
০১ জুন, ২০২৬ ২০:৪৩
📌 নশ্বর পৃথিবীর এটাই নিয়ম—সব আলোকেই একদিন মহাকালের গর্ভে বিলীন হতে হয়। কিন্তু কিছু জীবন নিভে যাওয়ার পরও তার আভা রেখে যায় শতাব্দীর দিগন্তে। ১ জুন, ২০২৬, সোমবার; ঘড়ির কাঁটায় তখন বিকেল সাড়ে ৩টা। চারদিকের প্রখর রোদ যখন ম্লান হতে শুরু করেছে, ঠিক তখনই রাজধানীর স্কয়ার হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় শেষনিঃশ্বাস ত্যাগ করলেন বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসের অন্যতম চালিকাশক্তি ও অবিসংবাদিত নেতা তোফায়েল আহমেদ। আমাদের মহান মুক্তিসংগ্রামের অন্যতম রূপকার, স্বাধীন বাংলা কেন্দ্রীয় ছাত্রসংগ্রাম পরিষদের মহানায়ক এবং জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের সবচেয়ে বিশ্বস্ত এই সহচরের প্রস্থান কেবল একজন প্রবীণ রাজনীতিবিদের বিদায় নয়; বরং এটি রক্তস্নাত স্বাধীন বাংলাদেশ অভ্যুদয়ের একটি জীবন্ত ও প্রত্যক্ষ অধ্যায়ের মহাপ্রস্থান। চিরচেনা সেই শুভ্র পায়জামা-পাঞ্জাবি আর কালো মুজিব কোটে আবৃত, হাত নেড়ে উত্তাল জনসমুদ্রকে জাগ্রত করা রাজপথের সেই সিংহপুরুষ আর কোনোদিন আমাদের মাঝে ফিরবেন না।
এই দূরদর্শী নেতার জীবন ও রাজনীতির পরিক্রমা শুরু হয়েছিল নদী-বিধৌত ভোলার পললভূমিতে। ১৯৪৩ সালের ২২ অক্টোবর ভোলার কোড়ালিয়া গ্রামে এক সম্ভ্রান্ত পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন তিনি। তাঁর পিতা আজাহার আলী ও মাতা ফাতেমা খানম। স্থানীয় প্রাইমারি স্কুল ও খায়েরহাট জুনিয়র হাইস্কুলে প্রাথমিক পাঠ শেষে তিনি বোরহানউদ্দিন হাইস্কুলে লজিং থেকে পড়াশোনা করেন। পরবর্তীতে ভোলা সরকারি হাইস্কুল থেকে ১৯৬০ সালে বিজ্ঞান শাখায় ম্যাট্রিকুলেশন পাস করে তিনি ভর্তি হন বরিশালের ঐতিহ্যবাহী ব্রজমোহন (বিএম) কলেজে। এই কলেজ থেকেই তিনি ১৯৬২ সালে আইএসসি এবং ১৯৬৪ সালে বিএসসি পাস করেন। এরপর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের মৃত্তিকা বিজ্ঞান বিভাগ থেকে ১৯৬৬ সালে তিনি কৃতিত্বের সাথে এমএসসি ডিগ্রি লাভ করেন।
বরিশালের ব্রজমোহন কলেজে অধ্যায়নকালেই তোফায়েল আহমেদের সাংগঠনিক প্রতিভার প্রথম আনুষ্ঠানিক বিকাশ ঘটে। ১৯৬২ সালে তিনি বিপুল ভোটে বিএম কলেজ ছাত্র সংসদের ক্রীড়া সম্পাদক নির্বাচিত হন। এই প্রাতিষ্ঠানিক ভিত্তি অর্জনের পর তাঁর নেতৃত্বের চূড়ান্ত বিকাশ ঘটে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে। ১৯৬৬ সালের ঐতিহাসিক ছয় দফা আন্দোলনে সাহসী ভূমিকা রাখার পর, ১৯৬৬-৬৭ মেয়াদে তিনি তৎকালীন ইকবাল হলের ভিপি নির্বাচিত হন। এরপর, ১৯৬৯ সালের ঐতিহাসিক গণঅভ্যুত্থানের মহাসময়ে তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদের (ডাকসু) ভিপি নির্বাচিত হন এবং তৎকালীন ছাত্রসমাজকে স্বৈরাচারের বিরুদ্ধে এক অপরাজেয় শক্তিতে রূপান্তরিত করেন।
তোফায়েল আহমেদ ও স্বাধীন বাংলাদেশের ইতিহাস যেন একই সুতোয় গাঁথা। তাঁর রাজনীতির প্রথম পাঠ শুরু হয়েছিল ১৯৫৭ সালে, যখন তিনি অষ্টম শ্রেণির ছাত্র। ভোলা সরকারি কলেজ মাঠে এক উপনির্বাচনের জনসভায় প্রধানমন্ত্রী হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী ও তৎকালীন তরুণ আওয়ামী লীগ সাধারণ সম্পাদক শেখ মুজিবুর রহমানের বক্তৃতা তাঁর কিশোর মনে গভীর রেখাপাত করে। সেদিনই তিনি মনে মনে সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন, রাজনীতি করলে এই নেতার রাজনীতিই করবেন। সেই থেকে শুরু করে বাঙালির মুক্তিসনদ ১৯৬৬ সালের ঐতিহাসিক ছয় দফা আন্দোলনে তিনি ছাত্রসমাজকে সংগঠিত করতে অনন্য ভূমিকা রাখেন। ১৯৬৬ সালের মে মাসে বঙ্গবন্ধুর গ্রেপ্তারের পর জুনের ঐতিহাসিক ছয় দফার হরতালে তাঁর সাংগঠনিক দক্ষতা তৎকালীন শীর্ষ নেতৃত্বকে মুগ্ধ করেছিল। ১৯৬৮ সালের স্বৈরাচারী আইয়ুব সরকারের দমনপীড়নের মুখে তিনি কারাবরণ করেন।
তাঁর রাজনৈতিক জীবনের সবচেয়ে প্রদীপ্ত অধ্যায়টি রচিত হয় ১৯৬৯ সালের গণঅভ্যুত্থানে। আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলায় শেখ মুজিবুর রহমানকে যখন ফাঁসি দেয়ার চক্রান্ত চলছিল, তখন পূর্ব পাকিস্তান ছাত্রলীগ, ছাত্র ইউনিয়ন (মতিয়া গ্রুপ), ছাত্র ইউনিয়ন (মেনন গ্রুপ) ও ডাকসুর সমন্বয়ে গঠিত সর্বদলীয় ছাত্রসংগ্রাম পরিষদের আহ্বায়ক হিসেবে তিনি ঐতিহাসিক ১১ দফা আন্দোলনের ডাক দেন। তাঁরই অনলবর্ষী নেতৃত্ব, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়কে কেন্দ্র করে গড়ে ওঠা তীব্র ছাত্র আন্দোলন ও অবিচল গণলড়াইয়ের মুখে আইয়ুব সরকার বঙ্গবন্ধুকে নিঃশর্ত মুক্তি দিতে বাধ্য হয়। ১৯৬৯ সালের ২৩ ফেব্রুয়ারি তৎকালীন রেসকোর্স ময়দানে (বর্তমান সোহরাওয়ার্দী উদ্যান) লাখো জনতার ঐতিহাসিক মহাসমাবেশে সর্বদলীয় ছাত্রসংগ্রাম পরিষদের আহবায়ক ও ডাকসু ভিপি তোফায়েল আহমেদই প্রথম শেখ মুজিবুর রহমানকে 'বঙ্গবন্ধু' উপাধিতে ভূষিত করে বাঙালি জাতির আবেগ ও আকাঙ্ক্ষাকে সুনির্দিষ্ট রূপ দেন।
ছাত্ররাজনীতির এই বিপুল জনপ্রিয়তার ধারাবাহিকতায় ১৯৭০ সালের ঐতিহাসিক সাধারণ নির্বাচনে মাত্র ২৭ বছর বয়সে তোফায়েল আহমেদ পাকিস্তান জাতীয় পরিষদের সদস্য (এমএনএ) নির্বাচিত হয়ে চমক সৃষ্টি করেন, যা তাঁকে তৎকালীন পাকিস্তানের সর্বকনিষ্ঠ জনপ্রতিনিধিদের তালিকায় স্থান করে দেয়। এর ঠিক আগে, ১৯৭০ সালের ১২ নভেম্বরের প্রলয়ঙ্করী ঘূর্ণিঝড়ের পর উপদ্বুত শাহবাজপুর (ভোলা) ও উপকূলীয় অঞ্চলের দুর্গত মানুষের মাঝে বঙ্গবন্ধুর নির্দেশে তাঁর অকুতোভয় ত্রাণ ও পুনর্বাসন তৎপরতা মানুষের হৃদয়ে তাঁর স্থান চিরস্থায়ী করে দেয়। স্বাধীনতার পর, ১৯৭৫ সালে একক জাতীয় দল 'বাংলাদেশ কৃষক শ্রমিক আওয়ামী লীগ' (বাকশাল) গঠিত হলে তোফায়েল আহমেদ এর কেন্দ্রীয় কমিটির সদস্য মনোনীত হন। একই সাথে বাকশালের অন্যতম প্রধান অঙ্গসংগঠন 'জাতীয় যুব লীগ'-এর সাধারণ সম্পাদক হিসেবে দেশের যুব সমাজকে দেশ পুনর্গঠনের কাজে সংগঠিত করার গুরুদায়িত্ব লাভ করেন।
১৯৭১ সালের মহান মুক্তিসংগ্রামে তাঁর রণকৌশল, বীরত্ব ও সাংগঠনিক দক্ষতা ছিল এক চিরন্তন বিস্ময়। স্বাধীন বাংলা কেন্দ্রীয় ছাত্রসংগ্রাম পরিষদের অন্যতম শীর্ষ নেতা হিসেবে তিনি ছিলেন মুক্তিযুদ্ধের অন্যতম চালিকাশক্তি এবং বীরত্বপূর্ণ মুজিব বাহিনীর (বাংলাদেশ লিবারেশন ফোর্সেস - বিএলএফ) অঞ্চলভিত্তিক দায়িত্বপ্রাপ্ত চার প্রধানের অন্যতম। এর পাশাপাশি, যুদ্ধের অন্যতম কৌশলগত ও ঝুঁকিপূর্ণ '১০ নম্বর সেক্টর' (নৌ-কমান্ডো) গঠনে এবং শত্রুপক্ষের মেরুদণ্ড ভেঙে দেওয়া ঐতিহাসিক 'অপারেশন জ্যাকপট'-এর মতো জলযুদ্ধের নেপথ্য রূপকার হিসেবে তাঁর প্রাজ্ঞ রণকৌশল ইতিহাসের অংশ হয়ে আছে। একই সাথে প্রবাসী সরকারের বিশেষ দূত হিসেবে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে, বিশেষ করে ভারতের তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধী এবং বিশ্ব গণমাধ্যমের কাছে বাঙালির ন্যায্য অধিকারের দাবি ও মুক্তিযুদ্ধের সপক্ষে বিশ্বজনমত গঠনে তিনি অনন্য ও বলিষ্ঠ ভূমিকা রেখেছিলেন।
স্বাধীনতার সূর্যোদয়ের পর, ১৯৭২ সালে তিনি জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের রাজনৈতিক সচিবের (প্রতিমন্ত্রীর পদমর্যাদায়) গুরুদায়িত্ব লাভ করেন এবং যুদ্ধবিধ্বস্ত দেশ পুনর্গঠনে বঙ্গবন্ধুর ছায়াসঙ্গী হিসেবে কাজ করেন। ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্টের সেই কালরাত্রির নির্মমতম ট্র্যাজেডির পর যখন দেশের রাজনৈতিক আকাশ ঘন অন্ধকারে ছেয়ে যায়, তখন নেমে আসে তাঁর ওপর অমানুষিক রাষ্ট্রীয় নির্যাতন। সামরিক জান্তার শাসনামলে দীর্ঘ সময় কারাবরণ করতে হলেও তিনি নিজের রাজনৈতিক আদর্শ, সততা ও বঙ্গবন্ধুর চেতনার প্রশ্নে একচুলও আপস করেননি। পরবর্তীতে যখন আওয়ামী লীগ চরম নেতৃত্বসংকট ও বিপর্যয়ের মুখোমুখি হয়েছিল, তখন তৃণমূল পর্যায়ে দলকে টিকিয়ে রাখতে এবং ১৯৮১ সালে জননেত্রী শেখ হাসিনার ঐতিহাসিক স্বদেশ প্রত্যাবর্তনের পর দলের অভ্যন্তরীণ ঐক্য, নীতি নির্ধারণ ও শৃঙ্খলা সুদৃঢ় করতে তিনি অন্যতম জ্যেষ্ঠ অভিভাবকের ভূমিকা পালন করেন। দলের সর্বোচ্চ নীতিনির্ধারণী ফোরাম তথা প্রেসিডিয়ামের সদস্য হিসেবে তিনি দলের সিদ্ধান্ত গ্রহণ ও অভ্যন্তরীণ শৃঙ্খলা বজায় রাখতে সুদীর্ঘকাল অবদান করেছিলেন।
তোফায়েল আহমেদ ছিলেন বাংলাদেশের সংসদীয় রাজনীতির ইতিহাসের এক কিংবদন্তি পুরোধা ব্যক্তিত্ব। নিজ জন্মভূমি ভোলাসহ দেশের বিভিন্ন আসন থেকে তিনি মোট ৯ বার বিপুল ভোটে জাতীয় সংসদের সদস্য (এমপি) নির্বাচিত হন। দেশের প্রতিটি জাতীয় ক্রান্তিলগ্নে সংসদে তাঁর উত্থাপিত জোরালো, যুক্তিপূর্ণ ও দালিলিক উপাত্ত সমৃদ্ধ বক্তব্য সমগ্র জাতিকে দিকনির্দেশনা দিত। এছাড়া বিভিন্ন মেয়াদে তিনি গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকারের বাণিজ্য ও শিল্প মন্ত্রণালয়ের মতো গুরুত্বপূর্ণ ও নীতিনির্ধারণী মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রী হিসেবে অত্যন্ত সফল, দূরদর্শী ও সততার সাথে দায়িত্ব পালন করেছেন। বিশেষ করে ১৯৯৬ সালের মেয়াদে বাণিজ্য ও শিল্পমন্ত্রী থাকাকালীন তাঁরই দূরদর্শী নেতৃত্বে বাংলাদেশের তৈরি পোশাক শিল্প বিশ্ববাজারে এক অভাবনীয় উচ্চতায় পৌঁছায়। ইউরোপীয় ইউনিয়ন থেকে বাংলাদেশের 'জিএসপি সুবিধা' নিশ্চিতকরণ এবং মার্কিন বাজারে কোটা সুবিধা সম্প্রসারণে তাঁর যুগান্তকারী অর্থনৈতিক কূটনীতি দেশের অর্থনীতির ভিতকে বিশ্বমঞ্চে মজবুত করেছিল। এছাড়া বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থার (ডব্লিউটিও) বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সম্মেলনে বাংলাদেশের পক্ষে তাঁর বলিষ্ঠ নেতৃত্ব এবং স্বল্পোন্নত দেশগুলোর (এলডিসি) শুল্কমুক্ত ও কোটামুক্ত বাজার সুবিধা আদায়ে তাঁর কূটনৈতিক প্রজ্ঞা সর্বমহলে প্রশংসিত হয়েছে।
ভোলার মেঠোপথ থেকে উঠে এসে ঢাকার রাজপথ, উত্তাল গণআন্দোলন আর সংসদের মাইক কাঁপানো সেই চিরপরিচিত প্রাজ্ঞ কণ্ঠটি আজ চিরতরে নীরব হয়ে গেল! দলমত নির্বিশেষে দেশের সর্বস্তরের মানুষের কাছে তিনি ছিলেন পরম শ্রদ্ধেয় ও ভালোবাসার 'তোফায়েল ভাই'। তাঁর এই চিরবিদায় দেশের রাজনৈতিক, সামাজিক ও কূটনৈতিক অঙ্গনে এক গভীর ও অপূরণীয় শূন্যতার সৃষ্টি করল, যা সহজে পূরণ হওয়ার নয়। একটি গৌরবময় অধ্যায়ের অবসান হলো সত্য, কিন্তু ইতিহাসের পাতা থেকে তোফায়েল আহমেদের নাম কখনো মুছে যাবার নয়। বাংলাদেশের ইতিহাস যতকাল থাকবে, ততকাল তিনি বেঁচে থাকবেন তাঁর কর্মে, তাঁর দেয়া অমর উপাধিতে এবং লাল-সবুজের পতাকায়।
এই মহান বীর মুক্তিযোদ্ধার স্মৃতির প্রতি গভীরতম শ্রদ্ধা নিবেদন করি এবং তাঁর শোকসন্তপ্ত পরিবার, ভোলার আপামর জনতা ও দেশ-বিদেশে থাকা লাখো অনুসারীর প্রতি গভীর সমবেদনা জানাই। ভালো থাকবেন ওপারে, হে ইতিহাসের মহান সারথি। স্বাধীন বাংলাদেশের মানচিত্র আপনাকে চিরকাল পরম শ্রদ্ধায় বুকে ধারণ করে রাখবে।
📌 বাহাউদ্দিন গোলাপ,
(লেখক: গবেষক, সংস্কৃতি কর্মী। ডেপুটি রেজিস্ট্রার, বরিশাল বিশ্ববিদ্যালয়)
📌 নশ্বর পৃথিবীর এটাই নিয়ম—সব আলোকেই একদিন মহাকালের গর্ভে বিলীন হতে হয়। কিন্তু কিছু জীবন নিভে যাওয়ার পরও তার আভা রেখে যায় শতাব্দীর দিগন্তে। ১ জুন, ২০২৬, সোমবার; ঘড়ির কাঁটায় তখন বিকেল সাড়ে ৩টা। চারদিকের প্রখর রোদ যখন ম্লান হতে শুরু করেছে, ঠিক তখনই রাজধানীর স্কয়ার হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় শেষনিঃশ্বাস ত্যাগ করলেন বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসের অন্যতম চালিকাশক্তি ও অবিসংবাদিত নেতা তোফায়েল আহমেদ। আমাদের মহান মুক্তিসংগ্রামের অন্যতম রূপকার, স্বাধীন বাংলা কেন্দ্রীয় ছাত্রসংগ্রাম পরিষদের মহানায়ক এবং জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের সবচেয়ে বিশ্বস্ত এই সহচরের প্রস্থান কেবল একজন প্রবীণ রাজনীতিবিদের বিদায় নয়; বরং এটি রক্তস্নাত স্বাধীন বাংলাদেশ অভ্যুদয়ের একটি জীবন্ত ও প্রত্যক্ষ অধ্যায়ের মহাপ্রস্থান। চিরচেনা সেই শুভ্র পায়জামা-পাঞ্জাবি আর কালো মুজিব কোটে আবৃত, হাত নেড়ে উত্তাল জনসমুদ্রকে জাগ্রত করা রাজপথের সেই সিংহপুরুষ আর কোনোদিন আমাদের মাঝে ফিরবেন না।
এই দূরদর্শী নেতার জীবন ও রাজনীতির পরিক্রমা শুরু হয়েছিল নদী-বিধৌত ভোলার পললভূমিতে। ১৯৪৩ সালের ২২ অক্টোবর ভোলার কোড়ালিয়া গ্রামে এক সম্ভ্রান্ত পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন তিনি। তাঁর পিতা আজাহার আলী ও মাতা ফাতেমা খানম। স্থানীয় প্রাইমারি স্কুল ও খায়েরহাট জুনিয়র হাইস্কুলে প্রাথমিক পাঠ শেষে তিনি বোরহানউদ্দিন হাইস্কুলে লজিং থেকে পড়াশোনা করেন। পরবর্তীতে ভোলা সরকারি হাইস্কুল থেকে ১৯৬০ সালে বিজ্ঞান শাখায় ম্যাট্রিকুলেশন পাস করে তিনি ভর্তি হন বরিশালের ঐতিহ্যবাহী ব্রজমোহন (বিএম) কলেজে। এই কলেজ থেকেই তিনি ১৯৬২ সালে আইএসসি এবং ১৯৬৪ সালে বিএসসি পাস করেন। এরপর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের মৃত্তিকা বিজ্ঞান বিভাগ থেকে ১৯৬৬ সালে তিনি কৃতিত্বের সাথে এমএসসি ডিগ্রি লাভ করেন।
বরিশালের ব্রজমোহন কলেজে অধ্যায়নকালেই তোফায়েল আহমেদের সাংগঠনিক প্রতিভার প্রথম আনুষ্ঠানিক বিকাশ ঘটে। ১৯৬২ সালে তিনি বিপুল ভোটে বিএম কলেজ ছাত্র সংসদের ক্রীড়া সম্পাদক নির্বাচিত হন। এই প্রাতিষ্ঠানিক ভিত্তি অর্জনের পর তাঁর নেতৃত্বের চূড়ান্ত বিকাশ ঘটে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে। ১৯৬৬ সালের ঐতিহাসিক ছয় দফা আন্দোলনে সাহসী ভূমিকা রাখার পর, ১৯৬৬-৬৭ মেয়াদে তিনি তৎকালীন ইকবাল হলের ভিপি নির্বাচিত হন। এরপর, ১৯৬৯ সালের ঐতিহাসিক গণঅভ্যুত্থানের মহাসময়ে তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদের (ডাকসু) ভিপি নির্বাচিত হন এবং তৎকালীন ছাত্রসমাজকে স্বৈরাচারের বিরুদ্ধে এক অপরাজেয় শক্তিতে রূপান্তরিত করেন।
তোফায়েল আহমেদ ও স্বাধীন বাংলাদেশের ইতিহাস যেন একই সুতোয় গাঁথা। তাঁর রাজনীতির প্রথম পাঠ শুরু হয়েছিল ১৯৫৭ সালে, যখন তিনি অষ্টম শ্রেণির ছাত্র। ভোলা সরকারি কলেজ মাঠে এক উপনির্বাচনের জনসভায় প্রধানমন্ত্রী হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী ও তৎকালীন তরুণ আওয়ামী লীগ সাধারণ সম্পাদক শেখ মুজিবুর রহমানের বক্তৃতা তাঁর কিশোর মনে গভীর রেখাপাত করে। সেদিনই তিনি মনে মনে সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন, রাজনীতি করলে এই নেতার রাজনীতিই করবেন। সেই থেকে শুরু করে বাঙালির মুক্তিসনদ ১৯৬৬ সালের ঐতিহাসিক ছয় দফা আন্দোলনে তিনি ছাত্রসমাজকে সংগঠিত করতে অনন্য ভূমিকা রাখেন। ১৯৬৬ সালের মে মাসে বঙ্গবন্ধুর গ্রেপ্তারের পর জুনের ঐতিহাসিক ছয় দফার হরতালে তাঁর সাংগঠনিক দক্ষতা তৎকালীন শীর্ষ নেতৃত্বকে মুগ্ধ করেছিল। ১৯৬৮ সালের স্বৈরাচারী আইয়ুব সরকারের দমনপীড়নের মুখে তিনি কারাবরণ করেন।
তাঁর রাজনৈতিক জীবনের সবচেয়ে প্রদীপ্ত অধ্যায়টি রচিত হয় ১৯৬৯ সালের গণঅভ্যুত্থানে। আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলায় শেখ মুজিবুর রহমানকে যখন ফাঁসি দেয়ার চক্রান্ত চলছিল, তখন পূর্ব পাকিস্তান ছাত্রলীগ, ছাত্র ইউনিয়ন (মতিয়া গ্রুপ), ছাত্র ইউনিয়ন (মেনন গ্রুপ) ও ডাকসুর সমন্বয়ে গঠিত সর্বদলীয় ছাত্রসংগ্রাম পরিষদের আহ্বায়ক হিসেবে তিনি ঐতিহাসিক ১১ দফা আন্দোলনের ডাক দেন। তাঁরই অনলবর্ষী নেতৃত্ব, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়কে কেন্দ্র করে গড়ে ওঠা তীব্র ছাত্র আন্দোলন ও অবিচল গণলড়াইয়ের মুখে আইয়ুব সরকার বঙ্গবন্ধুকে নিঃশর্ত মুক্তি দিতে বাধ্য হয়। ১৯৬৯ সালের ২৩ ফেব্রুয়ারি তৎকালীন রেসকোর্স ময়দানে (বর্তমান সোহরাওয়ার্দী উদ্যান) লাখো জনতার ঐতিহাসিক মহাসমাবেশে সর্বদলীয় ছাত্রসংগ্রাম পরিষদের আহবায়ক ও ডাকসু ভিপি তোফায়েল আহমেদই প্রথম শেখ মুজিবুর রহমানকে 'বঙ্গবন্ধু' উপাধিতে ভূষিত করে বাঙালি জাতির আবেগ ও আকাঙ্ক্ষাকে সুনির্দিষ্ট রূপ দেন।
ছাত্ররাজনীতির এই বিপুল জনপ্রিয়তার ধারাবাহিকতায় ১৯৭০ সালের ঐতিহাসিক সাধারণ নির্বাচনে মাত্র ২৭ বছর বয়সে তোফায়েল আহমেদ পাকিস্তান জাতীয় পরিষদের সদস্য (এমএনএ) নির্বাচিত হয়ে চমক সৃষ্টি করেন, যা তাঁকে তৎকালীন পাকিস্তানের সর্বকনিষ্ঠ জনপ্রতিনিধিদের তালিকায় স্থান করে দেয়। এর ঠিক আগে, ১৯৭০ সালের ১২ নভেম্বরের প্রলয়ঙ্করী ঘূর্ণিঝড়ের পর উপদ্বুত শাহবাজপুর (ভোলা) ও উপকূলীয় অঞ্চলের দুর্গত মানুষের মাঝে বঙ্গবন্ধুর নির্দেশে তাঁর অকুতোভয় ত্রাণ ও পুনর্বাসন তৎপরতা মানুষের হৃদয়ে তাঁর স্থান চিরস্থায়ী করে দেয়। স্বাধীনতার পর, ১৯৭৫ সালে একক জাতীয় দল 'বাংলাদেশ কৃষক শ্রমিক আওয়ামী লীগ' (বাকশাল) গঠিত হলে তোফায়েল আহমেদ এর কেন্দ্রীয় কমিটির সদস্য মনোনীত হন। একই সাথে বাকশালের অন্যতম প্রধান অঙ্গসংগঠন 'জাতীয় যুব লীগ'-এর সাধারণ সম্পাদক হিসেবে দেশের যুব সমাজকে দেশ পুনর্গঠনের কাজে সংগঠিত করার গুরুদায়িত্ব লাভ করেন।
১৯৭১ সালের মহান মুক্তিসংগ্রামে তাঁর রণকৌশল, বীরত্ব ও সাংগঠনিক দক্ষতা ছিল এক চিরন্তন বিস্ময়। স্বাধীন বাংলা কেন্দ্রীয় ছাত্রসংগ্রাম পরিষদের অন্যতম শীর্ষ নেতা হিসেবে তিনি ছিলেন মুক্তিযুদ্ধের অন্যতম চালিকাশক্তি এবং বীরত্বপূর্ণ মুজিব বাহিনীর (বাংলাদেশ লিবারেশন ফোর্সেস - বিএলএফ) অঞ্চলভিত্তিক দায়িত্বপ্রাপ্ত চার প্রধানের অন্যতম। এর পাশাপাশি, যুদ্ধের অন্যতম কৌশলগত ও ঝুঁকিপূর্ণ '১০ নম্বর সেক্টর' (নৌ-কমান্ডো) গঠনে এবং শত্রুপক্ষের মেরুদণ্ড ভেঙে দেওয়া ঐতিহাসিক 'অপারেশন জ্যাকপট'-এর মতো জলযুদ্ধের নেপথ্য রূপকার হিসেবে তাঁর প্রাজ্ঞ রণকৌশল ইতিহাসের অংশ হয়ে আছে। একই সাথে প্রবাসী সরকারের বিশেষ দূত হিসেবে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে, বিশেষ করে ভারতের তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধী এবং বিশ্ব গণমাধ্যমের কাছে বাঙালির ন্যায্য অধিকারের দাবি ও মুক্তিযুদ্ধের সপক্ষে বিশ্বজনমত গঠনে তিনি অনন্য ও বলিষ্ঠ ভূমিকা রেখেছিলেন।
স্বাধীনতার সূর্যোদয়ের পর, ১৯৭২ সালে তিনি জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের রাজনৈতিক সচিবের (প্রতিমন্ত্রীর পদমর্যাদায়) গুরুদায়িত্ব লাভ করেন এবং যুদ্ধবিধ্বস্ত দেশ পুনর্গঠনে বঙ্গবন্ধুর ছায়াসঙ্গী হিসেবে কাজ করেন। ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্টের সেই কালরাত্রির নির্মমতম ট্র্যাজেডির পর যখন দেশের রাজনৈতিক আকাশ ঘন অন্ধকারে ছেয়ে যায়, তখন নেমে আসে তাঁর ওপর অমানুষিক রাষ্ট্রীয় নির্যাতন। সামরিক জান্তার শাসনামলে দীর্ঘ সময় কারাবরণ করতে হলেও তিনি নিজের রাজনৈতিক আদর্শ, সততা ও বঙ্গবন্ধুর চেতনার প্রশ্নে একচুলও আপস করেননি। পরবর্তীতে যখন আওয়ামী লীগ চরম নেতৃত্বসংকট ও বিপর্যয়ের মুখোমুখি হয়েছিল, তখন তৃণমূল পর্যায়ে দলকে টিকিয়ে রাখতে এবং ১৯৮১ সালে জননেত্রী শেখ হাসিনার ঐতিহাসিক স্বদেশ প্রত্যাবর্তনের পর দলের অভ্যন্তরীণ ঐক্য, নীতি নির্ধারণ ও শৃঙ্খলা সুদৃঢ় করতে তিনি অন্যতম জ্যেষ্ঠ অভিভাবকের ভূমিকা পালন করেন। দলের সর্বোচ্চ নীতিনির্ধারণী ফোরাম তথা প্রেসিডিয়ামের সদস্য হিসেবে তিনি দলের সিদ্ধান্ত গ্রহণ ও অভ্যন্তরীণ শৃঙ্খলা বজায় রাখতে সুদীর্ঘকাল অবদান করেছিলেন।
তোফায়েল আহমেদ ছিলেন বাংলাদেশের সংসদীয় রাজনীতির ইতিহাসের এক কিংবদন্তি পুরোধা ব্যক্তিত্ব। নিজ জন্মভূমি ভোলাসহ দেশের বিভিন্ন আসন থেকে তিনি মোট ৯ বার বিপুল ভোটে জাতীয় সংসদের সদস্য (এমপি) নির্বাচিত হন। দেশের প্রতিটি জাতীয় ক্রান্তিলগ্নে সংসদে তাঁর উত্থাপিত জোরালো, যুক্তিপূর্ণ ও দালিলিক উপাত্ত সমৃদ্ধ বক্তব্য সমগ্র জাতিকে দিকনির্দেশনা দিত। এছাড়া বিভিন্ন মেয়াদে তিনি গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকারের বাণিজ্য ও শিল্প মন্ত্রণালয়ের মতো গুরুত্বপূর্ণ ও নীতিনির্ধারণী মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রী হিসেবে অত্যন্ত সফল, দূরদর্শী ও সততার সাথে দায়িত্ব পালন করেছেন। বিশেষ করে ১৯৯৬ সালের মেয়াদে বাণিজ্য ও শিল্পমন্ত্রী থাকাকালীন তাঁরই দূরদর্শী নেতৃত্বে বাংলাদেশের তৈরি পোশাক শিল্প বিশ্ববাজারে এক অভাবনীয় উচ্চতায় পৌঁছায়। ইউরোপীয় ইউনিয়ন থেকে বাংলাদেশের 'জিএসপি সুবিধা' নিশ্চিতকরণ এবং মার্কিন বাজারে কোটা সুবিধা সম্প্রসারণে তাঁর যুগান্তকারী অর্থনৈতিক কূটনীতি দেশের অর্থনীতির ভিতকে বিশ্বমঞ্চে মজবুত করেছিল। এছাড়া বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থার (ডব্লিউটিও) বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সম্মেলনে বাংলাদেশের পক্ষে তাঁর বলিষ্ঠ নেতৃত্ব এবং স্বল্পোন্নত দেশগুলোর (এলডিসি) শুল্কমুক্ত ও কোটামুক্ত বাজার সুবিধা আদায়ে তাঁর কূটনৈতিক প্রজ্ঞা সর্বমহলে প্রশংসিত হয়েছে।
ভোলার মেঠোপথ থেকে উঠে এসে ঢাকার রাজপথ, উত্তাল গণআন্দোলন আর সংসদের মাইক কাঁপানো সেই চিরপরিচিত প্রাজ্ঞ কণ্ঠটি আজ চিরতরে নীরব হয়ে গেল! দলমত নির্বিশেষে দেশের সর্বস্তরের মানুষের কাছে তিনি ছিলেন পরম শ্রদ্ধেয় ও ভালোবাসার 'তোফায়েল ভাই'। তাঁর এই চিরবিদায় দেশের রাজনৈতিক, সামাজিক ও কূটনৈতিক অঙ্গনে এক গভীর ও অপূরণীয় শূন্যতার সৃষ্টি করল, যা সহজে পূরণ হওয়ার নয়। একটি গৌরবময় অধ্যায়ের অবসান হলো সত্য, কিন্তু ইতিহাসের পাতা থেকে তোফায়েল আহমেদের নাম কখনো মুছে যাবার নয়। বাংলাদেশের ইতিহাস যতকাল থাকবে, ততকাল তিনি বেঁচে থাকবেন তাঁর কর্মে, তাঁর দেয়া অমর উপাধিতে এবং লাল-সবুজের পতাকায়।
এই মহান বীর মুক্তিযোদ্ধার স্মৃতির প্রতি গভীরতম শ্রদ্ধা নিবেদন করি এবং তাঁর শোকসন্তপ্ত পরিবার, ভোলার আপামর জনতা ও দেশ-বিদেশে থাকা লাখো অনুসারীর প্রতি গভীর সমবেদনা জানাই। ভালো থাকবেন ওপারে, হে ইতিহাসের মহান সারথি। স্বাধীন বাংলাদেশের মানচিত্র আপনাকে চিরকাল পরম শ্রদ্ধায় বুকে ধারণ করে রাখবে।
📌 বাহাউদ্দিন গোলাপ,
(লেখক: গবেষক, সংস্কৃতি কর্মী। ডেপুটি রেজিস্ট্রার, বরিশাল বিশ্ববিদ্যালয়)
০২ জুন, ২০২৬ ১৩:৫৬
০২ জুন, ২০২৬ ১৩:৪০
০২ জুন, ২০২৬ ১৩:০৫
০১ জুন, ২০২৬ ২১:৫৭

০১ মে, ২০২৬ ১৫:৫৭
১৮৮৬ সালের মে মাসে শিকাগোর হে মার্কেটে যখন শ্রমিকেরা আট ঘণ্টা কর্মঘণ্টার দাবিতে রক্ত দিচ্ছিলেন, তার ঠিক ১৪০ বছর পর ২০২৬ সালের এই মে দিবসেও বাংলাদেশের দক্ষিণাঞ্চলের মান্তা জনপদে শ্রমের সংজ্ঞাটি আজও আদিম ও অমানবিক রয়ে গেছে। মেঘনার মোহনায় ভোরের সূর্য যখন উঁকি দেয়, ভোলার দড়ির চর বা বরিশালের মেহেন্দীগঞ্জে কোনো কারখানার সাইরেন বাজে না; বাজে কেবল বৈঠার শব্দ আর লোনা জলের ঝাপটা। মান্তাদের কাছে 'গৃহ' মানে এক চিলতে চলন্ত নৌকা, আর 'শ্রম' মানে উত্তাল জলধির বুকে প্রাণের বাজি। আধুনিক অর্থনীতির এই অনিশ্চিত শ্রেণিটি ঘাম আর জল এক করে দিলেও জাতীয় জিডিপিতে মৎস্য খাতের ৩.৫০ শতাংশের বেশি অবদানে তাদের হাড়ভাঙা খাটুনির স্বীকৃতি আজও মেলেনি। মূলত 'কাঠামোগত বর্জন' এই জনপদকে নাগরিকত্বের মূল স্রোত থেকে বিচ্ছিন্ন এক ‘অদৃশ্য সর্বহারা’য় পরিণত করে রেখেছে।
এই ব্রাত্য জনপদের শ্রম-শোষণের ধরনটি এক জটিল ও নিষ্ঠুর অর্থনৈতিক সমীকরণ। বরিশাল, পটুয়াখালী ও ভোলার মেঘনা অববাহিকায় ভাসমান প্রায় ৪০ হাজার মানুষের এই বিশাল গোষ্ঠী মূলত ‘দাদন’ প্রথার এক অদৃশ্য শিকলে বন্দী। এক ভয়াবহ গাণিতিক বৈষম্যের শিকার এই মানুষগুলো—শহরের ডাইনিং টেবিলে যে মৎস্য সম্পদের বাজারমূল্য প্রতি কেজি এক হাজার টাকা, স্থানীয় প্রভাবশালী ও মধ্যস্বত্বভোগীদের রাজনৈতিক-প্রশাসনিক পৃষ্ঠপোষকতায় গড়ে ওঠা এই শোষণচক্রে মান্তা শ্রমিক সেই মাছের বিনিময়ে পান বড়জোর একশো থেকে দেড়শো টাকা। এই ‘ঋণ-দাসত্ব’ আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থার (ILO) ২৯ নম্বর কনভেনশনের সরাসরি লঙ্ঘন। অথচ বাংলাদেশ শ্রম আইন ২০০৬-এর ২(৬৫) ধারায় ‘শ্রমিক’-এর যে সংজ্ঞা দেওয়া হয়েছে, তা মূলত প্রাতিষ্ঠানিক কল-কারখানা কেন্দ্রিক। এই আইনি শূন্যতার সুযোগে মান্তারা রাষ্ট্রীয়ভাবে ‘শ্রমিক’ হিসেবে স্বীকৃত নন; ফলে পেশাগত দুর্ঘটনা বা অসুস্থতায় কোনো বিমা বা আইনি সুরক্ষা তাদের ধরাছোঁয়ার বাইরে থেকে যায়।
বিশ্ব প্রেক্ষাপটে ভিয়েতনামের হালং বে কিংবা কম্বোডিয়ার টনলে স্যাপ হ্রদের ভাসমান জনগোষ্ঠীর সাথে মান্তাদের জীবনচিত্রের মিল থাকলেও, ‘তথ্যগত দারিদ্র্য’ ও ডিজিটাল বৈষম্যের নিরিখে বাংলাদেশের মান্তারা অনেক বেশি পিছিয়ে। এই শ্রমের সবচেয়ে নিগৃহীত অংশ হলো নারী ও শিশুরা। নৌকার এক প্রান্তে মা যখন রান্নায় ব্যস্ত, অন্য প্রান্তে বাবা তখন জাল সারছেন, আর শিশুটি বৈঠা হাতে শিখছে জীবনের ভারসাম্য। কিন্তু এই বিশাল 'সেবামূলক শ্রমে' নারীর অবদানের কোনো অর্থনৈতিক মূল্যায়ন বা সামাজিক স্বীকৃতি নেই। মান্তা পরিবারের রহিমা আক্ষেপ করে বলেন, "নদী যেমন মাছ দেয়, তেমনি আমাগো পরিচয়ও ভাসাইয়া নিয়া যায়।" রহিমা ও কালামের সন্তান আকাশের চোখে স্বপ্ন—সে ওপাড়ে গড়ে ওঠা রঙিন দালানের স্কুলে যাবে। কিন্তু স্থায়ী ঠিকানার দালিলিক প্রমাণ না থাকায় তার শিক্ষার অধিকার আজ মেঘনার ঘোলা জলেই নিমজ্জিত। যেখানে পৃথিবী আজ চতুর্থ শিল্প বিপ্লব ও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার (AI) জোয়ারে ভাসছে, সেখানে আকাশের মতো হাজারো মান্তা শিশু এক নিষ্ঠুর ‘ডিজিটাল বর্ণপ্রথার’ শিকার হয়ে মৌলিক বর্ণমালার আলো থেকেও বঞ্চিত হচ্ছে।
বর্তমান প্রেক্ষাপটে মান্তাদের এই সংকট আজ জলবায়ু পরিবর্তনের এক করুণ উপাখ্যান। সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধি আর নদীবক্ষে লোনা জলের অনুপ্রবেশ তাদের ঐতিহ্যবাহী মৎস্য শিকারের কৌশলকে অকেজো করে দিচ্ছে, যা তাদের ‘জলবায়ু উদ্বাস্তু’ হিসেবে বিশ্ব পরিমণ্ডলে পরিচিতি দিচ্ছে। বিস্ময়কর বাস্তবতা হলো, যখন মা-ইলিশ রক্ষার সরকারি নিষেধাজ্ঞা জারি হয়, তখন ডাঙ্গার জেলেরা সামাজিক সহায়তার আওতায় এলেও ঠিকানাহীন মান্তারা প্রায়ই ‘ব্যুরোক্রেটিক প্যারালাইসিস’ বা আমলাতান্ত্রিক উদাসীনতার কারণে তালিকা থেকে বাদ পড়েন। রপ্তানিমুখী মৎস্য শিল্পের মূল জোগানদাতা হয়েও তারা থেকে যাচ্ছেন সামাজিক সুরক্ষা জালের বাইরে। তাদের আহরিত সম্পদ বিশ্ববাজারে বৈদেশিক মুদ্রা আনলেও, বিনিময়ে তারা পাচ্ছেন কেবল দীর্ঘস্থায়ী অবহেলা। কেবল অর্থনৈতিক নয়, এই প্রান্তিক জনপদ আজ এক গভীর সাংস্কৃতিক অবলুপ্তির মুখোমুখি। নদী দখল এবং আধুনিক মৎস্য শিল্পের যান্ত্রিক চাপে মান্তাদের কয়েক প্রজন্মের ঐতিহ্যবাহী ভাসমান সংস্কৃতি আজ বিলুপ্তপ্রায়। তবে এই উত্তরণের পথে তাদের নাগরিক অধিকার নিশ্চিত করার পাশাপাশি তাদের অনন্য সাংস্কৃতিক স্বাতন্ত্র্য রক্ষা করাও রাষ্ট্রের জন্য এক বড় চ্যালেঞ্জ।
মান্তা ও দক্ষিণ উপকূলের এই শ্রমজীবীদের 'জলমগ্ন শ্রম'-কে মূলধারার অর্থনীতিতে স্বীকৃতি দেওয়া এখন সময়ের দাবি। আন্তর্জাতিক মানদণ্ড অনুযায়ী তাদের জন্য সুনির্দিষ্ট ‘ফিশারিজ লেবার কোড’ প্রণয়ন, স্যাটেলাইট কানেক্টিভিটি নির্ভর ডিজিটাল প্রযুক্তির মাধ্যমে দুর্গম জলসীমায় মোবাইল ব্যাংকিং সেবা এবং পৈতৃক পরিচয় নির্বিশেষে ‘ভাসমান এনআইডি কার্ড’ বা বিশেষ ভোটার তালিকার পূর্ণ নিশ্চয়তা প্রদান করা অপরিহার্য। জাতিসংঘের টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা (SDG)-এর মূলমন্ত্র ‘কাউকে পেছনে ফেলে নয়’—এই অঙ্গীকার রক্ষা করতে হলে মান্তাদের জীবনের নৌকাকে কেবল মাছ ধরার যন্ত্র নয়, বরং অফলাইন লার্নিং মডিউল সমৃদ্ধ একটি 'ভাসমান লার্নিং সেন্টারে' রূপান্তর করতে হবে। নদী যেমন তার সবটুকু উজাড় করে দিয়ে সাগরে মেশে, তেমনি মান্তাদের এই ব্রাত্য জীবনকেও নাগরিকত্বের মোহনায় ফিরিয়ে আনা রাষ্ট্রের নৈতিক ও সাংবিধানিক অঙ্গীকার হওয়া উচিত। ডাঙ্গার মানুষ আর জলের মানুষের মধ্যকার এই অদৃশ্য প্রাচীর মুছে গিয়ে যেদিন আকাশের মতো হাজারো মান্তা শিশুর শিক্ষার অধিকার আর শ্রমিকের ন্যায্য হিস্যা নিশ্চিত হবে, সেদিনই প্রকৃত অর্থে সার্থক হবে শিকাগোর সেই রক্তভেজা মে দিবসের বৈশ্বিক চেতনা।

বাহাউদ্দিন গোলাপ
(লেখক: গবেষক, সংস্কৃতি কর্মী। ডেপুটি রেজিস্ট্রার, বরিশাল বিশ্ববিদ্যালয়)
১৮৮৬ সালের মে মাসে শিকাগোর হে মার্কেটে যখন শ্রমিকেরা আট ঘণ্টা কর্মঘণ্টার দাবিতে রক্ত দিচ্ছিলেন, তার ঠিক ১৪০ বছর পর ২০২৬ সালের এই মে দিবসেও বাংলাদেশের দক্ষিণাঞ্চলের মান্তা জনপদে শ্রমের সংজ্ঞাটি আজও আদিম ও অমানবিক রয়ে গেছে। মেঘনার মোহনায় ভোরের সূর্য যখন উঁকি দেয়, ভোলার দড়ির চর বা বরিশালের মেহেন্দীগঞ্জে কোনো কারখানার সাইরেন বাজে না; বাজে কেবল বৈঠার শব্দ আর লোনা জলের ঝাপটা। মান্তাদের কাছে 'গৃহ' মানে এক চিলতে চলন্ত নৌকা, আর 'শ্রম' মানে উত্তাল জলধির বুকে প্রাণের বাজি। আধুনিক অর্থনীতির এই অনিশ্চিত শ্রেণিটি ঘাম আর জল এক করে দিলেও জাতীয় জিডিপিতে মৎস্য খাতের ৩.৫০ শতাংশের বেশি অবদানে তাদের হাড়ভাঙা খাটুনির স্বীকৃতি আজও মেলেনি। মূলত 'কাঠামোগত বর্জন' এই জনপদকে নাগরিকত্বের মূল স্রোত থেকে বিচ্ছিন্ন এক ‘অদৃশ্য সর্বহারা’য় পরিণত করে রেখেছে।
এই ব্রাত্য জনপদের শ্রম-শোষণের ধরনটি এক জটিল ও নিষ্ঠুর অর্থনৈতিক সমীকরণ। বরিশাল, পটুয়াখালী ও ভোলার মেঘনা অববাহিকায় ভাসমান প্রায় ৪০ হাজার মানুষের এই বিশাল গোষ্ঠী মূলত ‘দাদন’ প্রথার এক অদৃশ্য শিকলে বন্দী। এক ভয়াবহ গাণিতিক বৈষম্যের শিকার এই মানুষগুলো—শহরের ডাইনিং টেবিলে যে মৎস্য সম্পদের বাজারমূল্য প্রতি কেজি এক হাজার টাকা, স্থানীয় প্রভাবশালী ও মধ্যস্বত্বভোগীদের রাজনৈতিক-প্রশাসনিক পৃষ্ঠপোষকতায় গড়ে ওঠা এই শোষণচক্রে মান্তা শ্রমিক সেই মাছের বিনিময়ে পান বড়জোর একশো থেকে দেড়শো টাকা। এই ‘ঋণ-দাসত্ব’ আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থার (ILO) ২৯ নম্বর কনভেনশনের সরাসরি লঙ্ঘন। অথচ বাংলাদেশ শ্রম আইন ২০০৬-এর ২(৬৫) ধারায় ‘শ্রমিক’-এর যে সংজ্ঞা দেওয়া হয়েছে, তা মূলত প্রাতিষ্ঠানিক কল-কারখানা কেন্দ্রিক। এই আইনি শূন্যতার সুযোগে মান্তারা রাষ্ট্রীয়ভাবে ‘শ্রমিক’ হিসেবে স্বীকৃত নন; ফলে পেশাগত দুর্ঘটনা বা অসুস্থতায় কোনো বিমা বা আইনি সুরক্ষা তাদের ধরাছোঁয়ার বাইরে থেকে যায়।
বিশ্ব প্রেক্ষাপটে ভিয়েতনামের হালং বে কিংবা কম্বোডিয়ার টনলে স্যাপ হ্রদের ভাসমান জনগোষ্ঠীর সাথে মান্তাদের জীবনচিত্রের মিল থাকলেও, ‘তথ্যগত দারিদ্র্য’ ও ডিজিটাল বৈষম্যের নিরিখে বাংলাদেশের মান্তারা অনেক বেশি পিছিয়ে। এই শ্রমের সবচেয়ে নিগৃহীত অংশ হলো নারী ও শিশুরা। নৌকার এক প্রান্তে মা যখন রান্নায় ব্যস্ত, অন্য প্রান্তে বাবা তখন জাল সারছেন, আর শিশুটি বৈঠা হাতে শিখছে জীবনের ভারসাম্য। কিন্তু এই বিশাল 'সেবামূলক শ্রমে' নারীর অবদানের কোনো অর্থনৈতিক মূল্যায়ন বা সামাজিক স্বীকৃতি নেই। মান্তা পরিবারের রহিমা আক্ষেপ করে বলেন, "নদী যেমন মাছ দেয়, তেমনি আমাগো পরিচয়ও ভাসাইয়া নিয়া যায়।" রহিমা ও কালামের সন্তান আকাশের চোখে স্বপ্ন—সে ওপাড়ে গড়ে ওঠা রঙিন দালানের স্কুলে যাবে। কিন্তু স্থায়ী ঠিকানার দালিলিক প্রমাণ না থাকায় তার শিক্ষার অধিকার আজ মেঘনার ঘোলা জলেই নিমজ্জিত। যেখানে পৃথিবী আজ চতুর্থ শিল্প বিপ্লব ও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার (AI) জোয়ারে ভাসছে, সেখানে আকাশের মতো হাজারো মান্তা শিশু এক নিষ্ঠুর ‘ডিজিটাল বর্ণপ্রথার’ শিকার হয়ে মৌলিক বর্ণমালার আলো থেকেও বঞ্চিত হচ্ছে।
বর্তমান প্রেক্ষাপটে মান্তাদের এই সংকট আজ জলবায়ু পরিবর্তনের এক করুণ উপাখ্যান। সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধি আর নদীবক্ষে লোনা জলের অনুপ্রবেশ তাদের ঐতিহ্যবাহী মৎস্য শিকারের কৌশলকে অকেজো করে দিচ্ছে, যা তাদের ‘জলবায়ু উদ্বাস্তু’ হিসেবে বিশ্ব পরিমণ্ডলে পরিচিতি দিচ্ছে। বিস্ময়কর বাস্তবতা হলো, যখন মা-ইলিশ রক্ষার সরকারি নিষেধাজ্ঞা জারি হয়, তখন ডাঙ্গার জেলেরা সামাজিক সহায়তার আওতায় এলেও ঠিকানাহীন মান্তারা প্রায়ই ‘ব্যুরোক্রেটিক প্যারালাইসিস’ বা আমলাতান্ত্রিক উদাসীনতার কারণে তালিকা থেকে বাদ পড়েন। রপ্তানিমুখী মৎস্য শিল্পের মূল জোগানদাতা হয়েও তারা থেকে যাচ্ছেন সামাজিক সুরক্ষা জালের বাইরে। তাদের আহরিত সম্পদ বিশ্ববাজারে বৈদেশিক মুদ্রা আনলেও, বিনিময়ে তারা পাচ্ছেন কেবল দীর্ঘস্থায়ী অবহেলা। কেবল অর্থনৈতিক নয়, এই প্রান্তিক জনপদ আজ এক গভীর সাংস্কৃতিক অবলুপ্তির মুখোমুখি। নদী দখল এবং আধুনিক মৎস্য শিল্পের যান্ত্রিক চাপে মান্তাদের কয়েক প্রজন্মের ঐতিহ্যবাহী ভাসমান সংস্কৃতি আজ বিলুপ্তপ্রায়। তবে এই উত্তরণের পথে তাদের নাগরিক অধিকার নিশ্চিত করার পাশাপাশি তাদের অনন্য সাংস্কৃতিক স্বাতন্ত্র্য রক্ষা করাও রাষ্ট্রের জন্য এক বড় চ্যালেঞ্জ।
মান্তা ও দক্ষিণ উপকূলের এই শ্রমজীবীদের 'জলমগ্ন শ্রম'-কে মূলধারার অর্থনীতিতে স্বীকৃতি দেওয়া এখন সময়ের দাবি। আন্তর্জাতিক মানদণ্ড অনুযায়ী তাদের জন্য সুনির্দিষ্ট ‘ফিশারিজ লেবার কোড’ প্রণয়ন, স্যাটেলাইট কানেক্টিভিটি নির্ভর ডিজিটাল প্রযুক্তির মাধ্যমে দুর্গম জলসীমায় মোবাইল ব্যাংকিং সেবা এবং পৈতৃক পরিচয় নির্বিশেষে ‘ভাসমান এনআইডি কার্ড’ বা বিশেষ ভোটার তালিকার পূর্ণ নিশ্চয়তা প্রদান করা অপরিহার্য। জাতিসংঘের টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা (SDG)-এর মূলমন্ত্র ‘কাউকে পেছনে ফেলে নয়’—এই অঙ্গীকার রক্ষা করতে হলে মান্তাদের জীবনের নৌকাকে কেবল মাছ ধরার যন্ত্র নয়, বরং অফলাইন লার্নিং মডিউল সমৃদ্ধ একটি 'ভাসমান লার্নিং সেন্টারে' রূপান্তর করতে হবে। নদী যেমন তার সবটুকু উজাড় করে দিয়ে সাগরে মেশে, তেমনি মান্তাদের এই ব্রাত্য জীবনকেও নাগরিকত্বের মোহনায় ফিরিয়ে আনা রাষ্ট্রের নৈতিক ও সাংবিধানিক অঙ্গীকার হওয়া উচিত। ডাঙ্গার মানুষ আর জলের মানুষের মধ্যকার এই অদৃশ্য প্রাচীর মুছে গিয়ে যেদিন আকাশের মতো হাজারো মান্তা শিশুর শিক্ষার অধিকার আর শ্রমিকের ন্যায্য হিস্যা নিশ্চিত হবে, সেদিনই প্রকৃত অর্থে সার্থক হবে শিকাগোর সেই রক্তভেজা মে দিবসের বৈশ্বিক চেতনা।

বাহাউদ্দিন গোলাপ
(লেখক: গবেষক, সংস্কৃতি কর্মী। ডেপুটি রেজিস্ট্রার, বরিশাল বিশ্ববিদ্যালয়)

১৬ এপ্রিল, ২০২৬ ১৫:৩৫
সময়ের অবারিত প্রান্তরে কিছু জীবন কেবল পঞ্জিকার পাতায় লীন হতে আসে না, তারা আসে অন্ধকারের বুকে নক্ষত্রের রেখা এঁকে দিতে। সৃষ্টির নিগূঢ় রসায়ন যখন শিল্পতৃষ্ণা আর অন্যায়ের বিরুদ্ধে দ্রোহের অনলকে একই বিন্দুতে মিলিয়ে দেয়, তখনই ধরণীর ধূলিকণায় আবির্ভাব ঘটে এমন এক ঋষিপ্রতিম পুরুষের—যাঁর নামনিখিল কুমার সেনগুপ্ত, যিনি নিখিল সেন নামেই ভুবনবিদিত। ১৯৩১-এর সেই শুভলগ্নে, ১৬ই এপ্রিল; বরিশালেরকাশিপুর ইউনিয়নের কলসগ্রামেরএক নিভৃত আঙিনায়যতীশ চন্দ্র সেনগুপ্ত ও সরোজিনী সেনগুপ্তারঘরে প্রস্ফুটিত হয়েছিল এই অনন্য জীবনকুসুম। শৈশবের সেই দিনগুলোতে কলসগ্রাম প্রাথমিক বিদ্যালয় আরমাধবপাশা চন্দ্রদ্বীপ ইনস্টিটিউশনেরমেঠো পথ ছিল তাঁর প্রথম পাঠশালা।১৯৪১ সালেমাত্র দশ বছর বয়সে কলসগ্রামের বিদ্যালয় মাঠে‘সিরাজের স্বপ্ন’নাটকের অভিনয়ে তাঁর শিল্পযাত্রার প্রথম স্পন্দন অনুভূত হয়। সেই বছরই ৮ আগস্ট কবিগুরুর মহাপ্রয়াণের পরদিন বিদ্যালয় আয়োজিত শোকসভায়‘ভারত তীর্থ’কবিতাটি আবৃত্তি করে তিনি প্রথম জানান দিয়েছিলেন এক বিশ্বজনীন আবৃত্তি-প্রতিভার। ১৯৪৭ সালে ম্যাট্রিক পাসের পর উত্তাল সময়ে তিনি পাড়ি জমান কলকাতায়। সেখানেকলকাতা সিটি কলেজ থেকে বাণিজ্য বিভাগে স্নাতক ডিগ্রি অর্জনতাঁর সমাজবীক্ষাকে করেছিল আরও গূঢ়, শাণিত ও দার্শনিক।
১৯৫১ সালের অক্টোবরের শেষদিকে যখন তিনি পুনরায় জন্মভূমিতে ফিরে আসেন, তখন তাঁর শিল্পচেতনায় নতুন মাত্রা যোগ করেন আবৃত্তিকার ও অভিনেতা গোলাম মোস্তফা। ১৯৫২ সালের জুলাই মাসে কর্ণকাঠী গাউসেল আজম মাধ্যমিক বিদ্যালয়ে সহকারী প্রধান শিক্ষক হিসেবে যোগদানের মধ্য দিয়ে শুরু হয় এক মহান শিক্ষাব্রতীর যাত্রা। কিন্তু শাসকের রক্তচক্ষু তাঁকে থামিয়ে রাখতে পারেনি; আইয়ুব সরকারের হুলিয়া আর শিক্ষকতা নিষিদ্ধ হওয়ার খাঁড়া মাথায় নিয়েও তিনি ছিলেন অকুতোভয়। মণি সিং, মনোরমা বসু মাসীমা ও আবদুর রব সেরনিয়াবাতদের মতো মহীরুহদের উদ্দীপনায় ১৯৫৩ সালে কমিউনিস্ট পার্টির পতাকাতলে সক্রিয় হয়ে ওঠেন তিনি। ১৯৫৩ থেকে ১৯৫৭ সাল পর্যন্ত তৎকালীন জেলা যুবলীগের সাংস্কৃতিক সম্পাদক থেকে শুরু করে সভাপতির গুরুদায়িত্ব পালন—সবখানেই তিনি ছিলেন প্রগতির অগ্রদূত। এই দ্রোহের মূল্য দিতে গিয়ে পঞ্চাশের দশকে তাঁকে তিনবার কারবরণ করতে হয় এবং ১৯৬৫-র পাক-ভারত যুদ্ধের সময় কাটাতে হয় দীর্ঘ নজরবন্দী জীবন। কলমকেই তিনি করেছিলেন শোষণের বিরুদ্ধে শাণিত অস্ত্র। সাংবাদিক হিসেবে তাঁর সাহসী পদচারণা ছিল ‘সংবাদ’, ‘লোকবাণী’, ন্যাপের মুখপত্র ‘নতুন বাংলা’ এবং কমিউনিস্ট পার্টির মুখপত্র ‘একতা’র পাতায়।
নিখিল সেনের শিল্পীসত্তা ছিল এক অতল সমুদ্রের মতো বিশাল, যেখানে লীন হয়ে গিয়েছিল সুর, শব্দ আর দ্রোহের মোহনা। সেতারের তারে ওস্তাদ আলী হোসেন ও রমেশ চক্রবর্তীর কাছে নেওয়া তালিম তাঁর হৃদয়ে যে নান্দনিক সুরের ঝংকার তুলেছিল, তা তিনি বিলিয়ে দিয়েছিলেন বাংলার নাট্য ও আবৃত্তি আন্দোলনে। ১৯৫৩ সালে ‘বরিশাল থিয়েটার’ গড়ে তোলার মধ্য দিয়ে তিনি যে আন্দোলনের বীজ বুনেছিলেন, তা পরবর্তীতে ‘বরিশাল নাটক’ এবং ‘উদীচী শিল্পীগোষ্ঠী’র পতাকাতলে এক বিশাল মহীরুহে পরিণত হয়। ৩২টি নাটকের সার্থক নির্দেশনার পাশাপাশি অগণিত নাটকে তাঁর বলিষ্ঠ অভিনয় ইতিহাসের হাহাকারকে মঞ্চে জীবন্ত করে তুলত। ১৯৮২ সালে বাংলাদেশের প্রথম আবৃত্তি প্রশিক্ষণ কেন্দ্র গড়ে তোলার মাধ্যমে তিনি তৈরি করেছিলেন একদল শব্দসৈনিক। রবীন্দ্র সঙ্গীত সম্মিলন পরিষদ, জাতীয় আবৃত্তি সমন্বয় পরিষদ, জীবনানন্দ একাডেমী এবং অমৃত লাল দে মহাবিদ্যালয়ের পরিচালনা পর্ষদ—সবখানেই তাঁর উপস্থিতি ছিল এক আজন্ম সংস্কৃতির আরাধনা।
নিখিল সেনের জীবনকে যখন আমরা বিশ্বসাহিত্যের ক্যানভাসে রাখি, তখন তাঁর মাঝে খুঁজে পাওয়া যায় বিশ্ববিখ্যাত সব বিপ্লবীদের ছায়া। জার্মান নাট্যকার বার্টোল্ট ব্রেখট যেমন থিয়েটারকে করেছিলেন সমাজ পরিবর্তনের রাজনৈতিক অস্ত্র, নিখিল সেনও তেমনি তাঁর প্রতিটি মঞ্চায়নকে করেছিলেন শোষণের বিরুদ্ধে শৈল্পিক লড়াই। লাতিন আমেরিকার বিপ্লবী কবি পাবলো নেরুদার কলম যেমন আর্তমানবতার পক্ষে জেগে উঠেছিল, নিখিল সেনের সাংবাদিকতা ও কণ্ঠস্বরও ছিল ঠিক তেমনি প্রান্তিক মানুষের সপক্ষে এক অবিনাশী সুর। দক্ষিণ আফ্রিকার নেলসন ম্যান্ডেলার মতো তিনিও আদর্শের জন্য দীর্ঘ কারাবরণ ও জুলুম সহ্য করেও অবিচল ছিলেন। তাঁর শিল্প সাধনা কেবল নান্দনিকতার মোড়ক ছিল না; বরং তা ছিল সেবাস্তিয়ান বাখের সিম্ফনির মতো সুশৃঙ্খল এবং ভিক্টর হুগোর রচনার মতো গণমুখী।
তাঁর এই দীর্ঘ আট দশকের তপোনিষ্ঠ শিল্পসাধনা কেবল করতালি কিংবা স্তুতিতে সীমাবদ্ধ ছিল না, বরং তা পেয়েছে সর্বোচ্চ রাষ্ট্রীয় মর্যাদা। সময়ের শ্রেষ্ঠ সন্তান হিসেবে ২০১৮ সালে রাষ্ট্র তাঁকে দেশের ২য় সর্বোচ্চ বেসামরিক সম্মান 'একুশে পদক'-এ ভূষিত করে। এর আগে ১৯৯৯ সালে বাংলাদেশ গ্রুপ থিয়েটার ফেডারেশন পদক, ২০০৫ সালে শহীদ মুনীর চৌধুরী পদক এবং ২০১৫ সালে শিল্পকলা একাডেমী সম্মাননাসহ অগণিত স্বীকৃতি তাঁর প্রজ্ঞার সাক্ষ্য দেয়। ১৯৫৮ সালে শিক্ষা আন্দোলনের মিছিলে নারায়ণগঞ্জ থেকে চট্টগ্রাম পর্যন্ত তাঁর দরাজ কণ্ঠে গাওয়া ‘তালেব মাস্টার’ কবিতা শুনলে আজও মানুষের রক্তে শিহরণ জাগে।
দীর্ঘ ৮৮ বছরের এক বর্ণিল ও ঋদ্ধ জীবন শেষে, ২০১৯ সালের ২৫ ফেব্রুয়ারি এই মহাপ্রাণ বিদায় নেন নশ্বর পৃথিবী থেকে। আজ তিনি নেই, কিন্তু তাঁর মৃত্যু নেই। তিনি অমর হয়ে আছেন বরিশালের অশ্বিনীকুমার হলের মঞ্চে, প্রতিটি প্রগতিশীল মিছিলে আর বাঙালির শুদ্ধ সাংস্কৃতিক চেতনার স্পন্দনে। কীর্তনখোলার জল আজও তাঁর স্মৃতি বহন করে বয়ে চলে, আর বাতাসে প্রতিধ্বনিত হয় নিখিল সেনের সেই মেঘমন্দ্র কণ্ঠস্বর। তিনি বিশ্বাস করতেন, অভিনয় কেবল শিল্পের জন্য নয়, বরং মানুষের মুক্তির জন্য এক নিরন্তর আরতি। তিনি এমন এক জ্যোতিষ্ক, যাঁর আলোকবর্তিকা আমাদের পথ হারানো সময়ে অনন্তকাল সত্য ও সুন্দরের ধ্রুবপথ দেখাবে।
আজ ১৬ই এপ্রিল; শব্দ ও সুরের এই মহান জাদুকরের জন্মতিথি। জন্মক্ষণে বিনম্র শ্রদ্ধায় স্মরণ করি কীর্তনখোলার তীরের এই অকুতোভয় শব্দসারথিকে, যাঁর কণ্ঠ আজও আমাদের বেঁচে থাকার শক্তি যোগায়।
শুভ জন্মদিন, শ্রদ্ধেয় নিখিল সেন।
বাহাউদ্দিন গোলাপ
(লেখক: গবেষক, সংস্কৃতি কর্মী। ডেপুটি রেজিস্ট্রার, বরিশাল বিশ্ববিদ্যালয়, b_golap@yahoo.com, 01712070133)
সময়ের অবারিত প্রান্তরে কিছু জীবন কেবল পঞ্জিকার পাতায় লীন হতে আসে না, তারা আসে অন্ধকারের বুকে নক্ষত্রের রেখা এঁকে দিতে। সৃষ্টির নিগূঢ় রসায়ন যখন শিল্পতৃষ্ণা আর অন্যায়ের বিরুদ্ধে দ্রোহের অনলকে একই বিন্দুতে মিলিয়ে দেয়, তখনই ধরণীর ধূলিকণায় আবির্ভাব ঘটে এমন এক ঋষিপ্রতিম পুরুষের—যাঁর নামনিখিল কুমার সেনগুপ্ত, যিনি নিখিল সেন নামেই ভুবনবিদিত। ১৯৩১-এর সেই শুভলগ্নে, ১৬ই এপ্রিল; বরিশালেরকাশিপুর ইউনিয়নের কলসগ্রামেরএক নিভৃত আঙিনায়যতীশ চন্দ্র সেনগুপ্ত ও সরোজিনী সেনগুপ্তারঘরে প্রস্ফুটিত হয়েছিল এই অনন্য জীবনকুসুম। শৈশবের সেই দিনগুলোতে কলসগ্রাম প্রাথমিক বিদ্যালয় আরমাধবপাশা চন্দ্রদ্বীপ ইনস্টিটিউশনেরমেঠো পথ ছিল তাঁর প্রথম পাঠশালা।১৯৪১ সালেমাত্র দশ বছর বয়সে কলসগ্রামের বিদ্যালয় মাঠে‘সিরাজের স্বপ্ন’নাটকের অভিনয়ে তাঁর শিল্পযাত্রার প্রথম স্পন্দন অনুভূত হয়। সেই বছরই ৮ আগস্ট কবিগুরুর মহাপ্রয়াণের পরদিন বিদ্যালয় আয়োজিত শোকসভায়‘ভারত তীর্থ’কবিতাটি আবৃত্তি করে তিনি প্রথম জানান দিয়েছিলেন এক বিশ্বজনীন আবৃত্তি-প্রতিভার। ১৯৪৭ সালে ম্যাট্রিক পাসের পর উত্তাল সময়ে তিনি পাড়ি জমান কলকাতায়। সেখানেকলকাতা সিটি কলেজ থেকে বাণিজ্য বিভাগে স্নাতক ডিগ্রি অর্জনতাঁর সমাজবীক্ষাকে করেছিল আরও গূঢ়, শাণিত ও দার্শনিক।
১৯৫১ সালের অক্টোবরের শেষদিকে যখন তিনি পুনরায় জন্মভূমিতে ফিরে আসেন, তখন তাঁর শিল্পচেতনায় নতুন মাত্রা যোগ করেন আবৃত্তিকার ও অভিনেতা গোলাম মোস্তফা। ১৯৫২ সালের জুলাই মাসে কর্ণকাঠী গাউসেল আজম মাধ্যমিক বিদ্যালয়ে সহকারী প্রধান শিক্ষক হিসেবে যোগদানের মধ্য দিয়ে শুরু হয় এক মহান শিক্ষাব্রতীর যাত্রা। কিন্তু শাসকের রক্তচক্ষু তাঁকে থামিয়ে রাখতে পারেনি; আইয়ুব সরকারের হুলিয়া আর শিক্ষকতা নিষিদ্ধ হওয়ার খাঁড়া মাথায় নিয়েও তিনি ছিলেন অকুতোভয়। মণি সিং, মনোরমা বসু মাসীমা ও আবদুর রব সেরনিয়াবাতদের মতো মহীরুহদের উদ্দীপনায় ১৯৫৩ সালে কমিউনিস্ট পার্টির পতাকাতলে সক্রিয় হয়ে ওঠেন তিনি। ১৯৫৩ থেকে ১৯৫৭ সাল পর্যন্ত তৎকালীন জেলা যুবলীগের সাংস্কৃতিক সম্পাদক থেকে শুরু করে সভাপতির গুরুদায়িত্ব পালন—সবখানেই তিনি ছিলেন প্রগতির অগ্রদূত। এই দ্রোহের মূল্য দিতে গিয়ে পঞ্চাশের দশকে তাঁকে তিনবার কারবরণ করতে হয় এবং ১৯৬৫-র পাক-ভারত যুদ্ধের সময় কাটাতে হয় দীর্ঘ নজরবন্দী জীবন। কলমকেই তিনি করেছিলেন শোষণের বিরুদ্ধে শাণিত অস্ত্র। সাংবাদিক হিসেবে তাঁর সাহসী পদচারণা ছিল ‘সংবাদ’, ‘লোকবাণী’, ন্যাপের মুখপত্র ‘নতুন বাংলা’ এবং কমিউনিস্ট পার্টির মুখপত্র ‘একতা’র পাতায়।
নিখিল সেনের শিল্পীসত্তা ছিল এক অতল সমুদ্রের মতো বিশাল, যেখানে লীন হয়ে গিয়েছিল সুর, শব্দ আর দ্রোহের মোহনা। সেতারের তারে ওস্তাদ আলী হোসেন ও রমেশ চক্রবর্তীর কাছে নেওয়া তালিম তাঁর হৃদয়ে যে নান্দনিক সুরের ঝংকার তুলেছিল, তা তিনি বিলিয়ে দিয়েছিলেন বাংলার নাট্য ও আবৃত্তি আন্দোলনে। ১৯৫৩ সালে ‘বরিশাল থিয়েটার’ গড়ে তোলার মধ্য দিয়ে তিনি যে আন্দোলনের বীজ বুনেছিলেন, তা পরবর্তীতে ‘বরিশাল নাটক’ এবং ‘উদীচী শিল্পীগোষ্ঠী’র পতাকাতলে এক বিশাল মহীরুহে পরিণত হয়। ৩২টি নাটকের সার্থক নির্দেশনার পাশাপাশি অগণিত নাটকে তাঁর বলিষ্ঠ অভিনয় ইতিহাসের হাহাকারকে মঞ্চে জীবন্ত করে তুলত। ১৯৮২ সালে বাংলাদেশের প্রথম আবৃত্তি প্রশিক্ষণ কেন্দ্র গড়ে তোলার মাধ্যমে তিনি তৈরি করেছিলেন একদল শব্দসৈনিক। রবীন্দ্র সঙ্গীত সম্মিলন পরিষদ, জাতীয় আবৃত্তি সমন্বয় পরিষদ, জীবনানন্দ একাডেমী এবং অমৃত লাল দে মহাবিদ্যালয়ের পরিচালনা পর্ষদ—সবখানেই তাঁর উপস্থিতি ছিল এক আজন্ম সংস্কৃতির আরাধনা।
নিখিল সেনের জীবনকে যখন আমরা বিশ্বসাহিত্যের ক্যানভাসে রাখি, তখন তাঁর মাঝে খুঁজে পাওয়া যায় বিশ্ববিখ্যাত সব বিপ্লবীদের ছায়া। জার্মান নাট্যকার বার্টোল্ট ব্রেখট যেমন থিয়েটারকে করেছিলেন সমাজ পরিবর্তনের রাজনৈতিক অস্ত্র, নিখিল সেনও তেমনি তাঁর প্রতিটি মঞ্চায়নকে করেছিলেন শোষণের বিরুদ্ধে শৈল্পিক লড়াই। লাতিন আমেরিকার বিপ্লবী কবি পাবলো নেরুদার কলম যেমন আর্তমানবতার পক্ষে জেগে উঠেছিল, নিখিল সেনের সাংবাদিকতা ও কণ্ঠস্বরও ছিল ঠিক তেমনি প্রান্তিক মানুষের সপক্ষে এক অবিনাশী সুর। দক্ষিণ আফ্রিকার নেলসন ম্যান্ডেলার মতো তিনিও আদর্শের জন্য দীর্ঘ কারাবরণ ও জুলুম সহ্য করেও অবিচল ছিলেন। তাঁর শিল্প সাধনা কেবল নান্দনিকতার মোড়ক ছিল না; বরং তা ছিল সেবাস্তিয়ান বাখের সিম্ফনির মতো সুশৃঙ্খল এবং ভিক্টর হুগোর রচনার মতো গণমুখী।
তাঁর এই দীর্ঘ আট দশকের তপোনিষ্ঠ শিল্পসাধনা কেবল করতালি কিংবা স্তুতিতে সীমাবদ্ধ ছিল না, বরং তা পেয়েছে সর্বোচ্চ রাষ্ট্রীয় মর্যাদা। সময়ের শ্রেষ্ঠ সন্তান হিসেবে ২০১৮ সালে রাষ্ট্র তাঁকে দেশের ২য় সর্বোচ্চ বেসামরিক সম্মান 'একুশে পদক'-এ ভূষিত করে। এর আগে ১৯৯৯ সালে বাংলাদেশ গ্রুপ থিয়েটার ফেডারেশন পদক, ২০০৫ সালে শহীদ মুনীর চৌধুরী পদক এবং ২০১৫ সালে শিল্পকলা একাডেমী সম্মাননাসহ অগণিত স্বীকৃতি তাঁর প্রজ্ঞার সাক্ষ্য দেয়। ১৯৫৮ সালে শিক্ষা আন্দোলনের মিছিলে নারায়ণগঞ্জ থেকে চট্টগ্রাম পর্যন্ত তাঁর দরাজ কণ্ঠে গাওয়া ‘তালেব মাস্টার’ কবিতা শুনলে আজও মানুষের রক্তে শিহরণ জাগে।
দীর্ঘ ৮৮ বছরের এক বর্ণিল ও ঋদ্ধ জীবন শেষে, ২০১৯ সালের ২৫ ফেব্রুয়ারি এই মহাপ্রাণ বিদায় নেন নশ্বর পৃথিবী থেকে। আজ তিনি নেই, কিন্তু তাঁর মৃত্যু নেই। তিনি অমর হয়ে আছেন বরিশালের অশ্বিনীকুমার হলের মঞ্চে, প্রতিটি প্রগতিশীল মিছিলে আর বাঙালির শুদ্ধ সাংস্কৃতিক চেতনার স্পন্দনে। কীর্তনখোলার জল আজও তাঁর স্মৃতি বহন করে বয়ে চলে, আর বাতাসে প্রতিধ্বনিত হয় নিখিল সেনের সেই মেঘমন্দ্র কণ্ঠস্বর। তিনি বিশ্বাস করতেন, অভিনয় কেবল শিল্পের জন্য নয়, বরং মানুষের মুক্তির জন্য এক নিরন্তর আরতি। তিনি এমন এক জ্যোতিষ্ক, যাঁর আলোকবর্তিকা আমাদের পথ হারানো সময়ে অনন্তকাল সত্য ও সুন্দরের ধ্রুবপথ দেখাবে।
আজ ১৬ই এপ্রিল; শব্দ ও সুরের এই মহান জাদুকরের জন্মতিথি। জন্মক্ষণে বিনম্র শ্রদ্ধায় স্মরণ করি কীর্তনখোলার তীরের এই অকুতোভয় শব্দসারথিকে, যাঁর কণ্ঠ আজও আমাদের বেঁচে থাকার শক্তি যোগায়।
শুভ জন্মদিন, শ্রদ্ধেয় নিখিল সেন।
বাহাউদ্দিন গোলাপ
(লেখক: গবেষক, সংস্কৃতি কর্মী। ডেপুটি রেজিস্ট্রার, বরিশাল বিশ্ববিদ্যালয়, b_golap@yahoo.com, 01712070133)

১৪ মার্চ, ২০২৬ ১৪:৪৭
একটি সুস্থ সমাজ ও রাষ্ট্রের মেরুদণ্ড হলো তার সচেতন ও বিবেকবান নাগরিক সমাজ। কিন্তু বর্তমান সময়ের রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে একটি নেতিবাচক সংস্কৃতি অত্যন্ত প্রকট হয়ে উঠেছে, তা হলো ‘পদলেহন’ বা অন্ধ তোষামোদ। শাসক দলের নেতাদের তুষ্ট করে ব্যক্তিগত ফায়দা হাসিলের এই প্রবণতা কেবল একজন ব্যক্তির নৈতিক স্থলন ঘটায় না, বরং গোটা জাতির বিবেককে পঙ্গু করে দেয়।
[ব্যক্তিত্বের অবমাননা ও নৈতিক সংকট]
মানুষের সবচেয়ে বড় সম্পদ তার আত্মসম্মানবোধ। যখন কোনো ব্যক্তি স্রেফ ক্ষমতার কাছাকাছি থাকার জন্য বা কোনো বৈষয়িক লাভের আশায় কোনো নেতার অন্যায্য কাজের প্রশংসা করেন বা চাটুকারিতা করেন, তখন তিনি মূলত নিজের ব্যক্তিত্বকেই হত্যা করেন। পদলেহনকারী ব্যক্তি কখনোই স্বাধীনভাবে চিন্তা করতে পারেন না। তার প্রতিটি শব্দ ও কাজ পরিচালিত হয় অন্যের ইশারায়। এই দাসত্ব মানসিকতা মানুষের সহজাত সৃজনশীলতা ও সত্য বলার সাহস কেড়ে নেয়।
[গণতন্ত্রের জন্য হুমকি]
গণতন্ত্রের মূল ভিত্তি হলো সমালোচনা ও জবাবদিহিতা। শাসক দলের ভুলত্রুটি ধরিয়ে দেওয়া এবং জনস্বার্থে গঠনমূলক সমালোচনা করা প্রতিটি নাগরিকের দায়িত্ব। কিন্তু যখন চারদিকে শুধু ‘জি-হুজুর’ বলা মানুষের ভিড় বাড়ে, তখন শাসকরা নিজেদের অপরাজেয় এবং অভ্রান্ত ভাবতে শুরু করেন। তোষামোদকারীরা নেতাদের সামনে সত্যের আয়না ধরতে দেয় না, ফলে শাসকরা জনবিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েন। ইতিহাসে দেখা গেছে, যে শাসকের চারপাশে চাটুকারের সংখ্যা যত বেশি, তার পতন তত দ্রুত ও করুণ হয়েছে। কারণ, বিপদের সময় এই পদলেহনকারীরাই সবার আগে পক্ষ ত্যাগ করে।
[সমাজের ওপর নেতিবাচক প্রভাব]
একটি সমাজে যখন পদলেহনকারীরা পুরস্কৃত হয় এবং সত্যবাদীরা কোণঠাসা হয়, তখন তরুণ প্রজন্মের কাছে ভুল বার্তা যায়। তারা মনে করতে শুরু করে যে মেধা, যোগ্যতা বা সততা দিয়ে নয়, বরং দালালি আর তেলবাজি করেই জীবনে সফল হওয়া সম্ভব। এর ফলে পেশাদারিত্ব নষ্ট হয় এবং অযোগ্য মানুষরা গুরুত্বপূর্ণ সব স্থান দখল করে নেয়। দীর্ঘমেয়াদে এটি রাষ্ট্রকে মেধাশূন্য করে ফেলে।
[আদর্শিক অবস্থান ও সমাধান]
নেতাদের প্রতি শ্রদ্ধা থাকা ভালো, কিন্তু সেই শ্রদ্ধা যেন দাসে পরিণত না করে। একজন প্রকৃত দেশপ্রেমিক নেতার অন্ধ অনুসারী না হয়ে তার আদর্শের অনুসারী হন। সত্যকে সত্য বলা এবং মিথ্যাকে মিথ্যা বলার সাহস রাখাটাই হলো প্রকৃত বীরত্ব। শাসক দলের নেতাদের তুষ্ট করার চেয়ে জনকল্যাণ ও ন্যায়ের পথে অটল থাকা অনেক বেশি সম্মানজনক।
মনে রাখতে হবে, ক্ষমতা চিরস্থায়ী নয়। আজ যিনি ক্ষমতার শীর্ষে, কাল তিনি সাধারণ নাগরিক। কিন্তু আপনার মেরুদণ্ড এবং বিবেক যদি আপনি বিকিয়ে দেন, তবে সেই ক্ষতি কোনোদিন পূরণ হওয়ার নয়। ইতিহাসে সেই সব মানুষই অমর হয়ে থাকেন, যারা ক্ষমতার দাপটে মাথা নত করেননি, বরং মাথা উঁচু করে সত্যের জয়গান গেয়েছেন।
লেখক হাসিবুল ইসলাম
সভাপতি, নিউজ এডিটরস্ কাউন্সিল, বরিশাল, বরিশাল ব্যুরো চিফ দৈনিক রূপালী বাংলাদেশ এবং বার্তা সম্পাদক বরিশালটাইমস।
একটি সুস্থ সমাজ ও রাষ্ট্রের মেরুদণ্ড হলো তার সচেতন ও বিবেকবান নাগরিক সমাজ। কিন্তু বর্তমান সময়ের রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে একটি নেতিবাচক সংস্কৃতি অত্যন্ত প্রকট হয়ে উঠেছে, তা হলো ‘পদলেহন’ বা অন্ধ তোষামোদ। শাসক দলের নেতাদের তুষ্ট করে ব্যক্তিগত ফায়দা হাসিলের এই প্রবণতা কেবল একজন ব্যক্তির নৈতিক স্থলন ঘটায় না, বরং গোটা জাতির বিবেককে পঙ্গু করে দেয়।
[ব্যক্তিত্বের অবমাননা ও নৈতিক সংকট]
মানুষের সবচেয়ে বড় সম্পদ তার আত্মসম্মানবোধ। যখন কোনো ব্যক্তি স্রেফ ক্ষমতার কাছাকাছি থাকার জন্য বা কোনো বৈষয়িক লাভের আশায় কোনো নেতার অন্যায্য কাজের প্রশংসা করেন বা চাটুকারিতা করেন, তখন তিনি মূলত নিজের ব্যক্তিত্বকেই হত্যা করেন। পদলেহনকারী ব্যক্তি কখনোই স্বাধীনভাবে চিন্তা করতে পারেন না। তার প্রতিটি শব্দ ও কাজ পরিচালিত হয় অন্যের ইশারায়। এই দাসত্ব মানসিকতা মানুষের সহজাত সৃজনশীলতা ও সত্য বলার সাহস কেড়ে নেয়।
[গণতন্ত্রের জন্য হুমকি]
গণতন্ত্রের মূল ভিত্তি হলো সমালোচনা ও জবাবদিহিতা। শাসক দলের ভুলত্রুটি ধরিয়ে দেওয়া এবং জনস্বার্থে গঠনমূলক সমালোচনা করা প্রতিটি নাগরিকের দায়িত্ব। কিন্তু যখন চারদিকে শুধু ‘জি-হুজুর’ বলা মানুষের ভিড় বাড়ে, তখন শাসকরা নিজেদের অপরাজেয় এবং অভ্রান্ত ভাবতে শুরু করেন। তোষামোদকারীরা নেতাদের সামনে সত্যের আয়না ধরতে দেয় না, ফলে শাসকরা জনবিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েন। ইতিহাসে দেখা গেছে, যে শাসকের চারপাশে চাটুকারের সংখ্যা যত বেশি, তার পতন তত দ্রুত ও করুণ হয়েছে। কারণ, বিপদের সময় এই পদলেহনকারীরাই সবার আগে পক্ষ ত্যাগ করে।
[সমাজের ওপর নেতিবাচক প্রভাব]
একটি সমাজে যখন পদলেহনকারীরা পুরস্কৃত হয় এবং সত্যবাদীরা কোণঠাসা হয়, তখন তরুণ প্রজন্মের কাছে ভুল বার্তা যায়। তারা মনে করতে শুরু করে যে মেধা, যোগ্যতা বা সততা দিয়ে নয়, বরং দালালি আর তেলবাজি করেই জীবনে সফল হওয়া সম্ভব। এর ফলে পেশাদারিত্ব নষ্ট হয় এবং অযোগ্য মানুষরা গুরুত্বপূর্ণ সব স্থান দখল করে নেয়। দীর্ঘমেয়াদে এটি রাষ্ট্রকে মেধাশূন্য করে ফেলে।
[আদর্শিক অবস্থান ও সমাধান]
নেতাদের প্রতি শ্রদ্ধা থাকা ভালো, কিন্তু সেই শ্রদ্ধা যেন দাসে পরিণত না করে। একজন প্রকৃত দেশপ্রেমিক নেতার অন্ধ অনুসারী না হয়ে তার আদর্শের অনুসারী হন। সত্যকে সত্য বলা এবং মিথ্যাকে মিথ্যা বলার সাহস রাখাটাই হলো প্রকৃত বীরত্ব। শাসক দলের নেতাদের তুষ্ট করার চেয়ে জনকল্যাণ ও ন্যায়ের পথে অটল থাকা অনেক বেশি সম্মানজনক।
মনে রাখতে হবে, ক্ষমতা চিরস্থায়ী নয়। আজ যিনি ক্ষমতার শীর্ষে, কাল তিনি সাধারণ নাগরিক। কিন্তু আপনার মেরুদণ্ড এবং বিবেক যদি আপনি বিকিয়ে দেন, তবে সেই ক্ষতি কোনোদিন পূরণ হওয়ার নয়। ইতিহাসে সেই সব মানুষই অমর হয়ে থাকেন, যারা ক্ষমতার দাপটে মাথা নত করেননি, বরং মাথা উঁচু করে সত্যের জয়গান গেয়েছেন।
লেখক হাসিবুল ইসলাম
সভাপতি, নিউজ এডিটরস্ কাউন্সিল, বরিশাল, বরিশাল ব্যুরো চিফ দৈনিক রূপালী বাংলাদেশ এবং বার্তা সম্পাদক বরিশালটাইমস।
Google AdSense
This is a demo ad. Your live ads will be displayed here once AdSense is properly configured.
Google AdSense
This is a demo ad. Your live ads will be displayed here once AdSense is properly configured.