আন্তর্জাতিক ন্যায়বিচার আদালতে (আইসিজে) সম্প্রতি গাম্বিয়া বনাম মায়ানমার মামলায় রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীকে ‘বেঙ্গলি’ হিসেবে অভিহিত করেছে মায়ানমার। গতকাল শুক্রবার ঢাকায় পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় এ বিষয়টি উল্লেখ করে মায়ানমারের অপচেষ্টার বিষয়ে জোরালো আপত্তি জানিয়েছে। পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় বলেছে, রোহিঙ্গাদের রাষ্ট্র ও সমাজের অবিচ্ছেদ্য অংশ হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়ার বিষয়ে আন্তরিক অঙ্গীকার প্রদর্শন এবং রাখাইনে অনুকূল পরিবেশ সৃষ্টি করে তাদের নিরাপদ, মর্যাদাপূর্ণ ও সমান অধিকারের ভিত্তিতে প্রত্যাবর্তন ও পুনরেকত্রীকরণ নিশ্চিত করতে মায়ানমার এবং রাখাইনে কর্তৃত্বকারী সব পক্ষকে বাংলাদেশ আহবান জানায়।
মায়ানমার অতীতেও বিভিন্ন সময় রোহিঙ্গাদের তৎকালীন ‘বেঙ্গল’ (বর্তমানে বাংলাদেশ) থেকে যাওয়া বোঝাতে ‘বেঙ্গলি’ হিসেবে অভিহিত করার চেষ্টা করেছে। অতীতেও বাংলাদেশ এ ব্যাপারে প্রতিবাদ ও প্রতিক্রিয়া জানিয়েছে।
আইসিজেতে সম্প্রতি মায়ানমারের উপস্থাপন করা বক্তব্যের বিষয়টি উল্লেখ করে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় বলেছে, এই ধরনের বক্তব্যের মাধ্যমে অবৈধ অভিবাসনের একটি কৃত্রিম বয়ান তৈরি এবং অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তা হুমকিকে জোরদার করার চেষ্টা করা হচ্ছে, যাতে ২০১৬-১৭ সালে রোহিঙ্গাদের বিরুদ্ধে সংঘটিত ভয়াবহ নৃশংসতা ও জেনোসাইড সম্পর্কিত অপরাধ থেকে দৃষ্টি অন্যদিকে সরানো যায় এবং তথাকথিত ‘ক্লিয়ারেন্স অপারেশন’ (নির্মূল অভিযানকে) সন্ত্রাসবিরোধী কার্যক্রম হিসেবে উপস্থাপন করা যায়।
পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় জানায়, রোহিঙ্গারা একটি স্বতন্ত্র জাতিগোষ্ঠী। তারা শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে আরাকানে বসবাস করে আসছে, এমনকি ১৭৮৫ সালে আরাকান বর্মন রাজ্যের অন্তর্ভুক্ত হওয়ারও বহু আগে থেকে। আরাকানের প্রাচীন রাজধানী মিয়ো-হাউং বা ম্রো-হাউং বা রোহাং এলাকায় তাদের উপস্থিতির কারণে চট্টগ্রাম এবং বৃহত্তর বঙ্গ অঞ্চলে তারা ‘রোশাং’ বা ‘রোহাং’-এর মানুষ হিসেবে পরিচিত ছিল। শুরুতে এটি ছিল একটি অ্যাক্সোনিম বা বহির্নাম। পরবর্তী সময়ে বার্মায় ধীরে ধীরে ক্রমবর্ধমান প্রান্তিকীকরণের শিকার হওয়ার প্রেক্ষাপটে এই জনগোষ্ঠী নিজেদের পরিচয়ের জন্য ‘রোহিঙ্গা’ নামটি গ্রহণ করে। তাদের বার্মার আরাকান এবং বর্তমান রাখাইন রাজ্যের সঙ্গে গভীর ঐতিহাসিক, সাংস্কৃতিক ও সামাজিক সম্পর্ক রয়েছে।
আধুনিক সীমান্ত নির্ধারণের অনেক আগেই এ অঞ্চলে তাদের উপস্থিতি ছিল, যা ঐতিহাসিক দলিল, ঔপনিবেশিক জনশুমারি এবং স্বাধীন গবেষণায় সুপ্রমাণিত। বার্মার স্বাধীনতার বহু আগেই আরাকানে সুপ্রতিষ্ঠিত একটি জনগোষ্ঠীকে বিদেশি বা অভিবাসী হিসেবে উপস্থাপন করার প্রচেষ্টা ঐতিহাসিক সত্যের সঙ্গে সম্পূর্ণ অসংগত। পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়েছে, ১৯৮২ সালের নাগরিকত্ব আইন প্রণয়নের আগ পর্যন্ত রোহিঙ্গারা মায়ানমারের রাজনীতি, সমাজ ও প্রশাসনের অবিচ্ছেদ্য অংশ ছিল। ওই আইনের মাধ্যমে মায়ানমার সরকার শুধু জাতিগত ও ধর্মীয় বিবেচনায় তাদের রাষ্ট্র ও সমাজ থেকে পরিকল্পিতভাবে বাদ দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেয়। অর্থনৈতিক, সাংস্কৃতিক ও রাজনৈতিক প্রান্তিকীকরণ সত্ত্বেও রোহিঙ্গারা দীর্ঘদিন ভোটাধিকার ভোগ করেছে।
তবে ২০১৫ সালের সাধারণ নির্বাচনে তাদের সম্পূর্ণভাবে ভোটাধিকার থেকে বঞ্চিত করা হয়। মায়ানমার ধারাবাহিকভাবে তাদের সমান অধিকার ও সমান নাগরিক হিসেবে অংশগ্রহণের সাংবিধানিক নিশ্চয়তা অস্বীকার করে এসেছে। এই পরিকল্পিত ধ্বংসপ্রক্রিয়ার চূড়ান্ত ধাপে রোহিঙ্গাদের রাখাইন থেকে উত্খাত করা হয় এবং তাদের রাষ্ট্রহীন করে ফেলা হয়।
বাংলাদেশের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় বলেছে, রোহিঙ্গাদের রয়েছে একটি স্বতন্ত্র জাতিগত পরিচয়, সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য, সামাজিক রীতিনীতি, প্রথা ও ভাষা, যা বাংলার সঙ্গে, বিশেষত চট্টগ্রাম অঞ্চলের উপভাষার সঙ্গে কিছু সাদৃশ্য থাকলেও তা থেকে স্পষ্টভাবে ভিন্ন। রোহিঙ্গাদের ‘বেঙ্গলি’ হিসেবে অভিহিত করার পদ্ধতিগত প্রচেষ্টা তাদের আত্মপরিচয় নির্ধারণের অন্তর্নিহিত অধিকারকে অস্বীকার করার শামিল। এই নামকরণ বিতর্ককে ব্যবহার করে তাদের বর্জন, নিপীড়ন এবং শেষ পর্যন্ত ২০১৬-১৭ সালে জাতিগত নির্মূল ও জেনোসাইডকে বৈধতা দেওয়ার চেষ্টা করা হয়েছে।
পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় বলেছে, রোহিঙ্গাদের ‘বেঙ্গলি’ হিসেবে শ্রেণিবদ্ধকরণ মায়ানমার রাষ্ট্রের একটি সুপরিকল্পিত কৌশল। এর মাধ্যমে রোহিঙ্গাদের নাগরিকত্ব ও মৌলিক মানবাধিকার থেকে বঞ্চিত করা হয়েছে। যদিও ১৯৭৮ সালের বাংলাদেশ-মায়ানমার দ্বিপক্ষীয় প্রত্যাবাসন চুক্তিতে তাদের ‘বার্মার আইনসম্মত বাসিন্দা’ হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়া হয়েছিল। নামকরণ যা-ই হোক না কেন, ওই চুক্তি ও পরবর্তী দ্বিপক্ষীয় সমঝোতায় এই (রোহিঙ্গা) জনগোষ্ঠীকে মায়ানমার সমাজে সমান সদস্য হিসেবে পুনরেকত্রীকরণের নিশ্চয়তা দেওয়া হয়েছিল।
পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়েছে, এই ধরনের বিভ্রান্তিকর বয়ান রোহিঙ্গা সংকটের মূল কারণ থেকে আন্তর্জাতিক মনোযোগ সরানোর পাশাপাশি ন্যায়বিচার, জবাবদিহি ও টেকসই সমাধান নিশ্চিত করার আন্তর্জাতিক প্রচেষ্টাকে ক্ষুণ্ন করছে। রোহিঙ্গাদের আত্মপরিচয়ের অধিকার অস্বীকার করাই তাদের সম্প্রদায় ধ্বংসের কেন্দ্রীয় কৌশল। এর পরিণতিতে তাদের রাখাইন থেকে উত্খাত করে রাষ্ট্রহীন করা হয়েছে।
পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় বলেছে, গত আট বছরেরও বেশি সময় ধরে রাখাইনে অনুকূল পরিবেশ সৃষ্টি এবং রোহিঙ্গাদের প্রত্যাবাসন নিশ্চিত করতে মায়ানমারের ব্যর্থতা ২০১৭-১৮ সালে স্বাক্ষরিত দ্বিপক্ষীয় চুক্তিগুলোর সুস্পষ্ট লঙ্ঘন। ইচ্ছাকৃত নিষ্ক্রিয়তা ও অজুহাত প্রদর্শনের মাধ্যমে প্রত্যাবাসনপ্রক্রিয়া বিলম্বিত করার এই প্রবণতা রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠী ধ্বংসের অভিপ্রায়ের প্রমাণ হিসেবেও বিবেচিত হতে পারে।
২০২৩ সালের ৬ জুলাই মায়ানমারের পররাষ্ট্রমন্ত্রীর একটি কূটনৈতিক ব্রিফিংয়ে উত্থাপন করা তথ্যের প্রতিবাদ জানানোর কথাও বাংলাদেশের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় গতকাল উল্লেখ করে। সেই কূটনৈতিক ব্রিফিংয়ে মায়ানমারের পক্ষ থেকে দাবি করা হয়েছিল, বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের সময় ‘প্রায় পাঁচ লাখ বাংলাদেশি নাগরিক রাখাইনে আশ্রয় নিয়েছিল।’ ২০২৩ সালের ১৮ জুলাই বাংলাদেশ আনুষ্ঠানিকভাবে তার প্রতিবাদ ও মায়ানমারকে তাদের দাবির পক্ষে প্রমাণ উপস্থাপনের আহবান জানায়। পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় বলেছে, ১৯৭১ সালে রাখাইনের মোট জনসংখ্যা ছিল ১৭ লাখেরও কম। ওই সময় রাখাইনের জনসংখ্যার প্রায় ৩০ শতাংশের সমপরিমাণ আশ্রয়প্রার্থীর উপস্থিতি নিশ্চিতভাবেই সামাজিক ও অর্থনৈতিক অস্থিরতা সৃষ্টি করত এবং আন্তর্জাতিক অঙ্গনে ব্যাপক মনোযোগ আকর্ষণ করত। এমনকি যুদ্ধকালীন কষ্ট এড়াতে বর্তমান বাংলাদেশের কিছু মানুষ সীমান্ত অতিক্রম করে যদি বার্মায় প্রবেশ করেও থাকে, তবে সামাজিকভাবে পশ্চাৎপদ ও অর্থনৈতিকভাবে অনগ্রসর রাখাইনে উন্নত জীবিকার কোনো সুযোগ না থাকা সত্ত্বেও তাদের সেখানে স্থায়ীভাবে থেকে যাওয়ার যুক্তি গ্রহণযোগ্য নয়। পরবর্তী সময়ে বার্মায় পরিচালিত রাখাইন রাজ্যের জনশুমারিতেও এই ধরনের দাবির পক্ষে কোনো জনমিতিক প্রমাণ পাওয়া যায় না।

০১ অক্টোবর, ২০২৬ ২১:২৫
যুক্তরাষ্ট্র-ইরান যুদ্ধাবস্থা ও আন্তর্জাতিক উত্তেজনার প্রভাবে আগামী কয়েক মাসের মধ্যে দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায় ভয়াবহ খাদ্যসংকট দেখা দেওয়ার তীব্র আশঙ্কা প্রকাশ করেছেন ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রী এস জয়শঙ্কর। তিনি সতর্ক করে বলেছেন, ইউক্রেন ও মধ্যপ্রাচ্যের অবিরাম সংঘাতের ফলে বিশ্বজুড়ে যে সার সরবরাহ ব্যাহত হচ্ছিল, তার ধারাবাহিকতায় এবার চরম খাদ্যসংকট তৈরি হতে চলেছে।
গত সোমবার যুক্তরাষ্ট্রের নিউইয়র্কে এশিয়া সোসাইটি আয়োজিত এক উন্মুক্ত আলোচনায় অংশ নিয়ে এস জয়শঙ্কর এ কথা বলেন। তিনি উল্লেখ করেন, বর্তমান আঞ্চলিক ভূরাজনৈতিক সংঘাতগুলো ‘গ্লোবাল সাউথ’ বা বিশ্বের অনুন্নত ও উন্নয়নশীল দেশগুলোর অর্থনীতির ওপর ‘তীব্র মানসিক ও অর্থনৈতিক চাপ’ তৈরি করছে।
চলমান সংঘাতের সামগ্রিক প্রভাব তুলে ধরে ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, ‘আমাদের জন্য এটি একটি বড় চিন্তার বিষয়। ইউক্রেনের যুদ্ধ এবং বর্তমানে ইরান-উপসাগরীয় অঞ্চলের সংঘাতের দিকে তাকালেই বোঝা যায় যে এই পরিস্থিতি গ্লোবাল সাউথের উদীয়মান অর্থনীতির ওপর অত্যন্ত নেতিবাচক ও ধ্বংসাত্মক প্রভাব ফেলেছে।’
বিশ্বের জ্বালানিবাজারের অস্থিরতা নিয়ে আলোচনা করতে গিয়ে জয়শঙ্কর বলেন, আন্তর্জাতিক সরবরাহব্যবস্থা বা সাপ্লাই চেইন বর্তমানে দ্বিমুখী সংকটে পড়েছে। জ্বালানির মূল্য স্থিতিশীল রাখার চেয়ে রাজনৈতিক ফায়দা লোটার প্রবণতা সমস্যাকে জটিল করে তুলছে। তিনি বলেন, ‘সমস্যাটির একটি দিক হলো তেল সরবরাহের নিরাপত্তা বজায় রাখা, আর অন্য দিকটি হলো তেল নিয়ে আন্তর্জাতিক রাজনীতি। এই দুই উপাদান পরস্পরের ওপর জোরদার প্রভাব ফেলছে এবং সমস্যাটিকে দ্বিগুণ বা আরও জটিল রূপ দিচ্ছে।’ জয়শঙ্কর সতর্ক করে বলেন, কেউ যদি এটা নিয়ে রাজনৈতিক খেলা খেলে, তবে তা বাজারে অস্থিরতা ও জটিলতা কেবল বাড়িয়েই তুলবে।
কৃষির অপরিহার্য উপাদান সার ও খাদ্যশস্যের পরিবহন প্রসঙ্গে জয়শঙ্কর কৃষ্ণসাগর অঞ্চলের স্থবিরতার কথা উল্লেখ করেন। তিনি বলেন, ‘আজ আমরা এমন এক বাস্তবতার মুখোমুখি এসে দাঁড়িয়েছি, যেখানে বিশ্বের শীর্ষস্থানীয় কয়েকটি খাদ্যশস্য রপ্তানিকারক দেশ নিজেদের পণ্য বাইরে পাঠাতে পারছে না। বিশেষ করে কৃষ্ণসাগর অঞ্চলে সমুদ্রপথ দিয়ে রপ্তানি চালু রাখা প্রায় অসম্ভব হয়ে পড়েছে।’
ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আরও বলেন, বিশ্বের মূল সার উৎপাদনকারী কেন্দ্রগুলো মধ্যপ্রাচ্য ও রাশিয়ায় অবস্থিত হওয়ায় সেখানে ঘাটতি তৈরি হয়েছে। এর সঙ্গে ‘সুপার এল নিনো’র মতো জলবায়ুর বিরূপ আচরণ যুক্ত হয়ে খাদ্যনিরাপত্তাকে খাদের কিনারে ঠেলে দিচ্ছে।
সামগ্রিক সংকট ব্যাখ্যা করে জয়শঙ্কর বলেন, ‘আগামী মাসগুলোয় এক বিশাল খাদ্যসংকট তৈরি হতে যাচ্ছে। প্রথমত জ্বালানির সংকট, তার ওপর খাদ্য ও সারের অপ্রতুলতা, আর সবশেষে মূলধনের সংকট ঘটতে চলেছে। কারণ, প্রতিবার কোনো বড় যুদ্ধ বা সংঘাত শুরু হলে বিনিয়োগের অর্থ নিরাপদ আশ্রয়ে চলে যাওয়ার প্রবণতা দেখা দেয় এবং বর্তমানে এভাবেই গ্লোবাল সাউথ থেকে মূলধন বের হয়ে যাচ্ছে। তার সামগ্রিক প্রভাবে দরিদ্র ও উন্নয়নশীল দেশগুলোর জন্য অত্যন্ত কঠিন ও সংকটময় পরিস্থিতির জন্ম দিচ্ছে।’
শক্তিশালী দেশগুলোর স্বার্থপর সিদ্ধান্তের কড়া সমালোচনা করে ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, ‘বিশ্বের প্রভাবশালী দেশগুলোর এতটা স্বার্থপর হওয়া উচিত নয় যে তারা নিজেদের ব্যক্তিগত বলয়ের স্বার্থেই শুধু সিদ্ধান্ত নেবে এবং বাকি বিশ্বের প্রতি দায়িত্ব এড়ানোর সুর তুলে বলবে—আমরা তো তোমাদের জীবন কঠিন করে তোলার জন্য এমন করিনি।’ তিনি প্রভাবশালী দেশগুলোকে ন্যূনতম ‘সাধারণ বুদ্ধিমত্তা’ বজায় রেখে দরিদ্র দেশগুলোর মৌলিক চাহিদার প্রতি সংবেদনশীল হওয়ার আহ্বান জানান।
জ্বালানিসংকটের ফলে দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোতে ইতিমধ্যে যে রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতা তৈরি হয়েছে, সে প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ‘ইউক্রেন যুদ্ধের পরেই আমরা দেখেছি কীভাবে প্রতিবেশী দেশগুলোতে সরাসরি তার প্রভাবে রাজনৈতিক অস্থিরতা তৈরি হয়েছে। আমার আশঙ্কা, বর্তমানে ইরান ও পারস্য উপসাগরীয় অঞ্চলে যা ঘটছে, তা আঞ্চলিক রাজনৈতিক অস্থিরতাকে আরও উসকে দেবে এবং সংকটকে আরও জটিল করে তুলবে।’
উন্নয়নশীল দেশগুলো কীভাবে এই মন্দা ও সংকট কাটিয়ে উঠবে, তা নিয়ে জয়শঙ্কর বলেন, ‘কিছু দেশের পক্ষে এই পরিস্থিতি মোকাবিলা করা অত্যন্ত কঠিন হয়ে পড়বে। তাই আমাদের মতো যারা কৌশলগতভাবে স্বায়ত্তশাসিত, তারা চাই আরও অনেক দেশ স্বনির্ভর হয়ে উঠুক। তবে এর কোনো একক বা সোজা সমীকরণ নেই। এসব দেশ ঠিক কী পদক্ষেপ নেবে, তা নির্ভর করবে এ বিষয়ে তাদের নির্দিষ্ট সমস্যা ও স্বার্থ কতটা জড়িত, তার ওপর। এমন অনেক ঘটনা ঘটতে পারে, যা মোকাবিলা করতে সংশ্লিষ্ট দেশগুলো তাদের নীতিতে কিছুটা নমনীয় হয়ে উঠবে অথবা পরিবর্তিত পরিস্থিতির সঙ্গে মানিয়ে নিতে শিখবে। আবার কিছু ক্ষেত্রে এমনও দেখা যাবে যে তারা নিজেদের স্বার্থ রক্ষায় শক্তভাবে রুখে দাঁড়াচ্ছে।’
যুক্তরাষ্ট্র-ইরান যুদ্ধাবস্থা ও আন্তর্জাতিক উত্তেজনার প্রভাবে আগামী কয়েক মাসের মধ্যে দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায় ভয়াবহ খাদ্যসংকট দেখা দেওয়ার তীব্র আশঙ্কা প্রকাশ করেছেন ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রী এস জয়শঙ্কর। তিনি সতর্ক করে বলেছেন, ইউক্রেন ও মধ্যপ্রাচ্যের অবিরাম সংঘাতের ফলে বিশ্বজুড়ে যে সার সরবরাহ ব্যাহত হচ্ছিল, তার ধারাবাহিকতায় এবার চরম খাদ্যসংকট তৈরি হতে চলেছে।
গত সোমবার যুক্তরাষ্ট্রের নিউইয়র্কে এশিয়া সোসাইটি আয়োজিত এক উন্মুক্ত আলোচনায় অংশ নিয়ে এস জয়শঙ্কর এ কথা বলেন। তিনি উল্লেখ করেন, বর্তমান আঞ্চলিক ভূরাজনৈতিক সংঘাতগুলো ‘গ্লোবাল সাউথ’ বা বিশ্বের অনুন্নত ও উন্নয়নশীল দেশগুলোর অর্থনীতির ওপর ‘তীব্র মানসিক ও অর্থনৈতিক চাপ’ তৈরি করছে।
চলমান সংঘাতের সামগ্রিক প্রভাব তুলে ধরে ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, ‘আমাদের জন্য এটি একটি বড় চিন্তার বিষয়। ইউক্রেনের যুদ্ধ এবং বর্তমানে ইরান-উপসাগরীয় অঞ্চলের সংঘাতের দিকে তাকালেই বোঝা যায় যে এই পরিস্থিতি গ্লোবাল সাউথের উদীয়মান অর্থনীতির ওপর অত্যন্ত নেতিবাচক ও ধ্বংসাত্মক প্রভাব ফেলেছে।’
বিশ্বের জ্বালানিবাজারের অস্থিরতা নিয়ে আলোচনা করতে গিয়ে জয়শঙ্কর বলেন, আন্তর্জাতিক সরবরাহব্যবস্থা বা সাপ্লাই চেইন বর্তমানে দ্বিমুখী সংকটে পড়েছে। জ্বালানির মূল্য স্থিতিশীল রাখার চেয়ে রাজনৈতিক ফায়দা লোটার প্রবণতা সমস্যাকে জটিল করে তুলছে। তিনি বলেন, ‘সমস্যাটির একটি দিক হলো তেল সরবরাহের নিরাপত্তা বজায় রাখা, আর অন্য দিকটি হলো তেল নিয়ে আন্তর্জাতিক রাজনীতি। এই দুই উপাদান পরস্পরের ওপর জোরদার প্রভাব ফেলছে এবং সমস্যাটিকে দ্বিগুণ বা আরও জটিল রূপ দিচ্ছে।’ জয়শঙ্কর সতর্ক করে বলেন, কেউ যদি এটা নিয়ে রাজনৈতিক খেলা খেলে, তবে তা বাজারে অস্থিরতা ও জটিলতা কেবল বাড়িয়েই তুলবে।
কৃষির অপরিহার্য উপাদান সার ও খাদ্যশস্যের পরিবহন প্রসঙ্গে জয়শঙ্কর কৃষ্ণসাগর অঞ্চলের স্থবিরতার কথা উল্লেখ করেন। তিনি বলেন, ‘আজ আমরা এমন এক বাস্তবতার মুখোমুখি এসে দাঁড়িয়েছি, যেখানে বিশ্বের শীর্ষস্থানীয় কয়েকটি খাদ্যশস্য রপ্তানিকারক দেশ নিজেদের পণ্য বাইরে পাঠাতে পারছে না। বিশেষ করে কৃষ্ণসাগর অঞ্চলে সমুদ্রপথ দিয়ে রপ্তানি চালু রাখা প্রায় অসম্ভব হয়ে পড়েছে।’
ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আরও বলেন, বিশ্বের মূল সার উৎপাদনকারী কেন্দ্রগুলো মধ্যপ্রাচ্য ও রাশিয়ায় অবস্থিত হওয়ায় সেখানে ঘাটতি তৈরি হয়েছে। এর সঙ্গে ‘সুপার এল নিনো’র মতো জলবায়ুর বিরূপ আচরণ যুক্ত হয়ে খাদ্যনিরাপত্তাকে খাদের কিনারে ঠেলে দিচ্ছে।
সামগ্রিক সংকট ব্যাখ্যা করে জয়শঙ্কর বলেন, ‘আগামী মাসগুলোয় এক বিশাল খাদ্যসংকট তৈরি হতে যাচ্ছে। প্রথমত জ্বালানির সংকট, তার ওপর খাদ্য ও সারের অপ্রতুলতা, আর সবশেষে মূলধনের সংকট ঘটতে চলেছে। কারণ, প্রতিবার কোনো বড় যুদ্ধ বা সংঘাত শুরু হলে বিনিয়োগের অর্থ নিরাপদ আশ্রয়ে চলে যাওয়ার প্রবণতা দেখা দেয় এবং বর্তমানে এভাবেই গ্লোবাল সাউথ থেকে মূলধন বের হয়ে যাচ্ছে। তার সামগ্রিক প্রভাবে দরিদ্র ও উন্নয়নশীল দেশগুলোর জন্য অত্যন্ত কঠিন ও সংকটময় পরিস্থিতির জন্ম দিচ্ছে।’
শক্তিশালী দেশগুলোর স্বার্থপর সিদ্ধান্তের কড়া সমালোচনা করে ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, ‘বিশ্বের প্রভাবশালী দেশগুলোর এতটা স্বার্থপর হওয়া উচিত নয় যে তারা নিজেদের ব্যক্তিগত বলয়ের স্বার্থেই শুধু সিদ্ধান্ত নেবে এবং বাকি বিশ্বের প্রতি দায়িত্ব এড়ানোর সুর তুলে বলবে—আমরা তো তোমাদের জীবন কঠিন করে তোলার জন্য এমন করিনি।’ তিনি প্রভাবশালী দেশগুলোকে ন্যূনতম ‘সাধারণ বুদ্ধিমত্তা’ বজায় রেখে দরিদ্র দেশগুলোর মৌলিক চাহিদার প্রতি সংবেদনশীল হওয়ার আহ্বান জানান।
জ্বালানিসংকটের ফলে দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোতে ইতিমধ্যে যে রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতা তৈরি হয়েছে, সে প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ‘ইউক্রেন যুদ্ধের পরেই আমরা দেখেছি কীভাবে প্রতিবেশী দেশগুলোতে সরাসরি তার প্রভাবে রাজনৈতিক অস্থিরতা তৈরি হয়েছে। আমার আশঙ্কা, বর্তমানে ইরান ও পারস্য উপসাগরীয় অঞ্চলে যা ঘটছে, তা আঞ্চলিক রাজনৈতিক অস্থিরতাকে আরও উসকে দেবে এবং সংকটকে আরও জটিল করে তুলবে।’
উন্নয়নশীল দেশগুলো কীভাবে এই মন্দা ও সংকট কাটিয়ে উঠবে, তা নিয়ে জয়শঙ্কর বলেন, ‘কিছু দেশের পক্ষে এই পরিস্থিতি মোকাবিলা করা অত্যন্ত কঠিন হয়ে পড়বে। তাই আমাদের মতো যারা কৌশলগতভাবে স্বায়ত্তশাসিত, তারা চাই আরও অনেক দেশ স্বনির্ভর হয়ে উঠুক। তবে এর কোনো একক বা সোজা সমীকরণ নেই। এসব দেশ ঠিক কী পদক্ষেপ নেবে, তা নির্ভর করবে এ বিষয়ে তাদের নির্দিষ্ট সমস্যা ও স্বার্থ কতটা জড়িত, তার ওপর। এমন অনেক ঘটনা ঘটতে পারে, যা মোকাবিলা করতে সংশ্লিষ্ট দেশগুলো তাদের নীতিতে কিছুটা নমনীয় হয়ে উঠবে অথবা পরিবর্তিত পরিস্থিতির সঙ্গে মানিয়ে নিতে শিখবে। আবার কিছু ক্ষেত্রে এমনও দেখা যাবে যে তারা নিজেদের স্বার্থ রক্ষায় শক্তভাবে রুখে দাঁড়াচ্ছে।’

০১ অক্টোবর, ২০২৬ ১১:৪৮
সৌদি আরবের নিরাপত্তা ও সার্বভৌমত্বের ওপর যেকোনো হুমকি বা হামলা হলে কঠোর পদক্ষেপ নেওয়ার হুঁশিয়ারি দিয়েছেন দেশটির যুবরাজ ও প্রধানমন্ত্রী মোহাম্মদ বিন সালমান। তবে আঞ্চলিক উত্তেজনা কমাতে কূটনৈতিক প্রচেষ্টাও অব্যাহত রাখার কথা জানিয়েছেন তিনি।
বুধবার (৩০ সেপ্টেম্বর) সৌদি আরবের শুরা কাউন্সিলের নবম অধিবেশনের তৃতীয় বর্ষের উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে দেওয়া ভাষণে এসব কথা বলেন মোহাম্মদ বিন সালমান। খবর আরব নিউজের।
যুবরাজ বলেন, উপসাগরীয় দেশগুলোকে লক্ষ্য করে সাম্প্রতিক হামলাগুলো পুরো অঞ্চলের নিরাপত্তা ও স্থিতিশীলতার জন্য উদ্বেগ তৈরি করেছে। সৌদি আরব নিরাপত্তা রক্ষায় কোনো ধরনের আপস করবে না। একই সঙ্গে উত্তেজনা প্রশমন ও কূটনৈতিক সমাধানের পথ খুঁজতেও কাজ করে যাবে রিয়াদ।
তিনি বলেন, সৌদি আরবের নিরাপত্তা ক্ষুণ্ন করার উদ্দেশ্যে কোনো হুমকি বা হামলা হলে কঠোর ব্যবস্থা নিতে দ্বিধা করবে না দেশটি।
আঞ্চলিক নিরাপত্তা জোরদারে উপসাগরীয় অংশীদারদের সঙ্গে সহযোগিতা আরও বাড়ানোর কথা জানিয়েছেন সৌদি যুবরাজ।
তিনি বলেন, নিরাপত্তা রক্ষা, কৌশলগত ও অর্থনৈতিক সহযোগিতা এবং যৌথ কার্যক্রম জোরদারে অংশীদার দেশগুলোর সঙ্গে কাজ করছে সৌদি আরব।
সৌদি আরব, তুরস্ক ও পাকিস্তানের মধ্যকার ‘মক্কা প্রতিরক্ষা চুক্তি’র কথাও তুলে ধরেন তিনি। তার মতে, আঞ্চলিক নিরাপত্তা ও স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করতে তিন দেশের যৌথ প্রচেষ্টার প্রতিফলন এই চুক্তি।
সৌদি আরবের পাশে দাঁড়ানো এবং দেশটির নিরাপত্তা ও স্থিতিশীলতা জোরদারে ভূমিকা রাখায় বন্ধুত্বপূর্ণ ও ভ্রাতৃপ্রতিম দেশগুলোর প্রতিও কৃতজ্ঞতা জানান তিনি।
বিশ্বের বর্তমান নিরাপত্তা পরিস্থিতি নিয়েও উদ্বেগ প্রকাশ করেন মোহাম্মদ বিন সালমান।
তিনি বলেন, বিশ্ব এমন এক জ্বালানি সংকটের মুখোমুখি, যার প্রভাব সুদূরপ্রসারী হতে পারে। আঞ্চলিক উত্তেজনা বাড়লেও আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের সরবরাহ অব্যাহত রেখে বৈশ্বিক জ্বালানি নিরাপত্তায় সৌদি আরব ভূমিকা রাখছে।
সামুদ্রিক নিরাপত্তা জোরদার এবং আন্তর্জাতিক জলপথে পারস্পরিক স্বার্থ রক্ষায় ‘বহুজাতিক সামুদ্রিক প্রতিরক্ষা জোট’ গঠনের উদ্যোগের কথাও জানান তিনি।
গাজা উপত্যকায় ফিলিস্তিনিদের ওপর চলমান হামলার নিন্দা জানিয়েছেন সৌদি যুবরাজ।
তিনি আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় এবং বিশেষ করে জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদকে দীর্ঘস্থায়ী রাজনৈতিক সমাধানে পৌঁছাতে কার্যকর ভূমিকা রাখার আহ্বান জানান।
আন্তর্জাতিক আইনের ভিত্তিতে স্বাধীন ফিলিস্তিন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠাসহ ফিলিস্তিনি জনগণের অধিকার নিশ্চিত করার বিষয়ে সৌদি আরবের দৃঢ় অবস্থানও পুনর্ব্যক্ত করেন তিনি।
ইয়েমেন প্রসঙ্গে মোহাম্মদ বিন সালমান বলেন, দেশটির সরকারের কর্তৃত্ব পুনঃপ্রতিষ্ঠা ও স্থিতিশীলতা ফিরিয়ে আনতে সৌদি আরব সহযোগিতা করে যাচ্ছে।
ইরান-সমর্থিত হুথি মিলিশিয়াদের মোকাবিলায় ‘কোয়ালিশন টু রিস্টোর লেজিটিমেসি’র মাধ্যমে ইয়েমেন সরকারকে সহযোগিতা অব্যাহত রাখার কথাও জানান তিনি।
অন্যদিকে, সুদানের ঐক্য ও স্থিতিশীলতা রক্ষা এবং দেশটির বৈধ প্রতিষ্ঠানগুলোর সুরক্ষায় সৌদি আরবের সমর্থন অব্যাহত থাকবে বলে জানান যুবরাজ।
ভাষণে সৌদি আরবের অর্থনৈতিক রূপান্তরের অগ্রগতিও তুলে ধরেন মোহাম্মদ বিন সালমান।
তিনি জানান, ‘ভিশন ২০৩০’-এর আওতায় নির্ধারিত বিভিন্ন লক্ষ্যের ৯৩ শতাংশ অর্জিত হয়েছে। ২০১৬ সালের তুলনায় তেলবহির্ভূত রপ্তানি বেড়েছে ১৫৫ শতাংশ। একই সময়ে অর্থনীতিতে বেসরকারি খাতের অবদান বেড়ে ৫১ শতাংশে পৌঁছেছে।
২০২৬ সালকে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার (এআই) বছর হিসেবে উল্লেখ করে সৌদি যুবরাজ বলেন, এআইভিত্তিক অ্যাপ্লিকেশন ও সমাধান উদ্ভাবন, উৎপাদনশীলতা বাড়ানো এবং সেবার মান উন্নয়নে প্রযুক্তিটির ব্যবহার বাড়াতে চায় সৌদি আরব।
এআই খাতে দক্ষ জনশক্তি গড়ে তুলে বিশ্বে নেতৃত্ব দেওয়াও দেশটির অন্যতম লক্ষ্য বলে জানান তিনি।
সৌদি আরবের নিরাপত্তা ও সার্বভৌমত্বের ওপর যেকোনো হুমকি বা হামলা হলে কঠোর পদক্ষেপ নেওয়ার হুঁশিয়ারি দিয়েছেন দেশটির যুবরাজ ও প্রধানমন্ত্রী মোহাম্মদ বিন সালমান। তবে আঞ্চলিক উত্তেজনা কমাতে কূটনৈতিক প্রচেষ্টাও অব্যাহত রাখার কথা জানিয়েছেন তিনি।
বুধবার (৩০ সেপ্টেম্বর) সৌদি আরবের শুরা কাউন্সিলের নবম অধিবেশনের তৃতীয় বর্ষের উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে দেওয়া ভাষণে এসব কথা বলেন মোহাম্মদ বিন সালমান। খবর আরব নিউজের।
যুবরাজ বলেন, উপসাগরীয় দেশগুলোকে লক্ষ্য করে সাম্প্রতিক হামলাগুলো পুরো অঞ্চলের নিরাপত্তা ও স্থিতিশীলতার জন্য উদ্বেগ তৈরি করেছে। সৌদি আরব নিরাপত্তা রক্ষায় কোনো ধরনের আপস করবে না। একই সঙ্গে উত্তেজনা প্রশমন ও কূটনৈতিক সমাধানের পথ খুঁজতেও কাজ করে যাবে রিয়াদ।
তিনি বলেন, সৌদি আরবের নিরাপত্তা ক্ষুণ্ন করার উদ্দেশ্যে কোনো হুমকি বা হামলা হলে কঠোর ব্যবস্থা নিতে দ্বিধা করবে না দেশটি।
আঞ্চলিক নিরাপত্তা জোরদারে উপসাগরীয় অংশীদারদের সঙ্গে সহযোগিতা আরও বাড়ানোর কথা জানিয়েছেন সৌদি যুবরাজ।
তিনি বলেন, নিরাপত্তা রক্ষা, কৌশলগত ও অর্থনৈতিক সহযোগিতা এবং যৌথ কার্যক্রম জোরদারে অংশীদার দেশগুলোর সঙ্গে কাজ করছে সৌদি আরব।
সৌদি আরব, তুরস্ক ও পাকিস্তানের মধ্যকার ‘মক্কা প্রতিরক্ষা চুক্তি’র কথাও তুলে ধরেন তিনি। তার মতে, আঞ্চলিক নিরাপত্তা ও স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করতে তিন দেশের যৌথ প্রচেষ্টার প্রতিফলন এই চুক্তি।
সৌদি আরবের পাশে দাঁড়ানো এবং দেশটির নিরাপত্তা ও স্থিতিশীলতা জোরদারে ভূমিকা রাখায় বন্ধুত্বপূর্ণ ও ভ্রাতৃপ্রতিম দেশগুলোর প্রতিও কৃতজ্ঞতা জানান তিনি।
বিশ্বের বর্তমান নিরাপত্তা পরিস্থিতি নিয়েও উদ্বেগ প্রকাশ করেন মোহাম্মদ বিন সালমান।
তিনি বলেন, বিশ্ব এমন এক জ্বালানি সংকটের মুখোমুখি, যার প্রভাব সুদূরপ্রসারী হতে পারে। আঞ্চলিক উত্তেজনা বাড়লেও আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের সরবরাহ অব্যাহত রেখে বৈশ্বিক জ্বালানি নিরাপত্তায় সৌদি আরব ভূমিকা রাখছে।
সামুদ্রিক নিরাপত্তা জোরদার এবং আন্তর্জাতিক জলপথে পারস্পরিক স্বার্থ রক্ষায় ‘বহুজাতিক সামুদ্রিক প্রতিরক্ষা জোট’ গঠনের উদ্যোগের কথাও জানান তিনি।
গাজা উপত্যকায় ফিলিস্তিনিদের ওপর চলমান হামলার নিন্দা জানিয়েছেন সৌদি যুবরাজ।
তিনি আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় এবং বিশেষ করে জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদকে দীর্ঘস্থায়ী রাজনৈতিক সমাধানে পৌঁছাতে কার্যকর ভূমিকা রাখার আহ্বান জানান।
আন্তর্জাতিক আইনের ভিত্তিতে স্বাধীন ফিলিস্তিন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠাসহ ফিলিস্তিনি জনগণের অধিকার নিশ্চিত করার বিষয়ে সৌদি আরবের দৃঢ় অবস্থানও পুনর্ব্যক্ত করেন তিনি।
ইয়েমেন প্রসঙ্গে মোহাম্মদ বিন সালমান বলেন, দেশটির সরকারের কর্তৃত্ব পুনঃপ্রতিষ্ঠা ও স্থিতিশীলতা ফিরিয়ে আনতে সৌদি আরব সহযোগিতা করে যাচ্ছে।
ইরান-সমর্থিত হুথি মিলিশিয়াদের মোকাবিলায় ‘কোয়ালিশন টু রিস্টোর লেজিটিমেসি’র মাধ্যমে ইয়েমেন সরকারকে সহযোগিতা অব্যাহত রাখার কথাও জানান তিনি।
অন্যদিকে, সুদানের ঐক্য ও স্থিতিশীলতা রক্ষা এবং দেশটির বৈধ প্রতিষ্ঠানগুলোর সুরক্ষায় সৌদি আরবের সমর্থন অব্যাহত থাকবে বলে জানান যুবরাজ।
ভাষণে সৌদি আরবের অর্থনৈতিক রূপান্তরের অগ্রগতিও তুলে ধরেন মোহাম্মদ বিন সালমান।
তিনি জানান, ‘ভিশন ২০৩০’-এর আওতায় নির্ধারিত বিভিন্ন লক্ষ্যের ৯৩ শতাংশ অর্জিত হয়েছে। ২০১৬ সালের তুলনায় তেলবহির্ভূত রপ্তানি বেড়েছে ১৫৫ শতাংশ। একই সময়ে অর্থনীতিতে বেসরকারি খাতের অবদান বেড়ে ৫১ শতাংশে পৌঁছেছে।
২০২৬ সালকে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার (এআই) বছর হিসেবে উল্লেখ করে সৌদি যুবরাজ বলেন, এআইভিত্তিক অ্যাপ্লিকেশন ও সমাধান উদ্ভাবন, উৎপাদনশীলতা বাড়ানো এবং সেবার মান উন্নয়নে প্রযুক্তিটির ব্যবহার বাড়াতে চায় সৌদি আরব।
এআই খাতে দক্ষ জনশক্তি গড়ে তুলে বিশ্বে নেতৃত্ব দেওয়াও দেশটির অন্যতম লক্ষ্য বলে জানান তিনি।

৩০ সেপ্টেম্বর, ২০২৬ ১৯:০৩
সংযুক্ত আরব আমিরাতে ইসরাইলের সঙ্গে সৌদি আরবের কোনো গোপন বৈঠক হয়নি বলে জানিয়েছে রিয়াদ। সৌদি আরবের এক উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা ইসরাইলি গণমাধ্যমে প্রকাশিত এ সংক্রান্ত প্রতিবেদনকে সম্পূর্ণ মিথ্যা বলে প্রত্যাখ্যান করেছেন।
রয়টার্সের এক প্রতিবেদনের বরাতে জানা যায়, সম্প্রতি ইসরাইলের চ্যানেল ১৪-এ দাবি করা হয়, সংযুক্ত আরব আমিরাতের প্রেসিডেন্ট শেখ মোহাম্মদ বিন জায়েদ ও ইসরাইলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর বৈঠকের পর একটি বিস্তৃত বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। এতে সৌদি আরবসহ কয়েকটি আরব দেশের প্রতিনিধিরা অংশ নেন বলে দাবি করা হয়েছিল।
ইসরাইলি প্রতিবেদনে বলা হয়, বৈঠকে ইরান ও হুথিদের মোকাবিলা, ইসরাইলের আয়রন ডোম প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা এবং সম্ভাব্য একটি আঞ্চলিক জোট গঠনের মতো বিষয় নিয়ে আলোচনা হয়। বৈঠকটি আয়োজনের পেছনে ইসরাইলি রাষ্ট্রদূত ইয়োসি শেলির ভূমিকা ছিল বলেও প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়।
তবে সৌদি আরবের পক্ষ থেকে এ ধরনের কোনো বৈঠকে অংশ নেওয়ার কথা সরাসরি অস্বীকার করা হয়েছে। দেশটির কর্মকর্তার বক্তব্যের পর ইসরাইলি গণমাধ্যমে প্রকাশিত ওই বৈঠকের দাবি নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন দেখা দিয়েছে।
সূত্র: মিডল ইস্ট মনিটর, রয়টার্স
সংযুক্ত আরব আমিরাতে ইসরাইলের সঙ্গে সৌদি আরবের কোনো গোপন বৈঠক হয়নি বলে জানিয়েছে রিয়াদ। সৌদি আরবের এক উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা ইসরাইলি গণমাধ্যমে প্রকাশিত এ সংক্রান্ত প্রতিবেদনকে সম্পূর্ণ মিথ্যা বলে প্রত্যাখ্যান করেছেন।
রয়টার্সের এক প্রতিবেদনের বরাতে জানা যায়, সম্প্রতি ইসরাইলের চ্যানেল ১৪-এ দাবি করা হয়, সংযুক্ত আরব আমিরাতের প্রেসিডেন্ট শেখ মোহাম্মদ বিন জায়েদ ও ইসরাইলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর বৈঠকের পর একটি বিস্তৃত বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। এতে সৌদি আরবসহ কয়েকটি আরব দেশের প্রতিনিধিরা অংশ নেন বলে দাবি করা হয়েছিল।
ইসরাইলি প্রতিবেদনে বলা হয়, বৈঠকে ইরান ও হুথিদের মোকাবিলা, ইসরাইলের আয়রন ডোম প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা এবং সম্ভাব্য একটি আঞ্চলিক জোট গঠনের মতো বিষয় নিয়ে আলোচনা হয়। বৈঠকটি আয়োজনের পেছনে ইসরাইলি রাষ্ট্রদূত ইয়োসি শেলির ভূমিকা ছিল বলেও প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়।
তবে সৌদি আরবের পক্ষ থেকে এ ধরনের কোনো বৈঠকে অংশ নেওয়ার কথা সরাসরি অস্বীকার করা হয়েছে। দেশটির কর্মকর্তার বক্তব্যের পর ইসরাইলি গণমাধ্যমে প্রকাশিত ওই বৈঠকের দাবি নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন দেখা দিয়েছে।
সূত্র: মিডল ইস্ট মনিটর, রয়টার্স

২৪ জানুয়ারি, ২০২৬ ১২:৫২
আন্তর্জাতিক ন্যায়বিচার আদালতে (আইসিজে) সম্প্রতি গাম্বিয়া বনাম মায়ানমার মামলায় রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীকে ‘বেঙ্গলি’ হিসেবে অভিহিত করেছে মায়ানমার। গতকাল শুক্রবার ঢাকায় পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় এ বিষয়টি উল্লেখ করে মায়ানমারের অপচেষ্টার বিষয়ে জোরালো আপত্তি জানিয়েছে। পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় বলেছে, রোহিঙ্গাদের রাষ্ট্র ও সমাজের অবিচ্ছেদ্য অংশ হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়ার বিষয়ে আন্তরিক অঙ্গীকার প্রদর্শন এবং রাখাইনে অনুকূল পরিবেশ সৃষ্টি করে তাদের নিরাপদ, মর্যাদাপূর্ণ ও সমান অধিকারের ভিত্তিতে প্রত্যাবর্তন ও পুনরেকত্রীকরণ নিশ্চিত করতে মায়ানমার এবং রাখাইনে কর্তৃত্বকারী সব পক্ষকে বাংলাদেশ আহবান জানায়।
মায়ানমার অতীতেও বিভিন্ন সময় রোহিঙ্গাদের তৎকালীন ‘বেঙ্গল’ (বর্তমানে বাংলাদেশ) থেকে যাওয়া বোঝাতে ‘বেঙ্গলি’ হিসেবে অভিহিত করার চেষ্টা করেছে। অতীতেও বাংলাদেশ এ ব্যাপারে প্রতিবাদ ও প্রতিক্রিয়া জানিয়েছে।
আইসিজেতে সম্প্রতি মায়ানমারের উপস্থাপন করা বক্তব্যের বিষয়টি উল্লেখ করে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় বলেছে, এই ধরনের বক্তব্যের মাধ্যমে অবৈধ অভিবাসনের একটি কৃত্রিম বয়ান তৈরি এবং অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তা হুমকিকে জোরদার করার চেষ্টা করা হচ্ছে, যাতে ২০১৬-১৭ সালে রোহিঙ্গাদের বিরুদ্ধে সংঘটিত ভয়াবহ নৃশংসতা ও জেনোসাইড সম্পর্কিত অপরাধ থেকে দৃষ্টি অন্যদিকে সরানো যায় এবং তথাকথিত ‘ক্লিয়ারেন্স অপারেশন’ (নির্মূল অভিযানকে) সন্ত্রাসবিরোধী কার্যক্রম হিসেবে উপস্থাপন করা যায়।
পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় জানায়, রোহিঙ্গারা একটি স্বতন্ত্র জাতিগোষ্ঠী। তারা শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে আরাকানে বসবাস করে আসছে, এমনকি ১৭৮৫ সালে আরাকান বর্মন রাজ্যের অন্তর্ভুক্ত হওয়ারও বহু আগে থেকে। আরাকানের প্রাচীন রাজধানী মিয়ো-হাউং বা ম্রো-হাউং বা রোহাং এলাকায় তাদের উপস্থিতির কারণে চট্টগ্রাম এবং বৃহত্তর বঙ্গ অঞ্চলে তারা ‘রোশাং’ বা ‘রোহাং’-এর মানুষ হিসেবে পরিচিত ছিল। শুরুতে এটি ছিল একটি অ্যাক্সোনিম বা বহির্নাম। পরবর্তী সময়ে বার্মায় ধীরে ধীরে ক্রমবর্ধমান প্রান্তিকীকরণের শিকার হওয়ার প্রেক্ষাপটে এই জনগোষ্ঠী নিজেদের পরিচয়ের জন্য ‘রোহিঙ্গা’ নামটি গ্রহণ করে। তাদের বার্মার আরাকান এবং বর্তমান রাখাইন রাজ্যের সঙ্গে গভীর ঐতিহাসিক, সাংস্কৃতিক ও সামাজিক সম্পর্ক রয়েছে।
আধুনিক সীমান্ত নির্ধারণের অনেক আগেই এ অঞ্চলে তাদের উপস্থিতি ছিল, যা ঐতিহাসিক দলিল, ঔপনিবেশিক জনশুমারি এবং স্বাধীন গবেষণায় সুপ্রমাণিত। বার্মার স্বাধীনতার বহু আগেই আরাকানে সুপ্রতিষ্ঠিত একটি জনগোষ্ঠীকে বিদেশি বা অভিবাসী হিসেবে উপস্থাপন করার প্রচেষ্টা ঐতিহাসিক সত্যের সঙ্গে সম্পূর্ণ অসংগত। পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়েছে, ১৯৮২ সালের নাগরিকত্ব আইন প্রণয়নের আগ পর্যন্ত রোহিঙ্গারা মায়ানমারের রাজনীতি, সমাজ ও প্রশাসনের অবিচ্ছেদ্য অংশ ছিল। ওই আইনের মাধ্যমে মায়ানমার সরকার শুধু জাতিগত ও ধর্মীয় বিবেচনায় তাদের রাষ্ট্র ও সমাজ থেকে পরিকল্পিতভাবে বাদ দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেয়। অর্থনৈতিক, সাংস্কৃতিক ও রাজনৈতিক প্রান্তিকীকরণ সত্ত্বেও রোহিঙ্গারা দীর্ঘদিন ভোটাধিকার ভোগ করেছে।
তবে ২০১৫ সালের সাধারণ নির্বাচনে তাদের সম্পূর্ণভাবে ভোটাধিকার থেকে বঞ্চিত করা হয়। মায়ানমার ধারাবাহিকভাবে তাদের সমান অধিকার ও সমান নাগরিক হিসেবে অংশগ্রহণের সাংবিধানিক নিশ্চয়তা অস্বীকার করে এসেছে। এই পরিকল্পিত ধ্বংসপ্রক্রিয়ার চূড়ান্ত ধাপে রোহিঙ্গাদের রাখাইন থেকে উত্খাত করা হয় এবং তাদের রাষ্ট্রহীন করে ফেলা হয়।
বাংলাদেশের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় বলেছে, রোহিঙ্গাদের রয়েছে একটি স্বতন্ত্র জাতিগত পরিচয়, সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য, সামাজিক রীতিনীতি, প্রথা ও ভাষা, যা বাংলার সঙ্গে, বিশেষত চট্টগ্রাম অঞ্চলের উপভাষার সঙ্গে কিছু সাদৃশ্য থাকলেও তা থেকে স্পষ্টভাবে ভিন্ন। রোহিঙ্গাদের ‘বেঙ্গলি’ হিসেবে অভিহিত করার পদ্ধতিগত প্রচেষ্টা তাদের আত্মপরিচয় নির্ধারণের অন্তর্নিহিত অধিকারকে অস্বীকার করার শামিল। এই নামকরণ বিতর্ককে ব্যবহার করে তাদের বর্জন, নিপীড়ন এবং শেষ পর্যন্ত ২০১৬-১৭ সালে জাতিগত নির্মূল ও জেনোসাইডকে বৈধতা দেওয়ার চেষ্টা করা হয়েছে।
পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় বলেছে, রোহিঙ্গাদের ‘বেঙ্গলি’ হিসেবে শ্রেণিবদ্ধকরণ মায়ানমার রাষ্ট্রের একটি সুপরিকল্পিত কৌশল। এর মাধ্যমে রোহিঙ্গাদের নাগরিকত্ব ও মৌলিক মানবাধিকার থেকে বঞ্চিত করা হয়েছে। যদিও ১৯৭৮ সালের বাংলাদেশ-মায়ানমার দ্বিপক্ষীয় প্রত্যাবাসন চুক্তিতে তাদের ‘বার্মার আইনসম্মত বাসিন্দা’ হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়া হয়েছিল। নামকরণ যা-ই হোক না কেন, ওই চুক্তি ও পরবর্তী দ্বিপক্ষীয় সমঝোতায় এই (রোহিঙ্গা) জনগোষ্ঠীকে মায়ানমার সমাজে সমান সদস্য হিসেবে পুনরেকত্রীকরণের নিশ্চয়তা দেওয়া হয়েছিল।
পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়েছে, এই ধরনের বিভ্রান্তিকর বয়ান রোহিঙ্গা সংকটের মূল কারণ থেকে আন্তর্জাতিক মনোযোগ সরানোর পাশাপাশি ন্যায়বিচার, জবাবদিহি ও টেকসই সমাধান নিশ্চিত করার আন্তর্জাতিক প্রচেষ্টাকে ক্ষুণ্ন করছে। রোহিঙ্গাদের আত্মপরিচয়ের অধিকার অস্বীকার করাই তাদের সম্প্রদায় ধ্বংসের কেন্দ্রীয় কৌশল। এর পরিণতিতে তাদের রাখাইন থেকে উত্খাত করে রাষ্ট্রহীন করা হয়েছে।
পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় বলেছে, গত আট বছরেরও বেশি সময় ধরে রাখাইনে অনুকূল পরিবেশ সৃষ্টি এবং রোহিঙ্গাদের প্রত্যাবাসন নিশ্চিত করতে মায়ানমারের ব্যর্থতা ২০১৭-১৮ সালে স্বাক্ষরিত দ্বিপক্ষীয় চুক্তিগুলোর সুস্পষ্ট লঙ্ঘন। ইচ্ছাকৃত নিষ্ক্রিয়তা ও অজুহাত প্রদর্শনের মাধ্যমে প্রত্যাবাসনপ্রক্রিয়া বিলম্বিত করার এই প্রবণতা রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠী ধ্বংসের অভিপ্রায়ের প্রমাণ হিসেবেও বিবেচিত হতে পারে।
২০২৩ সালের ৬ জুলাই মায়ানমারের পররাষ্ট্রমন্ত্রীর একটি কূটনৈতিক ব্রিফিংয়ে উত্থাপন করা তথ্যের প্রতিবাদ জানানোর কথাও বাংলাদেশের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় গতকাল উল্লেখ করে। সেই কূটনৈতিক ব্রিফিংয়ে মায়ানমারের পক্ষ থেকে দাবি করা হয়েছিল, বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের সময় ‘প্রায় পাঁচ লাখ বাংলাদেশি নাগরিক রাখাইনে আশ্রয় নিয়েছিল।’ ২০২৩ সালের ১৮ জুলাই বাংলাদেশ আনুষ্ঠানিকভাবে তার প্রতিবাদ ও মায়ানমারকে তাদের দাবির পক্ষে প্রমাণ উপস্থাপনের আহবান জানায়। পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় বলেছে, ১৯৭১ সালে রাখাইনের মোট জনসংখ্যা ছিল ১৭ লাখেরও কম। ওই সময় রাখাইনের জনসংখ্যার প্রায় ৩০ শতাংশের সমপরিমাণ আশ্রয়প্রার্থীর উপস্থিতি নিশ্চিতভাবেই সামাজিক ও অর্থনৈতিক অস্থিরতা সৃষ্টি করত এবং আন্তর্জাতিক অঙ্গনে ব্যাপক মনোযোগ আকর্ষণ করত। এমনকি যুদ্ধকালীন কষ্ট এড়াতে বর্তমান বাংলাদেশের কিছু মানুষ সীমান্ত অতিক্রম করে যদি বার্মায় প্রবেশ করেও থাকে, তবে সামাজিকভাবে পশ্চাৎপদ ও অর্থনৈতিকভাবে অনগ্রসর রাখাইনে উন্নত জীবিকার কোনো সুযোগ না থাকা সত্ত্বেও তাদের সেখানে স্থায়ীভাবে থেকে যাওয়ার যুক্তি গ্রহণযোগ্য নয়। পরবর্তী সময়ে বার্মায় পরিচালিত রাখাইন রাজ্যের জনশুমারিতেও এই ধরনের দাবির পক্ষে কোনো জনমিতিক প্রমাণ পাওয়া যায় না।
০২ অক্টোবর, ২০২৬ ১১:১৬
০২ অক্টোবর, ২০২৬ ১০:০১
০২ অক্টোবর, ২০২৬ ০২:৩১
০২ অক্টোবর, ২০২৬ ০১:৫২