
২৯ মে, ২০২৫ ১৬:১০
প্রফেসর ড. সৈয়দ সাখাওয়াত হোসেন ➤ বাংলাদেশের শিক্ষাব্যবস্থা আজ নানান সমস্যায় জর্জরিত। সেগুলোর মধ্যে সবচেয়ে বড় সমস্যা হলো শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের সর্বোচ্চ কর্তৃপক্ষের দুর্নীতিপরায়ণ মানসিকতা এবং স্বেচ্ছাচারিতা। পৃথিবীব্যাপি একটি স্বতঃসিদ্ধ উক্তি আছে- ‘প্রতিটি শিক্ষা প্রতিষ্ঠান পরিচিত হয় সেটির শিক্ষক দ্বারা, শিক্ষকের কর্মদক্ষতা, সক্ষমতা, মেধা ও জ্ঞানভিত্তিক কর্মকাণ্ডের সম্মিলিত প্রয়াসের দ্বারা শিক্ষাকর্ম সম্পাদনের মাধ্যমে।’ অর্থাৎ শিক্ষকরাই হলো প্রতিষ্ঠানের মেইন ফ্যাক্টর বা প্রধান স্তম্ভ তথা মূল চালিকাশক্তি। আমরা যারা শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে শিক্ষকতা করি বা করেছি তাদের অর্জিত অভিজ্ঞতার আলোকেই আমার আজকের এই লেখার অবতারণা।
শুধু শিক্ষাই নয়, সারা বিশ্বের বিভিন্ন শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের বিশেষ করে বিশ্ববিদ্যালয়ের মানমর্যাদা নিরূপণ হয় শিক্ষা ও গবেষণার মানের উপর ভিত্তি করে- যা মূলত নির্ভর করে শিক্ষকদের সম্মিলিত প্রয়াসের উপরেই। কিন্তু পরিতাপের বিষয় হলো অধিকাংশ শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে সেই শিক্ষকরাই নানাভাবে নিগৃহীত ও ন্যায্য অধিকার থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন। তাদের শোষণ ও অধিকার হরণের মূলে রয়েছে প্রতিটি প্রতিষ্ঠানের কর্ণধারগণ। অধিকাংশ ক্ষেত্রেই প্রতিষ্ঠানের কর্ণধার হিসেবে নিয়োগ পাওয়ার পরে তারা নিজের গদি সুরক্ষা ও কিছু ব্যক্তিস্বার্থ সিদ্ধির জন্য নিজের পক্ষে একটি তোষামোদি গ্রুপ সৃষ্টি করেন। নিজের অনুগত বাহিনী তৈরি করতে গিয়ে শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে শিক্ষকদের বিদ্যমান ঐক্যের মধ্যে ভাঙন সৃষ্টি করেন। নানান লোভ-লালসা ও ভয়ভীতি দেখিয়ে নিজের পক্ষে টেনে আস্থাভাজন শিক্ষকদের নিয়ে দলবাজি শুরু করেন।
ফলে অল্প কিছুদিনেই শিক্ষকদের মধ্যে সুস্পষ্ট একটি বিভাজন তৈরি হয়। এক্ষেত্রে নিয়োগপ্রাপ্ত কর্তাব্যক্তি ব্রিটিশদের সেই ‘Divide and Rule’ পলিসি অবলম্বন করে নিজের মনের মতো প্রশাসন পরিচালনার অপচেষ্টা করে থাকেন। অনেক ক্ষেত্রেই তারা সফল হয়ে থাকেন নিজের অনুগত সেই তোষামোদি গ্রুপের সহযোগিতায়। শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের কর্ণধারের অসৎ উদ্দেশ্য হাসিল, ক্ষমতার দাপট ও কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠার জন্যই এসব করা হয়। এমন হীন উদ্দেশ্য চরিতার্থ করার মানসেই প্রতিষ্ঠানের গুরুত্ব এবং শিক্ষার পরিবেশ অবনমিত করা হয়। কর্তার ইচ্ছায় কর্ম পালনে একদল সবসময় সচেষ্ট থাকেন। তাদের কাছে শিক্ষা এবং গবেষণার মূল্য অতি নগণ্য। এদিকে অপর গ্রুপকে নিজেদের অস্তিত্ব রক্ষার জন্য সবসময় সচেষ্ট থাকতে হয়। ফলে তারাও শিক্ষা আর গবেষণায় মনোনিবেশ করার পরিবেশ থেকে বঞ্চিত হন।
দেশের শিক্ষাঙ্গনে এই অবক্ষয়ের চিত্র এখন প্রাথমিক বিদ্যালয় থেকে শুরু করে বিশ্ববিদ্যালয় পর্যন্ত বিস্তৃত। কর্ণধারদের অসৎ উদ্দেশ্য হাসিল করার জন্য আজ শিক্ষাব্যবস্থা ধ্বংসের দ্বারপ্রান্তে উপনীত। শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের কর্ণধার নিয়োগের প্রক্রিয়াটাও স্বচ্ছ নয়। কর্ণধার নিয়োগে প্রায়ই মেধা, দক্ষতা, যোগ্যতা, সক্ষমতা, অভিজ্ঞতা ও ম্যানেজারিয়াল স্কিলনেস, এসব কিছুই বিবেচনা করা হয় না বললেই চলে। নিয়োগ প্রদানের ক্ষেত্রে তোষামোদি রাজনৈতিক বিবেচনা ও সংযোগ স্থাপনের দক্ষতা তথা লবিংয়ের উপরই বেশি নির্ভর করে। ফলে অনেক সময়ই প্রচলিত আইন ও বিধিবিধানের তোয়াক্কা করা হয় না এসব নিয়োগ প্রক্রিয়ায়। ফলে এর সরাসরি কুপ্রভাব পড়ে শিক্ষা ব্যবস্থায়।
অনেক সময় এমনও দেখা যায় যে, যার কথা কেউ কখনো চিন্তা করেনি কিংবা যার ওই চেয়ারে বসার বিন্দুমাত্র যোগ্যতা নেই এমন কাউকে নিয়োগ দেয়া হয়। লবিং আর তদবিরের জোরে বাগিয়ে নেওয়া হয় চেয়ার। ফলে তাঁর যোগ্যতা এবং অভিজ্ঞতার অভাবে প্রতিষ্ঠান পরিচালনার সব নিয়মকানুন আর নীতি-নৈতিকতা ছিন্নভিন্ন হয়ে যায়। সর্বোচ্চ বিদ্যাপীঠের কর্ণধার নিয়োগে সঠিক কোনো নীতিমালা না থাকায় অধিকাংশ ক্ষেত্রেই স্বজনপ্রীতি, তোষামোদি কিংবা অর্থ লেনদেনের মাধ্যমে কার্যসম্পাদন হয়ে থাকে। বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্ষেত্রে এটা অনেকটা ওপেন সিক্রেট ঘটনা।
এভাবে অনৈতিক পন্থায় যারা নিয়োগ লাভ করেন সঙ্গত কারণেই তাদের কোনো দায়বদ্ধতা কিংবা জবাবদিহিতা থাকে না। ফলে দায়িত্ব পেয়েই তিনি স্বেচ্ছাচারী হয়ে ওঠেন। সর্বক্ষেত্রে স্বৈরাচারী আচরণ শুরু করেন। অবৈধ পন্থায় অর্থ উপার্জন করাই তাঁর প্রধান লক্ষ্য হয়ে ওঠে। এসব কারণেই এখন অনেক অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনা মিডিয়ার শিরোনাম হয়। বেশকিছু বিশ্ববিদ্যায়ের কর্নধারদের বিরুদ্ধে প্রতিষ্ঠানের টাকা অবৈধভাবে আত্মসাৎ, ক্ষমতার চরম অপব্যবহার এবং চারিত্রিক ও নৈতিক স্খলনসহ বিভিন্ন গুরুতর অভিযোগের খবর হরহামেশাই শোনা যায়। এজন্য অনেককে চাকরিচ্যুত হয়ে এমনকি শ্রীঘরে পর্যন্ত যেতে হয়।
অনেক প্রতিষ্ঠান প্রধান নিজের হীনস্বার্থ চরিতার্থ করার জন্য শিক্ষক-কর্মকর্তা-কর্মচারীর মধ্যে নানাবিধ বিভাজন সৃষ্টি করেন। এতে তিনি নিজে লাভবান হলেও শিক্ষার পরিবেশ ধ্বংস হয়। শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের মূল লক্ষ্য মারাত্মকভাবে ব্যহত হয়। অনেকে প্রতিষ্ঠানের সর্বোচ্চ পদে থেকে অনেকে মিথ্যার আশ্রয়, প্রতারণা, কথা দিয়ে কথা না রাখা, মোনাফেকি আর বিশ্বাসঘাতকতা করার মতো জঘন্য কর্মকাণ্ডের সাথে জড়িত হয়ে পড়েন। ফলে প্রতিষ্ঠান পরিচালনার যোগ্যতা হারান তিনি। এসব অযোগ্য ব্যক্তিরা নানান কূটকৌশলে কাঙ্ক্ষিত নিয়োগ বাগিয়ে নিয়ে শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা ও গবেষণাকে মারাত্মক হুমকির মধ্যে নিপতিত করেন।
আমার এক বন্ধু আক্ষেপ করে বলেন- ‘অধিকাংশ ক্ষেত্রেই নিয়োগ দেওয়া হয় না, নিয়োগ নেয়া হয়।ছলেবলে, কৌশলে কিংবা মোটা অংকের অর্থের বিনিময়ে। ফলে এই নিয়োগপ্রাপ্তদের প্রতিষ্ঠানের প্রতি, দেশ ও জাতির প্রতি কোনো দায়বদ্ধতা থাকে না। তাদের মাঝে থাকে না সততা, দেশপ্রেম, শুদ্ধাচার কিংবা নীতি-নৈতিকতার বালাই। আমার দীর্ঘ অভিজ্ঞতা থেকে দেখেছি- যিনি প্রতিষ্ঠানের কর্ণধার হন মূলত তাঁর ইচ্ছার উপরেই সবকিছু নির্ভর করে। সর্বত্র কর্তার ইচ্ছায় কর্ম এবং কীর্তন হয়। এর ফলে মারাত্মক প্রভাব পড়ে শিক্ষা এবং গবেষণার ক্ষেত্রে। এসব কারণেই আজ শিক্ষার বিপর্যয় ঘটেছে। বিশেষ করে উচ্চশিক্ষায় দেখা দিয়েছে চরম অবক্ষয়। আমাদের ভঙ্গুর শিক্ষাব্যবস্থার প্রভাব বর্তমানে সুস্পষ্টভাবে সর্বত্র দৃশ্যমান।
বিশ্বের বহুল প্রচলিত ও স্বনামধন্য বিশ্ববিদ্যালয়ের গুণগত মান পরিমাপক পদ্ধতি টাইমস হায়ার এডুকেশন (THE) কর্তৃক Ranking-2024’এ বিশ্বের ১০৮ টি দেশের ১,৯০৪ টি বিশ্ববিদ্যালয় নিয়ে জরিপ পরিচালনা করা হয়। এতে বাংলাদেশের ২১ টি বিশ্ববিদ্যালয় র্যাঙ্কিংয়ে ৮০১ থেকে ১০০০-এর মধ্যে স্থান পেয়েছে। এরমধ্যে শীর্ষস্থান অর্জন করেছে ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়। ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়ের পরের অবস্থানে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়। এরপরে পর্যায়ক্রমে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়, নর্থ-সাউথ, বাকৃবি, বুয়েট, শাহজালাল বিশ্ববিদ্যালয় অন্যতম।
তবে এবারই প্রথম দেশের পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়গুলোকে পেছনে ফেলে একটি প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয় সামনে চলে এসেছে।
The Times Higher Education World University Ranking-2024 adopts methodology which includes 18 carefully calibrated performance indicators that measure an institution’s performance across five areas: teaching, research environment, research quality, industry, and International outlook.
যে পাঁচটি ইন্ডিকেটরস তথা সূচক দিয়ে শিক্ষার মানদণ্ড বিশ্লেষণ করা হয় সেগুলোর সব কয়টির সাথেই শিক্ষকগণ ওতোপ্রোতোভাবে জড়িত। সেই শিক্ষকদের নিয়ে যদি নানান বিরোধ ও গ্রুপিং সৃষ্টি করা হয় তাহলে সবকিছুই মুখ থুবড়ে পড়বে সন্দেহাতীতভাবে। তাছাড়া কেউ যদি বিশ্ববিদ্যালয় গড়ার ভিশন নিয়ে কাজ না করে নিজের ব্যক্তিগত হীনস্বার্থ চরিতার্থ করার উদ্দেশ্য নিয়ে মহান শিক্ষকতা পেশায় যোগদান করেন সেক্ষেত্রে যা হবার তা-ই হবে এবং বর্তমানে হচ্ছে। বিশ্ববিদ্যালয়ের ভিসিদের সামগ্রিক বিষয়ে দক্ষতা, মেধা ও দৃষ্টিভঙ্গির উপরেই মূলত অনেক কিছু নির্ভর করে। বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ে অনেক মেধাবী শিক্ষক আছেন যাদেরকে উপযুক্ত পরিবেশ ও সুযোগ দিলে তারা শিক্ষা ও গবেষণায় উল্লেখযোগ্য অবদান রাখতে পারেন।
সকল বিষয়ে মেধা সৃষ্টি করার পরিবেশ সংরক্ষণ করার প্রাথমিক দায়িত্ব শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের কর্ণধার এবং সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের। যে কথা দিয়ে আমার লেখাটা শুরু করেছিলাম তা ছিল সকল শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের প্রধান কম্পোনেন্ট হলেন শিক্ষক। আর সেই শিক্ষকদের সঠিকভাবে ব্যবহার ও পরিচালনার দায়িত্ব হলো প্রতিষ্ঠান প্রধানের। তাই সততা, নিষ্ঠা ও নীতি-নৈতিকতার সাথেসাথে সব ধরনের লোভ-লালসার উর্ধ্বে উঠে শিক্ষা প্রতিষ্ঠান পরিচালনা করতে হবে। এটা না পারলে দেশের ভবিষ্যৎ প্রজন্ম এক মেরুদণ্ডহীন জাতিতে পরিণত হবে।
দেশে শিক্ষার্থীর মধ্যে যদি মেধা সৃষ্টি করা না যায়, সততা ও দেশপ্রেম তৈরি করা না যায় তাহলে আমরা যে স্মার্ট বাংলাদেশ বিনির্মানের কথা বলছি তা অর্জন করা সম্ভব হবে না। শুধু মেধা থাকাই যথেষ্ট নয়। যে মেধার মধ্যে সততা এবং শুদ্ধাচার না থাকে সেই মেধা মূল্যহীন। পক্ষান্তরে এমন মেধা দেশ ও জাতির জন্য বিপর্যয় ডেকে আনে। এছাড়া সামনে আসছে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার (Artificial Intelligence) যুগ; যা সম্পূর্ণভাবে নতুন ধারণার উপর ভর করে সকল ক্ষেত্রে উন্নয়নের পথ প্রদর্শক হিসাবে কাজ করবে। আমাদের সকল শিক্ষা প্রতিষ্ঠানকে সেভাবেই গড়ে তুলতে হবে। বিজ্ঞানের চরম উৎকর্ষের এই যুগে আমাদের শিক্ষাব্যবস্থাকে যুগোপযোগীকরণ, শিক্ষাক্ষেত্রে বৈষম্য দূরীকরণ এবং শিক্ষকদের নীতি-নৈতিকতার বিপর্যয় রোধ করতে না পারলে অমানিশার অন্ধকারে হারিয়ে যাবে আমাদের পরবর্তী প্রজন্ম। #

লেখকঃ প্রফেসর ড. সৈয়দ সাখাওয়াত হোসেন
প্রাক্তন উপাচার্য,
পটুয়াখালী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়
জ্যেষ্ঠ অধ্যাপক,
বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়
বীর মুক্তিযোদ্ধা ও সেক্টর কমান্ডার্স ফোরাম নেতা।
প্রফেসর ড. সৈয়দ সাখাওয়াত হোসেন ➤ বাংলাদেশের শিক্ষাব্যবস্থা আজ নানান সমস্যায় জর্জরিত। সেগুলোর মধ্যে সবচেয়ে বড় সমস্যা হলো শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের সর্বোচ্চ কর্তৃপক্ষের দুর্নীতিপরায়ণ মানসিকতা এবং স্বেচ্ছাচারিতা। পৃথিবীব্যাপি একটি স্বতঃসিদ্ধ উক্তি আছে- ‘প্রতিটি শিক্ষা প্রতিষ্ঠান পরিচিত হয় সেটির শিক্ষক দ্বারা, শিক্ষকের কর্মদক্ষতা, সক্ষমতা, মেধা ও জ্ঞানভিত্তিক কর্মকাণ্ডের সম্মিলিত প্রয়াসের দ্বারা শিক্ষাকর্ম সম্পাদনের মাধ্যমে।’ অর্থাৎ শিক্ষকরাই হলো প্রতিষ্ঠানের মেইন ফ্যাক্টর বা প্রধান স্তম্ভ তথা মূল চালিকাশক্তি। আমরা যারা শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে শিক্ষকতা করি বা করেছি তাদের অর্জিত অভিজ্ঞতার আলোকেই আমার আজকের এই লেখার অবতারণা।
শুধু শিক্ষাই নয়, সারা বিশ্বের বিভিন্ন শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের বিশেষ করে বিশ্ববিদ্যালয়ের মানমর্যাদা নিরূপণ হয় শিক্ষা ও গবেষণার মানের উপর ভিত্তি করে- যা মূলত নির্ভর করে শিক্ষকদের সম্মিলিত প্রয়াসের উপরেই। কিন্তু পরিতাপের বিষয় হলো অধিকাংশ শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে সেই শিক্ষকরাই নানাভাবে নিগৃহীত ও ন্যায্য অধিকার থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন। তাদের শোষণ ও অধিকার হরণের মূলে রয়েছে প্রতিটি প্রতিষ্ঠানের কর্ণধারগণ। অধিকাংশ ক্ষেত্রেই প্রতিষ্ঠানের কর্ণধার হিসেবে নিয়োগ পাওয়ার পরে তারা নিজের গদি সুরক্ষা ও কিছু ব্যক্তিস্বার্থ সিদ্ধির জন্য নিজের পক্ষে একটি তোষামোদি গ্রুপ সৃষ্টি করেন। নিজের অনুগত বাহিনী তৈরি করতে গিয়ে শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে শিক্ষকদের বিদ্যমান ঐক্যের মধ্যে ভাঙন সৃষ্টি করেন। নানান লোভ-লালসা ও ভয়ভীতি দেখিয়ে নিজের পক্ষে টেনে আস্থাভাজন শিক্ষকদের নিয়ে দলবাজি শুরু করেন।
ফলে অল্প কিছুদিনেই শিক্ষকদের মধ্যে সুস্পষ্ট একটি বিভাজন তৈরি হয়। এক্ষেত্রে নিয়োগপ্রাপ্ত কর্তাব্যক্তি ব্রিটিশদের সেই ‘Divide and Rule’ পলিসি অবলম্বন করে নিজের মনের মতো প্রশাসন পরিচালনার অপচেষ্টা করে থাকেন। অনেক ক্ষেত্রেই তারা সফল হয়ে থাকেন নিজের অনুগত সেই তোষামোদি গ্রুপের সহযোগিতায়। শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের কর্ণধারের অসৎ উদ্দেশ্য হাসিল, ক্ষমতার দাপট ও কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠার জন্যই এসব করা হয়। এমন হীন উদ্দেশ্য চরিতার্থ করার মানসেই প্রতিষ্ঠানের গুরুত্ব এবং শিক্ষার পরিবেশ অবনমিত করা হয়। কর্তার ইচ্ছায় কর্ম পালনে একদল সবসময় সচেষ্ট থাকেন। তাদের কাছে শিক্ষা এবং গবেষণার মূল্য অতি নগণ্য। এদিকে অপর গ্রুপকে নিজেদের অস্তিত্ব রক্ষার জন্য সবসময় সচেষ্ট থাকতে হয়। ফলে তারাও শিক্ষা আর গবেষণায় মনোনিবেশ করার পরিবেশ থেকে বঞ্চিত হন।
দেশের শিক্ষাঙ্গনে এই অবক্ষয়ের চিত্র এখন প্রাথমিক বিদ্যালয় থেকে শুরু করে বিশ্ববিদ্যালয় পর্যন্ত বিস্তৃত। কর্ণধারদের অসৎ উদ্দেশ্য হাসিল করার জন্য আজ শিক্ষাব্যবস্থা ধ্বংসের দ্বারপ্রান্তে উপনীত। শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের কর্ণধার নিয়োগের প্রক্রিয়াটাও স্বচ্ছ নয়। কর্ণধার নিয়োগে প্রায়ই মেধা, দক্ষতা, যোগ্যতা, সক্ষমতা, অভিজ্ঞতা ও ম্যানেজারিয়াল স্কিলনেস, এসব কিছুই বিবেচনা করা হয় না বললেই চলে। নিয়োগ প্রদানের ক্ষেত্রে তোষামোদি রাজনৈতিক বিবেচনা ও সংযোগ স্থাপনের দক্ষতা তথা লবিংয়ের উপরই বেশি নির্ভর করে। ফলে অনেক সময়ই প্রচলিত আইন ও বিধিবিধানের তোয়াক্কা করা হয় না এসব নিয়োগ প্রক্রিয়ায়। ফলে এর সরাসরি কুপ্রভাব পড়ে শিক্ষা ব্যবস্থায়।
অনেক সময় এমনও দেখা যায় যে, যার কথা কেউ কখনো চিন্তা করেনি কিংবা যার ওই চেয়ারে বসার বিন্দুমাত্র যোগ্যতা নেই এমন কাউকে নিয়োগ দেয়া হয়। লবিং আর তদবিরের জোরে বাগিয়ে নেওয়া হয় চেয়ার। ফলে তাঁর যোগ্যতা এবং অভিজ্ঞতার অভাবে প্রতিষ্ঠান পরিচালনার সব নিয়মকানুন আর নীতি-নৈতিকতা ছিন্নভিন্ন হয়ে যায়। সর্বোচ্চ বিদ্যাপীঠের কর্ণধার নিয়োগে সঠিক কোনো নীতিমালা না থাকায় অধিকাংশ ক্ষেত্রেই স্বজনপ্রীতি, তোষামোদি কিংবা অর্থ লেনদেনের মাধ্যমে কার্যসম্পাদন হয়ে থাকে। বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্ষেত্রে এটা অনেকটা ওপেন সিক্রেট ঘটনা।
এভাবে অনৈতিক পন্থায় যারা নিয়োগ লাভ করেন সঙ্গত কারণেই তাদের কোনো দায়বদ্ধতা কিংবা জবাবদিহিতা থাকে না। ফলে দায়িত্ব পেয়েই তিনি স্বেচ্ছাচারী হয়ে ওঠেন। সর্বক্ষেত্রে স্বৈরাচারী আচরণ শুরু করেন। অবৈধ পন্থায় অর্থ উপার্জন করাই তাঁর প্রধান লক্ষ্য হয়ে ওঠে। এসব কারণেই এখন অনেক অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনা মিডিয়ার শিরোনাম হয়। বেশকিছু বিশ্ববিদ্যায়ের কর্নধারদের বিরুদ্ধে প্রতিষ্ঠানের টাকা অবৈধভাবে আত্মসাৎ, ক্ষমতার চরম অপব্যবহার এবং চারিত্রিক ও নৈতিক স্খলনসহ বিভিন্ন গুরুতর অভিযোগের খবর হরহামেশাই শোনা যায়। এজন্য অনেককে চাকরিচ্যুত হয়ে এমনকি শ্রীঘরে পর্যন্ত যেতে হয়।
অনেক প্রতিষ্ঠান প্রধান নিজের হীনস্বার্থ চরিতার্থ করার জন্য শিক্ষক-কর্মকর্তা-কর্মচারীর মধ্যে নানাবিধ বিভাজন সৃষ্টি করেন। এতে তিনি নিজে লাভবান হলেও শিক্ষার পরিবেশ ধ্বংস হয়। শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের মূল লক্ষ্য মারাত্মকভাবে ব্যহত হয়। অনেকে প্রতিষ্ঠানের সর্বোচ্চ পদে থেকে অনেকে মিথ্যার আশ্রয়, প্রতারণা, কথা দিয়ে কথা না রাখা, মোনাফেকি আর বিশ্বাসঘাতকতা করার মতো জঘন্য কর্মকাণ্ডের সাথে জড়িত হয়ে পড়েন। ফলে প্রতিষ্ঠান পরিচালনার যোগ্যতা হারান তিনি। এসব অযোগ্য ব্যক্তিরা নানান কূটকৌশলে কাঙ্ক্ষিত নিয়োগ বাগিয়ে নিয়ে শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা ও গবেষণাকে মারাত্মক হুমকির মধ্যে নিপতিত করেন।
আমার এক বন্ধু আক্ষেপ করে বলেন- ‘অধিকাংশ ক্ষেত্রেই নিয়োগ দেওয়া হয় না, নিয়োগ নেয়া হয়।ছলেবলে, কৌশলে কিংবা মোটা অংকের অর্থের বিনিময়ে। ফলে এই নিয়োগপ্রাপ্তদের প্রতিষ্ঠানের প্রতি, দেশ ও জাতির প্রতি কোনো দায়বদ্ধতা থাকে না। তাদের মাঝে থাকে না সততা, দেশপ্রেম, শুদ্ধাচার কিংবা নীতি-নৈতিকতার বালাই। আমার দীর্ঘ অভিজ্ঞতা থেকে দেখেছি- যিনি প্রতিষ্ঠানের কর্ণধার হন মূলত তাঁর ইচ্ছার উপরেই সবকিছু নির্ভর করে। সর্বত্র কর্তার ইচ্ছায় কর্ম এবং কীর্তন হয়। এর ফলে মারাত্মক প্রভাব পড়ে শিক্ষা এবং গবেষণার ক্ষেত্রে। এসব কারণেই আজ শিক্ষার বিপর্যয় ঘটেছে। বিশেষ করে উচ্চশিক্ষায় দেখা দিয়েছে চরম অবক্ষয়। আমাদের ভঙ্গুর শিক্ষাব্যবস্থার প্রভাব বর্তমানে সুস্পষ্টভাবে সর্বত্র দৃশ্যমান।
বিশ্বের বহুল প্রচলিত ও স্বনামধন্য বিশ্ববিদ্যালয়ের গুণগত মান পরিমাপক পদ্ধতি টাইমস হায়ার এডুকেশন (THE) কর্তৃক Ranking-2024’এ বিশ্বের ১০৮ টি দেশের ১,৯০৪ টি বিশ্ববিদ্যালয় নিয়ে জরিপ পরিচালনা করা হয়। এতে বাংলাদেশের ২১ টি বিশ্ববিদ্যালয় র্যাঙ্কিংয়ে ৮০১ থেকে ১০০০-এর মধ্যে স্থান পেয়েছে। এরমধ্যে শীর্ষস্থান অর্জন করেছে ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়। ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়ের পরের অবস্থানে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়। এরপরে পর্যায়ক্রমে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়, নর্থ-সাউথ, বাকৃবি, বুয়েট, শাহজালাল বিশ্ববিদ্যালয় অন্যতম।
তবে এবারই প্রথম দেশের পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়গুলোকে পেছনে ফেলে একটি প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয় সামনে চলে এসেছে।
The Times Higher Education World University Ranking-2024 adopts methodology which includes 18 carefully calibrated performance indicators that measure an institution’s performance across five areas: teaching, research environment, research quality, industry, and International outlook.
যে পাঁচটি ইন্ডিকেটরস তথা সূচক দিয়ে শিক্ষার মানদণ্ড বিশ্লেষণ করা হয় সেগুলোর সব কয়টির সাথেই শিক্ষকগণ ওতোপ্রোতোভাবে জড়িত। সেই শিক্ষকদের নিয়ে যদি নানান বিরোধ ও গ্রুপিং সৃষ্টি করা হয় তাহলে সবকিছুই মুখ থুবড়ে পড়বে সন্দেহাতীতভাবে। তাছাড়া কেউ যদি বিশ্ববিদ্যালয় গড়ার ভিশন নিয়ে কাজ না করে নিজের ব্যক্তিগত হীনস্বার্থ চরিতার্থ করার উদ্দেশ্য নিয়ে মহান শিক্ষকতা পেশায় যোগদান করেন সেক্ষেত্রে যা হবার তা-ই হবে এবং বর্তমানে হচ্ছে। বিশ্ববিদ্যালয়ের ভিসিদের সামগ্রিক বিষয়ে দক্ষতা, মেধা ও দৃষ্টিভঙ্গির উপরেই মূলত অনেক কিছু নির্ভর করে। বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ে অনেক মেধাবী শিক্ষক আছেন যাদেরকে উপযুক্ত পরিবেশ ও সুযোগ দিলে তারা শিক্ষা ও গবেষণায় উল্লেখযোগ্য অবদান রাখতে পারেন।
সকল বিষয়ে মেধা সৃষ্টি করার পরিবেশ সংরক্ষণ করার প্রাথমিক দায়িত্ব শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের কর্ণধার এবং সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের। যে কথা দিয়ে আমার লেখাটা শুরু করেছিলাম তা ছিল সকল শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের প্রধান কম্পোনেন্ট হলেন শিক্ষক। আর সেই শিক্ষকদের সঠিকভাবে ব্যবহার ও পরিচালনার দায়িত্ব হলো প্রতিষ্ঠান প্রধানের। তাই সততা, নিষ্ঠা ও নীতি-নৈতিকতার সাথেসাথে সব ধরনের লোভ-লালসার উর্ধ্বে উঠে শিক্ষা প্রতিষ্ঠান পরিচালনা করতে হবে। এটা না পারলে দেশের ভবিষ্যৎ প্রজন্ম এক মেরুদণ্ডহীন জাতিতে পরিণত হবে।
দেশে শিক্ষার্থীর মধ্যে যদি মেধা সৃষ্টি করা না যায়, সততা ও দেশপ্রেম তৈরি করা না যায় তাহলে আমরা যে স্মার্ট বাংলাদেশ বিনির্মানের কথা বলছি তা অর্জন করা সম্ভব হবে না। শুধু মেধা থাকাই যথেষ্ট নয়। যে মেধার মধ্যে সততা এবং শুদ্ধাচার না থাকে সেই মেধা মূল্যহীন। পক্ষান্তরে এমন মেধা দেশ ও জাতির জন্য বিপর্যয় ডেকে আনে। এছাড়া সামনে আসছে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার (Artificial Intelligence) যুগ; যা সম্পূর্ণভাবে নতুন ধারণার উপর ভর করে সকল ক্ষেত্রে উন্নয়নের পথ প্রদর্শক হিসাবে কাজ করবে। আমাদের সকল শিক্ষা প্রতিষ্ঠানকে সেভাবেই গড়ে তুলতে হবে। বিজ্ঞানের চরম উৎকর্ষের এই যুগে আমাদের শিক্ষাব্যবস্থাকে যুগোপযোগীকরণ, শিক্ষাক্ষেত্রে বৈষম্য দূরীকরণ এবং শিক্ষকদের নীতি-নৈতিকতার বিপর্যয় রোধ করতে না পারলে অমানিশার অন্ধকারে হারিয়ে যাবে আমাদের পরবর্তী প্রজন্ম। #

লেখকঃ প্রফেসর ড. সৈয়দ সাখাওয়াত হোসেন
প্রাক্তন উপাচার্য,
পটুয়াখালী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়
জ্যেষ্ঠ অধ্যাপক,
বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়
বীর মুক্তিযোদ্ধা ও সেক্টর কমান্ডার্স ফোরাম নেতা।
০৮ ফেব্রুয়ারি, ২০২৬ ১৯:৪৯
০৮ ফেব্রুয়ারি, ২০২৬ ১৯:২২
০৮ ফেব্রুয়ারি, ২০২৬ ১৯:০০
০৮ ফেব্রুয়ারি, ২০২৬ ১৮:৩২

০৮ ফেব্রুয়ারি, ২০২৬ ১৯:০০
বিংশ শতাব্দীর মধ্যলগ্নে, যখন বিশ্বসাহিত্য আধুনিকতার রুক্ষ ও যান্ত্রিক অভিঘাতে এক পরিচয়হীন শূন্যতায় নিমজ্জিত ছিল, ঠিক সেই মাহেন্দ্রক্ষণে আবু জাফর ওবায়দুল্লাহর আবির্ভাব ঘটেছিল এক নাক্ষত্রিক স্থপতির মতো। ১৯৩৪ সালের ৮ ফেব্রুয়ারি বরিশাল জেলার বাবুগঞ্জ উপজেলার পলিধৌত বাহেরচর গ্রামে যে প্রাণস্পন্দনের শুরু, তা কেবল একটি জীবনের অঙ্কুরোদ্গম ছিল না—বরং তা ছিল একটি উত্তর-ঔপনিবেশিক জাতিসত্তার আত্মপরিচয় সন্ধানের দার্শনিক ইশতেহার। আড়িয়াল খাঁ ও সন্ধ্যা নদীর অববাহিকায় গড়ে ওঠা এই বাহেরচরের আদিম পলি আর মরমী আবহ তাঁর সত্তাকে এক দ্বান্দ্বিক অথচ সুষম বিন্যাসে গড়ে তুলেছিল; যেখানে একাধারে মিশে ছিল বাংলার লোকজ সহজপন্থা এবং ইংরেজি সাহিত্যের রাজকীয় আভিজাত্যের ধ্রুপদী দীপ্তি। হার্ভার্ডের বৈশ্বিক প্রশাসনিক ব্যাকরণ আর বাহেরচরের মাটির সোঁদা ঘ্রাণ তাঁর ভেতর এমন এক ‘পোয়েটিক জেনিয়াস’ তৈরি করেছিল, যা আধুনিকতাকে কেবল নাগরিক ড্রয়িংরুমের অলঙ্কার হিসেবে দেখেনি, বরং তাকে নিয়ে গিয়েছিল কর্ষিত জমিন ও ঐতিহ্যের শাশ্বত বেদিতে। তিনি বিশ্বাস করতেন, মানুষ কেবল তার বর্তমানের সমষ্টি নয়, বরং সে তার পূর্বপুরুষের সঞ্চিত অভিজ্ঞতার এক জীবন্ত সংকলন—যেখানে প্রতিটি দীর্ঘশ্বাস এক একটি শস্যের দানার মতো পবিত্র।
আবু জাফর ওবায়দুল্লাহর কাব্যভুবনের বিবর্তন পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, প্রতিটি সৃষ্টিই একেকটি অনন্য নান্দনিক অধ্যায়। তাঁর প্রথম কাব্যগ্রন্থ ‘সাতনরী হার’ (১৯৫৫) ছিল রোমান্টিক সংবেদনশীলতা ও লোকজ ছন্দের এক আশ্চর্য মেলবন্ধন, যেখানে তিনি ঐতিহ্যের অলঙ্কার দিয়ে আধুনিকতার অবয়ব গড়েছিলেন। বিশেষ করে ‘কমলিনী-র হাসি’ গ্রন্থে নারীর শাশ্বত রূপ ও তাঁর অন্তর্লীন হাসিকে তিনি যেভাবে দার্শনিক উচ্চতায় নিয়ে গেছেন, তা বাংলা সাহিত্যে জাদুকরী বাস্তবতার এক অনন্য উদাহরণ। তাঁর কাব্যে ‘খাঁচার ভিতর অচিন পাখি’ সুফি দর্শনের সেই চিরন্তন হাহাকারকে আধুনিক নাগরিক চেতনার সাথে যুক্ত করে, যেখানে তিনি মরমী ঢংয়ে প্রশ্ন তোলেন— “তুমি কে / এই অন্ধকারে একা ব’সে আছো? / তোমার চোখের তারা কি নক্ষত্রের প্রতিচ্ছায়া?” (খাঁচার ভিতর অচিন পাখি, ১৯৯৬)। ওবায়দুল্লাহর কাব্যিক শ্রেষ্ঠত্বের শিখর স্পর্শ করে তাঁর কালজয়ী ‘আমি কিংবদন্তির কথা বলছি’ (১৯৮২)। কার্ল ইয়ুং-এর ‘কালেক্টিভ আনকনশাস’ বা সমষ্টিগত অবচেতনার তত্ত্বের আলোকে এই কাব্যটি বাঙালির হাজার বছরের নৃতাত্ত্বিক স্মৃতির এক মহাকাব্যিক ইশতেহার। জীবনানন্দ দাশ যে রূপসী বাংলার ধূসর পাণ্ডুলিপি লিখেছিলেন, ওবায়দুল্লাহ সেই মাটির ইতিহাসকেই দিয়েছেন এক বীরত্বগাথার রূপ। তিনি যখন উচ্চারণ করেন— “আমি আমার পূর্বপুরুষের কথা বলছি / তাঁর করতলে পলিমাটির সৌরভ ছিল / তিনি অতিক্রান্ত পাহাড়ের কথা বলতেন / অরণ্য এবং পদের কথা বলতেন”—তখন তিনি আসলে একজন কবির ব্যক্তি-পরিচয় ছাপিয়ে এক জাতির শেকড়ের অতন্দ্র প্রহরী হয়ে ওঠেন। তাঁর শব্দশৈলী ছিল মিতব্যয়ী কিন্তু আবেদন ছিল মহাজাগতিক। তাঁর সেই বজ্রনির্ঘোষ ঘোষণা আজও আমাদের বিবেকের দরজায় কড়া নাড়ে— “যে কবিতা শুনতে জানে না / সে আজন্ম ক্রীতদাস থেকে যাবে।” (আমি কিংবদন্তির কথা বলছি, ১৯৮২)।
ঐতিহ্যের এই পুনর্নির্মাণে ওবায়দুল্লাহর তুলনা অনিবার্যভাবে টি. এস. এলিয়টের ‘ঐতিহাসিক বোধ’-এর সাথে চলে আসে। এলিয়ট যেমন পাশ্চাত্যের ঐতিহ্যের আধুনিকায়নের পথ দেখিয়েছিলেন, ওবায়দুল্লাহ তেমনি বাংলার লুপ্তপ্রায় মিথ ও লোকগাথাকে আধুনিক কবিতার শরীরে সঞ্চারিত করে আধুনিকতার একটি ‘দেশজ মডেল’ তৈরি করেছেন। তবে তাঁর মহত্তম বৈশিষ্ট্য ছিল আমলাতন্ত্রের যান্ত্রিক শীতলতা বনাম কবিতার মানবিক উষ্ণতার সার্থক মেলবন্ধন। তিনি যখন বিশ্বব্যাংকের উচ্চপদে কিংবা জাতিসংঘের এফএও (FAO)-এর এশীয় প্রতিনিধি হিসেবে নীতি-নির্ধারণ করেছেন, তখন তাঁর প্রজ্ঞা কেবল ফাইলে সীমাবদ্ধ থাকেনি। কৃষি ও সেচ মন্ত্রী হিসেবে তাঁর আমলেই প্রবর্তিত হয়েছিল বৈপ্লবিক ‘গুচ্ছগ্রাম’ প্রকল্প, যা ভূমিহীন মানুষের অস্তিত্বের ঠিকানা দিয়েছিল। তাঁর শাসনামলে সেচ ব্যবস্থার আধুনিকায়ন ও ‘সবুজ বিপ্লবের’ ডাক ছিল মূলত মাটির প্রতি তাঁর এক শৈল্পিক অঙ্গীকার। তিনি অনুভব করেছিলেন যে, ক্ষুধার্ত মানুষের কাছে ভাত ও কবিতা সমার্থক—এই মরমী দর্শনই তাঁর প্রশাসনিক মেধা ও সাহিত্যিক জীবনকে একসূত্রে গেঁথেছে। বিশ্বব্যাংকের কনসালট্যান্ট হিসেবে তাঁর গ্রামীণ উন্নয়ন মডেলগুলো আজও প্রমাণ করে যে, একজন সত্যিকারের কবির চোখে উন্নয়ন কেবল সংখ্যা নয়, বরং মানুষের সামগ্রিক মুক্তি।
শিল্পের এই দায়বদ্ধতা পাবলো নেরুদার মতো তাঁর কাব্যেও প্রকৃতি ও রাজনীতিকে এক পরাবাস্তব রসায়নে গেঁথেছে। ‘বৃষ্টি ও সাহসী পুরুষের জন্য প্রার্থনা’ (১৯৭১) কাব্যগ্রন্থে তাঁর সেই হাহাকার এক রাজনৈতিক ও প্রাকৃতিক শুদ্ধিকরণের নাম। সেখানে তিনি কাতরকণ্ঠে অমোঘ প্রার্থনায় নিমগ্ন হন— “হে ঈশ্বর / আমাদের বৃষ্টির জল দাও / যেন আমাদের পাপ ধুয়ে যায় / যেন শস্যের গহন থেকে আবার জীবন জেগে ওঠে।” (বৃষ্টি ও সাহসী পুরুষের জন্য প্রার্থনা, ১৯৭১)। ১৯৫২-র ভাষা আন্দোলনে সিভিল সার্ভিসের (CSP) নবীন কর্মকর্তা হিসেবে ঢাকা জেলা ম্যাজিস্ট্রেটের দপ্তরে কর্মরত থাকাকালীন তাঁর যে সূক্ষ্ম নৈতিক টানাপোড়েন ছিল, তা তিনি জয় করেছিলেন শিল্পের সাহসিকতায়। ১৯৫৩ সালে প্রকাশিত হাসান হাফিজুর রহমান সম্পাদিত প্রথম ‘একুশের সংকলন’-এর নেপথ্যে তাঁর অর্থায়ন ও সক্রিয় সহযোগিতা ছিল আমলাতান্ত্রিক শৃঙ্খলের বিরুদ্ধে এক নীরব বিদ্রোহ। তাঁর সহকর্মীরা বলতেন, ওবায়দুল্লাহ ফাইলে বন্দি কোনো আমলা ছিলেন না, বরং এক ঋজু ব্যক্তিত্ব ছিলেন, যিনি ক্ষমতার অলিন্দেও তাঁর কবিত্ব ও নৈতিকতাকে অমলিন রেখেছিলেন। তাঁর বাসভবনে ‘আলাপন’-এর বুদ্ধিবৃত্তিক আড্ডা ছিল মূলত সমকালীন শ্রেষ্ঠ চিন্তাবিদদের এক মিলনমেলা, যা ক্ষমতার যান্ত্রিকতাকে সৃজনশীলতার স্পর্শে মানবিক করার এক বিরল নজির।
আজ ২০ ২৬ সালের এই নিষ্প্রাণ যান্ত্রিক সভ্যতায়, যখন মানবসত্তা কৃত্রিম মেধার গোলকধাঁধায় তার আদিম স্পন্দন হারিয়ে ফেলছে, তখন ওবায়দুল্লাহর ‘পলিমাটির সৌরভ’ আমাদের ক্লান্ত অস্তিত্বে এক পৈত্তিক আশ্লেষ হয়ে ধরা দেয়। তথ্যের পাহাড় আর অ্যালগরিদমের শীতল অরণ্যে যখন মানবিক আবেগগুলো প্রাণহীন সংজ্ঞায় পর্যবসিত, তখন তাঁর কবিতা আমাদের সেই চিরন্তন শেকড়ের স্পন্দন শুনিয়ে যায়। তিনি আমাদের মনে করিয়ে দেন—আমরা নিছক কোনো যান্ত্রিক কোড নই, বরং এই বাংলার কর্ষিত মৃত্তিকার এক একটি জীবন্ত নক্ষত্র। চিরকালীনতার আলোয় আবু জাফর ওবায়দুল্লাহর সৃষ্টিকর্ম কেবল শব্দের কারুকাজ নয়, বরং তা আমাদের আত্মপরিচয়ের এক অতলস্পর্শী দর্পণ। তাঁর কালজয়ী কবিতা ‘মাগো, ওরা বলে’ কেবল একটি শোকগাথা হয়ে থাকেনি, তা হয়ে উঠেছে জাদুকরী বাস্তবতার এক শাশ্বত মহাকাব্য। মাতৃভাষার প্রতি সেই ব্যাকুলতা তিনি গেঁথেছিলেন এইভাবে— “মাগো, ওরা বলে / তোমার কোলে শুয়ে / গল্প শুনতে দেবে না। / বলো মা, তাই কি হয়?” (কবিতা- ‘মাগো, ওরা বলে’, কাব্যগ্রন্থ- সহিষ্ণু প্রতীক্ষা, ১৯৮২)।
কুমড়ো ফুল কিংবা লতা-পাতার বুননে তিনি মায়ের আকুতিকে যেভাবে মহাজাগতিক ব্যাপ্তি দিয়েছেন, তা বিশ্বসাহিত্যের ধ্রুপদী ঐতিহ্যেরই নামান্তর। বর্তমানের যান্ত্রিক মরুভূমিতে যখন মানুষ তার শিকড় হারিয়ে দিশেহারা, তখন ওবায়দুল্লাহর কবিতা আমাদের ফিরিয়ে নিয়ে যায় সেই হারানো নন্দনকাননে, যেখানে আধুনিকতা আর ঐতিহ্য পরস্পরকে আলিঙ্গন করে বাঁচে। ২০০১ সালের ১৯ মার্চ এই ঋষিপ্রতিম কবি নশ্বর পৃথিবী ত্যাগ করলেও, তিনি রেখে গেছেন এমন এক দার্শনিক আলোকবর্তিকা, যা আমাদের শেখায়—প্রকৃত মুক্তি ঐতিহ্যের বিনাশে নয়, বরং তার পুনর্জাগরণে। আবু জাফর ওবায়দুল্লাহ আজ কেবল একজন ব্যক্তি বা কবির নাম নয়, তিনি আমাদের পলিমাটির সেই অমর প্রজ্ঞা, যা যুগ-যুগান্তরের ধূলি সরিয়ে আমাদের অস্তিত্বের শ্বেতপদ্মটিকে জাগিয়ে রাখে।
বাহাউদ্দিন গোলাপ
(লেখক: প্রাবন্ধিক, গবেষক ও সংস্কৃতি কর্মী। ডেপুটি রেজিস্ট্রার, বরিশাল বিশ্ববিদ্যালয় b_golap@yahoo.com)
বিংশ শতাব্দীর মধ্যলগ্নে, যখন বিশ্বসাহিত্য আধুনিকতার রুক্ষ ও যান্ত্রিক অভিঘাতে এক পরিচয়হীন শূন্যতায় নিমজ্জিত ছিল, ঠিক সেই মাহেন্দ্রক্ষণে আবু জাফর ওবায়দুল্লাহর আবির্ভাব ঘটেছিল এক নাক্ষত্রিক স্থপতির মতো। ১৯৩৪ সালের ৮ ফেব্রুয়ারি বরিশাল জেলার বাবুগঞ্জ উপজেলার পলিধৌত বাহেরচর গ্রামে যে প্রাণস্পন্দনের শুরু, তা কেবল একটি জীবনের অঙ্কুরোদ্গম ছিল না—বরং তা ছিল একটি উত্তর-ঔপনিবেশিক জাতিসত্তার আত্মপরিচয় সন্ধানের দার্শনিক ইশতেহার। আড়িয়াল খাঁ ও সন্ধ্যা নদীর অববাহিকায় গড়ে ওঠা এই বাহেরচরের আদিম পলি আর মরমী আবহ তাঁর সত্তাকে এক দ্বান্দ্বিক অথচ সুষম বিন্যাসে গড়ে তুলেছিল; যেখানে একাধারে মিশে ছিল বাংলার লোকজ সহজপন্থা এবং ইংরেজি সাহিত্যের রাজকীয় আভিজাত্যের ধ্রুপদী দীপ্তি। হার্ভার্ডের বৈশ্বিক প্রশাসনিক ব্যাকরণ আর বাহেরচরের মাটির সোঁদা ঘ্রাণ তাঁর ভেতর এমন এক ‘পোয়েটিক জেনিয়াস’ তৈরি করেছিল, যা আধুনিকতাকে কেবল নাগরিক ড্রয়িংরুমের অলঙ্কার হিসেবে দেখেনি, বরং তাকে নিয়ে গিয়েছিল কর্ষিত জমিন ও ঐতিহ্যের শাশ্বত বেদিতে। তিনি বিশ্বাস করতেন, মানুষ কেবল তার বর্তমানের সমষ্টি নয়, বরং সে তার পূর্বপুরুষের সঞ্চিত অভিজ্ঞতার এক জীবন্ত সংকলন—যেখানে প্রতিটি দীর্ঘশ্বাস এক একটি শস্যের দানার মতো পবিত্র।
আবু জাফর ওবায়দুল্লাহর কাব্যভুবনের বিবর্তন পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, প্রতিটি সৃষ্টিই একেকটি অনন্য নান্দনিক অধ্যায়। তাঁর প্রথম কাব্যগ্রন্থ ‘সাতনরী হার’ (১৯৫৫) ছিল রোমান্টিক সংবেদনশীলতা ও লোকজ ছন্দের এক আশ্চর্য মেলবন্ধন, যেখানে তিনি ঐতিহ্যের অলঙ্কার দিয়ে আধুনিকতার অবয়ব গড়েছিলেন। বিশেষ করে ‘কমলিনী-র হাসি’ গ্রন্থে নারীর শাশ্বত রূপ ও তাঁর অন্তর্লীন হাসিকে তিনি যেভাবে দার্শনিক উচ্চতায় নিয়ে গেছেন, তা বাংলা সাহিত্যে জাদুকরী বাস্তবতার এক অনন্য উদাহরণ। তাঁর কাব্যে ‘খাঁচার ভিতর অচিন পাখি’ সুফি দর্শনের সেই চিরন্তন হাহাকারকে আধুনিক নাগরিক চেতনার সাথে যুক্ত করে, যেখানে তিনি মরমী ঢংয়ে প্রশ্ন তোলেন— “তুমি কে / এই অন্ধকারে একা ব’সে আছো? / তোমার চোখের তারা কি নক্ষত্রের প্রতিচ্ছায়া?” (খাঁচার ভিতর অচিন পাখি, ১৯৯৬)। ওবায়দুল্লাহর কাব্যিক শ্রেষ্ঠত্বের শিখর স্পর্শ করে তাঁর কালজয়ী ‘আমি কিংবদন্তির কথা বলছি’ (১৯৮২)। কার্ল ইয়ুং-এর ‘কালেক্টিভ আনকনশাস’ বা সমষ্টিগত অবচেতনার তত্ত্বের আলোকে এই কাব্যটি বাঙালির হাজার বছরের নৃতাত্ত্বিক স্মৃতির এক মহাকাব্যিক ইশতেহার। জীবনানন্দ দাশ যে রূপসী বাংলার ধূসর পাণ্ডুলিপি লিখেছিলেন, ওবায়দুল্লাহ সেই মাটির ইতিহাসকেই দিয়েছেন এক বীরত্বগাথার রূপ। তিনি যখন উচ্চারণ করেন— “আমি আমার পূর্বপুরুষের কথা বলছি / তাঁর করতলে পলিমাটির সৌরভ ছিল / তিনি অতিক্রান্ত পাহাড়ের কথা বলতেন / অরণ্য এবং পদের কথা বলতেন”—তখন তিনি আসলে একজন কবির ব্যক্তি-পরিচয় ছাপিয়ে এক জাতির শেকড়ের অতন্দ্র প্রহরী হয়ে ওঠেন। তাঁর শব্দশৈলী ছিল মিতব্যয়ী কিন্তু আবেদন ছিল মহাজাগতিক। তাঁর সেই বজ্রনির্ঘোষ ঘোষণা আজও আমাদের বিবেকের দরজায় কড়া নাড়ে— “যে কবিতা শুনতে জানে না / সে আজন্ম ক্রীতদাস থেকে যাবে।” (আমি কিংবদন্তির কথা বলছি, ১৯৮২)।
ঐতিহ্যের এই পুনর্নির্মাণে ওবায়দুল্লাহর তুলনা অনিবার্যভাবে টি. এস. এলিয়টের ‘ঐতিহাসিক বোধ’-এর সাথে চলে আসে। এলিয়ট যেমন পাশ্চাত্যের ঐতিহ্যের আধুনিকায়নের পথ দেখিয়েছিলেন, ওবায়দুল্লাহ তেমনি বাংলার লুপ্তপ্রায় মিথ ও লোকগাথাকে আধুনিক কবিতার শরীরে সঞ্চারিত করে আধুনিকতার একটি ‘দেশজ মডেল’ তৈরি করেছেন। তবে তাঁর মহত্তম বৈশিষ্ট্য ছিল আমলাতন্ত্রের যান্ত্রিক শীতলতা বনাম কবিতার মানবিক উষ্ণতার সার্থক মেলবন্ধন। তিনি যখন বিশ্বব্যাংকের উচ্চপদে কিংবা জাতিসংঘের এফএও (FAO)-এর এশীয় প্রতিনিধি হিসেবে নীতি-নির্ধারণ করেছেন, তখন তাঁর প্রজ্ঞা কেবল ফাইলে সীমাবদ্ধ থাকেনি। কৃষি ও সেচ মন্ত্রী হিসেবে তাঁর আমলেই প্রবর্তিত হয়েছিল বৈপ্লবিক ‘গুচ্ছগ্রাম’ প্রকল্প, যা ভূমিহীন মানুষের অস্তিত্বের ঠিকানা দিয়েছিল। তাঁর শাসনামলে সেচ ব্যবস্থার আধুনিকায়ন ও ‘সবুজ বিপ্লবের’ ডাক ছিল মূলত মাটির প্রতি তাঁর এক শৈল্পিক অঙ্গীকার। তিনি অনুভব করেছিলেন যে, ক্ষুধার্ত মানুষের কাছে ভাত ও কবিতা সমার্থক—এই মরমী দর্শনই তাঁর প্রশাসনিক মেধা ও সাহিত্যিক জীবনকে একসূত্রে গেঁথেছে। বিশ্বব্যাংকের কনসালট্যান্ট হিসেবে তাঁর গ্রামীণ উন্নয়ন মডেলগুলো আজও প্রমাণ করে যে, একজন সত্যিকারের কবির চোখে উন্নয়ন কেবল সংখ্যা নয়, বরং মানুষের সামগ্রিক মুক্তি।
শিল্পের এই দায়বদ্ধতা পাবলো নেরুদার মতো তাঁর কাব্যেও প্রকৃতি ও রাজনীতিকে এক পরাবাস্তব রসায়নে গেঁথেছে। ‘বৃষ্টি ও সাহসী পুরুষের জন্য প্রার্থনা’ (১৯৭১) কাব্যগ্রন্থে তাঁর সেই হাহাকার এক রাজনৈতিক ও প্রাকৃতিক শুদ্ধিকরণের নাম। সেখানে তিনি কাতরকণ্ঠে অমোঘ প্রার্থনায় নিমগ্ন হন— “হে ঈশ্বর / আমাদের বৃষ্টির জল দাও / যেন আমাদের পাপ ধুয়ে যায় / যেন শস্যের গহন থেকে আবার জীবন জেগে ওঠে।” (বৃষ্টি ও সাহসী পুরুষের জন্য প্রার্থনা, ১৯৭১)। ১৯৫২-র ভাষা আন্দোলনে সিভিল সার্ভিসের (CSP) নবীন কর্মকর্তা হিসেবে ঢাকা জেলা ম্যাজিস্ট্রেটের দপ্তরে কর্মরত থাকাকালীন তাঁর যে সূক্ষ্ম নৈতিক টানাপোড়েন ছিল, তা তিনি জয় করেছিলেন শিল্পের সাহসিকতায়। ১৯৫৩ সালে প্রকাশিত হাসান হাফিজুর রহমান সম্পাদিত প্রথম ‘একুশের সংকলন’-এর নেপথ্যে তাঁর অর্থায়ন ও সক্রিয় সহযোগিতা ছিল আমলাতান্ত্রিক শৃঙ্খলের বিরুদ্ধে এক নীরব বিদ্রোহ। তাঁর সহকর্মীরা বলতেন, ওবায়দুল্লাহ ফাইলে বন্দি কোনো আমলা ছিলেন না, বরং এক ঋজু ব্যক্তিত্ব ছিলেন, যিনি ক্ষমতার অলিন্দেও তাঁর কবিত্ব ও নৈতিকতাকে অমলিন রেখেছিলেন। তাঁর বাসভবনে ‘আলাপন’-এর বুদ্ধিবৃত্তিক আড্ডা ছিল মূলত সমকালীন শ্রেষ্ঠ চিন্তাবিদদের এক মিলনমেলা, যা ক্ষমতার যান্ত্রিকতাকে সৃজনশীলতার স্পর্শে মানবিক করার এক বিরল নজির।
আজ ২০ ২৬ সালের এই নিষ্প্রাণ যান্ত্রিক সভ্যতায়, যখন মানবসত্তা কৃত্রিম মেধার গোলকধাঁধায় তার আদিম স্পন্দন হারিয়ে ফেলছে, তখন ওবায়দুল্লাহর ‘পলিমাটির সৌরভ’ আমাদের ক্লান্ত অস্তিত্বে এক পৈত্তিক আশ্লেষ হয়ে ধরা দেয়। তথ্যের পাহাড় আর অ্যালগরিদমের শীতল অরণ্যে যখন মানবিক আবেগগুলো প্রাণহীন সংজ্ঞায় পর্যবসিত, তখন তাঁর কবিতা আমাদের সেই চিরন্তন শেকড়ের স্পন্দন শুনিয়ে যায়। তিনি আমাদের মনে করিয়ে দেন—আমরা নিছক কোনো যান্ত্রিক কোড নই, বরং এই বাংলার কর্ষিত মৃত্তিকার এক একটি জীবন্ত নক্ষত্র। চিরকালীনতার আলোয় আবু জাফর ওবায়দুল্লাহর সৃষ্টিকর্ম কেবল শব্দের কারুকাজ নয়, বরং তা আমাদের আত্মপরিচয়ের এক অতলস্পর্শী দর্পণ। তাঁর কালজয়ী কবিতা ‘মাগো, ওরা বলে’ কেবল একটি শোকগাথা হয়ে থাকেনি, তা হয়ে উঠেছে জাদুকরী বাস্তবতার এক শাশ্বত মহাকাব্য। মাতৃভাষার প্রতি সেই ব্যাকুলতা তিনি গেঁথেছিলেন এইভাবে— “মাগো, ওরা বলে / তোমার কোলে শুয়ে / গল্প শুনতে দেবে না। / বলো মা, তাই কি হয়?” (কবিতা- ‘মাগো, ওরা বলে’, কাব্যগ্রন্থ- সহিষ্ণু প্রতীক্ষা, ১৯৮২)।
কুমড়ো ফুল কিংবা লতা-পাতার বুননে তিনি মায়ের আকুতিকে যেভাবে মহাজাগতিক ব্যাপ্তি দিয়েছেন, তা বিশ্বসাহিত্যের ধ্রুপদী ঐতিহ্যেরই নামান্তর। বর্তমানের যান্ত্রিক মরুভূমিতে যখন মানুষ তার শিকড় হারিয়ে দিশেহারা, তখন ওবায়দুল্লাহর কবিতা আমাদের ফিরিয়ে নিয়ে যায় সেই হারানো নন্দনকাননে, যেখানে আধুনিকতা আর ঐতিহ্য পরস্পরকে আলিঙ্গন করে বাঁচে। ২০০১ সালের ১৯ মার্চ এই ঋষিপ্রতিম কবি নশ্বর পৃথিবী ত্যাগ করলেও, তিনি রেখে গেছেন এমন এক দার্শনিক আলোকবর্তিকা, যা আমাদের শেখায়—প্রকৃত মুক্তি ঐতিহ্যের বিনাশে নয়, বরং তার পুনর্জাগরণে। আবু জাফর ওবায়দুল্লাহ আজ কেবল একজন ব্যক্তি বা কবির নাম নয়, তিনি আমাদের পলিমাটির সেই অমর প্রজ্ঞা, যা যুগ-যুগান্তরের ধূলি সরিয়ে আমাদের অস্তিত্বের শ্বেতপদ্মটিকে জাগিয়ে রাখে।
বাহাউদ্দিন গোলাপ
(লেখক: প্রাবন্ধিক, গবেষক ও সংস্কৃতি কর্মী। ডেপুটি রেজিস্ট্রার, বরিশাল বিশ্ববিদ্যালয় b_golap@yahoo.com)

০৪ ফেব্রুয়ারি, ২০২৬ ০২:৪৮
‘I Have a Plan, ১৭ বছরের প্রবাস জীবন শেষ করে গত ২৫ ডিসেম্বর বাংলাদেশে ফিরে রাজধানী ঢাকার ৩০০ ফিটে জনসমুদ্রে দাঁড়িয়ে এই একটি বাক্য ছুড়ে জনসাধারণের মাঝে তুমুল আলোচনায় এসেছিলেন তারেক রহমান। সাবেক রাষ্ট্রপতি শহীদ জিয়াউর রহমান এবং সাবেক প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়ার ছোট সন্তান বিএনপির চেয়ারম্যান তারেকের উচ্চরিত এই ইংরেজি শব্দ নিয়ে দেশের রাজনৈতিক অঙ্গনে চুলচেরা বিশ্লেষণ শুরু হয়। এবং দেশের মিডিয়ায় ইতিবাচক লেখালেখি করলেও কলকাতার একচোখা গণমাধ্যম ‘রিপাবলিক বাংলা’ প্রচার করে তারেক রহমান ভারতকে বিপদে ফেলার বড় কোনো প্ল্যান নিয়ে এসেছেন। ভূমিপুত্র তারেক রহমান নির্বাচনী সফরে বিভিন্ন স্থানে গিয়ে জনসমাবেশ আগামীদিনে দেশ নিয়ে বহুমুখী উন্নয়ন করাসহ পরিকল্পনার গ্রহণের কথা জানালেও ‘আই হ্যাভ এ প্ল্যান’ কি কি আছে তা এখনও খোলাসা করেননি। বুধবার দীর্ঘ ২০ বছর পরে কীর্তনখোলার তীর জনপদ বরিশালের মাটিতে পা রাখবেন জিয়াপুত্র তারেক রহমান, এদিন বান্দরোডস্থ ঐতিহাসিক বেলসপার্ক মাঠে স্থানীয় বিএনপি আয়োজিত নির্বাচনী সমাবেশে লাখো মানুষের উপস্থিতিতে তিনি ভাষণ দেবেন। এই সমাবেশে বিএনপির শীর্ষনেতৃত্ব তারেক রহমান তার প্ল্যান বরিশালবাসীর কাছে তুলে ধরবেন কী না তা নিয়েও আলোচনার শেষ নেই।
নির্বাচনপূর্ব বিএনপির শীর্ষ নেতৃত্ব তারেক রহমানের আগমনকে ঘিরে বরিশালের নেতাকর্মীদের মধ্যে আনন্দ-উচ্ছ্বাস লক্ষ্য করা গেছে। দুদিন যাবত বরিশাল শহরসহ উপজেলাগুলোতে ট্রাকে ঘুরে ঘুরে তারেক রহমানের নামসংবলিত গান বাজিয়ে তার আগমনের বার্তা দেওয়া হচ্ছে। পাশাপাশি ধানের শীষ প্রতীকে ভোটও প্রার্থনা করা হয়।
ধারনা করা হচ্ছে, বুধবার ‘বাংলার ভূমিপুত্র’ তারেক রহমান তার বক্তব্যে বরিশাল তথা গোটা দক্ষিণাঞ্চলের উন্নয়ন এবং সমস্যা-সম্ভবনা নিয়ে কথা বলতে পারেন। বরিশালবাসীর প্রত্যাশাও এমনটাই। তবে এর বাইরে তার কোনো নির্দিষ্ট প্ল্যান নিয়ে আলোচনায় সরব হবেন কী না তা স্থানীয় বিএনপির নেতাকর্মীরা নিশ্চিত বলতে পারছে না।
বিশ্বজুড়ে নাগরিক অধিকার আন্দোলনের অন্যান্য প্রতীক যুক্তরাষ্ট্রের মার্টিন লুথার কিং জুনিয়র বলেছিলেন, ‘I Have a Dream.’। ২৫ ডিসেম্বর বাংলাদেশের মাটিতে নেমে ঢাকার ৩০০ ফিটে আনুমানিক অর্ধকোটি মানুষের মধ্যে দাঁড়িয়ে নেতা তারেক রহমান কর্মীদের উদ্দেশ করে যুক্তরাষ্ট্রে অবিসংবাদিত নেতা লুথার কিংয়ের নাম উচ্চরণ করার পাশাপাশি বলেছিলেন, ‘I Have a Plan’
রাজনৈতিক বোদ্ধারা বলছেন, এই দুটি বাক্যের মধ্যকার পার্থক্য শুধু অর্থগত নয়, বরং বাক্য দুটিও ভিন্ন দুটি সময়ের বাস্তবতাকে তুলে ধরে। মার্টিন লুথার কিংয়ের ‘ড্রিম’ জন্ম নেয় শ্রেণিবৈষম্যের বিরুদ্ধে লড়াইয়ের প্রশ্নে আর ‘প্ল্যান’ জন্ম নেয় রাষ্ট্রভাঙনের ঝুঁকির মুহূর্তে।
নেতা তারেক রহমান লন্ডন থেকে ফিরে গত ২৫ ডিসেম্বর বাংলাদেশ বিএনপির ৩১ দফার স্বপক্ষে সভা-সমাবেশে বক্তব্য রাখলেও ‘আই হ্যাভ এ প্ল্যান’ এই বাক্যটির অন্তরালে কি লুকায়িত আছে তা নিয়ে রাজনৈতিব মহলে কৌতুহলের শেষ নেই। এবং তিনি দীর্ঘ এক মাস ধরে দেশের বিভিন্ন জেলা ও বিভাগীয় শহরে সমাবেশে ইতিবাচক ও জনস্বার্থমূলক বক্তব্য রেখে প্রতিনিয়ত মিডিয়ার শিরোনাম হচ্ছেন, মানুষও তার প্রতি আগ্রহ দেখাচ্ছেন।
স্বাধীনতার ঘোষক জিয়াউর রহমান এবং আপসহীন নারী নেত্রী খালেদা জিয়াপুত্র বুধবার বরিশাল বিএনপির নির্বাচনী সমাবেশে দক্ষিণাঞ্চলের উন্নয়ন পরিকল্পনা নিয়ে কথা বলতে পারেন। সেক্ষেত্রে তিনি প্ল্যান প্রকাশ অপেক্ষা বেশি মাত্রায় গুরুত্ব দিয়ে এই অঞ্চলের মানুষের প্রাপ্তি এবং প্রত্যাশার হিসেব জানতে চাইতেও পারেন বলে কেউ কেউ মনে করছেন।
এই আলোচনায় অগ্রাধিকার পেতে বরিশাল-ঢাকা মহাসড়ক ৪ বা ৬ লেনে উন্নীত করা এবং বাইপাসসহ ভাঙা-বরিশাল হয়ে কুয়াকাটা পর্যন্ত রেললাইন স্থাপনের বিষয়টি। বর্তমান সময়ে বরিশাল-ঢাকা সরু মহাসড়কটিতে যে প্রতিনিয়ত প্রাণহানি ঘটছে তা সম্পর্কে নেতা তারেক রহমানও অবগত আছেন। এবং বরিশাল বিএনপির নেতারা এই বিষয়টি তাকে অনেক আগেই অবগত করেছেন বলে জানা গেছে।
মঙ্গলবার বিকেলের আগেই বেলসপার্ক মাঠে মঞ্চ তৈরির কাজ শেষ হয়। এর আগে দুপুরে নেতাকর্মীদের আনাগোনায় মাঠটি লোকে লোকারণ্য হয়ে যায়। সেই সময় স্থানীয় বিএনপির শীর্ষ নেতারা সমাবেশস্থল পরিদর্শন করেন।
কেন্দ্রীয় বিএনপির সাংগঠনিক সম্পাদক (বরিশাল বিভাগ) অ্যাডভোকেট বিলকিস জাহান শিরিন সমাবেশস্থল পরিদর্শনে গিয়ে জানান, তাদের সার্বিক প্রস্তুতি সম্পন্ন হয়েছে। এখন নেতা তারেক রহমানকে বরণ করার অপেক্ষা। তবে এই নারী নেত্রীও তার নেতা তারেক রহমান দক্ষিণাঞ্চল নিয়ে কি প্ল্যান করে রেখেছেন তা সম্পর্কে আগাম কিছু বলতে চাইছেন না বা বলতে পারছেন না। তারেক রহমানের এই সমাবেশে কয়েক লাখ সাধারণ মানুষের উপস্থিতি ঘটবে এবং বরিশাল শহরটি লোকে লোকারণ্য হয়ে যাবে মন্তব্য করেন শিরিন।
অনুরূপ মন্তব্য করেন বরিশাল মহানগর বিএনপির সদস্যসচিব জিয়া উদ্দিন সিকদার এবং একই কমিটির যুগ্ম আহ্বায়ক আফরোজা খানম নাসরিনসহ শীর্ষস্থানীয় নেতারা। মঙ্গলবার গভীর রাতে মহানগর বিএনপির এই দুই নেতা জানান, সন্ধ্যার পর থেকেই দক্ষিণাঞ্চলের বিভিন্ন জেলা এবং উপজেলা থেকে কর্মী-সমর্থকেরা মাঠে অবস্থান নেন। অবশ্য এর দুদিন আগে অর্থাৎ সোমবার থেকে বরিশালের অধিকাংশ হোটেলগুলোতে অবস্থান নেন জেলা-উপজেলার শীর্ষ নেতারা।
সবকিছু মিলিয়ে বলা যায়, দুই দশক পরে বরিশালে তারেক রহমানের আগমনে বিএনপির নেতাকর্মী-সমর্থকদের মধ্যে এক ধরনের উৎসবের আবহ বিরাজ করছে। এবং বরিশাল তথা দক্ষিণাঞ্চল নিয়ে তাদের নেতা কি প্ল্যান রেখেছেন তা শোনার অধির আগ্রহ নিয়ে অপেক্ষায় আছেন। কিন্তু বাংলার ভূমিপুত্র তারেক রহমান পূর্বে ঘোষিত ৩১ দফার বাইরে দেশ নিয়ে নতুন কি প্ল্যান এই বিষয়টি আদৌ বরিশালের সমাবেশে পরিস্কার করবেন কী না তা নিশ্চিত বলা সম্ভব হচ্ছে না।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকেরা বলছেন, বরিশাল তথা গোটা দক্ষিণাঞ্চলের সমস্যা এবং সম্ভবনাগুলো সম্পর্কে তারেক রহমান যেহেতু অবগত আছেন, বিশেষ করে বরিশাল-ঢাকা মহাসড়ক ৪ বা ৬ লেনে উন্নীত করার বিষয়টি নিয়ে তিনি নিজেও ভাবছেন। সেক্ষেত্রে জিয়াপুত্র তারেক মহাসড়ক বহু লেনে উন্নীত করাসহ ভাঙা টু কুয়াকাটা পর্যন্ত রেললাইন স্থাপন নিয়ে বরিশালবাসীর কাছে গুরুত্বপূর্ণ মতামত তুলে ধরতে পারেন। পাশাপাশি স্থানীয় নেতাকর্মীদের বিভাজন বা বিভক্তি ভুলে ঐক্যবদ্ধ হয়ে ধানের শীষের প্রার্থী বিজয়ী করার ক্ষেত্রে কর্মী-সমর্থকদের অঙ্গীকার বা শপথ করানোর সিদ্ধন্তে যাওয়ার সম্ভবনাও থাকছে।
বিএনপি চেয়ারপারসনের উপদেষ্টা ও বরিশাল সদর আসনের এমপি প্রার্থী মজিবর রহমান সরোয়ার বলেন, নেতা তারেক রহমান ২৫ ডিসেম্বর বাংলাদেশ নিয়ে তার মহাপরিকল্পনার কথা আছে বলে জানিয়েছেন। কিন্তু সেখানে কি কি পরিকল্পনা রয়েছে, তা খোলসা না করে তিনি কৌশল হিসেবে বলেছেন, ‘আই হ্যাভ এ প্ল্যান’। এই একটি শব্দ বিরোধী রাজনৈতিক শিবিরকে ঘোর টেনশনে ফেলে দিয়েছে এবং দেশের সাধারণ মানুষকে নতুন করে স্বপ্ন দেখিয়েছে। আসন্ন ত্রয়োদশ নির্বাচনে বিএনপি সরকার গঠন করলে ‘ ‘I Have a Plan’ এই ইংরেজি ছোট্ট শব্দের ব্যাপকতা হয়তো দেশবাসী দেখতে পাবেন মন্তব্য করেন বর্ষীয়ান রাজনৈতিক সরোয়ার।’
লেখক
হাসিবুল ইসলাম
সভাপতি, নিউজ এডিটরস্ কাউন্সিল, বরিশাল।
ইমেল: bslhasib@gmail.com, মোবাইল: +৮৮০১৭১১-৫৮৬৯৪০।
‘I Have a Plan, ১৭ বছরের প্রবাস জীবন শেষ করে গত ২৫ ডিসেম্বর বাংলাদেশে ফিরে রাজধানী ঢাকার ৩০০ ফিটে জনসমুদ্রে দাঁড়িয়ে এই একটি বাক্য ছুড়ে জনসাধারণের মাঝে তুমুল আলোচনায় এসেছিলেন তারেক রহমান। সাবেক রাষ্ট্রপতি শহীদ জিয়াউর রহমান এবং সাবেক প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়ার ছোট সন্তান বিএনপির চেয়ারম্যান তারেকের উচ্চরিত এই ইংরেজি শব্দ নিয়ে দেশের রাজনৈতিক অঙ্গনে চুলচেরা বিশ্লেষণ শুরু হয়। এবং দেশের মিডিয়ায় ইতিবাচক লেখালেখি করলেও কলকাতার একচোখা গণমাধ্যম ‘রিপাবলিক বাংলা’ প্রচার করে তারেক রহমান ভারতকে বিপদে ফেলার বড় কোনো প্ল্যান নিয়ে এসেছেন। ভূমিপুত্র তারেক রহমান নির্বাচনী সফরে বিভিন্ন স্থানে গিয়ে জনসমাবেশ আগামীদিনে দেশ নিয়ে বহুমুখী উন্নয়ন করাসহ পরিকল্পনার গ্রহণের কথা জানালেও ‘আই হ্যাভ এ প্ল্যান’ কি কি আছে তা এখনও খোলাসা করেননি। বুধবার দীর্ঘ ২০ বছর পরে কীর্তনখোলার তীর জনপদ বরিশালের মাটিতে পা রাখবেন জিয়াপুত্র তারেক রহমান, এদিন বান্দরোডস্থ ঐতিহাসিক বেলসপার্ক মাঠে স্থানীয় বিএনপি আয়োজিত নির্বাচনী সমাবেশে লাখো মানুষের উপস্থিতিতে তিনি ভাষণ দেবেন। এই সমাবেশে বিএনপির শীর্ষনেতৃত্ব তারেক রহমান তার প্ল্যান বরিশালবাসীর কাছে তুলে ধরবেন কী না তা নিয়েও আলোচনার শেষ নেই।
নির্বাচনপূর্ব বিএনপির শীর্ষ নেতৃত্ব তারেক রহমানের আগমনকে ঘিরে বরিশালের নেতাকর্মীদের মধ্যে আনন্দ-উচ্ছ্বাস লক্ষ্য করা গেছে। দুদিন যাবত বরিশাল শহরসহ উপজেলাগুলোতে ট্রাকে ঘুরে ঘুরে তারেক রহমানের নামসংবলিত গান বাজিয়ে তার আগমনের বার্তা দেওয়া হচ্ছে। পাশাপাশি ধানের শীষ প্রতীকে ভোটও প্রার্থনা করা হয়।
ধারনা করা হচ্ছে, বুধবার ‘বাংলার ভূমিপুত্র’ তারেক রহমান তার বক্তব্যে বরিশাল তথা গোটা দক্ষিণাঞ্চলের উন্নয়ন এবং সমস্যা-সম্ভবনা নিয়ে কথা বলতে পারেন। বরিশালবাসীর প্রত্যাশাও এমনটাই। তবে এর বাইরে তার কোনো নির্দিষ্ট প্ল্যান নিয়ে আলোচনায় সরব হবেন কী না তা স্থানীয় বিএনপির নেতাকর্মীরা নিশ্চিত বলতে পারছে না।
বিশ্বজুড়ে নাগরিক অধিকার আন্দোলনের অন্যান্য প্রতীক যুক্তরাষ্ট্রের মার্টিন লুথার কিং জুনিয়র বলেছিলেন, ‘I Have a Dream.’। ২৫ ডিসেম্বর বাংলাদেশের মাটিতে নেমে ঢাকার ৩০০ ফিটে আনুমানিক অর্ধকোটি মানুষের মধ্যে দাঁড়িয়ে নেতা তারেক রহমান কর্মীদের উদ্দেশ করে যুক্তরাষ্ট্রে অবিসংবাদিত নেতা লুথার কিংয়ের নাম উচ্চরণ করার পাশাপাশি বলেছিলেন, ‘I Have a Plan’
রাজনৈতিক বোদ্ধারা বলছেন, এই দুটি বাক্যের মধ্যকার পার্থক্য শুধু অর্থগত নয়, বরং বাক্য দুটিও ভিন্ন দুটি সময়ের বাস্তবতাকে তুলে ধরে। মার্টিন লুথার কিংয়ের ‘ড্রিম’ জন্ম নেয় শ্রেণিবৈষম্যের বিরুদ্ধে লড়াইয়ের প্রশ্নে আর ‘প্ল্যান’ জন্ম নেয় রাষ্ট্রভাঙনের ঝুঁকির মুহূর্তে।
নেতা তারেক রহমান লন্ডন থেকে ফিরে গত ২৫ ডিসেম্বর বাংলাদেশ বিএনপির ৩১ দফার স্বপক্ষে সভা-সমাবেশে বক্তব্য রাখলেও ‘আই হ্যাভ এ প্ল্যান’ এই বাক্যটির অন্তরালে কি লুকায়িত আছে তা নিয়ে রাজনৈতিব মহলে কৌতুহলের শেষ নেই। এবং তিনি দীর্ঘ এক মাস ধরে দেশের বিভিন্ন জেলা ও বিভাগীয় শহরে সমাবেশে ইতিবাচক ও জনস্বার্থমূলক বক্তব্য রেখে প্রতিনিয়ত মিডিয়ার শিরোনাম হচ্ছেন, মানুষও তার প্রতি আগ্রহ দেখাচ্ছেন।
স্বাধীনতার ঘোষক জিয়াউর রহমান এবং আপসহীন নারী নেত্রী খালেদা জিয়াপুত্র বুধবার বরিশাল বিএনপির নির্বাচনী সমাবেশে দক্ষিণাঞ্চলের উন্নয়ন পরিকল্পনা নিয়ে কথা বলতে পারেন। সেক্ষেত্রে তিনি প্ল্যান প্রকাশ অপেক্ষা বেশি মাত্রায় গুরুত্ব দিয়ে এই অঞ্চলের মানুষের প্রাপ্তি এবং প্রত্যাশার হিসেব জানতে চাইতেও পারেন বলে কেউ কেউ মনে করছেন।
এই আলোচনায় অগ্রাধিকার পেতে বরিশাল-ঢাকা মহাসড়ক ৪ বা ৬ লেনে উন্নীত করা এবং বাইপাসসহ ভাঙা-বরিশাল হয়ে কুয়াকাটা পর্যন্ত রেললাইন স্থাপনের বিষয়টি। বর্তমান সময়ে বরিশাল-ঢাকা সরু মহাসড়কটিতে যে প্রতিনিয়ত প্রাণহানি ঘটছে তা সম্পর্কে নেতা তারেক রহমানও অবগত আছেন। এবং বরিশাল বিএনপির নেতারা এই বিষয়টি তাকে অনেক আগেই অবগত করেছেন বলে জানা গেছে।
মঙ্গলবার বিকেলের আগেই বেলসপার্ক মাঠে মঞ্চ তৈরির কাজ শেষ হয়। এর আগে দুপুরে নেতাকর্মীদের আনাগোনায় মাঠটি লোকে লোকারণ্য হয়ে যায়। সেই সময় স্থানীয় বিএনপির শীর্ষ নেতারা সমাবেশস্থল পরিদর্শন করেন।
কেন্দ্রীয় বিএনপির সাংগঠনিক সম্পাদক (বরিশাল বিভাগ) অ্যাডভোকেট বিলকিস জাহান শিরিন সমাবেশস্থল পরিদর্শনে গিয়ে জানান, তাদের সার্বিক প্রস্তুতি সম্পন্ন হয়েছে। এখন নেতা তারেক রহমানকে বরণ করার অপেক্ষা। তবে এই নারী নেত্রীও তার নেতা তারেক রহমান দক্ষিণাঞ্চল নিয়ে কি প্ল্যান করে রেখেছেন তা সম্পর্কে আগাম কিছু বলতে চাইছেন না বা বলতে পারছেন না। তারেক রহমানের এই সমাবেশে কয়েক লাখ সাধারণ মানুষের উপস্থিতি ঘটবে এবং বরিশাল শহরটি লোকে লোকারণ্য হয়ে যাবে মন্তব্য করেন শিরিন।
অনুরূপ মন্তব্য করেন বরিশাল মহানগর বিএনপির সদস্যসচিব জিয়া উদ্দিন সিকদার এবং একই কমিটির যুগ্ম আহ্বায়ক আফরোজা খানম নাসরিনসহ শীর্ষস্থানীয় নেতারা। মঙ্গলবার গভীর রাতে মহানগর বিএনপির এই দুই নেতা জানান, সন্ধ্যার পর থেকেই দক্ষিণাঞ্চলের বিভিন্ন জেলা এবং উপজেলা থেকে কর্মী-সমর্থকেরা মাঠে অবস্থান নেন। অবশ্য এর দুদিন আগে অর্থাৎ সোমবার থেকে বরিশালের অধিকাংশ হোটেলগুলোতে অবস্থান নেন জেলা-উপজেলার শীর্ষ নেতারা।
সবকিছু মিলিয়ে বলা যায়, দুই দশক পরে বরিশালে তারেক রহমানের আগমনে বিএনপির নেতাকর্মী-সমর্থকদের মধ্যে এক ধরনের উৎসবের আবহ বিরাজ করছে। এবং বরিশাল তথা দক্ষিণাঞ্চল নিয়ে তাদের নেতা কি প্ল্যান রেখেছেন তা শোনার অধির আগ্রহ নিয়ে অপেক্ষায় আছেন। কিন্তু বাংলার ভূমিপুত্র তারেক রহমান পূর্বে ঘোষিত ৩১ দফার বাইরে দেশ নিয়ে নতুন কি প্ল্যান এই বিষয়টি আদৌ বরিশালের সমাবেশে পরিস্কার করবেন কী না তা নিশ্চিত বলা সম্ভব হচ্ছে না।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকেরা বলছেন, বরিশাল তথা গোটা দক্ষিণাঞ্চলের সমস্যা এবং সম্ভবনাগুলো সম্পর্কে তারেক রহমান যেহেতু অবগত আছেন, বিশেষ করে বরিশাল-ঢাকা মহাসড়ক ৪ বা ৬ লেনে উন্নীত করার বিষয়টি নিয়ে তিনি নিজেও ভাবছেন। সেক্ষেত্রে জিয়াপুত্র তারেক মহাসড়ক বহু লেনে উন্নীত করাসহ ভাঙা টু কুয়াকাটা পর্যন্ত রেললাইন স্থাপন নিয়ে বরিশালবাসীর কাছে গুরুত্বপূর্ণ মতামত তুলে ধরতে পারেন। পাশাপাশি স্থানীয় নেতাকর্মীদের বিভাজন বা বিভক্তি ভুলে ঐক্যবদ্ধ হয়ে ধানের শীষের প্রার্থী বিজয়ী করার ক্ষেত্রে কর্মী-সমর্থকদের অঙ্গীকার বা শপথ করানোর সিদ্ধন্তে যাওয়ার সম্ভবনাও থাকছে।
বিএনপি চেয়ারপারসনের উপদেষ্টা ও বরিশাল সদর আসনের এমপি প্রার্থী মজিবর রহমান সরোয়ার বলেন, নেতা তারেক রহমান ২৫ ডিসেম্বর বাংলাদেশ নিয়ে তার মহাপরিকল্পনার কথা আছে বলে জানিয়েছেন। কিন্তু সেখানে কি কি পরিকল্পনা রয়েছে, তা খোলসা না করে তিনি কৌশল হিসেবে বলেছেন, ‘আই হ্যাভ এ প্ল্যান’। এই একটি শব্দ বিরোধী রাজনৈতিক শিবিরকে ঘোর টেনশনে ফেলে দিয়েছে এবং দেশের সাধারণ মানুষকে নতুন করে স্বপ্ন দেখিয়েছে। আসন্ন ত্রয়োদশ নির্বাচনে বিএনপি সরকার গঠন করলে ‘ ‘I Have a Plan’ এই ইংরেজি ছোট্ট শব্দের ব্যাপকতা হয়তো দেশবাসী দেখতে পাবেন মন্তব্য করেন বর্ষীয়ান রাজনৈতিক সরোয়ার।’
লেখক
হাসিবুল ইসলাম
সভাপতি, নিউজ এডিটরস্ কাউন্সিল, বরিশাল।
ইমেল: bslhasib@gmail.com, মোবাইল: +৮৮০১৭১১-৫৮৬৯৪০।

২৫ জানুয়ারি, ২০২৬ ১৭:২০
কপোতাক্ষের স্নিগ্ধ জলরাশি সেদিন হয়তো জানত না যে, তার কোল ঘেঁষেই জন্ম নিচ্ছে এক মহাকাব্যিক বিদ্রোহ। সাগরদাঁড়ির সেই শান্ত প্রহরটি ছিল মূলত দুই শতাব্দীর এক নিবিড় সন্ধিস্থল—যেখানে জীর্ণ মধ্যযুগ শেষ নিশ্বাস ত্যাগ করছে আর আধুনিকতার অস্থির সূর্যোদয় ঘটছে দিগন্তে। ১৮২৪ সালের ২৫ জানুয়ারি যখন মাইকেল মধুসূদন দত্তের প্রাদুর্ভাব ঘটে, তখন তা কেবল এক কবির জন্ম ছিল না; বরং তা ছিল শেকড় ও শিখরের দ্বন্দ্বে এক মহাকাব্যিক পথিকের অবিনাশী আখ্যানের সূচনা। তাঁর এই আবির্ভাব প্রাচ্য ও পাশ্চাত্যের সেই ঐতিহাসিক সংঘর্ষের নাম, যার স্ফুলিঙ্গ পরবর্তীকালে বাংলা সাহিত্যের চিরচেনা মানচিত্রকে চিরতরে বদলে দিয়েছিল। হিন্দু কলেজের করিডোরে ডিরোজিয়ান মুক্তবুদ্ধির যে হাওয়া তাঁর কিশোর মনে লেগেছিল, তা তাঁকে শিখিয়েছিল দেবতাকে নয়, মানুষকে পূজা করতে; আর অনুকরণকে নয়, বরং মৌলিক সৃষ্টিকে আলিঙ্গন করতে। ১৮৪৩ সালে খ্রিষ্টধর্ম গ্রহণ করা ছিল মূলত ঔপনিবেশিক ভারতের এক প্রদীপ্ত তরুণের সামাজিক শৃঙ্খল ও সামন্ততান্ত্রিক জড়ত্ব ভাঙার এক চরমপন্থী প্রকাশ। মাইকেল যখন নাম পরিবর্তন করে নিজের সত্তাকে এক ‘বৈশ্বিক নাগরিক’ পরিচয়ের সাথে যুক্ত করতে চেয়েছিলেন, তখন তিনি হয়তো জানতেন না যে, বিশ্বনাগরিক হওয়ার প্রথম শর্তই হলো নিজের শিকড়ের গভীরতাকে উপলব্ধি করা।
মধুসূদনের এই বিশ্বনাগরিক হয়ে ওঠার নেপথ্যে ছিল তাঁর অসামান্য ভাষাগত পাণ্ডিত্য। হিব্রু, গ্রিক, ল্যাটিন থেকে শুরু করে আধুনিক ইউরোপীয় প্রায় এক ডজন ভাষায় ব্যুৎপত্তি তাঁকে বিশ্বের ধ্রুপদী সাহিত্যের মূল নির্যাস আস্বাদনের সুযোগ দিয়েছিল। এই ভাষাগত বহুত্ববাদই (Multilingualism) তাঁকে সাহস জুগিয়েছিল বাংলা ভাষার আটপৌরে কাঠামোর ওপর হোমার-ভার্জিল-দান্তের ধ্রুপদী গাম্ভীর্য আরোপ করতে। তিনি কেবল অমিত্রাক্ষর ছন্দেই সীমাবদ্ধ থাকেননি, বরং পেত্রার্কীয় ঢঙে বাংলায় প্রথম 'সনেট' বা চতুর্দশপদী কবিতার প্রবর্তন করে নিজের ভুল ও আত্মোপলব্ধির এক অনন্য দর্পণ তৈরি করেছিলেন। মাদ্রাজের দারিদ্র্যপীষ্ট জীবন থেকে ফ্রান্সের ভার্সাইয়ের নির্বাসিত দিনগুলো তাঁকে সেই ধ্রুব সত্যের মুখোমুখি দাঁড় করিয়েছিল যে—বিশ্বকে জানতে হলে ভাষার বৈচিত্র্য প্রয়োজন, কিন্তু নিজেকে চিনতে হলে প্রয়োজন নিজের মাতৃভাষা।
কবির ব্যক্তিগত জীবনের ট্র্যাজেডি ছিল তাঁর মহাকাব্যিক সৃজনের এক অবিচ্ছেদ্য সমান্তরাল আখ্যান। রেবেকা ম্যাকট্যাভিস ও এমিলিয়া হেনরিয়েটার ত্যাগ ও সান্নিধ্য তাঁর সৃষ্টির অন্তরালে এক ধ্রুপদী করুণ রস সঞ্চার করেছে। তবে মধুসূদনের জীবনে এই নারীদের ভূমিকা কেবল ব্যক্তিগত আবেগ নয়, বরং তাঁর 'বীরাঙ্গনা' কাব্যের আধুনিক ও প্রতিবাদী নারী চরিত্রগুলোর অবচেতন প্রেরণা হিসেবে কাজ করেছে। ১৮৭৩ সালে হেনরিয়েটার মৃত্যুর মাত্র তিন দিন পর কবির প্রয়াণ ঘটে—ইতিহাসের এই নির্মম পরিসমাপ্তি যেন তাঁর নিজের রচিত কোনো মহাকাব্যিক ট্র্যাজেডিরই এক জীবন্ত রূপায়ন।
বিশ্বসাহিত্যের নিরিখে মধুসূদনের শ্রেষ্ঠত্ব নিহিত তাঁর প্রথাগত চিন্তাকে ভেঙে নতুন করে গড়ার বা 'বিনির্মাণবাদী' (Deconstructive) দৃষ্টিভঙ্গিতে। ১৮৬১ সালে প্রকাশিত ‘মেঘনাদবধ কাব্য’ কেবল একটি মহাকাব্য নয়, এটি ছিল আর্য-অনার্য দ্বন্দ্বে প্রাচ্যের তথাকথিত 'অসুর' বা রাবণকে এক আধুনিক বীর হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করার প্রথম বৌদ্ধিক লড়াই। মূলত মধুসূদনের বিদ্রোহ কেবল ছন্দের ছিল না; এটি ছিল দেবকেন্দ্রিক সাহিত্য থেকে মানুষের জয়গানে উত্তরণের প্রথম মহাকাব্যিক বিপ্লব। মিল্টন তাঁর ‘প্যারাডাইস লস্ট’-এ স্যাটানকে বিদ্রোহী করলেও শেষ পর্যন্ত ঐশ্বরিক শক্তির শ্রেষ্ঠত্বই বিজয়ী করেছেন; এমনকি হোমার বা দান্তের মহাকাব্যেও দৈব বিধানই ছিল চূড়ান্ত। কিন্তু মধুসূদন সচেতনভাবে প্রথাগত দেবতাকে হীনবল করে রাবণের দেশপ্রেম ও মানবিক সত্তাকে মহিমান্বিত করেছেন—যা পাশ্চাত্যের একপেশে দৃষ্টিভঙ্গি বা 'ওরিয়েন্টালিজম'-এর বিপরীতে এক শক্তিশালী প্রতিবাদ। তিনি প্রহসন থেকে নাটক এবং মহাকাব্য থেকে সনেট—সবখানেই মধ্যযুগীয় স্থবিরতা ভেঙে প্রবর্তন করেছিলেন এক 'সেক্যুলার হিউম্যানিজম' বা ইহজাগতিক মানবতাবাদ, যেখানে ঈশ্বর নয়, মানুষই হয়ে উঠেছে সকল শিল্পের কেন্দ্রবিন্দু।
বর্তমান বিশ্বায়নের যুগে মধুসূদনের প্রাসঙ্গিকতা আজও অম্লান তাঁর 'ডায়াসপোরা চেতনা' বা ঘর ও বাহিরের অন্তহীন দ্বন্দ্বে—যা আজ বিশ্বজুড়ে ছড়িয়ে থাকা কোটি কোটি অভিবাসী মানুষের আত্মপরিচয়ের সংকটকে ধারণ করে। তিনি আমাদের শিখিয়েছেন কীভাবে পাশ্চাত্য শিক্ষাকে পরম মমতায় আত্মস্থ করে মনস্তাত্ত্বিক 'ডিকলোনাইজেশন' বা পরাধীন মানসিকতা থেকে মুক্ত হয়ে নিজের 'কপোতাক্ষ' বা শিকড়ের কাছে ফিরে আসতে হয়। ১৮৭৩ সালের ২৯ জুন নিঃস্ব অবস্থায় আলিপুর হাসপাতালে শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করা এই মহাকবি আজও আমাদের মনে করিয়ে দেন যে, সৃজনশীল বিদ্রোহ ছাড়া কোনো জাতির আধুনিকতা পূর্ণতা পায় না।
পাশ্চাত্যের দর্পণ ছুঁয়ে প্রাচ্যের শিকড়ে ফেরার এক মহাকাব্যিক পথিকের নাম মাইকেল মধুসূদন দত্ত। তাঁর কলম কেবল অমিত্রাক্ষরের ছন্দ বুণেনি, বরং ঔপনিবেশিক আধুনিকতার ভেতর দাঁড়িয়ে বদলে দিয়েছিল একটি পরাধীন জাতির সাহিত্যিক রুচি ও আত্মপরিচয় খোঁজার গভীর দর্শন। বিশ্বসাহিত্যের মানচিত্রে তিনি কেবল এক ধূমকেতু নন, বরং আধুনিক বাংলা সাহিত্যের সেই ধ্রুবতারা, যা আজও আমাদের শেকড় ও শিখরের দ্বন্দ্বে পথ দেখায়। তিনি চেয়েছিলেন 'পাশ্চাত্যের মিল্টন' হতে, অথচ নিয়তির কী নির্মম পরিহাস—আজ তিনি আমাদের কাছে অমর হয়ে আছেন ‘বাংলার মধুসূদন’ হিসেবেই।
বাহাউদ্দিন গোলাপ
(ডেপুটি রেজিস্ট্রার, বরিশাল বিশ্ববিদ্যালয়, b_golap@yahoo.com।
কপোতাক্ষের স্নিগ্ধ জলরাশি সেদিন হয়তো জানত না যে, তার কোল ঘেঁষেই জন্ম নিচ্ছে এক মহাকাব্যিক বিদ্রোহ। সাগরদাঁড়ির সেই শান্ত প্রহরটি ছিল মূলত দুই শতাব্দীর এক নিবিড় সন্ধিস্থল—যেখানে জীর্ণ মধ্যযুগ শেষ নিশ্বাস ত্যাগ করছে আর আধুনিকতার অস্থির সূর্যোদয় ঘটছে দিগন্তে। ১৮২৪ সালের ২৫ জানুয়ারি যখন মাইকেল মধুসূদন দত্তের প্রাদুর্ভাব ঘটে, তখন তা কেবল এক কবির জন্ম ছিল না; বরং তা ছিল শেকড় ও শিখরের দ্বন্দ্বে এক মহাকাব্যিক পথিকের অবিনাশী আখ্যানের সূচনা। তাঁর এই আবির্ভাব প্রাচ্য ও পাশ্চাত্যের সেই ঐতিহাসিক সংঘর্ষের নাম, যার স্ফুলিঙ্গ পরবর্তীকালে বাংলা সাহিত্যের চিরচেনা মানচিত্রকে চিরতরে বদলে দিয়েছিল। হিন্দু কলেজের করিডোরে ডিরোজিয়ান মুক্তবুদ্ধির যে হাওয়া তাঁর কিশোর মনে লেগেছিল, তা তাঁকে শিখিয়েছিল দেবতাকে নয়, মানুষকে পূজা করতে; আর অনুকরণকে নয়, বরং মৌলিক সৃষ্টিকে আলিঙ্গন করতে। ১৮৪৩ সালে খ্রিষ্টধর্ম গ্রহণ করা ছিল মূলত ঔপনিবেশিক ভারতের এক প্রদীপ্ত তরুণের সামাজিক শৃঙ্খল ও সামন্ততান্ত্রিক জড়ত্ব ভাঙার এক চরমপন্থী প্রকাশ। মাইকেল যখন নাম পরিবর্তন করে নিজের সত্তাকে এক ‘বৈশ্বিক নাগরিক’ পরিচয়ের সাথে যুক্ত করতে চেয়েছিলেন, তখন তিনি হয়তো জানতেন না যে, বিশ্বনাগরিক হওয়ার প্রথম শর্তই হলো নিজের শিকড়ের গভীরতাকে উপলব্ধি করা।
মধুসূদনের এই বিশ্বনাগরিক হয়ে ওঠার নেপথ্যে ছিল তাঁর অসামান্য ভাষাগত পাণ্ডিত্য। হিব্রু, গ্রিক, ল্যাটিন থেকে শুরু করে আধুনিক ইউরোপীয় প্রায় এক ডজন ভাষায় ব্যুৎপত্তি তাঁকে বিশ্বের ধ্রুপদী সাহিত্যের মূল নির্যাস আস্বাদনের সুযোগ দিয়েছিল। এই ভাষাগত বহুত্ববাদই (Multilingualism) তাঁকে সাহস জুগিয়েছিল বাংলা ভাষার আটপৌরে কাঠামোর ওপর হোমার-ভার্জিল-দান্তের ধ্রুপদী গাম্ভীর্য আরোপ করতে। তিনি কেবল অমিত্রাক্ষর ছন্দেই সীমাবদ্ধ থাকেননি, বরং পেত্রার্কীয় ঢঙে বাংলায় প্রথম 'সনেট' বা চতুর্দশপদী কবিতার প্রবর্তন করে নিজের ভুল ও আত্মোপলব্ধির এক অনন্য দর্পণ তৈরি করেছিলেন। মাদ্রাজের দারিদ্র্যপীষ্ট জীবন থেকে ফ্রান্সের ভার্সাইয়ের নির্বাসিত দিনগুলো তাঁকে সেই ধ্রুব সত্যের মুখোমুখি দাঁড় করিয়েছিল যে—বিশ্বকে জানতে হলে ভাষার বৈচিত্র্য প্রয়োজন, কিন্তু নিজেকে চিনতে হলে প্রয়োজন নিজের মাতৃভাষা।
কবির ব্যক্তিগত জীবনের ট্র্যাজেডি ছিল তাঁর মহাকাব্যিক সৃজনের এক অবিচ্ছেদ্য সমান্তরাল আখ্যান। রেবেকা ম্যাকট্যাভিস ও এমিলিয়া হেনরিয়েটার ত্যাগ ও সান্নিধ্য তাঁর সৃষ্টির অন্তরালে এক ধ্রুপদী করুণ রস সঞ্চার করেছে। তবে মধুসূদনের জীবনে এই নারীদের ভূমিকা কেবল ব্যক্তিগত আবেগ নয়, বরং তাঁর 'বীরাঙ্গনা' কাব্যের আধুনিক ও প্রতিবাদী নারী চরিত্রগুলোর অবচেতন প্রেরণা হিসেবে কাজ করেছে। ১৮৭৩ সালে হেনরিয়েটার মৃত্যুর মাত্র তিন দিন পর কবির প্রয়াণ ঘটে—ইতিহাসের এই নির্মম পরিসমাপ্তি যেন তাঁর নিজের রচিত কোনো মহাকাব্যিক ট্র্যাজেডিরই এক জীবন্ত রূপায়ন।
বিশ্বসাহিত্যের নিরিখে মধুসূদনের শ্রেষ্ঠত্ব নিহিত তাঁর প্রথাগত চিন্তাকে ভেঙে নতুন করে গড়ার বা 'বিনির্মাণবাদী' (Deconstructive) দৃষ্টিভঙ্গিতে। ১৮৬১ সালে প্রকাশিত ‘মেঘনাদবধ কাব্য’ কেবল একটি মহাকাব্য নয়, এটি ছিল আর্য-অনার্য দ্বন্দ্বে প্রাচ্যের তথাকথিত 'অসুর' বা রাবণকে এক আধুনিক বীর হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করার প্রথম বৌদ্ধিক লড়াই। মূলত মধুসূদনের বিদ্রোহ কেবল ছন্দের ছিল না; এটি ছিল দেবকেন্দ্রিক সাহিত্য থেকে মানুষের জয়গানে উত্তরণের প্রথম মহাকাব্যিক বিপ্লব। মিল্টন তাঁর ‘প্যারাডাইস লস্ট’-এ স্যাটানকে বিদ্রোহী করলেও শেষ পর্যন্ত ঐশ্বরিক শক্তির শ্রেষ্ঠত্বই বিজয়ী করেছেন; এমনকি হোমার বা দান্তের মহাকাব্যেও দৈব বিধানই ছিল চূড়ান্ত। কিন্তু মধুসূদন সচেতনভাবে প্রথাগত দেবতাকে হীনবল করে রাবণের দেশপ্রেম ও মানবিক সত্তাকে মহিমান্বিত করেছেন—যা পাশ্চাত্যের একপেশে দৃষ্টিভঙ্গি বা 'ওরিয়েন্টালিজম'-এর বিপরীতে এক শক্তিশালী প্রতিবাদ। তিনি প্রহসন থেকে নাটক এবং মহাকাব্য থেকে সনেট—সবখানেই মধ্যযুগীয় স্থবিরতা ভেঙে প্রবর্তন করেছিলেন এক 'সেক্যুলার হিউম্যানিজম' বা ইহজাগতিক মানবতাবাদ, যেখানে ঈশ্বর নয়, মানুষই হয়ে উঠেছে সকল শিল্পের কেন্দ্রবিন্দু।
বর্তমান বিশ্বায়নের যুগে মধুসূদনের প্রাসঙ্গিকতা আজও অম্লান তাঁর 'ডায়াসপোরা চেতনা' বা ঘর ও বাহিরের অন্তহীন দ্বন্দ্বে—যা আজ বিশ্বজুড়ে ছড়িয়ে থাকা কোটি কোটি অভিবাসী মানুষের আত্মপরিচয়ের সংকটকে ধারণ করে। তিনি আমাদের শিখিয়েছেন কীভাবে পাশ্চাত্য শিক্ষাকে পরম মমতায় আত্মস্থ করে মনস্তাত্ত্বিক 'ডিকলোনাইজেশন' বা পরাধীন মানসিকতা থেকে মুক্ত হয়ে নিজের 'কপোতাক্ষ' বা শিকড়ের কাছে ফিরে আসতে হয়। ১৮৭৩ সালের ২৯ জুন নিঃস্ব অবস্থায় আলিপুর হাসপাতালে শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করা এই মহাকবি আজও আমাদের মনে করিয়ে দেন যে, সৃজনশীল বিদ্রোহ ছাড়া কোনো জাতির আধুনিকতা পূর্ণতা পায় না।
পাশ্চাত্যের দর্পণ ছুঁয়ে প্রাচ্যের শিকড়ে ফেরার এক মহাকাব্যিক পথিকের নাম মাইকেল মধুসূদন দত্ত। তাঁর কলম কেবল অমিত্রাক্ষরের ছন্দ বুণেনি, বরং ঔপনিবেশিক আধুনিকতার ভেতর দাঁড়িয়ে বদলে দিয়েছিল একটি পরাধীন জাতির সাহিত্যিক রুচি ও আত্মপরিচয় খোঁজার গভীর দর্শন। বিশ্বসাহিত্যের মানচিত্রে তিনি কেবল এক ধূমকেতু নন, বরং আধুনিক বাংলা সাহিত্যের সেই ধ্রুবতারা, যা আজও আমাদের শেকড় ও শিখরের দ্বন্দ্বে পথ দেখায়। তিনি চেয়েছিলেন 'পাশ্চাত্যের মিল্টন' হতে, অথচ নিয়তির কী নির্মম পরিহাস—আজ তিনি আমাদের কাছে অমর হয়ে আছেন ‘বাংলার মধুসূদন’ হিসেবেই।
বাহাউদ্দিন গোলাপ
(ডেপুটি রেজিস্ট্রার, বরিশাল বিশ্ববিদ্যালয়, b_golap@yahoo.com।

Google AdSense
This is a demo ad. Your live ads will be displayed here once AdSense is properly configured.
Google AdSense
This is a demo ad. Your live ads will be displayed here once AdSense is properly configured.