্না। একটি দুর্ঘটনা বিয়ের আনন্দকে শোকে পরিণত করেছে।

স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, শুক্রবার দুপুর পৌনে ১টায় কনকসার বাজার থেকে বর রুবেল বেপারী দুই মাইক্রোবাসে করে স্বজনদের নিয়ে হাসি মুখে কনে নিশা আক্তারের (১৮) বাড়ি ঢাকার কামরাঙ্গীরচরের আলীনগরের উদ্দেশ্যে যাত্রা করেন। পথিমধ্যে দুপুর ২টায় শ্রীনগরের ষোলঘর বাসস্ট্যান্ডের কাছে যাত্রীবাহী স্বাধীন পরিবহনের একটি বেপরোয়া বাস মুখোমুখি তাদের একটি মাইক্রোবাসকে চাপা দেয়। এতে ঘটনাস্থলেই মারা যান বরের বাবা আব্দুর রশিদ বেপারী (৭০), বোন লিজা (২৪), ভাগনি তাবাসসুম (৬) ভাবির বোন রেনু (১২), বরের ভাতিজা তাহসান (৪), ফুপা কেরামত বেপারী (৭০), বরের প্রতিবেশী মফিজুল মোল্লা (৬৫), মাইক্রোবাস চালক বিল্লাল (৪০) এবং পরবর্তীতে ঢাকা মেডিকেল মারা যান ভাবি রুনা (২৪)। চিকিৎসাধীন রয়েছেন জাহাঙ্গীর (৪২), জয়নাল আবেদীন (৫২) ও সোহরাব (৫৫)।

সন্ধ্যা ৭টার দিকে ষোলঘর স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স থেকে স্বজনদের কাছে মরদেহগুলো হস্তান্তর করা হয়। পরবর্তীতে মরদেহ বহনকারী গাড়িগুলো গ্রামে প্রবেশ করার পরপরই এক হৃদয়স্পর্শী পরিবেশ সৃষ্টি হয়। স্বজনদের কান্নার ভারী হয়ে ওঠে আকাশ বাতাস। স্বজন হারাদের আর্তচিৎকারে স্তম্ভিত হয়ে যান বর রুবেল বেপারী।

নিহতের স্বজনরা বলেন, বেপরোয়া গাড়ি চালকদের বিরুদ্ধে কার্যকর কোনো ব্যবস্থা গ্রহণ না করলে সড়কে এমন মৃত্যুর মিছিল থামবে না। সরকার আমাদের কিছু টাকা দিয়েছে, এ টাকা আমরা চাই না। যারা অসুস্থ তাদের কী হবে। বাসের কর্তৃপক্ষের বিরুদ্ধে প্রশাসন কোনো ব্যবস্থা না নিলে আমরা হরতাল করবো।

বরের বোন জামাই বলেন, আমরা এমন মৃত্যু আর দেখতে চাই না। সড়কে উন্নয়নের কাজ হচ্ছে তাই একটি পথ দিয়েই যানবাহন যাতায়াত করছে। কিন্তু বাস-ট্রাক চালকরা তা মানে না। বেপরোয়াভাবে গাড়ি চালিয়ে থাকে। রীতিমতো তারা প্রতিযোগিতা করে চলে। আজও আসার পথে এ রূপ দৃশ্য দেখে আসলাম। তাই প্রশাসনের প্রতি অনুরোধ তারা যেন এই হাইওয়ের ট্রাফিক ব্যবস্থা আরও কঠোরভাবে পর্যবেক্ষণ করেন। আমরা চাই না এই সড়কে আর কারও মৃত্যু হোক।

নিহতদের মধ্যে আটজনের মরদেহ মুন্সীগঞ্জের লৌহজং উপজেলার কনকসার বটতলা নিজ গ্রামে দাফন করা হয়েছে। শনিবার সকাল সাড়ে ১০টার দিকে লৌহজং উপজেলার কনকসার বটতলা গ্রামের বাহ্মনগাঁও উচ্চবিদ্যালয় মাঠে জানাজা শেষে হলদিয়া সাতঘড়িয়া কবরস্থানে তাদের দাফন সম্পন্ন হয়। আর মাইক্রোবাস চালক বিল্লালকে (৪০) নাগেরহাট নিজ এলাকায় দাফন করা হয়।

লৌহজং উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা কাবিরুল ইসলাম খান জানান, মাওয়া-ঢাকা সড়ক দুর্ঘটনার মৃত্যুর মিছিল থামাতে এবং বেপরোয়া যানবাহন নিয়ন্ত্রণ করতে প্রধানমন্ত্রী যে আইন চালু করেছেন তা বাস্তবায়ন করতে হবে। এই আইন বাস্তবায়ন হলে দেশে সড়ক দুর্ঘটনা অনেকটাই কমে যাবে।

মুন্সীগঞ্জের পুলিশ সুপার জায়েদুল আলম বলেন, ওভার স্পিডের কারণে এই দুর্ঘটনা ঘটেছে। আমাদের প্রাথমিক ধারণা দুটি গাড়ি অতিরিক্ত স্পিডে ছিল। মামলা হয়েছে হাসাড়া ফাঁড়ির আন্ডারে। তারা বাসের মালিক ও ড্রাইভারকে শনাক্ত করেছে। আমরা দ্রুত সময়ের মধ্যে চালককে আটক করতে পারব। গাড়িগুলোকেও পর্যবেক্ষণ করা হচ্ছে।

মুন্সীগঞ্জের জেলা প্রশাসক মো. মনিরুজ্জামান জানান, দুর্ঘটনার কারণ তদন্তে এডিসি জেনারেল দীপক কুমার রায়কে প্রধান করে পাঁচ সদস্যের একটি তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে। তাদের সাতদিনের মধ্যে তদন্ত প্রতিবেদন জমা দিতে বলা হয়েছে। জেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে নিহত ৯ জনের দাফন কাজ সম্পন্ন করার জন্য প্রত্যেককে ২০ হাজার টাকা করে অর্থ সহায়তা দেয়া হয়েছে।