নদীটির নাম খাপড়াভাঙ্গা। শিববাড়িয়া নদী নামে বেশ পরিচিত। কলকল স্রোতে বয়ে যাওয়া নদীটির দু’প্রান্ত সাগরের সাথে মিলিত হবার কারণে ‘খাপড়াভাঙ্গা দোন’ বলা হয়। নদীটির পশ্চিম প্রান্তে আন্ধারমানিক মোহনা, আর পূর্ব প্রান্ত মিলিত হয়েছে রামনাবাদ মোহনায়।
দূর্যোগপূর্ণ আবহাওয়ার সময় সমুদ্রে মাছ ধরা ট্রলারগুলো দ্রুত নিরাপদ আশ্রয় নিতে পারে বিধায় ‘প্রোতাশ্রয় নদী’ নামে খ্যাতি অর্জন করেছে। এই নদীর দু’পাড়ে গড়ে উঠেছে আশাখালী মৎস্যপল্লী, চাপলী বাজার, লক্ষ্মীরহাট এবং আলীপুর-মহিপুর মৎস্য বন্দর। এসব বন্দরের মৎস্য ব্যবসায়ীদের ব্যবহৃত পলিথিন ও প্লাস্টিক ফেলা হচ্ছে নদীতে।
নদীর পেটের এসব প্লাস্টিক ও পলিথিন ভাটার স্রোতে ভেঁসে যাচ্ছে বঙ্গোপসাগরে। ধীরে ধীরে ছোট ছোট মাইক্রোপ্লাস্টিকে রূপান্তরিত হয়ে খাদ্য ও পানির মাধ্যমে জলজপ্রাণী গ্রহণ করে। এতে ধ্বংস হচ্ছে সামুদ্রিক জীববৈচিত্র্য, কমছে মাছের উৎপাদন। শেষমেশ ক্ষতিগ্রস্থ হচ্ছেন মৎস্য ব্যবসায়ীরাই। আর পরিবেশ নষ্টের অন্যতম কারণ এসব প্লাস্টিক ও পলিথিনের ব্যবহার বন্ধ করতে পরিবেশ অধিদপ্তর এবং মৎস্য বিভাগকে যৌথ উদ্যোগ গ্রহণ করার পরামর্শ বিশেষজ্ঞদের।
পটুয়াখালী জেলার কলাপাড়া উপজেলার মহিপুর থানায় অবস্থিত খাপড়াভাঙ্গা নদীটি। এটি আকারে ছোট্ট হলেও এই উপকূলীয় অঞ্চলের অর্থনীতির চাকা সচল রাখতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে দীর্ঘ বছর ধরে। কিন্তু ব্যবসায়ীদের অসচেতনতার কারণে দখল দূষণে অস্তিত্ব সংকটে ভুগছে নদীটি। প্রতিনিয়ত নির্বিচারে মৎস্য বন্দরে ব্যবহৃত পলিথিন ও প্লাস্টিক সামগ্রী ফেলা হচ্ছে নদীর পাড়ে। পলিথিনের বিকল্প না পেয়ে ব্যবসায়ীরা ব্যবহার করতে বাধ্য হচ্ছেন।
আর মৎস্য বন্দরের বর্জ্য ফেলার নির্দিষ্ট জায়গা না থাকার অজুহাতে ফেলছে নদীতে। অথচ আলীপুর, মহিপুর মৎস্য বন্দর থেকে সরকার প্রতি বছর কোটি কোটি টাকা রাজস্ব আয় করছেন। ব্যবসায়ীদের জন্য শুধুমাত্র দু’পাড়ে দুইটি মৎস্য অবতরণ কেন্দ্র নির্মাণ করেছে সরকার। আলীপুরের অবতরণ কেন্দ্রটি ব্যবসায়ীরা ব্যবহার করলেও মহিপুরেরটি ব্যবহার করছেন না। ব্যবসায়ীদের তরফ থেকে বার বার বর্জ্য ফেলার নির্দিষ্ট জায়গা চাওয়া হচ্ছে। কিন্তু আশ্বাস দিয়ে সময় ক্ষেপন করেছেন মৎস্য অধিদপ্তর।
এ প্রসঙ্গে আলীপুরের মৎস্য ব্যবসায়ী মো. মিজানুর রহমান বলেন, ‘আমরা পলিথিন ফেলার জন্য বিএফডিসি কর্তৃপক্ষের কাছে অনেকবার জায়গা চেয়েছি। তারা কোন জায়গা নির্ধারণ করে দেয়নি। তাই বিভিন্ন সময় জেলেরা যে পলিথিনগুলো ফেলে দেয় তা নদীর পানির সাথে মিশে যায়।’
পরিবেশ দূষণ রোধ, মাটির উর্বরতা রক্ষা, পানিতে আর্সেনিকের পরিমাণ কমানো, ডেঙ্গু ও অন্যান্য রোগ সৃষ্টিকারী মশা নির্মূল করা এবং মানুষের স্বাস্থ্য সুরক্ষার জন্য বিশ্বের প্রথম দেশ হিসেবে ২০০২ সালের ১লা মার্চ পরিবেশ সংরক্ষণ আইন (সংশোধনী) এর মাধ্যমে পলিথিনের উৎপাদন, বিপণন ও ব্যবহার নিষিদ্ধ করা হয়েছে।
পাশাপাশি পলিথিনের বিকল্প হিসেবে পাট ও কাপড়ের ব্যাগ ব্যবহারের জন্য উৎসাহিত করা হচ্ছে। কিন্তু আইনটি কার্যকরভাবে প্রয়োগ না করায় পলিথিন ব্যবহার বন্ধ হয়নি। তাছাড়া মাছ সংরক্ষণ ও রপ্তানির জন্য পলিথিনের বিকল্প কিছুই পাচ্ছে না মৎস্য ব্যবসায়ীরা। মাছে বরফ দেয়ার জন্য পাট বা কাপড়ের ব্যাগ ব্যবহার করা যাচ্ছে না। মৎস্য ব্যবসায়ীরা বলছেন একই দামে পলিথিনের বিকল্প পেলে তারা ব্যবহার করবেন।
এ বিষয়ে মৎস্য ব্যবসায়ী এম.আনিসুর রহমান মামুন বলেন, ‘আমাদের আহরিত মাছগুলো পলিতে প্যাকেট করলে ভালো থাকে। এর বিকল্প যে ব্যাগ আছে তা মাছ প্যাকেট করার উপযোগী না। মাছ সংরক্ষণের জন্য পলিথিনের বিকল্প কিছু আসলে আমরা অবশ্যই ব্যবহার করবো।’
পলিথিন অপচনশীল হওয়ায় ১০০-৪৫০ বছর পর্যন্ত পরিবেশে অবশিষ্ট থাকে। যার ফলে নদী ও সমুদ্রের পানিতে মিশে জলজপ্রাণীর জীবনহানি ঘটায়। সামুদ্রিক বাস্তুতন্ত্রের ভারসাম্য নষ্ট করে। সামুদ্রিক পরিবেশ দূষিত করে। অনেক সামুদ্রিক কচ্ছপ, মাছ এবং পাখি ভুলবশত পলিথিন খেয়ে ফেলে, যা তাদের খাদ্যনালীতে আটকে গিয়ে হজমে বাধা সৃষ্টি করে এবং মৃত্যু হয়।
গবেষণার তথ্যানুযায়ী, প্রতিদিন সমুদ্রে ৭৩ হাজার টন প্লাস্টিক বর্জ্য পড়ছে। এতে ৩০০ ধরণের প্লাস্টিক পণ্য রয়েছে। এর মধ্যে কোমল পানীয়র বোতল থেকে শুরু করে কসমেটিকসের মোড়ক রয়েছে। প্লাস্টিক বোতলের একটি বড় অংশ যাচ্ছে উপকূলের মাছ ধরা ট্রলারে।
পরিবেশ ও জলবায়ু বিষয়ক নাগরিক সংগঠন ‘ধরিত্রী রক্ষায় আমরা (ধরা)’ কলাপাড়া উপজেলা সমন্বয়কারী ও সিনিয়র সাংবাদিক মেজবাহউদ্দিন মাননু বলেন, ‘উপকূলের মৎস্যবন্দর ব্যবসায়ী ও জেলেদের সচেতন করতে হবে। শুধুমাত্র বিশ্ব পরিবেশ দিবসে একটি র্যালী ও আলোচনা সভার মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকলে হবে না। উপজেলা পরিবেশ সংরক্ষণ কমিটিকে কার্যকরী উদ্যোগ নিয়ে দায়িত্বশীল ভূমিকা পালন রাখতে হবে।’
বিশেষজ্ঞদের মতে, প্লাস্টিক ও পলিথিনের ব্যবহার নিষিদ্ধকরণ এবং বিকল্প হিসেবে পরিবেশবান্ধব পণ্যের ব্যবহার বৃদ্ধি করতে হবে। বর্জ্য ব্যবস্থাপনা ব্যবস্থার উন্নয়ন এবং প্লাস্টিক বর্জ্য সংগ্রহ, প্রক্রিয়াকরণ ও পুনব্যবহারের কার্যকর উদ্যোগ নিতে হবে। প্লাস্টিক দূষণ রোধে সরকার, উৎপাদক, ব্যবহারকারী এবং পরিবেশবাদীদের সম্মিলিতভাবে সচেতনতা বৃদ্ধি করতে হবে।
বাংলাদেশ মেরিটাইম বিশ্ববিদ্যালয়ের সেফাস প্রজেক্টের সহযোগী গবেষক সাগরিকা স্মৃতি বলেন, ‘পলিথিন ও প্লাস্টিক বর্জ্যরে কারণে নদী ও সমুদ্র দূষণ ক্রমান্বয়ে বাড়ছে। এক্ষেত্রে পরিবেশ অধিদপ্তর ও মৎস্য অধিদপ্তরকে সম্মিলিতভাবে কার্যকরী উদ্যোগ গ্রহণ করতে হবে। এক দপ্তর অন্য দপ্তরের উপর দায় চাপিয়ে নিশ্চুপ থাকলে আমাদের সামুদ্রিক পরিবেশ ও প্রতিবেশ দিন দিন নষ্ট হবে। আমাদের সামুদ্রিক জীববৈচিত্র্য রক্ষায় মৎস্যজীবীদের আরো বেশি সচেতন করতে হবে।’
এ প্রসঙ্গে পটুয়াখালী জেলা মৎস্য কর্মকর্তা মো. কামরুল ইসলাম বলেন, ‘মহিপুর-আলীপুর ব্যবসায়ীদের ব্যবহৃত পলিথিন ও প্লাস্টিক সামগ্রী খাপড়াভাঙ্গা নদীতে ফেলছে। এতে আমাদের পরিবেশ ও জলজ পরিবেশ প্রতিবেশের জন্য মারাত্মক হুমকির সৃষ্টি হতে পারে। এ বিষয়টি নিয়ে বহুবার বন্দরের ব্যবসায়ীদের সচেতন করা হয়েছে। মৎস্য অধিদপ্তর জলজপ্রাণী রক্ষা ও নদী দূষণ রোধে যথেষ্ট সচেতন রয়েছে। দ্রুত বন্দর ব্যবসায়ীদের নিয়ে একটি মতবিনিময় সভা করে তাদের ব্যবহৃত পলিথিন নির্দিষ্ট জায়গায় সংরক্ষণের উদ্যোগ নেয়া হবে।

২৪ অক্টোবর, ২০২৬ ১৪:৩১
পটুয়াখালীর গলাচিপায় মা ইলিশ সংরক্ষণ অভিযানে গিয়ে অবৈধ জেলেদের হামলার শিকার হয়েছেন অভিযানকারী দলের সদস্যরা। এ সময় এক পুলিশ কনস্টেবল ও স্পিডবোটের চালক আহত হয়েছেন। আহত পুলিশ সদস্যের হাতে গুরুতর আঘাত লেগেছে। শুক্রবার (২৩ অক্টোবর) সন্ধ্যায় বুড়াগৌরাঙ্গ নদীর কালিরচর এলাকায় এ হামলার ঘটনা ঘটে। পরে আহতদের উদ্ধার করে গলাচিপা উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে চিকিৎসা দেওয়া হয়।
আহতরা হলেন গলাচিপা থানার পুলিশ কনস্টেবল মো. জসিম এবং অভিযানে ব্যবহৃত স্পিডবোটের চালক মো. শাহজালাল।
মৎস্য বিভাগ সূত্রে জানা গেছে, মা ইলিশ সংরক্ষণে সরকারি নিষেধাজ্ঞা অমান্য করে বুড়াগৌরাঙ্গ নদীতে অবৈধভাবে মাছ শিকারের খবর পেয়ে শুক্রবার বিকেলে যৌথ অভিযান চালায় মৎস্য বিভাগ ও পুলিশ। স্পিডবোট নিয়ে নদীতে থাকা ট্রলারগুলোর দিকে এগিয়ে গেলে জেলেরা পালানোর চেষ্টা করেন। প্রায় ১০ মিনিট ধাওয়া করার পর একটি ট্রলারের কাছাকাছি পৌঁছালে ওই ট্রলারে থাকা ১০ থেকে ১২ জন জেলে বৈঠা ও লাঠিসোঁটা নিয়ে অভিযানকারী দলের ওপর হামলা চালান।
অভিযানে অংশ নেওয়া মৎস্য বিভাগের সদস্য সুধাংশু জানান, জেলেরা প্রথমে স্পিডবোটের চালক শাহজালালকে বৈঠা দিয়ে আঘাত করেন। তাকে রক্ষা করতে পুলিশ কনস্টেবল জসিম এগিয়ে গেলে তাকেও আঘাত করা হয়। এতে তার হাত কেটে রক্তাক্ত জখম হয়। পরে ডাবল ইঞ্জিনচালিত দ্রুতগতির ট্রলার নিয়ে পালিয়ে যান জেলেরা।
গলাচিপা উপজেলা সিনিয়র মৎস্য কর্মকর্তা ভিক্টর বাইন বলেন, “অসাধু জেলেদের আটক করতে গেলে স্পিডবোটে হামলার ঘটনা ঘটে। এতে এক পুলিশ সদস্য আহত হয়েছেন। জড়িতদের শনাক্তের চেষ্টা চলছে।”
গলাচিপা থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) ইমতিয়াজ আহমেদ সাংবাদিকদের জানান, সরকারি কাজে বাধা ও হামলার ঘটনায় আইনি ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে। জড়িত জেলেদের শনাক্ত করে দ্রুত আইনের আওতায় আনার প্রক্রিয়া চলছে।’

২৩ অক্টোবর, ২০২৬ ১৭:২০

২৩ অক্টোবর, ২০২৬ ১৬:২৮
আগামী তিন মাসের মধ্যে ভাঙ্গা-বরিশাল চার লেন সড়ক প্রকল্প জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের নির্বাহী কমিটির (একনেক) অনুমোদন পেতে পারে বলে জানিয়েছেন পরিকল্পনা প্রতিমন্ত্রী জোনায়েদ সাকী। একই সঙ্গে বরিশাল-কুয়াকাটা মহাসড়ক চার লেনে উন্নীত করার পরিকল্পনার কথাও জানিয়েছেন তিনি। এসব উদ্যোগ বাস্তবায়িত হলে দক্ষিণাঞ্চলের সড়ক যোগাযোগ ও পর্যটন খাতে বড় ধরনের পরিবর্তন আসবে বলে আশা করা হচ্ছে।
শুক্রবার (২৩ অক্টোবর) দুপুর ১২টায় কুয়াকাটায় দুই দিনব্যাপী পর্যটন কার্নিভালে যোগ দিয়ে সাংবাদিকদের সঙ্গে মতবিনিময় সভায় এসব কথা বলেন প্রতিমন্ত্রী।
জোনায়েদ সাকী বলেন, ভাঙ্গা-বরিশাল চার লেন সড়ক প্রকল্প আগামী তিন মাসের মধ্যে একনেকে অনুমোদন পেতে পারে। প্রকল্পটি বাস্তবায়িত হলে কুয়াকাটাসহ দক্ষিণাঞ্চলের বিভিন্ন এলাকার সঙ্গে সড়ক যোগাযোগে বৈপ্লবিক পরিবর্তন আসবে। পাশাপাশি বরিশাল থেকে কুয়াকাটা পর্যন্ত সড়ক চার লেনে উন্নীত করার পরিকল্পনাও রয়েছে সরকারের।
তিনি আরও বলেন, বর্তমান সরকার সব ধরনের উন্নয়ন কর্মকাণ্ড মাস্টারপ্ল্যানের আওতায় নেওয়ার উদ্যোগ নিয়েছে। পরিকল্পিতভাবে প্রকল্প গ্রহণ ও বাস্তবায়ন করা হলে দীর্ঘসূত্রিতা কমবে এবং উন্নয়ন কার্যক্রম আরও কার্যকর হবে।
মতবিনিময় সভায় বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটনমন্ত্রী এম রশিদুজ্জামান মিল্লাত, পটুয়াখালী-৪ আসনের সংসদ সদস্য এবিএম মোশাররফ হোসেনসহ বরিশাল ও পটুয়াখালী জেলা প্রশাসনের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন।

১৭ জুলাই, ২০২৫ ১৪:০৫
নদীটির নাম খাপড়াভাঙ্গা। শিববাড়িয়া নদী নামে বেশ পরিচিত। কলকল স্রোতে বয়ে যাওয়া নদীটির দু’প্রান্ত সাগরের সাথে মিলিত হবার কারণে ‘খাপড়াভাঙ্গা দোন’ বলা হয়। নদীটির পশ্চিম প্রান্তে আন্ধারমানিক মোহনা, আর পূর্ব প্রান্ত মিলিত হয়েছে রামনাবাদ মোহনায়।
দূর্যোগপূর্ণ আবহাওয়ার সময় সমুদ্রে মাছ ধরা ট্রলারগুলো দ্রুত নিরাপদ আশ্রয় নিতে পারে বিধায় ‘প্রোতাশ্রয় নদী’ নামে খ্যাতি অর্জন করেছে। এই নদীর দু’পাড়ে গড়ে উঠেছে আশাখালী মৎস্যপল্লী, চাপলী বাজার, লক্ষ্মীরহাট এবং আলীপুর-মহিপুর মৎস্য বন্দর। এসব বন্দরের মৎস্য ব্যবসায়ীদের ব্যবহৃত পলিথিন ও প্লাস্টিক ফেলা হচ্ছে নদীতে।
নদীর পেটের এসব প্লাস্টিক ও পলিথিন ভাটার স্রোতে ভেঁসে যাচ্ছে বঙ্গোপসাগরে। ধীরে ধীরে ছোট ছোট মাইক্রোপ্লাস্টিকে রূপান্তরিত হয়ে খাদ্য ও পানির মাধ্যমে জলজপ্রাণী গ্রহণ করে। এতে ধ্বংস হচ্ছে সামুদ্রিক জীববৈচিত্র্য, কমছে মাছের উৎপাদন। শেষমেশ ক্ষতিগ্রস্থ হচ্ছেন মৎস্য ব্যবসায়ীরাই। আর পরিবেশ নষ্টের অন্যতম কারণ এসব প্লাস্টিক ও পলিথিনের ব্যবহার বন্ধ করতে পরিবেশ অধিদপ্তর এবং মৎস্য বিভাগকে যৌথ উদ্যোগ গ্রহণ করার পরামর্শ বিশেষজ্ঞদের।
পটুয়াখালী জেলার কলাপাড়া উপজেলার মহিপুর থানায় অবস্থিত খাপড়াভাঙ্গা নদীটি। এটি আকারে ছোট্ট হলেও এই উপকূলীয় অঞ্চলের অর্থনীতির চাকা সচল রাখতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে দীর্ঘ বছর ধরে। কিন্তু ব্যবসায়ীদের অসচেতনতার কারণে দখল দূষণে অস্তিত্ব সংকটে ভুগছে নদীটি। প্রতিনিয়ত নির্বিচারে মৎস্য বন্দরে ব্যবহৃত পলিথিন ও প্লাস্টিক সামগ্রী ফেলা হচ্ছে নদীর পাড়ে। পলিথিনের বিকল্প না পেয়ে ব্যবসায়ীরা ব্যবহার করতে বাধ্য হচ্ছেন।
আর মৎস্য বন্দরের বর্জ্য ফেলার নির্দিষ্ট জায়গা না থাকার অজুহাতে ফেলছে নদীতে। অথচ আলীপুর, মহিপুর মৎস্য বন্দর থেকে সরকার প্রতি বছর কোটি কোটি টাকা রাজস্ব আয় করছেন। ব্যবসায়ীদের জন্য শুধুমাত্র দু’পাড়ে দুইটি মৎস্য অবতরণ কেন্দ্র নির্মাণ করেছে সরকার। আলীপুরের অবতরণ কেন্দ্রটি ব্যবসায়ীরা ব্যবহার করলেও মহিপুরেরটি ব্যবহার করছেন না। ব্যবসায়ীদের তরফ থেকে বার বার বর্জ্য ফেলার নির্দিষ্ট জায়গা চাওয়া হচ্ছে। কিন্তু আশ্বাস দিয়ে সময় ক্ষেপন করেছেন মৎস্য অধিদপ্তর।
এ প্রসঙ্গে আলীপুরের মৎস্য ব্যবসায়ী মো. মিজানুর রহমান বলেন, ‘আমরা পলিথিন ফেলার জন্য বিএফডিসি কর্তৃপক্ষের কাছে অনেকবার জায়গা চেয়েছি। তারা কোন জায়গা নির্ধারণ করে দেয়নি। তাই বিভিন্ন সময় জেলেরা যে পলিথিনগুলো ফেলে দেয় তা নদীর পানির সাথে মিশে যায়।’
পরিবেশ দূষণ রোধ, মাটির উর্বরতা রক্ষা, পানিতে আর্সেনিকের পরিমাণ কমানো, ডেঙ্গু ও অন্যান্য রোগ সৃষ্টিকারী মশা নির্মূল করা এবং মানুষের স্বাস্থ্য সুরক্ষার জন্য বিশ্বের প্রথম দেশ হিসেবে ২০০২ সালের ১লা মার্চ পরিবেশ সংরক্ষণ আইন (সংশোধনী) এর মাধ্যমে পলিথিনের উৎপাদন, বিপণন ও ব্যবহার নিষিদ্ধ করা হয়েছে।
পাশাপাশি পলিথিনের বিকল্প হিসেবে পাট ও কাপড়ের ব্যাগ ব্যবহারের জন্য উৎসাহিত করা হচ্ছে। কিন্তু আইনটি কার্যকরভাবে প্রয়োগ না করায় পলিথিন ব্যবহার বন্ধ হয়নি। তাছাড়া মাছ সংরক্ষণ ও রপ্তানির জন্য পলিথিনের বিকল্প কিছুই পাচ্ছে না মৎস্য ব্যবসায়ীরা। মাছে বরফ দেয়ার জন্য পাট বা কাপড়ের ব্যাগ ব্যবহার করা যাচ্ছে না। মৎস্য ব্যবসায়ীরা বলছেন একই দামে পলিথিনের বিকল্প পেলে তারা ব্যবহার করবেন।
এ বিষয়ে মৎস্য ব্যবসায়ী এম.আনিসুর রহমান মামুন বলেন, ‘আমাদের আহরিত মাছগুলো পলিতে প্যাকেট করলে ভালো থাকে। এর বিকল্প যে ব্যাগ আছে তা মাছ প্যাকেট করার উপযোগী না। মাছ সংরক্ষণের জন্য পলিথিনের বিকল্প কিছু আসলে আমরা অবশ্যই ব্যবহার করবো।’
পলিথিন অপচনশীল হওয়ায় ১০০-৪৫০ বছর পর্যন্ত পরিবেশে অবশিষ্ট থাকে। যার ফলে নদী ও সমুদ্রের পানিতে মিশে জলজপ্রাণীর জীবনহানি ঘটায়। সামুদ্রিক বাস্তুতন্ত্রের ভারসাম্য নষ্ট করে। সামুদ্রিক পরিবেশ দূষিত করে। অনেক সামুদ্রিক কচ্ছপ, মাছ এবং পাখি ভুলবশত পলিথিন খেয়ে ফেলে, যা তাদের খাদ্যনালীতে আটকে গিয়ে হজমে বাধা সৃষ্টি করে এবং মৃত্যু হয়।
গবেষণার তথ্যানুযায়ী, প্রতিদিন সমুদ্রে ৭৩ হাজার টন প্লাস্টিক বর্জ্য পড়ছে। এতে ৩০০ ধরণের প্লাস্টিক পণ্য রয়েছে। এর মধ্যে কোমল পানীয়র বোতল থেকে শুরু করে কসমেটিকসের মোড়ক রয়েছে। প্লাস্টিক বোতলের একটি বড় অংশ যাচ্ছে উপকূলের মাছ ধরা ট্রলারে।
পরিবেশ ও জলবায়ু বিষয়ক নাগরিক সংগঠন ‘ধরিত্রী রক্ষায় আমরা (ধরা)’ কলাপাড়া উপজেলা সমন্বয়কারী ও সিনিয়র সাংবাদিক মেজবাহউদ্দিন মাননু বলেন, ‘উপকূলের মৎস্যবন্দর ব্যবসায়ী ও জেলেদের সচেতন করতে হবে। শুধুমাত্র বিশ্ব পরিবেশ দিবসে একটি র্যালী ও আলোচনা সভার মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকলে হবে না। উপজেলা পরিবেশ সংরক্ষণ কমিটিকে কার্যকরী উদ্যোগ নিয়ে দায়িত্বশীল ভূমিকা পালন রাখতে হবে।’
বিশেষজ্ঞদের মতে, প্লাস্টিক ও পলিথিনের ব্যবহার নিষিদ্ধকরণ এবং বিকল্প হিসেবে পরিবেশবান্ধব পণ্যের ব্যবহার বৃদ্ধি করতে হবে। বর্জ্য ব্যবস্থাপনা ব্যবস্থার উন্নয়ন এবং প্লাস্টিক বর্জ্য সংগ্রহ, প্রক্রিয়াকরণ ও পুনব্যবহারের কার্যকর উদ্যোগ নিতে হবে। প্লাস্টিক দূষণ রোধে সরকার, উৎপাদক, ব্যবহারকারী এবং পরিবেশবাদীদের সম্মিলিতভাবে সচেতনতা বৃদ্ধি করতে হবে।
বাংলাদেশ মেরিটাইম বিশ্ববিদ্যালয়ের সেফাস প্রজেক্টের সহযোগী গবেষক সাগরিকা স্মৃতি বলেন, ‘পলিথিন ও প্লাস্টিক বর্জ্যরে কারণে নদী ও সমুদ্র দূষণ ক্রমান্বয়ে বাড়ছে। এক্ষেত্রে পরিবেশ অধিদপ্তর ও মৎস্য অধিদপ্তরকে সম্মিলিতভাবে কার্যকরী উদ্যোগ গ্রহণ করতে হবে। এক দপ্তর অন্য দপ্তরের উপর দায় চাপিয়ে নিশ্চুপ থাকলে আমাদের সামুদ্রিক পরিবেশ ও প্রতিবেশ দিন দিন নষ্ট হবে। আমাদের সামুদ্রিক জীববৈচিত্র্য রক্ষায় মৎস্যজীবীদের আরো বেশি সচেতন করতে হবে।’
এ প্রসঙ্গে পটুয়াখালী জেলা মৎস্য কর্মকর্তা মো. কামরুল ইসলাম বলেন, ‘মহিপুর-আলীপুর ব্যবসায়ীদের ব্যবহৃত পলিথিন ও প্লাস্টিক সামগ্রী খাপড়াভাঙ্গা নদীতে ফেলছে। এতে আমাদের পরিবেশ ও জলজ পরিবেশ প্রতিবেশের জন্য মারাত্মক হুমকির সৃষ্টি হতে পারে। এ বিষয়টি নিয়ে বহুবার বন্দরের ব্যবসায়ীদের সচেতন করা হয়েছে। মৎস্য অধিদপ্তর জলজপ্রাণী রক্ষা ও নদী দূষণ রোধে যথেষ্ট সচেতন রয়েছে। দ্রুত বন্দর ব্যবসায়ীদের নিয়ে একটি মতবিনিময় সভা করে তাদের ব্যবহৃত পলিথিন নির্দিষ্ট জায়গায় সংরক্ষণের উদ্যোগ নেয়া হবে।
পটুয়াখালীর গলাচিপায় মা ইলিশ সংরক্ষণ অভিযানে গিয়ে অবৈধ জেলেদের হামলার শিকার হয়েছেন অভিযানকারী দলের সদস্যরা। এ সময় এক পুলিশ কনস্টেবল ও স্পিডবোটের চালক আহত হয়েছেন। আহত পুলিশ সদস্যের হাতে গুরুতর আঘাত লেগেছে। শুক্রবার (২৩ অক্টোবর) সন্ধ্যায় বুড়াগৌরাঙ্গ নদীর কালিরচর এলাকায় এ হামলার ঘটনা ঘটে। পরে আহতদের উদ্ধার করে গলাচিপা উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে চিকিৎসা দেওয়া হয়।
আহতরা হলেন গলাচিপা থানার পুলিশ কনস্টেবল মো. জসিম এবং অভিযানে ব্যবহৃত স্পিডবোটের চালক মো. শাহজালাল।
মৎস্য বিভাগ সূত্রে জানা গেছে, মা ইলিশ সংরক্ষণে সরকারি নিষেধাজ্ঞা অমান্য করে বুড়াগৌরাঙ্গ নদীতে অবৈধভাবে মাছ শিকারের খবর পেয়ে শুক্রবার বিকেলে যৌথ অভিযান চালায় মৎস্য বিভাগ ও পুলিশ। স্পিডবোট নিয়ে নদীতে থাকা ট্রলারগুলোর দিকে এগিয়ে গেলে জেলেরা পালানোর চেষ্টা করেন। প্রায় ১০ মিনিট ধাওয়া করার পর একটি ট্রলারের কাছাকাছি পৌঁছালে ওই ট্রলারে থাকা ১০ থেকে ১২ জন জেলে বৈঠা ও লাঠিসোঁটা নিয়ে অভিযানকারী দলের ওপর হামলা চালান।
অভিযানে অংশ নেওয়া মৎস্য বিভাগের সদস্য সুধাংশু জানান, জেলেরা প্রথমে স্পিডবোটের চালক শাহজালালকে বৈঠা দিয়ে আঘাত করেন। তাকে রক্ষা করতে পুলিশ কনস্টেবল জসিম এগিয়ে গেলে তাকেও আঘাত করা হয়। এতে তার হাত কেটে রক্তাক্ত জখম হয়। পরে ডাবল ইঞ্জিনচালিত দ্রুতগতির ট্রলার নিয়ে পালিয়ে যান জেলেরা।
গলাচিপা উপজেলা সিনিয়র মৎস্য কর্মকর্তা ভিক্টর বাইন বলেন, “অসাধু জেলেদের আটক করতে গেলে স্পিডবোটে হামলার ঘটনা ঘটে। এতে এক পুলিশ সদস্য আহত হয়েছেন। জড়িতদের শনাক্তের চেষ্টা চলছে।”
গলাচিপা থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) ইমতিয়াজ আহমেদ সাংবাদিকদের জানান, সরকারি কাজে বাধা ও হামলার ঘটনায় আইনি ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে। জড়িত জেলেদের শনাক্ত করে দ্রুত আইনের আওতায় আনার প্রক্রিয়া চলছে।’
১০–২০ হাজার টাকায় নদীতে মাছ ধরার সুযোগ, টাকা দিয়ে জেলে ও জাল ছাড়ানোর অভিযোগ
মা ইলিশ রক্ষায় তেঁতুলিয়া নদীতে ২২ দিনের নিষেধাজ্ঞা চলছে। ইলিশের প্রজনন নির্বিঘ্ন করতে নদীতে দিনরাত অভিযান চালানোর কথা নৌ পুলিশ ও মৎস্য বিভাগের। কিন্তু এই অভিযান ঘিরেই পটুয়াখালীর বাউফলে উঠেছে গুরুতর অনিয়ম ও অর্থ লেনদেনের অভিযোগ। অভিযোগ রয়েছে, ১০ থেকে ২০ হাজার টাকার বিনিময়ে জেলেদের নদীতে মাছ ধরার সুযোগ দেওয়া হচ্ছে। আটক জেলেদের কারও কারও কাছ থেকে টাকা নিয়ে ছেড়ে দেওয়া হচ্ছে। এমনকি অভিযানে জব্দ করা জাল ও মাছ গোপনে বিক্রির অভিযোগও উঠেছে কালাইয়া নৌ পুলিশ ফাঁড়ির কয়েকজন সদস্যের বিরুদ্ধে।
তেঁতুলিয়া নদীর চরফেডারেশন, বাতিরখাল, চরওয়াঢেল, খানকা, চরকলাইয়া ও চর শৌলা পয়েন্ট ঘিরে কয়েক দিনের অনুসন্ধানে এসব অভিযোগ সামনে এসেছে। স্থানীয় জেলে, নদীপারের বাসিন্দা এবং অভিযোগকারীদের বক্তব্যে উঠে এসেছে অর্থ লেনদেনের একাধিক ঘটনা। তবে অভিযুক্ত পুলিশ সদস্যরা এসব অভিযোগ অস্বীকার করেছেন।
গত ৮ অক্টোবর থেকে তেঁতুলিয়া নদীতে মা ইলিশ সংরক্ষণে ২২ দিনের নিষেধাজ্ঞা শুরু হয়, যা ২৯ অক্টোবর পর্যন্ত চলার কথা। নিষেধাজ্ঞা কার্যকর করতে নৌ পুলিশ ও মৎস্য বিভাগের যৌথ অভিযানের কথা থাকলেও স্থানীয়দের অভিযোগ, কালাইয়া নৌ পুলিশ ফাঁড়ির সদস্যরা অনেক ক্ষেত্রে এককভাবে অভিযান পরিচালনা করছেন। এসব অভিযানে নেতৃত্ব দিচ্ছেন ফাঁড়ির দায়িত্বপ্রাপ্ত ইনচার্জ এসআই মো. মনিরুজ্জামান তালুকদার।
অভিযোগ রয়েছে, অভিযানের শুরু থেকেই একশ্রেণির জেলের সঙ্গে আর্থিক চুক্তির মাধ্যমে নদীতে মাছ ধরার সুযোগ করে দেওয়া হচ্ছে। ট্রলারপ্রতি ১০ থেকে ২০ হাজার টাকা পর্যন্ত লেনদেনের অভিযোগ করেছেন স্থানীয় কয়েকজন জেলে ও নদীপারের বাসিন্দা।
গত ১৯ অক্টোবর বিকেল সাড়ে ৪টার দিকে তেঁতুলিয়া নদীর চরফেডারেশন ও দক্ষিণ চরওয়াঢেলের মাঝামাঝি এলাকায় সরেজমিন পর্যবেক্ষণে একাধিক মাছ ধরার ট্রলার দেখা যায়। অভিযোগ অনুযায়ী, নৌ পুলিশের একটি টহল ট্রলার ওই এলাকায় দুই ঘণ্টার বেশি সময় অবস্থান করছিল। কাছাকাছি দূরত্বে কয়েকটি জেলেট্রলারকে নদীতে জাল ফেলতে এবং মাছ ধরে চলে যেতে দেখা যায়।
নিষেধাজ্ঞার মধ্যে পুলিশের টহল ট্রলারের কাছাকাছি এমন দৃশ্য দেখে অভিযান পরিচালনার কার্যকারিতা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। তবে ওই সময় মাছ ধরতে দেখা যাওয়া জেলেরা কোনো আর্থিক চুক্তির আওতায় ছিলেন কি না, তা স্বাধীনভাবে নিশ্চিত হওয়া যায়নি।
স্থানীয় জেলে ও নদীপারের বাসিন্দাদের দাবি, কিছু জেলে আগে থেকেই অভিযানের গতিবিধি জানতে পারেন। ফলে পুলিশ নদীতে নামার আগেই তাঁরা নিরাপদ স্থানে সরে যান। তাঁদের অভিযোগ, চরব্যারেট, বাতিরখাল, খানকা, দেবীরচর, চরকলাইয়া ও বগী-তুলাতলা এলাকার প্রায় অর্ধশত ট্রলারের জেলেদের সঙ্গে আর্থিক লেনদেনের মাধ্যমে সমঝোতা হয়েছে।
অভিযোগের বিষয়ে কালাইয়া নৌ পুলিশ ফাঁড়ির ইনচার্জ এসআই মো. মনিরুজ্জামান তালুকদার বলেন, টাকার বিনিময়ে মাছ ধরার সুযোগ দেওয়ার অভিযোগ সঠিক নয়। তবে টহলের কাছাকাছি জেলেদের মাছ ধরার বিষয়ে তিনি বলেন, অনেক অসচ্ছল মানুষ নদীতে জাল ফেলেন, মানবিক কারণে তাঁদের ধরা হয় না।
অভিযান ঘিরে সবচেয়ে গুরুতর অভিযোগ উঠেছে আটক জেলে ও জব্দ করা সরঞ্জাম নিয়ে। অভিযোগকারীদের ভাষ্য, নিষেধাজ্ঞা অমান্য করে মাছ ধরার সময় জেলেদের আটক করার পর কখনো নদীর মধ্যেই অর্থ লেনদেনের আলোচনা হয়। অভিযোগ অনুযায়ী, ৫ হাজার থেকে ২০ হাজার টাকা পর্যন্ত নিয়ে কোনো কোনো জেলেকে ছেড়ে দেওয়া হয়েছে। জব্দ করা জালও ১ হাজার ৫০০ থেকে ২৫ হাজার টাকা পর্যন্ত বিক্রির অভিযোগ রয়েছে। জব্দ মাছ হালি হিসেবে ৪০০ থেকে ৬ হাজার টাকায় বিক্রির অভিযোগও করেছেন কয়েকজন।
অভিযোগকারীরা দাবি করেছেন, এসব লেনদেনে কালাইয়া নৌ পুলিশ ফাঁড়ির কয়েকজন সদস্য, ট্রলারচালক জালাল গাজী এবং তাঁর ভাই ফিরোজ গাজীর সম্পৃক্ততা রয়েছে। তবে অভিযোগের প্রতিটি লেনদেনের স্বাধীন প্রমাণ বা পূর্ণাঙ্গ হিসাব প্রকাশ্যে পাওয়া যায়নি।
কালাইয়া নৌ পুলিশ ফাঁড়ির দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, অভিযান শুরুর পর থেকে ২১ অক্টোবর দুপুর পর্যন্ত নিষেধাজ্ঞা অমান্য করে মাছ ধরার অভিযোগে ৪৪ জন জেলেকে আটক করা হয়েছে। তাঁদের বিরুদ্ধে ২২টি ভ্রাম্যমাণ আদালত এবং ১১টি নিয়মিত মামলার মাধ্যমে বিভিন্ন মেয়াদে সাজা দেওয়া হয়েছে বলে জানানো হয়েছে। এ সময় বিপুল পরিমাণ কারেন্ট জাল ও মাছ জব্দের কথাও জানিয়েছে পুলিশ। পুলিশের দাবি, জব্দ করা জাল পুড়িয়ে ধ্বংস এবং মাছ এতিমখানায় বিতরণ করা হয়েছে।
তবে আটক ও সাজাপ্রাপ্তদের সরকারি নথি, জব্দ করা জালের পরিমাণ, ধ্বংসের কার্যবিবরণী এবং মাছ বিতরণের রসিদ যাচাই করা গেলে অভিযোগগুলোর সত্যতা নির্ধারণে গুরুত্বপূর্ণ তথ্য পাওয়া যেতে পারে।
গত ১৬ অক্টোবর সকালে নিষেধাজ্ঞার মধ্যে তেঁতুলিয়া নদীতে জাল ফেলতে গিয়ে চন্দ্রদ্বীপ ইউনিয়নের জেলে নুর আলম আটক হন বলে অভিযোগ উঠেছে। পরে ফিরোজ গাজীর মাধ্যমে ১০ হাজার টাকা দিয়ে তিনি মুক্তি পান বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রের দাবি।
একইভাবে গত ১৮ অক্টোবর ভোরে তেঁতুলিয়া নদীর চরদিয়ারা এলাকা থেকে চারটি ট্রলারসহ কয়েকজন জেলেকে আটক করা হয় বলে অভিযোগকারীরা জানিয়েছেন। তাঁদের দাবি, ট্রলারপ্রতি ৫ হাজার টাকা হিসেবে মোট ২০ হাজার টাকার বিনিময়ে তাঁদের ছেড়ে দেওয়া হয়।
মুক্তি পাওয়া জেলেদের একজন রাকিব (ছদ্মনাম)। তাঁর ভাষ্য অনুযায়ী, চারটি ছোট ইঞ্জিনচালিত ট্রলারসহ তাঁদের আটক করা হয়েছিল। পরে ট্রলারপ্রতি ৫ হাজার টাকা করে মোট ২০ হাজার টাকায় ছেড়ে দেওয়ার সমঝোতা হয়। তাঁদের কাছে নগদ টাকা না থাকায় নৌ পুলিশের ট্রলারচালক জালাল গাজীর ভাই ফিরোজ গাজীর জিম্মায় তাঁদের ছেড়ে দেওয়া হয়। পরে তাঁরা ওই টাকা পরিশোধ করেন বলে দাবি করেন রাকিব।
একই দিন চরদিয়ারা এলাকার জেলে শাহিন, হারুন গাজীসহ কয়েকজনকে জালসহ আটক করা হয় বলে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা জানিয়েছেন। তাঁদের অভিযোগ, হারুন গাজীসহ দুজনকে ৬ হাজার টাকার বিনিময়ে ছেড়ে দেওয়া হয়। তবে শাহিনকে মৎস্য সংরক্ষণ আইনে মামলার মাধ্যমে আদালতে পাঠানো হয়।
শাহিনের অভিযোগ, তাঁকে ছেড়ে দেওয়ার জন্য নৌ পুলিশের এএসআই কবির হোসেন ২০ হাজার টাকা দাবি করেন। দাবিকৃত টাকা দিতে না পারায় তাঁর বিরুদ্ধে মামলা দেওয়া হয় বলে তিনি দাবি করেন। তাঁর আরও অভিযোগ, জব্দ করা জাল ভোলার লালমোহনের নাজিম নামের এক ব্যক্তির কাছে ২৫ হাজার টাকায় বিক্রি করা হয়েছে।
এসব অভিযোগের বিষয়ে অভিযুক্ত এএসআই কবির হোসেনের বক্তব্য স্বাধীনভাবে যাচাই করা প্রয়োজন। জাল জব্দ, সংরক্ষণ ও নিষ্পত্তির সরকারি নথি পরীক্ষা করলেই এ বিষয়ে স্পষ্ট ধারণা পাওয়া যেতে পারে।
গত ১৯ অক্টোবর চরফেডারেশন এলাকার একটি খাল থেকে মাছ ধরতে নামা এক জেলের ট্রলার জব্দ করা হয় বলে স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে। পরে স্থানীয় এক ব্যক্তির মাধ্যমে নৌ পুলিশের ট্রলারচালক জালাল গাজীকে ৫ হাজার টাকা দিয়ে ট্রলারটি ছাড়িয়ে নেওয়া হয় বলে অভিযোগ উঠেছে।
পরদিন ২০ অক্টোবর সকাল ৭টার দিকে দক্ষিণ চরওয়াঢেল ও খানকা বাজারের পূর্ব-দক্ষিণ দিক থেকে চর রায়সাহেব এলাকা পর্যন্ত অভিযান চালিয়ে প্রায় ২০ জন জেলের জাল জব্দ করা হয় বলে অভিযোগকারীরা জানান।
তাঁদের দাবি, জালগুলো জব্দের পর নৌ পুলিশের ট্রলারে রাখা হয়। পরে কয়েকজন জেলে জাল ফেরত পেতে ট্রলারচালকের সঙ্গে মুঠোফোনে যোগাযোগ করেন। একপর্যায়ে চরওয়াঢেলের জেলে শহিদুল ও সুজন ৮ হাজার টাকার বিনিময়ে জাল ছাড়িয়ে আনেন বলে অভিযোগ রয়েছে।
জাল ফেরত আনার পর স্থানীয় আরেক জেলে নুর জামাল অভিযোগ করেন, শহিদুল টাকা দিয়ে তাঁর জালও নিয়ে এসেছেন। এ নিয়ে তাঁদের মধ্যে হাতাহাতির ঘটনাও ঘটে বলে স্থানীয় সূত্র জানিয়েছে।
এদিকে পূর্ব কালাইয়া গ্রামের বাসিন্দা সোহাগের অভিযোগ, নদীতে জাল ফেলার পর চরফেডারেশন এলাকায় অবস্থানকালে নৌ পুলিশ তাঁর জাল জব্দ করে। পরে সেই জাল চন্দ্রদ্বীপ ইউনিয়নের কালা রাশেদ নামের এক ব্যক্তির কাছে বিক্রি করা হয় বলে তিনি দাবি করেন।
নাম প্রকাশ না করার শর্তে চরকালাইয়া গ্রামের আরেক জেলে বলেন, শনিবার নদীতে জাল ফেলে তিনি চরে অপেক্ষা করছিলেন। এ সময় নৌ পুলিশের ট্রলার তাঁর জাল তুলে নেয়। পরে সংশ্লিষ্ট এক পুলিশ কর্মকর্তার সঙ্গে যোগাযোগের পর ১ হাজার ৫০০ টাকার বিনিময়ে জাল ফেরত পান বলে তাঁর দাবি।
অভিযোগকারীদের আরও দাবি, অভিযানে জব্দ করা জাল ও মাছ ট্রলারচালক জালাল গাজীর কাছে রাখা হতো। পরে সেগুলো বিক্রি করে পাওয়া অর্থ সংশ্লিষ্টদের কাছে পৌঁছে দেওয়া হতো এবং এর বিনিময়ে কমিশন দেওয়া হতো। তবে এই অভিযোগের পক্ষে আর্থিক লেনদেনের নথি বা স্বাধীনভাবে যাচাই করা প্রমাণ পাওয়া গেছে কি না, তা নিশ্চিত হওয়া যায়নি।
টাকার বিনিময়ে জেলে ও তাঁদের নৌকা-জাল ছেড়ে দেওয়া এবং জব্দ করা মাছ ও জাল বিক্রির অভিযোগ অস্বীকার করেছেন কালাইয়া নৌ পুলিশ ফাঁড়ির ইনচার্জ এসআই মো. মনিরুজ্জামান তালুকদার ও এএসআই কবির হোসেন। তাঁদের দাবি, এসব অভিযোগ মিথ্যা।
তবে অভিযোগের বিষয়ে বরিশাল অঞ্চল নৌ পুলিশের পুলিশ সুপার এসএম নাজমুল হক বলেন, “সুনির্দিষ্ট অভিযোগ পেলে তদন্ত করে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।”
অন্যদিকে সিনিয়র উপজেলা মৎস্য কর্মকর্তা এম এম পারভেজ বলেন, নৌ পুলিশ ও মৎস্য বিভাগের যৌথভাবে অভিযান পরিচালনা করার কথা। কিন্তু নৌ পুলিশ পৃথকভাবে অভিযান পরিচালনা করায় সমন্বয়হীনতা দেখা দিয়েছে। অভিযানের স্বচ্ছতা নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে। বিষয়টি ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে অবহিত করা হবে বলে জানান তিনি।
মা ইলিশ সংরক্ষণে নিষেধাজ্ঞার মূল উদ্দেশ্য হলো ইলিশের প্রজনন নিশ্চিত করা এবং ভবিষ্যতে মাছের উৎপাদন ধরে রাখা। এ সময়ে নদীতে অবৈধ মাছ শিকার বন্ধ করা সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের দায়িত্ব। কিন্তু অভিযানের মধ্যেই যদি অর্থের বিনিময়ে মাছ ধরার সুযোগ দেওয়া বা জব্দ করা সরঞ্জাম বিক্রির অভিযোগ ওঠে, তাহলে নিষেধাজ্ঞা বাস্তবায়নের কার্যকারিতা নিয়ে প্রশ্ন তৈরি হওয়া স্বাভাবিক।
বাউফলের তেঁতুলিয়া নদীতে ওঠা এসব অভিযোগের সত্যতা নির্ধারণে নিরপেক্ষ তদন্ত, অভিযানের সরকারি নথি যাচাই, জব্দ করা জাল ও মাছের হিসাব পরীক্ষা এবং অভিযোগকারী জেলেদের বক্তব্য গ্রহণ জরুরি। একই সঙ্গে অভিযুক্ত পুলিশ সদস্যদের বক্তব্য ও আত্মপক্ষ সমর্থনের সুযোগ নিশ্চিত করাও প্রয়োজন।
অভিযোগ প্রমাণিত হলে সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে আইন ও বিধি অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া দরকার। আর অভিযোগের সত্যতা না মিললে তদন্তের মাধ্যমে সেটিও স্পষ্ট করা উচিত। মা ইলিশ রক্ষার মতো গুরুত্বপূর্ণ কর্মসূচিতে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি নিশ্চিত না হলে নদী রক্ষার উদ্যোগ প্রশ্নবিদ্ধ হওয়ার আশঙ্কা থেকেই যায়।'
১০–২০ হাজার টাকায় নদীতে মাছ ধরার সুযোগ, টাকা দিয়ে জেলে ও জাল ছাড়ানোর অভিযোগ
মা ইলিশ রক্ষায় তেঁতুলিয়া নদীতে ২২ দিনের নিষেধাজ্ঞা চলছে। ইলিশের প্রজনন নির্বিঘ্ন করতে নদীতে দিনরাত অভিযান চালানোর কথা নৌ পুলিশ ও মৎস্য বিভাগের। কিন্তু এই অভিযান ঘিরেই পটুয়াখালীর বাউফলে উঠেছে গুরুতর অনিয়ম ও অর্থ লেনদেনের অভিযোগ। অভিযোগ রয়েছে, ১০ থেকে ২০ হাজার টাকার বিনিময়ে জেলেদের নদীতে মাছ ধরার সুযোগ দেওয়া হচ্ছে। আটক জেলেদের কারও কারও কাছ থেকে টাকা নিয়ে ছেড়ে দেওয়া হচ্ছে। এমনকি অভিযানে জব্দ করা জাল ও মাছ গোপনে বিক্রির অভিযোগও উঠেছে কালাইয়া নৌ পুলিশ ফাঁড়ির কয়েকজন সদস্যের বিরুদ্ধে।
তেঁতুলিয়া নদীর চরফেডারেশন, বাতিরখাল, চরওয়াঢেল, খানকা, চরকলাইয়া ও চর শৌলা পয়েন্ট ঘিরে কয়েক দিনের অনুসন্ধানে এসব অভিযোগ সামনে এসেছে। স্থানীয় জেলে, নদীপারের বাসিন্দা এবং অভিযোগকারীদের বক্তব্যে উঠে এসেছে অর্থ লেনদেনের একাধিক ঘটনা। তবে অভিযুক্ত পুলিশ সদস্যরা এসব অভিযোগ অস্বীকার করেছেন।
গত ৮ অক্টোবর থেকে তেঁতুলিয়া নদীতে মা ইলিশ সংরক্ষণে ২২ দিনের নিষেধাজ্ঞা শুরু হয়, যা ২৯ অক্টোবর পর্যন্ত চলার কথা। নিষেধাজ্ঞা কার্যকর করতে নৌ পুলিশ ও মৎস্য বিভাগের যৌথ অভিযানের কথা থাকলেও স্থানীয়দের অভিযোগ, কালাইয়া নৌ পুলিশ ফাঁড়ির সদস্যরা অনেক ক্ষেত্রে এককভাবে অভিযান পরিচালনা করছেন। এসব অভিযানে নেতৃত্ব দিচ্ছেন ফাঁড়ির দায়িত্বপ্রাপ্ত ইনচার্জ এসআই মো. মনিরুজ্জামান তালুকদার।
অভিযোগ রয়েছে, অভিযানের শুরু থেকেই একশ্রেণির জেলের সঙ্গে আর্থিক চুক্তির মাধ্যমে নদীতে মাছ ধরার সুযোগ করে দেওয়া হচ্ছে। ট্রলারপ্রতি ১০ থেকে ২০ হাজার টাকা পর্যন্ত লেনদেনের অভিযোগ করেছেন স্থানীয় কয়েকজন জেলে ও নদীপারের বাসিন্দা।
গত ১৯ অক্টোবর বিকেল সাড়ে ৪টার দিকে তেঁতুলিয়া নদীর চরফেডারেশন ও দক্ষিণ চরওয়াঢেলের মাঝামাঝি এলাকায় সরেজমিন পর্যবেক্ষণে একাধিক মাছ ধরার ট্রলার দেখা যায়। অভিযোগ অনুযায়ী, নৌ পুলিশের একটি টহল ট্রলার ওই এলাকায় দুই ঘণ্টার বেশি সময় অবস্থান করছিল। কাছাকাছি দূরত্বে কয়েকটি জেলেট্রলারকে নদীতে জাল ফেলতে এবং মাছ ধরে চলে যেতে দেখা যায়।
নিষেধাজ্ঞার মধ্যে পুলিশের টহল ট্রলারের কাছাকাছি এমন দৃশ্য দেখে অভিযান পরিচালনার কার্যকারিতা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। তবে ওই সময় মাছ ধরতে দেখা যাওয়া জেলেরা কোনো আর্থিক চুক্তির আওতায় ছিলেন কি না, তা স্বাধীনভাবে নিশ্চিত হওয়া যায়নি।
স্থানীয় জেলে ও নদীপারের বাসিন্দাদের দাবি, কিছু জেলে আগে থেকেই অভিযানের গতিবিধি জানতে পারেন। ফলে পুলিশ নদীতে নামার আগেই তাঁরা নিরাপদ স্থানে সরে যান। তাঁদের অভিযোগ, চরব্যারেট, বাতিরখাল, খানকা, দেবীরচর, চরকলাইয়া ও বগী-তুলাতলা এলাকার প্রায় অর্ধশত ট্রলারের জেলেদের সঙ্গে আর্থিক লেনদেনের মাধ্যমে সমঝোতা হয়েছে।
অভিযোগের বিষয়ে কালাইয়া নৌ পুলিশ ফাঁড়ির ইনচার্জ এসআই মো. মনিরুজ্জামান তালুকদার বলেন, টাকার বিনিময়ে মাছ ধরার সুযোগ দেওয়ার অভিযোগ সঠিক নয়। তবে টহলের কাছাকাছি জেলেদের মাছ ধরার বিষয়ে তিনি বলেন, অনেক অসচ্ছল মানুষ নদীতে জাল ফেলেন, মানবিক কারণে তাঁদের ধরা হয় না।
অভিযান ঘিরে সবচেয়ে গুরুতর অভিযোগ উঠেছে আটক জেলে ও জব্দ করা সরঞ্জাম নিয়ে। অভিযোগকারীদের ভাষ্য, নিষেধাজ্ঞা অমান্য করে মাছ ধরার সময় জেলেদের আটক করার পর কখনো নদীর মধ্যেই অর্থ লেনদেনের আলোচনা হয়। অভিযোগ অনুযায়ী, ৫ হাজার থেকে ২০ হাজার টাকা পর্যন্ত নিয়ে কোনো কোনো জেলেকে ছেড়ে দেওয়া হয়েছে। জব্দ করা জালও ১ হাজার ৫০০ থেকে ২৫ হাজার টাকা পর্যন্ত বিক্রির অভিযোগ রয়েছে। জব্দ মাছ হালি হিসেবে ৪০০ থেকে ৬ হাজার টাকায় বিক্রির অভিযোগও করেছেন কয়েকজন।
অভিযোগকারীরা দাবি করেছেন, এসব লেনদেনে কালাইয়া নৌ পুলিশ ফাঁড়ির কয়েকজন সদস্য, ট্রলারচালক জালাল গাজী এবং তাঁর ভাই ফিরোজ গাজীর সম্পৃক্ততা রয়েছে। তবে অভিযোগের প্রতিটি লেনদেনের স্বাধীন প্রমাণ বা পূর্ণাঙ্গ হিসাব প্রকাশ্যে পাওয়া যায়নি।
কালাইয়া নৌ পুলিশ ফাঁড়ির দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, অভিযান শুরুর পর থেকে ২১ অক্টোবর দুপুর পর্যন্ত নিষেধাজ্ঞা অমান্য করে মাছ ধরার অভিযোগে ৪৪ জন জেলেকে আটক করা হয়েছে। তাঁদের বিরুদ্ধে ২২টি ভ্রাম্যমাণ আদালত এবং ১১টি নিয়মিত মামলার মাধ্যমে বিভিন্ন মেয়াদে সাজা দেওয়া হয়েছে বলে জানানো হয়েছে। এ সময় বিপুল পরিমাণ কারেন্ট জাল ও মাছ জব্দের কথাও জানিয়েছে পুলিশ। পুলিশের দাবি, জব্দ করা জাল পুড়িয়ে ধ্বংস এবং মাছ এতিমখানায় বিতরণ করা হয়েছে।
তবে আটক ও সাজাপ্রাপ্তদের সরকারি নথি, জব্দ করা জালের পরিমাণ, ধ্বংসের কার্যবিবরণী এবং মাছ বিতরণের রসিদ যাচাই করা গেলে অভিযোগগুলোর সত্যতা নির্ধারণে গুরুত্বপূর্ণ তথ্য পাওয়া যেতে পারে।
গত ১৬ অক্টোবর সকালে নিষেধাজ্ঞার মধ্যে তেঁতুলিয়া নদীতে জাল ফেলতে গিয়ে চন্দ্রদ্বীপ ইউনিয়নের জেলে নুর আলম আটক হন বলে অভিযোগ উঠেছে। পরে ফিরোজ গাজীর মাধ্যমে ১০ হাজার টাকা দিয়ে তিনি মুক্তি পান বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রের দাবি।
একইভাবে গত ১৮ অক্টোবর ভোরে তেঁতুলিয়া নদীর চরদিয়ারা এলাকা থেকে চারটি ট্রলারসহ কয়েকজন জেলেকে আটক করা হয় বলে অভিযোগকারীরা জানিয়েছেন। তাঁদের দাবি, ট্রলারপ্রতি ৫ হাজার টাকা হিসেবে মোট ২০ হাজার টাকার বিনিময়ে তাঁদের ছেড়ে দেওয়া হয়।
মুক্তি পাওয়া জেলেদের একজন রাকিব (ছদ্মনাম)। তাঁর ভাষ্য অনুযায়ী, চারটি ছোট ইঞ্জিনচালিত ট্রলারসহ তাঁদের আটক করা হয়েছিল। পরে ট্রলারপ্রতি ৫ হাজার টাকা করে মোট ২০ হাজার টাকায় ছেড়ে দেওয়ার সমঝোতা হয়। তাঁদের কাছে নগদ টাকা না থাকায় নৌ পুলিশের ট্রলারচালক জালাল গাজীর ভাই ফিরোজ গাজীর জিম্মায় তাঁদের ছেড়ে দেওয়া হয়। পরে তাঁরা ওই টাকা পরিশোধ করেন বলে দাবি করেন রাকিব।
একই দিন চরদিয়ারা এলাকার জেলে শাহিন, হারুন গাজীসহ কয়েকজনকে জালসহ আটক করা হয় বলে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা জানিয়েছেন। তাঁদের অভিযোগ, হারুন গাজীসহ দুজনকে ৬ হাজার টাকার বিনিময়ে ছেড়ে দেওয়া হয়। তবে শাহিনকে মৎস্য সংরক্ষণ আইনে মামলার মাধ্যমে আদালতে পাঠানো হয়।
শাহিনের অভিযোগ, তাঁকে ছেড়ে দেওয়ার জন্য নৌ পুলিশের এএসআই কবির হোসেন ২০ হাজার টাকা দাবি করেন। দাবিকৃত টাকা দিতে না পারায় তাঁর বিরুদ্ধে মামলা দেওয়া হয় বলে তিনি দাবি করেন। তাঁর আরও অভিযোগ, জব্দ করা জাল ভোলার লালমোহনের নাজিম নামের এক ব্যক্তির কাছে ২৫ হাজার টাকায় বিক্রি করা হয়েছে।
এসব অভিযোগের বিষয়ে অভিযুক্ত এএসআই কবির হোসেনের বক্তব্য স্বাধীনভাবে যাচাই করা প্রয়োজন। জাল জব্দ, সংরক্ষণ ও নিষ্পত্তির সরকারি নথি পরীক্ষা করলেই এ বিষয়ে স্পষ্ট ধারণা পাওয়া যেতে পারে।
গত ১৯ অক্টোবর চরফেডারেশন এলাকার একটি খাল থেকে মাছ ধরতে নামা এক জেলের ট্রলার জব্দ করা হয় বলে স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে। পরে স্থানীয় এক ব্যক্তির মাধ্যমে নৌ পুলিশের ট্রলারচালক জালাল গাজীকে ৫ হাজার টাকা দিয়ে ট্রলারটি ছাড়িয়ে নেওয়া হয় বলে অভিযোগ উঠেছে।
পরদিন ২০ অক্টোবর সকাল ৭টার দিকে দক্ষিণ চরওয়াঢেল ও খানকা বাজারের পূর্ব-দক্ষিণ দিক থেকে চর রায়সাহেব এলাকা পর্যন্ত অভিযান চালিয়ে প্রায় ২০ জন জেলের জাল জব্দ করা হয় বলে অভিযোগকারীরা জানান।
তাঁদের দাবি, জালগুলো জব্দের পর নৌ পুলিশের ট্রলারে রাখা হয়। পরে কয়েকজন জেলে জাল ফেরত পেতে ট্রলারচালকের সঙ্গে মুঠোফোনে যোগাযোগ করেন। একপর্যায়ে চরওয়াঢেলের জেলে শহিদুল ও সুজন ৮ হাজার টাকার বিনিময়ে জাল ছাড়িয়ে আনেন বলে অভিযোগ রয়েছে।
জাল ফেরত আনার পর স্থানীয় আরেক জেলে নুর জামাল অভিযোগ করেন, শহিদুল টাকা দিয়ে তাঁর জালও নিয়ে এসেছেন। এ নিয়ে তাঁদের মধ্যে হাতাহাতির ঘটনাও ঘটে বলে স্থানীয় সূত্র জানিয়েছে।
এদিকে পূর্ব কালাইয়া গ্রামের বাসিন্দা সোহাগের অভিযোগ, নদীতে জাল ফেলার পর চরফেডারেশন এলাকায় অবস্থানকালে নৌ পুলিশ তাঁর জাল জব্দ করে। পরে সেই জাল চন্দ্রদ্বীপ ইউনিয়নের কালা রাশেদ নামের এক ব্যক্তির কাছে বিক্রি করা হয় বলে তিনি দাবি করেন।
নাম প্রকাশ না করার শর্তে চরকালাইয়া গ্রামের আরেক জেলে বলেন, শনিবার নদীতে জাল ফেলে তিনি চরে অপেক্ষা করছিলেন। এ সময় নৌ পুলিশের ট্রলার তাঁর জাল তুলে নেয়। পরে সংশ্লিষ্ট এক পুলিশ কর্মকর্তার সঙ্গে যোগাযোগের পর ১ হাজার ৫০০ টাকার বিনিময়ে জাল ফেরত পান বলে তাঁর দাবি।
অভিযোগকারীদের আরও দাবি, অভিযানে জব্দ করা জাল ও মাছ ট্রলারচালক জালাল গাজীর কাছে রাখা হতো। পরে সেগুলো বিক্রি করে পাওয়া অর্থ সংশ্লিষ্টদের কাছে পৌঁছে দেওয়া হতো এবং এর বিনিময়ে কমিশন দেওয়া হতো। তবে এই অভিযোগের পক্ষে আর্থিক লেনদেনের নথি বা স্বাধীনভাবে যাচাই করা প্রমাণ পাওয়া গেছে কি না, তা নিশ্চিত হওয়া যায়নি।
টাকার বিনিময়ে জেলে ও তাঁদের নৌকা-জাল ছেড়ে দেওয়া এবং জব্দ করা মাছ ও জাল বিক্রির অভিযোগ অস্বীকার করেছেন কালাইয়া নৌ পুলিশ ফাঁড়ির ইনচার্জ এসআই মো. মনিরুজ্জামান তালুকদার ও এএসআই কবির হোসেন। তাঁদের দাবি, এসব অভিযোগ মিথ্যা।
তবে অভিযোগের বিষয়ে বরিশাল অঞ্চল নৌ পুলিশের পুলিশ সুপার এসএম নাজমুল হক বলেন, “সুনির্দিষ্ট অভিযোগ পেলে তদন্ত করে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।”
অন্যদিকে সিনিয়র উপজেলা মৎস্য কর্মকর্তা এম এম পারভেজ বলেন, নৌ পুলিশ ও মৎস্য বিভাগের যৌথভাবে অভিযান পরিচালনা করার কথা। কিন্তু নৌ পুলিশ পৃথকভাবে অভিযান পরিচালনা করায় সমন্বয়হীনতা দেখা দিয়েছে। অভিযানের স্বচ্ছতা নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে। বিষয়টি ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে অবহিত করা হবে বলে জানান তিনি।
মা ইলিশ সংরক্ষণে নিষেধাজ্ঞার মূল উদ্দেশ্য হলো ইলিশের প্রজনন নিশ্চিত করা এবং ভবিষ্যতে মাছের উৎপাদন ধরে রাখা। এ সময়ে নদীতে অবৈধ মাছ শিকার বন্ধ করা সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের দায়িত্ব। কিন্তু অভিযানের মধ্যেই যদি অর্থের বিনিময়ে মাছ ধরার সুযোগ দেওয়া বা জব্দ করা সরঞ্জাম বিক্রির অভিযোগ ওঠে, তাহলে নিষেধাজ্ঞা বাস্তবায়নের কার্যকারিতা নিয়ে প্রশ্ন তৈরি হওয়া স্বাভাবিক।
বাউফলের তেঁতুলিয়া নদীতে ওঠা এসব অভিযোগের সত্যতা নির্ধারণে নিরপেক্ষ তদন্ত, অভিযানের সরকারি নথি যাচাই, জব্দ করা জাল ও মাছের হিসাব পরীক্ষা এবং অভিযোগকারী জেলেদের বক্তব্য গ্রহণ জরুরি। একই সঙ্গে অভিযুক্ত পুলিশ সদস্যদের বক্তব্য ও আত্মপক্ষ সমর্থনের সুযোগ নিশ্চিত করাও প্রয়োজন।
অভিযোগ প্রমাণিত হলে সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে আইন ও বিধি অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া দরকার। আর অভিযোগের সত্যতা না মিললে তদন্তের মাধ্যমে সেটিও স্পষ্ট করা উচিত। মা ইলিশ রক্ষার মতো গুরুত্বপূর্ণ কর্মসূচিতে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি নিশ্চিত না হলে নদী রক্ষার উদ্যোগ প্রশ্নবিদ্ধ হওয়ার আশঙ্কা থেকেই যায়।'
আগামী তিন মাসের মধ্যে ভাঙ্গা-বরিশাল চার লেন সড়ক প্রকল্প জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের নির্বাহী কমিটির (একনেক) অনুমোদন পেতে পারে বলে জানিয়েছেন পরিকল্পনা প্রতিমন্ত্রী জোনায়েদ সাকী। একই সঙ্গে বরিশাল-কুয়াকাটা মহাসড়ক চার লেনে উন্নীত করার পরিকল্পনার কথাও জানিয়েছেন তিনি। এসব উদ্যোগ বাস্তবায়িত হলে দক্ষিণাঞ্চলের সড়ক যোগাযোগ ও পর্যটন খাতে বড় ধরনের পরিবর্তন আসবে বলে আশা করা হচ্ছে।
শুক্রবার (২৩ অক্টোবর) দুপুর ১২টায় কুয়াকাটায় দুই দিনব্যাপী পর্যটন কার্নিভালে যোগ দিয়ে সাংবাদিকদের সঙ্গে মতবিনিময় সভায় এসব কথা বলেন প্রতিমন্ত্রী।
জোনায়েদ সাকী বলেন, ভাঙ্গা-বরিশাল চার লেন সড়ক প্রকল্প আগামী তিন মাসের মধ্যে একনেকে অনুমোদন পেতে পারে। প্রকল্পটি বাস্তবায়িত হলে কুয়াকাটাসহ দক্ষিণাঞ্চলের বিভিন্ন এলাকার সঙ্গে সড়ক যোগাযোগে বৈপ্লবিক পরিবর্তন আসবে। পাশাপাশি বরিশাল থেকে কুয়াকাটা পর্যন্ত সড়ক চার লেনে উন্নীত করার পরিকল্পনাও রয়েছে সরকারের।
তিনি আরও বলেন, বর্তমান সরকার সব ধরনের উন্নয়ন কর্মকাণ্ড মাস্টারপ্ল্যানের আওতায় নেওয়ার উদ্যোগ নিয়েছে। পরিকল্পিতভাবে প্রকল্প গ্রহণ ও বাস্তবায়ন করা হলে দীর্ঘসূত্রিতা কমবে এবং উন্নয়ন কার্যক্রম আরও কার্যকর হবে।
মতবিনিময় সভায় বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটনমন্ত্রী এম রশিদুজ্জামান মিল্লাত, পটুয়াখালী-৪ আসনের সংসদ সদস্য এবিএম মোশাররফ হোসেনসহ বরিশাল ও পটুয়াখালী জেলা প্রশাসনের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন।