বরিশাল জেলা শিল্পকলা একাডেমির কালচারাল অফিসার অসিত বরণ দাশগুপ্তের বিরুদ্ধে ভুয়া বিল-ভাউচারের মাধ্যমে অর্থ আত্মসাতের অভিযোগ পাওয়া গেছে। কদিন আগে জেলা শিল্পকলা একাডেমি অনুমোদিত একটি বিলের ভাউচার নিয়ে বরিশাল নগরের সদর রোডের একটি ফুলের দোকানে গিয়ে দেখিয়ে জানতে চাওয়া হয়, এই বিল তারা করেছেন কিনা। ফুল দোকানের মালিক মো. ইভান সঙ্গে সঙ্গে উত্তর দেন, ‘না না। আমরা এই বিল করিনি।’
এই বিলের ভাউচারে একটি ফুলের তোড়া বাবদ পাঁচ হাজার টাকা দেখানো হয়েছে। ইভান বলেন, ‘জেলা শিল্পকলা একাডেমি প্রায়ই আমার দোকান থেকে ফুলের তোড়া নেয়। যার বিল সর্বোচ্চ ৫০০ টাকা। তবে ফুলের তোড়া নেওয়ার সময় শিল্পকলা একাডেমি বিলের খালি পাতা নেয়। আমার ধারণা, খালি পাতায় পাঁচ হাজার টাকা বসিয়ে দিয়েছেন শিল্পকলার কর্মকর্তারা। ফুলের তোড়ার বিল আমরা ৫০০ টাকাই করি।’
তাহলে কেন বিলের খালি পাতা দিচ্ছেন এমন প্রশ্নের জবাবে ইভান বলেন, ‘ক্রেতা ধরে রাখতে এইটুকু সুযোগ দিতে হয়। না হয় পরে তারা আর ফুল কিনতে আসবে না।’
একইভাবে এক হাজার ৮০০ টাকার আরেকটি বিল ভাউচারে ১৮ হাজার টাকা দেখানো হয়েছে। এভাবে ভুয়া বিল-ভাউচারের মাধ্যমে অসিত বরণ দাশগুপ্ত অর্থ আত্মসাৎ করছেন বলে জানা গেছে। জেলা শিল্পকলা একাডেমির কালচারাল অফিসার হিসেবে অসিত বরণ দাশগুপ্ত গত ১২ জানুয়ারি যোগ দেন। এরপর থেকে একের পর এক দুর্নীতির অভিযোগ ওঠে তার বিরুদ্ধে। যা নিয়ে বরিশালের সাংস্কৃতিক অঙ্গনের নেতৃবৃন্দও উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন।
সর্বশেষ রবীন্দ্র সংগীত সম্মেলনে দুর্নীতির অভিযোগ ওঠে তার বিরুদ্ধে। এক হাজার ৮০০ টাকা করে ২৬টি সংগঠনে ৪৬ হাজার ৮০০ টাকা বরাদ্দ দেওয়া হয়। কিন্তু কালচারাল কর্মকর্তা সেখানে ১৮ হাজার টাকা করে চার লাখ ৬৮ হাজার টাকার বিল করেন বলে নাম প্রকাশ না করা শর্তে একাধিক সংগঠক জানিয়েছেন। এ ছাড়া বিভিন্ন অনুষ্ঠানের খাবার বাবদ অতিরিক্ত বিল করে টাকা আত্মসাৎ করছেন অভিযোগ রয়েছে।
গত ৩০ জুন জেলা কালচারাল কর্মকর্তা স্বাক্ষরিত নোটিশে সাংস্কৃতিক প্রশিক্ষণ বন্ধের ঘোষণা দেওয়া হয়। নোটিশে উল্লেখ করা হয় সাময়িক সময়ের জন্য এ কার্যক্রম বন্ধ থাকবে। তবে কবে নাগাদ চালু হবে, সে বিষয়ে কোনও তথ্য দেওয়া হয়নি। এতে শিল্পকলা একাডেমিতে দায়িত্বরত প্রশিক্ষকরা ক্ষুব্ধ হন। তাদের দাবি, প্রতিষ্ঠানটির সাবেক কালচারাল কর্মকর্তা হাসানুর রশীদ শিল্পকলায় নিযুক্ত ১২ জন প্রশিক্ষকের ২০২৪-২৫ সালের চুক্তিনামা নবায়ন করে যেতে পারেননি। তবে প্রশিক্ষকরা তাদের কার্যক্রম চালিয়ে গেছেন। নবায়নের জন্য কয়েক দফায় সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের কাছে গেছেন তারা। কিন্তু এখন পর্যন্ত তা সুরাহা হয়নি। তাদের অভিযোগ, অসিত বরণ দাশগুপ্ত প্রশিক্ষক নিয়োগ নিয়েও দুর্নীতি করছেন।
ইতিমধ্যেই অসিত বরণ দাশগুপ্তের বিরুদ্ধে দুর্নীতি, অনিয়মের তথ্য সংগ্রহ করে লিখিত অভিযোগপত্র দেওয়া হয়েছে। গত ১ জুলাই বরিশালের গণমাধ্যমকর্মী মুহম্মদ ইমন খন্দকার হৃদয় অভিযোগপত্রটি বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমির তৎকালীন ভারপ্রাপ্ত মহাপরিচালক ওয়ারেছ হোসেন, বরিশালের জেলা প্রশাসক ও শিল্পকলা একাডেমির সভাপতি মোহাম্মদ দেলোয়ার হোসেন এবং দুদকের বরিশাল আঞ্চলিক কার্যালয়ের উপপরিচালক মো. এইচএম আক্তারুজ্জামানের বরাবর দাখিল করেন।
অভিযোগপত্রে মুহম্মদ ইমন খন্দকার উল্লেখ করেন, অসিত বরণ দাশগুপ্ত ২০১৩ সালে কালচারাল অফিসার হিসেবে নিয়োগ পাওয়ার পর থেকে সিলেট, হবিগঞ্জ ও বর্তমানে বরিশালে দায়িত্ব পালনকালে নানা অনিয়ম-দুর্নীতিতে জড়িয়ে পড়েন। ২০১৬ সালে সিলেটে নারী কেলেঙ্কারির ঘটনায় তার বিরুদ্ধে মামলা হয় এবং স্থানীয় সাংস্কৃতিক কর্মীরা স্মারকলিপি দেন। ২০২৪ সালে সিলেটে তার অপসারণের দাবিতে বিক্ষোভ করা হয়। ২০২৫ সালে তাকে বরিশালে বদলি করা হয়। বরিশালে যোগদানের পর থেকেই সরকারি রেস্ট হাউজে পরিবারসহ মাসের পর মাস অবৈধভাবে বসবাস করে প্রায় পাঁচ লাখ টাকার রাজস্ব ফাঁকি দিয়েছেন। একইসঙ্গে হলরুম ভাড়ার টাকা গোপন রেখে তা ব্যক্তিগতভাবে এবং স্থানীয় ও সাধারণ ফান্ডের ২৯ লাখ টাকার একটি বড় অংশ তুলে আত্মসাৎ করেন। এ ছাড়া জনসাধারণের প্রবেশে বাধা সৃষ্টি করে পুরো প্রতিষ্ঠানটি নিয়ন্ত্রণে রেখেছেন।
এ ব্যাপারে জানতে চাইলে অভিযোগকারী মুহম্মদ ইমন খন্দকার বলেন, ‘বরিশাল একটি সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যবাহী অঞ্চল। এখানে কোনও দুর্নীতিবাজের ঠাঁই হতে পারে না। অসিত বরণ বরিশালের সাংস্কৃতিক অঙ্গনকে কলুষিত করছেন। তার কর্মকাণ্ড জুলাই-আগস্ট চেতনার পরিপন্থি। এজন্য তার বিরুদ্ধে সব দুর্নীতির অভিযোগে বিভিন্ন দফতরে লিখিত অভিযোগ দিয়েছি। তদন্ত সাপেক্ষে তার শাস্তি দাবি করছি।’
বাংলাদেশ সাংস্কৃতিক জোটের আহ্বায়ক সাব্বির নেওয়াজ সাগর বলেন, ‘জুলাই পরবর্তী বরিশাল শিল্পকলা একাডেমি ফ্যাসিবাদের দোসর ছাড়া সবার জন্য একটি প্রতিষ্ঠান হবে এটাই আশা করেছিলাম। কিন্তু আমরা আশাহত হয়েছি। অসিত বরণ সিলেট ও হবিগঞ্জে কালচারাল অফিসার থাকাকালীন তার বিরুদ্ধে একাধিক অভিযোগ থাকা সত্ত্বেও আমরা সুযোগ দিতে চেয়েছিলাম। কিন্তু তার কর্মকাণ্ড আগের মতো। বাংলাদেশ সাংস্কৃতিক জোটের পক্ষ থেকে আমরাও তদন্ত কমিটি গঠন করে দ্রুত শাস্তিমূলক ব্যবস্থা গ্রহণের দাবি জানাচ্ছি। এ নিয়ে শিল্পকলা একাডেমির মহাপরিচালকের কাছে লিখিত অভিযোগ করবো।’
লেখক গবেষক সাইফুল আহসান বুলবুল, নাট্যমের সংগঠক বাসুদেব ঘোষ, রিপন গুহ এবং শব্দাবলী গ্রুপ থিয়েটারের অনিমেষ লিটুসহ একাধিক সাংস্কৃতিক কর্মী জানিয়েছেন, অসিত বরণ দাশগুপ্তের বিরুদ্ধে দুর্নীতি, স্বজনপ্রীতি, স্বেচ্ছাচারিতা ও প্রশাসনিক অনিয়মের অভিযোগের শেষ নেই। তিনি যোগদানের পর থেকেই নানা অনিয়ম-দুর্নীতি করছেন। বিষয়টি জেলা প্রশাসনও জানে। তারা বলছে তদন্ত করছে। তবে কতদূর এগিয়েছে তা জানা নেই। আমাদের পক্ষ থেকে দাবি, দ্রুত সময়ের মধ্যে তদন্ত করে অসিত বরণের বিরুদ্ধে বিভাগীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করা হোক। যাতে পরবর্তী কর্মকর্তা এ ধরনের দুর্নীতি করার আগে শতবার চিন্তা করেন।
অভিযুক্ত জেলা শিল্পকলা একাডেমির কালচারাল কর্মকর্তা অসিত বরণ দাশগুপ্ত বলেন, ‘আমার বিরুদ্ধে উদ্দেশ্যপ্রণোদিত ও ভিত্তিহীন অভিযোগ আনা হয়েছে। আমি নিয়ম মেনেই দায়িত্ব পালন করে যাচ্ছি।’
এক হাজার ৮০০ টাকার বিল ১৮ হাজার টাকা এবং ৫০০ টাকার ফুলের বিল পাঁচ হাজার টাকা কীভাবে দেখানো হলো জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘এটি কারা করেছে, তা আমার জানা নেই।’
এ ব্যাপারে জানতে চাইলে জেলা প্রশাসক ও শিল্পকলা একাডেমির সভাপতি মোহাম্মদ দেলোয়ার হোসেন বলেন, ‘কালচারাল কর্মকর্তা অসিত বরণের বিরুদ্ধে তদন্ত চলমান রয়েছে। অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (শিক্ষা ও আইসিটি) উপমা ফারিসাকে প্রধান করে তিন সদস্যের তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে। ৮ আগস্ট থেকে তারা কাজ শুরু করেছেন। প্রতিবেদন পাওয়ার পর ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’
তদন্তকারী কর্মকর্তা অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক উপমা ফারিসা বলেন, ‘লিখিত অভিযোগের পরিপ্রেক্ষিতে সাক্ষ্য-প্রমাণ সংগ্রহের কাজ চলছে। তদন্ত শেষে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।’
এ বিষয়ে জানতে চাইলে বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমির মহাপরিচালক কবি রেজাউদ্দিন স্টালিন বলেন, ‘আমি এখন পর্যন্ত এ বিষয়ে কিছুই জানি না। নতুন যোগ দিয়েছি। তবে আজ থেকে বরিশাল জেলা শিল্পকলা একাডেমির কালচারাল কর্মকর্তার অভিযোগের বিষয় নিয়ে কাজ করবো।’

১৫ সেপ্টেম্বর, ২০২৬ ০০:০৬
‘মাদককে বলি না, শিক্ষা ও সৃষ্টিশীলতায় এগিয়ে চলি সর্বদা’ -এ স্লোগানকে সামনে রেখে বাবুগঞ্জে মাদকবিরোধী ক্যাম্পেইন শুরু করেছে বাবুগঞ্জ ডিগ্রি কলেজ। এরই ধারাবাহিকতায় রোববার কলেজ মিলনায়তনে এক মাদকবিরোধী সচেতনতা ও উদ্বুদ্ধকরণ সভা অনুষ্ঠিত হয়েছে। সভায় মাদক প্রতিরোধে সম্মিলিতভাবে কাজ করার অঙ্গীকার করেছেন কলেজের শিক্ষক-শিক্ষার্থী এবং অভিভাবকরা।
রোববার সকালে বাবুগঞ্জ ডিগ্রি কলেজের আয়োজনে মাদকবিরোধী সচেতনতামূলক কার্যক্রমের অংশ হিসেবে ওই উদ্বুদ্ধকরণ সভা অনুষ্ঠিত হয়। কলেজের অধ্যক্ষ আ.ন.ম. আব্দুল হালিমের সভাপতিত্বে সভায় প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন বাবুগঞ্জ উপজেলা সহকারী কমিশনার (ভূমি) কামরুন্নাহার তামান্না।
সভায় বিশেষ অতিথি হিসেবে বক্তব্য রাখেন বাবুগঞ্জ উপজেলা বিএনপির যুগ্ম-আহবায়ক সামসুল আলম ফকির, কলেজের সাবেক ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষ মো. শাহে আলম, সহকারী অধ্যাপক মো. গোলাম হোসেন, কলেজের গভর্নিং বডির অভিভাবক সদস্য হারুন অর রশীদ, বাবুগঞ্জ থানার উপ-পরিদর্শক মাসুদ রানা প্রমুখ। অনুষ্ঠান সঞ্চালনা করেন কলেজের সহকারী অধ্যাপক শাহ-ই আলম হাওলাদার।
প্রধান অতিথির বক্তব্যে বাবুগঞ্জ উপজেলা সহকারী কমিশনার (ভূমি) কামরুন্নাহার তামান্না বলেন, 'মাদক আজ এক সামাজিক ব্যাধিতে পরিণত হয়েছে। মাদকের জন্য ব্যক্তি, পরিবার ও সমাজ ধ্বংস হয়ে যাচ্ছে। তাই সবার আগে আমাদের শিক্ষার্থী এবং তরুণ প্রজন্মকে মাদকের ভয়াবহতা থেকে রক্ষা করতে সম্মিলিত উদ্যোগ নিতে হবে। শুধু আইন প্রয়োগ করে মাদক নির্মূল সম্ভব নয়। এজন্য পারিবারিক, সামাজিক ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানভিত্তিক সচেতনতা সবচেয়ে বেশি জরুরি।'
মাদকবিরোধী ক্যাম্পেইন প্রসঙ্গে বাবুগঞ্জ ডিগ্রি কলেজের অধ্যক্ষ আ.ন.ম. আব্দুল হালিম জানান, মাদক আজ সর্বত্র সর্বগ্রাসী রূপ নিয়েছে। তাই শিক্ষার্থীদের মাদক থেকে নিরাপদ রাখতে বাবুগঞ্জ ডিগ্রি কলেজের পক্ষ থেকে এই সচেতনতামূলক কার্যক্রম শুরু করা হয়েছে। শিক্ষার্থী এবং তাদের অভিভাবকদের সাথে এ বিষয়ে নিয়মিত মতবিনিময় ও সচেতনতামূলক কার্যক্রম করা হবে। বাবুগঞ্জ ডিগ্রি কলেজ ক্যাম্পাস মাদকমুক্ত রাখাসহ অত্র প্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থীরা যাতে মাদকের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়াতে পারে সেজন্য শিক্ষক-শিক্ষার্থী এবং অভিভাবকদের নিয়ে একটি সমন্বিত উদ্যোগসহ বিভিন্ন কর্মপরিকল্পনা গ্রহণ করা হয়েছে। #
‘মাদককে বলি না, শিক্ষা ও সৃষ্টিশীলতায় এগিয়ে চলি সর্বদা’ -এ স্লোগানকে সামনে রেখে বাবুগঞ্জে মাদকবিরোধী ক্যাম্পেইন শুরু করেছে বাবুগঞ্জ ডিগ্রি কলেজ। এরই ধারাবাহিকতায় রোববার কলেজ মিলনায়তনে এক মাদকবিরোধী সচেতনতা ও উদ্বুদ্ধকরণ সভা অনুষ্ঠিত হয়েছে। সভায় মাদক প্রতিরোধে সম্মিলিতভাবে কাজ করার অঙ্গীকার করেছেন কলেজের শিক্ষক-শিক্ষার্থী এবং অভিভাবকরা।
রোববার সকালে বাবুগঞ্জ ডিগ্রি কলেজের আয়োজনে মাদকবিরোধী সচেতনতামূলক কার্যক্রমের অংশ হিসেবে ওই উদ্বুদ্ধকরণ সভা অনুষ্ঠিত হয়। কলেজের অধ্যক্ষ আ.ন.ম. আব্দুল হালিমের সভাপতিত্বে সভায় প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন বাবুগঞ্জ উপজেলা সহকারী কমিশনার (ভূমি) কামরুন্নাহার তামান্না।
সভায় বিশেষ অতিথি হিসেবে বক্তব্য রাখেন বাবুগঞ্জ উপজেলা বিএনপির যুগ্ম-আহবায়ক সামসুল আলম ফকির, কলেজের সাবেক ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষ মো. শাহে আলম, সহকারী অধ্যাপক মো. গোলাম হোসেন, কলেজের গভর্নিং বডির অভিভাবক সদস্য হারুন অর রশীদ, বাবুগঞ্জ থানার উপ-পরিদর্শক মাসুদ রানা প্রমুখ। অনুষ্ঠান সঞ্চালনা করেন কলেজের সহকারী অধ্যাপক শাহ-ই আলম হাওলাদার।
প্রধান অতিথির বক্তব্যে বাবুগঞ্জ উপজেলা সহকারী কমিশনার (ভূমি) কামরুন্নাহার তামান্না বলেন, 'মাদক আজ এক সামাজিক ব্যাধিতে পরিণত হয়েছে। মাদকের জন্য ব্যক্তি, পরিবার ও সমাজ ধ্বংস হয়ে যাচ্ছে। তাই সবার আগে আমাদের শিক্ষার্থী এবং তরুণ প্রজন্মকে মাদকের ভয়াবহতা থেকে রক্ষা করতে সম্মিলিত উদ্যোগ নিতে হবে। শুধু আইন প্রয়োগ করে মাদক নির্মূল সম্ভব নয়। এজন্য পারিবারিক, সামাজিক ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানভিত্তিক সচেতনতা সবচেয়ে বেশি জরুরি।'
মাদকবিরোধী ক্যাম্পেইন প্রসঙ্গে বাবুগঞ্জ ডিগ্রি কলেজের অধ্যক্ষ আ.ন.ম. আব্দুল হালিম জানান, মাদক আজ সর্বত্র সর্বগ্রাসী রূপ নিয়েছে। তাই শিক্ষার্থীদের মাদক থেকে নিরাপদ রাখতে বাবুগঞ্জ ডিগ্রি কলেজের পক্ষ থেকে এই সচেতনতামূলক কার্যক্রম শুরু করা হয়েছে। শিক্ষার্থী এবং তাদের অভিভাবকদের সাথে এ বিষয়ে নিয়মিত মতবিনিময় ও সচেতনতামূলক কার্যক্রম করা হবে। বাবুগঞ্জ ডিগ্রি কলেজ ক্যাম্পাস মাদকমুক্ত রাখাসহ অত্র প্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থীরা যাতে মাদকের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়াতে পারে সেজন্য শিক্ষক-শিক্ষার্থী এবং অভিভাবকদের নিয়ে একটি সমন্বিত উদ্যোগসহ বিভিন্ন কর্মপরিকল্পনা গ্রহণ করা হয়েছে। #

১৪ সেপ্টেম্বর, ২০২৬ ২২:২৪
বরিশালে স্ত্রীকে হত্যার দায়ে এলজিইডির সাবেক প্রকৌশলী জহিরুল ইসলামকে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড দিয়েছেন আদালত। একই মামলায় হোটেল ম্যানেজার আবদুল মালেককে পাঁচ বছরের সশ্রম কারাদণ্ড দেওয়া হয়েছে।
সোমবার (১৪ সেপ্টেম্বর) দুপুরে বরিশাল জেলা ও দায়রা জজ আদালতের দ্রুত বিচার ট্রাইব্যুনালের বিচারক মোসতাক আহমেদ এ রায় ঘোষণা করেন। পরে তাদের বরিশাল কেন্দ্রীয় কারাগারে পাঠানো হয়।
দ্রুত বিচার ট্রাইব্যুনালের পিপি অ্যাডভোকেট মহাসিন মন্টু রায়ের বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন।
মামলার সুত্রে জানা যায়, ২০১০ সালের ১৫ ফেব্রুয়ারি বরিশাল নগরের সদর রোডে অবস্থিত হোটেল আলী ইন্টারন্যাশনালের পঞ্চম তলার একটি কক্ষে স্ত্রী নাজমা জহির শোভাকে নিয়ে যান জহিরুল ইসলাম। সেখানে ছুরি দিয়ে গলায় আঘাত করে শোভাকে হত্যা করা হয়।
ঘটনার দিনই নিহতের বোন নিলুফা আইরিন বরিশাল কোতোয়ালি মডেল থানায় মামলা করেন। মামলায় জহিরুল ইসলাম ও হোটেলটির ম্যানেজার আবদুল মালেককে আসামি করা হয়।
পরে পুলিশ তদন্ত শেষে দুজনের বিরুদ্ধে আদালতে অভিযোগপত্র জমা দেয়। মামলায় মোট ১৩ জন সাক্ষীর মধ্যে ১০ জনের সাক্ষ্য গ্রহণ করা হয়। দীর্ঘ বিচারিক প্রক্রিয়া শেষে সোমবার আদালত রায় ঘোষণা করেন।
বাদীপক্ষের আইনজীবী মো. আনোয়ার হোসেন মিজান জানান, নিহত শোভার ছোট বোন রুমা আক্তারের সঙ্গে জহিরুল ইসলামের প্রেমের সম্পর্ক ছিল। বিষয়টি শোভা জানতে পারার পর তাকে পরিকল্পিতভাবে হত্যা করা হয় বলে মামলার অভিযোগে উল্লেখ করা হয়েছে।
তিনি আরও জানান, হত্যাকাণ্ডের সময় জহিরুল ইসলাম বরিশাল এলজিইডিতে প্রকৌশলী হিসেবে কর্মরত ছিলেন। গ্রেপ্তারের পর তিনি আদালতে স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দেন।
অন্যদিকে, হোটেল ম্যানেজার আবদুল মালেকের বিরুদ্ধে হোটেল পরিচালনায় অনিয়মের প্রমাণ পাওয়ায় আদালত তাকে পাঁচ বছরের সশ্রম কারাদণ্ড দিয়েছেন বলে জানান বাদীপক্ষের আইনজীবী।
প্রায় ১৬ বছর ধরে চলা বিচারপ্রক্রিয়ার পর দেওয়া এ রায়ে সন্তোষ প্রকাশ করেছেন নিহতের স্বজন ও বাদীপক্ষ।
আইনজীবী আনোয়ার হোসেন মিজান বলেন, আদালতের রায়ের মাধ্যমে ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। তাই রায়ের বিরুদ্ধে তারা আপিল করবেন না।
বরিশালে স্ত্রীকে হত্যার দায়ে এলজিইডির সাবেক প্রকৌশলী জহিরুল ইসলামকে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড দিয়েছেন আদালত। একই মামলায় হোটেল ম্যানেজার আবদুল মালেককে পাঁচ বছরের সশ্রম কারাদণ্ড দেওয়া হয়েছে।
সোমবার (১৪ সেপ্টেম্বর) দুপুরে বরিশাল জেলা ও দায়রা জজ আদালতের দ্রুত বিচার ট্রাইব্যুনালের বিচারক মোসতাক আহমেদ এ রায় ঘোষণা করেন। পরে তাদের বরিশাল কেন্দ্রীয় কারাগারে পাঠানো হয়।
দ্রুত বিচার ট্রাইব্যুনালের পিপি অ্যাডভোকেট মহাসিন মন্টু রায়ের বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন।
মামলার সুত্রে জানা যায়, ২০১০ সালের ১৫ ফেব্রুয়ারি বরিশাল নগরের সদর রোডে অবস্থিত হোটেল আলী ইন্টারন্যাশনালের পঞ্চম তলার একটি কক্ষে স্ত্রী নাজমা জহির শোভাকে নিয়ে যান জহিরুল ইসলাম। সেখানে ছুরি দিয়ে গলায় আঘাত করে শোভাকে হত্যা করা হয়।
ঘটনার দিনই নিহতের বোন নিলুফা আইরিন বরিশাল কোতোয়ালি মডেল থানায় মামলা করেন। মামলায় জহিরুল ইসলাম ও হোটেলটির ম্যানেজার আবদুল মালেককে আসামি করা হয়।
পরে পুলিশ তদন্ত শেষে দুজনের বিরুদ্ধে আদালতে অভিযোগপত্র জমা দেয়। মামলায় মোট ১৩ জন সাক্ষীর মধ্যে ১০ জনের সাক্ষ্য গ্রহণ করা হয়। দীর্ঘ বিচারিক প্রক্রিয়া শেষে সোমবার আদালত রায় ঘোষণা করেন।
বাদীপক্ষের আইনজীবী মো. আনোয়ার হোসেন মিজান জানান, নিহত শোভার ছোট বোন রুমা আক্তারের সঙ্গে জহিরুল ইসলামের প্রেমের সম্পর্ক ছিল। বিষয়টি শোভা জানতে পারার পর তাকে পরিকল্পিতভাবে হত্যা করা হয় বলে মামলার অভিযোগে উল্লেখ করা হয়েছে।
তিনি আরও জানান, হত্যাকাণ্ডের সময় জহিরুল ইসলাম বরিশাল এলজিইডিতে প্রকৌশলী হিসেবে কর্মরত ছিলেন। গ্রেপ্তারের পর তিনি আদালতে স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দেন।
অন্যদিকে, হোটেল ম্যানেজার আবদুল মালেকের বিরুদ্ধে হোটেল পরিচালনায় অনিয়মের প্রমাণ পাওয়ায় আদালত তাকে পাঁচ বছরের সশ্রম কারাদণ্ড দিয়েছেন বলে জানান বাদীপক্ষের আইনজীবী।
প্রায় ১৬ বছর ধরে চলা বিচারপ্রক্রিয়ার পর দেওয়া এ রায়ে সন্তোষ প্রকাশ করেছেন নিহতের স্বজন ও বাদীপক্ষ।
আইনজীবী আনোয়ার হোসেন মিজান বলেন, আদালতের রায়ের মাধ্যমে ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। তাই রায়ের বিরুদ্ধে তারা আপিল করবেন না।

১৪ সেপ্টেম্বর, ২০২৬ ১৮:২৯
একজন সাংবাদিকের দীর্ঘ কর্মজীবনের শেষ অধ্যায় কি এমনই হওয়ার কথা ছিল? দুই দশকেরও বেশি সময় সাংবাদিকতা করেছেন পুলক চ্যাটার্জি। দৈনিক সমকালের প্রতিষ্ঠালগ্ন থেকে ২০২৩ সাল পর্যন্ত ছিলেন প্রতিষ্ঠানটির বরিশাল ব্যুরোর গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্বে। বরিশাল প্রেসক্লাবের সাধারণ সম্পাদক হিসেবেও দায়িত্ব পালন করেছেন। অথচ কর্মজীবনের শেষদিকে এসে চাকরি হারিয়েছেন, দীর্ঘ সময় বেকার ছিলেন, আর্থিক সংকটে পড়েছেন- এমন তথ্যই এখন তাঁর মৃত্যুর পর সামনে আসছে। শুক্রবার (১১ সেপ্টেম্বর) তাঁর আকস্মিক ও অস্বাভাবিক মৃত্যুর পর সেই প্রশ্নটিই সবচেয়ে জোরালো হয়ে উঠেছে-একজন প্রবীণ ও অভিজ্ঞ সাংবাদিক যখন একের পর এক সংকটে পড়ছিলেন, তখন তাঁর পাশে ছিলেন কে?
শুধু ব্যক্তিগত হতাশা, শারীরিক সমস্যা কিংবা আর্থিক সংকট দিয়ে কি এই মৃত্যুর পুরো প্রেক্ষাপট ব্যাখ্যা করা সম্ভব? নাকি এর পেছনে রয়েছে দীর্ঘদিনের পেশাগত অনিশ্চয়তা, কর্মহীনতা, পাওনা নিয়ে জটিলতা এবং সাংবাদিক সমাজের কাঠামোগত দুর্বলতা? এসব প্রশ্নের উত্তর এখন জরুরি।
সিনিয়র সাংবাদিক পুলক চ্যাটার্জি ২০০৫ সালে দৈনিক সমকালের প্রতিষ্ঠালগ্ন থেকে প্রতিষ্ঠানটির সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। দীর্ঘ প্রায় ১৮ বছর তিনি বরিশাল ব্যুরোর দায়িত্ব পালন করেন। ২০২৩ সালে সমকাল কর্তৃপক্ষ তাঁকে ব্যুরোর দায়িত্ব থেকে সরিয়ে দেয়। এরপর সহকর্মী স্টাফ রিপোর্টার সুমন চৌধুরীকে দিয়ে ব্যুরোর কার্যক্রম চালানো হয়। কিন্তু চাকরি বা দায়িত্ব হারানোর পর পুলক চ্যাটার্জির আর্থিক ও পেশাগত পরিস্থিতি কী দাঁড়িয়েছিল- এখন সেটিই অনুসন্ধানের গুরুত্বপূর্ণ বিষয়।
বিশেষ করে তাঁর ন্যায্য পাওনা আদৌ পরিশোধ করা হয়েছিল কি না, হয়ে থাকলে কতটুকু এবং না হয়ে থাকলে কেন- এ বিষয়ে সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের সুস্পষ্ট বক্তব্য প্রয়োজন। কারণ একজন সাংবাদিকের দীর্ঘ কর্মজীবনের অবসান শুধু একটি পদ হারানোর ঘটনা নয়। এর সঙ্গে জড়িয়ে থাকে তাঁর জীবিকা, পরিবারের নিরাপত্তা এবং ভবিষ্যৎ জীবনযাপনের প্রশ্ন।
পরিবার ও সহকর্মীদের ভাষ্য অনুযায়ী, চাকরি হারানোর পরও সমকালের সঙ্গে পুলক চ্যাটার্জির সম্পর্ক পুরোপুরি শেষ হয়ে যায়নি। তাঁর কাছে সাবেক অফিসের একটি বিকল্প চাবি ছিল বলে জানা গেছে। তিনি মাঝেমধ্যে সেখানে যেতেন, বসতেন এবং পত্রিকা পড়তেন। এখানেও রয়েছে একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন- কর্মস্থল থেকে আনুষ্ঠানিকভাবে বিচ্ছিন্ন হওয়ার পরও একজন সাবেক ব্যুরোপ্রধান কেন সেখানে নিয়মিত যেতেন? এটি কি শুধুই পুরোনো কর্মস্থলের প্রতি আবেগ? নাকি দীর্ঘ কর্মজীবনের সঙ্গে গড়ে ওঠা সম্পর্ক ও পরিচিত পরিবেশ থেকে বিচ্ছিন্ন হতে না পারার এক ধরনের মানসিক টান? সহকর্মীদের কেউ কেউ বিষয়টিকে স্বাভাবিকভাবেই দেখেছেন বলে জানা গেছে। কিন্তু তাঁর জীবনের শেষ সময়ের প্রেক্ষাপট বিবেচনায় নিলে ঘটনাটির সামাজিক ও মনস্তাত্ত্বিক দিকও তদন্তের দাবি রাখে।
মৃত্যুর পর পুলক চ্যাটার্জির পাশে একাধিক চিরকুট পাওয়ার কথা জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা। এসব লেখায় আর্থিক সংকট, শারীরিক সমস্যা এবং সামাজিকভাবে পিছিয়ে পড়ার অনুভূতির কথা উল্লেখ রয়েছে বলে জানা গেছে। একটি চিঠিতে সহকর্মী সুমন চৌধুরীর প্রসঙ্গ এসেছে। ছোট ভাই ভূমি কর্মকর্তা দীপক, দুই সন্তান পিয়াঙ্কা ও প্রদ্ধতি এবং বরিশাল প্রেসক্লাবের সাধারণ সম্পাদক এসএম জাকির হোসেনকে উদ্দেশ করেও পৃথক লেখা থাকার কথা জানা গেছে। এসব চিঠির বক্তব্যের পূর্ণাঙ্গ সত্যতা ও প্রেক্ষাপট অবশ্যই তদন্তের বিষয়। কিন্তু সেগুলো যদি তাঁর শেষ সময়ের মানসিক ও আর্থিক অবস্থার প্রতিফলন হয়ে থাকে, তাহলে সাংবাদিক সমাজের সামনে একটি অস্বস্তিকর প্রশ্ন দাঁড়ায়- তিনি যখন সংকটে ছিলেন, তখন তাঁর সহকর্মীরা কী জানতেন? আর জানলে কী করেছিলেন? নেতৃত্বের দায় কতটুকু?
বরিশাল প্রেসক্লাবের সাধারণ সম্পাদক ছিলেন পুলক চ্যাটার্জি। অর্থাৎ সাংবাদিকদের অধিকার, পেশাগত নিরাপত্তা ও কল্যাণ নিয়ে কাজ করা একটি গুরুত্বপূর্ণ সংগঠনের নেতৃত্বে তিনি নিজেই ছিলেন। কিন্তু একই সঙ্গে বরিশালের সাংবাদিক সংগঠনগুলোর নেতৃত্ব নিয়েও দীর্ঘদিন ধরে নানা প্রশ্ন রয়েছে।
সাংবাদিকদের অভিযোগ ও পর্যবেক্ষণ, কিছু সংগঠনে পেশাদার সাংবাদিকদের চেয়ে রাজনৈতিক পরিচয় ও ব্যক্তি-স্বার্থের প্রভাব কখনো কখনো বেশি দৃশ্যমান হয়ে ওঠে। রাজনৈতিক ব্যক্তি-বিশেষের প্রভাব সাংবাদিক সংগঠনগুলোর ওপর চেপে বসলে পেশাগত যোগ্যতা, অভিজ্ঞতা ও অবদানের যথার্থ মূল্যায়ন বাধাগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়। এই কারণে পুলক চ্যাটার্জির মতো দীর্ঘদিনের অভিজ্ঞ ও যোগ্য সাংবাদিকরা যথার্থ সম্মান ও প্রাতিষ্ঠানিক মর্যাদা থেকে বঞ্চিত হয়েছেন।
অবশ্য কোনো ব্যক্তির ব্যক্তিগত মৃত্যুর দায় সরাসরি কোনো সংগঠন বা ব্যক্তির ওপর চাপিয়ে দেওয়া যায় না। মৃত্যুর প্রকৃত কারণ এবং এর পেছনের পরিস্থিতি তদন্তের মাধ্যমে নির্ধারিত হওয়া উচিত। কিন্তু একজন প্রবীণ সাংবাদিক দীর্ঘদিন কর্মহীন ও আর্থিক সংকটে থাকলে তাঁর সহকর্মী সংগঠনগুলোর সামাজিক ও পেশাগত দায়িত্ব নিয়ে প্রশ্ন উঠবেই। বিশেষ করে সাংবাদিকদের জন্য কল্যাণ তহবিল, জরুরি সহায়তা, কর্মসংস্থান বা পেশাগত পুনর্বাসনের কোনো কার্যকর ব্যবস্থা আছে কি না- পুলক চ্যাটার্জির মৃত্যু সেই প্রশ্নও সামনে এনেছে।
স্থানীয় সাংবাদিকদের মধ্যে অনৈক্য ও নেতৃত্বের বিভাজন নিয়ে দীর্ঘদিন ধরেই নানা আলোচনা রয়েছে। পেশাজীবী সংগঠনের নেতৃত্বে যোগ্যতা, অভিজ্ঞতা ও সাংবাদিকদের স্বার্থ কতটা অগ্রাধিকার পাচ্ছে- এ নিয়েও প্রশ্ন আছে। পুলক চ্যাটার্জির মতো অভিজ্ঞ সাংবাদিক কর্মজীবন হারানোর পর যদি দীর্ঘ সময় নিজেকে একা মনে করে থাকেন, তবে সেটি শুধু তাঁর ব্যক্তিগত সংকট নয়; সাংবাদিক সমাজের সাংগঠনিক সক্ষমতারও একটি পরীক্ষা। এই পরীক্ষায় বরিশালের সাংবাদিক সংগঠনগুলো কতটা সফল- এখন সেটিই আলোচনার বিষয়।
পুলক চ্যাটার্জির মৃত্যুকে কেন্দ্র করে অন্তত কয়েকটি বিষয় খতিয়ে দেখা প্রয়োজন। প্রথমত ২০২৩ সালে তাঁর চাকরি বা দায়িত্ব পরিবর্তনের সুনির্দিষ্ট কারণ কী ছিল? দ্বিতীয়ত, সমকাল কর্তৃপক্ষের কাছে তাঁর কোনো ন্যায্য পাওনা বকেয়া ছিল কি না? তৃতীয়ত, চাকরি হারানোর পর তাঁর আর্থিক ও সামাজিক পরিস্থিতি কী ছিল? চতুর্থত, সাংবাদিক সংগঠন ও সহকর্মীরা তাঁর সংকট সম্পর্কে কতটা অবগত ছিলেন এবং তাঁকে কোনো সহায়তা দেওয়া হয়েছিল কি না? পঞ্চমত, মৃত্যুর আগে পাওয়া চিঠিগুলোর বক্তব্য ও সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের ভূমিকা তদন্তে কী উঠে আসে? ষষ্ঠত, স্থানীয় সাংবাদিক সংগঠনগুলোর নেতৃত্বে রাজনৈতিক প্রভাব কতটা রয়েছে এবং তার কারণে পেশাদার সাংবাদিকদের মর্যাদা, অধিকার ও প্রতিনিধিত্ব কোনোভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে কি না? আর সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ- এই মৃত্যু কি কেবল একজন মানুষের ব্যক্তিগত সংকটের পরিণতি, নাকি এর সঙ্গে পেশাগত ও প্রাতিষ্ঠানিক ব্যর্থতারও কোনো যোগসূত্র রয়েছে?
পুলক চ্যাটার্জির মৃত্যু নিয়ে আবেগ থাকবে, শোক থাকবে, স্মৃতিচারণ থাকবে। কিন্তু শুধু শোক প্রকাশ করে যদি বিষয়টি শেষ হয়ে যায়, তাহলে তাঁর মৃত্যুর পর সামনে আসা প্রশ্নগুলোর উত্তর আর পাওয়া যাবে না। প্রয়োজন নিরপেক্ষ তদন্ত। প্রয়োজন সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের বক্তব্য। প্রয়োজন তাঁর চাকরি হারানোর প্রেক্ষাপট ও পাওনা সংক্রান্ত তথ্য প্রকাশ। প্রয়োজন সাংবাদিক সংগঠনগুলোর নিজেদের ভূমিকা পর্যালোচনা।
একজন সাংবাদিক তাঁর জীবনের বড় একটি অংশ সংবাদপেশা ও সমাজের কল্যাণে ব্যয় করেছেন। শেষ জীবনে যদি তিনি আর্থিক সংকট, পেশাগত অনিশ্চয়তা ও সামাজিক বিচ্ছিন্নতার ভারে ন্যুব্জ হয়ে থাকেন, তবে তাঁর মৃত্যুকে শুধু ব্যক্তিগত ট্র্যাজেডি হিসেবে দেখলে মূল প্রশ্নটি আড়ালেই থেকে যাবে। পুলক চ্যাটার্জি নেই। কিন্তু তাঁর মৃত্যু বরিশালের সাংবাদিক সমাজের সামনে যে প্রশ্নগুলো রেখে গেছে, সেগুলো এখনো জীবিত।
একজন সাংবাদিকের দুর্দিনে সাংবাদিক সমাজ কোথায় থাকে- আর সাংবাদিক সংগঠনের নেতৃত্ব যখন পেশাদারিত্বের বদলে অন্য কোনো প্রভাবের কাছে দুর্বল হয়ে পড়ে, তখন যোগ্য সাংবাদিকদের পাশে দাঁড়াবে কে? পুলক চ্যাটার্জির মৃত্যু এখন সেই প্রশ্নের উত্তর দাবি করছে।’
হাসিবুল ইসলাম, সংবাদকর্মী ও কলাম লেখক।
একজন সাংবাদিকের দীর্ঘ কর্মজীবনের শেষ অধ্যায় কি এমনই হওয়ার কথা ছিল? দুই দশকেরও বেশি সময় সাংবাদিকতা করেছেন পুলক চ্যাটার্জি। দৈনিক সমকালের প্রতিষ্ঠালগ্ন থেকে ২০২৩ সাল পর্যন্ত ছিলেন প্রতিষ্ঠানটির বরিশাল ব্যুরোর গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্বে। বরিশাল প্রেসক্লাবের সাধারণ সম্পাদক হিসেবেও দায়িত্ব পালন করেছেন। অথচ কর্মজীবনের শেষদিকে এসে চাকরি হারিয়েছেন, দীর্ঘ সময় বেকার ছিলেন, আর্থিক সংকটে পড়েছেন- এমন তথ্যই এখন তাঁর মৃত্যুর পর সামনে আসছে। শুক্রবার (১১ সেপ্টেম্বর) তাঁর আকস্মিক ও অস্বাভাবিক মৃত্যুর পর সেই প্রশ্নটিই সবচেয়ে জোরালো হয়ে উঠেছে-একজন প্রবীণ ও অভিজ্ঞ সাংবাদিক যখন একের পর এক সংকটে পড়ছিলেন, তখন তাঁর পাশে ছিলেন কে?
শুধু ব্যক্তিগত হতাশা, শারীরিক সমস্যা কিংবা আর্থিক সংকট দিয়ে কি এই মৃত্যুর পুরো প্রেক্ষাপট ব্যাখ্যা করা সম্ভব? নাকি এর পেছনে রয়েছে দীর্ঘদিনের পেশাগত অনিশ্চয়তা, কর্মহীনতা, পাওনা নিয়ে জটিলতা এবং সাংবাদিক সমাজের কাঠামোগত দুর্বলতা? এসব প্রশ্নের উত্তর এখন জরুরি।
সিনিয়র সাংবাদিক পুলক চ্যাটার্জি ২০০৫ সালে দৈনিক সমকালের প্রতিষ্ঠালগ্ন থেকে প্রতিষ্ঠানটির সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। দীর্ঘ প্রায় ১৮ বছর তিনি বরিশাল ব্যুরোর দায়িত্ব পালন করেন। ২০২৩ সালে সমকাল কর্তৃপক্ষ তাঁকে ব্যুরোর দায়িত্ব থেকে সরিয়ে দেয়। এরপর সহকর্মী স্টাফ রিপোর্টার সুমন চৌধুরীকে দিয়ে ব্যুরোর কার্যক্রম চালানো হয়। কিন্তু চাকরি বা দায়িত্ব হারানোর পর পুলক চ্যাটার্জির আর্থিক ও পেশাগত পরিস্থিতি কী দাঁড়িয়েছিল- এখন সেটিই অনুসন্ধানের গুরুত্বপূর্ণ বিষয়।
বিশেষ করে তাঁর ন্যায্য পাওনা আদৌ পরিশোধ করা হয়েছিল কি না, হয়ে থাকলে কতটুকু এবং না হয়ে থাকলে কেন- এ বিষয়ে সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের সুস্পষ্ট বক্তব্য প্রয়োজন। কারণ একজন সাংবাদিকের দীর্ঘ কর্মজীবনের অবসান শুধু একটি পদ হারানোর ঘটনা নয়। এর সঙ্গে জড়িয়ে থাকে তাঁর জীবিকা, পরিবারের নিরাপত্তা এবং ভবিষ্যৎ জীবনযাপনের প্রশ্ন।
পরিবার ও সহকর্মীদের ভাষ্য অনুযায়ী, চাকরি হারানোর পরও সমকালের সঙ্গে পুলক চ্যাটার্জির সম্পর্ক পুরোপুরি শেষ হয়ে যায়নি। তাঁর কাছে সাবেক অফিসের একটি বিকল্প চাবি ছিল বলে জানা গেছে। তিনি মাঝেমধ্যে সেখানে যেতেন, বসতেন এবং পত্রিকা পড়তেন। এখানেও রয়েছে একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন- কর্মস্থল থেকে আনুষ্ঠানিকভাবে বিচ্ছিন্ন হওয়ার পরও একজন সাবেক ব্যুরোপ্রধান কেন সেখানে নিয়মিত যেতেন? এটি কি শুধুই পুরোনো কর্মস্থলের প্রতি আবেগ? নাকি দীর্ঘ কর্মজীবনের সঙ্গে গড়ে ওঠা সম্পর্ক ও পরিচিত পরিবেশ থেকে বিচ্ছিন্ন হতে না পারার এক ধরনের মানসিক টান? সহকর্মীদের কেউ কেউ বিষয়টিকে স্বাভাবিকভাবেই দেখেছেন বলে জানা গেছে। কিন্তু তাঁর জীবনের শেষ সময়ের প্রেক্ষাপট বিবেচনায় নিলে ঘটনাটির সামাজিক ও মনস্তাত্ত্বিক দিকও তদন্তের দাবি রাখে।
মৃত্যুর পর পুলক চ্যাটার্জির পাশে একাধিক চিরকুট পাওয়ার কথা জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা। এসব লেখায় আর্থিক সংকট, শারীরিক সমস্যা এবং সামাজিকভাবে পিছিয়ে পড়ার অনুভূতির কথা উল্লেখ রয়েছে বলে জানা গেছে। একটি চিঠিতে সহকর্মী সুমন চৌধুরীর প্রসঙ্গ এসেছে। ছোট ভাই ভূমি কর্মকর্তা দীপক, দুই সন্তান পিয়াঙ্কা ও প্রদ্ধতি এবং বরিশাল প্রেসক্লাবের সাধারণ সম্পাদক এসএম জাকির হোসেনকে উদ্দেশ করেও পৃথক লেখা থাকার কথা জানা গেছে। এসব চিঠির বক্তব্যের পূর্ণাঙ্গ সত্যতা ও প্রেক্ষাপট অবশ্যই তদন্তের বিষয়। কিন্তু সেগুলো যদি তাঁর শেষ সময়ের মানসিক ও আর্থিক অবস্থার প্রতিফলন হয়ে থাকে, তাহলে সাংবাদিক সমাজের সামনে একটি অস্বস্তিকর প্রশ্ন দাঁড়ায়- তিনি যখন সংকটে ছিলেন, তখন তাঁর সহকর্মীরা কী জানতেন? আর জানলে কী করেছিলেন? নেতৃত্বের দায় কতটুকু?
বরিশাল প্রেসক্লাবের সাধারণ সম্পাদক ছিলেন পুলক চ্যাটার্জি। অর্থাৎ সাংবাদিকদের অধিকার, পেশাগত নিরাপত্তা ও কল্যাণ নিয়ে কাজ করা একটি গুরুত্বপূর্ণ সংগঠনের নেতৃত্বে তিনি নিজেই ছিলেন। কিন্তু একই সঙ্গে বরিশালের সাংবাদিক সংগঠনগুলোর নেতৃত্ব নিয়েও দীর্ঘদিন ধরে নানা প্রশ্ন রয়েছে।
সাংবাদিকদের অভিযোগ ও পর্যবেক্ষণ, কিছু সংগঠনে পেশাদার সাংবাদিকদের চেয়ে রাজনৈতিক পরিচয় ও ব্যক্তি-স্বার্থের প্রভাব কখনো কখনো বেশি দৃশ্যমান হয়ে ওঠে। রাজনৈতিক ব্যক্তি-বিশেষের প্রভাব সাংবাদিক সংগঠনগুলোর ওপর চেপে বসলে পেশাগত যোগ্যতা, অভিজ্ঞতা ও অবদানের যথার্থ মূল্যায়ন বাধাগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়। এই কারণে পুলক চ্যাটার্জির মতো দীর্ঘদিনের অভিজ্ঞ ও যোগ্য সাংবাদিকরা যথার্থ সম্মান ও প্রাতিষ্ঠানিক মর্যাদা থেকে বঞ্চিত হয়েছেন।
অবশ্য কোনো ব্যক্তির ব্যক্তিগত মৃত্যুর দায় সরাসরি কোনো সংগঠন বা ব্যক্তির ওপর চাপিয়ে দেওয়া যায় না। মৃত্যুর প্রকৃত কারণ এবং এর পেছনের পরিস্থিতি তদন্তের মাধ্যমে নির্ধারিত হওয়া উচিত। কিন্তু একজন প্রবীণ সাংবাদিক দীর্ঘদিন কর্মহীন ও আর্থিক সংকটে থাকলে তাঁর সহকর্মী সংগঠনগুলোর সামাজিক ও পেশাগত দায়িত্ব নিয়ে প্রশ্ন উঠবেই। বিশেষ করে সাংবাদিকদের জন্য কল্যাণ তহবিল, জরুরি সহায়তা, কর্মসংস্থান বা পেশাগত পুনর্বাসনের কোনো কার্যকর ব্যবস্থা আছে কি না- পুলক চ্যাটার্জির মৃত্যু সেই প্রশ্নও সামনে এনেছে।
স্থানীয় সাংবাদিকদের মধ্যে অনৈক্য ও নেতৃত্বের বিভাজন নিয়ে দীর্ঘদিন ধরেই নানা আলোচনা রয়েছে। পেশাজীবী সংগঠনের নেতৃত্বে যোগ্যতা, অভিজ্ঞতা ও সাংবাদিকদের স্বার্থ কতটা অগ্রাধিকার পাচ্ছে- এ নিয়েও প্রশ্ন আছে। পুলক চ্যাটার্জির মতো অভিজ্ঞ সাংবাদিক কর্মজীবন হারানোর পর যদি দীর্ঘ সময় নিজেকে একা মনে করে থাকেন, তবে সেটি শুধু তাঁর ব্যক্তিগত সংকট নয়; সাংবাদিক সমাজের সাংগঠনিক সক্ষমতারও একটি পরীক্ষা। এই পরীক্ষায় বরিশালের সাংবাদিক সংগঠনগুলো কতটা সফল- এখন সেটিই আলোচনার বিষয়।
পুলক চ্যাটার্জির মৃত্যুকে কেন্দ্র করে অন্তত কয়েকটি বিষয় খতিয়ে দেখা প্রয়োজন। প্রথমত ২০২৩ সালে তাঁর চাকরি বা দায়িত্ব পরিবর্তনের সুনির্দিষ্ট কারণ কী ছিল? দ্বিতীয়ত, সমকাল কর্তৃপক্ষের কাছে তাঁর কোনো ন্যায্য পাওনা বকেয়া ছিল কি না? তৃতীয়ত, চাকরি হারানোর পর তাঁর আর্থিক ও সামাজিক পরিস্থিতি কী ছিল? চতুর্থত, সাংবাদিক সংগঠন ও সহকর্মীরা তাঁর সংকট সম্পর্কে কতটা অবগত ছিলেন এবং তাঁকে কোনো সহায়তা দেওয়া হয়েছিল কি না? পঞ্চমত, মৃত্যুর আগে পাওয়া চিঠিগুলোর বক্তব্য ও সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের ভূমিকা তদন্তে কী উঠে আসে? ষষ্ঠত, স্থানীয় সাংবাদিক সংগঠনগুলোর নেতৃত্বে রাজনৈতিক প্রভাব কতটা রয়েছে এবং তার কারণে পেশাদার সাংবাদিকদের মর্যাদা, অধিকার ও প্রতিনিধিত্ব কোনোভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে কি না? আর সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ- এই মৃত্যু কি কেবল একজন মানুষের ব্যক্তিগত সংকটের পরিণতি, নাকি এর সঙ্গে পেশাগত ও প্রাতিষ্ঠানিক ব্যর্থতারও কোনো যোগসূত্র রয়েছে?
পুলক চ্যাটার্জির মৃত্যু নিয়ে আবেগ থাকবে, শোক থাকবে, স্মৃতিচারণ থাকবে। কিন্তু শুধু শোক প্রকাশ করে যদি বিষয়টি শেষ হয়ে যায়, তাহলে তাঁর মৃত্যুর পর সামনে আসা প্রশ্নগুলোর উত্তর আর পাওয়া যাবে না। প্রয়োজন নিরপেক্ষ তদন্ত। প্রয়োজন সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের বক্তব্য। প্রয়োজন তাঁর চাকরি হারানোর প্রেক্ষাপট ও পাওনা সংক্রান্ত তথ্য প্রকাশ। প্রয়োজন সাংবাদিক সংগঠনগুলোর নিজেদের ভূমিকা পর্যালোচনা।
একজন সাংবাদিক তাঁর জীবনের বড় একটি অংশ সংবাদপেশা ও সমাজের কল্যাণে ব্যয় করেছেন। শেষ জীবনে যদি তিনি আর্থিক সংকট, পেশাগত অনিশ্চয়তা ও সামাজিক বিচ্ছিন্নতার ভারে ন্যুব্জ হয়ে থাকেন, তবে তাঁর মৃত্যুকে শুধু ব্যক্তিগত ট্র্যাজেডি হিসেবে দেখলে মূল প্রশ্নটি আড়ালেই থেকে যাবে। পুলক চ্যাটার্জি নেই। কিন্তু তাঁর মৃত্যু বরিশালের সাংবাদিক সমাজের সামনে যে প্রশ্নগুলো রেখে গেছে, সেগুলো এখনো জীবিত।
একজন সাংবাদিকের দুর্দিনে সাংবাদিক সমাজ কোথায় থাকে- আর সাংবাদিক সংগঠনের নেতৃত্ব যখন পেশাদারিত্বের বদলে অন্য কোনো প্রভাবের কাছে দুর্বল হয়ে পড়ে, তখন যোগ্য সাংবাদিকদের পাশে দাঁড়াবে কে? পুলক চ্যাটার্জির মৃত্যু এখন সেই প্রশ্নের উত্তর দাবি করছে।’
হাসিবুল ইসলাম, সংবাদকর্মী ও কলাম লেখক।

২৭ সেপ্টেম্বর, ২০২৫ ১৬:৪৬
বরিশাল জেলা শিল্পকলা একাডেমির কালচারাল অফিসার অসিত বরণ দাশগুপ্তের বিরুদ্ধে ভুয়া বিল-ভাউচারের মাধ্যমে অর্থ আত্মসাতের অভিযোগ পাওয়া গেছে। কদিন আগে জেলা শিল্পকলা একাডেমি অনুমোদিত একটি বিলের ভাউচার নিয়ে বরিশাল নগরের সদর রোডের একটি ফুলের দোকানে গিয়ে দেখিয়ে জানতে চাওয়া হয়, এই বিল তারা করেছেন কিনা। ফুল দোকানের মালিক মো. ইভান সঙ্গে সঙ্গে উত্তর দেন, ‘না না। আমরা এই বিল করিনি।’
এই বিলের ভাউচারে একটি ফুলের তোড়া বাবদ পাঁচ হাজার টাকা দেখানো হয়েছে। ইভান বলেন, ‘জেলা শিল্পকলা একাডেমি প্রায়ই আমার দোকান থেকে ফুলের তোড়া নেয়। যার বিল সর্বোচ্চ ৫০০ টাকা। তবে ফুলের তোড়া নেওয়ার সময় শিল্পকলা একাডেমি বিলের খালি পাতা নেয়। আমার ধারণা, খালি পাতায় পাঁচ হাজার টাকা বসিয়ে দিয়েছেন শিল্পকলার কর্মকর্তারা। ফুলের তোড়ার বিল আমরা ৫০০ টাকাই করি।’
তাহলে কেন বিলের খালি পাতা দিচ্ছেন এমন প্রশ্নের জবাবে ইভান বলেন, ‘ক্রেতা ধরে রাখতে এইটুকু সুযোগ দিতে হয়। না হয় পরে তারা আর ফুল কিনতে আসবে না।’
একইভাবে এক হাজার ৮০০ টাকার আরেকটি বিল ভাউচারে ১৮ হাজার টাকা দেখানো হয়েছে। এভাবে ভুয়া বিল-ভাউচারের মাধ্যমে অসিত বরণ দাশগুপ্ত অর্থ আত্মসাৎ করছেন বলে জানা গেছে। জেলা শিল্পকলা একাডেমির কালচারাল অফিসার হিসেবে অসিত বরণ দাশগুপ্ত গত ১২ জানুয়ারি যোগ দেন। এরপর থেকে একের পর এক দুর্নীতির অভিযোগ ওঠে তার বিরুদ্ধে। যা নিয়ে বরিশালের সাংস্কৃতিক অঙ্গনের নেতৃবৃন্দও উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন।
সর্বশেষ রবীন্দ্র সংগীত সম্মেলনে দুর্নীতির অভিযোগ ওঠে তার বিরুদ্ধে। এক হাজার ৮০০ টাকা করে ২৬টি সংগঠনে ৪৬ হাজার ৮০০ টাকা বরাদ্দ দেওয়া হয়। কিন্তু কালচারাল কর্মকর্তা সেখানে ১৮ হাজার টাকা করে চার লাখ ৬৮ হাজার টাকার বিল করেন বলে নাম প্রকাশ না করা শর্তে একাধিক সংগঠক জানিয়েছেন। এ ছাড়া বিভিন্ন অনুষ্ঠানের খাবার বাবদ অতিরিক্ত বিল করে টাকা আত্মসাৎ করছেন অভিযোগ রয়েছে।
গত ৩০ জুন জেলা কালচারাল কর্মকর্তা স্বাক্ষরিত নোটিশে সাংস্কৃতিক প্রশিক্ষণ বন্ধের ঘোষণা দেওয়া হয়। নোটিশে উল্লেখ করা হয় সাময়িক সময়ের জন্য এ কার্যক্রম বন্ধ থাকবে। তবে কবে নাগাদ চালু হবে, সে বিষয়ে কোনও তথ্য দেওয়া হয়নি। এতে শিল্পকলা একাডেমিতে দায়িত্বরত প্রশিক্ষকরা ক্ষুব্ধ হন। তাদের দাবি, প্রতিষ্ঠানটির সাবেক কালচারাল কর্মকর্তা হাসানুর রশীদ শিল্পকলায় নিযুক্ত ১২ জন প্রশিক্ষকের ২০২৪-২৫ সালের চুক্তিনামা নবায়ন করে যেতে পারেননি। তবে প্রশিক্ষকরা তাদের কার্যক্রম চালিয়ে গেছেন। নবায়নের জন্য কয়েক দফায় সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের কাছে গেছেন তারা। কিন্তু এখন পর্যন্ত তা সুরাহা হয়নি। তাদের অভিযোগ, অসিত বরণ দাশগুপ্ত প্রশিক্ষক নিয়োগ নিয়েও দুর্নীতি করছেন।
ইতিমধ্যেই অসিত বরণ দাশগুপ্তের বিরুদ্ধে দুর্নীতি, অনিয়মের তথ্য সংগ্রহ করে লিখিত অভিযোগপত্র দেওয়া হয়েছে। গত ১ জুলাই বরিশালের গণমাধ্যমকর্মী মুহম্মদ ইমন খন্দকার হৃদয় অভিযোগপত্রটি বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমির তৎকালীন ভারপ্রাপ্ত মহাপরিচালক ওয়ারেছ হোসেন, বরিশালের জেলা প্রশাসক ও শিল্পকলা একাডেমির সভাপতি মোহাম্মদ দেলোয়ার হোসেন এবং দুদকের বরিশাল আঞ্চলিক কার্যালয়ের উপপরিচালক মো. এইচএম আক্তারুজ্জামানের বরাবর দাখিল করেন।
অভিযোগপত্রে মুহম্মদ ইমন খন্দকার উল্লেখ করেন, অসিত বরণ দাশগুপ্ত ২০১৩ সালে কালচারাল অফিসার হিসেবে নিয়োগ পাওয়ার পর থেকে সিলেট, হবিগঞ্জ ও বর্তমানে বরিশালে দায়িত্ব পালনকালে নানা অনিয়ম-দুর্নীতিতে জড়িয়ে পড়েন। ২০১৬ সালে সিলেটে নারী কেলেঙ্কারির ঘটনায় তার বিরুদ্ধে মামলা হয় এবং স্থানীয় সাংস্কৃতিক কর্মীরা স্মারকলিপি দেন। ২০২৪ সালে সিলেটে তার অপসারণের দাবিতে বিক্ষোভ করা হয়। ২০২৫ সালে তাকে বরিশালে বদলি করা হয়। বরিশালে যোগদানের পর থেকেই সরকারি রেস্ট হাউজে পরিবারসহ মাসের পর মাস অবৈধভাবে বসবাস করে প্রায় পাঁচ লাখ টাকার রাজস্ব ফাঁকি দিয়েছেন। একইসঙ্গে হলরুম ভাড়ার টাকা গোপন রেখে তা ব্যক্তিগতভাবে এবং স্থানীয় ও সাধারণ ফান্ডের ২৯ লাখ টাকার একটি বড় অংশ তুলে আত্মসাৎ করেন। এ ছাড়া জনসাধারণের প্রবেশে বাধা সৃষ্টি করে পুরো প্রতিষ্ঠানটি নিয়ন্ত্রণে রেখেছেন।
এ ব্যাপারে জানতে চাইলে অভিযোগকারী মুহম্মদ ইমন খন্দকার বলেন, ‘বরিশাল একটি সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যবাহী অঞ্চল। এখানে কোনও দুর্নীতিবাজের ঠাঁই হতে পারে না। অসিত বরণ বরিশালের সাংস্কৃতিক অঙ্গনকে কলুষিত করছেন। তার কর্মকাণ্ড জুলাই-আগস্ট চেতনার পরিপন্থি। এজন্য তার বিরুদ্ধে সব দুর্নীতির অভিযোগে বিভিন্ন দফতরে লিখিত অভিযোগ দিয়েছি। তদন্ত সাপেক্ষে তার শাস্তি দাবি করছি।’
বাংলাদেশ সাংস্কৃতিক জোটের আহ্বায়ক সাব্বির নেওয়াজ সাগর বলেন, ‘জুলাই পরবর্তী বরিশাল শিল্পকলা একাডেমি ফ্যাসিবাদের দোসর ছাড়া সবার জন্য একটি প্রতিষ্ঠান হবে এটাই আশা করেছিলাম। কিন্তু আমরা আশাহত হয়েছি। অসিত বরণ সিলেট ও হবিগঞ্জে কালচারাল অফিসার থাকাকালীন তার বিরুদ্ধে একাধিক অভিযোগ থাকা সত্ত্বেও আমরা সুযোগ দিতে চেয়েছিলাম। কিন্তু তার কর্মকাণ্ড আগের মতো। বাংলাদেশ সাংস্কৃতিক জোটের পক্ষ থেকে আমরাও তদন্ত কমিটি গঠন করে দ্রুত শাস্তিমূলক ব্যবস্থা গ্রহণের দাবি জানাচ্ছি। এ নিয়ে শিল্পকলা একাডেমির মহাপরিচালকের কাছে লিখিত অভিযোগ করবো।’
লেখক গবেষক সাইফুল আহসান বুলবুল, নাট্যমের সংগঠক বাসুদেব ঘোষ, রিপন গুহ এবং শব্দাবলী গ্রুপ থিয়েটারের অনিমেষ লিটুসহ একাধিক সাংস্কৃতিক কর্মী জানিয়েছেন, অসিত বরণ দাশগুপ্তের বিরুদ্ধে দুর্নীতি, স্বজনপ্রীতি, স্বেচ্ছাচারিতা ও প্রশাসনিক অনিয়মের অভিযোগের শেষ নেই। তিনি যোগদানের পর থেকেই নানা অনিয়ম-দুর্নীতি করছেন। বিষয়টি জেলা প্রশাসনও জানে। তারা বলছে তদন্ত করছে। তবে কতদূর এগিয়েছে তা জানা নেই। আমাদের পক্ষ থেকে দাবি, দ্রুত সময়ের মধ্যে তদন্ত করে অসিত বরণের বিরুদ্ধে বিভাগীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করা হোক। যাতে পরবর্তী কর্মকর্তা এ ধরনের দুর্নীতি করার আগে শতবার চিন্তা করেন।
অভিযুক্ত জেলা শিল্পকলা একাডেমির কালচারাল কর্মকর্তা অসিত বরণ দাশগুপ্ত বলেন, ‘আমার বিরুদ্ধে উদ্দেশ্যপ্রণোদিত ও ভিত্তিহীন অভিযোগ আনা হয়েছে। আমি নিয়ম মেনেই দায়িত্ব পালন করে যাচ্ছি।’
এক হাজার ৮০০ টাকার বিল ১৮ হাজার টাকা এবং ৫০০ টাকার ফুলের বিল পাঁচ হাজার টাকা কীভাবে দেখানো হলো জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘এটি কারা করেছে, তা আমার জানা নেই।’
এ ব্যাপারে জানতে চাইলে জেলা প্রশাসক ও শিল্পকলা একাডেমির সভাপতি মোহাম্মদ দেলোয়ার হোসেন বলেন, ‘কালচারাল কর্মকর্তা অসিত বরণের বিরুদ্ধে তদন্ত চলমান রয়েছে। অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (শিক্ষা ও আইসিটি) উপমা ফারিসাকে প্রধান করে তিন সদস্যের তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে। ৮ আগস্ট থেকে তারা কাজ শুরু করেছেন। প্রতিবেদন পাওয়ার পর ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’
তদন্তকারী কর্মকর্তা অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক উপমা ফারিসা বলেন, ‘লিখিত অভিযোগের পরিপ্রেক্ষিতে সাক্ষ্য-প্রমাণ সংগ্রহের কাজ চলছে। তদন্ত শেষে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।’
এ বিষয়ে জানতে চাইলে বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমির মহাপরিচালক কবি রেজাউদ্দিন স্টালিন বলেন, ‘আমি এখন পর্যন্ত এ বিষয়ে কিছুই জানি না। নতুন যোগ দিয়েছি। তবে আজ থেকে বরিশাল জেলা শিল্পকলা একাডেমির কালচারাল কর্মকর্তার অভিযোগের বিষয় নিয়ে কাজ করবো।’
১৫ সেপ্টেম্বর, ২০২৬ ১২:১৯
১৫ সেপ্টেম্বর, ২০২৬ ১১:৫৭
১৫ সেপ্টেম্বর, ২০২৬ ১১:০৮
১৫ সেপ্টেম্বর, ২০২৬ ০১:২৪