Google AdSense
This is a demo ad. Your live ads will be displayed here once AdSense is properly configured.
Google AdSense
This is a demo ad. Your live ads will be displayed here once AdSense is properly configured.

২১ ফেব্রুয়ারি, ২০২৬ ২৩:০১
বরিশালে বিভাগের দ্বীপ জেলা ভোলার চরফ্যাশনের শশীভূষণে গোসল করতে গিয়ে পুকুরের পানিতে ডুবে খাদিজা ইসলাম(৯) ও সোহানা বেগম(৭) নামের দুই বান্ধবীর মর্মান্তিক মৃত্যু হয়েছে।
শনিবার (২১ ফেব্রুয়ারী) দুপুরে উপজেলার হাজারিগঞ্জ ইউনিয়নের দক্ষিণ হাজারিগঞ্জ গ্রামে এ ঘটনা ঘটে।
শিশু খাদিজা ওই গ্রামের ইউসুফ মিয়ার মেয়ে। এবং সোহানা একই গ্রামের সোহাগ হোসেনের মেয়ে। তারা দু'জন বান্ধবী ছিলেন।
শিশু দু'টির পরিবার সূত্রে জানা গেছে, শনিবার দুপুরে বাড়ির পাশের উপকূলীয় ড্রপ প্রাথমিক বিদ্যালয়ের পুকুরে গোসল করতে যান খাদিজা ও সোহানা। পরে তাদের ফিরতে দেরী হওয়ায় পরিবারের সদস্যরা খোঁজাখুঁজি শুরু করেন। একপর্যায়ে স্বজনরা তাদের দু'জনকে পুকুরের পানিতে ভেসে থাকতে দেখে স্থানীয়দের সহযোগিতায় দ্রুত উদ্ধার করে উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে নিয়ে গেলে কর্তব্যরত চিকিৎসক তাদের মৃত ঘোষণা করেন।
স্থানীয় হারুন চৌকিদার জানান, তারা দু'জন সবসময় একসঙ্গে চলাফেরা করতেন। প্রতিদিন এক সঙ্গে এসে ওই পুকুরে গোসল করতেন। তারা সাঁতার জানতেন না। গোসল করতে এসে হয়তো অসাবধানতাবশত পুকুরের পানিতে ডুবে গিয়েছে। পরে পরিবারের সদস্যরা তাদের দেখতে না পেয়ে খোঁজাখুঁজি করলে পুকুরে পানিতে ভেসে থাকতে দেখেন।
এদিকে একসঙ্গে দুই শিশুর মৃত্যুতে এলাকাজুড়ে নেমে এসেছে শোকের ছায়া। দু'টি পরিবারেই চলছে শোকের মাতম। বারবার মূর্ছা যাচ্ছেন তাদের বাবা–মা।
শশীভূষণ থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. ফখরুল ইসলাম বলেন, খবর পেয়ে পুলিশের একটি টিম ঘটনাস্থলে পাঠানো হয়েছে। পরিবারের কোন অভিযোগ না থাকায় লাশ বিনা ময়নাতদন্তে পরিবারের কাছে হস্তান্তর করা হয়েছে।
বরিশাল টাইমস
ছবি: সংগৃহীত
বরিশালে বিভাগের দ্বীপ জেলা ভোলার চরফ্যাশনের শশীভূষণে গোসল করতে গিয়ে পুকুরের পানিতে ডুবে খাদিজা ইসলাম(৯) ও সোহানা বেগম(৭) নামের দুই বান্ধবীর মর্মান্তিক মৃত্যু হয়েছে।
শনিবার (২১ ফেব্রুয়ারী) দুপুরে উপজেলার হাজারিগঞ্জ ইউনিয়নের দক্ষিণ হাজারিগঞ্জ গ্রামে এ ঘটনা ঘটে।
শিশু খাদিজা ওই গ্রামের ইউসুফ মিয়ার মেয়ে। এবং সোহানা একই গ্রামের সোহাগ হোসেনের মেয়ে। তারা দু'জন বান্ধবী ছিলেন।
শিশু দু'টির পরিবার সূত্রে জানা গেছে, শনিবার দুপুরে বাড়ির পাশের উপকূলীয় ড্রপ প্রাথমিক বিদ্যালয়ের পুকুরে গোসল করতে যান খাদিজা ও সোহানা। পরে তাদের ফিরতে দেরী হওয়ায় পরিবারের সদস্যরা খোঁজাখুঁজি শুরু করেন। একপর্যায়ে স্বজনরা তাদের দু'জনকে পুকুরের পানিতে ভেসে থাকতে দেখে স্থানীয়দের সহযোগিতায় দ্রুত উদ্ধার করে উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে নিয়ে গেলে কর্তব্যরত চিকিৎসক তাদের মৃত ঘোষণা করেন।
স্থানীয় হারুন চৌকিদার জানান, তারা দু'জন সবসময় একসঙ্গে চলাফেরা করতেন। প্রতিদিন এক সঙ্গে এসে ওই পুকুরে গোসল করতেন। তারা সাঁতার জানতেন না। গোসল করতে এসে হয়তো অসাবধানতাবশত পুকুরের পানিতে ডুবে গিয়েছে। পরে পরিবারের সদস্যরা তাদের দেখতে না পেয়ে খোঁজাখুঁজি করলে পুকুরে পানিতে ভেসে থাকতে দেখেন।
এদিকে একসঙ্গে দুই শিশুর মৃত্যুতে এলাকাজুড়ে নেমে এসেছে শোকের ছায়া। দু'টি পরিবারেই চলছে শোকের মাতম। বারবার মূর্ছা যাচ্ছেন তাদের বাবা–মা।
শশীভূষণ থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. ফখরুল ইসলাম বলেন, খবর পেয়ে পুলিশের একটি টিম ঘটনাস্থলে পাঠানো হয়েছে। পরিবারের কোন অভিযোগ না থাকায় লাশ বিনা ময়নাতদন্তে পরিবারের কাছে হস্তান্তর করা হয়েছে।
বরিশাল টাইমস

২১ ফেব্রুয়ারি, ২০২৬ ২৩:৪০

২১ ফেব্রুয়ারি, ২০২৬ ২২:৪০

২১ ফেব্রুয়ারি, ২০২৬ ২২:২৫
বরিশালের বাবুগঞ্জে যথাযোগ্য মর্যাদা এবং ভাবগাম্ভীর্যের মধ্য দিয়ে মহান শহীদ দিবস ও আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস-২০২৬ পালিত হয়েছে। দিবসটি উদযাপন উপলক্ষ্যে শহীদ বেদীতে পুষ্পস্তবক অর্পণ, প্রভাতফেরি, আলোচনা সভা ও পুরস্কার বিতরণীসহ বিভিন্ন কর্মসূচি পালন করেছে উপজেলা প্রশাসন।
একুশের প্রথম প্রহরে মহান ভাষা শহীদদের প্রতি শ্রদ্ধা নিবেদন করতে বাবুগঞ্জ উপজেলার কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারে পুষ্পস্তবক অর্পণের মাধ্যমে কর্মসূচির সূচনা করেন উপজেলা নির্বাহী অফিসার (ইউএনও) আসমা উল হুসনা। এসময় উপজেলা প্রশাসন ছাড়াও মুক্তিযোদ্ধা সংসদ, বাবুগঞ্জ ও এয়ারপোর্ট থানা পুলিশ, বিএনপি, যুবদল, ছাত্রদল, পল্লী বিদ্যুৎ সমিতি, রাশেদ খান মেনন মডেল উচ্চ মাধ্যমিক বিদ্যালয়, বাবুগঞ্জ ব্যবসায়ী সমিতিসহ বিভিন্ন রাজনৈতিক ও সামাজিক সংগঠন এবং শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের পক্ষ থেকে শ্রদ্ধা নিবেদন করা হয়।
সকালে উপজেলা প্রশাসনের উদ্যোগে একটি প্রভাতফেরি কেন্দ্রীয় শহীদ মিনার ঘুরে উপজেলা পরিষদের বিভিন্ন সড়ক প্রদক্ষিণ করে। পরে উপজেলা নির্বাহী অফিসার (ইউএনও) আসমা উল হুসনার সভাপতিত্বে উপজেলা পরিষদ হলরুমে অমর একুশের তাৎপর্য তুলে ধরে এক আলোচনা সভা অনুষ্ঠিত হয়। উপজেলা সমাজসেবা কর্মকর্তা মোঃ মিজানুর রহমানের সঞ্চালনায় অনুষ্ঠিত আলোচনা সভায় বক্তব্য রাখেন উপজেলা প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তা ডাঃ প্রদীপ কুমার সরকার, বাবুগঞ্জ থানার উপ-পরিদর্শক ইকবাল কবির, বীর মুক্তিযোদ্ধা শহীদুল ইসলাম, বিমানবন্দর প্রেসক্লাব সভাপতি ও সুজন সম্পাদক আরিফ আহমেদ মুন্না এবং বাবুগঞ্জ দাখিল মাদ্রাসার শিক্ষার্থী জায়েদ খান।
এসময় উপজেলা সহকারী কমিশনার (ভূমি) কামরুন্নাহার তামান্না, উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা মোঃ আব্দুর রউফ, উপজেলা প্রকৌশলী কাজী ইমামুল হক আলীম, মৎস্য কর্মকর্তা নাজমুস সালেহীন, উপজেলা শিশু বিষয়ক কর্মকর্তা মোঃ ইসমাইল হোসেন, মহিলা বিষয়ক কর্মকর্তা শামীমা ইয়াসমিন ডলি, যুব উন্নয়ন কর্মকর্তা আব্দুর রহমান সন্ন্যামত, মাধ্যমিক শিক্ষা কর্মকর্তা নাসরিন জোবায়দা আখতার, পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা শহিদুল ইসলাম, তথ্যআপা প্রকল্প কর্মকর্তা জিনিয়া আফরিন, উপজেলা মুক্তিযোদ্ধা সংসদের সাবেক ডেপুটি কমান্ডার আবদুল করিম হাওলাদার প্রমুখসহ উপজেলার বিভিন্ন সরকারি দপ্তরের কর্মকর্তা, বীর মুক্তিযোদ্ধা, শিক্ষক, সাংবাদিক, জনপ্রতিনিধি ও সুশীল সমাজের নেতৃবৃন্দ উপস্থিত ছিলেন। আলোচনা সভা শেষে উপজেলা শিশু একাডেমির উদ্যোগে অনুষ্ঠিত আবৃত্তি, চিত্রাঙ্কন ও রচনা প্রতিযোগিতায় বিজয়ীদের মাঝে পুরস্কার বিতরণ করা হয়।
অনুষ্ঠানে সমাপনী বক্তৃতাকালে বাবুগঞ্জ উপজেলা নির্বাহী অফিসার (ইউএনও) আসমা উল হুসনা বলেন, 'একুশে ফেব্রুয়ারি শুধু একটি তারিখ নয়, এটা বাঙালির স্বাধিকার, গৌরব ও আত্মমর্যাদার এক প্রতীক। পৃথিবীর অনেক দেশের মানুষ তাদের স্বাধীনতার জন্য জীবন দিলেও আমরাই একমাত্র গৌরবান্বিত জাতি, যারা ভাষার জন্য জীবন দিয়ে মাতৃভাষাকে বিশ্বব্যাপী প্রতিষ্ঠিত করেছি। আমাদের একুশে ফেব্রুয়ারি আজ বিশ্বের বিভিন্ন দেশে আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস হিসেবে পালিত হচ্ছে। সিয়েরা লিওনে দ্বিতীয় রাষ্ট্রভাষা হিসেবে বাংলাকে স্বীকৃতি দেওয়া হয়েছে। এটা আমাদের জন্য বিরল সম্মান এবং গৌরবের। তাই বাংলা ভাষার মর্যাদাকে সমুন্নত রেখে সর্বস্তরে বাংলা ভাষার ব্যবহার নিশ্চিত করতে হবে। সঠিক এবং শুদ্ধভাবে বাংলা বানান লেখা ও ব্যবহারের ক্ষেত্রে মনোযোগী হতে হবে।'
বরিশালের বাবুগঞ্জে যথাযোগ্য মর্যাদা এবং ভাবগাম্ভীর্যের মধ্য দিয়ে মহান শহীদ দিবস ও আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস-২০২৬ পালিত হয়েছে। দিবসটি উদযাপন উপলক্ষ্যে শহীদ বেদীতে পুষ্পস্তবক অর্পণ, প্রভাতফেরি, আলোচনা সভা ও পুরস্কার বিতরণীসহ বিভিন্ন কর্মসূচি পালন করেছে উপজেলা প্রশাসন।
একুশের প্রথম প্রহরে মহান ভাষা শহীদদের প্রতি শ্রদ্ধা নিবেদন করতে বাবুগঞ্জ উপজেলার কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারে পুষ্পস্তবক অর্পণের মাধ্যমে কর্মসূচির সূচনা করেন উপজেলা নির্বাহী অফিসার (ইউএনও) আসমা উল হুসনা। এসময় উপজেলা প্রশাসন ছাড়াও মুক্তিযোদ্ধা সংসদ, বাবুগঞ্জ ও এয়ারপোর্ট থানা পুলিশ, বিএনপি, যুবদল, ছাত্রদল, পল্লী বিদ্যুৎ সমিতি, রাশেদ খান মেনন মডেল উচ্চ মাধ্যমিক বিদ্যালয়, বাবুগঞ্জ ব্যবসায়ী সমিতিসহ বিভিন্ন রাজনৈতিক ও সামাজিক সংগঠন এবং শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের পক্ষ থেকে শ্রদ্ধা নিবেদন করা হয়।
সকালে উপজেলা প্রশাসনের উদ্যোগে একটি প্রভাতফেরি কেন্দ্রীয় শহীদ মিনার ঘুরে উপজেলা পরিষদের বিভিন্ন সড়ক প্রদক্ষিণ করে। পরে উপজেলা নির্বাহী অফিসার (ইউএনও) আসমা উল হুসনার সভাপতিত্বে উপজেলা পরিষদ হলরুমে অমর একুশের তাৎপর্য তুলে ধরে এক আলোচনা সভা অনুষ্ঠিত হয়। উপজেলা সমাজসেবা কর্মকর্তা মোঃ মিজানুর রহমানের সঞ্চালনায় অনুষ্ঠিত আলোচনা সভায় বক্তব্য রাখেন উপজেলা প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তা ডাঃ প্রদীপ কুমার সরকার, বাবুগঞ্জ থানার উপ-পরিদর্শক ইকবাল কবির, বীর মুক্তিযোদ্ধা শহীদুল ইসলাম, বিমানবন্দর প্রেসক্লাব সভাপতি ও সুজন সম্পাদক আরিফ আহমেদ মুন্না এবং বাবুগঞ্জ দাখিল মাদ্রাসার শিক্ষার্থী জায়েদ খান।
এসময় উপজেলা সহকারী কমিশনার (ভূমি) কামরুন্নাহার তামান্না, উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা মোঃ আব্দুর রউফ, উপজেলা প্রকৌশলী কাজী ইমামুল হক আলীম, মৎস্য কর্মকর্তা নাজমুস সালেহীন, উপজেলা শিশু বিষয়ক কর্মকর্তা মোঃ ইসমাইল হোসেন, মহিলা বিষয়ক কর্মকর্তা শামীমা ইয়াসমিন ডলি, যুব উন্নয়ন কর্মকর্তা আব্দুর রহমান সন্ন্যামত, মাধ্যমিক শিক্ষা কর্মকর্তা নাসরিন জোবায়দা আখতার, পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা শহিদুল ইসলাম, তথ্যআপা প্রকল্প কর্মকর্তা জিনিয়া আফরিন, উপজেলা মুক্তিযোদ্ধা সংসদের সাবেক ডেপুটি কমান্ডার আবদুল করিম হাওলাদার প্রমুখসহ উপজেলার বিভিন্ন সরকারি দপ্তরের কর্মকর্তা, বীর মুক্তিযোদ্ধা, শিক্ষক, সাংবাদিক, জনপ্রতিনিধি ও সুশীল সমাজের নেতৃবৃন্দ উপস্থিত ছিলেন। আলোচনা সভা শেষে উপজেলা শিশু একাডেমির উদ্যোগে অনুষ্ঠিত আবৃত্তি, চিত্রাঙ্কন ও রচনা প্রতিযোগিতায় বিজয়ীদের মাঝে পুরস্কার বিতরণ করা হয়।
অনুষ্ঠানে সমাপনী বক্তৃতাকালে বাবুগঞ্জ উপজেলা নির্বাহী অফিসার (ইউএনও) আসমা উল হুসনা বলেন, 'একুশে ফেব্রুয়ারি শুধু একটি তারিখ নয়, এটা বাঙালির স্বাধিকার, গৌরব ও আত্মমর্যাদার এক প্রতীক। পৃথিবীর অনেক দেশের মানুষ তাদের স্বাধীনতার জন্য জীবন দিলেও আমরাই একমাত্র গৌরবান্বিত জাতি, যারা ভাষার জন্য জীবন দিয়ে মাতৃভাষাকে বিশ্বব্যাপী প্রতিষ্ঠিত করেছি। আমাদের একুশে ফেব্রুয়ারি আজ বিশ্বের বিভিন্ন দেশে আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস হিসেবে পালিত হচ্ছে। সিয়েরা লিওনে দ্বিতীয় রাষ্ট্রভাষা হিসেবে বাংলাকে স্বীকৃতি দেওয়া হয়েছে। এটা আমাদের জন্য বিরল সম্মান এবং গৌরবের। তাই বাংলা ভাষার মর্যাদাকে সমুন্নত রেখে সর্বস্তরে বাংলা ভাষার ব্যবহার নিশ্চিত করতে হবে। সঠিক এবং শুদ্ধভাবে বাংলা বানান লেখা ও ব্যবহারের ক্ষেত্রে মনোযোগী হতে হবে।'
ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে তারেক রহমান নেতৃত্বাধীন বিএনপি দুই-তৃতীয়াংশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা পেয়েছে। ২০২৪ সালের ছাত্র-জনতা নেতৃত্বাধীন বিপ্লবের পর গত ১২ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠিত এই প্রথম নির্বাচনে ক্ষমতাচ্যুত সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার দল আওয়ামী লীগ নিষেধাজ্ঞার কারণে অংশগ্রহণ করতে পারেনি।
আবার এই নির্বাচনের মধ্য দিয়ে বাংলাদেশে ইসলামপন্থি দল জামায়াতে ইসলামীর আবির্ভাবও ঘটেছে। ১৯৭১ সালে দেশ স্বাধীনের পর থেকে আওয়ামী লীগ এবং বিএনপিই পালাক্রমে শাসন করেছে ঢাকার মসনদ। জামায়াত এককভাবে কখনো ক্ষমতায় না থাকলেও কখনো দুর্নীতিতে না জড়ানোর গৌরব আছে দলটির। এবার তারা ভারতের পশ্চিমবঙ্গ রাজ্যের সীমান্তবর্তী অঞ্চলে ভালো সমর্থন পেয়েছে।
জাতীয় সংসদে নিরঙ্কুশ ক্ষমতার সুবাদে বিএনপি সরকার শুরুতে যা ইচ্ছা তা-ই করতে পারে এবং নিজেদের খুশিমতো নতুন আইনও প্রণয়ন করতে পারে— এমনটা ভাবা হলেও অর্থনীতির ক্ষেত্রে হোঁচট খেলে বিএনপি সরকার একদিকে জামায়াত এবং অন্যদিকে আওয়ামী লীগের সুপ্ত জনসমর্থনের চাপের মুখে পড়তে পারে।
লক্ষণীয় বিষয় হলো, কর্মসংস্থান ও দুর্নীতি নিয়ে তরুণ প্রজন্মের অসন্তোষ সহজে মিটে যাওয়ার সম্ভাবনা কম। প্রধানমন্ত্রী হিসেবে সদ্য শপথ নেওয়া তারেক রহমানকে রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা বজায় রাখতে কঠোর পরিশ্রম করতে হবে। তবে তার রাজনৈতিক সাফল্য নির্ভর করবে অর্থনীতি পুনরুজ্জীবিত করার ওপর।
বিএনপি ২০৩৪ সালের মধ্যে জিডিপির আকার ৪৬০ বিলিয়ন ডলার থেকে বাড়িয়ে ১ ট্রিলিয়ন ডলারে নেওয়ার অর্থাৎ অর্থনীতি দ্বিগুণ করার প্রতিশ্রুতি দিয়েছে। এই লক্ষ্য অর্জনে প্রায় ৯ শতাংশ বার্ষিক প্রবৃদ্ধি প্রয়োজন, যা বর্তমানে ৪ শতাংশ প্রবৃদ্ধির দেশে একটি বিশাল চ্যালেঞ্জ। দলটি শিক্ষা খাতে বরাদ্দ জিডিপির ২ শতাংশ থেকে বাড়িয়ে ৬ শতাংশ এবং স্বাস্থ্য খাতে শূন্য দশমিক ৭৫ শতাংশ থেকে বাড়িয়ে ৫ শতাংশ করার প্রতিশ্রুতি দিয়েছে। কিন্তু এ ধরনের উচ্চাভিলাষী লক্ষ্য পূরণে প্রয়োজনীয় সরকারি রাজস্ব বাড়ানোর কোনো বিশ্বাসযোগ্য পরিকল্পনা এখনো নেই। প্রবৃদ্ধির হার দ্বিগুণের বেশি করতে হলে বেসরকারি বিনিয়োগ জিডিপির ২৩ শতাংশ থেকে বাড়িয়ে ৩৫ শতাংশ করতে হবে।
এদিকে গত দেড় বছর ধরে উচ্চ সুদহার অর্থনীতিবিদ ও ব্যবসায়ী মহলে তীব্র সমালোচনার জন্ম দিয়েছে। অনেকেই মনে করছেন, শুধু মুদ্রানীতিই নয়; বরং বণ্টনব্যবস্থার কাঠামোগত সমস্যাই উচ্চ খাদ্যমূল্যের প্রধান কারণ। এটিই তারেক রহমান সরকারের সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ।
জিডিপির ১২ শতাংশ আসে কৃষি থেকে এবং বাংলাদেশের প্রায় ৫ কোটি মানুষ (কর্মসংস্থানের ৪৪ শতাংশ) এই খাতে যুক্ত। শহরাঞ্চলে খাদ্যের দাম কমাতে এবং চাপের মুখে থাকা কৃষকদের ন্যায্যমূল্য নিশ্চিত করতে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানকে খামার থেকে শহর পর্যন্ত খাদ্য সরবরাহ প্রক্রিয়ায় থাকা শক্তিশালী ও অনিয়ন্ত্রিত মধ্যস্বত্বভোগীদের দমনে কঠোর পদক্ষেপ নিতে হবে। সরবরাহ ও দাম নিয়ন্ত্রণে রাখতে তাকে ফসল কাটার পরবর্তী লজিস্টিক খাতেও বিনিয়োগ করতে হবে।
প্রবাসী আয় একটি বড় উৎস মনে করিয়ে দিয়ে প্রতিবেদনে বলা হয়, আরেকটি অগ্রাধিকার হতে হবে প্রবাসী কর্মীদের রেমিট্যান্স বা রেমিট্যান্স ব্যবস্থাপনা, যা আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (আইএমএফ) যেকোনো প্রোগ্রামের চেয়ে কম গুরুত্বপূর্ণ নয়। প্রায় ১ কোটি বাংলাদেশি বিদেশে, বিশেষ করে উপসাগরীয় দেশগুলোতে কাজ করেন। তারা বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ রক্ষায় আইএমএফের চেয়েও বেশি ভূমিকা রাখছেন। মাত্র তিন মাসে তারা প্রায় ৭ দশমিক ৫ বিলিয়ন ডলার পাঠিয়েছেন, যা দেশটির জন্য দেওয়া আইএমএফের পুরো সহায়তা প্যাকেজের সমান।
২০২৪ সালে আওয়ামী লীগ সরকার ক্ষমতাচ্যুত হওয়ার পর অনেক প্রবাসীকর্মী অবৈধ হুন্ডি চ্যানেল থেকে সরে এসে বৈধ ব্যাংকিং চ্যানেলের দিকে ঝুঁকেছেন। এর ফল ছিল নাটকীয় রেমিট্যান্স। ২০২৩ সালের ২১ বিলিয়ন ডলার থেকে বেড়ে ২০২৫ সালে ৩০ বিলিয়ন ডলারে পৌঁছেছে। তুলনা করলে দেখা যায়, এই ৯ বিলিয়ন ডলার বৃদ্ধি আমেরিকান বাজারে বাংলাদেশের মোট বার্ষিক পোশাক রফতানির চেয়েও বেশি। যদি অবৈধ চ্যানেলের ওপর নিয়ন্ত্রণ শিথিল হয়, তবে বাংলাদেশ ব্যাংক এই গুরুত্বপূর্ণ বৈদেশিক মুদ্রার প্রবাহ হারাতে পারে।
প্রায় ১০ লাখ বাংলাদেশি প্রতিবছর চাকরির জন্য বিদেশে যান। এটি দেশের অর্থনীতির জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ নিরাপত্তার পথ, কারণ প্রতিবছর ২০ লাখ নতুন কর্মপ্রত্যাশী তৈরি হলেও দেশটির অর্থনীতি সবাইকে জায়গা দিতে পারছে না। দুর্ভাগ্যবশত, শ্রম রপ্তানি খাতে তীব্র দুর্নীতি ও শোষণ বিদ্যমান। বেশ কিছু দেশ এরই মধ্যে বাংলাদেশি কর্মীদের জন্য তাদের দরজা বন্ধ করে দিয়েছে, যা নতুন সুযোগের জন্য দেশটিকে বিপজ্জনকভাবে সৌদি আরবের ওপর নির্ভরশীল করে তুলেছে।
বাংলাদেশের অর্থনৈতিক পুনর্গঠন বিষয়ক একটি প্রতিবেদনের নেতৃত্ব দিয়েছেন বিশিষ্ট অর্থনীতিবিদ খান আহমেদ সাঈদ মুরশিদ। দেশে সামগ্রিক সংস্কারের বিষয়ে তিনি বাস্তববাদী হওয়ার পরামর্শ দিয়েছেন। তার মতে, বিএনপির উচিত বড় পরিকল্পনা মাথায় রাখা, তবে জরুরি বাস্তবায়নের জন্য ‘উচ্চ-প্রভাবশালী ছোট ছোট প্রকল্পে’র দিকেও দৃষ্টিপাত করা। নতুন প্রশাসনকে অবশ্যই শিল্পের জন্য নির্ভরযোগ্য জ্বালানি সরবরাহ নিশ্চিত এবং ক্ষতিগ্রস্ত আর্থিক খাত মেরামত করতে হবে। সব কিছুর ওপরে বড় ঝুঁকি হিসেবে দেখা দিচ্ছে ২০২৬ সালের নভেম্বরে স্বল্পোন্নত দেশ (এলডিসি) থেকে উত্তরণ, যার ফলে বাংলাদেশ সেই বাণিজ্যিক সুবিধাগুলো হারাবে, যার ওপর রফতানিকারকরা এখনও নির্ভরশীল।
বড় পরিসরে অর্থনীতি পুনরুজ্জীবিত করা একটি দেশের ভূ-রাজনৈতিক সম্পর্কের সঙ্গেও জড়িত। তারেক রহমানের প্রাথমিক পদক্ষেপগুলো থেকে অগ্রাধিকারের ক্ষেত্রে কিছুটা বিভ্রান্তি লক্ষ করা যাচ্ছে। নির্বাচনি ইশতেহারে বিএনপি আসিয়ানে যোগ দেওয়ার ইচ্ছা প্রকাশ করেছে। কিন্তু আন্তর্জাতিক সাংবাদিকদের সামনে প্রথম উপস্থিত হয়ে তারেক রহমান সার্কের ওপর গুরুত্বারোপ করেন, যা ১৯৮০ সালে তার বাবা ও তৎকালীন রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান শুরু করেছিলেন। সার্ক বর্তমানে একটি অকার্যকর আঞ্চলিক সংস্থা। গত বছর ভারত-পাকিস্তান যুদ্ধ, তাদের দ্বিপাক্ষিক সম্পর্কের সঙ্গে উপমহাদেশের সার্বিক আন্তঃসীমান্ত বাণিজ্যও অন্যতম অনুঘটক।
অপরদিকে আসিয়ান সদস্য দেশ মিয়ানমারের সঙ্গে আছে বাংলাদেশের সীমান্ত। মিয়ানমার থেকে আসা ১০ লাখের বেশি রোহিঙ্গা শরণার্থী এখনও বাংলাদেশে মানবেতর জীবন কাটাচ্ছে, যার কোনো সমাধান এখন পর্যন্ত দেখা যাচ্ছে না। আসিয়ানে যোগ দিলে বাংলাদেশ বৈচিত্র্যময় সরবরাহ শৃঙ্খল এবং সরাসরি বিদেশি বিনিয়োগের সুযোগ পাবে বলেও ধারণা করা হচ্ছে।
ভারতের সঙ্গে বাংলাদেশের দীর্ঘতম সীমান্ত থাকলেও ২০২৪ সালে শেখ হাসিনার পতনের পর দুই দেশের সম্পর্ক তিক্ত হয়ে ওঠে। শেখ হাসিনা ভারতে পালিয়ে যান এবং তাকে বিচারের জন্য হস্তান্তরে দিল্লির অস্বীকৃতি ঢাকায় তীব্র সমালোচনারও জন্ম দেয়। বিভিন্ন বক্তব্যের কারণে দুই দেশের মধ্যে কার্যত ভিসা কার্যক্রমও এখন স্থগিত। ক্রীড়াক্ষেত্রেও ভালো সম্পর্কের অবনতি দেখা গেছে।
এই প্রেক্ষাপটে ভারতের প্রতি ব্যাপক ক্ষোভ ও অবিশ্বাসের প্রেক্ষাপটে দিল্লির সঙ্গে সম্পর্ক উন্নয়নের ক্ষেত্রে বিএনপিকে অত্যন্ত সতর্কতার সঙ্গে পা বাড়াতে হবে। অন্যদিকে অবকাঠামো বা নতুন শিল্পে বিনিয়োগের ক্ষেত্রে চীনের সঙ্গে প্রতিযোগিতা করার ক্ষমতা ভারতের অত্যন্ত কম। দিল্লির বিরুদ্ধে একপেশে চুক্তি চাপিয়ে দেওয়ারও অভিযোগ আছে, বিশেষ করে আদানি গ্রুপের সঙ্গে বিদ্যুৎ চুক্তি। এই গ্রুপটির সঙ্গে ভারত সরকারের ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক আছে এবং তারা বাংলাদেশের ১৫ শতাংশ বিদ্যুৎ সরবরাহ করে।
দিল্লির উচিত হবে আমদানির ক্ষেত্রে অশুল্ক বাধাগুলো উল্লেখযোগ্যভাবে কমানো অথবা ভাটির দেশ বাংলাদেশের দিকে পানির ন্যায্য প্রবাহে একমত হওয়া। এই ফ্রন্টগুলোর কোনোটিতেই দিল্লির নমনীয় হওয়ার সম্ভাবনা কম হওয়ায় ভবিষ্যতে দুই দেশের যেকোনো সমঝোতা সীমিত থাকবে বলে মনে হয়।
তারেক রহমানের জন্য সবচেয়ে বড় পরীক্ষা হবে পররাষ্ট্রনীতি ও অর্থনৈতিক পরিসরে যুক্তরাষ্ট্র ও চীনের মধ্যে ভারসাম্য রক্ষা করা। চীন বাংলাদেশের বৃহত্তম বাণিজ্য অংশীদার, যাদের সঙ্গে বার্ষিক প্রায় ১৮ বিলিয়ন ডলারের দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্য আছে। বেইজিং ঢাকার প্রধান প্রতিরক্ষা সরঞ্জাম সরবরাহকারীও বটে। সম্প্রতি দুই দেশ বাংলাদেশে একটি ড্রোন তৈরির কারখানা স্থাপনের চুক্তি করেছে। বেইজিং বেল্ট অ্যান্ড রোড ইনিশিয়েটিভের অংশ হিসেবে বাংলাদেশে ২৪ বিলিয়ন ডলারের বেশি বিনিয়োগের প্রতিশ্রুতি দিয়েছে।
অপরদিকে যুক্তরাষ্ট্র বাংলাদেশের পোশাক রফতানির একক বৃহত্তম বাজার এবং জ্বালানি খাতে বিনিয়োগে তারা শীর্ষে আছে। জাতীয় নির্বাচনের কয়েক দিন আগে ঢাকায় নবনিযুক্ত মার্কিন রাষ্ট্রদূত ব্রেন্ট ক্রিস্টেনসেন বলেন, তিনি নতুন সরকারের সঙ্গে নির্দিষ্ট কিছু ক্ষেত্রে চীনের সঙ্গে সম্পৃক্ততার ‘ঝুঁকিগুলো স্পষ্টভাবে তুলে ধরবেন।’ তার এ বক্তব্যে তীব্র প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি হয়েছে বেইজিংয়ে।
ক্রিস্টেনসেন ইঙ্গিত দেন, ওয়াশিংটন সামরিক সহযোগিতার মাধ্যমে যে ‘সুযোগ-সুবিধা’ অফার করে থাকে, তার ওপর জোর দেবে। তিনি আরও বলেন, মার্কিন কোম্পানিগুলো বাংলাদেশে বিনিয়োগের সম্ভাবনা যাচাই করছে। এ ক্ষেত্রে বর্তমান সরকার যে বিনিয়োগবান্ধব, সে বিষয়ে তারেক রহমান সরকারের সুস্পষ্ট ইঙ্গিতের অপেক্ষায় আছেন তারা।
বাংলাদেশি অভিজাত শ্রেণির রাজনৈতিক ঝোঁক পশ্চিমের দিকে হলেও তারা জানেন যে, অবকাঠামো বিনিয়োগ মূলত এশিয়া থেকেই এসেছে। জাপান ও চীন সেতু, বন্দর ও রেলপথ নির্মাণে নেতৃত্ব দিচ্ছে। বেইজিং নদীর পানি সঞ্চয় করে সেচ কাজে সহায়তার জন্য ১ বিলিয়ন ডলারের একটি প্রকল্পে অর্থায়নের প্রস্তাব দিয়েছে। গত বছর ১৪৩টি চীনা কোম্পানির একটি প্রতিনিধিদল বাংলাদেশ সফর করে গেলেও তারা অন্তর্বর্তী সরকারের কার্যক্রমে খুব একটা সন্তুষ্ট হতে পারেনি।
চীনারা অপেক্ষায় আছে তারেক রহমান সরকারের সঙ্গে যুক্ত হওয়ার। তিনি যদি ওয়াশিংটনকে ‘সুস্পষ্ট সংকেত’ দেন, তবে আমেরিকান ব্যবসায়ীদের দ্রুত পদক্ষেপ নিতে হবে। তা না হলে চীনা বিনিয়োগের জন্য তারেক রহমান বেইজিং সফরে যেতে পারেন।
সরকারের প্রধান হিসেবে নতুন দায়িত্ব ও সার্বিক চ্যালেঞ্জগুলো বিশাল হলেও তারেক রহমানের সামনে অর্থনীতি পুনরুজ্জীবিত করা ও বাংলাদেশে স্থিতিশীলতা ফিরিয়ে আনার সুযোগ আছে। সাবেক রাষ্ট্রপতি বাবা ও সাবেক প্রধানমন্ত্রী মায়ের সন্তান তারেক রহমান নিজ দেশসহ আঞ্চলিক সহযোগিতা সংস্থাগুলোর সঙ্গে কাজ করতেও আগ্রহ দেখিয়েছেন। প্রধানমন্ত্রী তারেক দক্ষিণ এশিয়ার রাজনৈতিক অনুঘটক হিসেবে কতটা সফল হন সেটিই এখন দেখার বিষয়।
ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে তারেক রহমান নেতৃত্বাধীন বিএনপি দুই-তৃতীয়াংশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা পেয়েছে। ২০২৪ সালের ছাত্র-জনতা নেতৃত্বাধীন বিপ্লবের পর গত ১২ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠিত এই প্রথম নির্বাচনে ক্ষমতাচ্যুত সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার দল আওয়ামী লীগ নিষেধাজ্ঞার কারণে অংশগ্রহণ করতে পারেনি।
আবার এই নির্বাচনের মধ্য দিয়ে বাংলাদেশে ইসলামপন্থি দল জামায়াতে ইসলামীর আবির্ভাবও ঘটেছে। ১৯৭১ সালে দেশ স্বাধীনের পর থেকে আওয়ামী লীগ এবং বিএনপিই পালাক্রমে শাসন করেছে ঢাকার মসনদ। জামায়াত এককভাবে কখনো ক্ষমতায় না থাকলেও কখনো দুর্নীতিতে না জড়ানোর গৌরব আছে দলটির। এবার তারা ভারতের পশ্চিমবঙ্গ রাজ্যের সীমান্তবর্তী অঞ্চলে ভালো সমর্থন পেয়েছে।
জাতীয় সংসদে নিরঙ্কুশ ক্ষমতার সুবাদে বিএনপি সরকার শুরুতে যা ইচ্ছা তা-ই করতে পারে এবং নিজেদের খুশিমতো নতুন আইনও প্রণয়ন করতে পারে— এমনটা ভাবা হলেও অর্থনীতির ক্ষেত্রে হোঁচট খেলে বিএনপি সরকার একদিকে জামায়াত এবং অন্যদিকে আওয়ামী লীগের সুপ্ত জনসমর্থনের চাপের মুখে পড়তে পারে।
লক্ষণীয় বিষয় হলো, কর্মসংস্থান ও দুর্নীতি নিয়ে তরুণ প্রজন্মের অসন্তোষ সহজে মিটে যাওয়ার সম্ভাবনা কম। প্রধানমন্ত্রী হিসেবে সদ্য শপথ নেওয়া তারেক রহমানকে রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা বজায় রাখতে কঠোর পরিশ্রম করতে হবে। তবে তার রাজনৈতিক সাফল্য নির্ভর করবে অর্থনীতি পুনরুজ্জীবিত করার ওপর।
বিএনপি ২০৩৪ সালের মধ্যে জিডিপির আকার ৪৬০ বিলিয়ন ডলার থেকে বাড়িয়ে ১ ট্রিলিয়ন ডলারে নেওয়ার অর্থাৎ অর্থনীতি দ্বিগুণ করার প্রতিশ্রুতি দিয়েছে। এই লক্ষ্য অর্জনে প্রায় ৯ শতাংশ বার্ষিক প্রবৃদ্ধি প্রয়োজন, যা বর্তমানে ৪ শতাংশ প্রবৃদ্ধির দেশে একটি বিশাল চ্যালেঞ্জ। দলটি শিক্ষা খাতে বরাদ্দ জিডিপির ২ শতাংশ থেকে বাড়িয়ে ৬ শতাংশ এবং স্বাস্থ্য খাতে শূন্য দশমিক ৭৫ শতাংশ থেকে বাড়িয়ে ৫ শতাংশ করার প্রতিশ্রুতি দিয়েছে। কিন্তু এ ধরনের উচ্চাভিলাষী লক্ষ্য পূরণে প্রয়োজনীয় সরকারি রাজস্ব বাড়ানোর কোনো বিশ্বাসযোগ্য পরিকল্পনা এখনো নেই। প্রবৃদ্ধির হার দ্বিগুণের বেশি করতে হলে বেসরকারি বিনিয়োগ জিডিপির ২৩ শতাংশ থেকে বাড়িয়ে ৩৫ শতাংশ করতে হবে।
এদিকে গত দেড় বছর ধরে উচ্চ সুদহার অর্থনীতিবিদ ও ব্যবসায়ী মহলে তীব্র সমালোচনার জন্ম দিয়েছে। অনেকেই মনে করছেন, শুধু মুদ্রানীতিই নয়; বরং বণ্টনব্যবস্থার কাঠামোগত সমস্যাই উচ্চ খাদ্যমূল্যের প্রধান কারণ। এটিই তারেক রহমান সরকারের সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ।
জিডিপির ১২ শতাংশ আসে কৃষি থেকে এবং বাংলাদেশের প্রায় ৫ কোটি মানুষ (কর্মসংস্থানের ৪৪ শতাংশ) এই খাতে যুক্ত। শহরাঞ্চলে খাদ্যের দাম কমাতে এবং চাপের মুখে থাকা কৃষকদের ন্যায্যমূল্য নিশ্চিত করতে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানকে খামার থেকে শহর পর্যন্ত খাদ্য সরবরাহ প্রক্রিয়ায় থাকা শক্তিশালী ও অনিয়ন্ত্রিত মধ্যস্বত্বভোগীদের দমনে কঠোর পদক্ষেপ নিতে হবে। সরবরাহ ও দাম নিয়ন্ত্রণে রাখতে তাকে ফসল কাটার পরবর্তী লজিস্টিক খাতেও বিনিয়োগ করতে হবে।
প্রবাসী আয় একটি বড় উৎস মনে করিয়ে দিয়ে প্রতিবেদনে বলা হয়, আরেকটি অগ্রাধিকার হতে হবে প্রবাসী কর্মীদের রেমিট্যান্স বা রেমিট্যান্স ব্যবস্থাপনা, যা আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (আইএমএফ) যেকোনো প্রোগ্রামের চেয়ে কম গুরুত্বপূর্ণ নয়। প্রায় ১ কোটি বাংলাদেশি বিদেশে, বিশেষ করে উপসাগরীয় দেশগুলোতে কাজ করেন। তারা বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ রক্ষায় আইএমএফের চেয়েও বেশি ভূমিকা রাখছেন। মাত্র তিন মাসে তারা প্রায় ৭ দশমিক ৫ বিলিয়ন ডলার পাঠিয়েছেন, যা দেশটির জন্য দেওয়া আইএমএফের পুরো সহায়তা প্যাকেজের সমান।
২০২৪ সালে আওয়ামী লীগ সরকার ক্ষমতাচ্যুত হওয়ার পর অনেক প্রবাসীকর্মী অবৈধ হুন্ডি চ্যানেল থেকে সরে এসে বৈধ ব্যাংকিং চ্যানেলের দিকে ঝুঁকেছেন। এর ফল ছিল নাটকীয় রেমিট্যান্স। ২০২৩ সালের ২১ বিলিয়ন ডলার থেকে বেড়ে ২০২৫ সালে ৩০ বিলিয়ন ডলারে পৌঁছেছে। তুলনা করলে দেখা যায়, এই ৯ বিলিয়ন ডলার বৃদ্ধি আমেরিকান বাজারে বাংলাদেশের মোট বার্ষিক পোশাক রফতানির চেয়েও বেশি। যদি অবৈধ চ্যানেলের ওপর নিয়ন্ত্রণ শিথিল হয়, তবে বাংলাদেশ ব্যাংক এই গুরুত্বপূর্ণ বৈদেশিক মুদ্রার প্রবাহ হারাতে পারে।
প্রায় ১০ লাখ বাংলাদেশি প্রতিবছর চাকরির জন্য বিদেশে যান। এটি দেশের অর্থনীতির জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ নিরাপত্তার পথ, কারণ প্রতিবছর ২০ লাখ নতুন কর্মপ্রত্যাশী তৈরি হলেও দেশটির অর্থনীতি সবাইকে জায়গা দিতে পারছে না। দুর্ভাগ্যবশত, শ্রম রপ্তানি খাতে তীব্র দুর্নীতি ও শোষণ বিদ্যমান। বেশ কিছু দেশ এরই মধ্যে বাংলাদেশি কর্মীদের জন্য তাদের দরজা বন্ধ করে দিয়েছে, যা নতুন সুযোগের জন্য দেশটিকে বিপজ্জনকভাবে সৌদি আরবের ওপর নির্ভরশীল করে তুলেছে।
বাংলাদেশের অর্থনৈতিক পুনর্গঠন বিষয়ক একটি প্রতিবেদনের নেতৃত্ব দিয়েছেন বিশিষ্ট অর্থনীতিবিদ খান আহমেদ সাঈদ মুরশিদ। দেশে সামগ্রিক সংস্কারের বিষয়ে তিনি বাস্তববাদী হওয়ার পরামর্শ দিয়েছেন। তার মতে, বিএনপির উচিত বড় পরিকল্পনা মাথায় রাখা, তবে জরুরি বাস্তবায়নের জন্য ‘উচ্চ-প্রভাবশালী ছোট ছোট প্রকল্পে’র দিকেও দৃষ্টিপাত করা। নতুন প্রশাসনকে অবশ্যই শিল্পের জন্য নির্ভরযোগ্য জ্বালানি সরবরাহ নিশ্চিত এবং ক্ষতিগ্রস্ত আর্থিক খাত মেরামত করতে হবে। সব কিছুর ওপরে বড় ঝুঁকি হিসেবে দেখা দিচ্ছে ২০২৬ সালের নভেম্বরে স্বল্পোন্নত দেশ (এলডিসি) থেকে উত্তরণ, যার ফলে বাংলাদেশ সেই বাণিজ্যিক সুবিধাগুলো হারাবে, যার ওপর রফতানিকারকরা এখনও নির্ভরশীল।
বড় পরিসরে অর্থনীতি পুনরুজ্জীবিত করা একটি দেশের ভূ-রাজনৈতিক সম্পর্কের সঙ্গেও জড়িত। তারেক রহমানের প্রাথমিক পদক্ষেপগুলো থেকে অগ্রাধিকারের ক্ষেত্রে কিছুটা বিভ্রান্তি লক্ষ করা যাচ্ছে। নির্বাচনি ইশতেহারে বিএনপি আসিয়ানে যোগ দেওয়ার ইচ্ছা প্রকাশ করেছে। কিন্তু আন্তর্জাতিক সাংবাদিকদের সামনে প্রথম উপস্থিত হয়ে তারেক রহমান সার্কের ওপর গুরুত্বারোপ করেন, যা ১৯৮০ সালে তার বাবা ও তৎকালীন রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান শুরু করেছিলেন। সার্ক বর্তমানে একটি অকার্যকর আঞ্চলিক সংস্থা। গত বছর ভারত-পাকিস্তান যুদ্ধ, তাদের দ্বিপাক্ষিক সম্পর্কের সঙ্গে উপমহাদেশের সার্বিক আন্তঃসীমান্ত বাণিজ্যও অন্যতম অনুঘটক।
অপরদিকে আসিয়ান সদস্য দেশ মিয়ানমারের সঙ্গে আছে বাংলাদেশের সীমান্ত। মিয়ানমার থেকে আসা ১০ লাখের বেশি রোহিঙ্গা শরণার্থী এখনও বাংলাদেশে মানবেতর জীবন কাটাচ্ছে, যার কোনো সমাধান এখন পর্যন্ত দেখা যাচ্ছে না। আসিয়ানে যোগ দিলে বাংলাদেশ বৈচিত্র্যময় সরবরাহ শৃঙ্খল এবং সরাসরি বিদেশি বিনিয়োগের সুযোগ পাবে বলেও ধারণা করা হচ্ছে।
ভারতের সঙ্গে বাংলাদেশের দীর্ঘতম সীমান্ত থাকলেও ২০২৪ সালে শেখ হাসিনার পতনের পর দুই দেশের সম্পর্ক তিক্ত হয়ে ওঠে। শেখ হাসিনা ভারতে পালিয়ে যান এবং তাকে বিচারের জন্য হস্তান্তরে দিল্লির অস্বীকৃতি ঢাকায় তীব্র সমালোচনারও জন্ম দেয়। বিভিন্ন বক্তব্যের কারণে দুই দেশের মধ্যে কার্যত ভিসা কার্যক্রমও এখন স্থগিত। ক্রীড়াক্ষেত্রেও ভালো সম্পর্কের অবনতি দেখা গেছে।
এই প্রেক্ষাপটে ভারতের প্রতি ব্যাপক ক্ষোভ ও অবিশ্বাসের প্রেক্ষাপটে দিল্লির সঙ্গে সম্পর্ক উন্নয়নের ক্ষেত্রে বিএনপিকে অত্যন্ত সতর্কতার সঙ্গে পা বাড়াতে হবে। অন্যদিকে অবকাঠামো বা নতুন শিল্পে বিনিয়োগের ক্ষেত্রে চীনের সঙ্গে প্রতিযোগিতা করার ক্ষমতা ভারতের অত্যন্ত কম। দিল্লির বিরুদ্ধে একপেশে চুক্তি চাপিয়ে দেওয়ারও অভিযোগ আছে, বিশেষ করে আদানি গ্রুপের সঙ্গে বিদ্যুৎ চুক্তি। এই গ্রুপটির সঙ্গে ভারত সরকারের ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক আছে এবং তারা বাংলাদেশের ১৫ শতাংশ বিদ্যুৎ সরবরাহ করে।
দিল্লির উচিত হবে আমদানির ক্ষেত্রে অশুল্ক বাধাগুলো উল্লেখযোগ্যভাবে কমানো অথবা ভাটির দেশ বাংলাদেশের দিকে পানির ন্যায্য প্রবাহে একমত হওয়া। এই ফ্রন্টগুলোর কোনোটিতেই দিল্লির নমনীয় হওয়ার সম্ভাবনা কম হওয়ায় ভবিষ্যতে দুই দেশের যেকোনো সমঝোতা সীমিত থাকবে বলে মনে হয়।
তারেক রহমানের জন্য সবচেয়ে বড় পরীক্ষা হবে পররাষ্ট্রনীতি ও অর্থনৈতিক পরিসরে যুক্তরাষ্ট্র ও চীনের মধ্যে ভারসাম্য রক্ষা করা। চীন বাংলাদেশের বৃহত্তম বাণিজ্য অংশীদার, যাদের সঙ্গে বার্ষিক প্রায় ১৮ বিলিয়ন ডলারের দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্য আছে। বেইজিং ঢাকার প্রধান প্রতিরক্ষা সরঞ্জাম সরবরাহকারীও বটে। সম্প্রতি দুই দেশ বাংলাদেশে একটি ড্রোন তৈরির কারখানা স্থাপনের চুক্তি করেছে। বেইজিং বেল্ট অ্যান্ড রোড ইনিশিয়েটিভের অংশ হিসেবে বাংলাদেশে ২৪ বিলিয়ন ডলারের বেশি বিনিয়োগের প্রতিশ্রুতি দিয়েছে।
অপরদিকে যুক্তরাষ্ট্র বাংলাদেশের পোশাক রফতানির একক বৃহত্তম বাজার এবং জ্বালানি খাতে বিনিয়োগে তারা শীর্ষে আছে। জাতীয় নির্বাচনের কয়েক দিন আগে ঢাকায় নবনিযুক্ত মার্কিন রাষ্ট্রদূত ব্রেন্ট ক্রিস্টেনসেন বলেন, তিনি নতুন সরকারের সঙ্গে নির্দিষ্ট কিছু ক্ষেত্রে চীনের সঙ্গে সম্পৃক্ততার ‘ঝুঁকিগুলো স্পষ্টভাবে তুলে ধরবেন।’ তার এ বক্তব্যে তীব্র প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি হয়েছে বেইজিংয়ে।
ক্রিস্টেনসেন ইঙ্গিত দেন, ওয়াশিংটন সামরিক সহযোগিতার মাধ্যমে যে ‘সুযোগ-সুবিধা’ অফার করে থাকে, তার ওপর জোর দেবে। তিনি আরও বলেন, মার্কিন কোম্পানিগুলো বাংলাদেশে বিনিয়োগের সম্ভাবনা যাচাই করছে। এ ক্ষেত্রে বর্তমান সরকার যে বিনিয়োগবান্ধব, সে বিষয়ে তারেক রহমান সরকারের সুস্পষ্ট ইঙ্গিতের অপেক্ষায় আছেন তারা।
বাংলাদেশি অভিজাত শ্রেণির রাজনৈতিক ঝোঁক পশ্চিমের দিকে হলেও তারা জানেন যে, অবকাঠামো বিনিয়োগ মূলত এশিয়া থেকেই এসেছে। জাপান ও চীন সেতু, বন্দর ও রেলপথ নির্মাণে নেতৃত্ব দিচ্ছে। বেইজিং নদীর পানি সঞ্চয় করে সেচ কাজে সহায়তার জন্য ১ বিলিয়ন ডলারের একটি প্রকল্পে অর্থায়নের প্রস্তাব দিয়েছে। গত বছর ১৪৩টি চীনা কোম্পানির একটি প্রতিনিধিদল বাংলাদেশ সফর করে গেলেও তারা অন্তর্বর্তী সরকারের কার্যক্রমে খুব একটা সন্তুষ্ট হতে পারেনি।
চীনারা অপেক্ষায় আছে তারেক রহমান সরকারের সঙ্গে যুক্ত হওয়ার। তিনি যদি ওয়াশিংটনকে ‘সুস্পষ্ট সংকেত’ দেন, তবে আমেরিকান ব্যবসায়ীদের দ্রুত পদক্ষেপ নিতে হবে। তা না হলে চীনা বিনিয়োগের জন্য তারেক রহমান বেইজিং সফরে যেতে পারেন।
সরকারের প্রধান হিসেবে নতুন দায়িত্ব ও সার্বিক চ্যালেঞ্জগুলো বিশাল হলেও তারেক রহমানের সামনে অর্থনীতি পুনরুজ্জীবিত করা ও বাংলাদেশে স্থিতিশীলতা ফিরিয়ে আনার সুযোগ আছে। সাবেক রাষ্ট্রপতি বাবা ও সাবেক প্রধানমন্ত্রী মায়ের সন্তান তারেক রহমান নিজ দেশসহ আঞ্চলিক সহযোগিতা সংস্থাগুলোর সঙ্গে কাজ করতেও আগ্রহ দেখিয়েছেন। প্রধানমন্ত্রী তারেক দক্ষিণ এশিয়ার রাজনৈতিক অনুঘটক হিসেবে কতটা সফল হন সেটিই এখন দেখার বিষয়।
মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের শুল্ক যুদ্ধে হঠাৎই বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে দেশটির সুপ্রিম কোর্ট। ডোনাল্ড ট্রাম্পের বহুল আলোচিত 'ইউনিভার্সাল বেসলাইন ট্যারিফ' যুক্তরাষ্ট্রের সংবিধানের পরিপন্থি এবং আইনিভাবে অবৈধ বলে ঘোষণা করেছেন প্রধান বিচারপতি জন রবার্টসের নেতৃত্বাধীন বেঞ্চ।
এই রায় কেবল আমেরিকার অভ্যন্তরীণ বিষয় নয়, বরং এর ওপর নির্ভর করছে বিশ্ব অর্থনীতির উত্থান-পতন। অনেক দেশের মতো বাংলাদেশের জন্যও বড় মাথা ব্যাথার কারণ ট্রাম্পের এই শুল্কনীতি।
২০২৪ সালের নির্বাচনে জয়লাভের পর ডোনাল্ড ট্রাম্প তার 'আমেরিকা ফার্স্ট' নীতিকে নতুন উচ্চতায় নিয়ে যান। ২০২৫ সালের শুরুতেই তিনি ঘোষণা করেন, পৃথিবীর যেকোনো দেশ থেকে আমেরিকায় পণ্য ঢুকলে তার ওপর ১০ থেকে ২০ শতাংশ পর্যন্ত অতিরিক্ত শুল্ক দিতে হবে।
বাংলাদেশের জন্য এটি ছিল বিনামেঘে বজ্রপাত। ভিয়েতনাম বা ভারতের তুলনায় বাংলাদেশের শ্রমমূল্য কম হলেও মার্কিন শুল্কের কারণে বাংলাদেশি পোশাকের দাম আমেরিকায় আকাশচুম্বী হয়ে যায়।
ফলে ওয়ালমার্ট, গ্যাপ বা এইচঅ্যান্ডএম-এর মতো বড় বড় ক্রেতারা বাংলাদেশ থেকে মুখ ফিরিয়ে নেওয়ার হুমকি দেয়।
২০২৫ সালের দোসরা এপ্রিল ডোনাল্ড ট্রাম্পের একটি নির্বাহী আদেশের মাধ্যমে বাংলাদেশসহ বিশ্বের বিভিন্ন দেশের উপর বিভিন্ন হারে রেসিপ্রোকাল ট্যারিফ বা পাল্টা শুল্ক আরোপ করে যুক্তরাষ্ট্র, যেটা বিশ্ব অর্থনীতিতে একধরনের অস্থিরতা সৃষ্টি করেছিলো। বাংলাদেশ পড়ে ৩৫ শতাংশ শুল্কের আওতায়।
শেষ পর্যন্ত দরকষাকষি শেষে উভয় পক্ষ 'অ্যাগ্রিমেন্ট অন রেসিপ্রোকাল ট্রেড' নামে এই বাণিজ্য চুক্তিতে স্বাক্ষর করে, যার ফলে বাংলাদেশের উপর মার্কিন পাল্টা শুল্ক দাঁড়ায় ১৯ শতাংশ। যার বিনিময়ে বাংলাদেশকে আমেরিকা থেকে বিপুল পরিমাণ তুলা, সয়াবিন এবং অন্তত চারটি বোয়িং বিমান কিনতে সম্মত হয়। তখন এই চুক্তিকে বাংলাদেশের অর্থনীতিবিদরা 'অসম' এবং 'জবরদস্তিমূলক' বলে সমালোচনা করেছিলেন।
মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সুপ্রিম কোর্ট শুল্ক নিয়ে সম্প্রতি যে রায় দিয়েছে সেখানে বলা হয়েছে, প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প যে ইন্টারন্যাশনাল ইমারজেন্সি ইকোনমিক পাওয়ারস অ্যাক্ট বা আইইইপিএ ব্যবহার করে শুল্ক বসিয়েছিলেন, সেটি জাতীয় নিরাপত্তার অজুহাতে হলেও আসলে ছিল অর্থনৈতিক জবরদস্তি।
এই রায়ের ফলে এতদিন ধরে বাংলদেশ, ভারতসহ বিভিন্ন দেশের ওপর ট্রাম্প প্রশাসন যে পাল্টা শুল্ক আরোপের চুক্তি করছিল সেটি আর কার্যকর থাকছে না। তবে পিছু হটেননি ট্রাম্প। আদালতের রায়ের কয়েক ঘণ্টার মাথায় তিনিও অন্য একটি আইনে নতুন করে ১০ শতাংশ শুল্ক ঘোষণা করেছেন।
হোয়াইট হাউসের একজন কর্মকর্তা জানিয়েছেন যে, যুক্তরাজ্য, ভারত এবং ইউরোপীয় ইউনিয়ন-সহ আমেরিকার সাথে বাণিজ্য চুক্তি সম্পন্ন দেশগুলোকে এখন থেকে তাদের পূর্বে আলোচনা করা শুল্ক হারের পরিবর্তে 'ধারা ১২২' এর অধীনে বিশ্বব্যাপী ১০ শতাংশ শুল্কের সম্মুখীন হতে হবে।
তিনি জানিয়েছেন, শুল্কের বিষয়টি পরিবর্তন হলেও বাণিজ্য চুক্তি বাতিল হচ্ছে না। তাই চুক্তির অধীনে যেসব বিষয়ে সম্মতি বা যেসব শর্ত রয়েছে সেগুলো মেনে চলবে বলেই আশা করে ট্রাম্প প্রশাসন।
বিশ্ব বাণিজ্যে অন্য দেশের ওপর শুল্ক আরোপের বিষয়ে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট নয়, বরং কংগ্রেসের হাতেই সর্বোচ্চ ক্ষমতা।
ট্রাম্প যে আইনের উপর ভিত্তিতে শুল্ক আরোপ করেছিলেন, সেটি মূলত ১৯৭৭ সালের জরুরি অর্থনৈতিক ক্ষমতা আইনে, যেখানে ট্রাম্পকে এত ব্যাপক ক্ষমতা দেওয়া হয়নি। শুল্ক ইস্যুতে দেশটির সুপ্রিম কোর্টের রায়ের পর, এই রায় কার্যকরে প্রক্রিয়া নিয়ে নানা আলোচনা চলছে। এছাড়া যেসব বড় কোম্পানি ইতোমধ্যে বাড়তি হারে শুল্ক পরিশোধ করেছে তাদের অর্থ ফেরত দেওয়া হবে কিনা এমন নানা জটিলতাও রয়েছে।
সুপ্রিম কোর্টের এমন রায় নিয়ে ক্ষুব্ধ হয়েছেন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প।
রায় প্রকাশের কয়েক ঘণ্টা পর হোয়াইট হাউজে এক সংবাদ সম্মেলনে তিনি বলেন, আমি আদালতের কিছু সদস্যকে নিয়ে লজ্জিত। আমাদের দেশের স্বার্থে সঠিক কাজটি করার সাহস দেখাতে না পারায় আমি তাদের নিয়ে পুরোপুরি লজ্জিত।
নতুন করে ১০ শতাংশ শুল্ক আরোপের যে সিদ্ধান্ত ট্রাম্প জানিয়েছেন, যুক্তরাষ্ট্রের আইন অনুযায়ী এই পথে পরবর্তী পদক্ষেপ নেওয়ার এখতিয়ার প্রেসিডেন্টের হাতে রয়েছে।
ট্রেড অ্যাক্ট ১৯৭৪-এর ধারা ১২২ ব্যবহার করে নতুন শুল্ক আরোপের সিদ্ধান্ত নিয়েছেন ট্রাম্প।
নিয়ম অনুযায়ী, এই সময়ের মধ্যে মার্কিন কর্তৃপক্ষ যাচাই করবে যে সংশ্লিষ্ট দেশ আমেরিকার সঙ্গে বাণিজ্যের ক্ষেত্রে আনফেয়ার ট্রেড প্র্যাকটিস করছে কি না।
এই সময়ের মধ্যে সংশ্লিষ্ট দেশটির শ্রমবাজার, শ্রমিকের কর্ম-পরিবেশ, বেতন, পরিবেশ দূষণ, নারীদের কর্ম পরিবেশ এসব বিষয়ে অনিয়ম হচ্ছে কি না সেগুলো তদন্ত করবে মার্কিন প্রশাসন। এক্ষেত্রে সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে মার্কিন আইন অনুযায়ী। যদি কোনো অনিয়ম পাওয়া যায় তাহলে সংশ্লিষ্ট দেশটিকে ঘাটতি থাকা বিষয়গুলো ঠিক করতে আরও ১৫০ দিনের সময় দেওয়া হবে। তবে এই সময় ৫০ শতাংশ পর্যন্ত শুল্ক আরোপ করতে পারবে যুক্তরাষ্ট্র।
এক্ষেত্রে বাড়তি শুল্ক আরোপ বা বাণিজ্যিক সম্পর্ক রাখা না রাখার বিষয়ে পরবর্তী সিদ্ধান্ত নিতে কংগ্রেসের স্মরণাপন্ন হতে হবে। আর যদি কোনো অনিয়ম না পাওয়া যায় তাহলে শুল্ক শূন্যের কোটায় নামিয়ে ফিরতে হবে নিয়মিত বাণিজ্য প্রক্রিয়া বা চুক্তিতে।
বাংলাদেশের জন্য গুরুত্বপূর্ণ বাণিজ্য অংশীদার যুক্তরাষ্ট্র। যদিও দেশটির সঙ্গে বাংলাদেশের বড় বাণিজ্য ঘাটতি রয়েছে। দুই দেশের ৮০০ কোটি ডলারের বাণিজ্যে বাংলাদেশের রপ্তানি বেশি, আমদানি কম। পাল্টা শুল্ক আরোপের ক্ষেত্রে বাণিজ্য ঘাটতির এই বিষয়টিকে বড় করে সামনে এনেছিল ট্রাম্প প্রশাসন। একটি চুক্তিতে পৌঁছাতে বাংলাদেশও যুক্তরাষ্ট্র থেকে বিমান, কৃষিপণ্যসহ নানা পণ্য আমদানির সিদ্ধান্ত নিয়েছিল।
অবশ্য অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের বিদায়ের আগ মুহূর্তে যে চুক্তিটি যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে হয়েছে সেটি নিয়ে খুশি হতে পারেননি বাংলাদেশের অর্থনীতিবিদ কিংবা ব্যবসায়ীদের কেউই।
বাংলাদেশের নিট পোশাকশিল্প মালিকদের সংগঠন বিকেএমইএর সভাপতি মোহাম্মদ হাতেম বলেন, যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সম্প্রতি যে চুক্তি হয়েছে সেটি অসম। আমাদের প্রাপ্তির চেয়ে ক্ষয় বেশি, কঠিন কঠিন শর্ত ওখানে আছে। ট্রাম্পের ট্যারিফ শুরু থেকেই আনপ্রেডিক্টাবল, কখন কী হয় বলা যাচ্ছে না। এখন যে ১০ শতাংশ দিয়েছে সেটা আবার কয়দিন থাকে সেটাও তো অনিশ্চিত।
তবে যুক্তরাষ্ট্রের সুপ্রিম কোর্টের রায়ের পর পরিস্থিতি বদলেছে বলেই মত অর্থনীতিবিদদের। যদিও এ নিয়ে আলোচনার সময় এখনো আসেনি বলেই মনে করেন বিশ্বব্যাংকের ঢাকা কার্যালয়ের সাবেক মুখ্য অর্থনীতিবিদ ড. জাহিদ হোসেন।
তিনি বলেন, এই মুহূর্তে পুরনো চুক্তি নিয়ে আলোচনার চেষ্টা না করে বাংলাদেশের উচিত চুপ থেকে সময় নেওয়া। যে সমস্ত শর্তে আমরা চুক্তি করতে বাধ্য হয়েছি সেগুলো নিয়ে এখন আলোচনা করতে গেলে ট্রাম্প প্রশাসন বাংলাদেশের সঙ্গে বাণিজ্য কমানোর মতো কঠোর সিদ্ধান্তও নিতে পারে।
ড. জাহিদ হোসেন বলেন, যুক্তরাষ্ট্রের সুপ্রিমকোর্টের রায় আমাদের জন্য এটা সুখবর। তবে আলোচনার জন্য আরও অপেক্ষা করতে হবে, একইসাথে ভবিষ্যতের জন্য প্রস্তুতি নিয়ে রাখতে হবে। ট্রাম্প এখন যে ১০ শতাংশ শুল্ক আরোপের সিদ্ধান্ত জানিয়েছেন এটি ১৫০ দিন পর্যন্ত বহাল থাকবে। এর মধ্যে মার্কিন প্রশাসন তাদের মতো করে বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ পরিবেশ তদন্ত করবে। তাই বাংলাদেশের উচিত হবে যেসব বিষয়ে ঘাটতি রয়েছে সেগুলো ঠিক করা বা যথাযথ উত্তর নিয়ে প্রস্তুত থাকা। অবশ্য ১৫০ দিনের এই সময়ের মধ্যে যুক্তরাষ্ট্র এতগুলো দেশের তদন্ত শেষ করে ব্যবস্থা নেবে, এটি সম্ভব নয়।
তিনি বলেন, এতগুলো দেশে এই কম সময়ে যেসব বিষয় তদন্ত করতে হবে সেটি মার্কিন প্রশাসনের জন্যও সম্ভব না। এছাড়া যুক্তরাষ্ট্রের প্রধান লক্ষ্য তো চীন এবং তার প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বীরা।
বরিশাল টাইমস
মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের শুল্ক যুদ্ধে হঠাৎই বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে দেশটির সুপ্রিম কোর্ট। ডোনাল্ড ট্রাম্পের বহুল আলোচিত 'ইউনিভার্সাল বেসলাইন ট্যারিফ' যুক্তরাষ্ট্রের সংবিধানের পরিপন্থি এবং আইনিভাবে অবৈধ বলে ঘোষণা করেছেন প্রধান বিচারপতি জন রবার্টসের নেতৃত্বাধীন বেঞ্চ।
এই রায় কেবল আমেরিকার অভ্যন্তরীণ বিষয় নয়, বরং এর ওপর নির্ভর করছে বিশ্ব অর্থনীতির উত্থান-পতন। অনেক দেশের মতো বাংলাদেশের জন্যও বড় মাথা ব্যাথার কারণ ট্রাম্পের এই শুল্কনীতি।
২০২৪ সালের নির্বাচনে জয়লাভের পর ডোনাল্ড ট্রাম্প তার 'আমেরিকা ফার্স্ট' নীতিকে নতুন উচ্চতায় নিয়ে যান। ২০২৫ সালের শুরুতেই তিনি ঘোষণা করেন, পৃথিবীর যেকোনো দেশ থেকে আমেরিকায় পণ্য ঢুকলে তার ওপর ১০ থেকে ২০ শতাংশ পর্যন্ত অতিরিক্ত শুল্ক দিতে হবে।
বাংলাদেশের জন্য এটি ছিল বিনামেঘে বজ্রপাত। ভিয়েতনাম বা ভারতের তুলনায় বাংলাদেশের শ্রমমূল্য কম হলেও মার্কিন শুল্কের কারণে বাংলাদেশি পোশাকের দাম আমেরিকায় আকাশচুম্বী হয়ে যায়।
ফলে ওয়ালমার্ট, গ্যাপ বা এইচঅ্যান্ডএম-এর মতো বড় বড় ক্রেতারা বাংলাদেশ থেকে মুখ ফিরিয়ে নেওয়ার হুমকি দেয়।
২০২৫ সালের দোসরা এপ্রিল ডোনাল্ড ট্রাম্পের একটি নির্বাহী আদেশের মাধ্যমে বাংলাদেশসহ বিশ্বের বিভিন্ন দেশের উপর বিভিন্ন হারে রেসিপ্রোকাল ট্যারিফ বা পাল্টা শুল্ক আরোপ করে যুক্তরাষ্ট্র, যেটা বিশ্ব অর্থনীতিতে একধরনের অস্থিরতা সৃষ্টি করেছিলো। বাংলাদেশ পড়ে ৩৫ শতাংশ শুল্কের আওতায়।
শেষ পর্যন্ত দরকষাকষি শেষে উভয় পক্ষ 'অ্যাগ্রিমেন্ট অন রেসিপ্রোকাল ট্রেড' নামে এই বাণিজ্য চুক্তিতে স্বাক্ষর করে, যার ফলে বাংলাদেশের উপর মার্কিন পাল্টা শুল্ক দাঁড়ায় ১৯ শতাংশ। যার বিনিময়ে বাংলাদেশকে আমেরিকা থেকে বিপুল পরিমাণ তুলা, সয়াবিন এবং অন্তত চারটি বোয়িং বিমান কিনতে সম্মত হয়। তখন এই চুক্তিকে বাংলাদেশের অর্থনীতিবিদরা 'অসম' এবং 'জবরদস্তিমূলক' বলে সমালোচনা করেছিলেন।
মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সুপ্রিম কোর্ট শুল্ক নিয়ে সম্প্রতি যে রায় দিয়েছে সেখানে বলা হয়েছে, প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প যে ইন্টারন্যাশনাল ইমারজেন্সি ইকোনমিক পাওয়ারস অ্যাক্ট বা আইইইপিএ ব্যবহার করে শুল্ক বসিয়েছিলেন, সেটি জাতীয় নিরাপত্তার অজুহাতে হলেও আসলে ছিল অর্থনৈতিক জবরদস্তি।
এই রায়ের ফলে এতদিন ধরে বাংলদেশ, ভারতসহ বিভিন্ন দেশের ওপর ট্রাম্প প্রশাসন যে পাল্টা শুল্ক আরোপের চুক্তি করছিল সেটি আর কার্যকর থাকছে না। তবে পিছু হটেননি ট্রাম্প। আদালতের রায়ের কয়েক ঘণ্টার মাথায় তিনিও অন্য একটি আইনে নতুন করে ১০ শতাংশ শুল্ক ঘোষণা করেছেন।
হোয়াইট হাউসের একজন কর্মকর্তা জানিয়েছেন যে, যুক্তরাজ্য, ভারত এবং ইউরোপীয় ইউনিয়ন-সহ আমেরিকার সাথে বাণিজ্য চুক্তি সম্পন্ন দেশগুলোকে এখন থেকে তাদের পূর্বে আলোচনা করা শুল্ক হারের পরিবর্তে 'ধারা ১২২' এর অধীনে বিশ্বব্যাপী ১০ শতাংশ শুল্কের সম্মুখীন হতে হবে।
তিনি জানিয়েছেন, শুল্কের বিষয়টি পরিবর্তন হলেও বাণিজ্য চুক্তি বাতিল হচ্ছে না। তাই চুক্তির অধীনে যেসব বিষয়ে সম্মতি বা যেসব শর্ত রয়েছে সেগুলো মেনে চলবে বলেই আশা করে ট্রাম্প প্রশাসন।
বিশ্ব বাণিজ্যে অন্য দেশের ওপর শুল্ক আরোপের বিষয়ে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট নয়, বরং কংগ্রেসের হাতেই সর্বোচ্চ ক্ষমতা।
ট্রাম্প যে আইনের উপর ভিত্তিতে শুল্ক আরোপ করেছিলেন, সেটি মূলত ১৯৭৭ সালের জরুরি অর্থনৈতিক ক্ষমতা আইনে, যেখানে ট্রাম্পকে এত ব্যাপক ক্ষমতা দেওয়া হয়নি। শুল্ক ইস্যুতে দেশটির সুপ্রিম কোর্টের রায়ের পর, এই রায় কার্যকরে প্রক্রিয়া নিয়ে নানা আলোচনা চলছে। এছাড়া যেসব বড় কোম্পানি ইতোমধ্যে বাড়তি হারে শুল্ক পরিশোধ করেছে তাদের অর্থ ফেরত দেওয়া হবে কিনা এমন নানা জটিলতাও রয়েছে।
সুপ্রিম কোর্টের এমন রায় নিয়ে ক্ষুব্ধ হয়েছেন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প।
রায় প্রকাশের কয়েক ঘণ্টা পর হোয়াইট হাউজে এক সংবাদ সম্মেলনে তিনি বলেন, আমি আদালতের কিছু সদস্যকে নিয়ে লজ্জিত। আমাদের দেশের স্বার্থে সঠিক কাজটি করার সাহস দেখাতে না পারায় আমি তাদের নিয়ে পুরোপুরি লজ্জিত।
নতুন করে ১০ শতাংশ শুল্ক আরোপের যে সিদ্ধান্ত ট্রাম্প জানিয়েছেন, যুক্তরাষ্ট্রের আইন অনুযায়ী এই পথে পরবর্তী পদক্ষেপ নেওয়ার এখতিয়ার প্রেসিডেন্টের হাতে রয়েছে।
ট্রেড অ্যাক্ট ১৯৭৪-এর ধারা ১২২ ব্যবহার করে নতুন শুল্ক আরোপের সিদ্ধান্ত নিয়েছেন ট্রাম্প।
নিয়ম অনুযায়ী, এই সময়ের মধ্যে মার্কিন কর্তৃপক্ষ যাচাই করবে যে সংশ্লিষ্ট দেশ আমেরিকার সঙ্গে বাণিজ্যের ক্ষেত্রে আনফেয়ার ট্রেড প্র্যাকটিস করছে কি না।
এই সময়ের মধ্যে সংশ্লিষ্ট দেশটির শ্রমবাজার, শ্রমিকের কর্ম-পরিবেশ, বেতন, পরিবেশ দূষণ, নারীদের কর্ম পরিবেশ এসব বিষয়ে অনিয়ম হচ্ছে কি না সেগুলো তদন্ত করবে মার্কিন প্রশাসন। এক্ষেত্রে সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে মার্কিন আইন অনুযায়ী। যদি কোনো অনিয়ম পাওয়া যায় তাহলে সংশ্লিষ্ট দেশটিকে ঘাটতি থাকা বিষয়গুলো ঠিক করতে আরও ১৫০ দিনের সময় দেওয়া হবে। তবে এই সময় ৫০ শতাংশ পর্যন্ত শুল্ক আরোপ করতে পারবে যুক্তরাষ্ট্র।
এক্ষেত্রে বাড়তি শুল্ক আরোপ বা বাণিজ্যিক সম্পর্ক রাখা না রাখার বিষয়ে পরবর্তী সিদ্ধান্ত নিতে কংগ্রেসের স্মরণাপন্ন হতে হবে। আর যদি কোনো অনিয়ম না পাওয়া যায় তাহলে শুল্ক শূন্যের কোটায় নামিয়ে ফিরতে হবে নিয়মিত বাণিজ্য প্রক্রিয়া বা চুক্তিতে।
বাংলাদেশের জন্য গুরুত্বপূর্ণ বাণিজ্য অংশীদার যুক্তরাষ্ট্র। যদিও দেশটির সঙ্গে বাংলাদেশের বড় বাণিজ্য ঘাটতি রয়েছে। দুই দেশের ৮০০ কোটি ডলারের বাণিজ্যে বাংলাদেশের রপ্তানি বেশি, আমদানি কম। পাল্টা শুল্ক আরোপের ক্ষেত্রে বাণিজ্য ঘাটতির এই বিষয়টিকে বড় করে সামনে এনেছিল ট্রাম্প প্রশাসন। একটি চুক্তিতে পৌঁছাতে বাংলাদেশও যুক্তরাষ্ট্র থেকে বিমান, কৃষিপণ্যসহ নানা পণ্য আমদানির সিদ্ধান্ত নিয়েছিল।
অবশ্য অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের বিদায়ের আগ মুহূর্তে যে চুক্তিটি যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে হয়েছে সেটি নিয়ে খুশি হতে পারেননি বাংলাদেশের অর্থনীতিবিদ কিংবা ব্যবসায়ীদের কেউই।
বাংলাদেশের নিট পোশাকশিল্প মালিকদের সংগঠন বিকেএমইএর সভাপতি মোহাম্মদ হাতেম বলেন, যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সম্প্রতি যে চুক্তি হয়েছে সেটি অসম। আমাদের প্রাপ্তির চেয়ে ক্ষয় বেশি, কঠিন কঠিন শর্ত ওখানে আছে। ট্রাম্পের ট্যারিফ শুরু থেকেই আনপ্রেডিক্টাবল, কখন কী হয় বলা যাচ্ছে না। এখন যে ১০ শতাংশ দিয়েছে সেটা আবার কয়দিন থাকে সেটাও তো অনিশ্চিত।
তবে যুক্তরাষ্ট্রের সুপ্রিম কোর্টের রায়ের পর পরিস্থিতি বদলেছে বলেই মত অর্থনীতিবিদদের। যদিও এ নিয়ে আলোচনার সময় এখনো আসেনি বলেই মনে করেন বিশ্বব্যাংকের ঢাকা কার্যালয়ের সাবেক মুখ্য অর্থনীতিবিদ ড. জাহিদ হোসেন।
তিনি বলেন, এই মুহূর্তে পুরনো চুক্তি নিয়ে আলোচনার চেষ্টা না করে বাংলাদেশের উচিত চুপ থেকে সময় নেওয়া। যে সমস্ত শর্তে আমরা চুক্তি করতে বাধ্য হয়েছি সেগুলো নিয়ে এখন আলোচনা করতে গেলে ট্রাম্প প্রশাসন বাংলাদেশের সঙ্গে বাণিজ্য কমানোর মতো কঠোর সিদ্ধান্তও নিতে পারে।
ড. জাহিদ হোসেন বলেন, যুক্তরাষ্ট্রের সুপ্রিমকোর্টের রায় আমাদের জন্য এটা সুখবর। তবে আলোচনার জন্য আরও অপেক্ষা করতে হবে, একইসাথে ভবিষ্যতের জন্য প্রস্তুতি নিয়ে রাখতে হবে। ট্রাম্প এখন যে ১০ শতাংশ শুল্ক আরোপের সিদ্ধান্ত জানিয়েছেন এটি ১৫০ দিন পর্যন্ত বহাল থাকবে। এর মধ্যে মার্কিন প্রশাসন তাদের মতো করে বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ পরিবেশ তদন্ত করবে। তাই বাংলাদেশের উচিত হবে যেসব বিষয়ে ঘাটতি রয়েছে সেগুলো ঠিক করা বা যথাযথ উত্তর নিয়ে প্রস্তুত থাকা। অবশ্য ১৫০ দিনের এই সময়ের মধ্যে যুক্তরাষ্ট্র এতগুলো দেশের তদন্ত শেষ করে ব্যবস্থা নেবে, এটি সম্ভব নয়।
তিনি বলেন, এতগুলো দেশে এই কম সময়ে যেসব বিষয় তদন্ত করতে হবে সেটি মার্কিন প্রশাসনের জন্যও সম্ভব না। এছাড়া যুক্তরাষ্ট্রের প্রধান লক্ষ্য তো চীন এবং তার প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বীরা।
বরিশাল টাইমস
২১ ফেব্রুয়ারি, ২০২৬ ২৩:৪০
২১ ফেব্রুয়ারি, ২০২৬ ২৩:০১
২১ ফেব্রুয়ারি, ২০২৬ ২২:৪০
২১ ফেব্রুয়ারি, ২০২৬ ২২:২৫