Google AdSense
This is a demo ad. Your live ads will be displayed here once AdSense is properly configured.
Google AdSense
This is a demo ad. Your live ads will be displayed here once AdSense is properly configured.

২৬ জুলাই, ২০২৫ ১৩:০৪
ঢাকা-বরিশাল-ঢাকা রুটে বাংলাদেশ বিমানের সর্বশেষ ফ্লাইটটিও আজ বন্ধ হয়ে গেলো। এর আগে বন্ধ হয়েছিল ইউএস-বাংলা এয়ারলাইন্স এবং নভো এয়ারের বিমান। আমার কাছে এই ঘটনা অত্যন্ত বেদনাদায়ক হলেও অপ্রত্যাশিত ছিল না। ২০২২ সালের জুন মাসে পদ্মাসেতু চালু হওয়ার পরেই ভবিষ্যৎবাণী করেছিলাম- 'বরিশাল রুটে বিমানে যাত্রী কমতে কমতে একদিন সম্পূর্ণ বন্ধ হয়ে যাবে।' বাবুগঞ্জের একজন গুণীজন অবশ্য আমার সাথে চ্যালেঞ্জ করে বলেছিলেন- 'বিমানের যাত্রীরা বাসে চড়বে না। তাই লঞ্চের যাত্রী কমলেও বিমানের যাত্রী কমবে না। বিমান কখনোই বন্ধ হবে না।' ২০২২ সালে পদ্মাসেতু চালুর সময় ঢাকা-বরিশাল-ঢাকা রুটে সরকারি বাংলাদেশ বিমান এবং বেসরকারি ইউএস-বাংলা ও নভো এয়ারের তিনটি ফ্লাইট নিয়মিত চলাচল করতো। এরমধ্যে ইউএস-বাংলা প্রতিদিন সকালে এবং বিকালে ডবল ট্রিপ দিতো। তবুও আগাম বুকিং করে না রাখলে টিকেট পাওয়া যেতো না। তখন সেই অবস্থা দেখেই হয়তো তিনি চ্যালেঞ্জ করেছিলেন। কিন্তু আজ ৩ বছরের মাথায় যাত্রী সংকটে একে একে ৩টি এয়ারলাইন্সের বিমানই বন্ধ হয়ে গেছে।
বিমানের পাশাপাশি পদ্মাসেতুর বিরাট প্রভাব পড়েছে বরিশালের নৌপথেও। ঢাকা-বরিশাল-ঢাকা নৌপথে প্রতিদিন চলাচলকারী বিলাসবহুল ৯-১০টা লঞ্চ থেকে যাত্রী কমতে কমতে এখন মাত্র ২টা লঞ্চে নেমেছে। রোটেশন পদ্ধতিতে প্রতিদিন ২টি লঞ্চ চললেও তাতে বিশেষ উপলক্ষ্য ছাড়া আশানুরূপ যাত্রী নেই। এই বাস্তবতা অনুধাবন করেই আমি সেদিন চ্যালেঞ্জ করে বলেছিলাম- 'পদ্মাসেতু চালুর পরে বরিশালে যদি ভারী শিল্প প্রতিষ্ঠান এবং বাণিজ্যিক কলকারখানা গড়ে না ওঠে তাহলে লঞ্চশিল্প হুমকির মুখে পড়বে এবং বরিশালে বিমান টিকবেই না।' শুধু পর্যটন কুয়াকাটাকে বেইজ করে ঢাকা-কুয়াকাটার মধ্যবর্তী জায়গা বরিশালে একটি বিমানবন্দর টিকে থাকার যৌক্তিক কোনো কারণ নেই। এই বিমানবন্দরের অবস্থান যদি পটুয়াখালী জেলার যেকোনো সুবিধাজনক স্থানে হতো তাহলে এটা কুয়াকাটা সমুদ্র সৈকত এবং পায়রা বন্দরের কল্যাণে মাথা উঁচু করেই টিকে থাকতো। বরিশালে ইকোনমি জোন অর্থাৎ শিল্পপ্রতিষ্ঠান ভিত্তিক অর্থনৈতিক অঞ্চল তৈরি না হলে বরিশালে বিমান টিকবে না এটা বুঝতে অর্থনীতি বিশেষজ্ঞ হওয়ার প্রয়োজন নেই।
বরিশাল বিভাগীয় শহর হলেও এখানে কোনো বেসরকারি শিল্প প্রতিষ্ঠান, কলকারখানা কিংবা সরকারি গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনা না থাকায় এই অঞ্চলে ভিআইপি-সিআইপিদের যাতায়াত নেই বললেই চলে। তাহলে ৪ থেকে ৫ হাজার টাকা ভাড়া দিয়ে বিমানে চড়বে কারা? বিমানে সাধারণ যাত্রী উঠবে কেন? শখ পূরণ করতে ৪-৫ হাজার টাকা ভাড়া দিয়ে কয়দিন সাধারণ মানুষ বিমানে চড়তে পারে? তাছাড়া কুয়াকাটার পর্যটকরা বিমানে উঠলে তাদের মিরপুর কিংবা মতিঝিল থেকে ঢাকার উত্তরা বিমানবন্দরে যেতে সময় লাগে ৩ ঘন্টা। আবার বরিশাল বিমানবন্দরে নেমে কুয়াকাটা যেতেও লাগে প্রায় আড়াই থেকে ৩ ঘন্টার বেশি। তাহলে পর্যটকরা তাদের কুয়াকাটা ভ্রমনের জন্য বিমানের অর্ধেক পথকে কেন বেছে নেবেন? পদ্মাসেতু চালুর পরে বরিশাল থেকে সড়কপথে রাজধানীর প্রাণকেন্দ্র গুলিস্তান বা মতিঝিল যেতে সময় লাগে সাড়ে ৩ ঘন্টা। এদিকে ঢাকার উত্তরায় বিমানবন্দরে নেমে যানজটের কারণে গুলিস্তান কিংবা মতিঝিল আসতে পিক আওয়ারে কখনো কখনো সময় লাগে ৩ ঘন্টার বেশি। বিমানে আকাশপথে বরিশাল থেকে ঢাকা যেতে মাত্র ২০ মিনিট সময় লাগলেও ঢাকার উত্তরা বিমানবন্দরে নেমে মতিঝিল, গুলিস্তান বা মিরপুরের গন্তব্যে যেতে সময় লাগে কমপক্ষে ২ থেকে কখনো ৩ ঘন্টার বেশি। একই সময়ে বরং সড়কপথে পদ্মাসেতুর উপর দিয়ে বরিশাল চলে আসা সহজ। তাহলে কোন সুবিধার জন্য যাত্রীরা বিমানকে বেছে নেবেন?
বিমানের নিয়মিত যাত্রীরা এখন পদ্মাসেতু পাড়ি দিয়েই নিজের প্রাইভেট কার নিয়ে ৩ থেকে সাড়ে ৩ ঘন্টায় বরিশাল চলে আসেন। যারা নিজের গাড়ি বরিশাল আনেন না তারা আসেন বিলাসবহুল সোহাগ পরিবহনের অত্যাধুনিক স্ক্যানিয়া বাস কিংবা গ্রীণলাইনের ভলভো গাড়িতে। অভ্যন্তরীণ ঢাকা-বরিশাল-ঢাকা রুটে চলাচলকারী ৬৭-৭০ আসনের বিমানগুলোর সিটের চেয়ে এসব গাড়ির সিট অনেক বেশি উন্নত, বিলাসবহুল এবং আরামদায়ক। ৪৫০০ টাকার একই সেবা ও সুবিধা যদি ১২০০ বা ১৫০০ টাকায় পাওয়া যায় তাহলে সময় এবং টাকার শ্রাদ্ধ করে মানুষ কেন বিমানে উঠবে? সঙ্গত কারণেই এখন ভ্রমনে আসা পর্যটকরা ঢাকা-কুয়াকাটা রুটের বিলাসবহুল ডাইরেক্ট বাসে কুয়াকাটা ভ্রমন করেন। বিমানবন্দর পটুয়াখালী কিংবা বরগুনা জেলার সুবিধাজনক স্থানে না নিলে বরিশাল বিভাগে আপাতত যাত্রীবাহী বিমানের স্থায়ী মৃত্যু সুনিশ্চিত। এটাই ভৌগোলিক এবং অর্থনৈতিক বাস্তবতা। ভবিষ্যতে বরিশাল কেন্দ্রিক বিভিন্ন সরকারি ও বেসরকারি বিনিয়োগ এবং শিল্প প্রতিষ্ঠান, কলকারখানা গড়ে না উঠলে নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টি হবে না। পিছিয়ে পড়বে প্রাচ্যের ভেনিস খ্যাত প্রাচীন সভ্যতার ঐতিহাসিক নগরী এই বরিশাল। বরিশালের আকাশে আর কখনোই উড়বে না যাত্রীবাহী বিমান। ভোলার গ্যাস বরিশালে এনে একটি শিল্পাঞ্চল গড়ে তুলতে এবং বরিশালের ছোট পর্যটন স্পটগুলো নিয়ে একটি পর্যটন জোন তৈরি করতে না পারলে বরিশালের আকাশপথে স্বপ্নের বিমান চিরতরে দাফন হয়ে যাবে। পরবর্তীতে কুয়াকাটা পর্যন্ত ৬ লেনের মহাসড়ক নির্মাণ সম্পন্ন হলে বরিশালের ঐতিহ্যবাহী লঞ্চের কুলখানিও সম্পন্ন হবে বলে আমার ধারণা। #
❑ লেখাঃ আরিফ আহমেদ মুন্না
সাংবাদিক, কলামিস্ট, কবি ও মানবাধিকারকর্মী।
বাবুগঞ্জঃ ২৬ জুলাই, ২০২৫ খ্রিস্টাব্দ।
ঢাকা-বরিশাল-ঢাকা রুটে বাংলাদেশ বিমানের সর্বশেষ ফ্লাইটটিও আজ বন্ধ হয়ে গেলো। এর আগে বন্ধ হয়েছিল ইউএস-বাংলা এয়ারলাইন্স এবং নভো এয়ারের বিমান। আমার কাছে এই ঘটনা অত্যন্ত বেদনাদায়ক হলেও অপ্রত্যাশিত ছিল না। ২০২২ সালের জুন মাসে পদ্মাসেতু চালু হওয়ার পরেই ভবিষ্যৎবাণী করেছিলাম- 'বরিশাল রুটে বিমানে যাত্রী কমতে কমতে একদিন সম্পূর্ণ বন্ধ হয়ে যাবে।' বাবুগঞ্জের একজন গুণীজন অবশ্য আমার সাথে চ্যালেঞ্জ করে বলেছিলেন- 'বিমানের যাত্রীরা বাসে চড়বে না। তাই লঞ্চের যাত্রী কমলেও বিমানের যাত্রী কমবে না। বিমান কখনোই বন্ধ হবে না।' ২০২২ সালে পদ্মাসেতু চালুর সময় ঢাকা-বরিশাল-ঢাকা রুটে সরকারি বাংলাদেশ বিমান এবং বেসরকারি ইউএস-বাংলা ও নভো এয়ারের তিনটি ফ্লাইট নিয়মিত চলাচল করতো। এরমধ্যে ইউএস-বাংলা প্রতিদিন সকালে এবং বিকালে ডবল ট্রিপ দিতো। তবুও আগাম বুকিং করে না রাখলে টিকেট পাওয়া যেতো না। তখন সেই অবস্থা দেখেই হয়তো তিনি চ্যালেঞ্জ করেছিলেন। কিন্তু আজ ৩ বছরের মাথায় যাত্রী সংকটে একে একে ৩টি এয়ারলাইন্সের বিমানই বন্ধ হয়ে গেছে।
বিমানের পাশাপাশি পদ্মাসেতুর বিরাট প্রভাব পড়েছে বরিশালের নৌপথেও। ঢাকা-বরিশাল-ঢাকা নৌপথে প্রতিদিন চলাচলকারী বিলাসবহুল ৯-১০টা লঞ্চ থেকে যাত্রী কমতে কমতে এখন মাত্র ২টা লঞ্চে নেমেছে। রোটেশন পদ্ধতিতে প্রতিদিন ২টি লঞ্চ চললেও তাতে বিশেষ উপলক্ষ্য ছাড়া আশানুরূপ যাত্রী নেই। এই বাস্তবতা অনুধাবন করেই আমি সেদিন চ্যালেঞ্জ করে বলেছিলাম- 'পদ্মাসেতু চালুর পরে বরিশালে যদি ভারী শিল্প প্রতিষ্ঠান এবং বাণিজ্যিক কলকারখানা গড়ে না ওঠে তাহলে লঞ্চশিল্প হুমকির মুখে পড়বে এবং বরিশালে বিমান টিকবেই না।' শুধু পর্যটন কুয়াকাটাকে বেইজ করে ঢাকা-কুয়াকাটার মধ্যবর্তী জায়গা বরিশালে একটি বিমানবন্দর টিকে থাকার যৌক্তিক কোনো কারণ নেই। এই বিমানবন্দরের অবস্থান যদি পটুয়াখালী জেলার যেকোনো সুবিধাজনক স্থানে হতো তাহলে এটা কুয়াকাটা সমুদ্র সৈকত এবং পায়রা বন্দরের কল্যাণে মাথা উঁচু করেই টিকে থাকতো। বরিশালে ইকোনমি জোন অর্থাৎ শিল্পপ্রতিষ্ঠান ভিত্তিক অর্থনৈতিক অঞ্চল তৈরি না হলে বরিশালে বিমান টিকবে না এটা বুঝতে অর্থনীতি বিশেষজ্ঞ হওয়ার প্রয়োজন নেই।
বরিশাল বিভাগীয় শহর হলেও এখানে কোনো বেসরকারি শিল্প প্রতিষ্ঠান, কলকারখানা কিংবা সরকারি গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনা না থাকায় এই অঞ্চলে ভিআইপি-সিআইপিদের যাতায়াত নেই বললেই চলে। তাহলে ৪ থেকে ৫ হাজার টাকা ভাড়া দিয়ে বিমানে চড়বে কারা? বিমানে সাধারণ যাত্রী উঠবে কেন? শখ পূরণ করতে ৪-৫ হাজার টাকা ভাড়া দিয়ে কয়দিন সাধারণ মানুষ বিমানে চড়তে পারে? তাছাড়া কুয়াকাটার পর্যটকরা বিমানে উঠলে তাদের মিরপুর কিংবা মতিঝিল থেকে ঢাকার উত্তরা বিমানবন্দরে যেতে সময় লাগে ৩ ঘন্টা। আবার বরিশাল বিমানবন্দরে নেমে কুয়াকাটা যেতেও লাগে প্রায় আড়াই থেকে ৩ ঘন্টার বেশি। তাহলে পর্যটকরা তাদের কুয়াকাটা ভ্রমনের জন্য বিমানের অর্ধেক পথকে কেন বেছে নেবেন? পদ্মাসেতু চালুর পরে বরিশাল থেকে সড়কপথে রাজধানীর প্রাণকেন্দ্র গুলিস্তান বা মতিঝিল যেতে সময় লাগে সাড়ে ৩ ঘন্টা। এদিকে ঢাকার উত্তরায় বিমানবন্দরে নেমে যানজটের কারণে গুলিস্তান কিংবা মতিঝিল আসতে পিক আওয়ারে কখনো কখনো সময় লাগে ৩ ঘন্টার বেশি। বিমানে আকাশপথে বরিশাল থেকে ঢাকা যেতে মাত্র ২০ মিনিট সময় লাগলেও ঢাকার উত্তরা বিমানবন্দরে নেমে মতিঝিল, গুলিস্তান বা মিরপুরের গন্তব্যে যেতে সময় লাগে কমপক্ষে ২ থেকে কখনো ৩ ঘন্টার বেশি। একই সময়ে বরং সড়কপথে পদ্মাসেতুর উপর দিয়ে বরিশাল চলে আসা সহজ। তাহলে কোন সুবিধার জন্য যাত্রীরা বিমানকে বেছে নেবেন?
বিমানের নিয়মিত যাত্রীরা এখন পদ্মাসেতু পাড়ি দিয়েই নিজের প্রাইভেট কার নিয়ে ৩ থেকে সাড়ে ৩ ঘন্টায় বরিশাল চলে আসেন। যারা নিজের গাড়ি বরিশাল আনেন না তারা আসেন বিলাসবহুল সোহাগ পরিবহনের অত্যাধুনিক স্ক্যানিয়া বাস কিংবা গ্রীণলাইনের ভলভো গাড়িতে। অভ্যন্তরীণ ঢাকা-বরিশাল-ঢাকা রুটে চলাচলকারী ৬৭-৭০ আসনের বিমানগুলোর সিটের চেয়ে এসব গাড়ির সিট অনেক বেশি উন্নত, বিলাসবহুল এবং আরামদায়ক। ৪৫০০ টাকার একই সেবা ও সুবিধা যদি ১২০০ বা ১৫০০ টাকায় পাওয়া যায় তাহলে সময় এবং টাকার শ্রাদ্ধ করে মানুষ কেন বিমানে উঠবে? সঙ্গত কারণেই এখন ভ্রমনে আসা পর্যটকরা ঢাকা-কুয়াকাটা রুটের বিলাসবহুল ডাইরেক্ট বাসে কুয়াকাটা ভ্রমন করেন। বিমানবন্দর পটুয়াখালী কিংবা বরগুনা জেলার সুবিধাজনক স্থানে না নিলে বরিশাল বিভাগে আপাতত যাত্রীবাহী বিমানের স্থায়ী মৃত্যু সুনিশ্চিত। এটাই ভৌগোলিক এবং অর্থনৈতিক বাস্তবতা। ভবিষ্যতে বরিশাল কেন্দ্রিক বিভিন্ন সরকারি ও বেসরকারি বিনিয়োগ এবং শিল্প প্রতিষ্ঠান, কলকারখানা গড়ে না উঠলে নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টি হবে না। পিছিয়ে পড়বে প্রাচ্যের ভেনিস খ্যাত প্রাচীন সভ্যতার ঐতিহাসিক নগরী এই বরিশাল। বরিশালের আকাশে আর কখনোই উড়বে না যাত্রীবাহী বিমান। ভোলার গ্যাস বরিশালে এনে একটি শিল্পাঞ্চল গড়ে তুলতে এবং বরিশালের ছোট পর্যটন স্পটগুলো নিয়ে একটি পর্যটন জোন তৈরি করতে না পারলে বরিশালের আকাশপথে স্বপ্নের বিমান চিরতরে দাফন হয়ে যাবে। পরবর্তীতে কুয়াকাটা পর্যন্ত ৬ লেনের মহাসড়ক নির্মাণ সম্পন্ন হলে বরিশালের ঐতিহ্যবাহী লঞ্চের কুলখানিও সম্পন্ন হবে বলে আমার ধারণা। #
❑ লেখাঃ আরিফ আহমেদ মুন্না
সাংবাদিক, কলামিস্ট, কবি ও মানবাধিকারকর্মী।
বাবুগঞ্জঃ ২৬ জুলাই, ২০২৫ খ্রিস্টাব্দ।

১৪ মার্চ, ২০২৬ ১৪:৪৭

০৭ মার্চ, ২০২৬ ১৪:৩৮

২৭ ফেব্রুয়ারি, ২০২৬ ০১:৩১
একটি সুস্থ সমাজ ও রাষ্ট্রের মেরুদণ্ড হলো তার সচেতন ও বিবেকবান নাগরিক সমাজ। কিন্তু বর্তমান সময়ের রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে একটি নেতিবাচক সংস্কৃতি অত্যন্ত প্রকট হয়ে উঠেছে, তা হলো ‘পদলেহন’ বা অন্ধ তোষামোদ। শাসক দলের নেতাদের তুষ্ট করে ব্যক্তিগত ফায়দা হাসিলের এই প্রবণতা কেবল একজন ব্যক্তির নৈতিক স্থলন ঘটায় না, বরং গোটা জাতির বিবেককে পঙ্গু করে দেয়।
[ব্যক্তিত্বের অবমাননা ও নৈতিক সংকট]
মানুষের সবচেয়ে বড় সম্পদ তার আত্মসম্মানবোধ। যখন কোনো ব্যক্তি স্রেফ ক্ষমতার কাছাকাছি থাকার জন্য বা কোনো বৈষয়িক লাভের আশায় কোনো নেতার অন্যায্য কাজের প্রশংসা করেন বা চাটুকারিতা করেন, তখন তিনি মূলত নিজের ব্যক্তিত্বকেই হত্যা করেন। পদলেহনকারী ব্যক্তি কখনোই স্বাধীনভাবে চিন্তা করতে পারেন না। তার প্রতিটি শব্দ ও কাজ পরিচালিত হয় অন্যের ইশারায়। এই দাসত্ব মানসিকতা মানুষের সহজাত সৃজনশীলতা ও সত্য বলার সাহস কেড়ে নেয়।
[গণতন্ত্রের জন্য হুমকি]
গণতন্ত্রের মূল ভিত্তি হলো সমালোচনা ও জবাবদিহিতা। শাসক দলের ভুলত্রুটি ধরিয়ে দেওয়া এবং জনস্বার্থে গঠনমূলক সমালোচনা করা প্রতিটি নাগরিকের দায়িত্ব। কিন্তু যখন চারদিকে শুধু ‘জি-হুজুর’ বলা মানুষের ভিড় বাড়ে, তখন শাসকরা নিজেদের অপরাজেয় এবং অভ্রান্ত ভাবতে শুরু করেন। তোষামোদকারীরা নেতাদের সামনে সত্যের আয়না ধরতে দেয় না, ফলে শাসকরা জনবিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েন। ইতিহাসে দেখা গেছে, যে শাসকের চারপাশে চাটুকারের সংখ্যা যত বেশি, তার পতন তত দ্রুত ও করুণ হয়েছে। কারণ, বিপদের সময় এই পদলেহনকারীরাই সবার আগে পক্ষ ত্যাগ করে।
[সমাজের ওপর নেতিবাচক প্রভাব]
একটি সমাজে যখন পদলেহনকারীরা পুরস্কৃত হয় এবং সত্যবাদীরা কোণঠাসা হয়, তখন তরুণ প্রজন্মের কাছে ভুল বার্তা যায়। তারা মনে করতে শুরু করে যে মেধা, যোগ্যতা বা সততা দিয়ে নয়, বরং দালালি আর তেলবাজি করেই জীবনে সফল হওয়া সম্ভব। এর ফলে পেশাদারিত্ব নষ্ট হয় এবং অযোগ্য মানুষরা গুরুত্বপূর্ণ সব স্থান দখল করে নেয়। দীর্ঘমেয়াদে এটি রাষ্ট্রকে মেধাশূন্য করে ফেলে।
[আদর্শিক অবস্থান ও সমাধান]
নেতাদের প্রতি শ্রদ্ধা থাকা ভালো, কিন্তু সেই শ্রদ্ধা যেন দাসে পরিণত না করে। একজন প্রকৃত দেশপ্রেমিক নেতার অন্ধ অনুসারী না হয়ে তার আদর্শের অনুসারী হন। সত্যকে সত্য বলা এবং মিথ্যাকে মিথ্যা বলার সাহস রাখাটাই হলো প্রকৃত বীরত্ব। শাসক দলের নেতাদের তুষ্ট করার চেয়ে জনকল্যাণ ও ন্যায়ের পথে অটল থাকা অনেক বেশি সম্মানজনক।
মনে রাখতে হবে, ক্ষমতা চিরস্থায়ী নয়। আজ যিনি ক্ষমতার শীর্ষে, কাল তিনি সাধারণ নাগরিক। কিন্তু আপনার মেরুদণ্ড এবং বিবেক যদি আপনি বিকিয়ে দেন, তবে সেই ক্ষতি কোনোদিন পূরণ হওয়ার নয়। ইতিহাসে সেই সব মানুষই অমর হয়ে থাকেন, যারা ক্ষমতার দাপটে মাথা নত করেননি, বরং মাথা উঁচু করে সত্যের জয়গান গেয়েছেন।
লেখক হাসিবুল ইসলাম
সভাপতি, নিউজ এডিটরস্ কাউন্সিল, বরিশাল, বরিশাল ব্যুরো চিফ দৈনিক রূপালী বাংলাদেশ এবং বার্তা সম্পাদক বরিশালটাইমস।
একটি সুস্থ সমাজ ও রাষ্ট্রের মেরুদণ্ড হলো তার সচেতন ও বিবেকবান নাগরিক সমাজ। কিন্তু বর্তমান সময়ের রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে একটি নেতিবাচক সংস্কৃতি অত্যন্ত প্রকট হয়ে উঠেছে, তা হলো ‘পদলেহন’ বা অন্ধ তোষামোদ। শাসক দলের নেতাদের তুষ্ট করে ব্যক্তিগত ফায়দা হাসিলের এই প্রবণতা কেবল একজন ব্যক্তির নৈতিক স্থলন ঘটায় না, বরং গোটা জাতির বিবেককে পঙ্গু করে দেয়।
[ব্যক্তিত্বের অবমাননা ও নৈতিক সংকট]
মানুষের সবচেয়ে বড় সম্পদ তার আত্মসম্মানবোধ। যখন কোনো ব্যক্তি স্রেফ ক্ষমতার কাছাকাছি থাকার জন্য বা কোনো বৈষয়িক লাভের আশায় কোনো নেতার অন্যায্য কাজের প্রশংসা করেন বা চাটুকারিতা করেন, তখন তিনি মূলত নিজের ব্যক্তিত্বকেই হত্যা করেন। পদলেহনকারী ব্যক্তি কখনোই স্বাধীনভাবে চিন্তা করতে পারেন না। তার প্রতিটি শব্দ ও কাজ পরিচালিত হয় অন্যের ইশারায়। এই দাসত্ব মানসিকতা মানুষের সহজাত সৃজনশীলতা ও সত্য বলার সাহস কেড়ে নেয়।
[গণতন্ত্রের জন্য হুমকি]
গণতন্ত্রের মূল ভিত্তি হলো সমালোচনা ও জবাবদিহিতা। শাসক দলের ভুলত্রুটি ধরিয়ে দেওয়া এবং জনস্বার্থে গঠনমূলক সমালোচনা করা প্রতিটি নাগরিকের দায়িত্ব। কিন্তু যখন চারদিকে শুধু ‘জি-হুজুর’ বলা মানুষের ভিড় বাড়ে, তখন শাসকরা নিজেদের অপরাজেয় এবং অভ্রান্ত ভাবতে শুরু করেন। তোষামোদকারীরা নেতাদের সামনে সত্যের আয়না ধরতে দেয় না, ফলে শাসকরা জনবিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েন। ইতিহাসে দেখা গেছে, যে শাসকের চারপাশে চাটুকারের সংখ্যা যত বেশি, তার পতন তত দ্রুত ও করুণ হয়েছে। কারণ, বিপদের সময় এই পদলেহনকারীরাই সবার আগে পক্ষ ত্যাগ করে।
[সমাজের ওপর নেতিবাচক প্রভাব]
একটি সমাজে যখন পদলেহনকারীরা পুরস্কৃত হয় এবং সত্যবাদীরা কোণঠাসা হয়, তখন তরুণ প্রজন্মের কাছে ভুল বার্তা যায়। তারা মনে করতে শুরু করে যে মেধা, যোগ্যতা বা সততা দিয়ে নয়, বরং দালালি আর তেলবাজি করেই জীবনে সফল হওয়া সম্ভব। এর ফলে পেশাদারিত্ব নষ্ট হয় এবং অযোগ্য মানুষরা গুরুত্বপূর্ণ সব স্থান দখল করে নেয়। দীর্ঘমেয়াদে এটি রাষ্ট্রকে মেধাশূন্য করে ফেলে।
[আদর্শিক অবস্থান ও সমাধান]
নেতাদের প্রতি শ্রদ্ধা থাকা ভালো, কিন্তু সেই শ্রদ্ধা যেন দাসে পরিণত না করে। একজন প্রকৃত দেশপ্রেমিক নেতার অন্ধ অনুসারী না হয়ে তার আদর্শের অনুসারী হন। সত্যকে সত্য বলা এবং মিথ্যাকে মিথ্যা বলার সাহস রাখাটাই হলো প্রকৃত বীরত্ব। শাসক দলের নেতাদের তুষ্ট করার চেয়ে জনকল্যাণ ও ন্যায়ের পথে অটল থাকা অনেক বেশি সম্মানজনক।
মনে রাখতে হবে, ক্ষমতা চিরস্থায়ী নয়। আজ যিনি ক্ষমতার শীর্ষে, কাল তিনি সাধারণ নাগরিক। কিন্তু আপনার মেরুদণ্ড এবং বিবেক যদি আপনি বিকিয়ে দেন, তবে সেই ক্ষতি কোনোদিন পূরণ হওয়ার নয়। ইতিহাসে সেই সব মানুষই অমর হয়ে থাকেন, যারা ক্ষমতার দাপটে মাথা নত করেননি, বরং মাথা উঁচু করে সত্যের জয়গান গেয়েছেন।
লেখক হাসিবুল ইসলাম
সভাপতি, নিউজ এডিটরস্ কাউন্সিল, বরিশাল, বরিশাল ব্যুরো চিফ দৈনিক রূপালী বাংলাদেশ এবং বার্তা সম্পাদক বরিশালটাইমস।
ইসলামের ইতিহাসে ১৭ই রমজান এক অনন্য ও গৌরবোজ্জ্বল দিন। আজ থেকে প্রায় দেড় হাজার বছর আগে দ্বিতীয় হিজরির এই দিনে মদিনার অদূরে বদর প্রান্তরে সংঘটিত হয়েছিল বিশ্বাস ও অবিশ্বাসের এক চূড়ান্ত লড়াই। যা ইতিহাসে 'বদর যুদ্ধ' নামে পরিচিত। এই যুদ্ধ কেবল দুটি দলের লড়াই ছিল না, বরং এটি ছিল সত্য ও মিথ্যার মধ্যকার পার্থক্যকারী এক মহাসংগ্রাম। আল-কুরআনে এই দিনটিকে 'ইয়াওমুল ফুরকান' বা সত্য-মিথ্যা নির্ধারণকারী দিন হিসেবে অভিহিত করা হয়েছে।
অসম লড়াইয়ের প্রেক্ষাপট:
বদরের যুদ্ধ ছিল লোকবল ও সমরশক্তির বিচারে সম্পূর্ণ অসম। একদিকে মক্কার কুরাইশদের এক হাজার সুসজ্জিত সৈন্যের বিশাল বাহিনী, যাদের ছিল পর্যাপ্ত অস্ত্রশস্ত্র, উট ও ঘোড়া। অন্যদিকে বিশ্বনবী হযরত মুহাম্মদ (সা.)-এর নেতৃত্বে মাত্র ৩১৩ জন সাহাবীর একটি ছোট দল। তাঁদের কাছে ছিল মাত্র দুটি ঘোড়া এবং ৭০টি উট। কিন্তু সংখ্যা বা অস্ত্রের চেয়ে বড় ছিল তাঁদের অটুট ঈমান এবং আল্লাহর প্রতি অবিচল ভরসা।
আল্লাহর সাহায্য ও বিজয়:
রণক্ষেত্রে ৩১৩ জন মুজাহিদ আল্লাহর অসীম সাহায্যে মক্কার প্রতাপশালী বাহিনীকে শোচনীয়ভাবে পরাজিত করেন। মহান আল্লাহ ফেরেশতাদের পাঠিয়ে মুমিনদের সাহায্য করেছিলেন। যুদ্ধে কুরাইশদের প্রধান আবু জাহেলসহ ৭০ জন শীর্ষ নেতা নিহত হয় এবং আরও ৭০ জন বন্দী হয়। বিপরীতে মাত্র ১৪ জন সাহাবী শাহাদাত বরণ করেন। এই বিজয় প্রমাণ করে যে, সংখ্যা বা সাজসরঞ্জাম নয়, বরং আল্লাহর সাহায্য ও সঠিক আদর্শই হলো প্রকৃত শক্তির উৎস।
বদরের যুদ্ধের শিক্ষা ও তাৎপর্য:
বদর দিবস আমাদের বর্তমান সময়ের মুসলমানদের জন্যও গভীর শিক্ষা বহন করে:
১. ঈমানি শক্তিই আসল শক্তি: সংখ্যায় কম হলেও যদি লক্ষ্য সঠিক থাকে এবং আল্লাহর ওপর পূর্ণ আস্থা থাকে, তবে জয় নিশ্চিত। বদর আমাদের শেখায় যে, জাগতিক উপকরণের চেয়ে আত্মিক শক্তি অনেক বেশি প্রভাবশালী।
২. বিপদে ধৈর্য ও প্রার্থনা: যুদ্ধের কঠিন মুহূর্তে নবীজি (সা.) আল্লাহর দরবারে যেভাবে রোনাজারি করেছিলেন, তা আমাদের শেখায় যে কোনো সংকটে সবার আগে স্রষ্টার মুখাপেক্ষী হতে হবে।
৩. অন্যায়ের বিরুদ্ধে আপসহীনতা: সত্যের পথে টিকে থাকতে হলে অন্যায়ের কাছে মাথা নত করা যাবে না। মুমিনরা যুগে যুগে বদরের চেতনা নিয়ে জুলুম ও শোষণের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়াবে—এটাই এই দিবসের মূল বার্তা।
বর্তমান বিশ্বে যেখানে মুসলমানরা নানা সংকটের মুখোমুখি, সেখানে বদর দিবসের চেতনা অত্যন্ত প্রাসঙ্গিক। বদর আমাদের অলসতা ত্যাগ করে ত্যাগের মহিমায় উজ্জীবিত হতে শেখায়। সত্যের পথে অটল থাকা এবং এক আল্লাহর ওপর ভরসা রেখে এগিয়ে যাওয়ার নামই হলো বদর। এই দিনটি আমাদের প্রতিবছর মনে করিয়ে দেয় যে, অন্ধকারের শক্তি যতই প্রবল হোক না কেন, সত্যের আলোয় তা একদিন দূরীভূত হবেই।
লেখক: মাওলানা মির্জা নাইমুল হাসান বেগ।
ইসলামের ইতিহাসে ১৭ই রমজান এক অনন্য ও গৌরবোজ্জ্বল দিন। আজ থেকে প্রায় দেড় হাজার বছর আগে দ্বিতীয় হিজরির এই দিনে মদিনার অদূরে বদর প্রান্তরে সংঘটিত হয়েছিল বিশ্বাস ও অবিশ্বাসের এক চূড়ান্ত লড়াই। যা ইতিহাসে 'বদর যুদ্ধ' নামে পরিচিত। এই যুদ্ধ কেবল দুটি দলের লড়াই ছিল না, বরং এটি ছিল সত্য ও মিথ্যার মধ্যকার পার্থক্যকারী এক মহাসংগ্রাম। আল-কুরআনে এই দিনটিকে 'ইয়াওমুল ফুরকান' বা সত্য-মিথ্যা নির্ধারণকারী দিন হিসেবে অভিহিত করা হয়েছে।
অসম লড়াইয়ের প্রেক্ষাপট:
বদরের যুদ্ধ ছিল লোকবল ও সমরশক্তির বিচারে সম্পূর্ণ অসম। একদিকে মক্কার কুরাইশদের এক হাজার সুসজ্জিত সৈন্যের বিশাল বাহিনী, যাদের ছিল পর্যাপ্ত অস্ত্রশস্ত্র, উট ও ঘোড়া। অন্যদিকে বিশ্বনবী হযরত মুহাম্মদ (সা.)-এর নেতৃত্বে মাত্র ৩১৩ জন সাহাবীর একটি ছোট দল। তাঁদের কাছে ছিল মাত্র দুটি ঘোড়া এবং ৭০টি উট। কিন্তু সংখ্যা বা অস্ত্রের চেয়ে বড় ছিল তাঁদের অটুট ঈমান এবং আল্লাহর প্রতি অবিচল ভরসা।
আল্লাহর সাহায্য ও বিজয়:
রণক্ষেত্রে ৩১৩ জন মুজাহিদ আল্লাহর অসীম সাহায্যে মক্কার প্রতাপশালী বাহিনীকে শোচনীয়ভাবে পরাজিত করেন। মহান আল্লাহ ফেরেশতাদের পাঠিয়ে মুমিনদের সাহায্য করেছিলেন। যুদ্ধে কুরাইশদের প্রধান আবু জাহেলসহ ৭০ জন শীর্ষ নেতা নিহত হয় এবং আরও ৭০ জন বন্দী হয়। বিপরীতে মাত্র ১৪ জন সাহাবী শাহাদাত বরণ করেন। এই বিজয় প্রমাণ করে যে, সংখ্যা বা সাজসরঞ্জাম নয়, বরং আল্লাহর সাহায্য ও সঠিক আদর্শই হলো প্রকৃত শক্তির উৎস।
বদরের যুদ্ধের শিক্ষা ও তাৎপর্য:
বদর দিবস আমাদের বর্তমান সময়ের মুসলমানদের জন্যও গভীর শিক্ষা বহন করে:
১. ঈমানি শক্তিই আসল শক্তি: সংখ্যায় কম হলেও যদি লক্ষ্য সঠিক থাকে এবং আল্লাহর ওপর পূর্ণ আস্থা থাকে, তবে জয় নিশ্চিত। বদর আমাদের শেখায় যে, জাগতিক উপকরণের চেয়ে আত্মিক শক্তি অনেক বেশি প্রভাবশালী।
২. বিপদে ধৈর্য ও প্রার্থনা: যুদ্ধের কঠিন মুহূর্তে নবীজি (সা.) আল্লাহর দরবারে যেভাবে রোনাজারি করেছিলেন, তা আমাদের শেখায় যে কোনো সংকটে সবার আগে স্রষ্টার মুখাপেক্ষী হতে হবে।
৩. অন্যায়ের বিরুদ্ধে আপসহীনতা: সত্যের পথে টিকে থাকতে হলে অন্যায়ের কাছে মাথা নত করা যাবে না। মুমিনরা যুগে যুগে বদরের চেতনা নিয়ে জুলুম ও শোষণের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়াবে—এটাই এই দিবসের মূল বার্তা।
বর্তমান বিশ্বে যেখানে মুসলমানরা নানা সংকটের মুখোমুখি, সেখানে বদর দিবসের চেতনা অত্যন্ত প্রাসঙ্গিক। বদর আমাদের অলসতা ত্যাগ করে ত্যাগের মহিমায় উজ্জীবিত হতে শেখায়। সত্যের পথে অটল থাকা এবং এক আল্লাহর ওপর ভরসা রেখে এগিয়ে যাওয়ার নামই হলো বদর। এই দিনটি আমাদের প্রতিবছর মনে করিয়ে দেয় যে, অন্ধকারের শক্তি যতই প্রবল হোক না কেন, সত্যের আলোয় তা একদিন দূরীভূত হবেই।
লেখক: মাওলানা মির্জা নাইমুল হাসান বেগ।
সংগীত যখন কেবল বিনোদনের গণ্ডি পেরিয়ে একটি জাতির অস্তিত্ব রক্ষার দালিলিক হাতিয়ার হয়ে ওঠে, তখন শিল্পী আর স্রষ্টার লৌকিক পরিচয় ছাপিয়ে তা এক চিরন্তন মরমী রূপ ধারণ করে। এই দর্শনের অন্যতম অমর সারথি আব্দুল লতিফ ১৯২৭ সালের ৭ মার্চ বরিশালের রায়পাশা গ্রামের মেঠোপথের ধূলিকণায় প্রথম পদচিহ্ন এঁকেছিলেন। পিতা আমিনুদ্দিন আহমদ এবং মাতা আজিমুন্নেসার এই সন্তান শৈশব থেকেই ছিলেন ছকবাঁধা প্রাতিষ্ঠানিক পাঠের প্রতি ঘোরতর বিবাগী। স্থানীয় রায়পাশা প্রাথমিক বিদ্যালয়ে হাতেখড়ির পর তিনি ভর্তি হন বরিশাল সদরের ঐতিহ্যবাহী বরিশাল জিলা স্কুলে। কিন্তু জিলা স্কুলের প্রথাগত পড়াশোনা আর অঙ্কের কঠিন হিসাব যাঁর কিশোর মনকে টানতে পারেনি, তাঁর জন্য অবারিত পাঠশালা হয়ে উঠেছিল প্রকৃতির বিশাল ক্যানভাস। জীবনানন্দ দাশের কুয়াশায় ঢাকা ধানসিঁড়ি নদীর মায়াবী হাহাকার আর কীর্তনখোলার উত্তাল ঢেউ থেকেই তিনি কুড়িয়ে নিয়েছিলেন তাঁর আদি সংগীত-ব্যাকরণ। ১৯৪৪ সালে জিলা স্কুল থেকে ম্যাট্রিকুলেশন সম্পন্ন করার পর উচ্চশিক্ষার চিরাচরিত মোহ ত্যাগ করে তিনি পাড়ি জমান কলকাতায়।
কলকাতার ওস্তাদ সুরেন্দ্রনাথ দাসের কাছে দীর্ঘ তিন বছর উচ্চাঙ্গ সংগীতের কঠোর তালিম নিলেও তাঁর অন্তরের টান ছিল বাংলার মাটির সোঁদা গন্ধে। ১৯৪৩-৪৪ সালের সেই উত্তাল সময়ে, মাত্র ১৬ বছর বয়সে কংগ্রেস সাহিত্য সংঘের মঞ্চে গান গেয়ে জনতাকে জাগিয়ে তোলা সেই কিশোরটি জানতেন না যে, অভাবের তাড়নায় কলকাতায় তাবু সেলাইয়ের কষ্টকর কাজই একদিন তাঁর হৃদয়ে সাধারণ মানুষের প্রতি গভীর মমতার বীজ বুনে দেবে। ১৯৪৭ সালের আগস্ট মাসে দেশভাগের রক্তক্ষরণ আর সাম্প্রদায়িক দাঙ্গার বিভীষিকা যখন কলকাতাকে গ্রাস করে, তখন তরুণ লতিফ স্টিমারে চড়ে ফিরে আসেন তাঁর প্রিয় জন্মভিটা বরিশালে। ১৯৪৭-এর শেষ ভাগে বরিশালের শান্ত মেঠোপথে কিছুকাল অতিবাহিত করার পর তাঁর শিল্পীসত্তা তাঁকে টেনে নিয়ে আসে ঢাকার নতুন সাংস্কৃতিক বলয়ে। ১৯৪৮ সালের শুরুর দিকেই তিনি স্থায়ীভাবে ঢাকায় চলে আসেন এবং সেই বছরেরই ৫ আগস্ট ঢাকা বেতার কেন্দ্রে তাঁর প্রথম গান পরিবেশনার মাধ্যমে এক দীর্ঘ সাংস্কৃতিক মহাপ্রলয়ের মুখবন্ধ রচনা করেন। ১৯৪৮ সালেই তিনি ঢাকা বেতারের সংগীত প্রযোজক হিসেবে কর্মজীবন শুরু করেন, যা তাঁর শিল্পীসত্তাকে এক প্রাতিষ্ঠানিক ভিত্তি দান করে।
১৯৫২ সালের মহান ভাষা আন্দোলনে তাঁর এই রাজনৈতিক প্রজ্ঞা ও শিল্পবোধ এক আগ্নেয়গিরির মতো ফেটে পড়ে। তৎকালীন পাকিস্তানি শাসকেরা যখন বাঙালির সাংস্কৃতিক পরিচয় ও মুখের ভাষাকে চিরতরে মুছে ফেলার ষড়যন্ত্রে লিপ্ত, তখন লতিফের কলম ও কণ্ঠ হয়ে উঠল প্রতিরোধের সবচেয়ে শক্তিশালী শৈল্পিক মেনিফেস্টো। তাঁর অমর সৃষ্টি ‘ওরা আমার মুখের ভাষা কাইড়া নিতে চায়’ গানটিতে ‘কাইড়া’র মতো শক্তিশালী আঞ্চলিক শব্দের প্রয়োগ ছিল মূলত নাগরিক আভিজাত্যের কৃত্রিম পর্দা ছিঁড়ে সাধারণ মানুষের ভাষাকে ইতিহাসের কেন্দ্রে নিয়ে আসার এক চূড়ান্ত চপেটাঘাত। সংগীততাত্ত্বিক বিচারে, আব্দুল লতিফ এখানে এক অদ্ভুত সাহসিকতা দেখিয়েছিলেন। ১৯৫২ সালের মে মাসে ঢাকার ব্রিটানিয়া সিনেমা হলে আব্দুল গাফফার চৌধুরীর ‘আমার ভাইয়ের রক্তে রাঙানো’ কবিতায় যখন তিনি প্রথম সুরারোপ করেন, সেখানে তিনি বেছে নিয়েছিলেন ৩/৪ ছন্দের (দাদরা ঘরানার) এক করুণ ও বিষাদমাখা মরমী হাহাকার। লতিফ সাহেব নিজেই বলতেন, “আমি যখন সুর করি, তখন আমার চোখের সামনে ভাসে মায়ের মৃত মুখ, আর আলতাফ যখন সুর করেছে, তখন তার চোখে ছিল রাজপথের মিছিল।” যদিও আজ আলতাফ মাহমুদের ৪/৪ ছন্দের ‘মার্চিং’ সুরটিই বেশি জনপ্রিয়, কিন্তু ইতিহাসের সত্য এই যে, প্রথম কয়েক বছর লতিফ সাহেবের সেই মরমী সুরেই বাংলার আকাশ-বাতাস কেঁপে উঠেছিল।
আব্দুল লতিফের এই শৈল্পিক লড়াইয়ের প্রেক্ষাপট বৈশ্বিক প্রতিবাদী সংগীতের ইতিহাসের সমান্তরাল। তিনি ছিলেন বাংলার সেই শিল্পী, যাঁর কাজের ধরন চিলির ভিক্টর জারা বা আমেরিকার বব ডিলানের চেতনার সমান্তরাল। ভিক্টর জারা যেমন মেহনতি মানুষের অধিকার রক্ষায় গিটারকে হাতিয়ার করেছিলেন, লতিফও তেমনি লোকজ মরমীবাদ এবং আধুনিক দ্রোহের মেলবন্ধন ঘটিয়েছিলেন। কৃষ্ণাঙ্গদের ‘স্পিরিচুয়াল মিউজিক’ যেমন ক্রীতদাস প্রথার বিরুদ্ধে এক আধ্যাত্মিক ঢাল ছিল, লতিফের লোকজ সুরও তেমনি বাঙালির সাংস্কৃতিক দাসত্বের বিরুদ্ধে এক অবিনাশী শক্তি হিসেবে আবির্ভূত হয়েছিল। তিনি জানতেন, কেবল স্লোগানে বিপ্লব হয় না; তার জন্য প্রয়োজন এমন এক সুর, যা মানুষের হৃদয়ে অধিকারের তৃষ্ণা জাগিয়ে তোলে। ১৯৫৪ সালের যুক্তফ্রন্ট নির্বাচনের সময় তাঁর ‘হকের নায়ে চড়বি কারা আয়’ গানটি বাংলার ঘরে ঘরে এক রাজনৈতিক মন্ত্রে পরিণত হয়েছিল, যা প্রমাণ করে একজন শিল্পী কত দ্রুত রাজনৈতিক নেতৃত্বের সমান্তরালে জনমত গড়ে তুলতে পারেন।
আব্দুল লতিফ কেবল গানের পাখি ছিলেন না, তিনি ছিলেন গ্রাম-বাংলার চিরায়ত ‘পুঁথি পাঠ’ ঐতিহ্যের এক আধুনিক জাদুকর। বেতারে তাঁর দরাজ কণ্ঠের সেই দুলকি তালের পুঁথি পাঠ যেন মেঘনা-কীর্তনখোলার ঢেউয়ের মতো আছড়ে পড়ত বাঙালির অন্দরমহলে। তিনি পুঁথিকে কেবল বিনোদন হিসেবে দেখেননি, বরং একে বাঙালির নিজস্ব ‘গণমাধ্যম’ হিসেবে পুনর্জীবিত করেছিলেন। ‘মিশর কুমারী’, ‘আকাশ আর মাটি’ থেকে শুরু করে জহির রায়হানের ‘শেষ পর্যন্ত’—বিশটিরও বেশি চলচ্চিত্রে তাঁর গায়কী ও সুর ইতিহাসের অংশ হয়ে আছে। গবেষক হিসেবেও তাঁর অবদান অতুলনীয়; ১৯৮৫ সালে প্রকাশিত ‘ভাষার গান দেশের গান’ এবং ‘দিলরবাব’ ও ‘দয়ারে আইসাছে পালকি’-র মতো গ্রন্থগুলো সংগীত গবেষণায় এক নতুন দিগন্ত উন্মোচন করেছে। পটুয়া কামরুল হাসানের বোন নাজমা বেগমের সাথে পরিণয় তাঁর এই দীর্ঘ কণ্টকাকীর্ণ যাত্রাকে করেছিল আরও সুশোভিত। এছাড়া 'বাংলাদেশ ফোকলোর পরিষদ' প্রতিষ্ঠায় তাঁর অগ্রণী ভূমিকা তাঁকে একজন দূরদর্শী সাংস্কৃতিক সংগঠক হিসেবে অমরতা দিয়েছে।
১৯৭৩ সালে সোভিয়েত ইউনিয়ন এবং ১৯৭৪ সালে পূর্ব জার্মানি সফরসহ আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে বাংলাদেশের সাংস্কৃতিক প্রতিনিধিত্ব তাঁর বিশ্বজনীন স্বীকৃতিকেই সুপ্রতিষ্ঠিত করে। একুশে পদক (১৯৭৯) এবং স্বাধীনতা পদক (২০০২) প্রাপ্ত এই কিংদবন্তি ২০০৫ সালের ২৬ ফেব্রুয়ারি চিরনিদ্রায় শায়িত হন। জীবনের শেষ দিনগুলোতে অক্সিজেন সিলিন্ডারের কৃত্রিম সাহারায় বেঁচে থাকার লড়াইটি ছিল তাঁর আজীবনের সংগ্রামী দর্শনেরই এক জীবন্ত রূপক। বর্তমান সময়ে, যখন আমাদের শেকড়বিচ্ছিন্ন সংস্কৃতি যান্ত্রিক আকাশ-সংস্কৃতির মরুভূমিকে আলিঙ্গন করছে এবং কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার প্রভাবে মৌলিক লোকজ সুরগুলো কোণঠাসা হয়ে পড়ছে, তখন আব্দুল লতিফ আরও বেশি প্রাসঙ্গিক। তাঁর জীবন আমাদের শেখায় যে, শিল্পের আসল শক্তি সস্তা হাততালিতে নয়, বরং মাটির গভীরতার সাথে মানুষের প্রাণের সংযোগে। রাষ্ট্র ও সমাজের প্রতি আমাদের চূড়ান্ত দাবি হওয়া উচিত—আব্দুল লতিফের অপ্রকাশিত কাজগুলো দ্রুত উদ্ধার করা এবং তাঁর সংগীতের সঠিক সংরক্ষণ নিশ্চিত করা। লৌকিক পৃথিবীর সীমানা ছাড়িয়ে তিনি আজ লীন হয়ে আছেন এ দেশের প্রতিটি মিছিলে, প্রতিটি একুশের ভোরে আর বাঙালির প্রতিটি মুক্তিকামী মানুষের বজ্রকণ্ঠে—এক চিরন্তন ও অবিনাশী সুরের রেখা হয়ে।আজ এই মহান সুর-সংগ্রামীর প্রয়াণ বার্ষিকীতে তাঁর স্মৃতির প্রতি বিনম্র শ্রদ্ধা।
📕 বাহাউদ্দিন গোলাপ
(লেখক: প্রাবন্ধিক, গবেষক ও সংস্কৃতি কর্মী। ডেপুটি রেজিস্ট্রার, বরিশাল বিশ্ববিদ্যালয়। b_golap@yahoo.com)
সংগীত যখন কেবল বিনোদনের গণ্ডি পেরিয়ে একটি জাতির অস্তিত্ব রক্ষার দালিলিক হাতিয়ার হয়ে ওঠে, তখন শিল্পী আর স্রষ্টার লৌকিক পরিচয় ছাপিয়ে তা এক চিরন্তন মরমী রূপ ধারণ করে। এই দর্শনের অন্যতম অমর সারথি আব্দুল লতিফ ১৯২৭ সালের ৭ মার্চ বরিশালের রায়পাশা গ্রামের মেঠোপথের ধূলিকণায় প্রথম পদচিহ্ন এঁকেছিলেন। পিতা আমিনুদ্দিন আহমদ এবং মাতা আজিমুন্নেসার এই সন্তান শৈশব থেকেই ছিলেন ছকবাঁধা প্রাতিষ্ঠানিক পাঠের প্রতি ঘোরতর বিবাগী। স্থানীয় রায়পাশা প্রাথমিক বিদ্যালয়ে হাতেখড়ির পর তিনি ভর্তি হন বরিশাল সদরের ঐতিহ্যবাহী বরিশাল জিলা স্কুলে। কিন্তু জিলা স্কুলের প্রথাগত পড়াশোনা আর অঙ্কের কঠিন হিসাব যাঁর কিশোর মনকে টানতে পারেনি, তাঁর জন্য অবারিত পাঠশালা হয়ে উঠেছিল প্রকৃতির বিশাল ক্যানভাস। জীবনানন্দ দাশের কুয়াশায় ঢাকা ধানসিঁড়ি নদীর মায়াবী হাহাকার আর কীর্তনখোলার উত্তাল ঢেউ থেকেই তিনি কুড়িয়ে নিয়েছিলেন তাঁর আদি সংগীত-ব্যাকরণ। ১৯৪৪ সালে জিলা স্কুল থেকে ম্যাট্রিকুলেশন সম্পন্ন করার পর উচ্চশিক্ষার চিরাচরিত মোহ ত্যাগ করে তিনি পাড়ি জমান কলকাতায়।
কলকাতার ওস্তাদ সুরেন্দ্রনাথ দাসের কাছে দীর্ঘ তিন বছর উচ্চাঙ্গ সংগীতের কঠোর তালিম নিলেও তাঁর অন্তরের টান ছিল বাংলার মাটির সোঁদা গন্ধে। ১৯৪৩-৪৪ সালের সেই উত্তাল সময়ে, মাত্র ১৬ বছর বয়সে কংগ্রেস সাহিত্য সংঘের মঞ্চে গান গেয়ে জনতাকে জাগিয়ে তোলা সেই কিশোরটি জানতেন না যে, অভাবের তাড়নায় কলকাতায় তাবু সেলাইয়ের কষ্টকর কাজই একদিন তাঁর হৃদয়ে সাধারণ মানুষের প্রতি গভীর মমতার বীজ বুনে দেবে। ১৯৪৭ সালের আগস্ট মাসে দেশভাগের রক্তক্ষরণ আর সাম্প্রদায়িক দাঙ্গার বিভীষিকা যখন কলকাতাকে গ্রাস করে, তখন তরুণ লতিফ স্টিমারে চড়ে ফিরে আসেন তাঁর প্রিয় জন্মভিটা বরিশালে। ১৯৪৭-এর শেষ ভাগে বরিশালের শান্ত মেঠোপথে কিছুকাল অতিবাহিত করার পর তাঁর শিল্পীসত্তা তাঁকে টেনে নিয়ে আসে ঢাকার নতুন সাংস্কৃতিক বলয়ে। ১৯৪৮ সালের শুরুর দিকেই তিনি স্থায়ীভাবে ঢাকায় চলে আসেন এবং সেই বছরেরই ৫ আগস্ট ঢাকা বেতার কেন্দ্রে তাঁর প্রথম গান পরিবেশনার মাধ্যমে এক দীর্ঘ সাংস্কৃতিক মহাপ্রলয়ের মুখবন্ধ রচনা করেন। ১৯৪৮ সালেই তিনি ঢাকা বেতারের সংগীত প্রযোজক হিসেবে কর্মজীবন শুরু করেন, যা তাঁর শিল্পীসত্তাকে এক প্রাতিষ্ঠানিক ভিত্তি দান করে।
১৯৫২ সালের মহান ভাষা আন্দোলনে তাঁর এই রাজনৈতিক প্রজ্ঞা ও শিল্পবোধ এক আগ্নেয়গিরির মতো ফেটে পড়ে। তৎকালীন পাকিস্তানি শাসকেরা যখন বাঙালির সাংস্কৃতিক পরিচয় ও মুখের ভাষাকে চিরতরে মুছে ফেলার ষড়যন্ত্রে লিপ্ত, তখন লতিফের কলম ও কণ্ঠ হয়ে উঠল প্রতিরোধের সবচেয়ে শক্তিশালী শৈল্পিক মেনিফেস্টো। তাঁর অমর সৃষ্টি ‘ওরা আমার মুখের ভাষা কাইড়া নিতে চায়’ গানটিতে ‘কাইড়া’র মতো শক্তিশালী আঞ্চলিক শব্দের প্রয়োগ ছিল মূলত নাগরিক আভিজাত্যের কৃত্রিম পর্দা ছিঁড়ে সাধারণ মানুষের ভাষাকে ইতিহাসের কেন্দ্রে নিয়ে আসার এক চূড়ান্ত চপেটাঘাত। সংগীততাত্ত্বিক বিচারে, আব্দুল লতিফ এখানে এক অদ্ভুত সাহসিকতা দেখিয়েছিলেন। ১৯৫২ সালের মে মাসে ঢাকার ব্রিটানিয়া সিনেমা হলে আব্দুল গাফফার চৌধুরীর ‘আমার ভাইয়ের রক্তে রাঙানো’ কবিতায় যখন তিনি প্রথম সুরারোপ করেন, সেখানে তিনি বেছে নিয়েছিলেন ৩/৪ ছন্দের (দাদরা ঘরানার) এক করুণ ও বিষাদমাখা মরমী হাহাকার। লতিফ সাহেব নিজেই বলতেন, “আমি যখন সুর করি, তখন আমার চোখের সামনে ভাসে মায়ের মৃত মুখ, আর আলতাফ যখন সুর করেছে, তখন তার চোখে ছিল রাজপথের মিছিল।” যদিও আজ আলতাফ মাহমুদের ৪/৪ ছন্দের ‘মার্চিং’ সুরটিই বেশি জনপ্রিয়, কিন্তু ইতিহাসের সত্য এই যে, প্রথম কয়েক বছর লতিফ সাহেবের সেই মরমী সুরেই বাংলার আকাশ-বাতাস কেঁপে উঠেছিল।
আব্দুল লতিফের এই শৈল্পিক লড়াইয়ের প্রেক্ষাপট বৈশ্বিক প্রতিবাদী সংগীতের ইতিহাসের সমান্তরাল। তিনি ছিলেন বাংলার সেই শিল্পী, যাঁর কাজের ধরন চিলির ভিক্টর জারা বা আমেরিকার বব ডিলানের চেতনার সমান্তরাল। ভিক্টর জারা যেমন মেহনতি মানুষের অধিকার রক্ষায় গিটারকে হাতিয়ার করেছিলেন, লতিফও তেমনি লোকজ মরমীবাদ এবং আধুনিক দ্রোহের মেলবন্ধন ঘটিয়েছিলেন। কৃষ্ণাঙ্গদের ‘স্পিরিচুয়াল মিউজিক’ যেমন ক্রীতদাস প্রথার বিরুদ্ধে এক আধ্যাত্মিক ঢাল ছিল, লতিফের লোকজ সুরও তেমনি বাঙালির সাংস্কৃতিক দাসত্বের বিরুদ্ধে এক অবিনাশী শক্তি হিসেবে আবির্ভূত হয়েছিল। তিনি জানতেন, কেবল স্লোগানে বিপ্লব হয় না; তার জন্য প্রয়োজন এমন এক সুর, যা মানুষের হৃদয়ে অধিকারের তৃষ্ণা জাগিয়ে তোলে। ১৯৫৪ সালের যুক্তফ্রন্ট নির্বাচনের সময় তাঁর ‘হকের নায়ে চড়বি কারা আয়’ গানটি বাংলার ঘরে ঘরে এক রাজনৈতিক মন্ত্রে পরিণত হয়েছিল, যা প্রমাণ করে একজন শিল্পী কত দ্রুত রাজনৈতিক নেতৃত্বের সমান্তরালে জনমত গড়ে তুলতে পারেন।
আব্দুল লতিফ কেবল গানের পাখি ছিলেন না, তিনি ছিলেন গ্রাম-বাংলার চিরায়ত ‘পুঁথি পাঠ’ ঐতিহ্যের এক আধুনিক জাদুকর। বেতারে তাঁর দরাজ কণ্ঠের সেই দুলকি তালের পুঁথি পাঠ যেন মেঘনা-কীর্তনখোলার ঢেউয়ের মতো আছড়ে পড়ত বাঙালির অন্দরমহলে। তিনি পুঁথিকে কেবল বিনোদন হিসেবে দেখেননি, বরং একে বাঙালির নিজস্ব ‘গণমাধ্যম’ হিসেবে পুনর্জীবিত করেছিলেন। ‘মিশর কুমারী’, ‘আকাশ আর মাটি’ থেকে শুরু করে জহির রায়হানের ‘শেষ পর্যন্ত’—বিশটিরও বেশি চলচ্চিত্রে তাঁর গায়কী ও সুর ইতিহাসের অংশ হয়ে আছে। গবেষক হিসেবেও তাঁর অবদান অতুলনীয়; ১৯৮৫ সালে প্রকাশিত ‘ভাষার গান দেশের গান’ এবং ‘দিলরবাব’ ও ‘দয়ারে আইসাছে পালকি’-র মতো গ্রন্থগুলো সংগীত গবেষণায় এক নতুন দিগন্ত উন্মোচন করেছে। পটুয়া কামরুল হাসানের বোন নাজমা বেগমের সাথে পরিণয় তাঁর এই দীর্ঘ কণ্টকাকীর্ণ যাত্রাকে করেছিল আরও সুশোভিত। এছাড়া 'বাংলাদেশ ফোকলোর পরিষদ' প্রতিষ্ঠায় তাঁর অগ্রণী ভূমিকা তাঁকে একজন দূরদর্শী সাংস্কৃতিক সংগঠক হিসেবে অমরতা দিয়েছে।
১৯৭৩ সালে সোভিয়েত ইউনিয়ন এবং ১৯৭৪ সালে পূর্ব জার্মানি সফরসহ আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে বাংলাদেশের সাংস্কৃতিক প্রতিনিধিত্ব তাঁর বিশ্বজনীন স্বীকৃতিকেই সুপ্রতিষ্ঠিত করে। একুশে পদক (১৯৭৯) এবং স্বাধীনতা পদক (২০০২) প্রাপ্ত এই কিংদবন্তি ২০০৫ সালের ২৬ ফেব্রুয়ারি চিরনিদ্রায় শায়িত হন। জীবনের শেষ দিনগুলোতে অক্সিজেন সিলিন্ডারের কৃত্রিম সাহারায় বেঁচে থাকার লড়াইটি ছিল তাঁর আজীবনের সংগ্রামী দর্শনেরই এক জীবন্ত রূপক। বর্তমান সময়ে, যখন আমাদের শেকড়বিচ্ছিন্ন সংস্কৃতি যান্ত্রিক আকাশ-সংস্কৃতির মরুভূমিকে আলিঙ্গন করছে এবং কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার প্রভাবে মৌলিক লোকজ সুরগুলো কোণঠাসা হয়ে পড়ছে, তখন আব্দুল লতিফ আরও বেশি প্রাসঙ্গিক। তাঁর জীবন আমাদের শেখায় যে, শিল্পের আসল শক্তি সস্তা হাততালিতে নয়, বরং মাটির গভীরতার সাথে মানুষের প্রাণের সংযোগে। রাষ্ট্র ও সমাজের প্রতি আমাদের চূড়ান্ত দাবি হওয়া উচিত—আব্দুল লতিফের অপ্রকাশিত কাজগুলো দ্রুত উদ্ধার করা এবং তাঁর সংগীতের সঠিক সংরক্ষণ নিশ্চিত করা। লৌকিক পৃথিবীর সীমানা ছাড়িয়ে তিনি আজ লীন হয়ে আছেন এ দেশের প্রতিটি মিছিলে, প্রতিটি একুশের ভোরে আর বাঙালির প্রতিটি মুক্তিকামী মানুষের বজ্রকণ্ঠে—এক চিরন্তন ও অবিনাশী সুরের রেখা হয়ে।আজ এই মহান সুর-সংগ্রামীর প্রয়াণ বার্ষিকীতে তাঁর স্মৃতির প্রতি বিনম্র শ্রদ্ধা।
📕 বাহাউদ্দিন গোলাপ
(লেখক: প্রাবন্ধিক, গবেষক ও সংস্কৃতি কর্মী। ডেপুটি রেজিস্ট্রার, বরিশাল বিশ্ববিদ্যালয়। b_golap@yahoo.com)