হেনরী স্বপন>> জাতিধর্ম নির্বিশেষে ব্যবহৃত উন্মুক্ত পানীয় জলের চাহিদা মেটানোর জন্য বিবিরতালাব (তালাব: ফার্সি শব্দ- জলাশয়) খনন করা হয়েছিল। কালক্রমে এটি এখন বিবিরপুকুর হয়ে বরিশালবাসীর আত্মার অংশ হয়ে উঠেছে। বরিশালবাসীর সুপেয় জলের অভাব মোচনের জন্য জনদরদী জিন্নাত বিবি আঠারোশতকে এই পুকুরটি খনন করেছিলেন, বলে জানা যায়। এই পুকুরের চারপাশে ৪টি ঘাটলা ছিল। তখন সেই ঘাট থেকে বরিশালের সকল ধর্মের সব মানুষ খাবার পানি সসরবরাহ করতেন। কেউ স্নান করত না এবং ধোয়াকাচার কাজও হত না। সে সময় এই নিয়গুলো কঠোরভাবে পালিত হতো। যেহেতু তৎকালীন সময় রাখালবাবুর পুকুর থেকে কেবল হিন্দু সম্প্রদায়ের লোকেরা খাবার জল সসরবরাহ কতে পারতেন। কিন্তু বিবিরতালাব থেকে সকল সম্প্রদায়ের সব মানুষ এই পুকুরের পানি খাবার পানি হিসেবে ব্যবহার করতে পারত। তাই, এই পুকুরটিকে অসামপ্রদায়িক চেতনার উল্লেগযোগ্য নিদর্শনও বলা যায়।
এই জলাশয় খনন করে জেন্নাত বিবি ব্রিটিশ সরকারের সঙ্গে এমোন একটি ট্রাস্টি দলিলও করে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ ছিলেন যে, “পুকুরটি কেনোদিন ভরাট করা যাবে না, এর চাপাশের ঘাটলায় গোসল, সাবান সোডার ব্যবহার সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ থাকবে। জলাশয়ের পানি পরিস্কার রাখতে হবে এবং পাড়ঘেঁষে কোনও ইমারত, দেয়াল, তোরণ নির্মাণ করে পুকুরের সৌন্দর্য ক্ষুন্ন হয়, এমনও কিছুই করা যাবে না।”
যেহেতু, ১৯০০-১৯০৮ খ্রিস্টাব্দের ভূমি জরিপে জিন্নাত ও কেরি’র নামোল্লেখ আছে। সরকারের জাজেস সেরেস্তায় খুঁজলে এই চুক্তির দলিলও পাওয়া যাবে, হয়তো। অথচ, বরিশাল সিটি কর্পোরেশন এবং স্থানীয় মহল্লাবাসী ও অগণিত ফাস্টফুড ব্যবসায়ী কেউ চুক্তির কিছুই মানছে না। বরং এরাই দিনের পর দিন ঐতিহ্যবাহী এই পুকুরের সৌন্দর্যকে গলাটিপে হত্যা করছে। কেননা, সিটি কর্পোরেশনের কর্তারা অর্থের বিনিময়ে মোবাইল কোম্পানির স্থায়ী বিলবোর্ড স্থাপনরে মাধ্যমে পুকুরটির যতোটা শোভা বিনষ্ট করেছনে। ততধিক উচ্ছিষ্ট খাবারের বর্জ্য ফেলে এটিকে দুর্গন্ধময় জলাশয়ে পরিণত করছে, তেমনি এর চারপাশে যত্রতত্র বিলবোর্ড, দলীয় পোস্টার ফেস্টুনে কতিপয় রানৈতিক নেতাদের ছবিতে ছবিতে সয়লাব করে, পুকুরটির স্বাভাবিক অঙ্গছেদন এবং শোভা বিনষ্ট করছেন।
সম্প্রতি বর্তমানে বরিশাল সিটি করপোরেশন নগর ভবনের আধিপতি মো. রায়হান কাওছার সাহেব এককালে যে বিবিরতালাবের সুপেয় জলে আমাদের জীবনের তৃষ্ণা মিটেছে, সেই পুকুরের জলে ঝলমলে সূর্যের আলোর রোশনাই ফেরাতে এর চারপাশের অবৈধ স্থাপনা উচ্ছেদের উদ্যোগ নিয়েছেন। রাজনৈতিক দখলদারদের আমলা নির্ভরতা ও দলীয় হামটি-ডামটির তোয়াক্কা না করে, বরিশালবাসীর প্রাণভোমরা পুকুরটির সেই তিলত্তোমা রূপÑ স্বঅবয়বে স্বমহিমায় ফিরিয়ে আনতে তিনি যে, ঈর্ষণীয় এবং অনন্য ন্যায়পালের উদ্যোগের মতোই মহান কাজ করে চলেছেন এজন্য সিটিবাসী আপনাকে মনেও রাখবে বহুকাল।
লেখক : কবি ও প্রাবন্ধিক, বরিশাল।

২৭ অক্টোবর, ২০২৬ ১৪:২৫
আমি ব্যক্তিগতভাবে সাবেক আইজিপি বেনজীর আহমেদকে পছন্দ করি না। তাঁর অতীত কর্মকাণ্ড নিয়ে বিভিন্ন সময়ে সমালোচনা করেছি, এখনো করি। তাঁর কর্মজীবন, ভূমিকা কিংবা বিতর্কিত অধ্যায়গুলোকে ভুলে গিয়ে তাঁকে নতুন করে মূল্যায়ন করারও কোনো কারণ দেখি না। কিন্তু ব্যক্তিগত অপছন্দের জায়গা থেকে সরে এসে যখন বর্তমান পরিস্থিতির সঙ্গে অতীতের কিছু ঘটনা মেলানোর চেষ্টা করি, তখন একটি বিষয় আমাকে ভাবায়। বিশেষ করে সাংবাদিকদের হয়রানি ও তাঁদের পাশে দাঁড়ানোর প্রশ্নে বেনজীর আহমেদের একটি পুরোনো বক্তব্য আজ নতুন করে মনে পড়ছে।
সাংবাদিকদের হয়রানির কোনো এক প্রসঙ্গে তিনি বলেছিলেন, সাংবাদিকদের দিকে তাকালে চোখ তুলে ফেলা হবে। বক্তব্যটি তখন আমার কাছেও বেশ উগ্র মনে হয়েছিল। একজন পুলিশ কর্মকর্তার মুখে এমন কঠোর ভাষা শুনে স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন জেগেছিল—সাংবাদিকদের প্রতি তাঁর এই অবস্থান কি সত্যিকারের ভালোবাসা, নাকি পরিস্থিতি সামাল দেওয়ার কৌশল? সাংবাদিকদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার অঙ্গীকার আর তাঁদের পক্ষে দাঁড়িয়ে এমন হুঁশিয়ারি দেওয়ার মধ্যে পার্থক্য আছে। তাই তখন তাঁর বক্তব্যকে নিঃশর্তভাবে ইতিবাচকভাবে নেওয়ার সুযোগ আমার কাছে ছিল না।
কিন্তু সময়ের ব্যবধানে আজ সেই বক্তব্যের কথা মনে পড়লে অন্য রকম অনুভূতি তৈরি হয়। কারণ, বর্তমান সময়ে সাংবাদিকদের পেশাগত মর্যাদা, নিরাপত্তা ও স্বাধীনতার পক্ষে দায়িত্বশীল অবস্থান নেবেন—এমন পুলিশ কর্মকর্তার বড় অভাব অনুভব করছি। অন্তত প্রকাশ্যে সাংবাদিকদের হয়রানির বিরুদ্ধে দৃঢ়ভাবে কথা বলবেন, তাঁদের পেশাগত দায়িত্ব পালনের অধিকারকে সম্মান করবেন এবং অন্যায় হলে নিজেদের বাহিনীর সদস্যদের জবাবদিহির আওতায় আনার কথা বলবেন—এমন কণ্ঠ আরও বেশি শোনা প্রয়োজন।
অবশ্য এটাও সত্য, একজন কর্মকর্তার প্রকাশ্য বক্তব্যই তাঁর পুরো মানসিকতা কিংবা কর্মজীবনের চূড়ান্ত মূল্যায়ন হতে পারে না। তখন হয়তো বেনজীর আহমেদের বক্তব্যের ভাষা আমাকে বিস্মিত করেছিল, আর আজকের বাস্তবতা আমাকে ভাবাচ্ছে—সাংবাদিকদের পক্ষে কথা বলার মতো দৃঢ় অবস্থান কি সত্যিই এত দুর্লভ হয়ে পড়েছে? আবার এমনও হতে পারে, অনেক পুলিশ কর্মকর্তার ব্যক্তিগতভাবে সাংবাদিকদের প্রতি সহমর্মিতা রয়েছে, কিন্তু প্রাতিষ্ঠানিক চাপ, ক্ষমতার সমীকরণ কিংবা পরিস্থিতিগত কারণে তাঁরা প্রকাশ্যে কিছু বলতে পারছেন না। তবে সেই সম্ভাবনা থাকলেও প্রশ্ন থেকে যায়, দায়িত্বশীল পদে থাকা ব্যক্তিরা অন্যায়ের বিরুদ্ধে নিজেদের অবস্থান স্পষ্ট করবেন না কেন?
সবচেয়ে বড় প্রশ্ন, দেশের প্রায় দুই লাখ বিশ হাজার পুলিশের মধ্যে সাংবাদিকদের পেশাগত অধিকার ও সত্য প্রকাশের স্বাধীনতার পক্ষে দৃঢ়ভাবে কথা বলার মতো একজনও কি নেই? নিশ্চয়ই পুরো বাহিনীকে এক পাল্লায় মাপা যায় না। পুলিশে সৎ, দায়িত্বশীল ও মানবিক সদস্য আছেন—এমন বিশ্বাস রাখার যথেষ্ট কারণ রয়েছে। কিন্তু বিচ্ছিন্নভাবে ভালো কাজের উদাহরণ থাকলেই একটি বাহিনীর সামগ্রিক ভাবমূর্তি বদলে যায় না। মানুষের আস্থা অর্জন করতে হলে দায়িত্বশীল আচরণ, স্বচ্ছতা, জবাবদিহি এবং অন্যায়ের বিরুদ্ধে দৃশ্যমান অবস্থান প্রয়োজন।
গতকাল পুলিশপ্রধানের মাদকসংক্রান্ত একটি বক্তব্যও সাংবাদিক ও রাজনৈতিক মহলে ব্যাপক বিতর্কের জন্ম দিয়েছে। বক্তব্যটির সারকথা যদি এমন হয় যে সাংবাদিকদের একটি অংশ মাদক কারবারিদের কাছ থেকে অর্থ নেন, তাহলে প্রশ্ন উঠতেই পারে—এই অভিযোগের ভিত্তি কী, এর পক্ষে সুনির্দিষ্ট তথ্য-প্রমাণ আছে কি না এবং অভিযোগ থাকলে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে কি না?
সাংবাদিকদের মধ্যে কেউ অপরাধে জড়িত থাকলে তাঁর দায় অবশ্যই ব্যক্তিগত। সাংবাদিক পরিচয় কাউকে আইনের ঊর্ধ্বে রাখে না। কিন্তু কয়েকজনের বিরুদ্ধে অভিযোগ থাকলে সেই অভিযোগের দায় পুরো সাংবাদিক সমাজের ওপর চাপিয়ে দেওয়া যায় না। একইভাবে পুলিশের কোনো সদস্য অপরাধে জড়ালে তাঁর দায়ও পুরো বাহিনীর প্রত্যেক সদস্যের ওপর চাপানো যুক্তিসংগত নয়। তাহলে এক পক্ষের ক্ষেত্রে ব্যক্তিগত দায়ের যুক্তি প্রযোজ্য হবে, আর অন্য পক্ষের ক্ষেত্রে পুরো পেশাকে কাঠগড়ায় দাঁড় করানো হবে—এ কেমন বিচার?
পুলিশপ্রধানের কাছে আমার প্রশ্ন, সাংবাদিকদের বিরুদ্ধে মাদক কারবারিদের কাছ থেকে অর্থ নেওয়ার অভিযোগ থাকলে সুনির্দিষ্ট তথ্য-প্রমাণের ভিত্তিতে ব্যবস্থা নিন। অপরাধী যে-ই হোক, তাঁর বিরুদ্ধে আইন প্রয়োগ করুন। কিন্তু অভিযোগের ভাষা ও উপস্থাপন এমন হওয়া উচিত, যাতে পুরো সাংবাদিক সমাজকে সন্দেহের চোখে দেখা না হয়। সাংবাদিকদেরও ভুল থাকতে পারে, সীমাবদ্ধতা থাকতে পারে, এমনকি কেউ কেউ পেশার অপব্যবহারও করতে পারেন। কিন্তু তাঁদের সমালোচনা করার নামে স্বাধীন সাংবাদিকতার প্রয়োজনীয়তা ও গুরুত্বকে খাটো করা কোনোভাবেই কাম্য নয়।
আরেকটি প্রশ্ন আরও গুরুত্বপূর্ণ—আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী কি নিজেদের ভূমিকা নিয়ে একই রকম আত্মসমালোচনা করতে প্রস্তুত? ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের পর দেশের রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক বাস্তবতায় বড় পরিবর্তন এসেছে। সেই পরিবর্তনের পর পুলিশের ভূমিকা নিয়ে মানুষের প্রত্যাশাও বেড়েছে। মানুষ চেয়েছিল, পুলিশ দলীয় প্রভাবমুক্ত হয়ে আইন অনুযায়ী কাজ করবে। রাজনৈতিক পরিচয়, ক্ষমতার অবস্থান কিংবা ব্যক্তিগত সম্পর্ক বিবেচনায় না নিয়ে অপরাধীকে অপরাধী হিসেবে দেখবে। সাধারণ মানুষ থানায় গিয়ে হয়রানির শিকার হবে না, মামলা করতে গিয়ে অনৈতিক চাপের মুখে পড়বে না এবং বিচার চাইতে গিয়ে নতুন করে ভোগান্তিতে পড়বে না।
কিন্তু প্রশ্ন হলো, সেই প্রত্যাশার কতটা বাস্তবায়ন হয়েছে? পুলিশ কি সত্যিকার অর্থে বদলেছে? নাকি শুধু ক্ষমতার কেন্দ্র বদলেছে, আর ক্ষমতাবানদের সঙ্গে পুলিশের সম্পর্কের পুরোনো সংস্কৃতি অনেক জায়গায় রয়ে গেছে?
আমি কোনো প্রমাণ ছাড়াই পুরো পুলিশ বাহিনীকে দুর্নীতিগ্রস্ত বলতে চাই না। কিন্তু সাধারণ মানুষের অভিজ্ঞতা, পুলিশের বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগ এবং বিভিন্ন ঘটনায় বাহিনীর ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন তোলার অধিকার নাগরিকদের রয়েছে। পুলিশের দায়িত্ব শুধু অপরাধী ধরা কিংবা মামলা দেওয়া নয়। মানুষের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা, বিপদে পাশে দাঁড়ানো, দুর্বল মানুষের অধিকার রক্ষা করা এবং আইন প্রয়োগে নিরপেক্ষতা বজায় রাখাও পুলিশের মৌলিক দায়িত্ব।
অথচ দীর্ঘদিন ধরে পুলিশের বিরুদ্ধে রাজনৈতিক প্রভাব খাটানো, বিরোধী মতের মানুষকে হয়রানি, মামলা-বাণিজ্য কিংবা অর্থ আদায়ের মতো নানা অভিযোগ উঠেছে। এসব অভিযোগের প্রতিটির সত্যতা আলাদাভাবে যাচাই করা জরুরি। কিন্তু অভিযোগগুলো যদি বারবার সামনে আসে, তাহলে সেগুলোকে নিছক অপপ্রচার বলে উড়িয়ে দেওয়ার সুযোগ নেই। বরং তদন্ত, জবাবদিহি ও প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কারের মাধ্যমে মানুষের আস্থা ফিরিয়ে আনতে হবে।
আমাদের অভিজ্ঞতায়, অতীতে বিএনপি-জামায়াতের নেতাকর্মীদের হয়রানি বা দমন-পীড়নের অভিযোগ যেমন ছিল, তেমনি আওয়ামী লীগ সরকারের সময়ও বিরোধী রাজনৈতিক মতের মানুষের বিরুদ্ধে পুলিশের ভূমিকা নিয়ে ব্যাপক সমালোচনা হয়েছে। এখন প্রশ্ন উঠছে, রাজনৈতিক পালাবদলের পর সেই পুরোনো সংস্কৃতি কতটা বদলেছে? আগে যারা ক্ষমতার বাইরে ছিল, তারা ক্ষমতায় এলে পুলিশের আচরণ কি বদলে যায়? নাকি ক্ষমতাসীনদের সঙ্গে সম্পর্কের সমীকরণ বদলালেও সাধারণ মানুষের প্রতি আচরণ একই থেকে যায়?
এখানে মূল বিষয় কোনো নির্দিষ্ট রাজনৈতিক দলের পক্ষে বা বিপক্ষে অবস্থান নেওয়া নয়। মূল বিষয় হলো, পুলিশ কি রাষ্ট্রের আইন ও জনগণের প্রতি দায়বদ্ধ থাকবে, নাকি ক্ষমতাবানদের স্বার্থ রক্ষার প্রতিষ্ঠান হিসেবেই কাজ করবে? একজন নাগরিক বিএনপি, আওয়ামী লীগ, জামায়াত কিংবা অন্য কোনো রাজনৈতিক দলের সমর্থক হতে পারেন। কিন্তু তাঁর রাজনৈতিক পরিচয়ের কারণে আইনগত অধিকার ক্ষুণ্ন হওয়ার কথা নয়। অপরাধ করলে আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নিতে হবে, আর অপরাধ না করলে রাজনৈতিক পরিচয়ের কারণে হয়রানি করার অধিকার কারও নেই।
সাংবাদিকদের ক্ষেত্রেও একই কথা প্রযোজ্য। সাংবাদিক সরকারের সমালোচনা করবেন, পুলিশের ভুল তুলে ধরবেন, ক্ষমতাবানদের অনিয়ম নিয়ে প্রশ্ন করবেন—এটাই তাঁর পেশাগত দায়িত্বের অংশ। সংবাদ প্রকাশের কারণে কোনো সাংবাদিককে হুমকি দেওয়া, ভয় দেখানো কিংবা হয়রানি করা হলে সেটি শুধু একজন ব্যক্তির ওপর চাপ সৃষ্টি করা নয়; এর প্রভাব পড়ে জনস্বার্থে তথ্য জানার মানুষের অধিকারেও। সাংবাদিকদের সব প্রতিবেদন যে সঠিক হবে, এমন নিশ্চয়তা নেই। ভুল হলে প্রতিবাদ, সংশোধন, আইনি প্রতিকার কিংবা পেশাগত জবাবদিহির ব্যবস্থা রয়েছে। কিন্তু সমালোচনার জবাব হয়রানি দিয়ে দেওয়া যায় না।
পুলিশের সঙ্গে সাংবাদিকদের সম্পর্ক হওয়া উচিত পারস্পরিক পেশাগত শ্রদ্ধা ও জবাবদিহির। সাংবাদিক অপরাধ করলে তাঁর বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে। পুলিশ সদস্য অপরাধ করলে তাঁর বিরুদ্ধেও একইভাবে ব্যবস্থা নিতে হবে। কোনো পক্ষই অন্য পক্ষের ঊর্ধ্বে নয়। সাংবাদিকের পরিচয় যেমন তাঁকে অপরাধের দায় থেকে মুক্তি দিতে পারে না, তেমনি পুলিশের পোশাকও কাউকে জবাবদিহির বাইরে রাখতে পারে না।
বেনজীর আহমেদের অতীত কর্মকাণ্ড নিয়ে আমার প্রশ্ন ও সমালোচনা আগেও ছিল, এখনো আছে। তাঁর একটি বক্তব্যের কথা মনে পড়ছে বলেই তাঁর সামগ্রিক ভূমিকার প্রতি সমর্থন জানাচ্ছি—বিষয়টি এমন নয়। বরং বর্তমান বাস্তবতায় দাঁড়িয়ে বুঝতে পারছি, সাংবাদিকদের নিরাপত্তা ও মর্যাদার প্রশ্নে শুধু বক্তব্য নয়, বাস্তব পদক্ষেপ কতটা জরুরি। কে বলছেন, সেটি গুরুত্বপূর্ণ; কিন্তু তার চেয়েও গুরুত্বপূর্ণ হলো, সাংবাদিকদের হয়রানি বন্ধে বাস্তবে কী করা হচ্ছে।
আজ আমার প্রত্যাশা, পুলিশের কোনো কর্মকর্তা সাংবাদিকদের পক্ষে দাঁড়ালে তাঁকে ব্যতিক্রম হিসেবে দেখতে হবে না। সাংবাদিকদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা যেন কারও ব্যক্তিগত সদিচ্ছার ওপর নির্ভর না করে, বরং প্রাতিষ্ঠানিক দায়িত্ব হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হয়। একই সঙ্গে পুলিশের সদস্যদেরও মনে রাখতে হবে, তাঁরা জনগণের করের টাকায় পরিচালিত রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানের অংশ। তাঁদের ক্ষমতার উৎস জনগণ, আর সেই ক্ষমতার সীমা নির্ধারণ করে আইন।
পুলিশের কাছে আমার প্রশ্ন খুব সরল—আপনারা কি সত্যিকার অর্থে জনগণের পুলিশ হতে পেরেছেন? সাংবাদিকদের বিরুদ্ধে অভিযোগ তোলার আগে নিজেদের বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগগুলোর জবাব দিতে প্রস্তুত আছেন? ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের পর মানুষ যে পরিবর্তনের প্রত্যাশা করেছিল, সেই পরিবর্তন বাস্তবে কতটা এসেছে, তার হিসাব দিতে পারবেন?
আমরা এমন পুলিশ চাই, যারা অপরাধীর রাজনৈতিক পরিচয় দেখবে না; সাংবাদিকের প্রশ্নে বিরক্ত হবে না; সাধারণ মানুষের অভিযোগ শুনবে; নিজেদের সদস্যদের অপরাধ আড়াল করবে না এবং ক্ষমতাবানদের অন্যায় দেখেও নীরব থাকবে না। আমরা এমন পুলিশ চাই, যাদের কাছে থানায় যাওয়া মানে আতঙ্ক নয়, বরং নিরাপত্তা ও ন্যায়বিচারের প্রত্যাশা।
কারণ, পুলিশের কাজ শুধু আইন প্রয়োগ করা নয়—আইনের প্রতি মানুষের আস্থা তৈরি করাও। আর সেই আস্থা তৈরি হয় ক্ষমতার দাপটে নয়, ন্যায়বিচার, মানবিকতা ও জবাবদিহির মাধ্যমে।
বেনজীর আহমেদের অতীত নিয়ে আমার সমালোচনা থাকবেই। কিন্তু আজকের পুলিশপ্রধানসহ পুরো বাহিনীর কাছেও একই প্রশ্ন রাখতে চাই—সাংবাদিকদের কাঠগড়ায় দাঁড় করানোর আগে নিজেদের আয়নায় একবার তাকাবেন কি? জনগণের কাছে নিজেদের কাজের হিসাব দেবেন কি? নাকি সাংবাদিকদের প্রশ্ন করাটাই আপনাদের কাছে সবচেয়ে বড় অপরাধ হয়ে থাকবে?
হাসিবুল ইসলাম
সংবাদকর্মী, কলাম লেখক
সভাপতি ‘নিউজ এডিটরস কাউন্সিল’, বরিশাল।
আমি ব্যক্তিগতভাবে সাবেক আইজিপি বেনজীর আহমেদকে পছন্দ করি না। তাঁর অতীত কর্মকাণ্ড নিয়ে বিভিন্ন সময়ে সমালোচনা করেছি, এখনো করি। তাঁর কর্মজীবন, ভূমিকা কিংবা বিতর্কিত অধ্যায়গুলোকে ভুলে গিয়ে তাঁকে নতুন করে মূল্যায়ন করারও কোনো কারণ দেখি না। কিন্তু ব্যক্তিগত অপছন্দের জায়গা থেকে সরে এসে যখন বর্তমান পরিস্থিতির সঙ্গে অতীতের কিছু ঘটনা মেলানোর চেষ্টা করি, তখন একটি বিষয় আমাকে ভাবায়। বিশেষ করে সাংবাদিকদের হয়রানি ও তাঁদের পাশে দাঁড়ানোর প্রশ্নে বেনজীর আহমেদের একটি পুরোনো বক্তব্য আজ নতুন করে মনে পড়ছে।
সাংবাদিকদের হয়রানির কোনো এক প্রসঙ্গে তিনি বলেছিলেন, সাংবাদিকদের দিকে তাকালে চোখ তুলে ফেলা হবে। বক্তব্যটি তখন আমার কাছেও বেশ উগ্র মনে হয়েছিল। একজন পুলিশ কর্মকর্তার মুখে এমন কঠোর ভাষা শুনে স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন জেগেছিল—সাংবাদিকদের প্রতি তাঁর এই অবস্থান কি সত্যিকারের ভালোবাসা, নাকি পরিস্থিতি সামাল দেওয়ার কৌশল? সাংবাদিকদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার অঙ্গীকার আর তাঁদের পক্ষে দাঁড়িয়ে এমন হুঁশিয়ারি দেওয়ার মধ্যে পার্থক্য আছে। তাই তখন তাঁর বক্তব্যকে নিঃশর্তভাবে ইতিবাচকভাবে নেওয়ার সুযোগ আমার কাছে ছিল না।
কিন্তু সময়ের ব্যবধানে আজ সেই বক্তব্যের কথা মনে পড়লে অন্য রকম অনুভূতি তৈরি হয়। কারণ, বর্তমান সময়ে সাংবাদিকদের পেশাগত মর্যাদা, নিরাপত্তা ও স্বাধীনতার পক্ষে দায়িত্বশীল অবস্থান নেবেন—এমন পুলিশ কর্মকর্তার বড় অভাব অনুভব করছি। অন্তত প্রকাশ্যে সাংবাদিকদের হয়রানির বিরুদ্ধে দৃঢ়ভাবে কথা বলবেন, তাঁদের পেশাগত দায়িত্ব পালনের অধিকারকে সম্মান করবেন এবং অন্যায় হলে নিজেদের বাহিনীর সদস্যদের জবাবদিহির আওতায় আনার কথা বলবেন—এমন কণ্ঠ আরও বেশি শোনা প্রয়োজন।
অবশ্য এটাও সত্য, একজন কর্মকর্তার প্রকাশ্য বক্তব্যই তাঁর পুরো মানসিকতা কিংবা কর্মজীবনের চূড়ান্ত মূল্যায়ন হতে পারে না। তখন হয়তো বেনজীর আহমেদের বক্তব্যের ভাষা আমাকে বিস্মিত করেছিল, আর আজকের বাস্তবতা আমাকে ভাবাচ্ছে—সাংবাদিকদের পক্ষে কথা বলার মতো দৃঢ় অবস্থান কি সত্যিই এত দুর্লভ হয়ে পড়েছে? আবার এমনও হতে পারে, অনেক পুলিশ কর্মকর্তার ব্যক্তিগতভাবে সাংবাদিকদের প্রতি সহমর্মিতা রয়েছে, কিন্তু প্রাতিষ্ঠানিক চাপ, ক্ষমতার সমীকরণ কিংবা পরিস্থিতিগত কারণে তাঁরা প্রকাশ্যে কিছু বলতে পারছেন না। তবে সেই সম্ভাবনা থাকলেও প্রশ্ন থেকে যায়, দায়িত্বশীল পদে থাকা ব্যক্তিরা অন্যায়ের বিরুদ্ধে নিজেদের অবস্থান স্পষ্ট করবেন না কেন?
সবচেয়ে বড় প্রশ্ন, দেশের প্রায় দুই লাখ বিশ হাজার পুলিশের মধ্যে সাংবাদিকদের পেশাগত অধিকার ও সত্য প্রকাশের স্বাধীনতার পক্ষে দৃঢ়ভাবে কথা বলার মতো একজনও কি নেই? নিশ্চয়ই পুরো বাহিনীকে এক পাল্লায় মাপা যায় না। পুলিশে সৎ, দায়িত্বশীল ও মানবিক সদস্য আছেন—এমন বিশ্বাস রাখার যথেষ্ট কারণ রয়েছে। কিন্তু বিচ্ছিন্নভাবে ভালো কাজের উদাহরণ থাকলেই একটি বাহিনীর সামগ্রিক ভাবমূর্তি বদলে যায় না। মানুষের আস্থা অর্জন করতে হলে দায়িত্বশীল আচরণ, স্বচ্ছতা, জবাবদিহি এবং অন্যায়ের বিরুদ্ধে দৃশ্যমান অবস্থান প্রয়োজন।
গতকাল পুলিশপ্রধানের মাদকসংক্রান্ত একটি বক্তব্যও সাংবাদিক ও রাজনৈতিক মহলে ব্যাপক বিতর্কের জন্ম দিয়েছে। বক্তব্যটির সারকথা যদি এমন হয় যে সাংবাদিকদের একটি অংশ মাদক কারবারিদের কাছ থেকে অর্থ নেন, তাহলে প্রশ্ন উঠতেই পারে—এই অভিযোগের ভিত্তি কী, এর পক্ষে সুনির্দিষ্ট তথ্য-প্রমাণ আছে কি না এবং অভিযোগ থাকলে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে কি না?
সাংবাদিকদের মধ্যে কেউ অপরাধে জড়িত থাকলে তাঁর দায় অবশ্যই ব্যক্তিগত। সাংবাদিক পরিচয় কাউকে আইনের ঊর্ধ্বে রাখে না। কিন্তু কয়েকজনের বিরুদ্ধে অভিযোগ থাকলে সেই অভিযোগের দায় পুরো সাংবাদিক সমাজের ওপর চাপিয়ে দেওয়া যায় না। একইভাবে পুলিশের কোনো সদস্য অপরাধে জড়ালে তাঁর দায়ও পুরো বাহিনীর প্রত্যেক সদস্যের ওপর চাপানো যুক্তিসংগত নয়। তাহলে এক পক্ষের ক্ষেত্রে ব্যক্তিগত দায়ের যুক্তি প্রযোজ্য হবে, আর অন্য পক্ষের ক্ষেত্রে পুরো পেশাকে কাঠগড়ায় দাঁড় করানো হবে—এ কেমন বিচার?
পুলিশপ্রধানের কাছে আমার প্রশ্ন, সাংবাদিকদের বিরুদ্ধে মাদক কারবারিদের কাছ থেকে অর্থ নেওয়ার অভিযোগ থাকলে সুনির্দিষ্ট তথ্য-প্রমাণের ভিত্তিতে ব্যবস্থা নিন। অপরাধী যে-ই হোক, তাঁর বিরুদ্ধে আইন প্রয়োগ করুন। কিন্তু অভিযোগের ভাষা ও উপস্থাপন এমন হওয়া উচিত, যাতে পুরো সাংবাদিক সমাজকে সন্দেহের চোখে দেখা না হয়। সাংবাদিকদেরও ভুল থাকতে পারে, সীমাবদ্ধতা থাকতে পারে, এমনকি কেউ কেউ পেশার অপব্যবহারও করতে পারেন। কিন্তু তাঁদের সমালোচনা করার নামে স্বাধীন সাংবাদিকতার প্রয়োজনীয়তা ও গুরুত্বকে খাটো করা কোনোভাবেই কাম্য নয়।
আরেকটি প্রশ্ন আরও গুরুত্বপূর্ণ—আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী কি নিজেদের ভূমিকা নিয়ে একই রকম আত্মসমালোচনা করতে প্রস্তুত? ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের পর দেশের রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক বাস্তবতায় বড় পরিবর্তন এসেছে। সেই পরিবর্তনের পর পুলিশের ভূমিকা নিয়ে মানুষের প্রত্যাশাও বেড়েছে। মানুষ চেয়েছিল, পুলিশ দলীয় প্রভাবমুক্ত হয়ে আইন অনুযায়ী কাজ করবে। রাজনৈতিক পরিচয়, ক্ষমতার অবস্থান কিংবা ব্যক্তিগত সম্পর্ক বিবেচনায় না নিয়ে অপরাধীকে অপরাধী হিসেবে দেখবে। সাধারণ মানুষ থানায় গিয়ে হয়রানির শিকার হবে না, মামলা করতে গিয়ে অনৈতিক চাপের মুখে পড়বে না এবং বিচার চাইতে গিয়ে নতুন করে ভোগান্তিতে পড়বে না।
কিন্তু প্রশ্ন হলো, সেই প্রত্যাশার কতটা বাস্তবায়ন হয়েছে? পুলিশ কি সত্যিকার অর্থে বদলেছে? নাকি শুধু ক্ষমতার কেন্দ্র বদলেছে, আর ক্ষমতাবানদের সঙ্গে পুলিশের সম্পর্কের পুরোনো সংস্কৃতি অনেক জায়গায় রয়ে গেছে?
আমি কোনো প্রমাণ ছাড়াই পুরো পুলিশ বাহিনীকে দুর্নীতিগ্রস্ত বলতে চাই না। কিন্তু সাধারণ মানুষের অভিজ্ঞতা, পুলিশের বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগ এবং বিভিন্ন ঘটনায় বাহিনীর ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন তোলার অধিকার নাগরিকদের রয়েছে। পুলিশের দায়িত্ব শুধু অপরাধী ধরা কিংবা মামলা দেওয়া নয়। মানুষের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা, বিপদে পাশে দাঁড়ানো, দুর্বল মানুষের অধিকার রক্ষা করা এবং আইন প্রয়োগে নিরপেক্ষতা বজায় রাখাও পুলিশের মৌলিক দায়িত্ব।
অথচ দীর্ঘদিন ধরে পুলিশের বিরুদ্ধে রাজনৈতিক প্রভাব খাটানো, বিরোধী মতের মানুষকে হয়রানি, মামলা-বাণিজ্য কিংবা অর্থ আদায়ের মতো নানা অভিযোগ উঠেছে। এসব অভিযোগের প্রতিটির সত্যতা আলাদাভাবে যাচাই করা জরুরি। কিন্তু অভিযোগগুলো যদি বারবার সামনে আসে, তাহলে সেগুলোকে নিছক অপপ্রচার বলে উড়িয়ে দেওয়ার সুযোগ নেই। বরং তদন্ত, জবাবদিহি ও প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কারের মাধ্যমে মানুষের আস্থা ফিরিয়ে আনতে হবে।
আমাদের অভিজ্ঞতায়, অতীতে বিএনপি-জামায়াতের নেতাকর্মীদের হয়রানি বা দমন-পীড়নের অভিযোগ যেমন ছিল, তেমনি আওয়ামী লীগ সরকারের সময়ও বিরোধী রাজনৈতিক মতের মানুষের বিরুদ্ধে পুলিশের ভূমিকা নিয়ে ব্যাপক সমালোচনা হয়েছে। এখন প্রশ্ন উঠছে, রাজনৈতিক পালাবদলের পর সেই পুরোনো সংস্কৃতি কতটা বদলেছে? আগে যারা ক্ষমতার বাইরে ছিল, তারা ক্ষমতায় এলে পুলিশের আচরণ কি বদলে যায়? নাকি ক্ষমতাসীনদের সঙ্গে সম্পর্কের সমীকরণ বদলালেও সাধারণ মানুষের প্রতি আচরণ একই থেকে যায়?
এখানে মূল বিষয় কোনো নির্দিষ্ট রাজনৈতিক দলের পক্ষে বা বিপক্ষে অবস্থান নেওয়া নয়। মূল বিষয় হলো, পুলিশ কি রাষ্ট্রের আইন ও জনগণের প্রতি দায়বদ্ধ থাকবে, নাকি ক্ষমতাবানদের স্বার্থ রক্ষার প্রতিষ্ঠান হিসেবেই কাজ করবে? একজন নাগরিক বিএনপি, আওয়ামী লীগ, জামায়াত কিংবা অন্য কোনো রাজনৈতিক দলের সমর্থক হতে পারেন। কিন্তু তাঁর রাজনৈতিক পরিচয়ের কারণে আইনগত অধিকার ক্ষুণ্ন হওয়ার কথা নয়। অপরাধ করলে আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নিতে হবে, আর অপরাধ না করলে রাজনৈতিক পরিচয়ের কারণে হয়রানি করার অধিকার কারও নেই।
সাংবাদিকদের ক্ষেত্রেও একই কথা প্রযোজ্য। সাংবাদিক সরকারের সমালোচনা করবেন, পুলিশের ভুল তুলে ধরবেন, ক্ষমতাবানদের অনিয়ম নিয়ে প্রশ্ন করবেন—এটাই তাঁর পেশাগত দায়িত্বের অংশ। সংবাদ প্রকাশের কারণে কোনো সাংবাদিককে হুমকি দেওয়া, ভয় দেখানো কিংবা হয়রানি করা হলে সেটি শুধু একজন ব্যক্তির ওপর চাপ সৃষ্টি করা নয়; এর প্রভাব পড়ে জনস্বার্থে তথ্য জানার মানুষের অধিকারেও। সাংবাদিকদের সব প্রতিবেদন যে সঠিক হবে, এমন নিশ্চয়তা নেই। ভুল হলে প্রতিবাদ, সংশোধন, আইনি প্রতিকার কিংবা পেশাগত জবাবদিহির ব্যবস্থা রয়েছে। কিন্তু সমালোচনার জবাব হয়রানি দিয়ে দেওয়া যায় না।
পুলিশের সঙ্গে সাংবাদিকদের সম্পর্ক হওয়া উচিত পারস্পরিক পেশাগত শ্রদ্ধা ও জবাবদিহির। সাংবাদিক অপরাধ করলে তাঁর বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে। পুলিশ সদস্য অপরাধ করলে তাঁর বিরুদ্ধেও একইভাবে ব্যবস্থা নিতে হবে। কোনো পক্ষই অন্য পক্ষের ঊর্ধ্বে নয়। সাংবাদিকের পরিচয় যেমন তাঁকে অপরাধের দায় থেকে মুক্তি দিতে পারে না, তেমনি পুলিশের পোশাকও কাউকে জবাবদিহির বাইরে রাখতে পারে না।
বেনজীর আহমেদের অতীত কর্মকাণ্ড নিয়ে আমার প্রশ্ন ও সমালোচনা আগেও ছিল, এখনো আছে। তাঁর একটি বক্তব্যের কথা মনে পড়ছে বলেই তাঁর সামগ্রিক ভূমিকার প্রতি সমর্থন জানাচ্ছি—বিষয়টি এমন নয়। বরং বর্তমান বাস্তবতায় দাঁড়িয়ে বুঝতে পারছি, সাংবাদিকদের নিরাপত্তা ও মর্যাদার প্রশ্নে শুধু বক্তব্য নয়, বাস্তব পদক্ষেপ কতটা জরুরি। কে বলছেন, সেটি গুরুত্বপূর্ণ; কিন্তু তার চেয়েও গুরুত্বপূর্ণ হলো, সাংবাদিকদের হয়রানি বন্ধে বাস্তবে কী করা হচ্ছে।
আজ আমার প্রত্যাশা, পুলিশের কোনো কর্মকর্তা সাংবাদিকদের পক্ষে দাঁড়ালে তাঁকে ব্যতিক্রম হিসেবে দেখতে হবে না। সাংবাদিকদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা যেন কারও ব্যক্তিগত সদিচ্ছার ওপর নির্ভর না করে, বরং প্রাতিষ্ঠানিক দায়িত্ব হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হয়। একই সঙ্গে পুলিশের সদস্যদেরও মনে রাখতে হবে, তাঁরা জনগণের করের টাকায় পরিচালিত রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানের অংশ। তাঁদের ক্ষমতার উৎস জনগণ, আর সেই ক্ষমতার সীমা নির্ধারণ করে আইন।
পুলিশের কাছে আমার প্রশ্ন খুব সরল—আপনারা কি সত্যিকার অর্থে জনগণের পুলিশ হতে পেরেছেন? সাংবাদিকদের বিরুদ্ধে অভিযোগ তোলার আগে নিজেদের বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগগুলোর জবাব দিতে প্রস্তুত আছেন? ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের পর মানুষ যে পরিবর্তনের প্রত্যাশা করেছিল, সেই পরিবর্তন বাস্তবে কতটা এসেছে, তার হিসাব দিতে পারবেন?
আমরা এমন পুলিশ চাই, যারা অপরাধীর রাজনৈতিক পরিচয় দেখবে না; সাংবাদিকের প্রশ্নে বিরক্ত হবে না; সাধারণ মানুষের অভিযোগ শুনবে; নিজেদের সদস্যদের অপরাধ আড়াল করবে না এবং ক্ষমতাবানদের অন্যায় দেখেও নীরব থাকবে না। আমরা এমন পুলিশ চাই, যাদের কাছে থানায় যাওয়া মানে আতঙ্ক নয়, বরং নিরাপত্তা ও ন্যায়বিচারের প্রত্যাশা।
কারণ, পুলিশের কাজ শুধু আইন প্রয়োগ করা নয়—আইনের প্রতি মানুষের আস্থা তৈরি করাও। আর সেই আস্থা তৈরি হয় ক্ষমতার দাপটে নয়, ন্যায়বিচার, মানবিকতা ও জবাবদিহির মাধ্যমে।
বেনজীর আহমেদের অতীত নিয়ে আমার সমালোচনা থাকবেই। কিন্তু আজকের পুলিশপ্রধানসহ পুরো বাহিনীর কাছেও একই প্রশ্ন রাখতে চাই—সাংবাদিকদের কাঠগড়ায় দাঁড় করানোর আগে নিজেদের আয়নায় একবার তাকাবেন কি? জনগণের কাছে নিজেদের কাজের হিসাব দেবেন কি? নাকি সাংবাদিকদের প্রশ্ন করাটাই আপনাদের কাছে সবচেয়ে বড় অপরাধ হয়ে থাকবে?
হাসিবুল ইসলাম
সংবাদকর্মী, কলাম লেখক
সভাপতি ‘নিউজ এডিটরস কাউন্সিল’, বরিশাল।

২৩ অক্টোবর, ২০২৬ ১৪:২৪
নিকোলাস বিশ্বাস
২৪ অক্টোবর “জাতিসংঘ দিবস”। ২০২৬ সালে গোটা বিশ্ব এ দিবসটি পালন করবে এমন এক সময়ে, যখন আন্তর্জাতিক সহযোগিতা গভীর সংকটের মুখে। যুদ্ধ বেসামরিক মানুষের জীবন বিপন্ন করছে, ভূরাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বিতা সম্মিলিত পদক্ষেপ অচল করে দিচ্ছে, মানবাধিকার সুরক্ষায় দেখা যাচ্ছে দ্বৈতনীতি এবং জলবায়ু সংকটের সবচেয়ে বড় বোঝা বহন করছে বিশ্বের ঝুঁকিপূর্ণ জনগোষ্ঠী। অর্থনৈতিক বৈষম্য ও আর্থিক চাপও বাধাগ্রস্ত করছে টেকসই উন্নয়ন।
দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর প্রতিষ্ঠিত জাতিসংঘের লক্ষ্য ছিল ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে যুদ্ধের ধ্বংসযজ্ঞ থেকে রক্ষা করা এবং সংলাপের মাধ্যমে বিরোধ নিষ্পত্তি করা। ১৯৪৫ সালে জাতিসংঘ সনদ কার্যকর হওয়ার ৮১ বছর পরও এই লক্ষ্য অপরিহার্য। তবে প্রতিষ্ঠাকালীন আদর্শ ও মানুষের বাস্তব অভিজ্ঞতার ব্যবধান প্রশ্ন তুলছে: জাতিসংঘ কি তার প্রতিশ্রুতি পূরণে সক্ষম?
প্রতিনিধিত্ব ও কার্যকারিতার সংকট
বর্তমানে জাতিসংঘের সদস্যরাষ্ট্র ১৯৩টি। ভ্যাটিকান ও ফিলিস্তিন রাষ্ট্র সদস্য না হলেও পর্যবেক্ষক রাষ্ট্রের মর্যাদায় রয়েছে। ১৯৪৫ সালে ৫১টি প্রতিষ্ঠাতা সদস্য নিয়ে যাত্রা শুরু করা সংস্থাটিতে বাংলাদেশ যোগ দেয় ১৯৭৪ সালের ১৭ সেপ্টেম্বর। সর্বশেষ সদস্যরাষ্ট্র দক্ষিণ সুদান, যার সদস্যপদ লাভের তারিখ ২০১১ সালের ১৪ জুলাই।
সাধারণ পরিষদে প্রতিটি সদস্যরাষ্ট্রের একটি করে ভোট থাকলেও বৈশ্বিক সিদ্ধান্ত গ্রহণে সবার প্রভাব সমান নয়। বিশেষ করে নিরাপত্তা পরিষদের কাঠামোয় ক্ষমতার অসম বণ্টন স্পষ্ট। তাই প্রশ্নটি জাতিসংঘের প্রয়োজনীয়তা নিয়ে নয়; বরং সংস্থাটি কতটা কার্যকর, প্রতিনিধিত্বশীল ও জবাবদিহিমূলক হতে পারে, সেটিই এখন বড় চ্যালেঞ্জ।
শান্তি ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করা
জাতিসংঘ প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল বিশ্বে যুদ্ধ প্রতিরোধের লক্ষ্যে। অথচ ভূরাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বিতা এবং নিরাপত্তা পরিষদের পাঁচ স্থায়ী সদস্যের ভেটো ক্ষমতা প্রায়ই কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণে বাধা সৃষ্টি করে। যখন সম্মিলিত দায়িত্বের চেয়ে জাতীয় কৌশলগত স্বার্থ প্রাধান্য পায়, তখন আন্তর্জাতিক ব্যবস্থার বিশ্বাসযোগ্যতা ক্ষতিগ্রস্ত হয়। এর মূল্য দিতে হয় সাধারণ মানুষকেপরিবার হারায় ঘরবাড়ি, শিশুরা হারায় শিক্ষার সুযোগ এবং লাখো মানুষ বাস্তুচ্যুত হয়।
শান্তি মানে শুধু যুদ্ধ বন্ধ হওয়া নয়; এর অর্থ নিরাপদে ঘরে ফেরা, ভয়মুক্ত জীবনযাপন এবং মর্যাদার সঙ্গে নতুন করে জীবন গড়ে তোলা। সংঘাত প্রতিরোধে আগাম সতর্কতা, কূটনৈতিক উদ্যোগ ও মধ্যস্থতা জোরদার করতে হবে। একই সঙ্গে নিরাপত্তা পরিষদে অনু-প্রতিনিধিত্বশীল অঞ্চলগুলোর অংশগ্রহণ বাড়ানো এবং ব্যাপক নৃশংসতার ক্ষেত্রে ভেটো ব্যবহারে সংযম প্রতিষ্ঠা জরুরি। এজন্য প্রয়োজন প্রভাবশালী রাষ্ট্রগুলোর রাজনৈতিক সদিচ্ছা।
বহুপাক্ষিকতায় আস্থা ফেরানো
জাতীয়তাবাদ, রাজনৈতিক মেরুকরণ এবং আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠানের প্রতি আস্থার অবক্ষয় বৈশ্বিক সহযোগিতাকে দুর্বল করছে। কিছু সরকার আন্তর্জাতিক চুক্তিকে জাতীয় সার্বভৌমত্বের সীমাবদ্ধতা হিসেবে দেখে; অন্যরা মনে করে, আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠানগুলো সব ক্ষেত্রে একই নীতি অনুসরণ করে না। আস্থা পুনরুদ্ধারে প্রয়োজন ন্যায্যতা, স্বচ্ছতা ও দৃশ্যমান ফলাফল। অন্যদের কাছে জবাবদিহি দাবি করা ক্ষমতাধর রাষ্ট্রগুলোকেও নিজেদের কর্মকাণ্ডের জন্য জবাবদিহি করতে হবে।
জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের ৮১তম অধিবেশনে এই বিতর্ক স্পষ্ট হয়ে ওঠে। ২০২৬ সালের ২৩ সেপ্টেম্বর আর্জেন্টিনার প্রেসিডেন্ট হাভিয়ের মাইলেই জাতিসংঘকে ‘অকার্যকর সংস্থা’ এবং এর কর্মকর্তাদের ‘অহংকারী পরজীবী’ বলে আখ্যায়িত করেন বলে দ্য টাইমস অব ইসরায়েল জানিয়েছে। তাঁর অভিযোগ, সংস্থাটি সম্মিলিত নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে ব্যর্থ হয়েছে। বিপরীতে, স্পেনের প্রধানমন্ত্রী পেদ্রো সানচেজ নিরাপত্তা পরিষদে সব অঞ্চলের ন্যায্য প্রতিনিধিত্ব নিশ্চিত করতে সংস্কারের আহ্বান জানান এবং ভেটো ক্ষমতা বিলুপ্ত করার পক্ষে মত দেন বলে আনাদোলু এজেন্সির প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
মহামারি, জলবায়ু পরিবর্তন ও সাইবার হুমকি প্রমাণ করে, স্বার্থের পার্থক্য থাকা সত্ত্বেও রাষ্ট্রগুলোর সহযোগিতা অপরিহার্য। দায়িত্বশীল বহুপাক্ষিকতা জাতীয় স্বার্থকে অস্বীকার করে না; বরং তা সুরক্ষায় সহায়তা করে। এজন্য আন্তর্জাতিক ও বহুপাক্ষিক সহযোগিতা বৃদ্ধি, প্রতিশ্রুতি রক্ষা এবং স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা জাতিসংঘের অন্যতম দায়িত্ব হওয়া উচিৎ।
মানবাধিকার হতে হবে সর্বজনীন
মানবাধিকারের সর্বজনীন ঘোষণাপত্র মানুষের মর্যাদা, স্বাধীনতা ও সমতার অভিন্ন মানদণ্ড নির্ধারণ করেছে। কিন্তু এর বাস্তবায়ন এখনো অসম। কোনো কোনো সরকার সমালোচনা এড়াতে সার্বভৌমত্বের যুক্তি তুলে ধরে। অন্যদিকে নজরদারি, অনলাইন সেন্সরশিপ ও ডিজিটাল দমন-পীড়ন ব্যক্তি-স্বাধীনতার জন্য নতুন হুমকি তৈরি করছে।
রাজনৈতিক সুবিধা অনুযায়ী নয়, সর্বক্ষেত্রে মানবাধিকার রক্ষা করতে পারলেই জাতিসংঘের বিশ্বাসযোগ্যতা বাড়বে। বেসামরিক মানুষের সুরক্ষা, মতপ্রকাশের স্বাধীনতা ও আইনের দৃষ্টিতে সমতা কোনো রাজনৈতিক সমঝোতার হাতিয়ার হতে পারে না। গুরুতর মানবাধিকার লঙ্ঘনের নিরপেক্ষ তদন্ত, জবাবদিহি এবং ব্যক্তিগত গোপনীয়তা সুরক্ষায় কার্যকর উদ্যোগ প্রয়োজন।
টেকসই উন্নয়নে বৈশ্বিক সংহতি
জাতিসংঘের ২০৩০ সালের এজেন্ডা ও ১৭টি টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা দারিদ্র্য, বৈষম্য, স্বাস্থ্য, শিক্ষা ও পরিবেশ সুরক্ষায় অভিন্ন কাঠামো তৈরি করেছে। কিন্তু অর্থনৈতিক অভিঘাত, ঋণসংকট, অপর্যাপ্ত অর্থায়ন ও জলবায়ু পরিবর্তন অগ্রগতিকে মন্থর করছে। পরিবেশগত সংকটে যাদের অবদান সবচেয়ে কম, অনেক ক্ষেত্রে তারাই ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে সবচেয়ে বেশি।
বাংলাদেশের মতো উন্নয়নশীল দেশের জন্য সহজলভ্য জলবায়ু অর্থায়ন, প্রযুক্তি হস্তান্তর, দক্ষতা বৃদ্ধি এবং ন্যায্য অর্থনৈতিক ব্যবস্থা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। বৈশ্বিক আর্থিক কাঠামোর সংস্কার, স্বল্পসুদে উন্নয়ন অর্থায়ন এবং অসহনীয় ঋণের বোঝা কমানো জরুরি। উন্নত দেশগুলোকে জলবায়ু প্রতিশ্রুতির সঙ্গে বাস্তব আর্থিক সহায়তার সমন্বয় ঘটাতে হবে।
তবে শুধু বৈদেশিক সহায়তা যথেষ্ট নয়। জাতীয় নেতৃত্ব, সুশাসন ও জবাবদিহিও সমান গুরুত্বপূর্ণ। জাতিসংঘের দায়িত্ব হলো অংশীদারিত্ব গড়ে তোলা এবং উন্নয়নের সুফল যেন ঝুঁকিপূর্ণ জনগোষ্ঠীর কাছেও পৌঁছায়, তা নিশ্চিত করা।
ঘোষণার চেয়ে বাস্তবায়ন গুরুত্বপূর্ণ
জাতিসংঘের ৮১তম অধিবেশনের প্রতিপাদ্য - ‘আস্থা পুনরুদ্ধার, পরিবর্তন মোকাবিলা: সবার জন্য কার্যকর জাতিসংঘ’ - বর্তমান চ্যালেঞ্জের সারকথা তুলে ধরে। মানুষের জীবনে দৃশ্যমান অগ্রগতিই আস্থা ফেরানোর প্রধান শর্ত। জাতিসংঘের বিভিন্ন সংস্থার মধ্যে সমন্বয়, ফলাফলের জবাবদিহি এবং প্রযুক্তির দায়িত্বশীল ব্যবহার বাড়াতে হবে। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা জনসেবা উন্নত করতে পারে, তবে এর ব্যবহার মানবাধিকার ও স্বচ্ছতার নীতির সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ হওয়া জরুরি।
সদস্যরাষ্ট্রগুলোর পাশাপাশি নাগরিক সমাজ, তরুণ প্রজন্ম, গবেষক ও সাংবাদিকদেরও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে। বাংলাদেশসহ উন্নয়নশীল দেশগুলোকে শুধু আন্তর্জাতিক বৈঠকে অংশ নেওয়ার মধ্যে সীমাবদ্ধ না থেকে ন্যায্য বৈশ্বিক নিয়ম প্রতিষ্ঠা এবং ঝুঁকিপূর্ণ জনগোষ্ঠীর স্বার্থ তুলে ধরে তা আদায় করতে হবে।
মানবতার প্রতি নতুন অঙ্গীকার
জাতিসংঘ দিবস কেবল বার্ষিকী উদ্যাপনের দিন নয়; বরং প্রতিশ্রুতি ও বাস্তবতার ব্যবধান পর্যালোচনার উপলক্ষ্য। জাতিসংঘ নিখুঁত প্রতিষ্ঠান নয়, কিন্তু রাষ্ট্রগুলোর মধ্যে আলোচনা ও সমঝোতার জন্য একটি অভিন্ন বৈশ্বিক মঞ্চের প্রয়োজন অনস্বীকার্য। বহুপাক্ষিক সহযোগিতা পরিত্যাগ করলে বৈশ্বিক সংকট দূর হবে না; বরং সেগুলো মোকাবিলা আরও কঠিন হবে।
৮১ বছরে পদার্পণ করা জাতিসংঘের প্রয়োজন প্রতিষ্ঠাকালীন আদর্শের প্রতি নতুন অঙ্গীকার, প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কার, নির্ভরযোগ্য অর্থায়ন এবং সংকীর্ণ রাজনৈতিক স্বার্থের ঊর্ধ্বে মানবতাকে স্থান দেওয়ার মানসিকতা। এর সাফল্য নির্ধারিত হবে শুধু গৃহীত প্রস্তাব দিয়ে নয়; বরং যুদ্ধের দুর্ভোগ কমছে কি না, মানবাধিকার সুরক্ষিত হচ্ছে কি না, উন্নয়নশীল দেশগুলো ন্যায্য সুযোগ পাচ্ছে কি না এবং ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য নিরাপদ পৃথিবী নিশ্চিত হচ্ছে কি না, তার ভিত্তিতে।
জাতিসংঘের শরণার্থীবিষয়ক হাইকমিশনার বারহাম সালিহ যথার্থই বলেছেন, ‘শান্তির পরিমাপ শুধু স্বাক্ষরিত চুক্তির মাধ্যমে নয়, বরং মানুষের জীবনে আসা পরিবর্তনের মাধ্যমেও করতে হবে।’ বিশ্বের প্রয়োজন এমন এক জাতিসংঘ, যে শুধু কিছু মুষ্টিমেয়দের পক্ষে কাজ করবে না, বরং সবার জন্য কাজ করবে এবং বাস্তব ফলাফল নিশ্চিত করবে।
লেখক পরিচিতি
নিকোলাস বিশ্বাস একজন ফ্রীল্যান্স গণমাধ্যমকর্মী এবং জাতিসংঘ জনসংখ্যা তহবিল (UNFPA) মিডিয়া অ্যাওয়ার্ডপ্রাপ্ত। যোগাযোগের ই-মেইল: gonomaddzam@gmail.com
নিকোলাস বিশ্বাস
২৪ অক্টোবর “জাতিসংঘ দিবস”। ২০২৬ সালে গোটা বিশ্ব এ দিবসটি পালন করবে এমন এক সময়ে, যখন আন্তর্জাতিক সহযোগিতা গভীর সংকটের মুখে। যুদ্ধ বেসামরিক মানুষের জীবন বিপন্ন করছে, ভূরাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বিতা সম্মিলিত পদক্ষেপ অচল করে দিচ্ছে, মানবাধিকার সুরক্ষায় দেখা যাচ্ছে দ্বৈতনীতি এবং জলবায়ু সংকটের সবচেয়ে বড় বোঝা বহন করছে বিশ্বের ঝুঁকিপূর্ণ জনগোষ্ঠী। অর্থনৈতিক বৈষম্য ও আর্থিক চাপও বাধাগ্রস্ত করছে টেকসই উন্নয়ন।
দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর প্রতিষ্ঠিত জাতিসংঘের লক্ষ্য ছিল ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে যুদ্ধের ধ্বংসযজ্ঞ থেকে রক্ষা করা এবং সংলাপের মাধ্যমে বিরোধ নিষ্পত্তি করা। ১৯৪৫ সালে জাতিসংঘ সনদ কার্যকর হওয়ার ৮১ বছর পরও এই লক্ষ্য অপরিহার্য। তবে প্রতিষ্ঠাকালীন আদর্শ ও মানুষের বাস্তব অভিজ্ঞতার ব্যবধান প্রশ্ন তুলছে: জাতিসংঘ কি তার প্রতিশ্রুতি পূরণে সক্ষম?
প্রতিনিধিত্ব ও কার্যকারিতার সংকট
বর্তমানে জাতিসংঘের সদস্যরাষ্ট্র ১৯৩টি। ভ্যাটিকান ও ফিলিস্তিন রাষ্ট্র সদস্য না হলেও পর্যবেক্ষক রাষ্ট্রের মর্যাদায় রয়েছে। ১৯৪৫ সালে ৫১টি প্রতিষ্ঠাতা সদস্য নিয়ে যাত্রা শুরু করা সংস্থাটিতে বাংলাদেশ যোগ দেয় ১৯৭৪ সালের ১৭ সেপ্টেম্বর। সর্বশেষ সদস্যরাষ্ট্র দক্ষিণ সুদান, যার সদস্যপদ লাভের তারিখ ২০১১ সালের ১৪ জুলাই।
সাধারণ পরিষদে প্রতিটি সদস্যরাষ্ট্রের একটি করে ভোট থাকলেও বৈশ্বিক সিদ্ধান্ত গ্রহণে সবার প্রভাব সমান নয়। বিশেষ করে নিরাপত্তা পরিষদের কাঠামোয় ক্ষমতার অসম বণ্টন স্পষ্ট। তাই প্রশ্নটি জাতিসংঘের প্রয়োজনীয়তা নিয়ে নয়; বরং সংস্থাটি কতটা কার্যকর, প্রতিনিধিত্বশীল ও জবাবদিহিমূলক হতে পারে, সেটিই এখন বড় চ্যালেঞ্জ।
শান্তি ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করা
জাতিসংঘ প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল বিশ্বে যুদ্ধ প্রতিরোধের লক্ষ্যে। অথচ ভূরাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বিতা এবং নিরাপত্তা পরিষদের পাঁচ স্থায়ী সদস্যের ভেটো ক্ষমতা প্রায়ই কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণে বাধা সৃষ্টি করে। যখন সম্মিলিত দায়িত্বের চেয়ে জাতীয় কৌশলগত স্বার্থ প্রাধান্য পায়, তখন আন্তর্জাতিক ব্যবস্থার বিশ্বাসযোগ্যতা ক্ষতিগ্রস্ত হয়। এর মূল্য দিতে হয় সাধারণ মানুষকেপরিবার হারায় ঘরবাড়ি, শিশুরা হারায় শিক্ষার সুযোগ এবং লাখো মানুষ বাস্তুচ্যুত হয়।
শান্তি মানে শুধু যুদ্ধ বন্ধ হওয়া নয়; এর অর্থ নিরাপদে ঘরে ফেরা, ভয়মুক্ত জীবনযাপন এবং মর্যাদার সঙ্গে নতুন করে জীবন গড়ে তোলা। সংঘাত প্রতিরোধে আগাম সতর্কতা, কূটনৈতিক উদ্যোগ ও মধ্যস্থতা জোরদার করতে হবে। একই সঙ্গে নিরাপত্তা পরিষদে অনু-প্রতিনিধিত্বশীল অঞ্চলগুলোর অংশগ্রহণ বাড়ানো এবং ব্যাপক নৃশংসতার ক্ষেত্রে ভেটো ব্যবহারে সংযম প্রতিষ্ঠা জরুরি। এজন্য প্রয়োজন প্রভাবশালী রাষ্ট্রগুলোর রাজনৈতিক সদিচ্ছা।
বহুপাক্ষিকতায় আস্থা ফেরানো
জাতীয়তাবাদ, রাজনৈতিক মেরুকরণ এবং আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠানের প্রতি আস্থার অবক্ষয় বৈশ্বিক সহযোগিতাকে দুর্বল করছে। কিছু সরকার আন্তর্জাতিক চুক্তিকে জাতীয় সার্বভৌমত্বের সীমাবদ্ধতা হিসেবে দেখে; অন্যরা মনে করে, আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠানগুলো সব ক্ষেত্রে একই নীতি অনুসরণ করে না। আস্থা পুনরুদ্ধারে প্রয়োজন ন্যায্যতা, স্বচ্ছতা ও দৃশ্যমান ফলাফল। অন্যদের কাছে জবাবদিহি দাবি করা ক্ষমতাধর রাষ্ট্রগুলোকেও নিজেদের কর্মকাণ্ডের জন্য জবাবদিহি করতে হবে।
জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের ৮১তম অধিবেশনে এই বিতর্ক স্পষ্ট হয়ে ওঠে। ২০২৬ সালের ২৩ সেপ্টেম্বর আর্জেন্টিনার প্রেসিডেন্ট হাভিয়ের মাইলেই জাতিসংঘকে ‘অকার্যকর সংস্থা’ এবং এর কর্মকর্তাদের ‘অহংকারী পরজীবী’ বলে আখ্যায়িত করেন বলে দ্য টাইমস অব ইসরায়েল জানিয়েছে। তাঁর অভিযোগ, সংস্থাটি সম্মিলিত নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে ব্যর্থ হয়েছে। বিপরীতে, স্পেনের প্রধানমন্ত্রী পেদ্রো সানচেজ নিরাপত্তা পরিষদে সব অঞ্চলের ন্যায্য প্রতিনিধিত্ব নিশ্চিত করতে সংস্কারের আহ্বান জানান এবং ভেটো ক্ষমতা বিলুপ্ত করার পক্ষে মত দেন বলে আনাদোলু এজেন্সির প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
মহামারি, জলবায়ু পরিবর্তন ও সাইবার হুমকি প্রমাণ করে, স্বার্থের পার্থক্য থাকা সত্ত্বেও রাষ্ট্রগুলোর সহযোগিতা অপরিহার্য। দায়িত্বশীল বহুপাক্ষিকতা জাতীয় স্বার্থকে অস্বীকার করে না; বরং তা সুরক্ষায় সহায়তা করে। এজন্য আন্তর্জাতিক ও বহুপাক্ষিক সহযোগিতা বৃদ্ধি, প্রতিশ্রুতি রক্ষা এবং স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা জাতিসংঘের অন্যতম দায়িত্ব হওয়া উচিৎ।
মানবাধিকার হতে হবে সর্বজনীন
মানবাধিকারের সর্বজনীন ঘোষণাপত্র মানুষের মর্যাদা, স্বাধীনতা ও সমতার অভিন্ন মানদণ্ড নির্ধারণ করেছে। কিন্তু এর বাস্তবায়ন এখনো অসম। কোনো কোনো সরকার সমালোচনা এড়াতে সার্বভৌমত্বের যুক্তি তুলে ধরে। অন্যদিকে নজরদারি, অনলাইন সেন্সরশিপ ও ডিজিটাল দমন-পীড়ন ব্যক্তি-স্বাধীনতার জন্য নতুন হুমকি তৈরি করছে।
রাজনৈতিক সুবিধা অনুযায়ী নয়, সর্বক্ষেত্রে মানবাধিকার রক্ষা করতে পারলেই জাতিসংঘের বিশ্বাসযোগ্যতা বাড়বে। বেসামরিক মানুষের সুরক্ষা, মতপ্রকাশের স্বাধীনতা ও আইনের দৃষ্টিতে সমতা কোনো রাজনৈতিক সমঝোতার হাতিয়ার হতে পারে না। গুরুতর মানবাধিকার লঙ্ঘনের নিরপেক্ষ তদন্ত, জবাবদিহি এবং ব্যক্তিগত গোপনীয়তা সুরক্ষায় কার্যকর উদ্যোগ প্রয়োজন।
টেকসই উন্নয়নে বৈশ্বিক সংহতি
জাতিসংঘের ২০৩০ সালের এজেন্ডা ও ১৭টি টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা দারিদ্র্য, বৈষম্য, স্বাস্থ্য, শিক্ষা ও পরিবেশ সুরক্ষায় অভিন্ন কাঠামো তৈরি করেছে। কিন্তু অর্থনৈতিক অভিঘাত, ঋণসংকট, অপর্যাপ্ত অর্থায়ন ও জলবায়ু পরিবর্তন অগ্রগতিকে মন্থর করছে। পরিবেশগত সংকটে যাদের অবদান সবচেয়ে কম, অনেক ক্ষেত্রে তারাই ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে সবচেয়ে বেশি।
বাংলাদেশের মতো উন্নয়নশীল দেশের জন্য সহজলভ্য জলবায়ু অর্থায়ন, প্রযুক্তি হস্তান্তর, দক্ষতা বৃদ্ধি এবং ন্যায্য অর্থনৈতিক ব্যবস্থা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। বৈশ্বিক আর্থিক কাঠামোর সংস্কার, স্বল্পসুদে উন্নয়ন অর্থায়ন এবং অসহনীয় ঋণের বোঝা কমানো জরুরি। উন্নত দেশগুলোকে জলবায়ু প্রতিশ্রুতির সঙ্গে বাস্তব আর্থিক সহায়তার সমন্বয় ঘটাতে হবে।
তবে শুধু বৈদেশিক সহায়তা যথেষ্ট নয়। জাতীয় নেতৃত্ব, সুশাসন ও জবাবদিহিও সমান গুরুত্বপূর্ণ। জাতিসংঘের দায়িত্ব হলো অংশীদারিত্ব গড়ে তোলা এবং উন্নয়নের সুফল যেন ঝুঁকিপূর্ণ জনগোষ্ঠীর কাছেও পৌঁছায়, তা নিশ্চিত করা।
ঘোষণার চেয়ে বাস্তবায়ন গুরুত্বপূর্ণ
জাতিসংঘের ৮১তম অধিবেশনের প্রতিপাদ্য - ‘আস্থা পুনরুদ্ধার, পরিবর্তন মোকাবিলা: সবার জন্য কার্যকর জাতিসংঘ’ - বর্তমান চ্যালেঞ্জের সারকথা তুলে ধরে। মানুষের জীবনে দৃশ্যমান অগ্রগতিই আস্থা ফেরানোর প্রধান শর্ত। জাতিসংঘের বিভিন্ন সংস্থার মধ্যে সমন্বয়, ফলাফলের জবাবদিহি এবং প্রযুক্তির দায়িত্বশীল ব্যবহার বাড়াতে হবে। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা জনসেবা উন্নত করতে পারে, তবে এর ব্যবহার মানবাধিকার ও স্বচ্ছতার নীতির সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ হওয়া জরুরি।
সদস্যরাষ্ট্রগুলোর পাশাপাশি নাগরিক সমাজ, তরুণ প্রজন্ম, গবেষক ও সাংবাদিকদেরও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে। বাংলাদেশসহ উন্নয়নশীল দেশগুলোকে শুধু আন্তর্জাতিক বৈঠকে অংশ নেওয়ার মধ্যে সীমাবদ্ধ না থেকে ন্যায্য বৈশ্বিক নিয়ম প্রতিষ্ঠা এবং ঝুঁকিপূর্ণ জনগোষ্ঠীর স্বার্থ তুলে ধরে তা আদায় করতে হবে।
মানবতার প্রতি নতুন অঙ্গীকার
জাতিসংঘ দিবস কেবল বার্ষিকী উদ্যাপনের দিন নয়; বরং প্রতিশ্রুতি ও বাস্তবতার ব্যবধান পর্যালোচনার উপলক্ষ্য। জাতিসংঘ নিখুঁত প্রতিষ্ঠান নয়, কিন্তু রাষ্ট্রগুলোর মধ্যে আলোচনা ও সমঝোতার জন্য একটি অভিন্ন বৈশ্বিক মঞ্চের প্রয়োজন অনস্বীকার্য। বহুপাক্ষিক সহযোগিতা পরিত্যাগ করলে বৈশ্বিক সংকট দূর হবে না; বরং সেগুলো মোকাবিলা আরও কঠিন হবে।
৮১ বছরে পদার্পণ করা জাতিসংঘের প্রয়োজন প্রতিষ্ঠাকালীন আদর্শের প্রতি নতুন অঙ্গীকার, প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কার, নির্ভরযোগ্য অর্থায়ন এবং সংকীর্ণ রাজনৈতিক স্বার্থের ঊর্ধ্বে মানবতাকে স্থান দেওয়ার মানসিকতা। এর সাফল্য নির্ধারিত হবে শুধু গৃহীত প্রস্তাব দিয়ে নয়; বরং যুদ্ধের দুর্ভোগ কমছে কি না, মানবাধিকার সুরক্ষিত হচ্ছে কি না, উন্নয়নশীল দেশগুলো ন্যায্য সুযোগ পাচ্ছে কি না এবং ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য নিরাপদ পৃথিবী নিশ্চিত হচ্ছে কি না, তার ভিত্তিতে।
জাতিসংঘের শরণার্থীবিষয়ক হাইকমিশনার বারহাম সালিহ যথার্থই বলেছেন, ‘শান্তির পরিমাপ শুধু স্বাক্ষরিত চুক্তির মাধ্যমে নয়, বরং মানুষের জীবনে আসা পরিবর্তনের মাধ্যমেও করতে হবে।’ বিশ্বের প্রয়োজন এমন এক জাতিসংঘ, যে শুধু কিছু মুষ্টিমেয়দের পক্ষে কাজ করবে না, বরং সবার জন্য কাজ করবে এবং বাস্তব ফলাফল নিশ্চিত করবে।
লেখক পরিচিতি
নিকোলাস বিশ্বাস একজন ফ্রীল্যান্স গণমাধ্যমকর্মী এবং জাতিসংঘ জনসংখ্যা তহবিল (UNFPA) মিডিয়া অ্যাওয়ার্ডপ্রাপ্ত। যোগাযোগের ই-মেইল: gonomaddzam@gmail.com

২৭ সেপ্টেম্বর, ২০২৬ ১৩:৪১
এসপি মাহমুদ হাসানকে নিয়ে ষড়যন্ত্র নতুন কোনো ঘটনা নয়। পতিত আওয়ামী লীগের আমলেও তাকে নিয়ে বহুবার ষড়যন্ত্র হয়েছে। স্বার্থে আঘাত লাগার কারণে তাকে কখনো বিএনপিপন্থী পুলিশ, কখনো জামায়াতপন্থী, আবার কখনো রাজাকার ট্যাগ লাগানোর চেষ্টা করা হয়েছে। আমি নিজে যার বড় সাক্ষী। এর প্রতিবাদ জানিয়ে আমি নিজেই একবার কলাম লিখেছিলাম। আরেকবার একটা কবিতাও লিখেছিলাম।
তবে সবচেয়ে মজার ব্যাপার হলো- এবার তাকে উল্টো আওয়ামী ফ্যাসিস্টের দোসর বানানোর মিশন নিয়ে নেমেছে একটি গ্রুপ। ট্যাগিং, ফ্রেমিং, ব্লেমিংয়ের সেই ধারা একই আছে তবে এবার জাস্ট ১৮০ ডিগ্রি অ্যাঙ্গেলে ইউটার্ণ নিয়ে পক্ষটা ঘুরে গেছে। কারণ, এসপি মাহমুদ হাসানের দোষ একটাই। সে অন্যায়ের সাথে আপোষ করতে পারে না। নিজের নীতি আর আদর্শ থেকে সহজে বিচ্যুত হতে পারে না। এজন্য বারবারই সমস্যায় পড়তে হয় তাঁকে।
মাহমুদ হাসান কখনো দলীয় পুলিশ হয়নি। সে সবসময় চেয়েছে প্রজাতন্ত্রের পুলিশ হতে। তাঁর একমাত্র লক্ষ্য ছিল জনগণের পুলিশ হয়ে ওঠা। আদর্শবান এক স্কুল শিক্ষকের সন্তান আর অসম্ভব রকমের মেধাবী মাহমুদ পটুয়াখালী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াশোনা শেষ করে প্রথমে বিসিএস কৃষি ক্যাডারে এবং পরে বিসিএস পুলিশ ক্যাডারে যোগদান করেছে। সহকারী পুলিশ কমিশনার হিসেবে বরিশাল মেট্রোপলিটনে এবং অতিরিক্ত পুলিশ সুপার হিসেবে ঝালকাঠিতে দীর্ঘদিন কাজ করেছে। এরপরে র্যাপিড অ্যাকশন ব্যাটালিয়নে (RAB) পোস্টিং হওয়ার পরে সেখানেও অস্ত্র উদ্ধার, মাদক উদ্ধার, শীর্ষ সন্ত্রাসী গ্রেপ্তারসহ কর্মক্ষেত্রে নিষ্ঠা, দক্ষতা, দায়িত্ব এবং পেশাদারিত্বের বিভিন্ন উদাহরণ তৈরি করেছে মাহমুদ হাসান।
পেশাগত কর্মজীবনে অসম্ভব রকমের নিষ্ঠা, আন্তরিকতা, পরিশ্রম আর সততা দিয়ে সবসময় কাজ করার চেষ্টা করেছে। দিনরাত এক করে মানুষকে নিজের সর্বোচ্চটা দিয়ে সার্ভিস দেওয়ার চেষ্টা করেছে। তাঁর আচার, আচরণ, সেবা এবং নীতি দেখে অনেক মানুষ পুলিশকে নতুন করে ভালোবাসতে শিখেছে। আমি মাহমুদকে প্রায় দেড় যুগ থেকে চিনি। আমার ধারণা বরিশাল এবং ঝালকাঠি জেলার হাতেগোনা কিছু চিহ্নিত অপরাধী আর দুষ্কৃতিকারী ছাড়া আমার এই কথার সাথে কেউ দ্বিমত করবে না। তাঁর হাতে গ্রেপ্তার হওয়া একাধিক সংক্ষুব্ধ ব্যক্তি থাকতে পারে তবে বিবেকবুদ্ধি থাকলে তারাও অন্তত বলবে মাহমুদ খারাপ মানুষ নয়।
মাহমুদ যখন বরিশাল থেকে বদলি হয়ে ঝালকাঠি গেছে তখন বরিশালের অনেক মানুষ কেঁদেছে। আবার যখন সে প্রমোশন নিয়ে ঝালকাঠি জেলা ত্যাগ করেছে তখন ঝালকাঠির মানুষ তাঁকে রাখার জন্য আন্দোলন করেছে, মিছিল করেছে। পুলিশের মতো নিত্য গালি খাওয়া একটা পেশায় একজন মানুষের জীবনে এরচেয়ে বড় সার্থকতা আর কী হতে পারে? প্রজাতন্ত্রের একজন পুলিশ কর্মকর্তার কর্মজীবনে এরচেয়ে বড় অর্জন আর কী থাকতে পারে? এসপি মাহমুদ এখন পুলিশের স্পেশাল ব্রাঞ্চে (SB) ঢাকায় কর্মরত। এর আগে সে র্যাপিড অ্যাকশন ব্যাটালিয়ন (RAB) এবং অ্যান্টি টেরোরিজম ইউনিট (ATU)তেও নিষ্ঠা আর সুনামের সাথে কাজ করেছে।
মাহমুদকে নিয়ে নতুন করে আবার ষড়যন্ত্র শুরু হয়েছে। ফেসবুক স্ক্রল করতে করতে আমার সামনে জনৈক এক প্রবাসী ব্যক্তির একটা পোস্ট আসলো। সেখান থেকেই এই লেখার অবতারণা। পোস্টে মাহমুদের বিরুদ্ধে যেসব অভিযোগ আনা হয়েছে তার প্রায় সবটাই বানোয়াট আর শত্রুতামূলক। খোঁজ নিয়ে যতদূর জানলাম, একটা পুরাতন অপরাধী গ্রুপ তাঁর চরিত্রহননের নতুন মিশন নিয়ে নেমেছে। অতীতেও অনেকে অনেকবার চেষ্টা করেছিল। তারা যেমন ব্যর্থ হয়েছিল আশাকরি তেমনি এবারের কুশীলবরাও ব্যর্থ হবে। কারণ, মিথ্যাকে সাময়িক সময়ের জন্য ছড়িয়ে দেওয়া যায় কিন্তু টিকিয়ে রাখা যায় না।
টানা ৩ মেয়াদে ক্ষমতায় থাকতে গিয়ে আওয়ামী লীগ যখন পুলিশি রাষ্ট্র কায়েম করেছিল তখন ইচ্ছায় কিংবা অনিচ্ছায় ডিপার্টমেন্টের ৯০ জন অফিসারই প্রজাতন্ত্রের পুলিশের পরিবর্তে আওয়ামী পুলিশে পরিনত হয়েছিল। তবে সেদিনও বাকি ১০ জনের মধ্যে ছিল এই মাহমুদ হাসান। দলীয় সরকারের আদেশ কমবেশি পালন করলেও আমার জানামতে সে কখনো দলীয় পুলিশ হয়নি। সে সবসময় জনগণের পুলিশ থাকার চেষ্টা করেছে। যাদের দেখলে মানুষ আবার নতুন করে পুলিশকে ভালোবাসতে শেখে তাদেরকে যখন মিথ্যা ট্যাগিং, ফ্রেমিং, ব্লেমিং করা হয় তখন চুপ থাকা যায় না। বিবেক চিৎকার করে ওঠে। বিবেকের আর্তনাদ কিংবা দায়বদ্ধতা এড়িয়ে যাওয়া যায় না। কারণ, মানুষের বিবেকের চেয়ে বড় কোনো আদালত এই পৃথিবীতে নেই। #
❑ আরিফ আহমেদ মুন্না ✍️
সাংবাদিক, কলামিস্ট, কবি, মানবাধিকার ও সুশাসন ব্যক্তিত্ব।
বাবুগঞ্জঃ ২৭ সেপ্টেম্বর, ২০২৬ খ্রিষ্টাব্দ।
এসপি মাহমুদ হাসানকে নিয়ে ষড়যন্ত্র নতুন কোনো ঘটনা নয়। পতিত আওয়ামী লীগের আমলেও তাকে নিয়ে বহুবার ষড়যন্ত্র হয়েছে। স্বার্থে আঘাত লাগার কারণে তাকে কখনো বিএনপিপন্থী পুলিশ, কখনো জামায়াতপন্থী, আবার কখনো রাজাকার ট্যাগ লাগানোর চেষ্টা করা হয়েছে। আমি নিজে যার বড় সাক্ষী। এর প্রতিবাদ জানিয়ে আমি নিজেই একবার কলাম লিখেছিলাম। আরেকবার একটা কবিতাও লিখেছিলাম।
তবে সবচেয়ে মজার ব্যাপার হলো- এবার তাকে উল্টো আওয়ামী ফ্যাসিস্টের দোসর বানানোর মিশন নিয়ে নেমেছে একটি গ্রুপ। ট্যাগিং, ফ্রেমিং, ব্লেমিংয়ের সেই ধারা একই আছে তবে এবার জাস্ট ১৮০ ডিগ্রি অ্যাঙ্গেলে ইউটার্ণ নিয়ে পক্ষটা ঘুরে গেছে। কারণ, এসপি মাহমুদ হাসানের দোষ একটাই। সে অন্যায়ের সাথে আপোষ করতে পারে না। নিজের নীতি আর আদর্শ থেকে সহজে বিচ্যুত হতে পারে না। এজন্য বারবারই সমস্যায় পড়তে হয় তাঁকে।
মাহমুদ হাসান কখনো দলীয় পুলিশ হয়নি। সে সবসময় চেয়েছে প্রজাতন্ত্রের পুলিশ হতে। তাঁর একমাত্র লক্ষ্য ছিল জনগণের পুলিশ হয়ে ওঠা। আদর্শবান এক স্কুল শিক্ষকের সন্তান আর অসম্ভব রকমের মেধাবী মাহমুদ পটুয়াখালী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াশোনা শেষ করে প্রথমে বিসিএস কৃষি ক্যাডারে এবং পরে বিসিএস পুলিশ ক্যাডারে যোগদান করেছে। সহকারী পুলিশ কমিশনার হিসেবে বরিশাল মেট্রোপলিটনে এবং অতিরিক্ত পুলিশ সুপার হিসেবে ঝালকাঠিতে দীর্ঘদিন কাজ করেছে। এরপরে র্যাপিড অ্যাকশন ব্যাটালিয়নে (RAB) পোস্টিং হওয়ার পরে সেখানেও অস্ত্র উদ্ধার, মাদক উদ্ধার, শীর্ষ সন্ত্রাসী গ্রেপ্তারসহ কর্মক্ষেত্রে নিষ্ঠা, দক্ষতা, দায়িত্ব এবং পেশাদারিত্বের বিভিন্ন উদাহরণ তৈরি করেছে মাহমুদ হাসান।
পেশাগত কর্মজীবনে অসম্ভব রকমের নিষ্ঠা, আন্তরিকতা, পরিশ্রম আর সততা দিয়ে সবসময় কাজ করার চেষ্টা করেছে। দিনরাত এক করে মানুষকে নিজের সর্বোচ্চটা দিয়ে সার্ভিস দেওয়ার চেষ্টা করেছে। তাঁর আচার, আচরণ, সেবা এবং নীতি দেখে অনেক মানুষ পুলিশকে নতুন করে ভালোবাসতে শিখেছে। আমি মাহমুদকে প্রায় দেড় যুগ থেকে চিনি। আমার ধারণা বরিশাল এবং ঝালকাঠি জেলার হাতেগোনা কিছু চিহ্নিত অপরাধী আর দুষ্কৃতিকারী ছাড়া আমার এই কথার সাথে কেউ দ্বিমত করবে না। তাঁর হাতে গ্রেপ্তার হওয়া একাধিক সংক্ষুব্ধ ব্যক্তি থাকতে পারে তবে বিবেকবুদ্ধি থাকলে তারাও অন্তত বলবে মাহমুদ খারাপ মানুষ নয়।
মাহমুদ যখন বরিশাল থেকে বদলি হয়ে ঝালকাঠি গেছে তখন বরিশালের অনেক মানুষ কেঁদেছে। আবার যখন সে প্রমোশন নিয়ে ঝালকাঠি জেলা ত্যাগ করেছে তখন ঝালকাঠির মানুষ তাঁকে রাখার জন্য আন্দোলন করেছে, মিছিল করেছে। পুলিশের মতো নিত্য গালি খাওয়া একটা পেশায় একজন মানুষের জীবনে এরচেয়ে বড় সার্থকতা আর কী হতে পারে? প্রজাতন্ত্রের একজন পুলিশ কর্মকর্তার কর্মজীবনে এরচেয়ে বড় অর্জন আর কী থাকতে পারে? এসপি মাহমুদ এখন পুলিশের স্পেশাল ব্রাঞ্চে (SB) ঢাকায় কর্মরত। এর আগে সে র্যাপিড অ্যাকশন ব্যাটালিয়ন (RAB) এবং অ্যান্টি টেরোরিজম ইউনিট (ATU)তেও নিষ্ঠা আর সুনামের সাথে কাজ করেছে।
মাহমুদকে নিয়ে নতুন করে আবার ষড়যন্ত্র শুরু হয়েছে। ফেসবুক স্ক্রল করতে করতে আমার সামনে জনৈক এক প্রবাসী ব্যক্তির একটা পোস্ট আসলো। সেখান থেকেই এই লেখার অবতারণা। পোস্টে মাহমুদের বিরুদ্ধে যেসব অভিযোগ আনা হয়েছে তার প্রায় সবটাই বানোয়াট আর শত্রুতামূলক। খোঁজ নিয়ে যতদূর জানলাম, একটা পুরাতন অপরাধী গ্রুপ তাঁর চরিত্রহননের নতুন মিশন নিয়ে নেমেছে। অতীতেও অনেকে অনেকবার চেষ্টা করেছিল। তারা যেমন ব্যর্থ হয়েছিল আশাকরি তেমনি এবারের কুশীলবরাও ব্যর্থ হবে। কারণ, মিথ্যাকে সাময়িক সময়ের জন্য ছড়িয়ে দেওয়া যায় কিন্তু টিকিয়ে রাখা যায় না।
টানা ৩ মেয়াদে ক্ষমতায় থাকতে গিয়ে আওয়ামী লীগ যখন পুলিশি রাষ্ট্র কায়েম করেছিল তখন ইচ্ছায় কিংবা অনিচ্ছায় ডিপার্টমেন্টের ৯০ জন অফিসারই প্রজাতন্ত্রের পুলিশের পরিবর্তে আওয়ামী পুলিশে পরিনত হয়েছিল। তবে সেদিনও বাকি ১০ জনের মধ্যে ছিল এই মাহমুদ হাসান। দলীয় সরকারের আদেশ কমবেশি পালন করলেও আমার জানামতে সে কখনো দলীয় পুলিশ হয়নি। সে সবসময় জনগণের পুলিশ থাকার চেষ্টা করেছে। যাদের দেখলে মানুষ আবার নতুন করে পুলিশকে ভালোবাসতে শেখে তাদেরকে যখন মিথ্যা ট্যাগিং, ফ্রেমিং, ব্লেমিং করা হয় তখন চুপ থাকা যায় না। বিবেক চিৎকার করে ওঠে। বিবেকের আর্তনাদ কিংবা দায়বদ্ধতা এড়িয়ে যাওয়া যায় না। কারণ, মানুষের বিবেকের চেয়ে বড় কোনো আদালত এই পৃথিবীতে নেই। #
❑ আরিফ আহমেদ মুন্না ✍️
সাংবাদিক, কলামিস্ট, কবি, মানবাধিকার ও সুশাসন ব্যক্তিত্ব।
বাবুগঞ্জঃ ২৭ সেপ্টেম্বর, ২০২৬ খ্রিষ্টাব্দ।

১৭ সেপ্টেম্বর, ২০২৫ ১৮:৩১
হেনরী স্বপন>> জাতিধর্ম নির্বিশেষে ব্যবহৃত উন্মুক্ত পানীয় জলের চাহিদা মেটানোর জন্য বিবিরতালাব (তালাব: ফার্সি শব্দ- জলাশয়) খনন করা হয়েছিল। কালক্রমে এটি এখন বিবিরপুকুর হয়ে বরিশালবাসীর আত্মার অংশ হয়ে উঠেছে। বরিশালবাসীর সুপেয় জলের অভাব মোচনের জন্য জনদরদী জিন্নাত বিবি আঠারোশতকে এই পুকুরটি খনন করেছিলেন, বলে জানা যায়। এই পুকুরের চারপাশে ৪টি ঘাটলা ছিল। তখন সেই ঘাট থেকে বরিশালের সকল ধর্মের সব মানুষ খাবার পানি সসরবরাহ করতেন। কেউ স্নান করত না এবং ধোয়াকাচার কাজও হত না। সে সময় এই নিয়গুলো কঠোরভাবে পালিত হতো। যেহেতু তৎকালীন সময় রাখালবাবুর পুকুর থেকে কেবল হিন্দু সম্প্রদায়ের লোকেরা খাবার জল সসরবরাহ কতে পারতেন। কিন্তু বিবিরতালাব থেকে সকল সম্প্রদায়ের সব মানুষ এই পুকুরের পানি খাবার পানি হিসেবে ব্যবহার করতে পারত। তাই, এই পুকুরটিকে অসামপ্রদায়িক চেতনার উল্লেগযোগ্য নিদর্শনও বলা যায়।
এই জলাশয় খনন করে জেন্নাত বিবি ব্রিটিশ সরকারের সঙ্গে এমোন একটি ট্রাস্টি দলিলও করে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ ছিলেন যে, “পুকুরটি কেনোদিন ভরাট করা যাবে না, এর চাপাশের ঘাটলায় গোসল, সাবান সোডার ব্যবহার সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ থাকবে। জলাশয়ের পানি পরিস্কার রাখতে হবে এবং পাড়ঘেঁষে কোনও ইমারত, দেয়াল, তোরণ নির্মাণ করে পুকুরের সৌন্দর্য ক্ষুন্ন হয়, এমনও কিছুই করা যাবে না।”
যেহেতু, ১৯০০-১৯০৮ খ্রিস্টাব্দের ভূমি জরিপে জিন্নাত ও কেরি’র নামোল্লেখ আছে। সরকারের জাজেস সেরেস্তায় খুঁজলে এই চুক্তির দলিলও পাওয়া যাবে, হয়তো। অথচ, বরিশাল সিটি কর্পোরেশন এবং স্থানীয় মহল্লাবাসী ও অগণিত ফাস্টফুড ব্যবসায়ী কেউ চুক্তির কিছুই মানছে না। বরং এরাই দিনের পর দিন ঐতিহ্যবাহী এই পুকুরের সৌন্দর্যকে গলাটিপে হত্যা করছে। কেননা, সিটি কর্পোরেশনের কর্তারা অর্থের বিনিময়ে মোবাইল কোম্পানির স্থায়ী বিলবোর্ড স্থাপনরে মাধ্যমে পুকুরটির যতোটা শোভা বিনষ্ট করেছনে। ততধিক উচ্ছিষ্ট খাবারের বর্জ্য ফেলে এটিকে দুর্গন্ধময় জলাশয়ে পরিণত করছে, তেমনি এর চারপাশে যত্রতত্র বিলবোর্ড, দলীয় পোস্টার ফেস্টুনে কতিপয় রানৈতিক নেতাদের ছবিতে ছবিতে সয়লাব করে, পুকুরটির স্বাভাবিক অঙ্গছেদন এবং শোভা বিনষ্ট করছেন।
সম্প্রতি বর্তমানে বরিশাল সিটি করপোরেশন নগর ভবনের আধিপতি মো. রায়হান কাওছার সাহেব এককালে যে বিবিরতালাবের সুপেয় জলে আমাদের জীবনের তৃষ্ণা মিটেছে, সেই পুকুরের জলে ঝলমলে সূর্যের আলোর রোশনাই ফেরাতে এর চারপাশের অবৈধ স্থাপনা উচ্ছেদের উদ্যোগ নিয়েছেন। রাজনৈতিক দখলদারদের আমলা নির্ভরতা ও দলীয় হামটি-ডামটির তোয়াক্কা না করে, বরিশালবাসীর প্রাণভোমরা পুকুরটির সেই তিলত্তোমা রূপÑ স্বঅবয়বে স্বমহিমায় ফিরিয়ে আনতে তিনি যে, ঈর্ষণীয় এবং অনন্য ন্যায়পালের উদ্যোগের মতোই মহান কাজ করে চলেছেন এজন্য সিটিবাসী আপনাকে মনেও রাখবে বহুকাল।
লেখক : কবি ও প্রাবন্ধিক, বরিশাল।