
১৪ জুন, ২০২৬ ১৯:১৩
বিংশ শতাব্দীর বিশ্বরাজনীতিতে আর্নেস্তো চে গুয়েভারা একটি অত্যন্ত জটিল, বহুমাত্রিক এবং তুমুল বিতর্কিত নাম। ১৯২৮ সালের ১৪ জুন আর্জেন্টিনার সান্তা ফে শহরে এক মধ্যবিত্ত পরিবারে জন্ম নেন আর্নেস্তো গুয়েভারা দে লা সের্না। কালক্রমে তিনি বিশ্বজুড়ে শৃঙ্খলমুক্তির এক অবিনাশী প্রতীকে পরিণত হন। তবে সমকালীন ইতিহাসচর্চা ও রাষ্ট্রবিজ্ঞানের নির্মেদ আলোয় চে গুয়েভারা কেবল একজন রোমান্টিক গেরিলা নেতা নন। তিনি একই সাথে একজন কট্টর মার্ক্সবাদী সামরিক তত্ত্ববিদ, কিউবা বিপ্লবের প্রধান স্থপতি এবং রাষ্ট্রীয় ক্ষমতার বাস্তবতায় এক তীব্র বিতর্কিত ব্যক্তিত্ব। তাঁর জীবন, রাজনৈতিক দর্শন এবং সামরিক কৌশলকে বুঝতে হলে কেবল স্তুতিগাথা যথেষ্ট নয়। এর জন্য তাঁর প্রশাসনিক ব্যর্থতা, নীতিগত সীমাবদ্ধতা, আন্তর্জাতিক চুক্তির মারপ্যাঁচ এবং ঠান্ডা লড়াইয়ের যুগের ভূ-রাজনৈতিক দ্বন্দ্বের একটি নির্মোহ মূল্যায়ন অপরিহার্য।
সান্তা ফে শহরে জন্মের পর আর্নেস্তোর শৈশব ও কৈশোর কেটেছিল এক মননশীল ও উদার পারিবারিক আবহে। পাঁচ ভাইবোনের মধ্যে তিনি ছিলেন জ্যেষ্ঠ। শৈশব থেকেই তিনি তীব্র হাঁপানি রোগে আক্রান্ত ছিলেন, যা তাঁর জীবনের শেষদিন পর্যন্ত পিছু ছাড়েনি। কিন্তু এই শারীরিক প্রতিবন্ধকতা তাঁর অদম্য প্রাণশক্তিকে দমাতে পারেনি; বরং এটি তাঁকে আরও জেদি ও লড়াকু করে তোলে। তাঁর পরিবারে ছিল তিন হাজারেরও বেশি বইয়ের এক সমৃদ্ধ লাইব্রেরি, যেখানে ডুব দিয়ে কিশোর আর্নেস্তো কার্ল মার্ক্স, ফ্রিডরিখ এঙ্গেলস, ভ্লাদিমির লেনিন থেকে শুরু করে পাবলো নেরুদা, ফেদেরিকো গার্সিয়া লোরকা এবং জঁ-পল সার্ত্রের দর্শনের সাথে পরিচিত হন। একই সাথে দাবা খেলা ও খেলাধুলার প্রতি তাঁর ছিল তীব্র ঝোঁক। ১৯৪৭ সালে তিনি বুয়েনস আইরেস বিশ্ববিদ্যালয়ে চিকিৎসাশাস্ত্রে ভর্তি হন। চিকিৎসাশাস্ত্রে ডিগ্রি অর্জনকারী এই তরুণ মূলত মানুষের রোগমুক্তির স্বপ্ন দেখতেন, কিন্তু মানবসমাজের গভীরে প্রোথিত সামাজিক ও অর্থনৈতিক বৈষম্যের ব্যাধিটি তাঁকে আরও বেশি তাড়িত করেছিল।
চিকিৎসাবিজ্ঞানের এই ছাত্রটির বৈপ্লবিক চেতনার প্রধান রূপান্তর ঘটেছিল ১৯৫২ সালের প্রথমার্ধে নেওয়া লাতিন আমেরিকা পরিভ্রমণের মাধ্যমে। বন্ধু আলবার্তো গ্রানাদোকে সাথে নিয়ে এক জরাজীর্ণ মোটরসাইকেলে তিনি এই সফরে বের হন। এই সফর সমগ্র লাতিন আমেরিকা জুড়ে ছিল না, এটি মূলত আর্জেন্টিনা, চিলি, পেরু, কলম্বিয়া এবং ভেনিজুয়েলা পর্যন্ত বিস্তৃত ছিল। পথিমধ্যে চিলির লস অ্যাঞ্জেলেস নামক স্থানে মোটরসাইকেলটি চিরতরে অচল হয়ে যায় এবং বাকি পথ তাঁরা পায়ে হেঁটে, ট্রাকে বা ভেলায় পাড়ি দিয়েছিলেন। এই দীর্ঘ ভ্রমণ কেবল কোনো ভৌগোলিক পর্যটন ছিল না, এটি ছিল লাতিন আমেরিকার খনি শ্রমিকদের অমানবিক শ্রম ও আদিবাসীদের চরম অবহেলিত জীবনকে খুব কাছ থেকে দেখার অভিজ্ঞতা। পেরুর আমাজন অববাহিকার সান পাবলো কুষ্ঠাশ্রমে কুষ্ঠরোগীদের সামাজিক ও শারীরিক বিচ্ছিন্নতা তরুণ আর্নেস্তোকে গভীরভাবে নাড়া দেয়। এই ভ্রমণের পরপরই ১৯৫৩ সালে তিনি বলিভিয়ায় যান এবং সেখানে জাতীয়তাবাদী বিপ্লবী আন্দোলনের মাধ্যমে গড়ে ওঠা খনি শ্রমিকদের ক্ষমতা ও সংস্কারের প্রথম বাস্তব রূপ প্রত্যক্ষ করেন, যা তাঁর সমাজতান্ত্রিক ভাবনাকে আরও তাত্ত্বিক ভিত্তি দান করে।
এই বৈপ্লবিক বোধ চে-র চিন্তাধারায় এক ধরনের আপসহীন মানসিকতা তৈরি করে। ১৯৫৩ সালের শেষভাগে গুয়াতেমালায় অবস্থানকালীন ওখানকার সমাজতান্ত্রিক ও বামপন্থী নির্বাসিতরা তাঁর কথার মাঝে আর্জেন্টিনার আঞ্চলিক সম্বোধন ‘চে’ (যার অর্থ বন্ধু বা ভাই) ব্যবহারের অভ্যাসের কারণে তাঁকে ভালোবেসে প্রথম ‘চে’ নামে ডাকতে শুরু করেন, যা পরবর্তীতে ইতিহাসে তাঁর স্থায়ী পরিচয় হয়ে দাঁড়ায়। সেখানে তাঁর পরিচয় হয় পেরুর নির্বাসিত সমাজতান্ত্রিক অর্থনীতিবিদ হিল্ডা গাদিয়ার সাথে। হিল্ডা গাদিয়াই চে-কে প্রথম উচ্চতর মার্ক্সবাদী দর্শনের সাথে পরিচয় করিয়ে দেন এবং মেক্সিকোতে নির্বাসিত থাকাকালীন ফিদেল কাস্ত্রো ও রাউল কাস্ত্রোর সাথে তাঁর ঐতিহাসিক সাক্ষাৎ ঘটিয়ে দেন। ১৯৫৪ সালে গুয়াতেমালায় মার্কিন গোয়েন্দা সংস্থা সমর্থিত সামরিক অভ্যুত্থানের মাধ্যমে গণতান্ত্রিকভাবে নির্বাচিত রাষ্ট্রপতি জাকোবো আরবেনজ গুজমানকে ক্ষমতাচ্যুত করা হয়। এই অভিযানের মূল উস্কানিদাতা ছিল মার্কিন বহুজাতিক ফল বিপণন সংস্থা 'ইউনাইটেড ফ্রুট কোম্পানি', যাদের বিশাল ভূ-সম্পত্তি আরবেনজ সরকার ভূমি সংস্কার আইনের মাধ্যমে বাজেয়াপ্ত করেছিলেন। এই ঘটনা চে-র সেই সশস্ত্র দর্শনকে আরও দৃঢ় করে। তিনি বিশ্বাস করতে শুরু করেন যে, সাম্রাজ্যবাদী শক্তির বিরুদ্ধে শান্তিপূর্ণ উপায়ে বা নির্বাচনের মাধ্যমে সমাজতন্ত্র প্রতিষ্ঠা অসম্ভব। শোষক শ্রেণী কখনো স্বেচ্ছায় ক্ষমতা ছাড়ে না। কাস্ত্রোর ‘২৬শে জুলাই আন্দোলন’-এ যোগ দিয়ে ১৯৫৬ সালের ডিসেম্বরে তিনি 'গ্রানমা' নামক জাহাজে চড়ে কিউবায় অবতরণ করেন। সিয়েরা মায়েস্ত্রার গেরিলা যুদ্ধে চে তাঁর বিখ্যাত ‘ফোকো তত্ত্ব’-এর বাস্তব প্রয়োগ ঘটান। এই তত্ত্ব অনুযায়ী, একটি ছোট ও সুসংগঠিত গেরিলা অগ্রবর্তী দল গণ-আন্দোলনের দীর্ঘমেয়াদি প্রস্তুতি ছাড়াই একটি দেশে বৈপ্লবিক পরিস্থিতির সূচনা করতে পারে। ১৯৫৮ সালের ডিসেম্বরের শেষভাগে চে-র নেতৃত্বে পরিচালিত ঐতিহাসিক ‘সান্তা ক্লারার যুদ্ধ’-এ বাতিস্তার সামরিক ট্রেনের ওপর আক্রমণ কিউবা বিপ্লবের চূড়ান্ত বিজয় নির্ধারণ করে এবং ১৯৫৯ সালের ১ জানুয়ারি স্বৈরাচারী বাতিস্তা দেশ ছেড়ে পালিয়ে গেলে কিউবার মাটিতে এই বিপ্লবী মডেল সফল হয়।
কিউবার বিপ্লবোত্তর পুনর্গঠন পর্বে চে গুয়েভারা যে প্রশাসনিক, অর্থনৈতিক ও বিচারবিভাগীয় নীতি গ্রহণ করেছিলেন, তা আজো তীব্র সমালোচনার উৎস। বাতিস্তা সরকারের পতনের পর ১৯৫৯ সালের ৭ ফেব্রুয়ারি বিপ্লবী সরকার কর্তৃক কিউবার ১৯৪০ সালের সংবিধানে 'আইনি ধারা ১২' সংশোধন করে একটি বিশেষ ডিক্রি জারির মাধ্যমে চে গুয়েভারাকে 'জন্মসূত্রে কিউবান নাগরিক' হিসেবে ঘোষণা করা হয়, যা ছিল কিউবার ইতিহাসে এক বিরল আইনি ঘটনা। ১৯৫৯ সালের প্রথমভাগে হাভানার ‘লা কাবানিয়া’ দুর্গের সামরিক প্রধান হিসেবে বাতিস্তা সরকারের সহযোগী ও যুদ্ধাপরাধীদের বিচার প্রক্রিয়ার দায়িত্ব তাঁর ওপর ন্যস্ত ছিল। বাতিস্তা সরকারের তৎকালীন ১৯৩৮ সালের 'প্রতিরক্ষা সামাজিক কোড' এবং বিপ্লবী সরকারের 'আইনি ডিক্রি নম্বর ২০৮' ও 'বিপ্লবী আইন নম্বর ১১'-এর আওতায় এই বিশেষ ট্রাইব্যুনালগুলো পরিচালিত হয়েছিল। এই সময় আইনি প্রক্রিয়ার তোয়াক্কা না করে মৃত্যুদণ্ড দেওয়ার ক্ষেত্রে চে-র একটি উক্তি আজো দালিলিক প্রমাণ হিসেবে বিতর্ক তৈরি করে, যেখানে তিনি বলেছিলেন, "বিচার বিভাগীয় প্রমাণের উপস্থাপনা বিপ্লবী ট্রাইব্যুনালগুলোর জন্য অপ্রয়োজনীয়, এটি একটি বিপ্লবী যুদ্ধ।" পশ্চিমা ঐতিহাসিক এবং আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থাগুলোর মতে, এই বিচার প্রক্রিয়ায় কোনো আন্তর্জাতিক আইনি বিধিমালা বা আসামিপক্ষের যথাযথ আইনি আত্মপক্ষ সমর্থনের সুযোগ অনুসৃত হয়নি। সেখানে বাতিস্তা সরকারের বেশ কিছু সহযোগীকে ফায়ারিং স্কোয়াডে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয়েছিল, যার সঠিক সংখ্যা নিয়ে আজো ঐতিহাসিকদের মধ্যে বিতর্ক রয়েছে। সমাজবিজ্ঞানীদের অনেকেই একে রাজনৈতিক প্রতিশোধ ও রাষ্ট্রীয় ভিন্নমত দমনের একটি নিকৃষ্ট উদাহরণ হিসেবে চিহ্নিত করেন। উল্লেখ্য, সমাজতন্ত্রের প্রতি অনুপযুক্ত নাগরিকদের কৃষি-শ্রমশিবিরে পাঠানোর বিতর্কিত প্রক্রিয়াটি কিউবায় প্রাতিষ্ঠানিক রূপ পায় ১৯৬৫ সালের শেষভাগে, যার নাম ছিল 'উৎপাদনে সহায়তার জন্য সামরিক ইউনিট'। তখন চে কিউবা ছেড়ে চলে গেছেন, ফলে তিনি সেই ক্যাম্পের সরাসরি পরিচালক ছিলেন না। তবে তাঁর তৈরি নতুন মানব তত্ত্বের কঠোর সামরিক শৃঙ্খলা ও নৈতিক শুদ্ধিবাদ এই ক্যাম্প তৈরিতে গভীর আদেশিক অনুপ্রেরণা জুগিয়েছিল।
এর পাশাপাশি, সমাজতান্ত্রিক কিউবার শিল্পমন্ত্রী এবং জাতীয় ব্যাংকের গভর্নর হিসেবে তাঁর অর্থনৈতিক নীতিগুলো চরম প্রশাসনিক অদূরদর্শিতার পরিচয় দেয়। পুঁজিবাদের প্রতি তীব্র অবজ্ঞা প্রকাশ করতে তিনি জাতীয় ব্যাংকের গভর্নর হিসেবে কিউবান মুদ্রার নোটগুলোতে নিজের পুরো নামের বদলে শুধু অবহেলাভরে ‘চে’ লিখে স্বাক্ষর করতেন, যা ছিল বিশ্ব ব্যাংকিং ইতিহাসের এক অভিনব দালিলিক কূটাভাস। চে তাঁর বিখ্যাত প্রবন্ধ "কিউবায় সমাজতন্ত্র এবং মানুষ"-এ এক নতুন মানব ধারণার অবতারণা করেন। তিনি চেয়েছিলেন মানুষ ব্যক্তিস্বার্থ বা বস্তুগত লাভ ত্যাগ করে কেবল নৈতিক চেতনা ও স্বেচ্ছাশ্রমের ভিত্তিতে কাজ করবে। মানুষের সহজাত মনস্তত্ত্ব ও বাজার বাস্তবতাকে অস্বীকার করা এই অতি-উগ্র অর্থনৈতিক রূপান্তর এবং অবাস্তব দ্রুত শিল্পায়ন নীতির কারণে কিউবার উৎপাদন ব্যবস্থা সম্পূর্ণ ভেঙে পড়ে। ১৯৬৩ থেকে ১৯৬৫ সালের মধ্যে কিউবান অর্থনীতিতে বিখ্যাত 'শিল্প বনাম কৃষি উৎপাদন বিতর্ক' শুরু হয়, যেখানে সোভিয়েত ব্লকের কেন্দ্রীয় পরিকল্পনার বিরোধিতা করে চে কিউবাকে একতরফা ভারী শিল্পের দিকে ধাবিত করার চেষ্টা করেন, যা চরম বিপর্যয় ডেকে আনে। চিনি শিল্পের ওপর মারাত্মক ধস নামে। ফলে কিউবা শেষ পর্যন্ত অর্থনৈতিক ও সামরিকভাবে সম্পূর্ণ সোভিয়েত-নির্ভর হয়ে পড়ে। এমনকি ১৯৬২ সালের বিখ্যাত 'কিউবান মিসাইল ক্রাইসিস' বা ক্ষেপণাস্ত্র সংকটের সময় সোভিয়েত ইউনিয়ন যখন কিউবার মাটিতে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের অগোচরে পরমাণু ক্ষেপণাস্ত্র মোতায়েন করে, চে তা সম্পূর্ণ সমর্থন করেছিলেন। কিন্তু পরে কিউবাকে অন্ধকারে রেখে সোভিয়েত নেতা নিকিতা ক্রুশ্চেভ যখন মার্কিন রাষ্ট্রপতি জন এফ কেনেডির সাথে গোপন সমঝোতার মাধ্যমে ক্ষেপণাস্ত্র ফিরিয়ে নেন, তখন চে একে সোভিয়েত ইউনিয়নের চরম সাম্রাজ্যবাদী আপস ও বিশ্বাসঘাতকতা হিসেবে গণ্য করেন।
চে গুয়েভারার রাজনৈতিক জীবনের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় হলো তৎকালীন সমাজতান্ত্রিক শিবিরের চীন-সোভিয়েত বিভাজন এবং সোভিয়েত আমলাতন্ত্রের সাথে তাঁর সংঘাত। চে ক্রুশ্চেভ-এর পশ্চিমা পুঁজিবাদের সাথে "শান্তিপূর্ণ সহাবস্থান" নীতির তীব্র বিরোধী ছিলেন। তিনি সোভিয়েত ইউনিয়নকে একটি সংশোধনবাদী শক্তি হিসেবে দেখতে শুরু করেছিলেন। তবে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে তাঁর সবচেয়ে প্রভাবশালী ভূমিকা ছিল ১৯৬৪ সালের ১১ ডিসেম্বর জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদের ঊনবিংশ অধিবেশনে দেওয়া ঐতিহাসিক ভাষণ। সেই ভাষণে তিনি মার্কিন সাম্রাজ্যবাদের তীব্র সমালোচনা করার পাশাপাশি পরিষ্কার ঘোষণা দেন যে, লাতিন আমেরিকার নিপীড়িত মানুষ এখন তাদের মুক্তির ইতিহাস নিজেদের রক্তে লিখতে শুরু করেছে। এই ওজস্বী ভাষণের ঠিক পরদিন কিউবান প্রবাসী সমাজতান্ত্রিক-বিরোধীরা জাতিসংঘের সদর দপ্তর লক্ষ্য করে মর্টার হামলা চালায়, যা তাঁর উপস্থিতির ভূ-রাজনৈতিক গুরুত্বের বড় প্রমাণ। এর পরপরই ১৯৬৫ সালের ২৪ ফেব্রুয়ারি আলজেরিয়াতে অনুষ্ঠিত আফ্রো-এশীয় অর্থনৈতিক সম্মেলনে তিনি তাঁর শেষ আন্তর্জাতিক ‘আলজিয়ার্স ভাষণ’ দেন। সেখানে চে খোলাখুলিভাবে সোভিয়েত ও পশ্চিমা পরাশক্তিগুলোর তীব্র সমালোচনা করেন। তিনি অভিযোগ তোলেন যে, সোভিয়েত ইউনিয়ন অনুন্নত ও শোষিত সমাজতান্ত্রিক দেশগুলোর সাথে পশ্চিমা সাম্রাজ্যবাদের মতোই অসমান ও শোষণমূলক বাণিজ্য করছে। এই ভাষণের ফলে কিউবা-সোভিয়েত দ্বিপাক্ষিক সম্পর্কে চরম কূটনৈতিক টানাপোড়েন তৈরি হয়। ফিদেল কাস্ত্রো তখন অর্থনৈতিক ও সামরিক অস্তিত্বের জন্য সম্পূর্ণভাবে মস্কোর ওপর নির্ভরশীল ছিলেন। ফলে সোভিয়েত ব্লকের প্রবল চাপের মুখে চে গুয়েভারাকে কিউবার সমস্ত রাষ্ট্রীয় পদ, মন্ত্রিত্ব এবং নাগরিকত্ব ত্যাগ করে নির্বাসনে যেতে বাধ্য করা হয়।
কিউবা ত্যাগের পর চে গুয়েভারা বিশ্ব-বিপ্লবের ধারণাকে ছড়িয়ে দিতে তাঁর বিখ্যাত ‘ত্রিমহাদেশীয় কৌশল’ প্রবর্তন করেন। তিনি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ডমিনো তত্ত্বের বিপরীতে এশিয়া, আফ্রিকা ও লাতিন আমেরিকায় মার্কিন সাম্রাজ্যবাদকে ব্যস্ত ও দুর্বল রাখতে বিশ্বজুড়ে দুই, তিন বা ততোধিক ভিয়েতনামের জন্ম দেওয়ার সামরিক আহ্বান জানান। এই তত্ত্বের অংশ হিসেবে ১৯৬৫ সালে কঙ্গো কিনশাসায় তাঁর মার্ক্সবাদী গেরিলা যুদ্ধ পরিচালনার প্রচেষ্টা সম্পূর্ণ ব্যর্থতায় পর্যবসিত হয়। এর প্রধান কারণ ছিল স্থানীয় নৃগোষ্ঠীর জটিল অভ্যন্তরীণ রাজনীতি বুঝতে না পারা, কঙ্গোলিজ নেতা লঁরা কাবিলার বাহিনীর চরম শৃঙ্খলহীনতা এবং চে-র নিজস্ব সামরিক সংস্কৃতির সাথে আফ্রিকান বাস্তবতার তীব্র অসঙ্গতি।
এরপর ১৯৬৬ সালে তিনি বলিভিয়ায় তাঁর ‘ফোকো তত্ত্ব’-এর পুনরাবৃত্তি করতে যান। সেখানে তাঁর সাথে একমাত্র নারী গেরিলা হিসেবে যোগ দিয়েছিলেন হাইডি তামারা , যিনি 'টানিয়া' নামে পরিচিত। ছদ্মবেশে গোয়েন্দাগিরি ও লজিস্টিক সাপোর্টে তাঁর ভূমিকা ছিল অনন্য। কিন্তু বলিভিয়ার ভূ-রাজনৈতিক বাস্তবতা ছিল কিউবা থেকে সম্পূর্ণ ভিন্ন। সেখানে রেনে বারিয়েনতোসের সামরিক সরকারের ভূমি সংস্কারের কারণে গ্রামীণ আদিবাসী কৃষকদের মধ্যে কোনো বড় অসন্তোষ ছিল না। তার ওপর ভাষাগত দূরত্ব ছিল এক বিশাল বাধা; স্থানীয় কৃষকেরা স্প্যানিশের বদলে কেচুয়া ও গুয়ারানি ভাষায় কথা বলত, যার ফলে চে-র বাহিনী তাদের সাথে সংযোগ গড়তে ব্যর্থ হয়। অন্যদিকে, বলিভিয়ান কমিউনিস্ট পার্টির তৎকালীন সাধারণ সম্পাদক মারিও মোনহে চে-র সাথে দেখা করে দাবি করেছিলেন যে, বলিভিয়ার মাটির এই যুদ্ধের সুপ্রিম কমান্ডার হবেন তিনি নিজে। চে তা মেনে না নেওয়ায় দলের ভেতরের নেতৃত্বের অহং ও কৌশলগত দ্বন্দ্বের কারণে সেই সময়ের কমিউনিস্ট পার্টি চে-কে সমর্থন করতে সম্পূর্ণ অস্বীকৃতি জানায়।
ফলস্বরূপ, স্থানীয় জনবিচ্ছিন্নতা, চরম প্রতিকূল পরিবেশ এবং মার্কিন গোয়েন্দা সংস্থা সিআইএ পরিচালিত বিশেষ দমন অভিযান 'অপারেশন সিনথিয়া'-র আওতায় সিআইএ-প্রশিক্ষিত বলিভিয়ান রেঞ্জার বাহিনীর সাঁড়াশি অভিযানের মুখে ১৯৬৭ সালের ৮ অক্টোবর 'কিব্রাদা দেল ইউরো' গিরিখাতে আহত অবস্থায় বন্দি হন চে। বন্দি হওয়ার ঠিক পূর্বমুহূর্তে তিনি তাঁর ঐতিহাসিক 'বলিভিয়ান ডায়েরি' সম্বলিত ব্যাগটি এক বিশ্বস্ত সহযোদ্ধার মাধ্যমে নিরাপদ স্থানে সরিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করেছিলেন, যেন তাঁর শেষ লড়াইয়ের সত্যনিষ্ঠ দলিলটি সাম্রাজ্যবাদীদের হাতে বিকৃত না হয়। পরদিন, ৯ অক্টোবর লা হিগুয়েরা গ্রামের একটি জরাজীর্ণ স্কুলকক্ষে বলিভিয়ার সামরিক প্রধান রেনে বারিয়েনতোসের সরাসরি আদেশে এবং সিআইএ কর্মকর্তা ফেলিক্স রদ্রিগেজের উপস্থিতিতে কোনো প্রকার আইনি বিচার ছাড়াই অত্যন্ত অনৈতিক ও নির্মমভাবে তাঁকে হত্যা করা হয়। ঐতিহাসিক দলিল অনুযায়ী, ঘাতক সার্জেন্ট মারিও তেরান যখন মদ্যপ অবস্থায় কাঁপতে কাঁপতে ঘরে ঢোকে, চে তখন বুক চিতিয়ে তাঁর শেষ অমোঘ বাণী উচ্চারণ করেছিলেন: "আমি জানি তুমি আমাকে মারতে এসেছ। গুলি করো কাপুরুষ, তুমি কেবল একজন মানুষকে হত্যা করবে, তার আদর্শকে নয়।" মৃত্যুর অব্যবহিত পরেই তাঁর আইনি ও শারীরিক পরিচিতি নিশ্চিত করার অছিলায় বলিভিয়ার সামরিক জান্তা তাঁর দুই হাতের কবজি কেটে রাসায়নিক পাত্রে সংরক্ষণ করে হাভানায় পাঠিয়েছিল, যা বিংশ শতাব্দীর যুদ্ধাপরাধের ইতিহাসে এক পৈশাচিক দালিলিক প্রমাণ। পরবর্তীতে ডিক্লাসিফাইড হওয়া মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের নথিপত্র প্রমাণ করে যে, তৎকালীন মার্কিন প্রেসিডেন্ট লিন্ডন জনসনকে এই অভিযানের প্রতিটি মুহূর্তের গোয়েন্দা রিপোর্ট নিয়মিত সরবরাহ করা হচ্ছিল। দীর্ঘ তিন দশক পর ১৯৯৭ সালে ভ্যালেগ্রান্দেতে তাঁর গোপন গণকবর আবিষ্কৃত হলে তাঁর দেহাবশেষ কিউবার সান্তা ক্লারায় এনে রাষ্ট্রীয় মর্যাদায় সমাহিত করা হয়।
ঐতিহাসিক ও রাজনৈতিক বস্তুনিষ্ঠতার নিরিখে মূল্যায়ন করলে দেখা যায়, চে গুয়েভারা একই সাথে ইতিহাসের এক পরম পূজনীয় মুক্তিদূত এবং এক নির্মম শাসনতান্ত্রিক ব্যক্তিত্ব। ভিন্নমত দমন, সমকামীদের প্রতি নীতিগত কঠোরতা এবং আইনি প্রক্রিয়া বহির্ভূত হত্যাকাণ্ডের জন্য দক্ষিণপন্থী ও উদারপন্থী সমাজবিজ্ঞানীদের কাছে তিনি একজন কঠোর ও নির্মম আদর্শবাদী। অন্যদিকে বিশ্বজুড়ে প্রগতিশীল মুক্তিকামী শক্তির কাছে তিনি শৃঙ্খলমুক্তির এক আপসহীন আইকন। মৃত্যুর অর্ধশতক পরেও আলবার্তো কোর্দার তোলা তাঁর কালজয়ী আলোকচিত্র ‘গেরিলিরো হিরোইকো’-র যে বাণিজ্যিক রূপান্তর ঘটেছে, তা উত্তর-আধুনিক পুঁজিবাদের ইতিহাসের সবচেয়ে বড় কূটাভাস। যে পুঁজিবাদ ও মুক্তবাজার অর্থনীতির বিরুদ্ধে চে গুয়েভারা আজীবন লড়াই করলেন, সেই বহুজাতিক পুঁজিবাদী কর্পোরেট বাজারই আজ তাঁর বৈপ্লবিক অবয়বকে টি-শার্ট, পোস্টার ও বাণিজ্যিক পণ্যে রূপান্তর করে বিলিয়ন ডলারের মুনাফা কামাচ্ছে। এটি তাঁর বৈপ্লবিক আদর্শকে এক প্রকার নিষ্ক্রিয় করে একটি নিরীহ ফ্যাশন ব্র্যান্ডে পরিণত করেছে।
আর্নেস্তো চে গুয়েভারার ঐতিহাসিক উত্তরাধিকার তাই কোনো সরলরৈখিক সমীকরণ নয়; এটি এক গভীর আত্মদ্বন্দ্বে জারিত আখ্যান। রাষ্ট্র পরিচালনার কঠিন ও নির্মম বাস্তবতায় তিনি হয়তো একজন ব্যর্থ প্রশাসক ছিলেন, তাঁর অনেক সামরিক সিদ্ধান্তই হয়তো ডেকে এনেছিল বিপর্যয়। কিন্তু দিনশেষে চে গুয়েভারা কোনো সাধারণ ক্ষমতার লোভী রাজনীতিক ছিলেন না। নিজের তৈরি করা কঠোর আদর্শের জন্য সমস্ত রাষ্ট্রীয় সুখ, মন্ত্রিত্বের গদি এবং নিশ্চিত বুর্জোয়া জীবনের সচ্ছলতা ছুঁড়ে ফেলে দিয়ে যিনি মৃত্যুর মুখোমুখি দাঁড়াতে পারেন—ইতিহাস তাঁকে সহজে ভুলে যায় না। পুঁজিবাদ তাঁর ছবি বিক্রি করে মুনাফা লুটতে পারে, কিন্তু তাঁর ভেতরের সেই আপসহীন শৃঙ্খল ভাঙার তাড়নাকে কিনতে পারে না। সমস্ত তাত্ত্বিক সীমাবদ্ধতা ও শাসনতান্ত্রিক ত্রুটির ঊর্ধ্বে উঠে, অন্যায়ের বিরুদ্ধে বুক চিতিয়ে দাঁড়ানোর যে চিরকালীন মানবিক আদিম আকাঙ্ক্ষা—চে গুয়েভারা আজীবন তারই এক জীবন্ত, স্পন্দমান এবং অবিনাশী ইশতেহার।
আজ ১৪ জুন—এই কালজয়ী বিপ্লবীর শুভ জন্মদিন। ইতিহাসের খেরোখাতায় তিনি চিরকাল বেঁচে থাকবেন এক অমলিন, দীপ্তিময় এবং তীব্র পঠনযোগ্য ধ্রুবতারা হয়ে। ক্ষমতার মসনদ ছেড়ে ধূলিমগ্ন যুদ্ধক্ষেত্রে হারিয়ে যাওয়া এই চির-তরুণ রোমান্টিক রাজপুত্রের জন্মদিনে বিশ্বজুড়ে শৃঙ্খলিত মানুষের হৃদয়ে আজো বেজে ওঠে এক নীরব ও গভীর শ্রদ্ধাগাথা।
শুভ জন্মদিন, কমরেড চে গুয়েভারা!

বাহাউদ্দিন গোলাপ,
১৪ জুন,২০২৬
বিংশ শতাব্দীর বিশ্বরাজনীতিতে আর্নেস্তো চে গুয়েভারা একটি অত্যন্ত জটিল, বহুমাত্রিক এবং তুমুল বিতর্কিত নাম। ১৯২৮ সালের ১৪ জুন আর্জেন্টিনার সান্তা ফে শহরে এক মধ্যবিত্ত পরিবারে জন্ম নেন আর্নেস্তো গুয়েভারা দে লা সের্না। কালক্রমে তিনি বিশ্বজুড়ে শৃঙ্খলমুক্তির এক অবিনাশী প্রতীকে পরিণত হন। তবে সমকালীন ইতিহাসচর্চা ও রাষ্ট্রবিজ্ঞানের নির্মেদ আলোয় চে গুয়েভারা কেবল একজন রোমান্টিক গেরিলা নেতা নন। তিনি একই সাথে একজন কট্টর মার্ক্সবাদী সামরিক তত্ত্ববিদ, কিউবা বিপ্লবের প্রধান স্থপতি এবং রাষ্ট্রীয় ক্ষমতার বাস্তবতায় এক তীব্র বিতর্কিত ব্যক্তিত্ব। তাঁর জীবন, রাজনৈতিক দর্শন এবং সামরিক কৌশলকে বুঝতে হলে কেবল স্তুতিগাথা যথেষ্ট নয়। এর জন্য তাঁর প্রশাসনিক ব্যর্থতা, নীতিগত সীমাবদ্ধতা, আন্তর্জাতিক চুক্তির মারপ্যাঁচ এবং ঠান্ডা লড়াইয়ের যুগের ভূ-রাজনৈতিক দ্বন্দ্বের একটি নির্মোহ মূল্যায়ন অপরিহার্য।
সান্তা ফে শহরে জন্মের পর আর্নেস্তোর শৈশব ও কৈশোর কেটেছিল এক মননশীল ও উদার পারিবারিক আবহে। পাঁচ ভাইবোনের মধ্যে তিনি ছিলেন জ্যেষ্ঠ। শৈশব থেকেই তিনি তীব্র হাঁপানি রোগে আক্রান্ত ছিলেন, যা তাঁর জীবনের শেষদিন পর্যন্ত পিছু ছাড়েনি। কিন্তু এই শারীরিক প্রতিবন্ধকতা তাঁর অদম্য প্রাণশক্তিকে দমাতে পারেনি; বরং এটি তাঁকে আরও জেদি ও লড়াকু করে তোলে। তাঁর পরিবারে ছিল তিন হাজারেরও বেশি বইয়ের এক সমৃদ্ধ লাইব্রেরি, যেখানে ডুব দিয়ে কিশোর আর্নেস্তো কার্ল মার্ক্স, ফ্রিডরিখ এঙ্গেলস, ভ্লাদিমির লেনিন থেকে শুরু করে পাবলো নেরুদা, ফেদেরিকো গার্সিয়া লোরকা এবং জঁ-পল সার্ত্রের দর্শনের সাথে পরিচিত হন। একই সাথে দাবা খেলা ও খেলাধুলার প্রতি তাঁর ছিল তীব্র ঝোঁক। ১৯৪৭ সালে তিনি বুয়েনস আইরেস বিশ্ববিদ্যালয়ে চিকিৎসাশাস্ত্রে ভর্তি হন। চিকিৎসাশাস্ত্রে ডিগ্রি অর্জনকারী এই তরুণ মূলত মানুষের রোগমুক্তির স্বপ্ন দেখতেন, কিন্তু মানবসমাজের গভীরে প্রোথিত সামাজিক ও অর্থনৈতিক বৈষম্যের ব্যাধিটি তাঁকে আরও বেশি তাড়িত করেছিল।
চিকিৎসাবিজ্ঞানের এই ছাত্রটির বৈপ্লবিক চেতনার প্রধান রূপান্তর ঘটেছিল ১৯৫২ সালের প্রথমার্ধে নেওয়া লাতিন আমেরিকা পরিভ্রমণের মাধ্যমে। বন্ধু আলবার্তো গ্রানাদোকে সাথে নিয়ে এক জরাজীর্ণ মোটরসাইকেলে তিনি এই সফরে বের হন। এই সফর সমগ্র লাতিন আমেরিকা জুড়ে ছিল না, এটি মূলত আর্জেন্টিনা, চিলি, পেরু, কলম্বিয়া এবং ভেনিজুয়েলা পর্যন্ত বিস্তৃত ছিল। পথিমধ্যে চিলির লস অ্যাঞ্জেলেস নামক স্থানে মোটরসাইকেলটি চিরতরে অচল হয়ে যায় এবং বাকি পথ তাঁরা পায়ে হেঁটে, ট্রাকে বা ভেলায় পাড়ি দিয়েছিলেন। এই দীর্ঘ ভ্রমণ কেবল কোনো ভৌগোলিক পর্যটন ছিল না, এটি ছিল লাতিন আমেরিকার খনি শ্রমিকদের অমানবিক শ্রম ও আদিবাসীদের চরম অবহেলিত জীবনকে খুব কাছ থেকে দেখার অভিজ্ঞতা। পেরুর আমাজন অববাহিকার সান পাবলো কুষ্ঠাশ্রমে কুষ্ঠরোগীদের সামাজিক ও শারীরিক বিচ্ছিন্নতা তরুণ আর্নেস্তোকে গভীরভাবে নাড়া দেয়। এই ভ্রমণের পরপরই ১৯৫৩ সালে তিনি বলিভিয়ায় যান এবং সেখানে জাতীয়তাবাদী বিপ্লবী আন্দোলনের মাধ্যমে গড়ে ওঠা খনি শ্রমিকদের ক্ষমতা ও সংস্কারের প্রথম বাস্তব রূপ প্রত্যক্ষ করেন, যা তাঁর সমাজতান্ত্রিক ভাবনাকে আরও তাত্ত্বিক ভিত্তি দান করে।
এই বৈপ্লবিক বোধ চে-র চিন্তাধারায় এক ধরনের আপসহীন মানসিকতা তৈরি করে। ১৯৫৩ সালের শেষভাগে গুয়াতেমালায় অবস্থানকালীন ওখানকার সমাজতান্ত্রিক ও বামপন্থী নির্বাসিতরা তাঁর কথার মাঝে আর্জেন্টিনার আঞ্চলিক সম্বোধন ‘চে’ (যার অর্থ বন্ধু বা ভাই) ব্যবহারের অভ্যাসের কারণে তাঁকে ভালোবেসে প্রথম ‘চে’ নামে ডাকতে শুরু করেন, যা পরবর্তীতে ইতিহাসে তাঁর স্থায়ী পরিচয় হয়ে দাঁড়ায়। সেখানে তাঁর পরিচয় হয় পেরুর নির্বাসিত সমাজতান্ত্রিক অর্থনীতিবিদ হিল্ডা গাদিয়ার সাথে। হিল্ডা গাদিয়াই চে-কে প্রথম উচ্চতর মার্ক্সবাদী দর্শনের সাথে পরিচয় করিয়ে দেন এবং মেক্সিকোতে নির্বাসিত থাকাকালীন ফিদেল কাস্ত্রো ও রাউল কাস্ত্রোর সাথে তাঁর ঐতিহাসিক সাক্ষাৎ ঘটিয়ে দেন। ১৯৫৪ সালে গুয়াতেমালায় মার্কিন গোয়েন্দা সংস্থা সমর্থিত সামরিক অভ্যুত্থানের মাধ্যমে গণতান্ত্রিকভাবে নির্বাচিত রাষ্ট্রপতি জাকোবো আরবেনজ গুজমানকে ক্ষমতাচ্যুত করা হয়। এই অভিযানের মূল উস্কানিদাতা ছিল মার্কিন বহুজাতিক ফল বিপণন সংস্থা 'ইউনাইটেড ফ্রুট কোম্পানি', যাদের বিশাল ভূ-সম্পত্তি আরবেনজ সরকার ভূমি সংস্কার আইনের মাধ্যমে বাজেয়াপ্ত করেছিলেন। এই ঘটনা চে-র সেই সশস্ত্র দর্শনকে আরও দৃঢ় করে। তিনি বিশ্বাস করতে শুরু করেন যে, সাম্রাজ্যবাদী শক্তির বিরুদ্ধে শান্তিপূর্ণ উপায়ে বা নির্বাচনের মাধ্যমে সমাজতন্ত্র প্রতিষ্ঠা অসম্ভব। শোষক শ্রেণী কখনো স্বেচ্ছায় ক্ষমতা ছাড়ে না। কাস্ত্রোর ‘২৬শে জুলাই আন্দোলন’-এ যোগ দিয়ে ১৯৫৬ সালের ডিসেম্বরে তিনি 'গ্রানমা' নামক জাহাজে চড়ে কিউবায় অবতরণ করেন। সিয়েরা মায়েস্ত্রার গেরিলা যুদ্ধে চে তাঁর বিখ্যাত ‘ফোকো তত্ত্ব’-এর বাস্তব প্রয়োগ ঘটান। এই তত্ত্ব অনুযায়ী, একটি ছোট ও সুসংগঠিত গেরিলা অগ্রবর্তী দল গণ-আন্দোলনের দীর্ঘমেয়াদি প্রস্তুতি ছাড়াই একটি দেশে বৈপ্লবিক পরিস্থিতির সূচনা করতে পারে। ১৯৫৮ সালের ডিসেম্বরের শেষভাগে চে-র নেতৃত্বে পরিচালিত ঐতিহাসিক ‘সান্তা ক্লারার যুদ্ধ’-এ বাতিস্তার সামরিক ট্রেনের ওপর আক্রমণ কিউবা বিপ্লবের চূড়ান্ত বিজয় নির্ধারণ করে এবং ১৯৫৯ সালের ১ জানুয়ারি স্বৈরাচারী বাতিস্তা দেশ ছেড়ে পালিয়ে গেলে কিউবার মাটিতে এই বিপ্লবী মডেল সফল হয়।
কিউবার বিপ্লবোত্তর পুনর্গঠন পর্বে চে গুয়েভারা যে প্রশাসনিক, অর্থনৈতিক ও বিচারবিভাগীয় নীতি গ্রহণ করেছিলেন, তা আজো তীব্র সমালোচনার উৎস। বাতিস্তা সরকারের পতনের পর ১৯৫৯ সালের ৭ ফেব্রুয়ারি বিপ্লবী সরকার কর্তৃক কিউবার ১৯৪০ সালের সংবিধানে 'আইনি ধারা ১২' সংশোধন করে একটি বিশেষ ডিক্রি জারির মাধ্যমে চে গুয়েভারাকে 'জন্মসূত্রে কিউবান নাগরিক' হিসেবে ঘোষণা করা হয়, যা ছিল কিউবার ইতিহাসে এক বিরল আইনি ঘটনা। ১৯৫৯ সালের প্রথমভাগে হাভানার ‘লা কাবানিয়া’ দুর্গের সামরিক প্রধান হিসেবে বাতিস্তা সরকারের সহযোগী ও যুদ্ধাপরাধীদের বিচার প্রক্রিয়ার দায়িত্ব তাঁর ওপর ন্যস্ত ছিল। বাতিস্তা সরকারের তৎকালীন ১৯৩৮ সালের 'প্রতিরক্ষা সামাজিক কোড' এবং বিপ্লবী সরকারের 'আইনি ডিক্রি নম্বর ২০৮' ও 'বিপ্লবী আইন নম্বর ১১'-এর আওতায় এই বিশেষ ট্রাইব্যুনালগুলো পরিচালিত হয়েছিল। এই সময় আইনি প্রক্রিয়ার তোয়াক্কা না করে মৃত্যুদণ্ড দেওয়ার ক্ষেত্রে চে-র একটি উক্তি আজো দালিলিক প্রমাণ হিসেবে বিতর্ক তৈরি করে, যেখানে তিনি বলেছিলেন, "বিচার বিভাগীয় প্রমাণের উপস্থাপনা বিপ্লবী ট্রাইব্যুনালগুলোর জন্য অপ্রয়োজনীয়, এটি একটি বিপ্লবী যুদ্ধ।" পশ্চিমা ঐতিহাসিক এবং আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থাগুলোর মতে, এই বিচার প্রক্রিয়ায় কোনো আন্তর্জাতিক আইনি বিধিমালা বা আসামিপক্ষের যথাযথ আইনি আত্মপক্ষ সমর্থনের সুযোগ অনুসৃত হয়নি। সেখানে বাতিস্তা সরকারের বেশ কিছু সহযোগীকে ফায়ারিং স্কোয়াডে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয়েছিল, যার সঠিক সংখ্যা নিয়ে আজো ঐতিহাসিকদের মধ্যে বিতর্ক রয়েছে। সমাজবিজ্ঞানীদের অনেকেই একে রাজনৈতিক প্রতিশোধ ও রাষ্ট্রীয় ভিন্নমত দমনের একটি নিকৃষ্ট উদাহরণ হিসেবে চিহ্নিত করেন। উল্লেখ্য, সমাজতন্ত্রের প্রতি অনুপযুক্ত নাগরিকদের কৃষি-শ্রমশিবিরে পাঠানোর বিতর্কিত প্রক্রিয়াটি কিউবায় প্রাতিষ্ঠানিক রূপ পায় ১৯৬৫ সালের শেষভাগে, যার নাম ছিল 'উৎপাদনে সহায়তার জন্য সামরিক ইউনিট'। তখন চে কিউবা ছেড়ে চলে গেছেন, ফলে তিনি সেই ক্যাম্পের সরাসরি পরিচালক ছিলেন না। তবে তাঁর তৈরি নতুন মানব তত্ত্বের কঠোর সামরিক শৃঙ্খলা ও নৈতিক শুদ্ধিবাদ এই ক্যাম্প তৈরিতে গভীর আদেশিক অনুপ্রেরণা জুগিয়েছিল।
এর পাশাপাশি, সমাজতান্ত্রিক কিউবার শিল্পমন্ত্রী এবং জাতীয় ব্যাংকের গভর্নর হিসেবে তাঁর অর্থনৈতিক নীতিগুলো চরম প্রশাসনিক অদূরদর্শিতার পরিচয় দেয়। পুঁজিবাদের প্রতি তীব্র অবজ্ঞা প্রকাশ করতে তিনি জাতীয় ব্যাংকের গভর্নর হিসেবে কিউবান মুদ্রার নোটগুলোতে নিজের পুরো নামের বদলে শুধু অবহেলাভরে ‘চে’ লিখে স্বাক্ষর করতেন, যা ছিল বিশ্ব ব্যাংকিং ইতিহাসের এক অভিনব দালিলিক কূটাভাস। চে তাঁর বিখ্যাত প্রবন্ধ "কিউবায় সমাজতন্ত্র এবং মানুষ"-এ এক নতুন মানব ধারণার অবতারণা করেন। তিনি চেয়েছিলেন মানুষ ব্যক্তিস্বার্থ বা বস্তুগত লাভ ত্যাগ করে কেবল নৈতিক চেতনা ও স্বেচ্ছাশ্রমের ভিত্তিতে কাজ করবে। মানুষের সহজাত মনস্তত্ত্ব ও বাজার বাস্তবতাকে অস্বীকার করা এই অতি-উগ্র অর্থনৈতিক রূপান্তর এবং অবাস্তব দ্রুত শিল্পায়ন নীতির কারণে কিউবার উৎপাদন ব্যবস্থা সম্পূর্ণ ভেঙে পড়ে। ১৯৬৩ থেকে ১৯৬৫ সালের মধ্যে কিউবান অর্থনীতিতে বিখ্যাত 'শিল্প বনাম কৃষি উৎপাদন বিতর্ক' শুরু হয়, যেখানে সোভিয়েত ব্লকের কেন্দ্রীয় পরিকল্পনার বিরোধিতা করে চে কিউবাকে একতরফা ভারী শিল্পের দিকে ধাবিত করার চেষ্টা করেন, যা চরম বিপর্যয় ডেকে আনে। চিনি শিল্পের ওপর মারাত্মক ধস নামে। ফলে কিউবা শেষ পর্যন্ত অর্থনৈতিক ও সামরিকভাবে সম্পূর্ণ সোভিয়েত-নির্ভর হয়ে পড়ে। এমনকি ১৯৬২ সালের বিখ্যাত 'কিউবান মিসাইল ক্রাইসিস' বা ক্ষেপণাস্ত্র সংকটের সময় সোভিয়েত ইউনিয়ন যখন কিউবার মাটিতে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের অগোচরে পরমাণু ক্ষেপণাস্ত্র মোতায়েন করে, চে তা সম্পূর্ণ সমর্থন করেছিলেন। কিন্তু পরে কিউবাকে অন্ধকারে রেখে সোভিয়েত নেতা নিকিতা ক্রুশ্চেভ যখন মার্কিন রাষ্ট্রপতি জন এফ কেনেডির সাথে গোপন সমঝোতার মাধ্যমে ক্ষেপণাস্ত্র ফিরিয়ে নেন, তখন চে একে সোভিয়েত ইউনিয়নের চরম সাম্রাজ্যবাদী আপস ও বিশ্বাসঘাতকতা হিসেবে গণ্য করেন।
চে গুয়েভারার রাজনৈতিক জীবনের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় হলো তৎকালীন সমাজতান্ত্রিক শিবিরের চীন-সোভিয়েত বিভাজন এবং সোভিয়েত আমলাতন্ত্রের সাথে তাঁর সংঘাত। চে ক্রুশ্চেভ-এর পশ্চিমা পুঁজিবাদের সাথে "শান্তিপূর্ণ সহাবস্থান" নীতির তীব্র বিরোধী ছিলেন। তিনি সোভিয়েত ইউনিয়নকে একটি সংশোধনবাদী শক্তি হিসেবে দেখতে শুরু করেছিলেন। তবে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে তাঁর সবচেয়ে প্রভাবশালী ভূমিকা ছিল ১৯৬৪ সালের ১১ ডিসেম্বর জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদের ঊনবিংশ অধিবেশনে দেওয়া ঐতিহাসিক ভাষণ। সেই ভাষণে তিনি মার্কিন সাম্রাজ্যবাদের তীব্র সমালোচনা করার পাশাপাশি পরিষ্কার ঘোষণা দেন যে, লাতিন আমেরিকার নিপীড়িত মানুষ এখন তাদের মুক্তির ইতিহাস নিজেদের রক্তে লিখতে শুরু করেছে। এই ওজস্বী ভাষণের ঠিক পরদিন কিউবান প্রবাসী সমাজতান্ত্রিক-বিরোধীরা জাতিসংঘের সদর দপ্তর লক্ষ্য করে মর্টার হামলা চালায়, যা তাঁর উপস্থিতির ভূ-রাজনৈতিক গুরুত্বের বড় প্রমাণ। এর পরপরই ১৯৬৫ সালের ২৪ ফেব্রুয়ারি আলজেরিয়াতে অনুষ্ঠিত আফ্রো-এশীয় অর্থনৈতিক সম্মেলনে তিনি তাঁর শেষ আন্তর্জাতিক ‘আলজিয়ার্স ভাষণ’ দেন। সেখানে চে খোলাখুলিভাবে সোভিয়েত ও পশ্চিমা পরাশক্তিগুলোর তীব্র সমালোচনা করেন। তিনি অভিযোগ তোলেন যে, সোভিয়েত ইউনিয়ন অনুন্নত ও শোষিত সমাজতান্ত্রিক দেশগুলোর সাথে পশ্চিমা সাম্রাজ্যবাদের মতোই অসমান ও শোষণমূলক বাণিজ্য করছে। এই ভাষণের ফলে কিউবা-সোভিয়েত দ্বিপাক্ষিক সম্পর্কে চরম কূটনৈতিক টানাপোড়েন তৈরি হয়। ফিদেল কাস্ত্রো তখন অর্থনৈতিক ও সামরিক অস্তিত্বের জন্য সম্পূর্ণভাবে মস্কোর ওপর নির্ভরশীল ছিলেন। ফলে সোভিয়েত ব্লকের প্রবল চাপের মুখে চে গুয়েভারাকে কিউবার সমস্ত রাষ্ট্রীয় পদ, মন্ত্রিত্ব এবং নাগরিকত্ব ত্যাগ করে নির্বাসনে যেতে বাধ্য করা হয়।
কিউবা ত্যাগের পর চে গুয়েভারা বিশ্ব-বিপ্লবের ধারণাকে ছড়িয়ে দিতে তাঁর বিখ্যাত ‘ত্রিমহাদেশীয় কৌশল’ প্রবর্তন করেন। তিনি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ডমিনো তত্ত্বের বিপরীতে এশিয়া, আফ্রিকা ও লাতিন আমেরিকায় মার্কিন সাম্রাজ্যবাদকে ব্যস্ত ও দুর্বল রাখতে বিশ্বজুড়ে দুই, তিন বা ততোধিক ভিয়েতনামের জন্ম দেওয়ার সামরিক আহ্বান জানান। এই তত্ত্বের অংশ হিসেবে ১৯৬৫ সালে কঙ্গো কিনশাসায় তাঁর মার্ক্সবাদী গেরিলা যুদ্ধ পরিচালনার প্রচেষ্টা সম্পূর্ণ ব্যর্থতায় পর্যবসিত হয়। এর প্রধান কারণ ছিল স্থানীয় নৃগোষ্ঠীর জটিল অভ্যন্তরীণ রাজনীতি বুঝতে না পারা, কঙ্গোলিজ নেতা লঁরা কাবিলার বাহিনীর চরম শৃঙ্খলহীনতা এবং চে-র নিজস্ব সামরিক সংস্কৃতির সাথে আফ্রিকান বাস্তবতার তীব্র অসঙ্গতি।
এরপর ১৯৬৬ সালে তিনি বলিভিয়ায় তাঁর ‘ফোকো তত্ত্ব’-এর পুনরাবৃত্তি করতে যান। সেখানে তাঁর সাথে একমাত্র নারী গেরিলা হিসেবে যোগ দিয়েছিলেন হাইডি তামারা , যিনি 'টানিয়া' নামে পরিচিত। ছদ্মবেশে গোয়েন্দাগিরি ও লজিস্টিক সাপোর্টে তাঁর ভূমিকা ছিল অনন্য। কিন্তু বলিভিয়ার ভূ-রাজনৈতিক বাস্তবতা ছিল কিউবা থেকে সম্পূর্ণ ভিন্ন। সেখানে রেনে বারিয়েনতোসের সামরিক সরকারের ভূমি সংস্কারের কারণে গ্রামীণ আদিবাসী কৃষকদের মধ্যে কোনো বড় অসন্তোষ ছিল না। তার ওপর ভাষাগত দূরত্ব ছিল এক বিশাল বাধা; স্থানীয় কৃষকেরা স্প্যানিশের বদলে কেচুয়া ও গুয়ারানি ভাষায় কথা বলত, যার ফলে চে-র বাহিনী তাদের সাথে সংযোগ গড়তে ব্যর্থ হয়। অন্যদিকে, বলিভিয়ান কমিউনিস্ট পার্টির তৎকালীন সাধারণ সম্পাদক মারিও মোনহে চে-র সাথে দেখা করে দাবি করেছিলেন যে, বলিভিয়ার মাটির এই যুদ্ধের সুপ্রিম কমান্ডার হবেন তিনি নিজে। চে তা মেনে না নেওয়ায় দলের ভেতরের নেতৃত্বের অহং ও কৌশলগত দ্বন্দ্বের কারণে সেই সময়ের কমিউনিস্ট পার্টি চে-কে সমর্থন করতে সম্পূর্ণ অস্বীকৃতি জানায়।
ফলস্বরূপ, স্থানীয় জনবিচ্ছিন্নতা, চরম প্রতিকূল পরিবেশ এবং মার্কিন গোয়েন্দা সংস্থা সিআইএ পরিচালিত বিশেষ দমন অভিযান 'অপারেশন সিনথিয়া'-র আওতায় সিআইএ-প্রশিক্ষিত বলিভিয়ান রেঞ্জার বাহিনীর সাঁড়াশি অভিযানের মুখে ১৯৬৭ সালের ৮ অক্টোবর 'কিব্রাদা দেল ইউরো' গিরিখাতে আহত অবস্থায় বন্দি হন চে। বন্দি হওয়ার ঠিক পূর্বমুহূর্তে তিনি তাঁর ঐতিহাসিক 'বলিভিয়ান ডায়েরি' সম্বলিত ব্যাগটি এক বিশ্বস্ত সহযোদ্ধার মাধ্যমে নিরাপদ স্থানে সরিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করেছিলেন, যেন তাঁর শেষ লড়াইয়ের সত্যনিষ্ঠ দলিলটি সাম্রাজ্যবাদীদের হাতে বিকৃত না হয়। পরদিন, ৯ অক্টোবর লা হিগুয়েরা গ্রামের একটি জরাজীর্ণ স্কুলকক্ষে বলিভিয়ার সামরিক প্রধান রেনে বারিয়েনতোসের সরাসরি আদেশে এবং সিআইএ কর্মকর্তা ফেলিক্স রদ্রিগেজের উপস্থিতিতে কোনো প্রকার আইনি বিচার ছাড়াই অত্যন্ত অনৈতিক ও নির্মমভাবে তাঁকে হত্যা করা হয়। ঐতিহাসিক দলিল অনুযায়ী, ঘাতক সার্জেন্ট মারিও তেরান যখন মদ্যপ অবস্থায় কাঁপতে কাঁপতে ঘরে ঢোকে, চে তখন বুক চিতিয়ে তাঁর শেষ অমোঘ বাণী উচ্চারণ করেছিলেন: "আমি জানি তুমি আমাকে মারতে এসেছ। গুলি করো কাপুরুষ, তুমি কেবল একজন মানুষকে হত্যা করবে, তার আদর্শকে নয়।" মৃত্যুর অব্যবহিত পরেই তাঁর আইনি ও শারীরিক পরিচিতি নিশ্চিত করার অছিলায় বলিভিয়ার সামরিক জান্তা তাঁর দুই হাতের কবজি কেটে রাসায়নিক পাত্রে সংরক্ষণ করে হাভানায় পাঠিয়েছিল, যা বিংশ শতাব্দীর যুদ্ধাপরাধের ইতিহাসে এক পৈশাচিক দালিলিক প্রমাণ। পরবর্তীতে ডিক্লাসিফাইড হওয়া মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের নথিপত্র প্রমাণ করে যে, তৎকালীন মার্কিন প্রেসিডেন্ট লিন্ডন জনসনকে এই অভিযানের প্রতিটি মুহূর্তের গোয়েন্দা রিপোর্ট নিয়মিত সরবরাহ করা হচ্ছিল। দীর্ঘ তিন দশক পর ১৯৯৭ সালে ভ্যালেগ্রান্দেতে তাঁর গোপন গণকবর আবিষ্কৃত হলে তাঁর দেহাবশেষ কিউবার সান্তা ক্লারায় এনে রাষ্ট্রীয় মর্যাদায় সমাহিত করা হয়।
ঐতিহাসিক ও রাজনৈতিক বস্তুনিষ্ঠতার নিরিখে মূল্যায়ন করলে দেখা যায়, চে গুয়েভারা একই সাথে ইতিহাসের এক পরম পূজনীয় মুক্তিদূত এবং এক নির্মম শাসনতান্ত্রিক ব্যক্তিত্ব। ভিন্নমত দমন, সমকামীদের প্রতি নীতিগত কঠোরতা এবং আইনি প্রক্রিয়া বহির্ভূত হত্যাকাণ্ডের জন্য দক্ষিণপন্থী ও উদারপন্থী সমাজবিজ্ঞানীদের কাছে তিনি একজন কঠোর ও নির্মম আদর্শবাদী। অন্যদিকে বিশ্বজুড়ে প্রগতিশীল মুক্তিকামী শক্তির কাছে তিনি শৃঙ্খলমুক্তির এক আপসহীন আইকন। মৃত্যুর অর্ধশতক পরেও আলবার্তো কোর্দার তোলা তাঁর কালজয়ী আলোকচিত্র ‘গেরিলিরো হিরোইকো’-র যে বাণিজ্যিক রূপান্তর ঘটেছে, তা উত্তর-আধুনিক পুঁজিবাদের ইতিহাসের সবচেয়ে বড় কূটাভাস। যে পুঁজিবাদ ও মুক্তবাজার অর্থনীতির বিরুদ্ধে চে গুয়েভারা আজীবন লড়াই করলেন, সেই বহুজাতিক পুঁজিবাদী কর্পোরেট বাজারই আজ তাঁর বৈপ্লবিক অবয়বকে টি-শার্ট, পোস্টার ও বাণিজ্যিক পণ্যে রূপান্তর করে বিলিয়ন ডলারের মুনাফা কামাচ্ছে। এটি তাঁর বৈপ্লবিক আদর্শকে এক প্রকার নিষ্ক্রিয় করে একটি নিরীহ ফ্যাশন ব্র্যান্ডে পরিণত করেছে।
আর্নেস্তো চে গুয়েভারার ঐতিহাসিক উত্তরাধিকার তাই কোনো সরলরৈখিক সমীকরণ নয়; এটি এক গভীর আত্মদ্বন্দ্বে জারিত আখ্যান। রাষ্ট্র পরিচালনার কঠিন ও নির্মম বাস্তবতায় তিনি হয়তো একজন ব্যর্থ প্রশাসক ছিলেন, তাঁর অনেক সামরিক সিদ্ধান্তই হয়তো ডেকে এনেছিল বিপর্যয়। কিন্তু দিনশেষে চে গুয়েভারা কোনো সাধারণ ক্ষমতার লোভী রাজনীতিক ছিলেন না। নিজের তৈরি করা কঠোর আদর্শের জন্য সমস্ত রাষ্ট্রীয় সুখ, মন্ত্রিত্বের গদি এবং নিশ্চিত বুর্জোয়া জীবনের সচ্ছলতা ছুঁড়ে ফেলে দিয়ে যিনি মৃত্যুর মুখোমুখি দাঁড়াতে পারেন—ইতিহাস তাঁকে সহজে ভুলে যায় না। পুঁজিবাদ তাঁর ছবি বিক্রি করে মুনাফা লুটতে পারে, কিন্তু তাঁর ভেতরের সেই আপসহীন শৃঙ্খল ভাঙার তাড়নাকে কিনতে পারে না। সমস্ত তাত্ত্বিক সীমাবদ্ধতা ও শাসনতান্ত্রিক ত্রুটির ঊর্ধ্বে উঠে, অন্যায়ের বিরুদ্ধে বুক চিতিয়ে দাঁড়ানোর যে চিরকালীন মানবিক আদিম আকাঙ্ক্ষা—চে গুয়েভারা আজীবন তারই এক জীবন্ত, স্পন্দমান এবং অবিনাশী ইশতেহার।
আজ ১৪ জুন—এই কালজয়ী বিপ্লবীর শুভ জন্মদিন। ইতিহাসের খেরোখাতায় তিনি চিরকাল বেঁচে থাকবেন এক অমলিন, দীপ্তিময় এবং তীব্র পঠনযোগ্য ধ্রুবতারা হয়ে। ক্ষমতার মসনদ ছেড়ে ধূলিমগ্ন যুদ্ধক্ষেত্রে হারিয়ে যাওয়া এই চির-তরুণ রোমান্টিক রাজপুত্রের জন্মদিনে বিশ্বজুড়ে শৃঙ্খলিত মানুষের হৃদয়ে আজো বেজে ওঠে এক নীরব ও গভীর শ্রদ্ধাগাথা।
শুভ জন্মদিন, কমরেড চে গুয়েভারা!

বাহাউদ্দিন গোলাপ,
১৪ জুন,২০২৬

০৩ জুন, ২০২৬ ১২:১০
আজ থেকে প্রায় ৬০০ বছর আগে বাগেরহাটে এসেছিলেন আধ্যাত্মিক সুফি সাধক হযরত খানজাহান আলী (রহ.)। ইসলাম প্রচার করতে এসে তিনি সেখানে সুপেয় পানির অভাবে মসজিদের পাশে খনন করেছিলেন প্রায় ২০০ একর আয়তনের বিশালাকৃতির একটি দিঘি। নিজের অলৌকিক ক্ষমতা প্রদর্শনের মাধ্যমে মানুষকে ধর্মের পথে পরিচালিত করার জন্য তিনি নদীর দুইটি কুমির এনে মিঠা পানির দিঘিতে বন্দী করেছিলেন। ভালোবেসে তাদের নামকরণ করেছিলেন কালাপাহাড় আর ধলাপাহাড় নামে। তাঁর জীবদ্দশায় কুমির দুটি তাঁর হাতের ইশারায় চলতো। তিনি নাম ধরে ডাক দিলে সঙ্গে সঙ্গে দিঘির পানিতে পাহাড়ের মতো তারা ভেসে উঠতো এবং মানুষের কাছে আসতো বলে জনশ্রুতি রয়েছে। কালাপাহাড় পুরুষ এবং ধলাপাহাড় নারী কুমির হওয়ায় তারা দিঘিতে বেশকিছু বাচ্চা জন্ম দিয়েছিল। খানজাহান আলীর (রহ.) মৃত্যুর পরেও সেই কালাপাহাড়, ধলাপাহাড় এবং তাদের বংশধররা কয়েকশো বছর ধরে এই দিঘিতে বেঁচেছিল।
পরবর্তীকালে অযত্ন-অবহেলা, পরিবেশগত ভারসাম্য নষ্ট এবং প্রয়োজনীয় পরিচর্যা আর খাদ্যের অভাবে কালাপাহাড়, ধলাপাহাড় এবং তাদের বাচ্চা কুমিরগুলো একে একে মারা যেতে শুরু করে। চলতি শতাব্দীর শুরুর দিকে কুমিরশূন্য হয়ে পড়ে ঐতিহাসিক খানজাহান আলীর দিঘি। এতে মাজার ব্যবসায় ধ্বস নামে। পরে ২০০৫ সালে ভারত থেকে নতুন ৩টি কুমির কিনে এনে খানজাহান আলীর দিঘিতে অবমুক্ত করা হয়। ঐতিহ্যের নামে মূলতঃ মাজার ব্যবসা টিকিয়ে রাখার জন্যেই নেওয়া হয় এই উদ্যোগ। কিন্তু পরিচর্যার অভাব ও খাদ্য সংকটে ২টি কুমির মারা যায়। দিঘিতে অবশিষ্ট একটা কুমির টিকে থাকে। এই কুমিরের সাথে হযরত খানজাহান আলী (রহ.), তাঁর বংশধর কিংবা তাঁর আধ্যাত্মিকতার কোনো সম্পর্ক নেই। তবে মাজার ব্যবসায়ী একদল ভন্ডের সাথে এই কুমিরের গভীর অর্থনৈতিক সম্পর্ক রয়েছে।
আগত ভক্ত মাজার পূজারীরা আল্লাহর রহমত কামনা এবং তাদের মনোবাসনা পূর্ণ করার আশায় কুমিরের জন্য টাকা দেয়, খাবার দেয়। খাবার হিসেবে মুরগি, ছাগল এবং মাংস কিনে দেয়। তবে সেগুলো কুমিরের ভাগ্যে খুব একটা জোটে না। কুমিরের মুখের সামনে থেকে ঘুরিয়ে এনে সেগুলো আবার আরেক ক্রেতার কাছে বিক্রি করা হয়। মাজারের কাছে গড়ে উঠেছে আগরবাতি, মোমবাতি, তাগা, ফিতা, তাবিজ, কবজ, ঝাড়ফুঁকসহ রকমারি বিভিন্ন ব্যবসা প্রতিষ্ঠান। নানা কৌশলে সেখানে চলছে নানান প্রতারণা আর পর্যটকদের পকেট কাটার প্রতিযোগিতা। মাজার থেকে আয় হওয়া টাকা সিন্ডিকেটের মাধ্যমে ভাগবাটোয়ারা হয়। এই মাজার সিন্ডিকেটের সাথে জড়িত মাজারের খাদেম, স্বেচ্ছাসেবক নামধারী কিছু মাদকসেবী, সরকার দলীয় কতিপয় নেতা, স্থানীয় পুলিশ এবং প্রশাসনের কিছু অসাধু ব্যক্তি।
সরকারের ঊর্ধ্বতন মহল আর বাগেরহাটের জেলা প্রশাসকের কাছে আমার উদাত্ত আহবান এবং বিনীত অনুরোধ থাকবে- দিঘির এই কুমিরকে অনতিবিলম্বে মিরপুরের চিড়িয়াখানা, চট্টগ্রামের কুমির প্রজনন কেন্দ্র কিংবা সুন্দরবনের করমজল বন্যপ্রাণী সংরক্ষণ কেন্দ্রে নিয়ে অবমুক্ত করা হোক। একটি মাংসাশী হিংস্র প্রাণিকে কোনো অবস্থাতেই একটি লোকালয়ের দর্শনীয় স্থানে রাখা যৌক্তিক নয়। এতে একদিকে যেমন মানুষ শিরক করার মতো পাপাচারে লিপ্ত হবে, অন্যদিকে ফাতেমার মতো অনাথ পথশিশুরা কুমিরের খাদ্যবস্তুতে পরিনত হবে। আমার অনুসন্ধান করা এই ভেতরের গল্পটা দেশের ৯৯% মানুষ জানে না। অনেকেই ভক্তি সহকারে এই কুমিরের কাছে মানত করে। হযরত খানজাহান আলীর (রহ.) প্রতিনিধি মনে করে। সরল বিশ্বাসী ধর্মভীরু এসব মানুষকে জেনেশুনে ধোঁকা দেওয়ার অধিকার কারো নেই।
তাছাড়া হযরত খানজাহান আলীর (রহ.) আমলে ছেড়ে দেওয়া কুমির কালাপাহাড়, ধলাপাহাড় এবং তাদের বংশধরেরা কখনো কাউকে আক্রমণ করার ইতিহাস নেই। তবে ভারত থেকে আনা এই কুমিরটি বারবার হিংস্র আচরণ করছে। চলতি বছরের এপ্রিল মাসে এই কুমিরের আক্রমণে একটি কুকুর মারা যাওয়ার দৃশ্য দেশজুড়ে ভাইরাল হয়েছিল। এর আগে ২০২৪ সালের মাঝামাঝি সময়ে দিঘির প্রধান ঘাটে সেখাম আলী নামের এক বৃদ্ধ কুমিরের আক্রমণে গুরুতর আহত হয়েছিলেন। ২০২০ সালের দিকে এক কিশোরকে আক্রমণ করেছিল হিংস্র স্বভাবের মাদ্রাজি এই কুমির। ২০০৯ সালে মাজারে মানত করতে আসা এক মায়ের হাত থেকে তার শিশু সন্তানকে প্রথম এই কুমিরে টেনে নিয়ে গিয়েছিল। পরে দিঘির মাঝখানে শিশুটির মৃতদেহ ভেসে ওঠে। গতকাল এর সর্বশেষ আক্রমণের শিকার হয়ে মৃত্যুবরণ করে মাজারে আশ্রিত ৭ বছরের অনাথ পথশিশু ফাতেমা আক্তার। কুমিরের আক্রমণে একের পর এক এসব হতাহতের ঘটনা ঘটলেও দর্শনার্থীদের নিরাপত্তার জন্য মাজার কর্তৃপক্ষ কোনো ব্যবস্থা নেয়নি। কারণ, তাদের কাছে মাজার আর কুমির ব্যবসাই ছিল মুখ্য। পরিশেষে বলতে চাই- ভন্ডদের মাজার ব্যবসা টিকিয়ে রাখার স্বার্থে সেখানে ভিনদেশ থেকে কিনে আনা কুমির পালনের কোনো প্রয়োজন নেই। অনাথ ফাতেমার জীবন বিসর্জনের বিনিময়ে অন্তত মাজারের কুমির ব্যবসা চিরতরে বন্ধ হোক। #
❑ লেখাঃ আরিফ আহমেদ মুন্না
সাংবাদিক, কলামিস্ট, কবি ও সুশাসনকর্মী।
২ জুন, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ।
আজ থেকে প্রায় ৬০০ বছর আগে বাগেরহাটে এসেছিলেন আধ্যাত্মিক সুফি সাধক হযরত খানজাহান আলী (রহ.)। ইসলাম প্রচার করতে এসে তিনি সেখানে সুপেয় পানির অভাবে মসজিদের পাশে খনন করেছিলেন প্রায় ২০০ একর আয়তনের বিশালাকৃতির একটি দিঘি। নিজের অলৌকিক ক্ষমতা প্রদর্শনের মাধ্যমে মানুষকে ধর্মের পথে পরিচালিত করার জন্য তিনি নদীর দুইটি কুমির এনে মিঠা পানির দিঘিতে বন্দী করেছিলেন। ভালোবেসে তাদের নামকরণ করেছিলেন কালাপাহাড় আর ধলাপাহাড় নামে। তাঁর জীবদ্দশায় কুমির দুটি তাঁর হাতের ইশারায় চলতো। তিনি নাম ধরে ডাক দিলে সঙ্গে সঙ্গে দিঘির পানিতে পাহাড়ের মতো তারা ভেসে উঠতো এবং মানুষের কাছে আসতো বলে জনশ্রুতি রয়েছে। কালাপাহাড় পুরুষ এবং ধলাপাহাড় নারী কুমির হওয়ায় তারা দিঘিতে বেশকিছু বাচ্চা জন্ম দিয়েছিল। খানজাহান আলীর (রহ.) মৃত্যুর পরেও সেই কালাপাহাড়, ধলাপাহাড় এবং তাদের বংশধররা কয়েকশো বছর ধরে এই দিঘিতে বেঁচেছিল।
পরবর্তীকালে অযত্ন-অবহেলা, পরিবেশগত ভারসাম্য নষ্ট এবং প্রয়োজনীয় পরিচর্যা আর খাদ্যের অভাবে কালাপাহাড়, ধলাপাহাড় এবং তাদের বাচ্চা কুমিরগুলো একে একে মারা যেতে শুরু করে। চলতি শতাব্দীর শুরুর দিকে কুমিরশূন্য হয়ে পড়ে ঐতিহাসিক খানজাহান আলীর দিঘি। এতে মাজার ব্যবসায় ধ্বস নামে। পরে ২০০৫ সালে ভারত থেকে নতুন ৩টি কুমির কিনে এনে খানজাহান আলীর দিঘিতে অবমুক্ত করা হয়। ঐতিহ্যের নামে মূলতঃ মাজার ব্যবসা টিকিয়ে রাখার জন্যেই নেওয়া হয় এই উদ্যোগ। কিন্তু পরিচর্যার অভাব ও খাদ্য সংকটে ২টি কুমির মারা যায়। দিঘিতে অবশিষ্ট একটা কুমির টিকে থাকে। এই কুমিরের সাথে হযরত খানজাহান আলী (রহ.), তাঁর বংশধর কিংবা তাঁর আধ্যাত্মিকতার কোনো সম্পর্ক নেই। তবে মাজার ব্যবসায়ী একদল ভন্ডের সাথে এই কুমিরের গভীর অর্থনৈতিক সম্পর্ক রয়েছে।
আগত ভক্ত মাজার পূজারীরা আল্লাহর রহমত কামনা এবং তাদের মনোবাসনা পূর্ণ করার আশায় কুমিরের জন্য টাকা দেয়, খাবার দেয়। খাবার হিসেবে মুরগি, ছাগল এবং মাংস কিনে দেয়। তবে সেগুলো কুমিরের ভাগ্যে খুব একটা জোটে না। কুমিরের মুখের সামনে থেকে ঘুরিয়ে এনে সেগুলো আবার আরেক ক্রেতার কাছে বিক্রি করা হয়। মাজারের কাছে গড়ে উঠেছে আগরবাতি, মোমবাতি, তাগা, ফিতা, তাবিজ, কবজ, ঝাড়ফুঁকসহ রকমারি বিভিন্ন ব্যবসা প্রতিষ্ঠান। নানা কৌশলে সেখানে চলছে নানান প্রতারণা আর পর্যটকদের পকেট কাটার প্রতিযোগিতা। মাজার থেকে আয় হওয়া টাকা সিন্ডিকেটের মাধ্যমে ভাগবাটোয়ারা হয়। এই মাজার সিন্ডিকেটের সাথে জড়িত মাজারের খাদেম, স্বেচ্ছাসেবক নামধারী কিছু মাদকসেবী, সরকার দলীয় কতিপয় নেতা, স্থানীয় পুলিশ এবং প্রশাসনের কিছু অসাধু ব্যক্তি।
সরকারের ঊর্ধ্বতন মহল আর বাগেরহাটের জেলা প্রশাসকের কাছে আমার উদাত্ত আহবান এবং বিনীত অনুরোধ থাকবে- দিঘির এই কুমিরকে অনতিবিলম্বে মিরপুরের চিড়িয়াখানা, চট্টগ্রামের কুমির প্রজনন কেন্দ্র কিংবা সুন্দরবনের করমজল বন্যপ্রাণী সংরক্ষণ কেন্দ্রে নিয়ে অবমুক্ত করা হোক। একটি মাংসাশী হিংস্র প্রাণিকে কোনো অবস্থাতেই একটি লোকালয়ের দর্শনীয় স্থানে রাখা যৌক্তিক নয়। এতে একদিকে যেমন মানুষ শিরক করার মতো পাপাচারে লিপ্ত হবে, অন্যদিকে ফাতেমার মতো অনাথ পথশিশুরা কুমিরের খাদ্যবস্তুতে পরিনত হবে। আমার অনুসন্ধান করা এই ভেতরের গল্পটা দেশের ৯৯% মানুষ জানে না। অনেকেই ভক্তি সহকারে এই কুমিরের কাছে মানত করে। হযরত খানজাহান আলীর (রহ.) প্রতিনিধি মনে করে। সরল বিশ্বাসী ধর্মভীরু এসব মানুষকে জেনেশুনে ধোঁকা দেওয়ার অধিকার কারো নেই।
তাছাড়া হযরত খানজাহান আলীর (রহ.) আমলে ছেড়ে দেওয়া কুমির কালাপাহাড়, ধলাপাহাড় এবং তাদের বংশধরেরা কখনো কাউকে আক্রমণ করার ইতিহাস নেই। তবে ভারত থেকে আনা এই কুমিরটি বারবার হিংস্র আচরণ করছে। চলতি বছরের এপ্রিল মাসে এই কুমিরের আক্রমণে একটি কুকুর মারা যাওয়ার দৃশ্য দেশজুড়ে ভাইরাল হয়েছিল। এর আগে ২০২৪ সালের মাঝামাঝি সময়ে দিঘির প্রধান ঘাটে সেখাম আলী নামের এক বৃদ্ধ কুমিরের আক্রমণে গুরুতর আহত হয়েছিলেন। ২০২০ সালের দিকে এক কিশোরকে আক্রমণ করেছিল হিংস্র স্বভাবের মাদ্রাজি এই কুমির। ২০০৯ সালে মাজারে মানত করতে আসা এক মায়ের হাত থেকে তার শিশু সন্তানকে প্রথম এই কুমিরে টেনে নিয়ে গিয়েছিল। পরে দিঘির মাঝখানে শিশুটির মৃতদেহ ভেসে ওঠে। গতকাল এর সর্বশেষ আক্রমণের শিকার হয়ে মৃত্যুবরণ করে মাজারে আশ্রিত ৭ বছরের অনাথ পথশিশু ফাতেমা আক্তার। কুমিরের আক্রমণে একের পর এক এসব হতাহতের ঘটনা ঘটলেও দর্শনার্থীদের নিরাপত্তার জন্য মাজার কর্তৃপক্ষ কোনো ব্যবস্থা নেয়নি। কারণ, তাদের কাছে মাজার আর কুমির ব্যবসাই ছিল মুখ্য। পরিশেষে বলতে চাই- ভন্ডদের মাজার ব্যবসা টিকিয়ে রাখার স্বার্থে সেখানে ভিনদেশ থেকে কিনে আনা কুমির পালনের কোনো প্রয়োজন নেই। অনাথ ফাতেমার জীবন বিসর্জনের বিনিময়ে অন্তত মাজারের কুমির ব্যবসা চিরতরে বন্ধ হোক। #
❑ লেখাঃ আরিফ আহমেদ মুন্না
সাংবাদিক, কলামিস্ট, কবি ও সুশাসনকর্মী।
২ জুন, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ।

০১ জুন, ২০২৬ ২০:৪৩
📌 নশ্বর পৃথিবীর এটাই নিয়ম—সব আলোকেই একদিন মহাকালের গর্ভে বিলীন হতে হয়। কিন্তু কিছু জীবন নিভে যাওয়ার পরও তার আভা রেখে যায় শতাব্দীর দিগন্তে। ১ জুন, ২০২৬, সোমবার; ঘড়ির কাঁটায় তখন বিকেল সাড়ে ৩টা। চারদিকের প্রখর রোদ যখন ম্লান হতে শুরু করেছে, ঠিক তখনই রাজধানীর স্কয়ার হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় শেষনিঃশ্বাস ত্যাগ করলেন বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসের অন্যতম চালিকাশক্তি ও অবিসংবাদিত নেতা তোফায়েল আহমেদ। আমাদের মহান মুক্তিসংগ্রামের অন্যতম রূপকার, স্বাধীন বাংলা কেন্দ্রীয় ছাত্রসংগ্রাম পরিষদের মহানায়ক এবং জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের সবচেয়ে বিশ্বস্ত এই সহচরের প্রস্থান কেবল একজন প্রবীণ রাজনীতিবিদের বিদায় নয়; বরং এটি রক্তস্নাত স্বাধীন বাংলাদেশ অভ্যুদয়ের একটি জীবন্ত ও প্রত্যক্ষ অধ্যায়ের মহাপ্রস্থান। চিরচেনা সেই শুভ্র পায়জামা-পাঞ্জাবি আর কালো মুজিব কোটে আবৃত, হাত নেড়ে উত্তাল জনসমুদ্রকে জাগ্রত করা রাজপথের সেই সিংহপুরুষ আর কোনোদিন আমাদের মাঝে ফিরবেন না।
এই দূরদর্শী নেতার জীবন ও রাজনীতির পরিক্রমা শুরু হয়েছিল নদী-বিধৌত ভোলার পললভূমিতে। ১৯৪৩ সালের ২২ অক্টোবর ভোলার কোড়ালিয়া গ্রামে এক সম্ভ্রান্ত পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন তিনি। তাঁর পিতা আজাহার আলী ও মাতা ফাতেমা খানম। স্থানীয় প্রাইমারি স্কুল ও খায়েরহাট জুনিয়র হাইস্কুলে প্রাথমিক পাঠ শেষে তিনি বোরহানউদ্দিন হাইস্কুলে লজিং থেকে পড়াশোনা করেন। পরবর্তীতে ভোলা সরকারি হাইস্কুল থেকে ১৯৬০ সালে বিজ্ঞান শাখায় ম্যাট্রিকুলেশন পাস করে তিনি ভর্তি হন বরিশালের ঐতিহ্যবাহী ব্রজমোহন (বিএম) কলেজে। এই কলেজ থেকেই তিনি ১৯৬২ সালে আইএসসি এবং ১৯৬৪ সালে বিএসসি পাস করেন। এরপর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের মৃত্তিকা বিজ্ঞান বিভাগ থেকে ১৯৬৬ সালে তিনি কৃতিত্বের সাথে এমএসসি ডিগ্রি লাভ করেন।
বরিশালের ব্রজমোহন কলেজে অধ্যায়নকালেই তোফায়েল আহমেদের সাংগঠনিক প্রতিভার প্রথম আনুষ্ঠানিক বিকাশ ঘটে। ১৯৬২ সালে তিনি বিপুল ভোটে বিএম কলেজ ছাত্র সংসদের ক্রীড়া সম্পাদক নির্বাচিত হন। এই প্রাতিষ্ঠানিক ভিত্তি অর্জনের পর তাঁর নেতৃত্বের চূড়ান্ত বিকাশ ঘটে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে। ১৯৬৬ সালের ঐতিহাসিক ছয় দফা আন্দোলনে সাহসী ভূমিকা রাখার পর, ১৯৬৬-৬৭ মেয়াদে তিনি তৎকালীন ইকবাল হলের ভিপি নির্বাচিত হন। এরপর, ১৯৬৯ সালের ঐতিহাসিক গণঅভ্যুত্থানের মহাসময়ে তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদের (ডাকসু) ভিপি নির্বাচিত হন এবং তৎকালীন ছাত্রসমাজকে স্বৈরাচারের বিরুদ্ধে এক অপরাজেয় শক্তিতে রূপান্তরিত করেন।
তোফায়েল আহমেদ ও স্বাধীন বাংলাদেশের ইতিহাস যেন একই সুতোয় গাঁথা। তাঁর রাজনীতির প্রথম পাঠ শুরু হয়েছিল ১৯৫৭ সালে, যখন তিনি অষ্টম শ্রেণির ছাত্র। ভোলা সরকারি কলেজ মাঠে এক উপনির্বাচনের জনসভায় প্রধানমন্ত্রী হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী ও তৎকালীন তরুণ আওয়ামী লীগ সাধারণ সম্পাদক শেখ মুজিবুর রহমানের বক্তৃতা তাঁর কিশোর মনে গভীর রেখাপাত করে। সেদিনই তিনি মনে মনে সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন, রাজনীতি করলে এই নেতার রাজনীতিই করবেন। সেই থেকে শুরু করে বাঙালির মুক্তিসনদ ১৯৬৬ সালের ঐতিহাসিক ছয় দফা আন্দোলনে তিনি ছাত্রসমাজকে সংগঠিত করতে অনন্য ভূমিকা রাখেন। ১৯৬৬ সালের মে মাসে বঙ্গবন্ধুর গ্রেপ্তারের পর জুনের ঐতিহাসিক ছয় দফার হরতালে তাঁর সাংগঠনিক দক্ষতা তৎকালীন শীর্ষ নেতৃত্বকে মুগ্ধ করেছিল। ১৯৬৮ সালের স্বৈরাচারী আইয়ুব সরকারের দমনপীড়নের মুখে তিনি কারাবরণ করেন।
তাঁর রাজনৈতিক জীবনের সবচেয়ে প্রদীপ্ত অধ্যায়টি রচিত হয় ১৯৬৯ সালের গণঅভ্যুত্থানে। আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলায় শেখ মুজিবুর রহমানকে যখন ফাঁসি দেয়ার চক্রান্ত চলছিল, তখন পূর্ব পাকিস্তান ছাত্রলীগ, ছাত্র ইউনিয়ন (মতিয়া গ্রুপ), ছাত্র ইউনিয়ন (মেনন গ্রুপ) ও ডাকসুর সমন্বয়ে গঠিত সর্বদলীয় ছাত্রসংগ্রাম পরিষদের আহ্বায়ক হিসেবে তিনি ঐতিহাসিক ১১ দফা আন্দোলনের ডাক দেন। তাঁরই অনলবর্ষী নেতৃত্ব, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়কে কেন্দ্র করে গড়ে ওঠা তীব্র ছাত্র আন্দোলন ও অবিচল গণলড়াইয়ের মুখে আইয়ুব সরকার বঙ্গবন্ধুকে নিঃশর্ত মুক্তি দিতে বাধ্য হয়। ১৯৬৯ সালের ২৩ ফেব্রুয়ারি তৎকালীন রেসকোর্স ময়দানে (বর্তমান সোহরাওয়ার্দী উদ্যান) লাখো জনতার ঐতিহাসিক মহাসমাবেশে সর্বদলীয় ছাত্রসংগ্রাম পরিষদের আহবায়ক ও ডাকসু ভিপি তোফায়েল আহমেদই প্রথম শেখ মুজিবুর রহমানকে 'বঙ্গবন্ধু' উপাধিতে ভূষিত করে বাঙালি জাতির আবেগ ও আকাঙ্ক্ষাকে সুনির্দিষ্ট রূপ দেন।
ছাত্ররাজনীতির এই বিপুল জনপ্রিয়তার ধারাবাহিকতায় ১৯৭০ সালের ঐতিহাসিক সাধারণ নির্বাচনে মাত্র ২৭ বছর বয়সে তোফায়েল আহমেদ পাকিস্তান জাতীয় পরিষদের সদস্য (এমএনএ) নির্বাচিত হয়ে চমক সৃষ্টি করেন, যা তাঁকে তৎকালীন পাকিস্তানের সর্বকনিষ্ঠ জনপ্রতিনিধিদের তালিকায় স্থান করে দেয়। এর ঠিক আগে, ১৯৭০ সালের ১২ নভেম্বরের প্রলয়ঙ্করী ঘূর্ণিঝড়ের পর উপদ্বুত শাহবাজপুর (ভোলা) ও উপকূলীয় অঞ্চলের দুর্গত মানুষের মাঝে বঙ্গবন্ধুর নির্দেশে তাঁর অকুতোভয় ত্রাণ ও পুনর্বাসন তৎপরতা মানুষের হৃদয়ে তাঁর স্থান চিরস্থায়ী করে দেয়। স্বাধীনতার পর, ১৯৭৫ সালে একক জাতীয় দল 'বাংলাদেশ কৃষক শ্রমিক আওয়ামী লীগ' (বাকশাল) গঠিত হলে তোফায়েল আহমেদ এর কেন্দ্রীয় কমিটির সদস্য মনোনীত হন। একই সাথে বাকশালের অন্যতম প্রধান অঙ্গসংগঠন 'জাতীয় যুব লীগ'-এর সাধারণ সম্পাদক হিসেবে দেশের যুব সমাজকে দেশ পুনর্গঠনের কাজে সংগঠিত করার গুরুদায়িত্ব লাভ করেন।
১৯৭১ সালের মহান মুক্তিসংগ্রামে তাঁর রণকৌশল, বীরত্ব ও সাংগঠনিক দক্ষতা ছিল এক চিরন্তন বিস্ময়। স্বাধীন বাংলা কেন্দ্রীয় ছাত্রসংগ্রাম পরিষদের অন্যতম শীর্ষ নেতা হিসেবে তিনি ছিলেন মুক্তিযুদ্ধের অন্যতম চালিকাশক্তি এবং বীরত্বপূর্ণ মুজিব বাহিনীর (বাংলাদেশ লিবারেশন ফোর্সেস - বিএলএফ) অঞ্চলভিত্তিক দায়িত্বপ্রাপ্ত চার প্রধানের অন্যতম। এর পাশাপাশি, যুদ্ধের অন্যতম কৌশলগত ও ঝুঁকিপূর্ণ '১০ নম্বর সেক্টর' (নৌ-কমান্ডো) গঠনে এবং শত্রুপক্ষের মেরুদণ্ড ভেঙে দেওয়া ঐতিহাসিক 'অপারেশন জ্যাকপট'-এর মতো জলযুদ্ধের নেপথ্য রূপকার হিসেবে তাঁর প্রাজ্ঞ রণকৌশল ইতিহাসের অংশ হয়ে আছে। একই সাথে প্রবাসী সরকারের বিশেষ দূত হিসেবে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে, বিশেষ করে ভারতের তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধী এবং বিশ্ব গণমাধ্যমের কাছে বাঙালির ন্যায্য অধিকারের দাবি ও মুক্তিযুদ্ধের সপক্ষে বিশ্বজনমত গঠনে তিনি অনন্য ও বলিষ্ঠ ভূমিকা রেখেছিলেন।
স্বাধীনতার সূর্যোদয়ের পর, ১৯৭২ সালে তিনি জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের রাজনৈতিক সচিবের (প্রতিমন্ত্রীর পদমর্যাদায়) গুরুদায়িত্ব লাভ করেন এবং যুদ্ধবিধ্বস্ত দেশ পুনর্গঠনে বঙ্গবন্ধুর ছায়াসঙ্গী হিসেবে কাজ করেন। ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্টের সেই কালরাত্রির নির্মমতম ট্র্যাজেডির পর যখন দেশের রাজনৈতিক আকাশ ঘন অন্ধকারে ছেয়ে যায়, তখন নেমে আসে তাঁর ওপর অমানুষিক রাষ্ট্রীয় নির্যাতন। সামরিক জান্তার শাসনামলে দীর্ঘ সময় কারাবরণ করতে হলেও তিনি নিজের রাজনৈতিক আদর্শ, সততা ও বঙ্গবন্ধুর চেতনার প্রশ্নে একচুলও আপস করেননি। পরবর্তীতে যখন আওয়ামী লীগ চরম নেতৃত্বসংকট ও বিপর্যয়ের মুখোমুখি হয়েছিল, তখন তৃণমূল পর্যায়ে দলকে টিকিয়ে রাখতে এবং ১৯৮১ সালে জননেত্রী শেখ হাসিনার ঐতিহাসিক স্বদেশ প্রত্যাবর্তনের পর দলের অভ্যন্তরীণ ঐক্য, নীতি নির্ধারণ ও শৃঙ্খলা সুদৃঢ় করতে তিনি অন্যতম জ্যেষ্ঠ অভিভাবকের ভূমিকা পালন করেন। দলের সর্বোচ্চ নীতিনির্ধারণী ফোরাম তথা প্রেসিডিয়ামের সদস্য হিসেবে তিনি দলের সিদ্ধান্ত গ্রহণ ও অভ্যন্তরীণ শৃঙ্খলা বজায় রাখতে সুদীর্ঘকাল অবদান করেছিলেন।
তোফায়েল আহমেদ ছিলেন বাংলাদেশের সংসদীয় রাজনীতির ইতিহাসের এক কিংবদন্তি পুরোধা ব্যক্তিত্ব। নিজ জন্মভূমি ভোলাসহ দেশের বিভিন্ন আসন থেকে তিনি মোট ৯ বার বিপুল ভোটে জাতীয় সংসদের সদস্য (এমপি) নির্বাচিত হন। দেশের প্রতিটি জাতীয় ক্রান্তিলগ্নে সংসদে তাঁর উত্থাপিত জোরালো, যুক্তিপূর্ণ ও দালিলিক উপাত্ত সমৃদ্ধ বক্তব্য সমগ্র জাতিকে দিকনির্দেশনা দিত। এছাড়া বিভিন্ন মেয়াদে তিনি গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকারের বাণিজ্য ও শিল্প মন্ত্রণালয়ের মতো গুরুত্বপূর্ণ ও নীতিনির্ধারণী মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রী হিসেবে অত্যন্ত সফল, দূরদর্শী ও সততার সাথে দায়িত্ব পালন করেছেন। বিশেষ করে ১৯৯৬ সালের মেয়াদে বাণিজ্য ও শিল্পমন্ত্রী থাকাকালীন তাঁরই দূরদর্শী নেতৃত্বে বাংলাদেশের তৈরি পোশাক শিল্প বিশ্ববাজারে এক অভাবনীয় উচ্চতায় পৌঁছায়। ইউরোপীয় ইউনিয়ন থেকে বাংলাদেশের 'জিএসপি সুবিধা' নিশ্চিতকরণ এবং মার্কিন বাজারে কোটা সুবিধা সম্প্রসারণে তাঁর যুগান্তকারী অর্থনৈতিক কূটনীতি দেশের অর্থনীতির ভিতকে বিশ্বমঞ্চে মজবুত করেছিল। এছাড়া বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থার (ডব্লিউটিও) বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সম্মেলনে বাংলাদেশের পক্ষে তাঁর বলিষ্ঠ নেতৃত্ব এবং স্বল্পোন্নত দেশগুলোর (এলডিসি) শুল্কমুক্ত ও কোটামুক্ত বাজার সুবিধা আদায়ে তাঁর কূটনৈতিক প্রজ্ঞা সর্বমহলে প্রশংসিত হয়েছে।
ভোলার মেঠোপথ থেকে উঠে এসে ঢাকার রাজপথ, উত্তাল গণআন্দোলন আর সংসদের মাইক কাঁপানো সেই চিরপরিচিত প্রাজ্ঞ কণ্ঠটি আজ চিরতরে নীরব হয়ে গেল! দলমত নির্বিশেষে দেশের সর্বস্তরের মানুষের কাছে তিনি ছিলেন পরম শ্রদ্ধেয় ও ভালোবাসার 'তোফায়েল ভাই'। তাঁর এই চিরবিদায় দেশের রাজনৈতিক, সামাজিক ও কূটনৈতিক অঙ্গনে এক গভীর ও অপূরণীয় শূন্যতার সৃষ্টি করল, যা সহজে পূরণ হওয়ার নয়। একটি গৌরবময় অধ্যায়ের অবসান হলো সত্য, কিন্তু ইতিহাসের পাতা থেকে তোফায়েল আহমেদের নাম কখনো মুছে যাবার নয়। বাংলাদেশের ইতিহাস যতকাল থাকবে, ততকাল তিনি বেঁচে থাকবেন তাঁর কর্মে, তাঁর দেয়া অমর উপাধিতে এবং লাল-সবুজের পতাকায়।
এই মহান বীর মুক্তিযোদ্ধার স্মৃতির প্রতি গভীরতম শ্রদ্ধা নিবেদন করি এবং তাঁর শোকসন্তপ্ত পরিবার, ভোলার আপামর জনতা ও দেশ-বিদেশে থাকা লাখো অনুসারীর প্রতি গভীর সমবেদনা জানাই। ভালো থাকবেন ওপারে, হে ইতিহাসের মহান সারথি। স্বাধীন বাংলাদেশের মানচিত্র আপনাকে চিরকাল পরম শ্রদ্ধায় বুকে ধারণ করে রাখবে।
📌 বাহাউদ্দিন গোলাপ,
(লেখক: গবেষক, সংস্কৃতি কর্মী। ডেপুটি রেজিস্ট্রার, বরিশাল বিশ্ববিদ্যালয়)
📌 নশ্বর পৃথিবীর এটাই নিয়ম—সব আলোকেই একদিন মহাকালের গর্ভে বিলীন হতে হয়। কিন্তু কিছু জীবন নিভে যাওয়ার পরও তার আভা রেখে যায় শতাব্দীর দিগন্তে। ১ জুন, ২০২৬, সোমবার; ঘড়ির কাঁটায় তখন বিকেল সাড়ে ৩টা। চারদিকের প্রখর রোদ যখন ম্লান হতে শুরু করেছে, ঠিক তখনই রাজধানীর স্কয়ার হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় শেষনিঃশ্বাস ত্যাগ করলেন বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসের অন্যতম চালিকাশক্তি ও অবিসংবাদিত নেতা তোফায়েল আহমেদ। আমাদের মহান মুক্তিসংগ্রামের অন্যতম রূপকার, স্বাধীন বাংলা কেন্দ্রীয় ছাত্রসংগ্রাম পরিষদের মহানায়ক এবং জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের সবচেয়ে বিশ্বস্ত এই সহচরের প্রস্থান কেবল একজন প্রবীণ রাজনীতিবিদের বিদায় নয়; বরং এটি রক্তস্নাত স্বাধীন বাংলাদেশ অভ্যুদয়ের একটি জীবন্ত ও প্রত্যক্ষ অধ্যায়ের মহাপ্রস্থান। চিরচেনা সেই শুভ্র পায়জামা-পাঞ্জাবি আর কালো মুজিব কোটে আবৃত, হাত নেড়ে উত্তাল জনসমুদ্রকে জাগ্রত করা রাজপথের সেই সিংহপুরুষ আর কোনোদিন আমাদের মাঝে ফিরবেন না।
এই দূরদর্শী নেতার জীবন ও রাজনীতির পরিক্রমা শুরু হয়েছিল নদী-বিধৌত ভোলার পললভূমিতে। ১৯৪৩ সালের ২২ অক্টোবর ভোলার কোড়ালিয়া গ্রামে এক সম্ভ্রান্ত পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন তিনি। তাঁর পিতা আজাহার আলী ও মাতা ফাতেমা খানম। স্থানীয় প্রাইমারি স্কুল ও খায়েরহাট জুনিয়র হাইস্কুলে প্রাথমিক পাঠ শেষে তিনি বোরহানউদ্দিন হাইস্কুলে লজিং থেকে পড়াশোনা করেন। পরবর্তীতে ভোলা সরকারি হাইস্কুল থেকে ১৯৬০ সালে বিজ্ঞান শাখায় ম্যাট্রিকুলেশন পাস করে তিনি ভর্তি হন বরিশালের ঐতিহ্যবাহী ব্রজমোহন (বিএম) কলেজে। এই কলেজ থেকেই তিনি ১৯৬২ সালে আইএসসি এবং ১৯৬৪ সালে বিএসসি পাস করেন। এরপর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের মৃত্তিকা বিজ্ঞান বিভাগ থেকে ১৯৬৬ সালে তিনি কৃতিত্বের সাথে এমএসসি ডিগ্রি লাভ করেন।
বরিশালের ব্রজমোহন কলেজে অধ্যায়নকালেই তোফায়েল আহমেদের সাংগঠনিক প্রতিভার প্রথম আনুষ্ঠানিক বিকাশ ঘটে। ১৯৬২ সালে তিনি বিপুল ভোটে বিএম কলেজ ছাত্র সংসদের ক্রীড়া সম্পাদক নির্বাচিত হন। এই প্রাতিষ্ঠানিক ভিত্তি অর্জনের পর তাঁর নেতৃত্বের চূড়ান্ত বিকাশ ঘটে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে। ১৯৬৬ সালের ঐতিহাসিক ছয় দফা আন্দোলনে সাহসী ভূমিকা রাখার পর, ১৯৬৬-৬৭ মেয়াদে তিনি তৎকালীন ইকবাল হলের ভিপি নির্বাচিত হন। এরপর, ১৯৬৯ সালের ঐতিহাসিক গণঅভ্যুত্থানের মহাসময়ে তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদের (ডাকসু) ভিপি নির্বাচিত হন এবং তৎকালীন ছাত্রসমাজকে স্বৈরাচারের বিরুদ্ধে এক অপরাজেয় শক্তিতে রূপান্তরিত করেন।
তোফায়েল আহমেদ ও স্বাধীন বাংলাদেশের ইতিহাস যেন একই সুতোয় গাঁথা। তাঁর রাজনীতির প্রথম পাঠ শুরু হয়েছিল ১৯৫৭ সালে, যখন তিনি অষ্টম শ্রেণির ছাত্র। ভোলা সরকারি কলেজ মাঠে এক উপনির্বাচনের জনসভায় প্রধানমন্ত্রী হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী ও তৎকালীন তরুণ আওয়ামী লীগ সাধারণ সম্পাদক শেখ মুজিবুর রহমানের বক্তৃতা তাঁর কিশোর মনে গভীর রেখাপাত করে। সেদিনই তিনি মনে মনে সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন, রাজনীতি করলে এই নেতার রাজনীতিই করবেন। সেই থেকে শুরু করে বাঙালির মুক্তিসনদ ১৯৬৬ সালের ঐতিহাসিক ছয় দফা আন্দোলনে তিনি ছাত্রসমাজকে সংগঠিত করতে অনন্য ভূমিকা রাখেন। ১৯৬৬ সালের মে মাসে বঙ্গবন্ধুর গ্রেপ্তারের পর জুনের ঐতিহাসিক ছয় দফার হরতালে তাঁর সাংগঠনিক দক্ষতা তৎকালীন শীর্ষ নেতৃত্বকে মুগ্ধ করেছিল। ১৯৬৮ সালের স্বৈরাচারী আইয়ুব সরকারের দমনপীড়নের মুখে তিনি কারাবরণ করেন।
তাঁর রাজনৈতিক জীবনের সবচেয়ে প্রদীপ্ত অধ্যায়টি রচিত হয় ১৯৬৯ সালের গণঅভ্যুত্থানে। আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলায় শেখ মুজিবুর রহমানকে যখন ফাঁসি দেয়ার চক্রান্ত চলছিল, তখন পূর্ব পাকিস্তান ছাত্রলীগ, ছাত্র ইউনিয়ন (মতিয়া গ্রুপ), ছাত্র ইউনিয়ন (মেনন গ্রুপ) ও ডাকসুর সমন্বয়ে গঠিত সর্বদলীয় ছাত্রসংগ্রাম পরিষদের আহ্বায়ক হিসেবে তিনি ঐতিহাসিক ১১ দফা আন্দোলনের ডাক দেন। তাঁরই অনলবর্ষী নেতৃত্ব, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়কে কেন্দ্র করে গড়ে ওঠা তীব্র ছাত্র আন্দোলন ও অবিচল গণলড়াইয়ের মুখে আইয়ুব সরকার বঙ্গবন্ধুকে নিঃশর্ত মুক্তি দিতে বাধ্য হয়। ১৯৬৯ সালের ২৩ ফেব্রুয়ারি তৎকালীন রেসকোর্স ময়দানে (বর্তমান সোহরাওয়ার্দী উদ্যান) লাখো জনতার ঐতিহাসিক মহাসমাবেশে সর্বদলীয় ছাত্রসংগ্রাম পরিষদের আহবায়ক ও ডাকসু ভিপি তোফায়েল আহমেদই প্রথম শেখ মুজিবুর রহমানকে 'বঙ্গবন্ধু' উপাধিতে ভূষিত করে বাঙালি জাতির আবেগ ও আকাঙ্ক্ষাকে সুনির্দিষ্ট রূপ দেন।
ছাত্ররাজনীতির এই বিপুল জনপ্রিয়তার ধারাবাহিকতায় ১৯৭০ সালের ঐতিহাসিক সাধারণ নির্বাচনে মাত্র ২৭ বছর বয়সে তোফায়েল আহমেদ পাকিস্তান জাতীয় পরিষদের সদস্য (এমএনএ) নির্বাচিত হয়ে চমক সৃষ্টি করেন, যা তাঁকে তৎকালীন পাকিস্তানের সর্বকনিষ্ঠ জনপ্রতিনিধিদের তালিকায় স্থান করে দেয়। এর ঠিক আগে, ১৯৭০ সালের ১২ নভেম্বরের প্রলয়ঙ্করী ঘূর্ণিঝড়ের পর উপদ্বুত শাহবাজপুর (ভোলা) ও উপকূলীয় অঞ্চলের দুর্গত মানুষের মাঝে বঙ্গবন্ধুর নির্দেশে তাঁর অকুতোভয় ত্রাণ ও পুনর্বাসন তৎপরতা মানুষের হৃদয়ে তাঁর স্থান চিরস্থায়ী করে দেয়। স্বাধীনতার পর, ১৯৭৫ সালে একক জাতীয় দল 'বাংলাদেশ কৃষক শ্রমিক আওয়ামী লীগ' (বাকশাল) গঠিত হলে তোফায়েল আহমেদ এর কেন্দ্রীয় কমিটির সদস্য মনোনীত হন। একই সাথে বাকশালের অন্যতম প্রধান অঙ্গসংগঠন 'জাতীয় যুব লীগ'-এর সাধারণ সম্পাদক হিসেবে দেশের যুব সমাজকে দেশ পুনর্গঠনের কাজে সংগঠিত করার গুরুদায়িত্ব লাভ করেন।
১৯৭১ সালের মহান মুক্তিসংগ্রামে তাঁর রণকৌশল, বীরত্ব ও সাংগঠনিক দক্ষতা ছিল এক চিরন্তন বিস্ময়। স্বাধীন বাংলা কেন্দ্রীয় ছাত্রসংগ্রাম পরিষদের অন্যতম শীর্ষ নেতা হিসেবে তিনি ছিলেন মুক্তিযুদ্ধের অন্যতম চালিকাশক্তি এবং বীরত্বপূর্ণ মুজিব বাহিনীর (বাংলাদেশ লিবারেশন ফোর্সেস - বিএলএফ) অঞ্চলভিত্তিক দায়িত্বপ্রাপ্ত চার প্রধানের অন্যতম। এর পাশাপাশি, যুদ্ধের অন্যতম কৌশলগত ও ঝুঁকিপূর্ণ '১০ নম্বর সেক্টর' (নৌ-কমান্ডো) গঠনে এবং শত্রুপক্ষের মেরুদণ্ড ভেঙে দেওয়া ঐতিহাসিক 'অপারেশন জ্যাকপট'-এর মতো জলযুদ্ধের নেপথ্য রূপকার হিসেবে তাঁর প্রাজ্ঞ রণকৌশল ইতিহাসের অংশ হয়ে আছে। একই সাথে প্রবাসী সরকারের বিশেষ দূত হিসেবে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে, বিশেষ করে ভারতের তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধী এবং বিশ্ব গণমাধ্যমের কাছে বাঙালির ন্যায্য অধিকারের দাবি ও মুক্তিযুদ্ধের সপক্ষে বিশ্বজনমত গঠনে তিনি অনন্য ও বলিষ্ঠ ভূমিকা রেখেছিলেন।
স্বাধীনতার সূর্যোদয়ের পর, ১৯৭২ সালে তিনি জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের রাজনৈতিক সচিবের (প্রতিমন্ত্রীর পদমর্যাদায়) গুরুদায়িত্ব লাভ করেন এবং যুদ্ধবিধ্বস্ত দেশ পুনর্গঠনে বঙ্গবন্ধুর ছায়াসঙ্গী হিসেবে কাজ করেন। ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্টের সেই কালরাত্রির নির্মমতম ট্র্যাজেডির পর যখন দেশের রাজনৈতিক আকাশ ঘন অন্ধকারে ছেয়ে যায়, তখন নেমে আসে তাঁর ওপর অমানুষিক রাষ্ট্রীয় নির্যাতন। সামরিক জান্তার শাসনামলে দীর্ঘ সময় কারাবরণ করতে হলেও তিনি নিজের রাজনৈতিক আদর্শ, সততা ও বঙ্গবন্ধুর চেতনার প্রশ্নে একচুলও আপস করেননি। পরবর্তীতে যখন আওয়ামী লীগ চরম নেতৃত্বসংকট ও বিপর্যয়ের মুখোমুখি হয়েছিল, তখন তৃণমূল পর্যায়ে দলকে টিকিয়ে রাখতে এবং ১৯৮১ সালে জননেত্রী শেখ হাসিনার ঐতিহাসিক স্বদেশ প্রত্যাবর্তনের পর দলের অভ্যন্তরীণ ঐক্য, নীতি নির্ধারণ ও শৃঙ্খলা সুদৃঢ় করতে তিনি অন্যতম জ্যেষ্ঠ অভিভাবকের ভূমিকা পালন করেন। দলের সর্বোচ্চ নীতিনির্ধারণী ফোরাম তথা প্রেসিডিয়ামের সদস্য হিসেবে তিনি দলের সিদ্ধান্ত গ্রহণ ও অভ্যন্তরীণ শৃঙ্খলা বজায় রাখতে সুদীর্ঘকাল অবদান করেছিলেন।
তোফায়েল আহমেদ ছিলেন বাংলাদেশের সংসদীয় রাজনীতির ইতিহাসের এক কিংবদন্তি পুরোধা ব্যক্তিত্ব। নিজ জন্মভূমি ভোলাসহ দেশের বিভিন্ন আসন থেকে তিনি মোট ৯ বার বিপুল ভোটে জাতীয় সংসদের সদস্য (এমপি) নির্বাচিত হন। দেশের প্রতিটি জাতীয় ক্রান্তিলগ্নে সংসদে তাঁর উত্থাপিত জোরালো, যুক্তিপূর্ণ ও দালিলিক উপাত্ত সমৃদ্ধ বক্তব্য সমগ্র জাতিকে দিকনির্দেশনা দিত। এছাড়া বিভিন্ন মেয়াদে তিনি গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকারের বাণিজ্য ও শিল্প মন্ত্রণালয়ের মতো গুরুত্বপূর্ণ ও নীতিনির্ধারণী মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রী হিসেবে অত্যন্ত সফল, দূরদর্শী ও সততার সাথে দায়িত্ব পালন করেছেন। বিশেষ করে ১৯৯৬ সালের মেয়াদে বাণিজ্য ও শিল্পমন্ত্রী থাকাকালীন তাঁরই দূরদর্শী নেতৃত্বে বাংলাদেশের তৈরি পোশাক শিল্প বিশ্ববাজারে এক অভাবনীয় উচ্চতায় পৌঁছায়। ইউরোপীয় ইউনিয়ন থেকে বাংলাদেশের 'জিএসপি সুবিধা' নিশ্চিতকরণ এবং মার্কিন বাজারে কোটা সুবিধা সম্প্রসারণে তাঁর যুগান্তকারী অর্থনৈতিক কূটনীতি দেশের অর্থনীতির ভিতকে বিশ্বমঞ্চে মজবুত করেছিল। এছাড়া বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থার (ডব্লিউটিও) বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সম্মেলনে বাংলাদেশের পক্ষে তাঁর বলিষ্ঠ নেতৃত্ব এবং স্বল্পোন্নত দেশগুলোর (এলডিসি) শুল্কমুক্ত ও কোটামুক্ত বাজার সুবিধা আদায়ে তাঁর কূটনৈতিক প্রজ্ঞা সর্বমহলে প্রশংসিত হয়েছে।
ভোলার মেঠোপথ থেকে উঠে এসে ঢাকার রাজপথ, উত্তাল গণআন্দোলন আর সংসদের মাইক কাঁপানো সেই চিরপরিচিত প্রাজ্ঞ কণ্ঠটি আজ চিরতরে নীরব হয়ে গেল! দলমত নির্বিশেষে দেশের সর্বস্তরের মানুষের কাছে তিনি ছিলেন পরম শ্রদ্ধেয় ও ভালোবাসার 'তোফায়েল ভাই'। তাঁর এই চিরবিদায় দেশের রাজনৈতিক, সামাজিক ও কূটনৈতিক অঙ্গনে এক গভীর ও অপূরণীয় শূন্যতার সৃষ্টি করল, যা সহজে পূরণ হওয়ার নয়। একটি গৌরবময় অধ্যায়ের অবসান হলো সত্য, কিন্তু ইতিহাসের পাতা থেকে তোফায়েল আহমেদের নাম কখনো মুছে যাবার নয়। বাংলাদেশের ইতিহাস যতকাল থাকবে, ততকাল তিনি বেঁচে থাকবেন তাঁর কর্মে, তাঁর দেয়া অমর উপাধিতে এবং লাল-সবুজের পতাকায়।
এই মহান বীর মুক্তিযোদ্ধার স্মৃতির প্রতি গভীরতম শ্রদ্ধা নিবেদন করি এবং তাঁর শোকসন্তপ্ত পরিবার, ভোলার আপামর জনতা ও দেশ-বিদেশে থাকা লাখো অনুসারীর প্রতি গভীর সমবেদনা জানাই। ভালো থাকবেন ওপারে, হে ইতিহাসের মহান সারথি। স্বাধীন বাংলাদেশের মানচিত্র আপনাকে চিরকাল পরম শ্রদ্ধায় বুকে ধারণ করে রাখবে।
📌 বাহাউদ্দিন গোলাপ,
(লেখক: গবেষক, সংস্কৃতি কর্মী। ডেপুটি রেজিস্ট্রার, বরিশাল বিশ্ববিদ্যালয়)

০১ মে, ২০২৬ ১৫:৫৭
১৮৮৬ সালের মে মাসে শিকাগোর হে মার্কেটে যখন শ্রমিকেরা আট ঘণ্টা কর্মঘণ্টার দাবিতে রক্ত দিচ্ছিলেন, তার ঠিক ১৪০ বছর পর ২০২৬ সালের এই মে দিবসেও বাংলাদেশের দক্ষিণাঞ্চলের মান্তা জনপদে শ্রমের সংজ্ঞাটি আজও আদিম ও অমানবিক রয়ে গেছে। মেঘনার মোহনায় ভোরের সূর্য যখন উঁকি দেয়, ভোলার দড়ির চর বা বরিশালের মেহেন্দীগঞ্জে কোনো কারখানার সাইরেন বাজে না; বাজে কেবল বৈঠার শব্দ আর লোনা জলের ঝাপটা। মান্তাদের কাছে 'গৃহ' মানে এক চিলতে চলন্ত নৌকা, আর 'শ্রম' মানে উত্তাল জলধির বুকে প্রাণের বাজি। আধুনিক অর্থনীতির এই অনিশ্চিত শ্রেণিটি ঘাম আর জল এক করে দিলেও জাতীয় জিডিপিতে মৎস্য খাতের ৩.৫০ শতাংশের বেশি অবদানে তাদের হাড়ভাঙা খাটুনির স্বীকৃতি আজও মেলেনি। মূলত 'কাঠামোগত বর্জন' এই জনপদকে নাগরিকত্বের মূল স্রোত থেকে বিচ্ছিন্ন এক ‘অদৃশ্য সর্বহারা’য় পরিণত করে রেখেছে।
এই ব্রাত্য জনপদের শ্রম-শোষণের ধরনটি এক জটিল ও নিষ্ঠুর অর্থনৈতিক সমীকরণ। বরিশাল, পটুয়াখালী ও ভোলার মেঘনা অববাহিকায় ভাসমান প্রায় ৪০ হাজার মানুষের এই বিশাল গোষ্ঠী মূলত ‘দাদন’ প্রথার এক অদৃশ্য শিকলে বন্দী। এক ভয়াবহ গাণিতিক বৈষম্যের শিকার এই মানুষগুলো—শহরের ডাইনিং টেবিলে যে মৎস্য সম্পদের বাজারমূল্য প্রতি কেজি এক হাজার টাকা, স্থানীয় প্রভাবশালী ও মধ্যস্বত্বভোগীদের রাজনৈতিক-প্রশাসনিক পৃষ্ঠপোষকতায় গড়ে ওঠা এই শোষণচক্রে মান্তা শ্রমিক সেই মাছের বিনিময়ে পান বড়জোর একশো থেকে দেড়শো টাকা। এই ‘ঋণ-দাসত্ব’ আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থার (ILO) ২৯ নম্বর কনভেনশনের সরাসরি লঙ্ঘন। অথচ বাংলাদেশ শ্রম আইন ২০০৬-এর ২(৬৫) ধারায় ‘শ্রমিক’-এর যে সংজ্ঞা দেওয়া হয়েছে, তা মূলত প্রাতিষ্ঠানিক কল-কারখানা কেন্দ্রিক। এই আইনি শূন্যতার সুযোগে মান্তারা রাষ্ট্রীয়ভাবে ‘শ্রমিক’ হিসেবে স্বীকৃত নন; ফলে পেশাগত দুর্ঘটনা বা অসুস্থতায় কোনো বিমা বা আইনি সুরক্ষা তাদের ধরাছোঁয়ার বাইরে থেকে যায়।
বিশ্ব প্রেক্ষাপটে ভিয়েতনামের হালং বে কিংবা কম্বোডিয়ার টনলে স্যাপ হ্রদের ভাসমান জনগোষ্ঠীর সাথে মান্তাদের জীবনচিত্রের মিল থাকলেও, ‘তথ্যগত দারিদ্র্য’ ও ডিজিটাল বৈষম্যের নিরিখে বাংলাদেশের মান্তারা অনেক বেশি পিছিয়ে। এই শ্রমের সবচেয়ে নিগৃহীত অংশ হলো নারী ও শিশুরা। নৌকার এক প্রান্তে মা যখন রান্নায় ব্যস্ত, অন্য প্রান্তে বাবা তখন জাল সারছেন, আর শিশুটি বৈঠা হাতে শিখছে জীবনের ভারসাম্য। কিন্তু এই বিশাল 'সেবামূলক শ্রমে' নারীর অবদানের কোনো অর্থনৈতিক মূল্যায়ন বা সামাজিক স্বীকৃতি নেই। মান্তা পরিবারের রহিমা আক্ষেপ করে বলেন, "নদী যেমন মাছ দেয়, তেমনি আমাগো পরিচয়ও ভাসাইয়া নিয়া যায়।" রহিমা ও কালামের সন্তান আকাশের চোখে স্বপ্ন—সে ওপাড়ে গড়ে ওঠা রঙিন দালানের স্কুলে যাবে। কিন্তু স্থায়ী ঠিকানার দালিলিক প্রমাণ না থাকায় তার শিক্ষার অধিকার আজ মেঘনার ঘোলা জলেই নিমজ্জিত। যেখানে পৃথিবী আজ চতুর্থ শিল্প বিপ্লব ও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার (AI) জোয়ারে ভাসছে, সেখানে আকাশের মতো হাজারো মান্তা শিশু এক নিষ্ঠুর ‘ডিজিটাল বর্ণপ্রথার’ শিকার হয়ে মৌলিক বর্ণমালার আলো থেকেও বঞ্চিত হচ্ছে।
বর্তমান প্রেক্ষাপটে মান্তাদের এই সংকট আজ জলবায়ু পরিবর্তনের এক করুণ উপাখ্যান। সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধি আর নদীবক্ষে লোনা জলের অনুপ্রবেশ তাদের ঐতিহ্যবাহী মৎস্য শিকারের কৌশলকে অকেজো করে দিচ্ছে, যা তাদের ‘জলবায়ু উদ্বাস্তু’ হিসেবে বিশ্ব পরিমণ্ডলে পরিচিতি দিচ্ছে। বিস্ময়কর বাস্তবতা হলো, যখন মা-ইলিশ রক্ষার সরকারি নিষেধাজ্ঞা জারি হয়, তখন ডাঙ্গার জেলেরা সামাজিক সহায়তার আওতায় এলেও ঠিকানাহীন মান্তারা প্রায়ই ‘ব্যুরোক্রেটিক প্যারালাইসিস’ বা আমলাতান্ত্রিক উদাসীনতার কারণে তালিকা থেকে বাদ পড়েন। রপ্তানিমুখী মৎস্য শিল্পের মূল জোগানদাতা হয়েও তারা থেকে যাচ্ছেন সামাজিক সুরক্ষা জালের বাইরে। তাদের আহরিত সম্পদ বিশ্ববাজারে বৈদেশিক মুদ্রা আনলেও, বিনিময়ে তারা পাচ্ছেন কেবল দীর্ঘস্থায়ী অবহেলা। কেবল অর্থনৈতিক নয়, এই প্রান্তিক জনপদ আজ এক গভীর সাংস্কৃতিক অবলুপ্তির মুখোমুখি। নদী দখল এবং আধুনিক মৎস্য শিল্পের যান্ত্রিক চাপে মান্তাদের কয়েক প্রজন্মের ঐতিহ্যবাহী ভাসমান সংস্কৃতি আজ বিলুপ্তপ্রায়। তবে এই উত্তরণের পথে তাদের নাগরিক অধিকার নিশ্চিত করার পাশাপাশি তাদের অনন্য সাংস্কৃতিক স্বাতন্ত্র্য রক্ষা করাও রাষ্ট্রের জন্য এক বড় চ্যালেঞ্জ।
মান্তা ও দক্ষিণ উপকূলের এই শ্রমজীবীদের 'জলমগ্ন শ্রম'-কে মূলধারার অর্থনীতিতে স্বীকৃতি দেওয়া এখন সময়ের দাবি। আন্তর্জাতিক মানদণ্ড অনুযায়ী তাদের জন্য সুনির্দিষ্ট ‘ফিশারিজ লেবার কোড’ প্রণয়ন, স্যাটেলাইট কানেক্টিভিটি নির্ভর ডিজিটাল প্রযুক্তির মাধ্যমে দুর্গম জলসীমায় মোবাইল ব্যাংকিং সেবা এবং পৈতৃক পরিচয় নির্বিশেষে ‘ভাসমান এনআইডি কার্ড’ বা বিশেষ ভোটার তালিকার পূর্ণ নিশ্চয়তা প্রদান করা অপরিহার্য। জাতিসংঘের টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা (SDG)-এর মূলমন্ত্র ‘কাউকে পেছনে ফেলে নয়’—এই অঙ্গীকার রক্ষা করতে হলে মান্তাদের জীবনের নৌকাকে কেবল মাছ ধরার যন্ত্র নয়, বরং অফলাইন লার্নিং মডিউল সমৃদ্ধ একটি 'ভাসমান লার্নিং সেন্টারে' রূপান্তর করতে হবে। নদী যেমন তার সবটুকু উজাড় করে দিয়ে সাগরে মেশে, তেমনি মান্তাদের এই ব্রাত্য জীবনকেও নাগরিকত্বের মোহনায় ফিরিয়ে আনা রাষ্ট্রের নৈতিক ও সাংবিধানিক অঙ্গীকার হওয়া উচিত। ডাঙ্গার মানুষ আর জলের মানুষের মধ্যকার এই অদৃশ্য প্রাচীর মুছে গিয়ে যেদিন আকাশের মতো হাজারো মান্তা শিশুর শিক্ষার অধিকার আর শ্রমিকের ন্যায্য হিস্যা নিশ্চিত হবে, সেদিনই প্রকৃত অর্থে সার্থক হবে শিকাগোর সেই রক্তভেজা মে দিবসের বৈশ্বিক চেতনা।

বাহাউদ্দিন গোলাপ
(লেখক: গবেষক, সংস্কৃতি কর্মী। ডেপুটি রেজিস্ট্রার, বরিশাল বিশ্ববিদ্যালয়)
১৮৮৬ সালের মে মাসে শিকাগোর হে মার্কেটে যখন শ্রমিকেরা আট ঘণ্টা কর্মঘণ্টার দাবিতে রক্ত দিচ্ছিলেন, তার ঠিক ১৪০ বছর পর ২০২৬ সালের এই মে দিবসেও বাংলাদেশের দক্ষিণাঞ্চলের মান্তা জনপদে শ্রমের সংজ্ঞাটি আজও আদিম ও অমানবিক রয়ে গেছে। মেঘনার মোহনায় ভোরের সূর্য যখন উঁকি দেয়, ভোলার দড়ির চর বা বরিশালের মেহেন্দীগঞ্জে কোনো কারখানার সাইরেন বাজে না; বাজে কেবল বৈঠার শব্দ আর লোনা জলের ঝাপটা। মান্তাদের কাছে 'গৃহ' মানে এক চিলতে চলন্ত নৌকা, আর 'শ্রম' মানে উত্তাল জলধির বুকে প্রাণের বাজি। আধুনিক অর্থনীতির এই অনিশ্চিত শ্রেণিটি ঘাম আর জল এক করে দিলেও জাতীয় জিডিপিতে মৎস্য খাতের ৩.৫০ শতাংশের বেশি অবদানে তাদের হাড়ভাঙা খাটুনির স্বীকৃতি আজও মেলেনি। মূলত 'কাঠামোগত বর্জন' এই জনপদকে নাগরিকত্বের মূল স্রোত থেকে বিচ্ছিন্ন এক ‘অদৃশ্য সর্বহারা’য় পরিণত করে রেখেছে।
এই ব্রাত্য জনপদের শ্রম-শোষণের ধরনটি এক জটিল ও নিষ্ঠুর অর্থনৈতিক সমীকরণ। বরিশাল, পটুয়াখালী ও ভোলার মেঘনা অববাহিকায় ভাসমান প্রায় ৪০ হাজার মানুষের এই বিশাল গোষ্ঠী মূলত ‘দাদন’ প্রথার এক অদৃশ্য শিকলে বন্দী। এক ভয়াবহ গাণিতিক বৈষম্যের শিকার এই মানুষগুলো—শহরের ডাইনিং টেবিলে যে মৎস্য সম্পদের বাজারমূল্য প্রতি কেজি এক হাজার টাকা, স্থানীয় প্রভাবশালী ও মধ্যস্বত্বভোগীদের রাজনৈতিক-প্রশাসনিক পৃষ্ঠপোষকতায় গড়ে ওঠা এই শোষণচক্রে মান্তা শ্রমিক সেই মাছের বিনিময়ে পান বড়জোর একশো থেকে দেড়শো টাকা। এই ‘ঋণ-দাসত্ব’ আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থার (ILO) ২৯ নম্বর কনভেনশনের সরাসরি লঙ্ঘন। অথচ বাংলাদেশ শ্রম আইন ২০০৬-এর ২(৬৫) ধারায় ‘শ্রমিক’-এর যে সংজ্ঞা দেওয়া হয়েছে, তা মূলত প্রাতিষ্ঠানিক কল-কারখানা কেন্দ্রিক। এই আইনি শূন্যতার সুযোগে মান্তারা রাষ্ট্রীয়ভাবে ‘শ্রমিক’ হিসেবে স্বীকৃত নন; ফলে পেশাগত দুর্ঘটনা বা অসুস্থতায় কোনো বিমা বা আইনি সুরক্ষা তাদের ধরাছোঁয়ার বাইরে থেকে যায়।
বিশ্ব প্রেক্ষাপটে ভিয়েতনামের হালং বে কিংবা কম্বোডিয়ার টনলে স্যাপ হ্রদের ভাসমান জনগোষ্ঠীর সাথে মান্তাদের জীবনচিত্রের মিল থাকলেও, ‘তথ্যগত দারিদ্র্য’ ও ডিজিটাল বৈষম্যের নিরিখে বাংলাদেশের মান্তারা অনেক বেশি পিছিয়ে। এই শ্রমের সবচেয়ে নিগৃহীত অংশ হলো নারী ও শিশুরা। নৌকার এক প্রান্তে মা যখন রান্নায় ব্যস্ত, অন্য প্রান্তে বাবা তখন জাল সারছেন, আর শিশুটি বৈঠা হাতে শিখছে জীবনের ভারসাম্য। কিন্তু এই বিশাল 'সেবামূলক শ্রমে' নারীর অবদানের কোনো অর্থনৈতিক মূল্যায়ন বা সামাজিক স্বীকৃতি নেই। মান্তা পরিবারের রহিমা আক্ষেপ করে বলেন, "নদী যেমন মাছ দেয়, তেমনি আমাগো পরিচয়ও ভাসাইয়া নিয়া যায়।" রহিমা ও কালামের সন্তান আকাশের চোখে স্বপ্ন—সে ওপাড়ে গড়ে ওঠা রঙিন দালানের স্কুলে যাবে। কিন্তু স্থায়ী ঠিকানার দালিলিক প্রমাণ না থাকায় তার শিক্ষার অধিকার আজ মেঘনার ঘোলা জলেই নিমজ্জিত। যেখানে পৃথিবী আজ চতুর্থ শিল্প বিপ্লব ও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার (AI) জোয়ারে ভাসছে, সেখানে আকাশের মতো হাজারো মান্তা শিশু এক নিষ্ঠুর ‘ডিজিটাল বর্ণপ্রথার’ শিকার হয়ে মৌলিক বর্ণমালার আলো থেকেও বঞ্চিত হচ্ছে।
বর্তমান প্রেক্ষাপটে মান্তাদের এই সংকট আজ জলবায়ু পরিবর্তনের এক করুণ উপাখ্যান। সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধি আর নদীবক্ষে লোনা জলের অনুপ্রবেশ তাদের ঐতিহ্যবাহী মৎস্য শিকারের কৌশলকে অকেজো করে দিচ্ছে, যা তাদের ‘জলবায়ু উদ্বাস্তু’ হিসেবে বিশ্ব পরিমণ্ডলে পরিচিতি দিচ্ছে। বিস্ময়কর বাস্তবতা হলো, যখন মা-ইলিশ রক্ষার সরকারি নিষেধাজ্ঞা জারি হয়, তখন ডাঙ্গার জেলেরা সামাজিক সহায়তার আওতায় এলেও ঠিকানাহীন মান্তারা প্রায়ই ‘ব্যুরোক্রেটিক প্যারালাইসিস’ বা আমলাতান্ত্রিক উদাসীনতার কারণে তালিকা থেকে বাদ পড়েন। রপ্তানিমুখী মৎস্য শিল্পের মূল জোগানদাতা হয়েও তারা থেকে যাচ্ছেন সামাজিক সুরক্ষা জালের বাইরে। তাদের আহরিত সম্পদ বিশ্ববাজারে বৈদেশিক মুদ্রা আনলেও, বিনিময়ে তারা পাচ্ছেন কেবল দীর্ঘস্থায়ী অবহেলা। কেবল অর্থনৈতিক নয়, এই প্রান্তিক জনপদ আজ এক গভীর সাংস্কৃতিক অবলুপ্তির মুখোমুখি। নদী দখল এবং আধুনিক মৎস্য শিল্পের যান্ত্রিক চাপে মান্তাদের কয়েক প্রজন্মের ঐতিহ্যবাহী ভাসমান সংস্কৃতি আজ বিলুপ্তপ্রায়। তবে এই উত্তরণের পথে তাদের নাগরিক অধিকার নিশ্চিত করার পাশাপাশি তাদের অনন্য সাংস্কৃতিক স্বাতন্ত্র্য রক্ষা করাও রাষ্ট্রের জন্য এক বড় চ্যালেঞ্জ।
মান্তা ও দক্ষিণ উপকূলের এই শ্রমজীবীদের 'জলমগ্ন শ্রম'-কে মূলধারার অর্থনীতিতে স্বীকৃতি দেওয়া এখন সময়ের দাবি। আন্তর্জাতিক মানদণ্ড অনুযায়ী তাদের জন্য সুনির্দিষ্ট ‘ফিশারিজ লেবার কোড’ প্রণয়ন, স্যাটেলাইট কানেক্টিভিটি নির্ভর ডিজিটাল প্রযুক্তির মাধ্যমে দুর্গম জলসীমায় মোবাইল ব্যাংকিং সেবা এবং পৈতৃক পরিচয় নির্বিশেষে ‘ভাসমান এনআইডি কার্ড’ বা বিশেষ ভোটার তালিকার পূর্ণ নিশ্চয়তা প্রদান করা অপরিহার্য। জাতিসংঘের টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা (SDG)-এর মূলমন্ত্র ‘কাউকে পেছনে ফেলে নয়’—এই অঙ্গীকার রক্ষা করতে হলে মান্তাদের জীবনের নৌকাকে কেবল মাছ ধরার যন্ত্র নয়, বরং অফলাইন লার্নিং মডিউল সমৃদ্ধ একটি 'ভাসমান লার্নিং সেন্টারে' রূপান্তর করতে হবে। নদী যেমন তার সবটুকু উজাড় করে দিয়ে সাগরে মেশে, তেমনি মান্তাদের এই ব্রাত্য জীবনকেও নাগরিকত্বের মোহনায় ফিরিয়ে আনা রাষ্ট্রের নৈতিক ও সাংবিধানিক অঙ্গীকার হওয়া উচিত। ডাঙ্গার মানুষ আর জলের মানুষের মধ্যকার এই অদৃশ্য প্রাচীর মুছে গিয়ে যেদিন আকাশের মতো হাজারো মান্তা শিশুর শিক্ষার অধিকার আর শ্রমিকের ন্যায্য হিস্যা নিশ্চিত হবে, সেদিনই প্রকৃত অর্থে সার্থক হবে শিকাগোর সেই রক্তভেজা মে দিবসের বৈশ্বিক চেতনা।

বাহাউদ্দিন গোলাপ
(লেখক: গবেষক, সংস্কৃতি কর্মী। ডেপুটি রেজিস্ট্রার, বরিশাল বিশ্ববিদ্যালয়)
Google AdSense
This is a demo ad. Your live ads will be displayed here once AdSense is properly configured.
Google AdSense
This is a demo ad. Your live ads will be displayed here once AdSense is properly configured.
১৪ জুন, ২০২৬ ১৯:১৩
১৪ জুন, ২০২৬ ১৮:৪৫
১৪ জুন, ২০২৬ ১৬:২৩
১৪ জুন, ২০২৬ ১৬:০৮